শান্তিনিকেতনে অশান্তি (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত
সতের
রাস্তায় বেড়িয়ে একেনবাবু বললেন, তা হল —
সামনাসামনি অল্প দূরত্ব থেকে রোহিত রয়ের কপালে গুলি করা হয়েছে। তবে কখন তা এখনো জানা যায়নি। অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ে অনেক কনস্ট্রাকশনের কাজ চলছে। সেই আওয়াজে গুলির শব্দ শুনতে পাওয়াও কঠিন। বন্দুক বা হ্যান্ডগান পুলিশ খুঁজে পায়নি। সুতরাং নিঃসন্দেহে এটা হোমিসাইড বা খুন। যেখানে দেহ পাওয়া গেছে, সেখানেই হত্যাকান্ড ঘটেছে। রক্ত ছাড়া সোফার কুশনে, রোহিতের সার্ট-প্যান্টে এবং কার্পেটে কফির দাগ। একটা কফির কাপ নীচে কার্পেটে কাত হয়ে আছে। উলটোদিকের সোফায় পাশে সাইড টেবিলে কফি ভরতি একটা কাপ পাওয়া গেছে। একটা সম্ভাব্য থিওরি হল, রোহিত যখন কারুর সঙ্গে সোফায় বসে কফি খাচ্ছিলেন তখন হঠাৎ ওঁকে গুলি করা হয়। খুনি সম্ভবত রোহিত রয়ের পরিচিত। নইলে সকালে এসে রোহিতের সঙ্গে কফি খাওয়ার প্রশ্ন উঠত না। প্রিলিমিনারি টেস্ট-এ দুটো কাপেই রোহিতের ফিঙ্গার প্রিন্ট ছাড়া আর কোনো ফিঙ্গার প্রিন্ট নেই। রোহিতই কফি বানিয়ে অভ্যাগতকে দিয়েছিলেন। খুনি মারবে বলে প্রস্তুত হয়েই এসেছিল, কাপ সে ছোঁয়েওনি। মনে হয় রোহিত যখন চুমুক দিতে কাপ মুখে তুলেছেন, তখনই খুনি হ্যান্ডগান বের করে গুলি চালিয়েছে। এগুলো সবই স্পেকুলেশন।
বাড়িতে জিনিসপত্র কেউ ঘাঁটাঘাঁটি করেছে বলে মনে হয় না। রোহিত কাজের সূত্রে নানান জায়গায় ঘুরতেন। সে-সব জায়গা থেকে নতুন পুরোনো বহু জিনিসই সংগ্রহ করে এনেছেন। সেই সংগ্রহের মূল্য খুব একটা কম নয়। তার থেকে কিছু খোয়া গেছে কিনা বলা শক্ত। আরেকটা কথা, রোহিত বোধ হয় কোথাও যাবার প্ল্যান করছিলেন। কারণ ওঁর স্যুটকেসে বেশ কিছু জিনিস ঢোকানো এবং কিছু পোয়া জামাকাপড় স্যুটকেসের পাশে রাখা, যেগুলো ঢোকানোর সময় পাননি। পুলিশ খোঁজ নিচ্ছে কোথায় ওঁর যাওয়ার কথা ছিল।
সকালে হাওয়ার্ড লংফেলো বলে একজন লোক রোহিতের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। তাঁর সন্ধান পুলিশ পেয়েছে। এখানেই জিনিসটা একটু গোলমেলে। হাওয়ার্ড পুলিশকে ফোন করেছিলেন রোহিতের মৃত্যুর কথা জানিয়ে। কিন্তু সেটা সিকিউরিটি ফোন করার প্রায় আধঘন্টা পরে, অর্থাৎ প্রায় সাড়ে এগারোটা নাগাদ। সিকিউরিটির লগ অনুসারে হাওয়ার্ড রোহিতের অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকেছিলেন সকাল নটা বেজে পাঁচ মিনিট নাগাদ। তার কিছুক্ষণ পরেই তিনি বেরিয়ে যান। ঠিক কখন, সিকিউরিটি লগবুকে লেখেনি। সিকিউরিটি ডেস্কে যে দুজন ছিল, তাদের একজন এক নতুন ভিসিটারকে নিয়ে ব্যস্ত ছিল। আর দ্বিতীয়জন ঐ অ্যাপার্টমেন্টেরই এক ভাড়াটের সঙ্গে তর্কাতর্কি করছিল। ফলে হাওয়ার্ড কখন গেলেন আর লেখা হয়নি। তবে পুলিশ যেটুকু জানতে পেরেছে –তা হল ন’টা-দশ থেকে ন’টা-পনেরোর মধ্যেই হাওয়ার্ড বেরিয়েছে। তর্কাতর্কি শুরু হবার একেবারে প্রথম দিকে। আরেকটা ইন্টারেস্টিং পয়েন্ট, হাওয়ার্ড খুব ব্যস্তসমস্ত হয়ে বেরিয়ে যান। তর্কাতর্কির মাঝেও সিকিউরিটির দু’জনেই সেটা খেয়াল করেছে। তাহলে এতক্ষণ বাদে তিনি ফোন করলেন কেন?
আরেকটা কথা, রোহিতের অ্যাপার্টমেন্টে সিকিউরিটির ব্যবস্থা একটু ঢিলে ঢালা। চেনা মুখ হলে সিকিউরিটির লোকেরা অনেক সময়ে ভাড়াটদের ইন্টারকমে যোগাযোগ করে পারমিশন নেয় না, নামও লিখে রাখে না। সুতরাং আর কেউ সকালে রোহিতের কাছে এসেছিল কিনা, সঠিক জানার কোনো উপায় নেই।
নিউ ইয়র্ক পুলিশ দ্রুতগতিতে কাজ করে। এরমধ্যেই হাওয়ার্ডকে থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। হাওয়ার্ড যা বলেছেন তার সঙ্গে সিকিউরিটির লোকদের কথায় খুব একটা অমিল নেই। হ্যাঁ, তিনি ন’টা পাঁচ নাগাদই রোহিত রয়ের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। কিন্তু অ্যাপার্টমেন্টে এসে দেখেন রোহিত মরে পড়ে আছেন। অবভিয়াসলি হি প্যানিকড। সঙ্গে সঙ্গে নীচে যান সিকিউরিটির লোকদের বলতে। এলিভেটর থেকে নেমে যখন প্যাসেজ দিয়ে হাঁটছেন, তখন জানলা দিয়ে দেখেন ওঁর গাড়ি পুলিশ টো-ট্রাকে বেঁধে নিয়ে যাচ্ছে। একবার গাড়ি চলে গেলে ছাড়াতে দু-তিনশোর ডলারের ধাক্কা! পড়ি-কি-মরি করে পুলিশের কাছে ছুটে যেতে গিয়ে রাস্তায় পা মচকে পড়ে যান। সেখানে একটা ভাঙ্গা কাচের বোতল ছিল –তাতে ভীষণভাবে পা কেটে যায়। একটু আগে একটা মার্ডারড লোককে দেখে তারপরে নিজের এই রক্তাক্ত অবস্থা –হি ওয়াজ ইন টোটাল শক, বাস্তববুদ্ধি লোপ পেয়েছিল। প্রায় সেন্সলেস হয়ে ওঁকে পড়ে থাকতে দেখে, পথচারীদের একজন অ্যাম্বুলেন্সে খবর দেয়। এমার্জেন্সি রুমে বেশ কয়েকঘন্টা কাটিয়ে ফার্স্ট এইড, স্টিচ, এক্স-রে, ইত্যাদি হয়ে যাবার পর ওঁর খেয়াল হয় –পুলিশকে ফোন করা হয়নি! তখনই পকেট থেকে মোবাইল বার করে পুলিশকে ফোন করেন।
এতটা শোনার পর আমি একেনবাবুকে জিজ্ঞেস করলাম, “এটা কি বিশ্বাসযোগ্য কথা বলে আপনার মনে হয়?”
“হু নোজ স্যার। তবে একটা কথা ঠিক, ওঁর গাড়িটা ন’টা দশ মিনিট নাগাদ পুলিশ টো করে নিয়ে গিয়েছে পার্কিং ভায়লেশনের জন্য। আর এ-ও ঠিক যে এমার্জেন্সি রুমে কাঁচে কাটা পা নিয়ে উনি এসেছিলেন।”
হয়তো হাওয়ার্ড লোকটা সত্যি কথাই বলছে। কিন্তু তবু আমার মনে হল, ডাল মে কুছ কালা হ্যায়। আমি বললাম, “গাড়ি টো করার ব্যাপারটা আর পায়ে কাঁচ ঢোকা সত্যি। কিন্তু তার থেকে কি প্রমাণ হয় হাওয়ার্ড নির্দোষ?”
“তা হয় না স্যার। তবে খুনের জন্য একটা মোটিভ দরকার। সেদিকটাও ভাবতে হবে।”
“তা ঠিক। লোকটা কী করে?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“স্ট্যামফোর্ডে ওঁর হ্যাঁন্ডিক্রাফট- এর একটা দোকান আছে।”
“রোহিতের কাছে কেন এসেছিল?”
“ওঁর বয়ান অনুসারে, হাতে বোনা থাইসিল্কের তৈরি স্পেশাল হ্যাঁন্ডিক্র্যাফট কাভারিং এর ডেলিভারি নিতে। মিস্টার রয় আগেও ব্যাঙ্কক থেকে ওঁর জন্য এসব এনেছেন।”
“আপনি বিশ্বাস করেন?”
“অবিশ্বাস করার খুব একটা কারণ দেখি না স্যার। কারণ মিস্টার রয়ের অ্যাপার্টমেন্টে কাগজে প্যাক করা বেশ কিছু দামি থাই সিল্কের কাপড় পুলিশ পেয়েছে।”
“রোহিত তো বেশ কিছুদিন ফিরেছে –এদ্দিন বাদে মাল নিতে এল এই লংফেলো।”
“আপনার স্যার সন্দেহটা যায়নি মনে হচ্ছে?”
“না যায়নি,” আমি স্বীকার করলাম। “সামথিং ইস স্টিল ফিশি।”
“পুলিশও সেই প্রশ্ন করেছিল। মিস্টার লংফেলোর হ্যাঁন্ডিক্রাফট-এর ব্যাবসা করলেও, ওঁর প্যাশন হচ্ছে স্যার অ্যান্টিক। এ নিয়ে উনি অনেক পড়াশুনো করেছেন। অ্যান্টিক অ্যাপ্রেইজার হিসেবে বেশ পরিচিতিও আছে। সেই সূত্রে কয়েকদিনের জন্য ওহায়ওতে গিয়েছিলেন, গতকাল ফিরেছেন। ফিরে এসে মিস্টার রয়ের মেসেজ পান।”
“আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে হ্যাঁন্ডিক্রাফট-এর ব্যাবসাই হচ্ছে ওঁর হবি। দোকান ছেড়ে এইভাবে হাওয়া হয়ে গেলে তো ব্যাবসা লাটে উঠবে।”
“এটা স্যার আপনি ঠিকই বলেছেন। তবে কিনা ভদ্রলোকের টাকার অভাব নেই। গ্রিনিচে বিশাল বাড়ি আছে। ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্টের মতে বাপ-ঠাকুরদা যা রেখে গেছেন, তাতে মিস্টার লংফেলোর কয়েক পুরুষ চলে যাবে।”
আমি বললাম, “এটা জানার পরও আপনি বিশ্বাস করেন যে দু-তিনশো ডলার ফাইন বাঁচাতে লোকটা ওভাবে ছুটেছিল?”
“ইউ হ্যাভ এ পয়েন্ট স্যার।”
একেনবাবুর কাছে সার্টিফিকেট পেয়ে আমি উৎসাহিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “আর কী জানলেন বলুন?”
“ও হ্যাঁ, মিস্টার রয় মাঝেমাঝে অ্যান্টিকের ব্যাপারে মিস্টার লংফেলোর মতামত নিতেন। গতকাল ফোনে যখন কথা হয়েছিল তখন ওঁকে বলেছিলেন, একটা অ্যান্টিকের ন্যায্য দাম কী হতে পারে সেটা মিস্টার রয় জানতে চান।”
“অ্যান্টিকটা কী?”
“তা মিস্টার লংফেলো জানেন না।”
“আপনার কি মনে হয়, এই অ্যান্টিকের সঙ্গে খুনের কোনো সম্পর্ক আছে?”
একেনবাবু বললেন, “এর আগেও মাঝেমধ্যে ঠিক এই ব্যাপারেই মিস্টার লংফেলোর সাহায্য মিস্টার রয় নিয়েছেন। তবে এটা স্যার আপনার প্রশ্নের সঠিক উত্তর হল না।”
“বুঝেছি, লংফেলো নিয়ে আপনি মাথাই ঘামাতে চাইছেন না।”
“তা ঠিক নয় স্যার, তবে মোটিভটা আগে বার করুন। মোটিভ ছাড়া র্যান্ডম কিলিং হতে পারে, কিন্তু কোল্ড ব্লাডেড মার্ডার হয় না।”
