রুআহা (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

আট

রাতটা ভালয় ভালয় কাটল। হায়নারা বার-তিনেক এসেছিল। পিস্তল দিয়ে ওদের কাছে মাটিতে গুলি করাতে আবার হাঃ হাঃ করে ফিরে গেছিল। শর্ট-ব্যারেলড পিস্তলের এই মজা। প্রচণ্ড আওয়াজ হয়। তারপর এই ফাঁকা, পাহাড়ি জায়গাতে তো কথাই নেই।

ভোরের আলো ফুটতে না-ফুটতে গুহা থেকে সব জিনিসপত্র নামিয়ে জিপে তুলে তৈরি হয়ে নিলাম। তিতির তাড়াতাড়ি করে একটু পরিজ, মিল্ক-পাউডারের দুধের সঙ্গে বানিয়ে দিল। আর গ্যাজেল-এর স্মোক-করা টুকরো তো ছিলই। মিস্টার ডবসনকে খেতে দেওয়া হল। তাঁর কাছে খাওয়ার জল, টিনের মাছ, সসেজ, ফল, মালটি-ভিটামিন ট্যাবলেটস্ এবং যতখানি স্মোক-করা মাংস ছিল, সব কিছু আমরা দিয়ে গেলাম। ডামুর মৃতদেহ শক্ত হয়ে ফুলে গেছিল ত্রিপলের মধ্যে। ডবসনকেও বলা হয়েছিল সাহায্য করতে। একটু আগে জিপে করে আমরা সকলে নদীতে গিয়ে একটা বড় গাছের গোড়ার কাছে বালি খুঁড়ে ডামুকে কবর দিলাম। ওয়ানাকিরি-ওয়ানাবেরির নাম ভুলে-যাওয়া ডামুকে। মনটা বড় ভারী লাগছিল।

তিতির আমার হাতের পরিচর্যা করছিল যখন, তখন ঋজুদা সার্গেসন ডবসনকে নাইলনের দড়ি দিয়ে বাঁধল। তারপর এক অদ্ভুত কাণ্ড করল। জিপের পেছন থেকে জিনিসপত্রর ম্যাপ দেখে একটি চারকোনা চকচকে বড় টিন বের করল। সেই টিনটার ঢাকনি খুলে তাতে জল মেশাবার পর রাজমিস্ত্রিরা যেমন জিনিস দিয়ে ইটের গাঁথুনিতে সিমেন্ট লাগায় সেই রকম একটি জিনিসও জিপ থেকে বের করল। তারপর আমাদেরও ডাকল। গুহার মুখে, গুহার উপর থেকে এবং দু’পাশ থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে প্রকাণ্ড বড় বড় গোলাকার পাথর হাঁসফাঁস করতে করতে নিয়ে এলাম আমরা। পাথরগুলো দিয়ে গুহার মুখ পুরো ভরে দেওয়া হল। বয়ে আনতে হলে একটিও আনার ক্ষমতা আমাদের তিনজনের ছিল না। তারপর সেই সিমেন্টের মতো জিনিসটি দিয়ে পাথরগুলোর মুখে মুখে জোড়া দিতে লাগল ঋজুদা কাদের মিঞা রাজমিস্ত্রির মতন। সিমেন্ট, বালি, চুন-সুরকি শুকোতে সময় লাগে। কিন্তু সিমেন্টের মতো ঐ জিনিসটি ঐ চ্যাপ্টা চামচের মতো জিনিসে করে লাগানো মাত্রই শুকিয়ে যাচ্ছিল। ভিতর থেকে ডবসন বাঁধা হাত দিয়ে ধাক্কা দিচ্ছিলেন। ঋজুদা ফোকর দিয়ে মুখ ঢুকিয়ে বলল ইংরিজিতে, ধাক্কা দিয়ে কোনো লাভ নেই। তবে ভয়ও নেই। আমরা যদি টর্নাডোকে ধরতে পারি, তাহলে আমরাই এসে তোমাকে উদ্ধার করব। আর টর্নাডো যদি আমাদের ধরে, তবে তাকে বলব আপনার কথা। বলব, এমন বিশ্বাসী অনুচর টর্নাডো কেন, কারো পক্ষেই মেলা সম্ভব ছিল না। তখন সেই-ই নিশ্চয়ই লোক পাঠিয়ে বা নিজে এসে আপনাকে উদ্ধার করবে। আপনি যদি আমার অনুচর হতেন, তাহলে তো নিজেই এসে আপনাকে মুক্ত করতাম, আপনার মতো অনুচর তো অনেক তপস্যা করলেই মেলে?

ভিতর থেকে ডবসন বারবার বলতে লাগলেন, আমাকে বাঁচান, আমাকে এভাবে রেখে যাবেন না, প্লিজ; মিস্টার বোস, প্লিজ।

ঋজুদা বলল, তা হয় না। আপনি তো মরেননি। সাপ বা বিছের কামড় অথবা জলাভাব বা খাদ্যাভাব ছাড়া মরার আর কোনো কারণ রইল না। কোনো জানোয়ারই ঢুকতে পারবে না ভিতরে। তবু, মরতে হয়তো পারেন। তবে, সে সম্ভাবনা নিতান্তই কম।

তবে, একটা কথা। একটা কথা শুনুন।

ঋজুদা হঠাৎ খুব মনোযোগী হয়ে উঠল, যেন এই কথাটা শোনার জন্যেই এতক্ষণ অপেক্ষা করে ছিল। পাথরের ফাঁকে কান লাগিয়ে বলল, বলুন মিস্টার ডবসন, আমি শুনছি।

ডবসন বললেন, আমার ব্যাগের মধ্যে একটি ফ্লেয়ার গান আছে।

দেখেছি, আছে। এখন সিগন্যালটা কী তাই বলুন।

ওয়ান গ্রিন, ফলোড বাই টু রেড, দেন টু বি কনক্লুডেড বাই ওয়ান গ্রিন।  ডবসন এক নিঃশ্বাসে বললেন।

প্লিজ রিপিট। ঋজুদা বলল। ডবসন রিপিট করলেন।

কিসের সিগন্যাল এটা?

আমি বিপদে পড়লে আমাকে সাহায্য করার সিগন্যাল। টর্নাডোর দলের লোক আমার ফ্লেয়ার গান থেকে এই সিগন্যাল পেলেই আমাকে উদ্ধার করতে আসবে।

কিন্তু তারা আপনার বেয়ারিং জানবে কী করে? আমরা তো অন্য জায়গা থেকেই ছুঁড়ব, যদি ছুঁড়ি।

ওরা বেয়ারিং বের করে নেবে; ওদের কাছে কমপুটার আছে। সে ভাবনা আপনার নয়।

ঠিক আছে। আপনার চিন্তা নেই। আমরা এই গুহা থেকে দু-তিন বর্গকিলোমিটারের মধ্যেই ছুঁড়ব ফ্লেয়ার। এখন আমরা চলি। ওল দ্যা বেস্ট।

ভিতর থেকে আওয়াজ হল, ওল দ্যা বেস্ট।

আমার মনে হল শুনলাম, খোল দ্যা খেস্ট।

রওয়ানা হলাম আস্তানা ছেড়ে। এই অল্প কদিন গুহাটাতে থেকে এটাকেই ঘরবাড়ি বলে মনে হচ্ছিল। এমনই বোধ হয় ঘটে। রেলগাড়ির কামরাতে একরাত-একদিন কাটিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে সেই কামরা ছেড়ে নেমে যাবার সময় মনখারাপ লাগে। ঋজুদা একদিন বলছিল আমাদের জীবনটাও রেলগাড়ির কামরারই মতো। যারা এই অল্পদিনের ঘর-বাড়ি ছেলে চলে যাবার সময় মনখারাপ করে, তারা আসলে বোকা।

ঋজুদার নির্দেশমতো আমরা জিপ চালিয়ে নদীর দিকে চললাম, তারপর নদীর ওপারে যেখানে জঙ্গল খুব গভীর সেখানে পৌঁছে, বড় গাছ আর ঝোপঝাড়ের আড়ালে জিপ দুটোকে ক্যামোফ্লেজ করে রাখা হল। ঋজুদা আমার এবং তিতিরের রাকস্যাক চেয়ে নিল। বলল, এতে অতি প্রয়োজনীয় সব জিনিস আমি ভরে দিচ্ছি। তোরা ততক্ষণে আগে যেখানে লোক-চলাচল দেখেছিল তিতির, সেই দিকে নজর রাখ দূরবিন নিয়ে উঁচু গাছে চড়ে। বিকেল হলে নেমে এসে আমার কাছে খবর দিবি, কী দেখলি না-দেখলি। দিনের বেলা প্রসেশান করে জিপের ধুলো উড়িয়ে যাওয়ার দিন আমাদের আর নেই। কখন কী ঘটে তার জন্যে সবসময়ই তৈরি থাকতে হবে।

তিতির আর আমি ঋজুদার কথামতো রাকস্যাক নামিয়ে রেখে চলে গেলাম। যাবার আগে ঋজুদাকে বললাম, ফ্লেয়ার গান থেকে ফ্লেয়ার ছুঁড়লে না তুমি?

ঋজুদা বলল, ফ্লেয়ার গান ছুঁড়তে হয় রাতের অন্ধকারে, নইলে আলো দেখা যাবে কী করে? তাছাড়া, ডবসনের কথামতো ফ্লেয়ার গান আমি মোটেই ছুঁড়ব না। ডবসন আমাদের মিথ্যা কথা বলেছে। ডবসন আসলে টর্নাডোর দলের লোকই আদৌ নয়। ও একটি বড় দল নিজে তৈরি করেছে। ডামুর টর্নাডোর দলের উপর রাগ ছিল, বিশেষ করে ব্যক্তিগত রাগ ছিল টর্নাডোর উপর। এই পাজি লোকটা ডামুকে বুঝিয়েছিল যে, আমাদের আর ওদের উদ্দেশ্য এক, টর্নাডোর দলকে শেষ করা; কিন্তু টর্নাডোর দল শেষ করার পর ডামু কী করে খাবে? বাঙালি বাবুরা কি তার সারাজীবনের দায়িত্ব নেবে? তারা তো ভারতবর্ষে ফিরে যাবে। তার চেয়ে ওর দলে ভিড়ে ডামু ইনডোর উপর প্রতিশোধও নিতে পারবে এবং তারপর ডবসনের সঙ্গে মিলে ওরা একাই চুরি করে পশুশিকারের ঢালাও ব্যবসা শুরু করবে। ডামুকে পঞ্চাশ হাজার তানজানিয়ান শিলিং আদপে দিয়েছিল কি না সে সম্বন্ধে আমার ঘোর সন্দেহ আছে। লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু। লোভকে যে কেবলই বাড়িয়ে চলে তার এমন করেই প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়। আমি ডামুকে পঁচিশ হাজার শিলিং অগ্রিম দিয়ে রেখেছিলাম। বাকি আরও পঁচিশ দেব বলেছিলাম আমাদের কাজের শেষে। ডামু ভাবল আমাদের টাকাটা মেরে আবার ও ডবসনের টাকা পাবে এবং ভবিষ্যতেও তার কোনো অভাব থাকবে না। ডবসন জানে না, ওর ফ্লেয়ার গান আমাদের এমন কাজে লাগবে এবং এমন সময় যে ভগবান সদয় হলে আমাদের কাজই হাসিল হয়ে যাবে।

ঘড়িতে তখন বারোটা। আমরা এগিয়ে গেলাম। গলায় বায়নাকুলার ঝোলানো। কোমরে পিস্তল, ছুরি, ছোট্ট জলের বোতল ইত্যাদি। কিছুটা এগিয়ে গিয়ে বড় গাছ। দেখতে লাগলাম।

বাওবাব গাছগুলো যে শুধু বড় তাই-ই নয়, এতই বড় যে ভয় লাগে। কত যে তাদের বয়স! অদ্ভুত দেখতে। সাধে কি নাম হয়েছে আপসাইড-ডাউন ট্রিজ! অনেক দূরে একটা বড় বাওবাব গাছ ছিল। একটু এগোতেই দেখলাম, জংলি মৌমাছি উড়ছে তাদের চারপাশে। বাসা বেঁধেছে অনেক। একটা র‍্যাট দৌড়ে গেল সামনে দিয়ে। এই কালো গলার র‍্যাট বা হানি-ব্যাজারদের সঙ্গে রুআহা ন্যাশনাল পার্কের মধুচোরদের খুব ভাব। র‍্যাট প্রায় কুকুরের মতো কিন্তু তার চেয়ে অনেক ছোট একরকমের জানোয়ার। এরাও আমাদের দেশের ভাল্লুকের মতো মধু খেতে খুব ভালবাসে। তাই চোরা-মধুপাড়িয়েরা মৌচাক ভেঙে মধু পেয়ে নিয়ে কিছুটা রেখে যায় এদের জন্যে। একরকমের পাখি আছে, তাদের নাম ব্ল্যাক-থ্রোটে হানি-গাইড। এরা খুব সহজে চোখে পড়ে না কিন্তু এরাই মধুপাড়িয়েদের পথ-প্রদর্শক। এরা মধুপাড়িয়েদের সোজা নিয়ে হাজির করে মৌচাকের কাছে। তাই, মধু পাড়া হলে মৌচাকের একটি অংশ রেখে যায় হানি-গাইডের খাবার জন্যে। ওরা ভয় পায়। পথপ্রদর্শককে খাজনা না দিলে, পরে কখনও যদি সে প্রতিশোধ নেবার জন্যে সোজা তাদের নিয়ে গিয়ে হাজির করে কোনো চিতা বা লেপার্ড বা সিংহর দলের সামনে।

আমাদের সুন্দরবনে, গরান ফুলের মধু খেয়ে যেই মৌমাছি ওড়ে অমনি সেই মৌমাছির পিছু নেয় মৌলেরা। এরা এখানের দারুণ এই হানি-গাইডের সার্ভিস পায়! অবশ্য, সুন্দরবনে মৌমাছির দিকে চোখ রেখে গরান-হাঁতালের বনে বনে নাক উঁচু করে হেঁটে যেতে গিয়েই তো অনবধানে বাঘের খাদ্য হয় বেচারি মৌলেরা। বিপদ এখানেও অনেক। কিন্তু সুন্দরবনের মধুপাড়িয়েরা মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও ঐ ভাবেই জঙ্গলে ঢোকে। এখানের মধুপাড়িয়েরাও নিশ্চয়ই সুন্দরবনের মৌলেদের মতোই গরিব। নইলে হাতি, সিংহ, সাপ, চিতা, লেপার্ড, গণ্ডারের ভয় তুচ্ছ করে এমন সাংঘাতিক ভয়াবহ বনে কি তারা একটু মধু পাড়বার জন্যে ঢুকত! ক’ শিলিংই বা রোজগার করে মধু পেড়ে!

বাওবাব গাছটার প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। হঠাৎই মানুষের গলার স্বর কানে এল।

আমি তিতিরকে ইশারাতে দাঁড়াতে বলে তাড়াতাড়ি একটা কমব্রেটাম ঝোপের আড়ালে ওকে নিয়ে গুঁড়ি মেরে বসলাম।

ঠিকই তো! দূরের বাওবাব গাছের কাছে কয়েকজন মানুষ কথা বলছে। তিতির ততক্ষণে যে-দিক থেকে কথা আসছিল সেদিকে দূরবিন তুলে ধরেছে। কিছুক্ষণ দেখে ও দূরবিন নামিয়ে বলল, কী আশ্চর্য!

কী?

কতকগুলো পাখি! একেবারে মানুষের গলার মতো আওয়াজ।

আমিও দেখলাম। দেখি, অনেকগুলো বড় বড় পাখি, বড়দিনের আগে নিউ মার্কেটে যেসব সাইজের টার্কি বিক্রি হয় তার চেয়েও বড়, কালো গা, লাল গলা-বুক। ডানার দিকটা সাদা আর তাদের ইয়া বড় বড় লম্বা কালো কালো ঠোঁট আমাদের দেশের ধনেশ পাখির মতো। পাখিগুলো পাতা ও মাটিতে কী যেন খুঁজে খুঁজে বেড়াচ্ছে। এ কী। একটার মুখে যে একটা সাপ! পেটের কাছে কামড়ে ধরেছে সাপটাকে বিরাট সাঁড়াশির মতো ঠোঁটে আর সাপটা কিলিবিলি করছে এঁকেবেঁকে। কী যে ব্যাপার কিছুই বোঝার উপায় নেই। একেবারে ভুতুড়ে কাণ্ড। ঠোঁট ফাঁক করে যেই না কথা বলছে, অমনি মনে হচ্ছে মানুষই বুঝি! হুবহু! এ-দেশী মানুষেরই মত গলার স্বর। এ কোন্ পাখি আমি জানি না। ঋজুদাকে জিজ্ঞেস করতে হবে ফিরে।

ঠিক সেই সময়ই কাণ্ডটা ঘটল। তিতির আমার কোমরে হাত দিল। ওর মুখের দিকে চেয়ে ওর চোখকে অনুসরণ করে তাকাতেই দেখি, একটি চমৎকার বুশ বাক দাঁড়িয়ে আছে আমাদের দিকে মুখ করে। সোয়াহিলিতে এদের বলে পোঙ্গো। চমৎকার বাদামি গা, গলার কাছে আর শরীর আর গলা যেখানে মিলেছে সেখানে কেউ যেন তুলি দিয়ে সাদার পোঁচ লাগিয়ে দিয়েছে। পিছনের পা দুটির উপর সাদা রঙের ফোঁটা। দুটি সুন্দর সজাগ কান; আর মাথার উপরে বাঁকানো প্যাঁচানো শিঙের বাহার, অনেকটা আমাদের দেশের কৃষ্ণসার অথবা চৌশিঙ্গার মতো।

কী হল, বোঝার আগেই পোঙ্গো বাবাজি মাংগো বলে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল। সাপে কামড়াল কি? নাঃ, সাপে কামড়ালে অমন করে পড়ত না। গুলিও কেউ করেনি। শব্দ হত তাতে। তবে?

আমরা খুব ভয় পেয়ে গেলাম। তিতির মাথা তুলতে যাচ্ছিল। ওর পনিটেইলে হ্যাঁচকা টান লাগিয়ে মাথা নামিয়ে দিলাম। নিজেও মাথা নামিয়ে নিলাম। কমব্রেটাম ঝোপের লাল টাসল আর চাইনিজ-ল্যাণ্টার্নের মতো ফুলের ঝাড়ের সঙ্গে একেবারে নাক লাগিয়ে মড়ার মতো পড়ে রইলাম। কী যেন নাম এই ফুলগুলোর! কমব্রেটাম তো ঝাড়ের নাম। এদের একটা বটানিকাল নামও আছে। মনে পড়েছে। পারপারফালিয়া। ঋজুদা বানানের কারণে ঠাট্টা করে একদিন বলেছিল পুরপুরফুলিয়া। তাই-ই মনে আছে। বর্ষাকাল ছাড়া সব সময় ফুল ফোটে এই ঝোপে।

বুশ-বাকটা পড়েই রইল। নিথর হয়ে। এমন সময় একজন রোগা টিঙটিঙে নিগ্রো লোক দেখা গেল। তার পরনে আমাদের দেশের জঙ্গলের লোকের মতোই একটি নেংটি কিন্তু তফাৎ এই যে, তা রঙিন। তার হাতে একটি ধনুক। লোকটি এসে বুশ-বাকটির পাশে দাঁড়াল। তারপর যে বাওবাব গাছে চড়ে আমরা চারদিকে দেখব ঠিক করেছিলাম, সেই দিকেই তাকিয়ে কাকে যেন ডাকল। আমাদের দিকে পিছন ফিরতেই আমরা সাবধানে, নিঃশব্দে আরও একটু পেছিয়ে গিয়ে একটি দোলামতো জায়গায় গড়িয়ে গিয়ে আড়াল নিলাম। নিতে নিতেই কোমরে হাত দিয়ে দুজনেই পিস্তল বের করে ফেললাম। লোকটার ডাকে সাড়া দিল অন্য দুটো লোক। তারা এগিয়ে আসতে লাগল বুশ-বাকটার দিকে। প্রথম লোকটার হাতে কিন্তু শুধু ধনুকই ছিল। তীর ছিল না। অন্যদের হাতও খালি। ওরা তিনজনে বুশ-বাকটাকে দেখে আনন্দে দুবার নেচে উঠল। ওদের হাতগুলো হাঁটুরও নীচে পড়ে। হাতের আঙুলগুলো কাচকলার কাঁদির মত। বাইরের দিকটা চাইনিজ ইংকের মতো কালো, ভিতরের দিকটা সাদা।

আমরা চুপ করে দেখতে লাগলাম। লোকগুলো বুশ-বাকটাকে ফেলে রেখে বাওবাব গাছটার কাছে ফিরে গেল। আমরা এবার বুকে হেঁটে-হেঁটে ওদের দিকে এগোতে লাগলাম আড়াল নিয়ে নিয়ে। তিতির, দেখি কোথায় আমার কাছে কাছে থাকবে, কিন্তু আশ্চর্য! চোখের সামনে বিষের তীরের শক্তি দেখার পরও একটুও ভয় না-পেয়ে আমাকে ছেড়ে বাঁ দিক দিয়ে বুকে হেঁটে ঐ লোকগুলোর কাছেই এগিয়ে যেতে লাগল। কী করতে চায় ও? এখনও জানে না ও ঐ ছোট্ট বিষের তীরের একটু যদি গায়ের কোথাওই লাগে তাহলে কী হবে!

কিন্তু এখন সামলানোর বাইরে চলে গেছে ঘটনা। লোকগুলোর প্রায় পঁচিশ মিটারের মধ্যে চলে গিয়ে তিতির উপুড় হয়ে মাটিতে শুয়ে পড়ল। দেখলাম, পিস্তল ধরা ডান হাতটা রেখেছে পেটের নীচে, যাতে পিস্তলটা লোকগুলোর নজরে না-পড়ে।

ডানদিকে, লোকগুলোর থেকে একই দূরত্বে আড়াল নিয়ে আমিও সরে গেছি। এবার গাছের গুঁড়িটাও দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু তিতিরের থেকে আমি এখনও অনেক দূরে। গাছের গুঁড়ির নীচে একটা পুঁটলি, কাঠ খুদে তৈরি গোল কলসি মতো একটা। বোধহয় মধু পাড়বে তাতে। দু জোড়া তীর-ধনুক। আর গোটা দশেক তীর একসঙ্গে বাঁধা। লোকগুলো প্রায় আধা-উলঙ্গ। গায়ে দেওয়ার জন্যে একটা করে রঙিন কিটেঙ্গে। ওরা বোধহয় এই-ই এসে পৌঁছল। মধু পাড়বার আগেই বোধ হয় রাতের খাওয়ার সংস্থান করে নিল বুশ-বাকটা মেরে। ওরা যে খুবই গরিব তা দেখেই বোঝা যাচ্ছিল।

হঠাৎ মেয়েলি কান্নার কুঁই-কুঁই-কুঁই শব্দ কানে এল। সর্বনাশ। তিতির! কী, করতে চায় কী মেয়েটা? নিজেও মরবে। আমাকেও মারবে।

সোয়াহিলিতে কেঁদে কেঁদে কী যেন বলছিল তিতির। আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না। লোকগুলো ঐ মেয়েলি কান্না শুনে ভয় পেয়ে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল। তারপর তিতিরকে যখন উপুড় হয়ে শুয়ে থাকতে দেখল, তখন আরও চমকে উঠল। একজন তাড়াতাড়ি ধনুকে তীর লাগাল। মাটিতে বা শোয়ানো ছিল, এতক্ষণ দেখিনি, বর্শা তুলে নিল অন্য একজন। কিন্তু ওদের মধ্যে যে বয়স্ক, সর্দার গোছের, সে-লোকটা ওদের যেন বারণ করল। তীর-ধনুক নামিয়ে রাখল বটে, কিন্তু অন্যজন বর্শা ধরেই থাকল তিতিরের দিকে লক্ষ করে।

এতক্ষণে বুঝতে পারলাম তিতির কী বলছে। কেঁদে কেঁদে বলছে, নিমেপোটিয়া, নিমেপোটিয়া, নিমেপোটিয়া– এই কথাটা আমাকেও ঋজুদা শিখিয়েছিল। এর মানে হচ্ছে, আমি হারিয়ে গেছি।

লোকটা তিতিরের কাছে গেল, গিয়ে তিতিরের হাত ধরে ওঠাল। আশ্চর্য! তার হাতে পিস্তল নেই। গেল কোথায়? ম্যাজিক জানে নাকি? নিশ্চয়ই পেটের নীচের কোনো পাথরের আড়ালে বা ঝোপে ও লুকিয়ে ফেলেছে। চালু পার্টি! এমন ঝুঁকির মধ্যেও মাথা একদম কুলফির মতো ঠাণ্ডা।

লোকটা তিতিরের সঙ্গে অনেক কথা বলতে বলতে ওকে গাছের গুঁড়ির কাছে নিয়ে এল। কাঠখোদা কলসি থেকে ওকে কাঠের মগে করে জল খেতে দিল। একটা ইয়া গোদা কলাও খেতে দিল। তিতির তখনও কাঁদছিল, নাক-চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছিল। একবার মাথা নাড়ছিল আর বারবার বলছিল, আমেফুকা, আমেফুকা! শুনে তো আমার রক্ত হিম হয়ে গেল। বলছে কী? নিশ্চয়ই আমার কথাই বলছে। আমেফুকা মানে, সোয়াহিলিতে, হি ইজ ডেড। আমাকে মেরে ফেলে ওর লাভ কী হল? এখন আমি মরিই বা কেমন করে আর তিতিরকে এখানে ফেলে যাই-ই বা কী করে? এমন বিপদে জীবনে পড়িনি। মেয়ে সঙ্গে করে আফ্রিকায় যিনি এসেছিলেন সেই গ্রেট মিস্টার ঋজু বোস তো দিব্যি কফি-টফি খাচ্ছেন বোধ হয়, সসেজের সঙ্গে। অথবা, পাইপ ফুঁকছেন। আর আমার কী বিপদ! বিপদ বলে বিপদ!

সর্দারমতো লোকটি তিতিরের পিঠে হাত দিয়ে বলল, পোলেনি! মানে, সরি!

লোকটা ভাল। কিন্তু যে লোকটা বল্লম হাতে দাঁড়িয়ে ছিল সে লোকটার চোখমুখের ভাব আমার ভাল মনে হচ্ছিল না। তার চোখ ঢুলুঢুলু, মুখ কেমন যেন বেগুনে-বেগুনে। লোকটা পিচিক করে থুতু ফেলেই বলল, ভুয়া। তারপর আবার বলল, ভুয়া। বলেই চলল–ভুয়া, ভুয়া, ভুয়া।

কথাটার মানে আমি বুঝলাম না। কিন্তু তিতির যেন বুঝল। ওর চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট হল। আমি যেদিকে আছি সেদিকে একবার চোখ ফেললে ও। পিস্তলটা আমার হাতেই ছিল। বুড়ো আঙুলটা সেফটি-ক্যাচের উপর ছুঁইয়ে রাখলাম। ওরা তিনজন, আমি একা।

কিন্তু আমার কিছুই করতে হল না। সর্দার গোছের লোকটি এবং যে লোকটি বুশ-বাকটি বিষতীর দিয়ে মেরেছিল তারা দুজনে মিলে সেই বল্লমধারীর উপর পড়ে এমন মার লাগাতে লাগল কলার কাঁদির মতো হাতে যে, সে জিবা, জিবা, জিবা করে পরিত্রাহি চেঁচাতে লাগল।

এমন সময় তিতির আবারও সোয়াহিলিতে কাঁদতে কাঁদতেই হঠাৎ বাংলায় টেনে টেনে বলল, ওঁহ। রুঁদ্র তুঁমি এঁখান থেঁকে চঁলে গিঁয়ে এঁকটু পঁরে হেঁটে হেঁটে এঁসো যেঁন কিঁছুই দেঁখোনি আঁর আঁমাকে ভীষণ খুঁজছ? আঁমি তোঁ হাঁরিয়ে গেঁছি বুঁঝেছ–ওঁ-ওঁ-ও-ও—

ওরা অবাক হয়ে তাকাল তিতিরের দিকে। আবার তিতির সোয়াহিলিতে ফিরে যাওয়াতে ভাবল, বেশি দুঃখে নিজের ভাষা বেরিয়ে পড়েছিল। চাপতে পারেনি।

তবু, সর্দার একজনকে কী যেন বলল। বলতেই, দেখলাম ঐ বল্লমধারী লোকটাই তরতর করে বাওবাব গাছে উঠতে লাগল। আরে। দেখলাম বড় বড় গজালের মতো কী সব পোঁতা আছে বাওবাবের নরম গুঁড়িতে। তার উপরই পা দিয়ে দিয়ে উঠছে লোকটা। ও আমার দিকে পিছন ফিরে ছিল, তাই ও উঠতে না উঠতেই যেদিকে উপরে উঠলেও আমাকে ও দেখতে পাবে না সেই দিকে আড়াল নিয়েই আমি জঙ্গলে নিঃশব্দে দৌড় লাগালাম। দুশো মিটার মতো গিয়ে দাঁড়ালাম। দাঁড়িয়েই অ্যাবাউট-টার্ন করে তিতির, তিতির বলে ডাকতে ডাকতে বাওবাব গাছের দিকে আসতে লাগলাম; সোজা নয়–এঁকেবেঁকে, পাছে ওরা সন্দেহ করে। তারপর গাছটার কাছাকাছি এসেও ডান দিকে ইচ্ছে করেই ঘুরে ওদের বাঁয়ে রেখে তিতির তিতির করে দৌড়তে লাগলাম, কাঁটা-পাথরে হোঁচট খেতে খেতে। তিতিরের নাম করে এতবার বোধহয় ওর মাও ডাকেননি ওকে জন্মের পর থেকে।

কিন্তু আশ্চর্য। ওরা কেউই আমাকে ডাকল না। ভয়ে আমার হৃৎপিণ্ড বন্ধ হয়ে গেল। ঐ তিতিরের পাকামির জন্যেই আমার কোমরে পিস্তল থাকা সত্ত্বেও যে-কোনো মুহূর্তে আমার পাঁজরে নিঃশব্দে একটি বিষতীর এসে লাগতে পারে।

এমন সময় হঠাৎ মেঘগর্জনের মতো পেছন থেকে কে যেন ডাকল : জাম্বো! আমি থমকে দাঁড়িয়ে পড়েই বললাম, সিজাম্বো।

পিছন ফিরে দেখি পত্রশূন্য বাওবাব গাছের একটি ডালের উপরে প্রায় দোতলার সমান উঁচুতে একজন লোক বসে, মাথার উপর হাত তুলে রয়েছে আমার দিকে, সম্ভাষণের ভঙ্গিতে। তার গায়ের লাল আর কালো চাদর হাওয়াতে উড়ছে পতপত্ করে। তার কুচকুচে কালো রঙ, প্রকাণ্ড চেহারা, আর বাওবাব গাছে চড়া তার অদ্ভুত মূর্তি আমাকে ভুষুণ্ডাণ্ডির মাঠের কাঁড়িয়া পিরেতের কথা মুহূর্তে মনে পড়িয়ে দিল। কাঁড়িয়া পিরেতকে চোখে দেখিনি যদিও, কিন্তু কল্পনায় দেখেছি অনেক। সে ছিল রোগা টিঙটিঙে, আর এ তো তাগড়াই। হাতি জিরাফ এলা-এর মাংস খায়! এ তো আর পোস্ত তরকারি আর কলাইয়ের ডাল খাওয়া ভূত নয়।

আমি বাওবাব গাছের দিকে এগোতে এগোতে লোকটাও নেমে এল। এ আবার কে? এ তো আগে ছিল না।

আমি যেতেই তিতির দৌড়ে এসে আমার উপরে আছড়ে পড়ল। তার চোখ তখন জলে ভেসে যাচ্ছে। হায় আম্মা! কী অ্যাটিং, যেন শাবানা আজমীর মা!

সেই মুহূর্তের পর থেকে আমি নীরব হয়ে গেলাম। কারণ তিতির আর কাঙ্গা-ফিটেঙ্গে পরা লোকগুলো অনর্গল কথা বলে যেতে লাগল। আমাকে আঙুল দিয়ে দেখিয়েও ওরা অনেক কথা বলছিল।

মহা মুশকিলেই পড়লাম! এতদিনে তিতির আমাকে জব্দ করল। ও যদি এখন আমাকে মেরে ফেলতেও বলে, ঐ লোকগুলো বোধহয় তাও ফেলবে। অল্পক্ষণের মধ্যেই তিতির হেসে, কেঁদে, গম্ভীর হয়ে লোকগুলোর নেতাই যেন বনে গেল।

কোনো কথাই বুঝতে পারছিলাম না বলেই সন্দেহ হচ্ছিল যে, ওরা বোধহয় সোয়াহিলি নয়; অন্য কোনো উপজাতিক ভাষায় কথা বলছিল। তবে, লোকগুলোর মুখে ভুষুণ্ডা এবং টর্নাডো এই নাম দুটো বারবার শুনছিলাম। একটু পর ওরা আমাকেও একটু জল আর এক হাত সাইজের একটা কলা খেতে দিল। তারপর সবাই মিলে বুশ-বাকটির চামড়া ছাড়াতে লাগল। অবাক হয়ে দেখলাম, তিতিরও ওদের সাহায্য করছে। কিছুক্ষণের মধ্যে তিতির রক্ত-টক্ত মেখে একেবারে ভয়ংকরী চেহারা ধারণ করল। বুশ-বাকের চামড়া যত্ন করে একপাশে মুড়ে রেখে ওরা আগুন করল।

এদিকে বেলাও আস্তে আস্তে পড়ে আসছে। ঋজুদাও নিশ্চয়ই আমাদের জন্যে চিন্তা করছে। আমি নিজেও নিজের জন্যে কম চিন্তা করছি না। কিন্তু যেভাবে তিতির লোকগুলোকে অর্ডার করছিল, এমনকী দেখলাম, একজনের নাকও মলে দিল বাঁ হাত দিয়ে এবং যেভাবে ওরা নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করতে লাগল তাতে ব্যাপার-স্যাপার তিতিরের কল্যাণে যে ভালর দিকেই এগোচ্ছে তাতে আর সন্দেহ রইল না।

আগুন জোর হলে ওরা বুশ-বাকটার সামনের একটি রাং বারবিকিউ করতে লাগল ঘুরিয়ে ফিরিয়ে। পাশের আগুনের উপর হাঁড়ি চাপিয়ে আরেকজন ভুট্টা আর ডাল ফেলে, বুকের মাংস ডুমো ডুমো করে কেটে তাতে দিয়ে উগালি অর্থাৎ আফ্রিকান খিচুড়ি রাঁধতে শুরু করল। টেডি মহম্মদের কথা মনে পড়ে গেল। ও-ও উগালি রেঁধে খাইয়েছিল আমাদের।

আমি বাওবাব গাছে হেলান দিয়ে বসে সামনে চেয়ে ছিলাম, যেদিকে ঋজুদাকে রেখে এসেছি আমরা। সন্ধের ছায়া পড়ছে লম্বা হয়ে বনে প্রান্তরে। দড়াম্ দড়াম করে সিংহ ডাকতে লাগল আমাদের পিছন থেকে। নানারকম পাখির আর জন্তু-জানোয়ারের ডাকে সূর্যাস্তবেলার আদিম আফ্রিকা সরগরম হয়ে উঠল।

ওদের কাছ থেকে জল চেয়ে নিয়ে হাত-গায়ের রক্ত মুছল তিতির। তারপর আমার কাছে এসে বলল, কী খোকা? ভয় পেয়েছ?

বললাম, কী, হচ্ছে কী? তুমি করতে চাইছটা কী, একটু খুলে বলবে দয়া করে?

তিতির বলল, ছেলেমানুষদের সব কথা বলতে নেই; বললে বুঝবেও না।

তারপরই বলল, খোকাবাবু, লেবুঞ্চুস খাবে?

বলেই ওর জিনস-এর পকেটে হাত ঢুকিয়ে সত্যিই একমুঠো লজেন্স বের করে আমার দিকে বাড়িয়ে দিল। দেখলাম, লোকগুলো কুমিরের মতো ড্যাবড্যাবে চোখে আমার দিকে চেয়ে আছে। নিলাম একটা। ওদেরও দিল তিতির। তারপর পা ছড়িয়ে বসে ওদের সঙ্গে আবারও গল্প জুড়ে দিল। আবারও মাঝে-মাঝেই ভুষুণ্ডা আর টর্নাডোর নাম শুনতে পেলাম।

এদিকে উগালি আর বুশ বাকের বারবিকিউ বেশ এগিয়েছে বলে মনে হল। ওদের মধ্যে যে বুড়োমতো সর্দার গোছের, সে একফালি পোড়া মাংস কেটে মুখে ফেলে এমন বীভৎস মুখভঙ্গি করল যে মনে হল অজ্ঞানই হয়ে গেল বুঝি। পরক্ষণেই বুঝলাম যে, স্বাদটা যে দারুণ হচ্ছে তারই লক্ষণমাত্র। অন্য একজন একটি কাঠের পাত্রে করে পাথুরে নুন আর ধেড়ে ধেড়ে শুকনো লঙ্কা নিয়ে এসে ঠিকঠাক করে রাখল একপাশে। ঠিক সেই সময় তিতির হাসিমুখে আমাকে বলল, খোকাবাবু, এবারে গিয়ে তোমার গুরুদেবকে ডেকে নিয়ে এসো। দুজনে মিলে দুটি জিপই চালিয়ে নিয়ে এসো, তবে হেড-লাইট জ্বেলো না। টর্নাডো এবং তোমাদের পরমপ্রিয় ভুষুণ্ডা কাছাকাছি আছে। যা শুনলাম আর বুঝছি, তাতে মনে হচ্ছে দিন তিন-চারেকের মধ্যেই মামলার নিষ্পত্তি হবে। অনেকদিন টুবুলটকে দেখি না। কলকাতা ফিরব এবারে। বাঙালির মেয়ে, বেশিদিন কি কলকাতা ছেড়ে থাকতে ভাল লাগে!

আমি ওর দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করতে লাগলাম ও ঠাট্টা করছে কি না।

কিন্তু আমার সন্দেহভঞ্জন করে ও বলল, যাও খোকা, আর দেরি নয়।

আমি যখন এগোলাম প্রায়ান্ধকারে তখনও লোকগুলো কোনো আপত্তি করল না।

নাঃ! মেয়েটা আমারই শুধু নয়, ঋজুদারও প্রেস্টিজ একেবারে পাংচার করে দিল। ওই-ই কিনা নেতা বনল শেষে! কী খিটক্যাল, কী খিটক্যাল! ছিঃ!

অন্ধকারে পড়েই পিস্তলটা বের করলাম। কখন কোন বাবাজির ঘাড়ে গিয়ে পড়ি তার ঠিক কী! সাবধানে পা ফেলে ফেলে এগোচ্ছি। সিংহর বা অন্য জানোয়ারের ভয় আমার নেই, আমার ভয় কেবল সাপের। দেখলেই গা কেমন ঘিনঘিন করে ওঠে। তাছাড়া গতবারে এখানে গাব্বুন ভাইপার যা শিক্ষা দিয়েছিল! তার উপর অ্যালবিনোর সেই পেল্লায় সাপ।

বেশিদূর এগোইনি, তখনও জিপ থেকে বহুদূরে, এমন সময় সামনের একটা গাছ থেকে কেঠো ভূতের মতো ঋজুদার গলা পেলাম। একটি চাপা, সংক্ষিপ্ত শব্দ।

ইডিয়ট!

চমকে বললাম, কে? কোথায়?

তুই! এইখানে!

গাছ থেকে নামো!

কোথায় ফেলে এলি মেয়েটাকে?

মেয়ে!

তার মানে?

ব্রহ্মদত্যি। তুমি গুরু, গুড়ই রয়ে গেলে, চেলা তোমার চিনি হয়ে বেরিয়ে গেল।

ঋজুদা রাইফেলটা এগিয়ে দিয়ে বলল, ধর।

রাইফেলটা নিতেই, গাছ থেকে ধপ করে নামল। তম্বি করে বলল, কোথায় সে?

রান্না করছে। তোমারও নেমন্তন্ন। আমারও। চল, জিপ দুটো নিয়ে আসি। তিতির যা বলল, তা যদি সত্যি হয় তাহলে আমাদের কার্যসিদ্ধি হতে আর বিশেষ দেরি নেই।

তিতিরকে কাদের হাতে দিয়ে এলি? আচ্ছা বে-আক্কেলে তো তুই!

কাদের হাতে আবার? হার প্যালস। ওল্ড ফেইথফুল প্যালস। নাইস, ওয়ার্ম গাঈজ; য়ু নো!

কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললাম ঋজুদাকে।

এবারে জেবড়ে যাওয়া ঋজুদা ধমক লাগাল। বলল, দেখ রুদ্র! বড় ফাজিল হয়েছিস। সবসময় ফাজলামো ভাল লাগে না।

আমি কী ফাজলামি করলাম? জিপের স্টিয়ারিং-এ বসতে বসতে বললাম। একেই বলে খাল কেটে কুমির আনা! দুগ্ধপোষ্য মেয়েকে অ্যাডভেঞ্চার করাতে এনে তুমি নিজের ক্যাপটেনসিই খুইয়ে বসলে।

জিপটা স্টার্ট করে বললাম, হেডলাইট জ্বালিও না। ফলে মি!

অন্ধকারে ঋজুদার মুখটা দেখতে পাচ্ছিলাম না। ভাগ্যিস, পাচ্ছিলাম না। ঋজুদা বোধহয় জীবনে এমন অবিশ্বাস্য অবস্থায় কখনও পড়েনি। ব্যাপার-স্যাপার সব তার নিজের কন্ট্রোলের বাইরে চলে যাচ্ছে এ কথা বিশ্বাস করা ও মেনে নেওয়া ঋজুদার পক্ষে যে কত কষ্টের তা বুঝি আমি। শুধু নেতারাই একমাত্র বোঝে, গদি হারানোর যন্ত্রণা!

জিপটাকে অনেকখানি ঘুরিয়ে আনলাম। কারণ মধ্যে একটা নালামতো ছিল এবং বড় বড় পাথরও ছিল। খুব আস্তে আস্তে অন্ধকারে সাবধানে চালিয়ে যখন সেই বাওবাব গাছের নীচে এসে পৌঁছলাম তখন নাটক পুরো জমে গেছে। দেখলাম, তিতির একটা উঁচু পাথরে বসে আছে রানীর মত আর ঐ তিনটি লোক তার পায়ের কাছে বসে গল্প শুনছে। ফুট-ফাট শব্দ করে কাঠ পুড়ছে। কোনো বুড়ির অভিশাপের মতো বিড়বিড় শব্দ করে। উগালি শুকোচ্ছে উনুনের হাঁড়িতে।

আমরা জিপ থেকে নামতেই তিতির লাফিয়ে নামল পাথরটা থেকে। এবং ওর সঙ্গে ঐ তিনজন লোকও চলে এল ঋজুদার কাছে। তিতিরের নির্দেশে, লোকগুলো ঋজুদাকে জাম্বো, জাম্বো করে আমন্ত্রণ জানাল। কিন্তু জবাবে সিজাম্বো বলার পর ঋজুদাকেও চুপ মেরে যেতে হল। আবারও তিতির ওদের সঙ্গে কলকল্ খলখল করে কথা বলতে লাগল অনর্গল। কিছুক্ষণ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে থেকে ঋজুদা অস্ফুটে বলল, ওরা হেহে ডায়ালেক্টে কথা বলছে রে রুদ্র! তিতির এমন অনর্গল হেহে বলতে পারে? আশ্চর্য!

আমি হেসে বললাম, হেঁ হেঁ! হেহে! স্যার, নিজের নীচে কখনও নিজের চেয়ে বেশি ওস্তাদ লোককে রাখতে নেই। এবার বোঝো। দেশেও মেয়েমানুষ প্রধানমন্ত্রী, এই আফ্রিকার জঙ্গলে এসেও মেয়েদের কাছেই ছোট হওয়া। ছিঃ ছিঃ। আমারও আর দরকার নেই তোমার এই যাত্রাদলে থেকে। ইন্দিরা গান্ধী আর মার্গারেট থ্যাচারের অধীনস্থ হয়ে অনেক পুরুষ মন্ত্রী হয়ে থাকলে থাকুন; আমি থাকব না। ভটকাইকে নিয়ে আমি নতুন যাত্রাদল খুলব। কী লজ্জা। কী লজ্জা!

ঋজুদা একটু সামলে নিয়ে জিপ থেকে দু-তিনটে বোতল এনে ঐ লোকগুলোকে দিল। বলল, ওরা নেমন্তন্ন খাওয়াচ্ছে, বদলে তো ওদেরও কিছু দিতে হয়!

বললাম, কী ওগুলো?

মৃতসঞ্জীবনী সুরা।

খেলে কী হয়?

মরা মানুষও জেগে ওঠে।

তাহলে আমাকেও দাও একটু। আমি আর বেঁচে নেই। এমন কাটা সৈনিক হয়ে আমি বাঁচব না।

ঋজুদা এবার পাইপটা জম্পেশ করে ধরিয়ে বোতলগুলো ওদের দিতেই ওরা আনন্দে আড়াই পাক টুইস্ট নেচে নিল। ঋজুদাকে ধন্যবাদ দিল।

আমি বললাম, দেবে না আমাকে?

দেব। তোর জন্যেও এসেছি। সারিবাদি সালসা। খেতে খুব তেতো। নাই-ই বা খেলি। এখন তিতির দেবী কী বলেন আর করেন তা দেখলেই চাঙ্গা হয়ে যাব আমরা।

ওরা যখন মহোল্লাসে বোতলগুলো নিয়ে মৃতসঞ্জীবনী সূরা খেতে শুরু করল তখন তিতির বলল, ঋজুকাকা, কেল্লা ফতে! এই লোকগুলো টেডি মহম্মদ, ভুষুণ্ডা, টর্নাডো এবং ওয়ানাবেরিকেও চেনে। ভুষুণ্ডা ওদের আরেক বন্ধুকেও অমন করে মেরেছে। গোরাংগোরো ক্র্যাটারের কাছে। টর্নাডো ওদের দিয়েই সব করায় অথচ পয়সা দেয় না কিছুই। জেল খাটবার সময় ওরা, মার খাবার সময় ওরা, আর পয়সা লুটবার সময় টর্নাডোরা। ভুষণ্ডা নাকি তিনদিন আগে এখানে এসেছে। ওরা চোরাশিকারের কাজ শেষ করে একটু মধু পেড়ে বাড়ি যাবে বলে এসেছিল এদিকে। ওদের আস্তানাতেই ভুষুণ্ডা আছে। ওদের সঙ্গে মেশিনগানও আছে। এদিকে হাতি মারাই ওদের আসল কাজ। গত এক মাসে চুরি করে তিরিশটি টাস্কার মেরেছে ওরা। সব দাঁত এখনও চালান দিতে পারেনি। ওদের ডেরাতে এখনও পনেরো জোড়া মস্ত মস্ত হাতির দাঁত আছে। ওরা একটা পাহাড়ের গুহাতে ক্যাম্প করে আছে। এখান থেকে মাইল ছয়েক দূরে।

মাত্র মাইল ছয়েক দূরে? বলিস কী রে? আর তা জেনেও তোরা এখানে আগুন করে বারবিকিউ করছিস আর হুল্লোড় করছিস? টর্নাডো নিজে যদি ছ’ মাইল দূরে থেকে থাকে, তাহলে তার চারদিকে তার চর আর স্নাইপার্সরাও আছে। বারবিকিউ করা বুশ-বাক আর উগালি যখন খাবি, তখনই স্নাইপারদের টেলিস্কেপিক-লেন্স লাগানো রাইফেলের গুলি এসে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেবে আমাদের সবাইকে। ওরাও তো বোকা নয়, তুইও নোস্। এমন মূর্খামি কেউ করে? আমি হেহে বুঝি না–কিন্তু আমার ভয় করছে এরাও বোধহয় আমাদের ট্রাপ করছে। যদি তাই-ই করে, তাহলে এবারে আর কাউকেই প্রাণ নিয়ে ফিরে যেতে হবে না এখান থেকে।

এই কথাতে, তিতিরের মুখটা এক মুহূর্তের জন্যে কালো হয়ে গেল। ও একদৃষ্টে ঐ তিনটি লোকের মুখের দিকে চেয়ে রইল। লোকগুলো বোতল থেকে ঋজুদার দেওয়া মৃতসঞ্জীবনী সুরা খাচ্ছিল আর ছেলেমানুষের মতো হাসছিল। আগুনের আভা ওদের চকচকে কুচকুচে কালো হাঁড়ির মতো মুখ আর সাদা সাদা বড় বড় দাঁতে ঝিলিক মেরে যাচ্ছিল।

তিতির মুখ ঘুরিয়ে আমাদের দিকে চেয়ে বলল, না ঋজুকাকা। ওরা মানুষ ভাল। মানুষের উপর বিশ্বাস হারিয়ে গেলে কি অন্য মানুষ বাঁচে?

আমি বললাম, বিশ্বাস তো আমরা ভুষুণ্ডাকেও করেছিলাম গুগুনোগুম্বরের দেশে। লাভ কী হল? ডামুকেও ত ঋজুদা আবার বিশ্বাস করেছিল। ।

তোমরা মানুষ চেনো না। আমি বলছি এরা মানুষ ভাল। সন্দেহ নিয়ে জীবনে কেউই কিছু পায় না। আওরেঙ্গজেবের এত বড় সাম্রাজ্যও ধ্বংস হয়ে গেল শুধুই সন্দেহ করে করে। তোমরা যদি আমাকে বিশ্বাস কর, তাহলে ওদেরও করতে হবে।

তিতির কী বলে, দেখবার জন্যে বললাম, আমি ভাবছি আজ রাত্রেই এই তিনটেকে ঋজুদার সাইলেন্সার লাগানো পিস্তলটা দিয়ে সাবড়ে দেব।

তিতির ফুঁসে উঠল। বলল, ডোন্ট বি সিলি! যদি ওদের বিশ্বাসই না করো, তাহলে তুমি আর ঋজুকাকা চলে যাও। আমি ওদের সঙ্গে আছি। আমাকে শুধু কটা ডিনামাইট দিয়ে যাও, আর শিখিয়ে দিয়ে যাও কী করে তা ডিটোনেট করতে হয়। আমি একাই টর্নাডো আর ভুষুণ্ডাকে শেষ করে তোমাদের কাছে ফিরে আসব।

ঋজুদা তিতিরের দিকে তাকিয়ে বলল, হুমম্।

কী?

হুমমমম।

ওদের বিশ্বাস করছ তো?

হুঁ। তুই যখন বলছিস। তাছাড়া এখন তুই-ই তো কম্যাণ্ডার। তুই যা বলবি, তাই-ই হবে।

পনিটেইল দুলিয়ে তিতির আবার আমাদের তিতির হয়ে গিয়ে হাসল। বলল, ঠাট্টা কোরো না। তুমি ভাল করেই জানো কে কম্যাণ্ডার; আর কে নয়!

এর পর তিতির আবার ওদের কাছে ফিরে গেল। রাকস্যাক থেকে কাগজ বের করে ওদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে পাথরে বসে একটা ম্যাপ করতে লাগল।

ঋজুদা পাইপের ধোঁয়া ছেড়ে বলল, কী বুঝলেন মিস্টার রুরুদদরবাবু?

বেশি পেকেছে! পিপীলিকার পাখা ওঠে মরিবার তরে।

ফুক্ করে একটু হেসে উঠল ঋজুদা। বলল, তুই একটা পাক্কা মেল শভিনিস্ট। মেয়েদের তুই মানুষ বলেই গণ্য করতে চাস না। এটা কুশিক্ষা। আমি তো ভাবছি তিতিরের কথা। যখন ওকে আনব বলে ঠিক করি, তখন কি একবারও ভেবেছিলাম যে, ওর মধ্যে কর্তৃত্ব দেবার এতখানি ক্ষমতা ছিল? আশ্চর্য! কতটুকু মেয়ে।

আমি রীতিমত নার্ভাস হয়ে পড়লাম। বললাম, এ কথার মানেটা কী? তুমি কি তিতিরকে এই ক্রিটিকাল সময়ে নেতা বানিয়ে দিতে চাও নাকি? তাহলে আমি নেই।

ঋজুদা আমার দিকে ফিরে বলল, নেতা কেউ কাউকে বানাতে পারে না রে রুদ্র! নেতা আর নেতৃত্বর দাবিতেই নিজের থেকেই নেতা হয়ে ওঠে। বানানো নেতারা কোনোদিনও ধোপে টেকে না। নেতা হওয়ার চেয়েও অনেক বড় গুণ কী জানিস?

কী?

উদারতার সঙ্গে, নিজে বাহাদুরি না নিয়ে অন্যর নেতৃত্ব খুশি মনে মেনে নেওয়া। আমাদের সকলেরই যা উদ্দেশ্য, যে কারণে আমরা সকলে আফ্রিকাতে এসেছি এবারে, তা যদি সিদ্ধ হয়, তাহলে নেতাগিরি আমি করলাম কি তুই করলি তাতে কিছুই যায় আসে না। উদ্দেশ্যটা সিদ্ধ হলেই হল।

একটু চুপ করে থেকে বলল, রুদ্র, যখন বড় হবি, তখন বুঝতে পারবি, আমাদের চমৎকার দেশ, আমাদের ভারতবর্ষ কত বড় হতে পারত, যদি দেশে নেতা-হতে-চাওয়া লোকের সংখ্যা বেশি হত। এ নিয়ে আর কথা নয়। তিতিরকে আমি এবং তুই হাসিমুখে নেতা বলে মেনে নিচ্ছি। উই উইল জাস্ট ওবে হার কম্যাণ্ডস্। তাতে যা হবার তা হবে। আমাকে ভুষুণ্ডা গুগুনোম্বারের দেশে গুলি করার পর তুই-ই তো নেতা হয়েছিলি নিজের থেকেই। মনে নেই! আমার দেওয়ার অপেক্ষায় কি ছিলি তুই? ওরে পাগলা, নেতৃত্ব কেড়ে নিতে হয়। সম্মানে আর শ্রদ্ধায়। নেতৃত্ব ভিক্ষা চেয়ে কেউই কোনোদিন পায় না। এবারে তিতির আমার এবং তোর কাছ থেকে নেতাগিরি কেড়ে নিয়েছে; আমাদের সকলের ভালর জন্যে, ওর যোগ্যতার দাবিতে। এ নিয়ে আর একটিও কথা নয়। অ্যাডভেঞ্চারার হবি, স্পোর্টসম্যান হবি আর ক্যাপটেনের ক্যাপটেইনসি মানতে সম্মানে লাগবে? ছিঃ। তা যারা করে, তারা নামেই খেলোয়াড়, নামেই অভিযাত্রী; আসলে নয়। খেলার মাঠ, অ্যাডভেঞ্চারের পটভূমি আর মানুষের জীবন আসলে সবই এক। যে লোক খেলার মাঠে ফাউল করে, চুরি করে পেনাল্টি কিক্ নেয়, সে জীবনেও তাই-ই নেয়। তার ছবি বেরোতে পারে একদিন, দুদিন, তিনদিন খবরের কাগজে কিন্তু সে কারো মনেই থাকে না কখনও। পাকা কিছু, বড় কিছু পেতে হলে, তার ভিত গাঁথতে হয় পাকা করেই। বিবেকানন্দ বলেছিলেন পড়িসনি? চালাকির দ্বারা কোনো মহৎ কর্ম হয় না।

আমি ভাবছিলাম, বড় জ্ঞান দেয় ঋজুদাটা! কখন টর্নাডোর আর ভুষুণ্ডার গুলি এসে মাথার খুলি ফাটিয়ে দেবে সে চিন্তা নেই, শুধু জ্ঞানই দিয়ে যাচ্ছে। ননস্টপ জ্ঞান।

তিতির এসে খেতে ডাকল আমাদের। প্লাস্টিকের প্লেট আর গ্লাস বের করল ও জিপের পেছন থেকে। বলল, এসো রুদ্র, এসো ঋজুকাকা।

মনে মনে বললাম, ইয়েস ম্যাম্।

মুখে কিছুই বললাম না।

তিতিরের পিছু পিছু হেঁটে গেলাম।

.

কেন জানি না, হঠাৎ মনে দারুণ এক গভীর আনন্দ আর শান্তি পেলাম। এখানে এসে অবধি, এসে অবধি কেন, তার আগে থেকেই তিতিরের ব্যাপারে আমার মনে বড় একটা প্রতিযোগিতার ভাব ছিল। কে জেতে? কে হারে? কে বড়? কে ছোট? এমন একটা ভাব। এই প্রথম, তিতিরের পিছনে পিছনে ঋজুদার পাশে পাশে হেঁটে যেতে যেতে হঠাৎই আমার মনে হল যে, মেনে-নেওয়ার মধ্যে যতখানি বড় হওয়ার ব্যাপার থাকে, জোর করে মানানোর মধ্যে বোধহয় কখনোই তা থাকে না। তক্ষুনি আমি বুঝতে পারলাম যে, এই হেলাফেলায় নিজেকে ছোট করার ক্ষমতা আছে বলেই ঋজুদা আমার অথবা তিতিরের চেয়ে আসলে অনেক অনেক বড়।

মিথ্যে নেতাদের সত্যি নেতা।

ঋজুদা খেতে খেতে তিতিরকে বলল, সবই ভাল, শুধু কথাবার্তা একটু আস্তে আস্তে বলতে বল, আর আগুনটা যত তাড়াতাড়ি পারিস নিবিয়ে দে।

তিতির ওদের সে কথা বলল। ওরা যে সোয়াহিলি জানে না তা নয়, কিন্তু তিতির ওদের সঙ্গে হেহে ভাষায় কথা বলছে ওদের কনফিডেন্স উইন করার জন্যে। হেহে জানাতে ও যত তাড়াতাড়ি ওদের কাছে চলে যেতে পারল, তা সোয়াহিলি হলে সম্ভব হত না।

খেতে খেতেই তিতির বলল, আই রুদ্র! আমার পিস্তলটার কথা একদম ভুলে গেছিলাম। নিয়ে এসো না প্লিজ।

পিস্তল? কোথায় সেটা? কী বিপদ। তোদের বলেছিলাম না, এক মিনিটও হাতছাড়া করবি না!

তিতির বলল, সময়কালে পিস্তলটি হাতছাড়া না করলে আমার প্রাণটিই খাঁচাছাড়া হয়ে যেত ঋজুকাকা।

তারপর আমার দিকে চেয়ে বলল, কোথায় শুয়েছিলাম আমি তা মনে আছে তো? নাকি যাব আমি?

আছে আছে বলে টর্চটা নিয়ে গিয়ে তিতিরের পিস্তলটা নিয়ে এলাম। একটা পাথরের নিচে রেখেছিল।

তিতির সেটাকে এঁটোমুখেই একটা চুমু খেল, চুঃ করে। তারপর বাঁ হাত দিয়ে হোলস্টারে ভরল।

খাওয়া-দাওয়া হতে হতেই আগুন নিবিয়ে দেওয়া হল। বুড়োমতো লোকটা বাওবাব গাছের উপরে চড়ে গেল একটা কম্বল কাঁধে নিয়ে। রাতে চারধার দেখবে ও।

ঋজুদা বলল, তিতির যাইই বলুক, আমি অন্ধ বিশ্বাস করতে রাজী নই এদের। সেটা নেহাতই বোকামি হবে। তিতির ওদের বল, ওরা যেমন বাওয়াব গাছের পেটের মধ্যের বাড়িতে শুয়ে ছিল তেমনই শুতে। আমরা বাইরে থেকে ওদের পাহারা দেব। বুড়ো তো রইল গাছের মাথায়। আমি আর তুই থাকব একটা জিপে। আর রুদ্র পাশেরটায়। আমার বাঁ চোখটা ক্রমাগত নাচছে। মন বলছে আজ রাতে আমাদের কারোই ঘুমুনোটা ঠিক হবে না।

যেমন বলবে। তিতির বলল।

রুদ্র, জিপ থেকে আমাদের রাইফেলগুলোও বের কর। সময় হয়েছে। এখনও বের না করে রাখলে, হয়তো বোকাও বনতে হতে পারে।

ঠিক আছে।

বলে, আমি ঋজুদার অর্ডার ক্যারি আউট করতে চলে গেলাম। ফিরে এসে, যার যার রাইফেল স্লিং-এ ঝুলিয়ে অ্যামুনেশন বেল্টসুদ্ধ বুঝিয়ে দিলাম। ঋজুদা ফিসফিস করে বলল, চাঁদ উঠবে শেষ রাতের দিকে। তিতির, বুড়োকে বলে দে; সন্দেহজনক কোনো কিছু দেখলে যেন কথা না বলে। ও যেন স্টার্লিং-এর ডাক ডাকে।

আমি বললাম, খুব বললে তো! রাতে কি স্টার্লিং ডাকে নাকি? এ ডাক শুনেই তো স্নাইপার ওকে কড়াক-পিঙ করে দেবে।

দ্যাটস রাইট! ঠিক বলেছিস। তবে?

ঋজুদা যেন খুব সমস্যায় পড়েছে এমন মুখ করে বলল।

আমি বললাম, তোমার পিস্তলের কার্টিজের এম্পটি শেলগুলো আমি জমিয়ে রেখেছি। ওকে সেগুলো দিয়ে দাও। বলে দাও, কিছু দেখলে ও যেন ঐ এম্পটি শেল জিপের বনেটের উপর ছুঁড়ে মারে। তাতে যা শব্দ হবে, তা দূর থেকে শোনা যাবে না।

তিতির বলল, চমৎকার! ধাতব শব্দ জঙ্গলে স্বাভাবিক নয়। সামান্য শব্দ হলেও তা অস্বাভাবিক শোনাবে। সে শব্দ ত যারা আসবে তারাও শুনতে পাবে। অত কায়দার দরকার নেই। ওকে বলেছি, গাছ থেকে নেমে এসে আমাদের বলবে।

ঋজুদা বলল, বাওবাব গাছে তো ডালপালা বেশি নেই। ঐ গাছ থেকে কোনো কিছু দেখে নামতে গেলে, ঐ নড়াচড়া রাতের আকাশের পটভূমিতে চোখে পড়ে যাবে। তার চেয়ে এক কাজ কর। নাইলনের দড়ি তো আছেই আমাদের কাছে। ওর ডানপায়ে বেঁধে নিতে বল এক প্রান্ত, আর রুদ্রর বাঁ পায়ে অন্য প্রান্ত।

তিতির বলল, রুদ্রর নাকের সঙ্গেই বেঁধে দাও না ঋজুকাকা।

কিছু বললাম না। ওস্তাদের মার শেষ রাতে। দেখাব ওকে আমি। তাইই করা হল। তবে অন্য প্রান্ত আমার পায়ে না বেঁধে একটা সাদা তোয়ালের সঙ্গে বেঁধে সেটা গাছতলায় নামিয়ে দেওয়া হল। তোয়ালেটা আমাদের দিক থেকেই শুধু দেখা যাবে। দড়ি ধরে নাড়লেই তোয়ালেটা নড়বে। ফার্স্ট-ক্লাস বন্দোবস্ত।

ভাল ঠাণ্ডা আছে। পরিষ্কার তারাভরা আকাশ। নানারকম পশু আর পাখির আওয়াজে চতুর্দিক চমকে চমকে উঠছে।

কত কোটি বছর ধরে এই কৃষ্ণমহাদেশের গভীর গহনে কতরকম জন্তু-জানোয়ার আর পশুপাখি রাজত্ব করছে কে জানে! একদিন ছিল, যেদিন মানুষ আর পশুপাখির মধ্যে খাদ্য-খাদকের সম্পর্ক থাকলেও তার মধ্যে ব্যবসায়িক মুনাফার কোনো ব্যাপার ছিল না। মানুষের মস্তিষ্ক যত মারণাস্ত্র তৈরি করছে, ততই তা প্রয়োগ করা হচ্ছে মানুষের নিজেরই মৃত্যুর জন্যে এবং অর্থলোলুপতায় পশুপাখিদের অর্থহীন বিনাশের জন্যে, অগণ্য সংখ্যায়।

ভারী চমৎকার লাগে এই উদোম রাতে বাইরে কাটাতে। এই উদলা জীবন আমাদের দেশেও চমৎকার লাগে। আমাদের দেশের কর্ণাটক, গুজরাটের কোনো কোনো অংশ, মহারাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রদেশ ছাড়া অন্য বিশেষ কোথাওই আফ্রিকার মতো এমন দিগন্তবিস্তৃত দৃশ্য চোখে পড়ে না।

তিতির কম্বলের তলায় নিজেকে মুড়ে কাডলি-বেবি হয়ে ঋজুদার পাশে গুড়িসুড়ি মেরে শুয়ে আদুরে গলায় বলল, ঋজুকাকা, একটা গল্প বলো না, ওয়ানাবেরি ওয়ানাকিরির মতো কোনো গল্প-মিথোলজিকাল।

ঢং দেখে আমার হাসি পেল। কলকাতায় ঠাকুরমার কোলের কাছে শুয়ে নীলকমল লালকমলের গল্প শুনলেই হত! যত্ত সব!

ঋজুদাও তেমন। বলল, গল্প? দাঁড়া ভেবে নি। বলে, পাইপটা ভাল করে ঠেসেটুসে নিয়ে, যাতে মাঝরাত অবধি চলে, তাতে আগুন জ্বালিয়ে ভুসভুস করে ধোঁয়া ছাড়তে লাগল। পাইপের একটা সুবিধে এই যে আগুনটা খোলের মধ্যে থাকে বলে দূর থেকে বা পাশ থেকে রাতের বেলা তা দেখা যায় না সিগারেটের আগুনের মতো। যদিও, আলো থাকলে ধোঁয়া দেখা যায়। হাওয়া থাকলে পাইপের পোড়া তামাকের গন্ধ উড়ে যায় অনেক পথ। হাওয়ার তীব্রতা এবং গন্তব্যের উপর নির্ভর করে তার ওড়া।

ঋজুদা ফিসফিস করে বলল, শোন, তবে বলি। রুদ্র, তুইও শোন। কিন্তু ডানদিকে চোখ রাখিস একটু।

অনেকদিন আগে একজন কালাবার শিকারী ছিল। তার নাম ছিল এফিয়ং। এফিয়ং বুশ-কানট্রিতে থাকত। অনেক জন্তু-জানোয়ার শিকার করে সে পয়সা করেছিল। ঐ অঞ্চলের সকলেই তাকে জানত-চিনত। এফিয়ং-এর ঘনিষ্ঠতম বন্ধু ছিল ওকুন্। উকুন নয় রে, বুঝলি তো তিতির!

বুঝলাম। ওদের নামগুলোই তো উদ্ভট উদ্ভট। তারপর?

ওকুনের বাড়ি ছিল এফিয়ং-এর বাড়ির কাছে। এফিয়ং ছিল একনম্বরের উড়নচণ্ডি, প্রায় আমারই মতো। খেয়ে এবং খাইয়ে এত পয়সাই সে নষ্ট করল যে, দেখতে দেখতে সে একদিন গরিব হয়ে গেল। খুবই গরিব। শেষে অভাবের তাড়নায় তাকে আবার শিকারে বেরোতে হল। কিন্তু হলে কী হয়, তার ভাগ্যদেবী তাকে ছেড়ে গেছেন বলে মনে হল ওর। যতদিন মানুষের ভাগ্য ভাল থাকে, ততদিন মানুষ ভাবে, তার যা-কিছু ভাল হয়েছে তার সব কৃতিত্ব তারই; তারই একার। কিন্তু ভাগ্যদেবী যেদিন চলে যান ছেড়ে, সেদিন সে বুঝতে পারে তার সব কৃতিত্ব নিয়েও সে মোটেই বেশিদূর এগোতে পারল না। সকাল থেকে সন্ধে অবধি ঝোপেঝাড়ে চুপিসারে ঘুরে ঘুরেও কোনো কিছু ধরতে বা শিকার করতে পারল না ও।

কিছুদিন আগে জঙ্গলে ঘুরতে ঘুরতে এফিয়ং-এর সঙ্গে একটি লেপার্ডের বন্ধুত্ব হয়েছিল। এবং একটি বুশকাট-এর সঙ্গেও। একদিন খিদের জ্বালায় এফিয়ং সে তার বন্ধু ওকুনের কাছে গিয়ে দুশো টাকা (রডস) ধার চাইল। ওকুন এককথায় সে টাকা দিয়ে দিল। এফিয়ং ওকুনকে এক বিশেষ দিনে তার বাড়িতে আসতে বলল টাকা ফেরত নেওয়ার জন্যে। এও বলল যে, যখন আসবে, তখন যেন তার বন্দুকটা নিয়ে আসে সঙ্গে করে এবং গুলি ভরেই যেন আনে।

এফিয়ং যেমন করে লেপার্ড ও বুশকাটের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছিল তেমনভাবেই একদিন শিকারে গিয়ে একটা খামারবাড়িতে রাতে থাকাকালীন সে একটা মোরগ আর একটা ছাগলের সঙ্গেও বন্ধুত্ব করেছিল। যখন এফিয়ং ওকুনের কাছ থেকে টাকা ধার নেয় এবং যখন তাকে তার বাড়িতে তা শোধ নিতে আসতে বলে, তখনও কী করে সে এ ধার শুধবে তা জানত না। কিন্তু সে অনেক ভেবে ভেবে বুদ্ধি বের করল একটা। দুর্বুদ্ধি।

পরদিন সে তার বন্ধু লেপার্ডের কাছে গেল এবং তার কাছ থেকেও দুশো রত্ন ধার চাইল। যেদিন ও যে সময়ে ওকুনকে আসতে বলেছিল, সেদিন লেপার্ডকেও বলল তার। বাড়ি এসে টাকাটা নিয়ে যেতে। বলল যে, এফিয়ং নিজে যদি বাড়িতে না থাকে, তবে ওর বাড়িতে লেপার্ড যা কিছু পাবে তাইই যেন খায়। এবং তারপর যেন এফিয়ং-এর জন্য অপেক্ষা করে। এফিয়ং এসে টাকা দিয়ে দেবে।

লেপার্ড বলল, ঠিক আছে।

এরপরে এফিয়ং ওর বন্ধু সেই ছাগলের কাছে গেল। গিয়ে তার কাছ থেকেও দুশো টাকা (রডস) ধার চাইল এবং তাকেও ঐ দিনে ঐ সময়ে তার বাড়িতে যাবার কথা বলল এবং তাকেও বলল, এফিয়ং বাড়ি না থাকলে, তার বাড়িতে যা থাকে তা যেন সে খায় এবং যেন ওর ফেরার অপেক্ষা করে।

এমনি করে বুশক্যাট এবং মোরগের কাছ থেকেও এফিয়ং টাকা ধার করে ওদেরও ঐ, একই দিনে টাকা নিতে আসতে বলল একই রকম ভাবে।

সেই দিনে, মানে যেদিন ওকুনের এবং অন্য সবারই আসার কথা, এফিয়ং তার উঠোনে কিছুটা ভুট্টা ছড়িয়ে রাখল। তারপর বাড়ি ছেড়ে চলে গেল।

সে চলে যাবার পরই মোরগ এল। এসে দেখে, এফিয়ং বাড়ি নেই। এদিক-ওদিক ঘুরতেই তার চোখে পড়ল উঠোনে ভুট্টা ছড়ানো আছে। মোরগ এফিয়ং-এর কথা মনে করল, তার বাড়িতে যা পাবে তা খেতে বলার কথা। ভুট্টা খেতে শুরু করল মোরগটা। এমন সময় বুশকাটটা এল। সেও দেখে বাড়িতে এফিয়ং নেই, কিন্তু একটা মোরগ আছে। একমুহূর্তে কুঁক কুঁক করা মোরগের ঘাড়ে পড়ে সে মোরগকে মেরে, তাকে খেতে লাগল। এমন সময় ছাগলটা এল। এসে দেখে এফিয়ং নেই, কোনো খাবার-দাবারও নেই, থাকার মধ্যে একটা রক্তাক্ত মোরগ-খাওয়া বুশকাট। এফিয়ং বাড়ি না থাকায় ছাগল চটে গিয়ে দৌড়ে এসে বুশক্যাটটাকে এমন গুঁতোন গুতোল শিং দিয়ে যে সে একটু হলে প্রাণে মরত। বিরক্ত হয়ে সে আধ-খাওয়া মোরগটা মুখে করে এফিয়ং-এর বাড়ি ছেড়ে ঝোপের দিকে দৌড় লাগাল। কিন্তু এফিয়ং-এর জন্যে ওর বাড়িতে অপেক্ষা না করায় ওর শর্তভঙ্গ হল–টাকাটা ফেরত পাবার কোনোই সম্ভাবনা আর ওর রইল না। এমন সময় লেপার্ডটা এল। এসে দেখে এফিয়ং বাড়ি নেই। একটা ছাগল ঘুরে বেড়াচ্ছে। লেপার্ডের খিদেও পেয়েছিল। সে ভাবল, এফিয়ংই বুঝি তার জন্যে বন্দোবস্ত করে গেছে। ছাগলটাকে ঘাড় মটকাল লেপার্ডটা। এবং খেতে লাগল। ঠিক এমন সময় এফিয়ং-এর বন্ধু ওকুনও এফিয়ং-এর কথা মতো বন্দুক-হাতে এসে পৌঁছল। সে দূর থেকে দেখল লেপার্ড উঠোনে বসে ছাগল ধরে খাচ্ছে। শিকারী ওকুন তখন চুপিসারে এসে ভাল করে নিশানা নিয়ে ঘোড়া দেবে দিল। লেপার্ড চিতপটাং হয়ে পড়ল। ঠিক সেই সময় এফিয়ং ফিরে এসে ওকুনকে বকাবকি করতে লাগল, তার বন্ধু লেপার্ডকে সে মেরেছে বলে। এফিয়ং এও শাসাল যে, রাজার কাছে সে নালিশ করে দেবে।

ওকুন ভয় পেল এবং রাজাকে বলতে মানা করল।

এফিয়ং বলল, তা কি হয়? বলতেই হবে।

তখন ওকুন আরো ভয় পেয়ে বলল, যাক্ গে যা আমার টাকা তোমাকে শোধ দিতে হবে না, রাজাকে তুমি বোলো না শুধু।

এফিয়ং অনেক ভেবেটেবে কান চুলকে বলল, আচ্ছা। তুমি যখন বলছ। যাও তুমি। এখন আমার বন্ধু লেপার্ডের মৃত শরীরকে কবর দিতে হবে আমায়।

এই ভাবে এফিয়ং মোরগ, বুশকাট, ছাগল, লেপার্ড এমনকী ওকুনের টাকাটাও মেরে দিল।

ওকুন চলে যেতেই, এফিয়ং মরা লেপার্ডকে টেনে এনে তার চামড়া ছাড়াল। তারপর তা শুকিয়ে তাতে নুন ফটকিরি ছড়িয়ে ঠিকঠাক করে রেখে দিল। দূরের গ্রামের হাটে পরে সেই চামড়া নিয়ে গিয়েও বিক্রি করে এফিয়ং অনেক টাকা পেল।

তারপর? তিতির বলল ফিসফিস করে।

তারপর আর কী? ঋজুদা বলল, এখন, যখনই কোনো বুশক্যাট কোনো মোরগকে দেখে, সে সঙ্গে সঙ্গে তাকে মেরে খায়। মেরে খেয়ে এফিয়ং-এর না-শোধা টাকা উশুল করার চেষ্টা করে।

তারপর?

তারপর কী? এই গল্পের একটা মর‍্যাল আছে। সেটা হচ্ছে কখনও কোনো মানুষকে টাকা ধার দিবি না।

কত টাকা আমার! হাসল তিতির।

ঋজুদা বলল, যখন রোজগার করবি, টাকা হবে যখন, তখন।

কেন দেব না?

দিবি না এই জন্যে যে, যদি তারা তোর টাকা না শুধতে পারে, তাহলে তোকে তারা মেরে ফেলার চেষ্টা করবে। অথবা নানাভাবে তোর হাত থেকে রেহাই পাবার চেষ্টা করবে। হয় বিষ খাইয়ে, নয় তোর উপরে নানা জুজুর ভর করিয়ে।

জুজু? জুজু কথাটা বাংলা নয়?

সে কোলকাতায় ফিরে সুনীতিদাদুকে জিজ্ঞেস করিস। আমি জংলি লোক, অতশত জানি না। তবে, নাইজেরিয়ার এই এফিক ইবিবিও উপজাতিদের গল্পগাথাতে জুজুর নাম তো পাচ্ছি। জুজু আর জুজুবুড়ি এক কি না, সে বিষয়েও জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারিস কোলকাতা ফিরে।

.

কতগুলো হায়না এল বুশ-বাকটার মাংসের গন্ধ পেয়ে একটু পরেই। গুগুনোগুম্বারের দেশের অভিজ্ঞতার পর, হায়না জাতটার উপরই ঘেন্না ধরে গেছে। কিন্তু কিছুই করার নেই এখন। ঋজুদার অর্ডার নেই গুলি করার। আজ রাত থেকে এই অর্ডার কার্যকর হয়েছে। ওদের দিকে পাথর ছুঁড়ে এবং ঋজুদার খাওয়া মৃতসঞ্জীবনী সুরার বোতল ছুঁড়ে ভাগালাম ওদের।

হায়নাগুলো চলে যাবার পর অনেকক্ষণ নিরুপদ্রবেই কেটে গেল। তিতিরের ঘুম এখন গভীর। একপাশে আমি, অন্য জিপে ও। আমার ওর জিপের ডানদিকে ঋজুদা থাকায় নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারছে তিতির। কম ধকল যায়নি বেচারির। যাই হোক, মেয়ে তো! তবে মেয়ের মতো মেয়ে বটে! ওর পাতলা নিশ্বাসের শব্দ, বনের কোনো উড়াল মাছির ভানার শব্দের মতো ভেসে আসছে আমার নাকে ওর সোয়েটারে স্প্রে করা হালকা পারফমের গন্ধের সঙ্গে। ভাগ্যিস, গুগুনোগুম্বারের দেশের মতো এখানে সেৎসি মাছির অত্যাচার নেই। থাকলে, আর খোলা জিপে বসে এমন আরামে ঘুমোতে হত না ওকে। আমারও ঘুম-ঘুম পেয়ে গেছে। কাছাকাছি কেউ ঘুমালে বোধহয় ঐ রকম হয়। ঋজুদা, দেখলাম জিপের সিটে সোজা হেলান দিয়ে বসে, রাইফেলের নলটা ডান পায়ের উপর দিয়ে সিটের বাইরে বের করে দিয়ে রাইফেলের বাঁটের উপর ডান হাত রেখে বাঁ হাতে পাইপ ধরে বসে আছে ডানদিকে চেয়ে।

ঠিক এমন সময় দড়িবাঁধা সাদা তোয়ালেটা যেন একবার নড়ে উঠল। ঘুমে দু চোখ বন্ধ হয়ে আসছিল, অনেক সময় গাড়ি চালাতে চালাতে যেমন হয়, যখন মনে হয় গাড়ি যেখানে খুশি যাক, আমার যা খুশি হোক, একটু শুধু দুচোখের পাতা খুঁজে নি। ঠিক তেমন। সেই রকম ঘোরের মধ্যেই তোয়ালেটা জোরে বারবার আন্দোলিত হতে লাগল। আমার মাথার মধ্যে ঘুমপাড়ানিয়া কে যেন বলল, ঘুমের মতো বিনা পয়সার আশীর্বাদ ভগবান আর দুটি দেননি। ঘুমিয়ে নাও, ভাল করে ঘুমিয়ে নাও।

ঘুমিয়ে পড়তাম সেই মুহূর্তেই যদি না কতগুলো শেয়াল ডানদিক থেকে হঠাৎ ডেকে উঠত! ধড়মড়িয়ে ঘুমভাব ছেড়ে উঠতেই দেখি, সাদা তোয়ালেটা তখনও সমানে নড়ে যাচ্ছে মাটি থেকে আধহাত উপরে।

হঠাৎ একটা কাণ্ড ঘটল। তোয়ালেটা ক্রমশ মাটি ছেড়ে উপরে উঠতে লাগল এবং আমাদের জিপের উইণ্ডস্ক্রিনের মধ্যে দিয়ে তাকে আর দেখা গেল না। ব্যাপারটা যে কী হল, তা কিছুই বুঝলাম না। হঠাৎ দেখি, ঋজুদার জিপ থেকে তিতির নেমে পড়েই অসম্ভব ক্ষিপ্রতায় নিঃশব্দে গাছটার দিকে এগিয়ে গিয়ে প্রকাণ্ড বাওবাব গাছটার গুঁড়ির এ-পাশে একেবারে সেঁটে দাঁড়িয়ে পড়ল। ধপ্ করে একটা শব্দ হল। ততক্ষণে ঋজুদা রাইফেলটা তুলে নিয়ে তিতিরকে কভার করেছে, কিন্তু দাঁড়িয়ে আছে জিপের পাশেই-তিতিরের কাছে যাওয়ার কোনো চেষ্টা না করে।

ঐ আবছা অন্ধকারে হঠাৎ দেখলাম গাছের মসৃণ গুঁড়িতে গা ঘষে ঘষে তিতির গাছের অন্য দিকটাতে যাবার চেষ্টা করছে খুব সাবধানে। পৌঁছেও গেল। তারপর কী হল বোঝার আগেই গাছের ওপাশে দু-তিনজন লোকের গলা শুনলাম। তাদের মধ্যে একজন ইংরিজিতে বলল, ড্যাম ফুল।

পরক্ষণেই বলল, লেটস্ শোভ অফফ। কুইক।

অন্য কে একজন বলল, হাউ বাউট হিম?

কাম অন ঊ্য সিলি গোট। লিভ হিম বাহাইণ্ড। উ্য উইল বি অ্যাজ ডেড অ্যাজ হ্যাম। উই হ্যাভ অ্যাকসিডেন্টালি এনটার্ড দ্য টেরিটেরিজ অব সামওয়ান।

ঐ লোকগুলোর মধ্যে একজনের গলাটা ভীষণ চেনা-চেনা মনে হচ্ছিল আমার। কিন্তু চিনতে পারলাম না।

লোকগুলোর আওয়াজ মিলিয়ে যেতেই তিতির আমাদের কাছে এল। তখন দেখলাম ওর হাতে ঐ হেহে লোকদের একটি বেঁটে ধনুক আর ছোট্ট তীর।

খুন করলি তিতির? ফিসফিস করে ঋজুদা শুধোল।

কী করব? রাইফেল তো ছুঁড়তে বারণ ছিল!

লাগাতে পারলি তীর?

লেগে গেল তো! ঈস্, বুড়োটাকে মেরে ফেলল ওরা। পেছন থেকে আসা তীরটা ওর পিঠে বিঁধেছিল আর সঙ্গে সঙ্গে ও পেছনে হেলে পড়ায় ওর শরীরের চাপে তোয়ালেটা উঠে আসছিল। যাক্, ওকে যে মেরেছিল, তাকেও আমি মেরেছি, এইটেই মস্ত কথা।

ইতিমধ্যে গাছের গুঁড়ির ভেতর থেকে অন্যরা বেরিয়ে আসায় ঋজুদা ঠোঁটে আঙুল দিয়ে চুপ করতে বলল ওদের। ওরা রেগে গিয়ে হাত মুখ নেড়ে, শব্দ না করে বলল, কথা তো তোমারই বলছ!

ঋজুদা তিতিরকে বলল, ওদের মধ্যে একজনকে নিয়ে আমি আর রুদ্র ঐ লোকদুটোর পিছু নিচ্ছি। তুই অন্যদের সঙ্গে এখানে সাবধানে থাকিস। আশা করছি, রাত ভোর হবার আগেই আমরা ফিরে আসব।

তিতির ওদের একজনকে ফিসফিস্ করে কী বলল। সে লোকটা এগিয়ে এল। রাইফেল কাঁধে ঝুলিয়ে ঋজুদার পিছু পিছু এগোলাম। লোকটা তার বেঁটে তীর-ধনুকটা সঙ্গে নিল।

গাছের ছায়া ছেড়ে বেরিয়েই আমরা একটা পাথরের আড়ালে থেকে কিছুক্ষণ চারধার দেখে নিলাম। অন্ধকারে আমাদের চোখের চেয়ে জঙ্গলের মানুষদের চোখ অনেক বেশি কাজ করে। লোকটা ভাল করে চারধারে দেখে, আঙুল তুলে আমাদের দেখাল। দেখলাম দুটো লোক জোরে হেঁটে চলছে বাওবাব গাছটার উলটোদিকে।

ঋজুদা লোকটাকে সোয়াহিলিতে আর আমাকে বাংলাতে বলল, ফ্যান-আউট করে লোকদুটোকে ফলো করতে। দরকার হলে ওদের ডেরার ভিতরে গিয়ে পৌঁছতে হবে।

তাই-ই করলাম আমরা। আসবার সময় ঋজুদা বুড়ো লোকটার পা থেকে খুলে দড়িটা নিয়ে এসেছিল। সেটা কোন্ কাজে লাগবে, কে জানে?

লোকদুটো উঁচু-নিচু জংগলাকীর্ণ পথ বেয়ে চলেছে। নিচু জায়গায় বা নদীর খোলে ঢুকে গেলে দেখা যাচ্ছে না–আবার উঁচু জায়গায় গেলেই দেখা যাচ্ছে। ওদের সঙ্গে আমাদের দূরত্ব ক্রমশ কমে আসছে।

একটু পর হঠাৎ ওরা দাঁড়িয়ে পড়ল। পড়তেই, আমরাও শুয়ে পড়লাম। ঋজুদা ওদের সবচেয়ে কাছে এবং একেবারে পিছনে। আমি আর একটু পিছনে, ডানদিকে। এবং হেহে লোকটি বাঁ দিকে, আমার চেয়ে একটু পিছিয়ে।

ঐ লোকদুটো কান খাড়া করে কিছু শোনবার চেষ্টা করতে লাগল এবং ঠিক সেই সময়ই তিতির চিৎকার করে উঠল বাওবাব গাছের তলা থেকে। তারপর গোঙানির মতো করে হেহে ভাষায় কী সব বলতে লাগল টেনে টেনে। আমরা কিছুই বুঝতে পারলাম না।

এক সেকেণ্ড লোকদুটো দাঁড়িয়ে পড়ে তিতিরের ঐ চিৎকার শুনল। যে লোকটা ট্রাউজার আর শুটিং জ্যাকেট পরে ছিল সে এগিয়ে আসতে গেল বটে কিন্তু তার সঙ্গী তাকে জাপটে ধরল এবং উলটোদিকে টানতে লাগল। সঙ্গে সঙ্গে তিতির আবার ঐ রকম আর্তনাদ করে উঠল। তখন দুজনেই একসঙ্গে জোরে দৌড় লাগাল।

আমরাও ওদের পেছনে চললাম। কিন্তু বেশি দূর যেতে হল না। একটু গিয়েই ওরা একটি টিলার নীচে থেমে গেল। সেখানে একটি গুহামতো আছে। সেই গুহা থেকে আরও একটি লোক নেমে এসে খুব উত্তেজিত ভাবে কী সব কথাবার্তা বলতে লাগল। কথা শুনে মনে হল ওরা সকলেই ইংরিজি জানে এবং এই অঞ্চলের জঙ্গল সম্বন্ধে আমাদের মতোই অনভিজ্ঞ। যে লোকটাকে তিতির বিষের তীর দিয়ে মারল, সেই বোধহয় স্থানীয় লোক। ওদের পথপ্রদর্শক। কে জানে? সবই অনুমান।

লোকগুলোকে এখান থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। আমাদের হাতের রাইফেল দিয়ে তাদের এখুনি সাবড়ে দেওয়া যায়। কিন্তু শব্দ করা চলবে না এখন। ঐ দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎই মনে হল কেন ঋজুদা দড়িটা এনেছিল সঙ্গে করে। দড়িটা ঋজুদার কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে অনেকখানি ডি-ট্যওর করে আমি টিলাটার পিছন দিকে চলে গেলাম। ঋজুদার কথামতো হেহে লোকটি সাবধানে লেপার্ড-ক্রলিং করে টিলাটার দিকে এগোতে লাগল। কারণ ওর বিষের ধনুক-তীরের পাল্লা বেশি নয়। এবং বিষের তীরই এখন মোক্ষম জিনিস। নিঃশব্দ। তাৎক্ষণিক!

আমি হাঁপাচ্ছিলাম। টিলাটার উপরে পৌঁছে দম নিয়ে নিলাম। তারপর নাইলনের দড়িটাতে একটা ফাঁস লাগালাম বড় করে। আমার শিলুট যেন ওদের চোখে না পড়ে এমন করে এগোতে লাগলাম শরীর ঘষে ঘষে। ফোটোগ্রাফিতে যেমন আলো-ছায়ার খেলা বোঝাটাই সবচেয়ে বড় জিনিস, ক্যামোফ্লাজিং-এও তাই। এই আলো-ছায়ার। ইনটার-অ্যাকশান যে রপ্ত করতে পারে তার পক্ষে জঙ্গলে লুকিয়ে চলাফেরা করা কোনো। ব্যাপারই নয়। ঋজুদা পারে। আমিও হয়তো পারব কোনোদিন।

ওরাও তিনজন, আমরাও তিনজন। আমি জায়গামতে গিয়ে পৌঁছতে লক্ষ করলাম, কিছুটা দূরে ঘনতর ছায়ার মধ্যে ঘন ছায়ার মতো ঋজুদা একটা উইয়ের ঢিবির আড়াল নিয়ে বসে আছে। আমি ঐ জায়গাতে একটু আগে ছিলাম বলেই আমার পক্ষে ঋজুদাকে স্পট করা সম্ভব হল। হেহে লোকটি চিতারই মতো নিঃসাড়ে টিলাটা থেকে মাত্র পনেরো হাত দূরে একটা ক্যাণ্ডালাব্রাম ঝোপের আড়ালে এসে পৌঁছেছে। এমন সময় সাহেবি পোশাক পরা লোকটা, যে লোকটা টিলার গুহা থেকে বেরোলো একটু আগে, তাকে বলল, হুকুম্না ফেধা? মানে, ওদের টাকা দাওনি?

লোকটা বলল, এনিডিও, বাওনা। অর্থাৎ, না স্যার, দিইনি।

বলতেই সাহেবি পোশাক পরা লোকটা দুটো হাত জড়ো করে ঐ লোকটার মাথায় প্রচণ্ড এক বাড়ি মারল কারাটের মারের মতো। কটাং করে একটা শব্দ হল এমন যে মনে হল, লোকটার মাথার খুলিই বা বুঝি ফেটে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে আমার দারুণ আনন্দ হল। এতক্ষণে লোকটার গলার স্বর, লোকটার দাঁড়ানোর ভঙ্গি, লোকটার–লোকটাকে আমি চিনেছি। একে যখন হাতের কাছে পেয়েছি, তখন আর ছাড়াছাড়ি নেই। প্রাণ যায় তো যাক। ঋজুদা টর্নাডো-ফর্নাডো, আর ডবসন, আর তানজানিয়ান প্রেসিডেন্ট জুলিয়াস নীয়েরে-টিয়েরে বড় ব্যাপার নিয়ে থাকুক। আমি একা ভুষুণ্ডাকে হাতের কাছে পেলেই খুশি। ওকে নিয়ে আমি পুতুল খেলব।

ঐ লোকটা মাথায় বাড়ি খেয়ে সঙ্গে সঙ্গে গোঁ-গোঁ করে পড়ে গেল। মাথার খুলিটা নারকেলের মতো সত্যিই ফেটে গেল কি না কে জানে! ভালই হল। হারাধনের ছেলেদের মধ্যে এখন বাকি রইল দুই।

ভুষুণ্ডা বাওবাব গাছটা যেদিকে, সেদিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল, প্যান্টের দু পকেটে দু’হাত ঢুকিয়ে। তারপরই ও নিজের মনে বলল, ওয়েল, সামথিং হ্যাজ গান অ্যামিস্!

খুব ইংরিজি ফোটাচ্ছে বিনা কারণে।

ফাঁসটা আমার করাই ছিল। মাথাটা নিচু করে, টিলার নীচে দড়িটা নামিয়ে দিয়ে বার চারেক দুলিয়ে নিয়ে ভুষুণ্ডার মাথা লক্ষ করে আমি সেটাকে ছুঁড়ে দিলাম। তারাভরা অন্ধকার আকাশের নীচে টেডি মহম্মদ পাহাড়টি নিঃশব্দে আমাকে আশীর্বাদ করল যেন। ফাঁসটা ঠিক উড়ে গিয়ে ভুষুণ্ডার মাথা গলে নেমে গেল। সঙ্গে সঙ্গে ও সেটাকে খুলে ফেলার চেষ্টা করল বটে দু হাত দিয়ে, কিন্তু আমি আর কিছু দেখতে পেলাম না। দড়িটাকে আঁকড়ে ধরে আমার শরীরের সমস্ত ওজন সমেত ঝুলে পড়লাম টিলার পেছনে। তারপর মাটি থেকে প্রায় হাত-পনেরো উঁচুতে পাথরের গায়ে ঝুলতে থাকলাম। আমার শরীরের ওজন এবং হ্যাঁচকা টানে ভুষুণ্ডা বেশ কিছুটা হিঁচড়ে চলে এসে কোনো পাথর-টাথরে আটকে গেল। ওপাশ থেকে একটু দৌড়োদৌড়ির শব্দ শোনা গেল। তারপরই কী হল বোঝার আগেই হঠাৎ ভারশূন্য হয়ে গেলাম আমি। এবং পরক্ষণেই পপাত ধরণীতলে! কে যেন দড়িটা ওপাশে ছুরি দিয়ে কেটে দিল। পড় তো পড়, একেবারে কাঁটাঝোপের উপর।

ঐ অধঃপতিত অবস্থা থেকে প্রাণপণে উত্থান করার চেষ্টা করছি এমন সময় আমার পিছনে ঋজুদার পরিচিত ঠাট্টার হাসি শোনা গেল। বলল, রাইফেলটা আমাকে দে। নিজের গুলি খেয়ে যে নিজে মরিসনি, এই ঢের!

কোনোরকমে উঠে, কাঁটার কামড়ের কথা ভুলে গিয়ে, মুখে সপ্রতিভ হাসি এনে বললাম, ব্যাপারটা কী হল?

ব্যাপার অতীব গুরুতর! ভুষুণ্ডা আমাদের কেসের এগজিবিট নাম্বার ওয়ান। আর তুই তাকেই ফাঁসি দিয়ে মেরে ফেলছিলি? তুই কি ভাবিস, তোর শরীরের ওজন চড়াই পাখির সমান? গলার শিরা-ফিরা বোধহয় ছিঁড়ে গেছে। মুখ দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে। জ্ঞান নেই। এমন করিস না।

বললাম, আহা! এ পর্যন্ত কত লোককে নিজে ফটাফট সাবড়ে দিলে আর ভুষুণ্ডার বেলা তোমার যত প্রেম! ও কিন্তু আমার সম্পত্তি। গড়ের মাঠে ভেড়াওয়ালারা যেমন করে ভেড়ার গায়ের লোম কাটে আমি তেমন করেই ওর মাথার কোঁকড়া কালো ঘন চুল ছাঁটব, ওর মাথাটা কোলে নিয়ে। ওর সঙ্গে অনেক হিসেব-নিকেশ আছে আমার।

ঋজুদার পাইপটা নিভে গেছিল। আগুন জ্বেলে, হেসে বলল, আহা! যেন ঠাকুমা-নাতির সম্পর্ক! তোর যে কোনটা রাগ আর কোনটা ভালবাসা, বুঝতেই পারি না।

ঋজুদার গলা শুনে বুঝলাম, খুবই খুশি ঋজুদা।

তারপরই বলল, নষ্ট করার মতো সময় নেই আমাদের। চল্। যা বলব, তা মনোযোগ দিয়ে করবি।

টিলাটার ওপাশে গিয়ে দেখলাম, ভুষুণ্ডা অজ্ঞান হয়ে শুয়ে আছে। আর অন্য লোকটা বিষের তীর খেয়ে টেসে গেছে। অজ্ঞান হলেও তার হাত-পা বাঁধা আছে দড়ি দিয়ে।

ঋজুদা ঘড়ি দেখল। নিজের মনেই বলল, বারোটা! ঠিক আছে। যথেষ্ট সময় আছে। এখানে আয় এক মিনিট।

টিলাটার ভিতরের গুহাতে গিয়ে চক্ষু স্থির হয়ে গেল। দেখি দুটো মেশিনগান দোপায়ায় বসানো। ঝকঝক করছে টর্চের আলো পড়ে। ঋজুদা জিজ্ঞেস করল, ছুঁড়েছিস কখনও?

এন-সি-সিতে একবার ছুঁড়েছিলাম। এল-এম-জি।

সে তো যত কনডেমড মাল, আর্মির। অ্যাই দ্যাখ, এইটা হচ্ছে ব্রিটিশ ব্রেনগান। ওরিজিনাল ডিজাইনটা চেকোস্লোভাকিয়ার ছিল। ব্ৰনোর নাম শুনেছিস তো। পয়েন্ট টু-টু রাইফেল দেখেছিলি না একটা, মনে আছে? অ্যালবিনোর রহস্য ভেদের সময় বিষেনদেওবাবুর কাছে, হাজারিবাগের মুলিমালোয়াঁতে?

হুঁ।

ব্রেনগান কেন বলে তা বুঝলি?

কেন?

চেকোস্লোভাকিয়ার ব্রনোর ডিজাইনের উপর ইংল্যাণ্ডের এনফিল্ড মক্সো করে এই জিনিস তৈরি করেছে। তাই দুজনের নামই এতে জড়ানো আছে। ব্ৰনোর বি আর এবং এনফিল্ডের ই এন। বি. আর. ই. এন–ব্রেন। তাই ব্রেনগান।

আর ঐটা কী মেশিনগান? কী সুন্দর! এর তো স্ট্যাণ্ডেরও দরকার হয় না, না?

না। এটা আমিও এর আগে দেখিনি। নাম শুনেছি, ছবি দেখেছি। এই টর্নাডো আর ভুষুণ্ডাদের দল যে কত সম্পদশালী আর ওয়েল-ইকুইপড, ওয়েল-কানেকটেড তা এখানে না এলে বুঝতাম না। এইটা ইজরায়েলি লাইট মেশিনগান। নাইন মিলিমিটারের। অত্যন্ত পাওয়ারফুল। এক-একটা ম্যাগাজিনে পঁচিশটা গুলি নেয়। উনিশশো একান্ন সনে ইজারায়েলিরা অন্য দেশের উপর নির্ভরতা কমানোর জন্যে প্রথম এই উজি তৈরি করে। এই মেশিনগান এমনই কাজের যে, সারা পৃথিবীর মারদাঙ্গা-যুদ্ধবাজদের কাছে এর চাহিদা অসাধারণ। পশ্চিম জার্মানি, ওলন্দাজ এবং অনেক আফ্রিকান দেশের আর্মি এখন এই উজি এল-এম-জিই ব্যবহার করে।

বলেই বলল, দেখে নে, কী করে ব্যবহার করতে হয়। দুটোই। তিতির ব্রেনগানটা চালাবে শুয়ে শুয়ে। তুই চালাবি উজিটা। আমাদের রাইফেলগুলো দিবি হেহে লোকগুলোকে, তিতিরের কম্যাণ্ডে।

আর তুমি?

আমি একা যাব টর্নাডোর বেস ক্যাম্পে। এখন আর কোনো কথা নয়। তুই এক্ষুনি এই লোকটাকে সঙ্গে করে নিয়ে চলে যা। তিতির এবং ওদের নিয়ে এখানে ফিরে আয়। এলেই সব বুঝিয়ে বলব। আর শোন্! আমার জিপটা চালিয়ে আনবি হেডলাইট না-জ্বেলে। তাতে জিনিসপত্র আছে জরুরি।

বলেই সার্গেসন-এর জুতোর মধ্যে থেকে ম্যাপটা নিয়ে গুহার মধ্যে টর্চ জ্বেলে বসল।

আমি ফিরে না-গিয়ে রাক্-স্যাক থেকে ওয়াকি-টকিটা বের করলাম।

ঋজুদা বিরক্ত হয়ে বলল, ম্যাপের দিকেই চোখ রেখে, গেলি না তুই?

ঋজুদাকে গ্রাহ্য না করে ওয়াকি-টকিতে মুখ রেখে সুইচ অন করে বললাম, হ্যাল্লো।

ওপাশ থেকে তিতিরের রিনরিনে গলা ভেসে এল, টাঁড়বারো। টিটি।

বললাম, টাঁড়বারো–। রুফাস।

গো অ্যাহেড। তিতির বলল।

ঋজুদা বলে দিয়েছিল, টাঁড়বারো কোড ওয়ার্ড। তিতিরের কোড নেম টিটি। পাখির নাম। আমার কোড নেম রুফাস। রুফাস বাঁদরের নাম। আমাকে এই কোড নেম দেবার পেছনে তিতির এবং ঋজুদারও গভীর চক্রান্ত ছিল বলেই বিশ্বাস আমার। ঋজুদার নিজের কোড নেম রিৎজ, প্যারিসেরে রিৎজ হোটেলের নামে। ঋজুদা এও বলে দিয়েছিল যে, কথাবার্তা সব বাংলায় বলতে হবে।

তিতির আবার বলল, বল রুফাস। শুনছি।

ঋজুদার জিপটা নিয়ে ওখানের অন্য সবাইকে নিয়ে এক্ষুনি এখানে চলে এসো। হেড-লাইট জ্বালাবে না। সোজা উত্তরে এসো আধ মাইল। তারপর, আমি টিলার উপরে দাঁড়িয়ে টর্চ জ্বেলে থাকব। সেই আলো দেখে আসবে। সাবধান! গর্তে জিপ ফেলো না। এখন মোক্ষলাভের কাছাকাছি আমরা।

আসছি। কোনো খবর আছে? নতুন?

আছে। দারুণ খবর। এলেই জানবে। রজার। ওভার।

টিলার উপরে দাঁড়িয়ে রইলাম। কিছুক্ষণ বোঝার উপায় রইল না যে, তিতির আদৌ রওয়ানা হয়েছে কিনা। মিনিট দশেক পর রানী মৌমাছির ডানার আওয়াজের মতো জিপের এঞ্জিনের গুনগুনানি ভেসে এল। আমি টর্চটা জ্বেলে, যাতে উল্টোদিক থেকে না দেখা যায় এমন করে টিলার নীচে আলো ফেলে দাঁড়িয়ে রইলাম।

দেখতে দেখতে তিতির এসে গেল। ভুষুণ্ডার ততক্ষণে জ্ঞান এসেছে।

আমি বললাম, হ্যালো, ভুষুণ্ডা! চিনতে পারছ?

ভুষুণ্ডা ভূত দেখার মতো চমকে উঠল।

তিতির তার মাথার দুর্গন্ধ কদমছাঁট চুল দুহাতে নেড়ে দিয়ে বলল,

ওরে আমার বাঁদর নাচন
আদর গেলা কোঁৎকারে,
অন্ধবনের গন্ধগোকুল,
ওরে আমার হোঁৎকা রে।

ঋজুদা বলল, এখন ইয়ার্কি মারার সময় নয় তিতির। ভিতরে যা। রুদ্র, তুই শিগগির ওকে ব্রেনগানটা চালানো শিখিয়ে দে। ততক্ষণে আমি জিপটাকে টিলার এ-পাশে এনে লুকিয়ে রাখছি। আপাতত।

একটু পরে ঋজুদা যখন ফিরে এল, তখন আমরা প্রায় তৈরি। জিপ থেকে ঋজুদা একটা ব্যাগ নিয়ে এল। তার মধ্যে থাক-থাক তানজানিয়ান শিলিং-এর নতুন করকরে নোট।

এই ব্যাগটা ওদের দিয়ে দে। বলে দে, এখন রেখে দিতে। ওদের কাছেই থাক। আমরা যে টর্নাডো বা ভুষুণ্ডার মতো খারাপ নই তা ওরা জানুক। ভোরবেলা সমানভাগে ভাগ করে নেবে। তার আগে যুদ্ধ করতে হবে ভাল করে; যদি টর্নাডো যুদ্ধ করে। সামনাসামনি যুদ্ধ করার মতো বোকা সে নয়। তাকে তার ঘাঁটি থেকে বের করে আনতে হবে। গম্ভীরমুখেই ঋজুদা বলল, এই সব খুনোখুনি আমাদের কাজ নয়। কিন্তু এবারে প্রথম থেকেই ব্যাপারটা এমন দাঁড়াল যে আমরা যেন প্যারা-মিলিটারি কম্যাণ্ডোজ সব। যুদ্ধ করবে তারা; আমাদের কি এসব মানায়? ভবিষ্যতে এরকম ঝামেলাতে যাব না আর।

তারপর আমার হাতে ফ্লেয়ারগানটা দিয়ে বলল, আমি জিপ নিয়ে চলে যাচ্ছি টর্নাডোর ক্যাম্পের দিকে। ক্যাম্পের যত কাছে যেতে পারি, গিয়ে, তারপর হেঁটে যেতে হবে। জানি না, জিপ নিয়ে কত কাছে যেতে পারব।

তিতির বলল, তোমার সঙ্গে উজি এল-এম-জিটাও নিয়ে যাও ঋজুকাকা। একেবারেই একা যাচ্ছ।

না। বড্ড ভারী হয়ে যাবে। তাছাড়া আমার দুটো হাতই খালি থাকা চাই। টর্নাডো আর তার দলবলকে আমি এমন শিক্ষা দিতে চাই যে, সারা পৃথিবীর পোচাররা যেন জানে যে, যত বড় বলবান আর অর্থশালীই তারা হোক না কেন, তাদের সমানে সমানে টক্কর দেবার লোকও আছে। শোন রুদ্র। ঘড়িতে যখন ঠিক রাত তিনটে বাজবে, তখন এই ফ্লেয়ারগানটা থেকে আকাশে ফ্লেয়ার ছুঁড়বি। সিগন্যালটা মনে আছে তো?

আমাদের সিগন্যাল?

আঃ। আমাদের কেন? কোথায় যে মন থাকে তোর! ডবসনের সিগন্যাল। ডবসনের ডিস্ট্রেস সিগন্যাল দিয়ে আমরা টর্নাডোকে এই টিলার কাছে নিয়ে আসব। এবং টর্নাডো যখন তার আস্তানা ছেড়ে তোদের দিকে আসবে, তখন সেই আস্তানাকেই আমি উড়িয়ে দেবার চেষ্টা করব ডিনামাইট দিয়ে। আর তোরা ঐ ব্রেন-গান আর উজি আর তিতিরের হেহে চ্যালারা আমাদের রাইফেল দিয়ে ওদের কচুকাটা করে দিবি। বুঝেছিস? এবার বল দেখি সিগন্যালটা কী?

ওয়ান গ্রিন, ফলোড বাই টু রেড। দেন টু বি কনক্লডেড বাই ওয়ান গ্রিন। তিতির মুখস্থ বলল।

ঋজুদা বলল, ফাইন্। তাহলে আমি এগোচ্ছি। বলে, বুড়ো আঙুল তুলে থাম্বস-আপ করল।

আমরাও থাম্বস-আপ করলাম।

তখন বাজে প্রায় সোয়া একটা। ঋজুদার জিপের এঞ্জিনের গুড়গুড়ানির আওয়াজ মিলিয়ে গেল বন-পাহাড়ে। এমন সময় ভুষুণ্ডা বলল, ওয়াটার!

আমি পকেট থেকে রুমাল বের করে তিতিরকে বললাম, তোমার একজন চ্যালাকে বলো তো ওর মুখে এটা পাকিয়ে পুরে দেবে।

তুমি কি নিষ্ঠুর!

তিতির আবার বলল, জল দেব ওকে? আমার ওয়াটার বটলে আছে কিন্তু।

আমারও আছে। কিন্তু দেবে না। দয়ামায়া আমারও কম নেই তিতির। কিন্তু এ যে ব্যবহারের যোগ্য সেই রকম ব্যবহারই এর সঙ্গে আমাকে করতে দাও। ও আমার চোখের সামনে যদি জল জল করে মরেও যায়, একফোঁটা জলও দেব না ওকে। মরুক।

তিতির বলল, যাকগে। মরুকগে ও। কিন্তু কচুকাটার ঠিক ইংরিজি কী, জানো? ঋজুকাকা কচুকাটা করে দিতে বলে চলে গেল। এরকম অর্ডারের কথা তো কখনও শুনিনি।

কচুকাটার আবার ইংরিজি কী? সাহেবদের দেশে কি কচু হয়? কচু পুরোপুরি স্বদেশী জিনিস। ওরা বলে, মো-ডাউন; ঘাস-কাটার জাত তো। আর আমরা বলি, কচুকাটা। কেমন জবরদস্ত কথাটা বলো?

তা ঠিক।

এদিকে তিতিরের হেহে চ্যালারা টাকার গন্ধ শুঁকে রীতিমত নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। তার উপর মৃতসঞ্জীবনীর প্রভাব এখনও বোধহয় আছে। লোকগুলো একটু বেশি পরিমাণ সঞ্জীবিত হয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে। কড়া ওষুধের এই দোষ। ডোজের গণ্ডগোল হলেই গলগণ্ড!

যে বুড়োটা মরল গাছের মগডালে ব্রহ্মদৈত্যের মতো বসে বসেই, সে যে বিশেষ বেশি সঞ্জীবিত হয়েছিল তাতে কোনোই সন্দেহ নেই আমার। নইলে, দড়ি ধরে তোয়ালে নাড়তে পারল মগডালে বসে, আর তীর ছুঁড়তে পারল না একটা! বেচ্চারা! ঋজুদা তো ঐ বুড়োটাকে কিছুই দেয়নি। নিশ্চয়ই ওর বৌ-ছেলেদের দেবে কিছু। সব ভালয়-ভালয় মিটুক। ভুষুণ্ডা যে আমাদেরই হেপাজতে এ-কথাটা এখনও পুরোপুরি বিশ্বাস হচ্ছে না আমার। আড়াইটে এখন ঘড়িতে। আমাদের টেনসান বাড়তে লাগল। কোথাও কোনো সাড়াশব্দ নেই। শুধু ঋজুদা যেদিকে গেছে সেদিক থেকে হাতির বৃংহণ আর আমাদের বাওবাব গাছের দিক থেকে হায়নার বুক কাঁপানো অট্টহাসি ভেসে আসছে।

তিনটে বাজতে দশ। পাঁচ। তিন।

হিন্দিতে কাউন্ট-ডাউনকে কী বলে বলো তো?

তিতির আমাকে শুধোল, ঠিক আড়াই মিনিট যখন বাকি আছে তিনটে বাজতে তখন–।

রাগ ধরে গেল আমার। ফ্লেয়ারগানটা নিয়ে, শেলগুলো ঐ অর্ডারে সাজিয়ে গুহার বাইরে এলাম আমি। উত্তর দিলাম না। ফাকসা-আলাপের আর সময় পেল না!

তিতির উত্তরের অপেক্ষা না করেই বলল, নিজের মনে, উলটি-গীনতি।

ফ্লেয়ারগানটা হাতে করে দাঁড়ালাম। আর ষাট সেকেণ্ড। উনষাট, আটান্ন, সাতান্ন…চলতে লাগল উলটি-গীনতি।

টেনসান একেকজনের মধ্যে এক-একরকম কাজ করে। কেউ স্থির হয়ে যায়, কেউ অস্থির; কেউ আবার ঘুমিয়ে পড়ে। তিতির বোধহয় ঘুমিয়েই পড়ল।

সবুজ আলোয় ভরে গেল আকাশ। তারপর লালে, তারপর আবার সবুজে। ফ্লেয়ারগান ছুঁড়েই আমি এসে জায়গা নিলাম। তারপর তিতিরকে বললাম, তুমি আর আমি একই জায়গায় থাকলে আমাদের ফায়ারিং-পাওয়ার কার্যকরী হবে না। তুমি এখানে থাকো। আমি টিলার উপরে পাথরের আড়ালে গিয়ে থাকছি। তোমার কাছে একজন হেহেকে রাখো রাইফেল হাতে। আমি অন্যজনকে নিয়ে যাচ্ছি। টিলার উপরে থাকলে চারদিক দেখাও যাবে। টর্নাডোর দল, ঋজুদা যে পথে গেছে, সেই পথ দিয়েই আসবে তার কী মানে?

ঠিকই বলেছ। তাই-ই যাও। তিতির বলল।

তারপর হঠাৎ আমার দিকে হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, বেস্ট অব লাক। গুড হান্টিং। সাবধান রুদ্র।

একটু থেমে বলল, আমি তোমার সঙ্গে সব সময় ঝগড়া করি, তোমার পিছনে লাগি বলে তুমি রাগ করো না তো রুদ্র? আমাকে ক্ষমা করে দিও।

আমি ওর হাতে চাপ দিয়ে, হাতটা ছেড়ে দিয়ে জ্যাঠামশায়ের মতো গলায় বললাম, এ সব মেয়েলি কথাবার্তা, ঢং-ঢাং পরে হবে। এখন এসবের সময় নেই। সাবধান থেকো। লুক আফটার ইওরসেলফ?

সো ডু উ্য! বলল তিতির।

অন্ধকার কি কেটে যাচ্ছে? নাঃ। দেরি আছে অনেক এখনও ভোর হতে। সব প্রতীক্ষার রাত, সবচেয়ে দীর্ঘতম রাতও ভোর হয় এক সময়। আমাদের এই রাতও আশা করি ভোর হবে। আবার পাখি ডাকবে। আমাদের গায়ে রোদের চিকন বালাপোশ এসে আলতো করে জড়িয়ে নেবে নিজেকে।

বেশ শীত এখন। ঘড়িতে সাড়ে তিনটে। কী করে যে এতক্ষণ সময় কেটে গেল! আশ্চর্য! হঠাৎ, সামনের প্রায়-নিস্তব্ধ প্রায়ান্ধকার রাতের বুক চিরে দু জোড়া হেডলাইটের আলো ফুটে উঠল। এবং আস্তে আস্তে আলো যেমনই জোর হতে লাগল, তেমনই জিপের এঞ্জিনের আওয়াজও জোর হতে লাগল। কাছে আসতেই বুঝলাম, জিপ নয়, ল্যাণ্ডরোভার। তখনও গাড়িগুলো টিলা থেকে প্রায় আধ মাইল দূরে আছে, ঠিক সেই সময়ই মনে হল পৃথিবী বুঝি ধ্বংস হয়ে গেল। নাকি কোনো আগ্নেয়গিরি থেকে অগ্ন্যুৎপাত হল? অনেক দূরে, আকাশ লালে-লাল হয়ে উঠল। পেট্রলের ড্রাম ফাটার আওয়াজ আর লক্লকে আগুনের শিখা লাফিয়ে-লাফিয়ে উঠতে লাগল আকাশে। এবং সঙ্গে সঙ্গে ঐ ল্যাণ্ডরোভার দুটো আমাদের দিকে আর না এসে, মুখ ঘুরিয়ে যেদিক থেকে এসেছিল সেদিকেই তীব্ৰগতিতে ফিরে চলল, অন্ধকার জঙ্গলে আলোর চাবুক মেরে মেরে।

এইবার শুরু হল প্রচণ্ড বিস্ফোরণের পালা। টর্নাডোর অ্যামুনিশান ডাম্প ফাটল নিশ্চয়ই। আগুনে গুলিগোলা ফাটার নানারকম আওয়াজ। এতদূরে বসেও আমরা রাইফেলের বাঁট ছেড়ে দুহাতে কান চেপে ধরলাম। কালা করে দেবে যে! ওখানে কি যুদ্ধ লাগল নাকি? ঋজুদা একা গেল। কী হচ্ছে তা কে জানে!

আমার প্রচণ্ড রাগও হল। আমাদের লড়াই করার সুযোগটা হাতছাড়া হয়ে গেল বলে। পুরো ক্রেডিটটা ঋজুদা একাই নিয়ে নিল! বেশ!

এমন সময় দেখা গেল একজোড়া আলো দ্রুতগতিতে এদিকে আসছে আবার। হাত ঘেমে গেছিল। ট্রাউজারে হাত মুছে নিয়ে আমি উজির বাঁট আবার চেপে ধরলাম। আমার পাশের হেহে লোকটা উত্তেজনায় এমন অদ্ভুত কুঁই কুঁই আওয়াজ করছিল আর কাঁপছিল যে মনে হচ্ছিল ও বোধহয় মানুষ নয়, অন্য কোনো গ্রহের জীব। ও কিন্তু ভয় পায়নি। ছেলেবেলা থেকে যারা বল্লম দিয়ে মাটিতে দাঁড়িয়ে সিংহ মারে, তারা ভয় পাওয়ার পাত্র নয়। তাদের মায়েরা তাদের পুতুপুতু করে মানুষ করে না। আসলে বিপদেরও একটা দারুণ আনন্দ আছে। বিপদের তীব্র আনন্দেই ও অমন করছিল।

জিপটা কাছে আসতেই ওয়াকিটকি ব্লিপ ব্লিপ করতে লাগল। এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গে আরো চার জোড়া হেডলাইট দেখা গেল। তারা সেই প্রথম জোড়া আলোর চোখকে দ্রুত ফলো করে আসছে।

তিতির প্রথম কথা বলল, টাঁড়বারো! টিটি।

টাঁড়বারো। রিৎজ। ওরা আমাকে দেখতে পেয়েই তাড়া করেছে। ওরা প্রচণ্ড রেগে রয়েছে। সাবধান। খুব সাবধান। তোরা আগে গুলি করবি না! আমি তোদের টিলার সামনে দিয়ে জিপ চালিয়ে টিলার পিছনে চলে গিয়ে পাকদণ্ডী কাটার মতো করে ওদের পিছনে চলে আসব। শোন্। ওদের কাছে কোনো এল-এম-জি নেই। থাকলে এতক্ষণে আমার চিহ্ন থাকত না। আমাকে গুলি করিস না। মনে রাখিস, ওদের গাড়িগুলো ল্যাণ্ডারোভার। শুধু আমারটাই জিপ। রজার। গড ব্লেস। ওভার!

রিৎজ। শুনেছি। তিতির বলল, রুফাসকে বলে দেব। রজার। ওভার।

এতক্ষণে নাটক জমেছে। এই নইলে হয়! কী এত্তদিন টুকুস-টাকুস করে চলছিল দুসস। পায়ে গেঁটে বাত হয়ে যাচ্ছিল। এখন হয় এসপার, নয় উপার।

গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিল। ওরা পাগলের মতো গুলি ছুঁড়ছে ঋজুদার দিকে। চারটি গাড়ি ওদের। অনেক লোক। আর ঋজুদা একা; তাও নিজেই চালাচ্ছে গাড়ি। এঁকেবেঁকে আর খুব স্পিডে চালিয়ে ওদের সঙ্গে দূরত্বও বাড়িয়ে ফেলেছে অনেকখানি। ব্যাপার-স্যাপার দেখে এবার সত্যিই চিন্তা হতে লাগল।

কিন্তু চিন্তা শেষ হতে না-হতেই প্রচণ্ড হুঙ্কারে আর বেগে গুলি-খাওয়া বাঘের মতো ঋজুদার জিপ আমাদের গুহার মুখ অতিক্রম করে চলে গেল। পিছনের গাড়িগুলো আসছে। আসছে, আসছে; এসে গেল।

উপর থেকে আমি বললাম, ফা-য়া-র।

সঙ্গে সঙ্গে তিতিরের ব্রেন-গান আর আমার উজি বৃষ্টি ঝরাতে লাগল। ট্যা-র‍্যা র‍্যা-র‍্যা-র‍্যা-র‍্যা-র‍্যা-র‍্যা-র‍্যা র‍্যা-ট্যা– মধ্যে মধ্যে ম্যাগাজিন রাইফেলের গুলির আওয়াজ। ঢিক-চুঁই, ঢিক-চুঁই, ক্যাট ক্যাট।

প্রথম গাড়িটা উল্টে গেল। আগুন লেগে গেল গাড়িটাতে। বোধহয় ড্রাইভার মরেছে। উল্টোতেই ঐ স্পিডে সামলাতে না পেরে পিছনের গাড়িটাও তার ঘাড়ে এসে পড়েই উল্টে গেল। লোক বেরিয়ে পড়ল তার থেকে। আগুনে ওরা আমাদের পজিশান পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে। বিপদ! প্রত্যেকের হাতে রাইফেল। কিন্তু এদিকেও গুলির বন্যা বয়ে চলেছে। খা, খা, কত গুলি খাবি খা! তোদেরই এল-এম-জি; তোদেরই ম্যাগাজিনে-ঠাসা শয়ে শয়ে গুলি-খা! পেট পুরে খা পাজি শয়তানগুলো! ধর্মের কল বাতাসে নড়ে! খা!

এমন সময় হঠাৎ আর একজোড়া আলো কোথা থেকে ওদের পেছনে এসে হাজির হল। বাঙালির পো ঋজুদা সোঁদরবনের কেঁদো বাঘের চাল চেলেছে। এ-চালের খোঁজ তোরা জানবি কী করে? হেডলাইট নিবিয়ে দিয়ে ডামাডোলের মধ্যে পাকদণ্ডী কেটে জিপ নিয়ে এক্কেবারে পিছনে। বঙ্গদেশের জোঁক! চেনোনি তো বাপু!

এদিকে আমাদের কাছেও অজস্র গুলি এসে পৌঁছেছে। প্রথমে মনে হচ্ছিল শিলাবৃষ্টি, যখন দূরে ছিল। এখন মনে হচ্ছে, অনেকগুলো শিলকাটাইওয়ালা দূর থেকে পেল্লায় পেল্লায় ছেনি নিয়ে আমাদের সমস্ত টিলাটা কেটে কেটে মস্ত শিল-পাটা বানাচ্ছে। কী। কাটবে এখানে, এত বড় শিলে গাবুক-গুবুক করে কোন যজ্ঞি বাড়ির রান্না করবে যে তারা, তা তারাই জানে।

কিন্তু আমাদেরও ভ্রূক্ষেপ নেই। আমরাও সকলে মিলে চালিয়ে যাচ্ছি দে-দনাদন দে-দনাদ্দন। তিতির ঠিকই বলে। আমাদের সঙ্গে ন্যায় আছে, ওদের সঙ্গে অন্যায়। দেরি হতে পারে, কিন্তু অন্যায়কে হারতেই হয় ন্যায়ের কাছে। আমাদের হারাবে কে? কে হারাবে?

এমন সময় ঋজুদা যা করল, তা একমাত্র ঋজুদার পক্ষেই সম্ভব। একেবারে শ্রীকৃষ্ণের রথের মতো একা জিপ নিয়ে চলে এল ঐ ল্যাণ্ডরোভারের মারাত্মক দঙ্গলের মধ্যে। তার জিপ এক-একটা গাড়িকে পেরোয়, আর গদ্দাম গদ্দাম্ করে আওয়াজ হয়। হ্যাণ্ড-গ্রেনেড। ঠিক। হ্যাণ্ড-গ্রেনেড। এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে, অন্য হাতে গ্রেনেড ধরে, দাঁত দিয়ে পিন্ খুলে জিপ চালাতে চালাতেই ছুঁড়ে দিচ্ছে ঋজুদা গ্রেনেডগুলো। ভটকাই এ দৃশ্য দেখলে বলত : শোলে-টোলেকে জলে ধুয়ে দিলে র‍্যা! কী ফাইটিং!

গাড়ির ছাদ-ফাদ আকাশে উড়িয়ে দিয়ে ওদের ল্যাণ্ডরোভারের টায়ার ওদের হাত পা মুণ্ডু নিয়ে গ্রেনেডগুলো টাগ-ডুম টাগ-ডুম শব্দে ডাংগুলি খেলতে লাগল।

ঠিক সেই সময়ই কাণ্ডটা ঘটল। আমাদের টিলার গুহার ভিতর থেকে গড়াতে গড়াতে ভুষুণ্ডা বাইরে বেরিয়ে এল, তারপর পোলে পোলে, পোলে পোলে বলে চেঁচাতে চেঁচাতে গড়িয়ে নেমে যেতে লাগল দ্রুত।

আমার ট্রিগার ছোঁওয়ানো হাত হঠাৎ থেমে গেল। এক মুহূর্ত। টর্নাডোর দলের লোকেরা প্রথম ধাক্কা খেয়েছিল তাদেরই হাইডআউট থেকে, তাদেরই এল-এম-জি থেকে, তাদেরই উপর মুড়ি-মুড়কির মতো গুলিবৃষ্টি হতে দেখে। দ্বিতীয় ধাক্কা খেয়েছিল ঋজুদার টিপিক্যাল সোঁদরবনি পাকদণ্ডীর দণ্ডে। তৃতীয় ধাক্কা খেল তাদেরই পেয়ারের দিগ্বিজয়ের ভুষুণ্ডাকে হাত-পা-বাঁধা অবস্থাতে এমন করে গড়িয়ে নামতে দেখে।

কিন্তু মুখ দিয়ে পোলে পোলে অর্থাৎ আস্তে আস্তে বলল কী করে ভুষুণ্ডা! তার মুখে তো রুমাল ভরা ছিল! এ নিশ্চয়ই তিতিরের কাজ। মেয়েলি দয়া দেখিয়ে মহৎ হতে চেয়েছিল ও। ভুষুণ্ডাকে চেনে না, তাই!

ভুষুণ্ডাকে পড়তে দেখেই ঐ গুলির বৃষ্টির মধ্যেই দুটো লোক দৌড়ে এল ওর দিকে। আমি উজির ব্যারেলটা সামান্য ঘোরালাম। তারপর প্রায় খালি-হয়ে-আসা ম্যাগাজিনটা খুলে নিয়েই নতুন একটা ম্যাগাজিন ঠেলে ঢুকিয়ে দিয়ে ট্রিগার টানলাম। আমার হাতের ঘেন্না-মাখা গুলিগুলো সার-সার গিয়ে ভুষুণ্ডাকে ঝাঁঝরা করে ঠেলে এগিয়ে গিয়ে যেন উপরে ধাক্কা দিয়েই মাটিতে ফেলে দিল বাঁধা হাত-দুটো উপরে তুলে কী যেন বলল ভুষুণ্ডা। শুনতে পেলাম না। সে মাটির উপর লম্বা হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল। আমার হাতের ইজরায়েলি উজি, ভুষুণ্ডাকে একেবারে সুজির হালুয়া বানিয়ে দিল।

চার-চারটি ল্যাণ্ডরোভারই ছেড়ে পালিয়ে গেছে হতভম্ব টর্নাডোর দল। ভুষুণ্ডা ছাড়াও প্রায় পাঁচ-সাতজন লোক বিভিন্ন ভঙ্গিমায় শুয়ে আছে মাটিতে, মরে ভূত হয়ে। অনেকের হাত-পা-মাথা হ্যাণ্ড-গ্রেনেডে ছিন্নভিন্ন, বাকিরা পালিয়েছে অন্ধকারে।

ততক্ষণে পুবের আকাশ লাল হয়ে এসেছে। সেই লালকে আরও লাল করে তুলে তখনও টর্নাডোর বেস-ক্যাম্পের আগুন জ্বলছে দাউদাউ করে। হঠাৎই লক্ষ করলাম, একটা মোটাসোটা কিন্তু দারুণ লম্বা সাহেবকে তাড়া করে নিয়ে ঋজুদা চলেছে। লোকটা বাওবাব গাছের দিকেই দৌড়চ্ছে। ঋজুদার কোমরে পিস্তলটা আছে বটে; কিন্তু রাইফেল নেই। আর ঐ লোকটার হাত একেবারেই খালি। তিতিরও ব্যাপারটা দেখেছে বুঝলাম, যখন তিতিরের সঙ্গের হেহে লোকটাই কাটা দড়ির টুকরোটা হাতে নিয়ে লম্বা-লম্বা পা ফেলে ঋজুদার দিকে দৌড়ে যাচ্ছে দেখলাম। নিশ্চয়ই তিতিরেরই ডিরেকশানে। তখন আমিও আমার সঙ্গের লোকটিকে রাইফেল নিয়ে যেতে বললাম ওদিকে।

দেখতে দেখতে ওরা দুজন ঋজুদাদের ধরে ফেলল। আমার সঙ্গে যে-লোকটা ছিল, সে রাইফেলের কুঁদো দিয়ে ঐ লম্বা লোকটার মাথায় এক বাড়ি কষাল। লোকটা ঘুরে পড়ে গিয়েই ওঠবার চেষ্টা করল।

কে লোকটা? ঐ কি টর্নাডো?

ততক্ষণে ঋজুদা এবং ওরা দুজন মিলে তার হাত বেঁধে ফেলেছে পিছমোড়া করে। রাইফেলের নল ঠেকিয়ে রেখেছে আমার সঙ্গীটি তার পিঠে। সে দু’হাত উপরে তুলে হেঁটে আসছে। এই-ই তাহলে টর্নাডো! নইলে ঋজুদা এত ইম্পর্ট্যান্স দিত না অন্য কাউকে।

সামনে ছড়ানো-ছিটানো নানা জাতের মানুষের লাশ আর দূরের আগুনের দিকে চেয়ে আমার মনে ঐ হেঁটে-আসা টর্নাডো-নামক লোকটার উপর ভীষণ রাগ কুণ্ডলি পাকাচ্ছিল। ওই-ই এতগুলো লোক খুনের জন্যে দায়ী। এবং দায়ী হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ পশুপাখির অহেতুক খুনের জন্যে।

ভুষুণ্ডার থুবড়ে-পড়া মুখে এখন সকালের রোদ এসে পড়েছে। তিতির গুহার ভিতর থেকে বাইরে এল। আমি নেমে গিয়ে ওর পাশে দাঁড়ালাম। আমার দিকে চেয়ে ও বলল, হাই! রুফাস! গুড মর্নিং।

হাসলাম। বললাম, ভেরি গুড মর্নিং, ইনডিড।

ভুষুণ্ডার মুখের উপর রোদ এসে পড়েছিল। রোদ পড়েছিল টেডি মহম্মদ পাহাড়ের গায়েও। ওদিকে তাকিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম আমি। তিতির তো আর আমাদের বন্ধু টেডিকে দেখেনি! ভুষুণ্ডার ভয়াবহতার কথাও তার জানা নয়। ও কী করে জানবে গুগুনোগুম্বারের দেশের ব্যাপার-স্যাপার!

তিতিরও দেখলাম পড়ে-থাকা ভুষুণ্ডার দিকে তাকিয়ে ছিল।

ও আস্তে আস্তে বলল, রুদ্র! তোমার মনের সাধটা তাহলে মনেই রইল।

কী?

গড়ের মাঠের ভেড়াওয়ালার মতো ভুষুণ্ডার মাথাটা কোলের উপর শুইয়ে নিয়ে চুল কাটা আর হল না!

বললাম,সাধ পূরণ হবার অসুবিধে তো দেখি না! চুল কাটতে চাইলে মাথার অভাব কি? তোমার চুল তো ভুষুণ্ডার চুলের চেয়েও অনেক ভাল ও লম্বা। তোমার চুল কেটেই না হয় দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো যাবে।

তিতির বসে পড়ে বলল, হঁ! তাই-ই ভাবছ বুঝি? কত্ত সাধ! এবার একটু কফি-টফি খাওয়ানোর বন্দোবস্ত করো মিস্টার রুদ্রবাবু। একজন মহিলাকে দিয়ে তো যা নয় তাই করিয়ে নিলে!

দ্য গ্রেট অ্যাডভেঞ্চারার মিস্টার ঋজু বোস এগিয়ে আসছিলেন, সাদা পাহাড়ের মতো টর্নাডোকে নিয়ে; আমাদেরই দিকে।

তিতির দু হাত জড়ো করে বলল, ঋজুকাকা! প্লিজ একটু কফি খেতে দাও এবারে। আসতে না-আসতেই নতুন অর্ডার কোরো না কোনো কিছু।

ঋজুদাও এসে বসল আমাদের পাশে। পাইপের পোড়া-ছাই খুঁচিয়ে ফেলতে লাগল। মুখে কোনো ক্লান্তি নেই। ভূত না ভগবান, বুঝি না কিছু!

তিতির লোকগুলোকে বলল টর্নাডোর হাত ও পা বেঁধে গুহার মধ্যে ফেলে রাখতে। তারপর নিজের সুগন্ধি রুমালটাও বের করে দিল আমার দিকে চেয়ে। বলল, মুখে ঢুকিয়ে দিতে।

ঋজুদা বলল, রুদ্র! যা তো আমার জিপটা কাছে নিয়ে আয়। এইখানে। আর জলদি কফি। কফি খেয়ে, সার্গেসন ডবসনকে উদ্ধার করে আন্ গিয়ে। আমি ততক্ষণে দেখি পার্ক হেডকোয়ার্টার্সে আর নীয়েরে সাহেবের সঙ্গে ডার-এ-সালামে একটু যোগাযোগ করা যায় কি না? ওয়্যারলেস সেটটাও বয়ে নিয়ে আয়। এখন আর ভয় নেই। ডবসনের সব ডিনামাইট লাইন করে লাগিয়ে, আমাদের কালীপুজোর চিনেপটকার মতো ঠুকে দিয়ে এসেছি। ওদিকে সব সাফসুফ। নট নড়নচড়ন নট কিছু!

পটকা তোমার ফার্স্টক্লাস, ঋজুকাকা। আওয়াজটা একটু বেশি, এই-ই যা।

আমিও তখনও দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎই, আমাকে জোর ধমক দিল ঋজুদা। কী, করছিসটা কী তুই এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে! যা না! সাধে কি তোকে রুফাস্ বলি?

নেমে যেতে যেতেও দাঁড়ালাম। বললাম, শোনো ঋজুদা, একটা প্রমিস্ করতে হবে।

প্রমিস্? এই সময়? কিসের প্রমিস্?

না। আগে বলো যে করবে!

আহাঃ। কী তা বলবি তো। কী মুশকিল রে বাবা।

এর পরেরবার যখন কোথাও যাব আমরা, তখন আমাদের সঙ্গে কিন্তু ভটকাইকেও নিয়ে আসতে হবে।

তোমার অর্ডার?

আমার আর্জি।

তিতিরের দিকে ফিরে ঋজুদা বলল, তুই কী বলিস, তিতির?

নাইস্ কম্পানি; ভটকাই। যা শুনেছি রুদ্রর মুখে। আমাদের চেয়ে বছর-দুয়েকের বড়; এই যা। ভালই তো। তিনজনের টিমটা কেমন অপয়া-অপয়াও ঠেকে।

ঋজুদা বলল, অপয়া? তিনজনের টিমই তো সবচেয়ে পয়া বলে মনে হচ্ছে।

তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ভটকাই টিমে এলে, ভটকাই-এর উকিল বাদ যাবে। উকিল মক্কেল দুজনকে একসঙ্গে তো আর আনা যাবে না।

নামতে নামতে বললাম, বাঃ। তা তো বলবেই। কাজের বেলায় কাজি! কাজ ফুরোলে পাজি।

ঋজুদা আর তিতিরের হাসির শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম পিছন থেকে।

আমারও খুব হাসি পাচ্ছিল। আনন্দের স্বস্তির হাসি। কত্ত দিন কলকাতা ছেড়ে এসেছি। কাজ শেষ হওয়াতেই মনটা ভীষণ বাড়ি বাড়ি করছে। মা, বাবা, গদাধরদাদা, মিস্টার ভটকাই। কত্ত দিন মায়ের হাতের রাঁধা শুক্তো খাই না, বাবার সঙ্গে ওয়ার্ড-মেকিং খেলি না; গদাধরদাদার হাতের মুগের ডালের খিচুড়ি খাই না; আর চটকাই না ভটকাইকে!

কত্তদিন!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *