শান্তিনিকেতনে অশান্তি (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত
ছাব্বিশ
বল্লভ শাহর কাহিনি কতটা সত্য আর কতটা বানানো সেটা ভাবার বিষয়। প্রমথ বাড়ি ফিরে সব কিছু শুনে ওর সুচিন্তিত মত দিল, “এটা একটা ইলাবোরেট মার্ডার প্লট। উনি ঠিক করেছিলেন রোহিত রয় আর দিলীপকে মারবেন। তার প্রিপারেশন করতেই শান্তিনিকেতনে একটা বাক্স চুরি করালেন। আর সেটা চুরি করালেন একটা মিস্ট্রিম্যানের জন্যে, যাকে কেউই চেনে না! দিস ইস ইনক্রেডিবল! বল্লভ শাহ কি এতই কাঁচা লোক যে কেউ ওঁকে একটা বাক্স নিয়ে আসতে বললেই উনি নিয়ে আসবেন? বাক্সটাতে তো ফলস বটম থাকতে পারত –স্মাগলাররা তো এইভাবেই হিরে-মুক্তো চালান করে।”
“ইউ হ্যাভ এ পয়েন্ট স্যার।”
“আরও দেখুন, এই ঘটনাটা যারা জানে, মানে এই মিস্ট্রিম্যানের ব্যাপারটা তারা কনভিনিয়েন্টলি কেউই বেঁচে নেই। সুতরাং তাদের প্রশ্ন করে এই গল্পের সত্যতা বার করা যাবে না।”
আমি বললাম, “দ্যাটস নট টোটালি ট্র্য, শরৎ না কে, সে তো আছে।”
“সেটাও বল্লভ শাহ ক্লিয়ার করে রেখেছেন, শরৎ উলটোপালটা বকে বলে।”
আমাকে মানতেই হবে প্রমথর কথাগুলো খুবই যুক্তিপূর্ণ।
একেনবাবুও বললেন, “আপনি স্যার সত্যি খুব ইনসাইটফুল কথা বলেন।” বলেই উঠে পড়লেন।
আমি বললাম, “কোথায় চললেন?”
“এই একটু ঘুরে আসি স্যার, স্টুয়ার্ট সাহেব ছুটি থেকে ফিরেছেন, একটু মুখ দেখিয়ে আসি। তারপর একটু লাইব্রেরিতেও যাব।”
“তাড়াতাড়ি ফিরবেন,” প্রমথ বলল। “আজকে কষা মাংস রাঁধব।”
“ওঃ, আপনি স্যার, সত্যি একজন মহাপুরুষ!” বলে একেনবাবু অদৃশ্য হলেন।
প্রমথ আজ নিজেই নিজেকে ছাড়িয়ে গেছে। সারা অ্যাপার্টমেন্টে কষা-মাংসের যে খুশবাই বেরিয়েছে, তাতেই অর্ধেক খাওয়া যায়! তার ওপর আমায় বলেছে পুরি বানাতে সাহায্য করতে, যেটা আমার পক্ষে বাস্তবিকই একটা রেয়ার প্রিভিলেজ। প্রমথর রাজত্বে আমি বড়োজোর শাকসবজি এবং বাসনপত্র বোয়াটোয়ার কাজ পাই। তবে ওর এই উৎসাহের কারণটা একটু বাদেই আমার কাছে স্পষ্ট হল। আমাদের কাছে পুরির গল্প শুনে ফ্রাইন্সস্কা পুরি খেতে চেয়েছে, তাই প্রমথর এই উদ্যোগ। আমার উপর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আটার সঙ্গে অল্প একটু ময়দা মিশিয়ে জল দিয়ে সেটাকে মাখা। নুন-টুন আর বোধহয় একটু মার্জারিন –যাই হোক, যা দেবার সেটা প্রমথই দিয়েছে। আমার যেটা দেওয়ার, সেটা শুধু ম্যানুয়াল লেবার। কিন্তু তার ওপরও প্রমথ খবরদারি চলছে। “এটা কি হচ্ছে, তুই কি কলম পিষছিস? একটু মাসল পাওয়ার দে।”
নিতান্ত খাবার লোভে অপমানগুলো হজম করছি। ভাগ্যক্রমে এই সময়ে ফ্রান্সিস্কা এসে গেল। ওর সঙ্গে প্রমথ সুবিধা করতে পারে না। আমি বুদ্ধি খাঁটিয়ে চট করে আমার দায়িত্বটা ওর ঘাড়ে চাপালাম। এরপর প্রমথ যেই “ওফফ ওরকম করে নয়’ বলতে গেছে, সঙ্গে সঙ্গে ফ্রান্সিস্কা ধমক, “ডোন্ট বি সিলি, আমি অনেক ডো বানিয়েছি, জাস্ট হ্যাভ সাম পেশেন্স।”
সাধে কি বলে নারীশক্তি! একেনবাবুর ভঙ্গিতে বলতে হয়, “ম্যাডামের পায়ে শতকোটি প্রণাম।’ ফ্রান্সিস্কা শুধু আটা ভালো মাখল না, লিভার লাগান প্রেশার প্লেট দিয়ে চমৎকার গোল গোল করে পুরিও বেলে ফেলল। পুরি ভাজা আরম্ভ হওয়ার মিনিট কয়েকের মধ্যেই একেনবাবু এলেন। খাবারের গন্ধে দেখলাম মুখ একেবারে উদ্ভাসিত।
খেতে বসে আমি একেনবাবুকে বললাম, “পুরিগুলোর জন্য কিন্তু সব ক্রেডিট ফ্রান্সিস্কার।”
“তাই নাকি! সত্যি ম্যাডাম ফ্রান্সিস্কা, এরকম পারফেক্ট গোল গোল পুরি কিন্তু আমি অনেকদিন দেখিনি, একেবারে অ্যামেজিং!”
প্রমথ বলল, “আপনার মতো নিমকহারাম দুনিয়াতে নেই। কেন, আমি আপনাকে আগে গোল গোল পুরি খাওয়াইনি?”
“কি মুশকিল স্যার, নিশ্চয় খাইয়েছেন। তবে অনেকদিন খাওয়াননি।”
“আর এই যে মাংস খাচ্ছেন –সেটার কথা তো বললেন না!”
“আমি তো মাংসের কথায় আসছিলাম স্যার, আপনি তো তার সুযোগই দিলেন না।”
“থাক, আর আসতে হবে না।”
ফ্রান্সিস্কা আমায় জিজ্ঞেস করল, “হচ্ছেটা কি?”
আমি বললাম, “প্রমথর হিংসা হচ্ছে যে একেনবাবু তোমার পুরির প্রশংসা করছেন, কিন্তু প্রমথর রান্নার প্রশংসা করেননি।”
ফ্রান্সিস্কা প্রমথর দিকে তাকিয়ে ভারি মিষ্টি করে হেসে বলল, “কাম অন, ইউ নো ইউ হ্যাভ ডান এ সুপার জব।”
.
খাওয়া দাওয়ার পর ফ্রান্সিস্কা কফি বানাতে বসল। মেয়েটা সত্যিই অপূর্ব কফি বানায়। সেই একই কফি বিন, একই গ্রাইন্ডার আর একই কফি-মেকার ব্যবহার করে। কিন্তু কেন যে এত ভালো স্বাদ হয় ভগবান জানেন। প্রমথ ভালো কফি বানায়। কিন্তু ফ্রান্সিস্কার কাছে লাগে না। একেনবাবু অবশ্য ইনস্ট্যান্ট কফি তৈরি করা ছাড়া অন্য ভেঞ্চারের মধ্যে পা দেন না। ফ্রান্সিস্কা কফি বানাতে বানাতেই জিজ্ঞেস করল, “ডিটেকটিভ, তোমার মার্ডার মিস্ট্রি সলভ হল?”
একেনবাবু বললেন, “না ম্যাডাম, এখনও একটু খটকা আছে।”
“কি রকম?”
“মানে যে লোকটা মার্ডার করেছে বলে আমরা সবাই মনে করছি, সে হয়তো করেনি যদি প্রমথবাবু যা বলছেন, তা সত্যি হয়।”
“কী যা-তা বকছেন মশাই, আমি আবার কি বললাম?” প্রমথ অবাক হয়ে প্রশ্ন করল।
“ঐ যে স্যার আপনি বললেন, ফলস বটমে মণি-মুক্তো লুকোনো থাকার কথা। শিশিরবাবুর বাক্সে যদি সত্যিই মণি-মুক্তো লুকোনো থাকে, তাহলে সেই বাক্স দু’হাজার ডলার খরচা করে আনতে বলার অর্থ হয়। তাহলে বল্লভ শাহর গল্পটা একেবারে বানানো নাও হতে পারে। সেইজন্যই বলছিলাম এখনও খটকা আছে।”
“আপনি কি গাঁজা-ফাঁজা খাচ্ছেন নাকি?”
“কী যে বলেন স্যার, এই তো পুরি আর মাংস খেলাম!”
আমি বললাম, “দাঁড়ান, আপনি নিশ্চয় কিছু জানেন, যা আমাদের বলছেন না।”
“কী মুশকিল স্যার। আমি যা জানি, আপনারাও তাই জানেন।”
“ওসব ছাড়ুন,” প্রমথ বলল, “বটম লাইনটা কি?”
“বটম লাইন হল স্যার, পুলিশ মনে হচ্ছে বল্লভ শাহকেই ধরবে।”
“আর আপনি?”
“আমি স্যার এখনও একটু কনফিউজড।”
“ডিটেকটিভ, ইউ আর অলওয়েজ কনফিউজড,” বলে ফ্রান্সিস্কা প্রথম কফির কাপটা একেনবাবুর হাতে ধরিয়ে দিল। একেনবাবুকে ফ্রান্সিস্কা খানিকটা শিশুর মতোই দেখে।
“থ্যাঙ্ক ইউ, ম্যাডাম ফ্রান্সিস্কা, “ কাপটা হাতে নিয়ে একেনবাবু অননুকরণীয় ভঙ্গিতে মাথা নোয়ালেন।
“ইউ আর ভেরি ওয়েলকাম, ডিটেকটিভ।”
আমরা সবাই কফি নিয়ে সোফায় বসার পর একেনবাবু বললেন, “ভালো কথা স্যার, মিষ্টার পিন্টোর কাছে একটা মেসেজ পেলাম। আমি ফোন করিনি বলেই বোধ হয়।”
“আপনি আর যাননি! উনি যে সেদিন আপনাকে বললেন কিছু টিপস দেবেন?”
“সময় পেলাম কোথায় স্যার। কাল যাব ভাবছি, আপনারা আসবেন?”
“যাবেন কিনা ভেবে দেখুন, প্রমথ বলল। “কেন স্যার?”
“ওই যে শুনলাম ওঁর টাকা-পয়সার টানাটানি চলছে। আপনার গাঁটের পয়সা যদি খসাতে পারেন, সেই জন্যেই নিশ্চয় ফোনটা করেছেন।”
একেনবাবু মনে হল একটু চিন্তিত হয়েছেন। “না স্যার, যাব। আপনারাও আসুন না, জোর করে তো আর পয়সা নিতে পারবেন না।”
“ও, আমরা যাব আপনাকে ওঁর হাত থেকে বাঁচাবার জন্য?”
“কী যে বলেন স্যার।”
ঠিক হলো আমি আর প্রমথ দুজনেই যাব।
ফ্রান্সিস্কা বলল, “সে কি, আমি যেতে পারি না? আমি জিনিওলজিতে খুব ইন্টারেস্টেড।” ।
“আপনি আসবেন ম্যাডাম?”
“না ইনভাইট করলে কি করে যাই?”
“আঃ, সে কি কথা, নিশ্চয় আসবেন ম্যাডাম। আমি মিষ্টার পিন্টোকে বলে রাখব, আমরা অনেকে যাব। আমার মনে হয় না ওঁর আপত্তি থাকবে বলে।”
“মোটেই নয়, প্রমথ বলল, “এতগুলো পোটেনশিয়াল ক্লায়েন্ট।”
