রুআহা (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ
দুই
এখন এয়ার-ইন্ডিয়ার ডাইরেক্ট ফ্লাইট হয়েছে ডার-এস-সালামে। গতবার যখন এসেছিলাম, তখন সেশেলস অবধি গিয়ে সেশেলস থেকে তানজানিয়া এয়ারলাইনসের প্লেনে যেতে হত।
ডার-এস্-সালামে কিলিমাঞ্জারো হোটেলে ঋজুদার ঘরে বসে আমাদের কথা হচ্ছিল। আমরা তিনজনে তিনটি সিংগল রুমে রয়েছি পাশাপাশি। হোটেলের সামনে পার্কিং লট। সারি সারি বিদেশী গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। তানজানিয়াতে টুথব্রাশও তৈরি হয় না–তাই, গাড়ি-টাড়ি সবই ইম্পোর্টেড। সামনে রাস্তা। রাস্তার ওপাশে ভারত মহাসাগরের বুক থেকে এক টুকরো ফালি ঢুকে এসেছে। উত্তরে সমুদ্র বেয়ে কিছুটা এগোলেই মোম্বাসা। পুবে জাঞ্জিবার। সারি সারি জাহাজের মাস্তুল দেখা যাচ্ছে। রাস্তা নিয়ে নিগ্রো স্ত্রী-পুরুষ হেঁটে চলছে। গাড়ি যাওয়া-আসা করছে জোরে, বুইক, জুইক্ শব্দ করে। দাঁড়কাক ডাকছে।
আমরা যার যার কিট চেক করে নিচ্ছি। তিতির ভাল ফোটোও তোলে। টেলিফোটো লেন্স-লাগানো আশাহী-পেনটাক্স এম-ই ক্যামেরাটা নিয়ে এসেছে ও। আর এনেছে ওর পয়েন্ট টু-টু রাইফেলটা। এই রাইফেল দিয়ে ছোট হরিণ, গ্যাজেল, খরগোশ ইত্যাদি মারে লোকে। মানুষ মারার জন্যেও আইডিয়াল। তবে, তিতির কখনও মানুষ মারেনি। আমি আর ঋজুদা তো অলরেডি খুনিই হয়ে গেছি। দাগি খুনি। বিষেণদেওবাবুর প্রেজেন্ট একেবারে ঝকঝকে আমেরিকান কোল্ট পিস্তলটাও নিয়ে এসেছে ও। গোটা ছয়েক এক্সট্রা ম্যাগাজিন। লোড করা থাকলে, পর-পর ঢুকিয়ে দিলেই হল।
আমার পয়েন্ট টু-টু স্প্যানিশ লামা পিস্তলটাও নিয়ে এসেছি। অ্যালবিনোর রহস্য ভেদ করার সময়ে যেটা আমাকে প্রেজেন্ট করেছিল ঋজুদা। আর বাবার সেকেণ্ড লাইসেন্সে চড়ানো, থার্টি-ও-সিক্স ম্যানলিকার শুনার। ঋজুদা যে থ্রী-সেভেনটিন পিস্তলটা মুলিমালোঁয়াতে নিয়ে গেছিল সেটাই এনেছে। সাইলেন্সারটাও। আর ফোর-সেভেনটি ডাবল-ব্যারেল রাইফেলটা। গণ্ডার, হাতি কি সিংহ, কি লেপার্ড বা চিতা যদি গায়ে পড়ে ঝামেলা বাধাতে আসে, তাদের মোকাবিলার জন্যে। তাছাড়া, আমাদের সঙ্গে আছে জাইসের বাইনাকুলার। তিতিরের সঙ্গে একটা জাপানি বাইনাকুলার। কাঠমাণ্ডু থেকে ওর বাবা ওকে এনে দিয়েছিলেন।
এবার আমরা জানি না, কোনদিকে যাব। কতদিন থাকব। কিসে করে যাব। সবই ঠিক হবে আরুশাতে পৌঁছে ভুষুণ্ডার খোঁজ পেলে। তাছাড়া, এবার আমাদের সঙ্গে আছে ছদ্মবেশ নেবার সরঞ্জাম। ডার-এস-সালাম থেকে আরুশার প্লেনে আমরা নিজেদের নামে ট্র্যাভেল করব না। আরুশার হোটেলেও আলাদা আলাদা নামে ঘর বুক করা হয়েছে। মাসাইদের মতো আমরাও পুরনো নাম ইচ্ছেমতো বদলে ফেলব।
হোটেলের বিল পেমেন্ট করেই, ঋজুদার এক তানজানিয়ান বন্ধুর গাড়ি নিজেরা চালিয়ে সমুদ্রের ধারে নির্জনে, যেদিকে প্রেসিডেন্ট নীয়েরের বাড়ি, সেখানে সী-বীচে ছদ্মবেশ নিয়ে, আলাদা আলাদা ট্যাক্সি নিয়ে ডার-এস-সালাম এয়ারপোর্টে পৌঁছব। ঋজুদার এই বন্ধুই গতবারে মীরশ্যাম পাইপ প্রেজেন্ট করেছিল ঋজুদাকে।
গতবার ভুষুণ্ডার গুলি খেয়ে আহত হবার পরে ঋজুদা নানা লোকের সঙ্গে যোগাযোগ করে এ-বিষয়ে একেবারে নিশ্চিত হয়েছে যে, ভুষুণ্ডা একটা যন্ত্রমাত্র। পুব-আফ্রিকার জানোয়ারদের মাংস ও চামড়া, হাতির দাঁত এবং গণ্ডারের খড়্গের চোরাচালানের ব্যবসার পিছনে আছে সব বাঘা বাঘা লোক। অথচ কেউই জানে না, তারা কারা। তাদের অর্থ, প্রতিপত্তি, সুনাম কিছুরই অভাব নেই।
ঠিক হয়েছে, আমি একজোড়া ফলস-দাঁত আর লাল পরচুলা পরব এবং কানাডাতে সেটল-করা একজন অল্পবয়সী অ্যাংলো-ইণ্ডিয়ান টুরিস্ট হিসাবে আরুশাতে পৌঁছব। তিতির সাজবে একটি ব্লণ্ড, ফ্রেঞ্চ মেয়ে। প্যারিসের কলেজের ছাত্রী।
তানজানিয়া কমুনিস্ট দেশ। এখানে আমেরিকানরা কম আসে। তিতির কাজ চালানোর মতো ফ্রেঞ্চ জানে। ও এই দেশে নতুন যাত্রী। আমিও নতুন। তাই আমরা আরুশা পৌঁছবার পরদিনই আরুশার হোটেলের লাউঞ্জে আমার সঙ্গে তিতিরের আলাপ হবে; হঠাৎই। আমরা বন্ধু হয়ে যাব। ঋজুদা সাজবে একজন দিল্লিওয়ালা বুড়ো সর্দারজি। বয়স্ক, চুল-দাড়ি সাদা, হাতে লাঠি; তানজানিয়াতে এক্সপোর্ট বিজনেস করার ধান্দায় এসেছে। আমাদের তিনজনেরই জাল পাসপোর্ট করে নেওয়া হয়েছে। তানজানিয়ান এবং ইণ্ডিয়ান ফরেন ডিপার্টমেন্টের এবং হোম ডিপার্টমেন্টের সম্মতি নিয়ে। আমাদের আসল পাসপোর্ট এখানেই রেখে যাব ঋজুদার ঐ বন্ধু মিঃ লিলেকাওয়ার কাছে। রক্ষাকবচ আছে তিনজনেরই। একটি করে ছোট্ট কার্ড। সে-রকম বিপদ না ঘটলে সেই কার্ড দেখিয়ে এখানে কোনো পুলিশের সাহায্য নেব না বলেই ঠিক করেছি আমরা। কারণ, বড় বড় অপরাধীদের সঙ্গে পুলিশের যোগসাজশ সব দেশেই থাকে। ভুষুণ্ডার ব্যাপারটা আমরা নিজেরাই হ্যাণ্ডল করব।
ঋজুদা বলেছিল, ওর একটা ঠ্যাং ভেঙে দিয়েই ছেড়ে দেবে। আমি বলেছি, টেডির মৃত্যুর বদলা না-নিয়ে আমি ওকে ছাড়ব না। যে-রাইফেল দিয়ে অনেক শুয়োর মেরেছি ছোটবেলা থেকে, তা দিয়েই ভুষুণ্ডা-শুয়োরকে আমি শেষ করব। কোনো ছাড়াছাড়ি নেই দেখা পেলে, তাতে প্রাণ যায় তো যাবে। তিতির আমাদের সাহায্য করবে।
তিতিরকে ভুষুণ্ডার সমস্ত ছবি দেখিয়ে আমরা চিনিয়ে দিয়েছি। তাছাড়া, ওর ব্যাগেও একটা পোস্টকার্ড সাইজের ছবি দিয়ে দিয়েছি।
ঋজুদার নাম হয়েছে সর্দার গুরিন্দার সিং। অতএব, নিবাসও ডিফেন্স কলোনি; নিউ দিল্লি। আমার নাম জন অ্যালেন। অ্যাংলো ইণ্ডিয়ান। ছোটবেলা কেটেছে বিহারের ম্যাকলাক্সিগঞ্জের অ্যাংলো-ইণ্ডিয়ান কলোনিতে। এখন ক্যাডার টোরোন্টোর ডন-ভ্যালিতে একটি ফ্ল্যাটে থাকি। এঞ্জিন-ড্রাইভারের কাজ করি টিউব রেলে। ছুটিতে টাকা জমিয়ে আফ্রিকা দেখতে এসেছি।
তিতিরের নাম ক্রিস্ ভ্যালেরি। প্যারিসেই ওর জন্ম। জুওলজির ছাত্রী। আফ্রিকান হাতি সম্বন্ধে জানতে-শুনতে এবং রিসার্চ করতে এসেছে ও!
তিতির বলল, রুদ্র, তোমার হঠাৎ ব্যথা লাগলেই তুমি বল উঃ বাবাঃ। কক্ষনো বলবে না, বলবে, আউচ! বুঝেছ! তুমি অ্যাংলো-ইণ্ডিয়ান।
ঋজুদা বলল, ক্রিস! রুদ্র বলে তুমি যার সঙ্গে কথা বলছ, তার নাম জন অ্যালেন। এখন থেকে যার-যার নতুন নামেই ডাকাডাকি করবে, নইলে মুশকিল হয়ে যাবে। আমাদের কমন ল্যাঙ্গুয়েজ এখন থেকে ইংরিজি। অন্যদের সামনে। বুঝেছ! একবারও ভুল কোরো না। এসো, একবার বরং রিহার্সাল দিয়ে নেওয়া যাক।
আমি বললাম, স্টার্ট।
তিতির বলল, মিঃ সিং, হাউ বাউট দ্যা আন-এণ্ডিং পাওয়ারশেডিং ইন ক্যালকাটা? উ্য সেইড, ঊ্য হ্যাভ অ্যান অফিস ইন ক্যালকাটা! ওয়ান অব মাই ফ্রেণ্ডস্ লিভস্ দেয়ার। হি ওলওয়েজ কমপ্লেইন বাউট দ্যাট।
ঋজুদা বলল, হানজি। উ্য আর রাইট জি! দ্যা কণ্ডিশান্ ইজ ভেরি টাইট।
বলেই বলল, মাই ইংলিশ ইজ নাট গুড।
তিতির হাততালি দিল।
আমি এবার বললাম, মিস ভ্যালারি, ডু উ হ্যাভ এনি পাঞ্জাবি ধাবাজ ইন ইওর কানট্রি?
তিতির ভুরু কুঁচকে বলল, পাঁর্দো মঁসিয়ে? নেভার হার্ড অফ সাচ্ থিংগস। হোয়াট ইজ ইট? আ টেম্পল অর সামথিং?
ঋজুদা বলল, নানজি। আ ধাবা ইজ আ প্লেস হ্যোয়ার উই সীট অন চারপাইজ, অ্যাণ্ড রেল্লিশ আওয়ার রোটি–তাড়কা অ্যাণ্ড রাজমা দাল।
হোয়াট ইজ টাড়কা-রাজমা-দাল? তিতির ভুরু কুঁচকে শুধোল।
হানজি। হ্যাভনট হার্ড অফ? স্ট্রেঞ্জ! ছোড়ো জি। ক্যোই গ্যাল নেহি। বাট তাড়কা-রাজমা-ডাল গিভস উ্য জোস্ত। রিয়্যালি জি?
ঋজুদার কথা শেষ হতে না-হতেই ফোনটা বাজল। মিস্টার শাহ বলে একজনের ফোন। ফোন রেখে ঋজুদা বলল, আমাদের নেমন্তন্ন করেছেন গুজরাটি ভদ্রলোক ডিনারে।
ব্যাপারটা কী তা ভাল করে জানবার আগেই আবার ফোন। এবার লিলেকাওয়া। ঋজুদার বন্ধু।
লিলেকাওয়া বললেন যে, ওঁর সঙ্গে নাকি আগে মিঃ শাহর কথা হয়নি কোনো। ঋজুদাকে ফোন করার পরই উনি লিলেকাওয়াকে ফোন করেছিলেন। তবে ডিনারের অনুরোধ জানালেন লিলেকাওয়াও, মিঃ শাহর হয়ে।
বন্ধুর বন্ধুকে জোর করে খাওয়ানোর এমন আগ্রহ তো বড় একটা দেখা যায় না! গম্ভীরমুখে ঋজুদা বলল।
তিতির বলল, কী করবে ঋজুকাকা? যাবে?
যাব না? কেন? গুজরাটি খাবার আমার খুব ভাল লাগে। আমি বললাম।
ঋজুদা হাসিমুখে পাইপটাতে তামাক ভরতে ভরতে তিতিরকে বলল, যাওয়াই যাক। সাধা লক্ষ্মী, পায়ে ঠেলতে নেই। হ্যাঁ। একটা কথা–।
রাত পৌনে-আটটায় রিসেপশান থেকে ফোন।
লিলেকাওয়া এবং মিস্টার শাহ দুজনেই এসে গেছেন। নীচে নেমে দেখলাম, বেশ মোটাসোটা, বেঁটে একজন গুজরাটি ভদ্রলোক কালো-রঙা থ্রী-পিস-স্যুট পরে দাঁড়িয়ে আছেন। মুখে ইয়া মোটা সিগার। চিমনির মতো ধোঁয়া ছাড়ছেন সব সময়। বোঁটকা গন্ধ সিগারটার! ওঁর সাদা-রঙা ঝকঝকে মার্সিডিস গাড়িতে আমি আর তিতির উঠলাম। ঋজুদা মিস্টার লিলেকাওয়ার সঙ্গে। মিনিট-কুড়ির মধ্যেই আমরা একটি ফাঁকা কিন্তু খুব পশ এলাকায় চলে এলাম। দারুণ দারুণ সব বাড়ি; বাংলো। আলো-বসানো বিরাট গেট-ওয়ালা ছবির মতো একটা বাংলোতে গাড়ি ঢুকল। টুপি-পরা শোফার দরজা খুলে দিল।
নানা জানোয়ারের ফোটোতে সাজানো বিরাট ফিকে খয়েরি-রঙা কার্পেটে মোড়া ড্রয়িংরুমে আমাদের সকলকে নিয়ে বসালেন মিস্টার শাহ। ঋজুদা ও মিস্টার লিলেকাওয়ার সঙ্গে কথাবার্তায় জানা গেল যে, মিস্টার শাহ কফি প্ল্যাটেশানের মালিক, তাছাড়া আরও নানান ব্যবসা তাঁর। একজন শখের ফোটোগ্রাফারও উনি। নানা জীবজন্তুর ছবি তোলেন সময় পেলেই। বন-জঙ্গল খুবই নাকি ভালবাসেন। ওঁর ইচ্ছে, ভারতবর্ষের বিভিন্ন জঙ্গলে পরপর অনেকগুলি টুরিস্ট লজ এবং মোটেল খুলবেন, এবং পৃথিবীর তাবৎ জায়গা থেকে আসা টুরিস্টদের একাংশকে ভারতেও পাঠাবেন। একটি কোম্পানি গড়বেন তিনি, নাম দেবেন জাঙ্গল মোটেলস্ (ইণ্ডিয়া) লিমিটেড। তিনি ঋজুদাকে সেই কোম্পানির ডিরেক্টর করতে চান বলেই নাকি আজকের এই হঠাৎ নেমন্তন্ন।
মিস্টার শাহ আর ঋজুদারা কোম্পানি এবং আয়কর আইনের নানা কচকচি নিয়ে আলোচনা করছিলেন। সে-সবের একবর্ণও আমি আর তিতির বুঝি না এবং বোঝবার বিন্দুমাত্র ইচ্ছেও ছিল না আমাদের। তিতির আমার দিকে তাকিয়ে ইশারা করল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে মিস্টার লিলেকাওয়াকে বললাম, এক্সকিউজ মী আঙ্কল, মে উই টেক ইওর কার ফর হাফ-এন আওয়ার?
ঋজুদা আমার চোখে তাকাল। ইংরিজিতে বলল, কোথায় যাবি তোরা?
এমনিই একটু ঘুরে আসতাম। তোমাদের কথার তো কিছুই বুঝছি না।
মিস্টার লিলেকাওয়া বললেন, বাই ওল মীনস, বলে চাবিটা দিলেন আমাকে।
মিস্টার শাহ বললেন, উগাণ্ডার সঙ্গে যুদ্ধের পর প্রচুর আর্মস এসে গেছে তানজানিয়াতে। খুব ছিনতাই ডাকাতি হচ্ছে চারধারে, তোমরা ছেলেমানুষ, রাতে একা একা যেও না।
আমি কিছু বলার আগেই তিতির বলল, উই ক্যান টেক কেয়ার অব আওয়ারসেলভস। থ্যাঙ্ক ঊ্য।
মিঃ শাহ আমাদের দিকে ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে পরক্ষণেই হেসে বললেন, তবে যাও; সাবধানে যেও।
লিলেকাওয়া এখানে ইউ-এন-ও’র চাকরি করেন। তাঁর লাল-রঙা টোয়াটো গাড়ির দরজা খুলে ড্রাইভিং সীটে বসে তিতিরকে পাশের দরজা খুলে দিলাম। তিতির উঠে বসে বলল, কোথায় যাবে?
বললাম, লক্ষ করেছিলে? ড্রইংরুমের দেওয়ালে একটা ছবি আছে, ক্যাম্পফায়ারের সামনে চেয়ারে বসে মিঃ শাহ সিগার টানছেন। পিছনে কতগুলো খড়ের ঘর। ঐ জায়গাটা আমার ভীষণই চেনা-চেনা লাগল। ভীষণ।
কোন জায়গা সেটা?
ঠিক কিনা জানি না, তবে মনে হচ্ছে গুগুনোগুম্বারের দেশে ভুষুণ্ডা সোডা লেকের পাশে যেখানে আমাদের নিয়ে গেছিল, যেখানে টেডিকে বিষের তীর দিয়ে মেরেছিল সেই জায়গা ওটা। ওয়াণ্ডারাবোদের সেই ডেরা।
বল কী? তিতির রীতিমত এক্সাইটেড হয়ে বলল। তুমি শিওর?
মনে হচ্ছে। ভুলও হতে পারে।
বাবাঃ। শুনেই আমার ভয়-ভয় করছে। তিতির বলল।
আমারও। সব পুরনো কথা মনে পড়ে যাচ্ছে।
এখন কোথায় যাবে? মতলবটা কী তোমার?
কোথাও না। গাড়িটাকে ঐ সামনের গাছগুলোর নীচে পার্ক করে রেখে, মিঃ শাহর বাংলোর চারপাশে ঘুরে দেখব। টর্চ আছে তোমার সঙ্গে?
হুঁ। তবে, চাঁদও আছে। তিতির বলল।
তা আছে।
যখন পথের পাশের বড় বড় গাছগুলোর ছায়ার অন্ধকারে গাড়িটাকে রেখে, লক্ করে নামলাম, তখন গাড়ির লাল রঙ রাতের অন্ধকারে কালো মনে হওয়ায় ওখানে যে গাড়ি আছে তা বোঝা যাচ্ছিল না। আমরা সাবধানে হেঁটে বাংলোটার পিছনে এলাম। পথে লোকজন নেই। বড়লোকেদের পাড়া। অনেকক্ষণ বাদে বাদে দু-একটি গাড়ি হুমহাম্ শব্দ করে হেডলাইট জ্বেলে চলে যাচ্ছে। বাংলোর পিছনের বাউন্ডারি-ওয়ালের গায়ে কতগুলো আফ্রিকান টিউলিপের গাছ, আমরা দেশে যাকে আকাশমণি বলি। সেই গাছগুলোর ছায়ায় ছোট্ট একটা গেট। তালাবন্ধ, ভিতর থেকে। তিতিরকে ইশারা করে আমি গেটের লোহা বেয়ে উপরে উঠে নামলাম। তিতিরও গেট ডিঙোল আমার পেছন পেছন।
বিরাট লন। নানারকম ফুল ও ফলের গাছ। জাঞ্জিবারের দারচিনি লবঙ্গ থেকে গোরোংগোরোর মরা আগ্নেয়গিরির পাশের উঁচু পাহাড়ের অর্কিড পর্যন্ত। বাংলোটার পেছনদিকে লাগোয়া বাবুর্চিখানা, প্যানট্রি, সার্ভেন্টস্ কোয়ার্টারস্। আলো জ্বলছে। রান্নাঘরের উপরের মেটে-লালরঙা ফায়ারব্রিকে তৈরি চারকোনা চিমনি থেকে মিশকালো ধোঁয়া বেরোচ্ছে দুধসাদা চাঁদনি রাতে। বাংলোটার বাঁ পাশে একটা আলাদা বাড়ি অথবা গুদাম। সেখানটা বেশ অন্ধকার, গাছপালার ঘন ছায়ায়। চাঁদের আলো পড়ে ছাই-রঙা গুদামটাকে কেমন রহস্যময় বলে মনে হচ্ছে। আমি ও তিতির পায়ে পায়ে ওদিকে গিয়ে পৌঁছতেই কোত্থেকে একটা কুকুর গুর-র-র-র-র করে উঠল। আমার পেটের মধ্যেও গুর-র-র-র করে উঠল। তাকিয়ে দেখলাম একটা কালো লাব্রাডর, গান-ডগ আমাদের দেখছে লেজ উঁচিয়ে কান খাড়া করে। তার হাবভাব মোটেই ভাল নয়। তিতির বোধহয় ওর রুমালটা পাকিয়ে কুকুরটার মুখে পুরে দেবার মতলব করছিল, এমন সময় কুকুরটা আরও একবার ডাকল। সংক্ষিপ্ত চাপা ডাক। সঙ্গে সঙ্গেই বাংলোর বিভিন্ন দিকের দেওয়ালে ফিট-করা অনেকগুলো সার্চ লাইট জ্বলে উঠল একসঙ্গে।
অলিভ-গ্রীন কর্ডুরয়ের ট্রাউজার ও কোট পরা প্রায় সাত ফিট লম্বা একজন ষণ্ডামার্কা নিগ্রো যেন মাটি খুঁড়েই উঠে আমাদের দিকে আস্তে আস্তে এগিয়ে এসে খসখসে গলায় ভাঙা-ভাঙা ইংরিজিতে বলল, জাম্বো!
আমরা দুজনেই একসঙ্গে বললাম, হু-জাম্বো।
লোকটা এগিয়ে এসে বলল, ওহে, ডিক ডিক-এর বাচ্চারা! তোমরা কারা? এখানে কোন্ মহৎ কম্মো করতে আসা?
আমি গম্ভীর গলায় তার মুখের দিকে মুখ তুলে বললাম, আমরা মিঃ শাহর অতিথি। ডিনারে এসেছি। বাগান দেখছিলাম।
তাইই? তবে অতিথিরা গেট টপকে ঢুকে সচরাচর তো হোস্টের বাগান-টাগান দেখেন না। এত কষ্ট করার কী দরকার ছিল? মিঃ শাহকে বললেই তো হত। বলেই, পিছনে দাঁড়িয়ে আমাদের প্রায় ঠেলতে ঠেলতেই ঐ রহস্যময় অন্ধকার বাড়িটার দিক থেকে সরিয়ে আনল। তারপর আমাদের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে খুব ঠাণ্ডা ঠাট্টার গলায় বলল, তোমরা খুব অ্যাডভেঞ্চার ভালবাসো, তাই না? জোড়া ডিক-ডিক?
হ্যাঁ। তিতির বলল।
আমিও। খুব ভালবাসি অ্যাডভেঞ্চার! বলেই, লোকটা আমাদের দুজনের দিকে তাকাল। তারপর হঠাৎ একবার হাততালি দিল। সবকটা সার্চলাইটের আলো একসঙ্গে নিভে গেল।
তিতির বলল, তোমার নাম কী?
লোকটা হাসল, অদ্ভুতভাবে। সোনা বাঁধানো তিন-চারটে দাঁত চাঁদের আলোতেও ঝিকমিক্ করে উঠল। বলল, আমার নাম ওয়ানাবেরি। চলো, তোমরা যেখানে গাড়ি রেখেছ, সেখানেই যাই। আজ বাইরে বেশ ঠাণ্ডা। গাড়িতে বসেই তোমাদের একটা গল্প বলব।
গল্প? কিসের গল্প? তিতির ভয়-মেশানো কৌতূহলের সঙ্গে শুধোল।
ওয়ানাকিরি, ওয়ানাবেরির গল্প।
গা ছমছম করে উঠল। তিতির ওর বাঁ হাতটা আমার দিকে এগিয়ে দিল। আমি ওর হাতটা হাতে নিয়ে দেখলাম একেবারে ঠাণ্ডা হয়ে গেছে হাতটা।
ছোট গেটটার কাছে পৌঁছতেই লোকটা পকেট থেকে চাবি দিয়ে গেটের তালা খুলল। তারপর কথা না-বলে গেট থেকে বেরিয়ে গাড়ির দিকে এগোতে লাগল।
তিতির বাংলায় বলল, আমরা কোথায় গাড়ি রেখেছি তা পর্যন্ত ও দেখেছে! সবই দেখেছে!
হুঁ। বলে, আমি কোমরের কাছে হাত দিয়ে, যেন হঠাৎই হাত লেগে গেছে এমন করে পিস্তলটার হোলস্টারের বোতাম খুললাম।
লোকটা যেন নিজের মনেই হেসে উঠল। বলল, ওয়ানাবেরিকে মারা যায় না। ওয়ানাবেরি কখনও মরে না, জানো?
জানি। তিতির বলল।
জানো? বলেই লোকটা তিতিরের দিকে বিচ্ছিরি চোখে তাকাল।
অবাক চোখে তিতিরের দিকে তাকালাম আমি।
তিতির বলল, তুমি এই বাংলোতেই থাকো?
হ্যাঁ। মিস্টার শাহ আমার মালিক।
তুমি কী কাজ করো?
অকাজ।
মানে?
মানে নেই। সব কথার মানে হয় না।
গাড়ির কাছে পৌঁছে, গাড়ি খুলে ওকে সামনের সীটে বসতে বলে তিতিরকে পিছনে বসতে বললাম। কেন বললাম, তিতির নিশ্চয়ই বুঝল। প্রয়োজন হলে, ওর ঘাড়ে পিছন থেকে পিস্তলের নল ঠেকাবে।
লোকটা একটা সিগারেট ধরাল পকেট থেকে প্যাকেট বের করে। সিগারেটের গন্ধটা বিচ্ছিরি। তারপর জানালার কাচ নামিয়ে, ধোঁয়া ছেড়ে, জানালাটা খুলেই রাখল।
গাড়িতে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকাতে বেশ ঠাণ্ডা লাগতে লাগল আমাদের। অথচ, লোকটার ভ্রূক্ষেপ নেই। চাঁদের আলো গাছগুলোর ফাঁক-ফোঁক দিয়ে এসে পড়ে আলোছায়ার কার্পেট বুনেছিল গাড়ির বনেটের উপরে। চারপাশে। লোকটা সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে, নিজের মনেই, যেন নিজেকে শোনাবার জন্যেই, নিচু স্বরে বলতে আরম্ভ করল :
অনেক, অনেক দিন আগে মৃত্যু ঘুরে বেড়াচ্ছিল আফ্রিকার বনে প্রান্তরে। কোন্ মানুষকে ছিনিয়ে নিয়ে যাবে সেই খোঁজে। আর মানুষদের লোভ দেখানোর জন্যে তার পিছনে পিছনে একটা খুব মোটা চর্বি-নদনদে ষাঁড়কে হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল তার গলায় দড়ি বেঁধে।
মৃত্যুর শুধু একটিই মাত্র জিনিস চাইবার ছিল। তা হচ্ছে, জীবন। যে ঐ ষাঁড়টাকে নেবে, এক বছর পরেও ওয়ানাবেরির নামটা তাকে মনে রাখতে হবে। এক বছর পরেও যদি সে ওয়ানাবেরির নাম মনে না রাখতে পারে, তবে তাকে সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু নিয়ে যাবে ছিনিয়ে।
একটা লোক ছিল; ভারী গরিব, খাওয়া জুটত না তার। নাম ছিল তার মাকড়শা। খিদের জ্বালায় মাকড়টা ঐ ষাঁড়টাকেই ওয়ানাবেরির কাছ থেকে নিয়ে বাড়িতে গিয়ে কেটেকুটে কদিন ধরে সবাই মিলে চর্ব্য-চোষ্য করে খেয়ে তার বউ-ছেলেকে বলল, শোনো, তোমরা আজ থেকে এই গানটি সবসময় গাইবে–ওয়ানাকিরি ওয়ানাবেরি; ওয়ানাকিনি– ওয়ানাবেরি; সবসময়, যাতে কখনও।
হঠাৎ তিতির লোকটাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, গাড়ি স্টার্ট করো রুদ্র। চলো বাংলোতে ফিরি। এ-সব গাঁজাখোরি গল্প শোনার সময় নেই।
গাড়ি স্টার্ট করতেই ওয়ানাবেরি চমকে উঠল। বিরক্ত হয়ে তাকাল আমাদের দিকে মুখ ঘুরিয়ে। দুর্বোধ্য ভাষায় বলে উঠল, নানি আনি ওনেগা?
হঠাৎ তিতির উত্তরে বলে উঠল, আম্বোনা, উনাসেমাসেমা টু?
ওয়ানাবেরি চমকে গিয়ে বলল, পোলেনি।
তিতির খুব মিষ্টি গলায় বলল, টোয়েন্টিনী।
ওয়ানাবেরি স্টীয়ারিং-ধরা আমার হাতে হাত রেখে বলল, কাওয়া হেরিনি।
আমি তাকিয়ে রইলাম তার মুখে।
সেই কিম্ভুতকিমাকার হাওয়া-পাওয়া ভাষার কিছুই না-বোঝায় বোকার মতো আমি তাকিয়ে রইলাম তার মুখে। তিতির বলল, রুদ্র, ও গুডবাই করে নেমে যেতে চাইছে। ওকে নামিয়ে দাও।
আমি গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাঁ দিকের দরজা খুলে দিলাম।
ওয়ানাবেরি তখনও অবাক চোখে তিতিরের দিকে তাকিয়েছিল। অবাক আমিও কম হইনি।
লোকটা নেমে, দরজাটা বন্ধ করতে করতে আবার বলল, হেরিনি।
হেরিনি! তিতির বলল।
ওয়ানাবেরি এবার ভাঙা ইংরিজিতে আমাদের দুজনকেই বলল, রিমেম্বার ওয়ানাবেরি। ওয়ানাকিরি–ওয়ানাবেরি। ওয়ানাকিরি–ওয়ানাবেরি। ডোন্ট উ্য ডেয়ার টু ফরগেট মাই নেম। বিকজ, আই উ্যল কাম ব্যাক–
আমার গা শিউরে উঠল। গাড়িটা ঘুরিয়ে নিয়ে মিঃ শাহর বাংলোর সামনের গেটের দিকে চললাম।
তিতির বলল, দেখলে তো রুদ্র, ওয়েস্ট-ইণ্ডিজের ক্রিকেটার হল-এর চেয়ে লম্বা লোকটা। কথা বলছিল না, যেন বাউন্সার দিচ্ছিল।
তুমি তো দেখছি, সোয়াহিলিতে রীতিমত পণ্ডিত তিতির। কী কথা বললে ওর সঙ্গে?
নানি আনি ওনেগার মানে হচ্ছে, কে কথা বলছে? আর আমবোনা উনাসেমাসেমা টু মানে হচ্ছে, মিছিমিছি বকবক করছ কেন?
আর পোলেনি মানে? আমি জিজ্ঞেস করলাম।
পোলেনি মানে, সরি। আর টোয়েন্টিনী মানে হচ্ছে, চলো, আমরা এবার যাই।
বাঃ। সত্যিই তুমি এবার আমাদের সঙ্গে থাকায় অনেক সুবিধা হবে।
অসুবিধাও কম হবে না। আমি যে মেয়ে! তিতির আমার দিকে মুখ ঘুরিয়ে, চুল ঝাঁকিয়ে বলল।
আমি জানি, কিছুদিন ও আমাকে এমনি করেই ঠাট্টা করবে, যতদিন না আমিও প্রমাণ করতে পারছি যে, শহরের মধ্যে ব্বাওয়া-গ্বাওয়া করে গরমের দুপুরে তেষ্টা পাওয়া মুরগির মতো মুখ হাঁ করে দু কলি সোয়াহিলি বলাতে আর জঙ্গলের মারাত্মক পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার মধ্যে অনেক তফাত। তিতির যে মেয়েই, তা ও শিগগিরই বুঝতে পারবে। গর্ব যাবে ওর।
আমরা যখন বাংলোয় ঢুকলাম, আমাদের কেউই লক্ষ করল না। ঋজুদারা তিনজনে এমনই আলোচনাতে ব্যস্ত।
তিতির হঠাৎ বলল, এজন্যই বলে, মেয়েরা হল গিয়ে বাড়ির লক্ষ্মী। বাংলোটা কেমন লক্ষ্মীছাড়া-লক্ষ্মীছাড়া দেখতে পাচ্ছ রুদ্র? সবই আছে, কিন্তু কী যেন নেই। মিঃ শাহ ব্যাচেলর কি না?
হু। আমি বললাম।
ভাবলাম মেয়েটা মায়েদের মতোই পাকা-পাকা কথা বলে। মেয়েরা ঐ রকমই হয়। ছোটবেলা থেকেই। ঋজুদা যে কেন এসব ঝুট ঝামেলা সঙ্গে আনল। আমার নজর ছিল কিন্তু দেওয়ালের সেই ফোটোটার উপর। আরও অনেক ফোটো ছিল।
প্রায় ঘণ্টাখানেক পর খাবার এল। গরম গরম পুরি, ভাজি, আচার নানারকমের, কাড়াই। দারুণ। কিন্তু খাবার আগেই গ্লাস-গ্লাস জিরাপানি খেয়েই পেট ফুলে গেছিল আমাদের। ঋজুদা খাবার সময় কেমন অন্যমনস্ক ছিল। বলল, লিলেকাওয়া, আমরা তাড়াতাড়িই যাব একটু। কাল ভোরেই তো চলে যাচ্ছি মোম্বাসা।
মিঃ শাহ বললেন, মোম্বাসা? হোয়াই মোম্বাসা? বলেই বললেন, ওহ্, ইয়েস, মোম্বাসা! মোম্বাসা!
হোটেলে লিলেকাওয়া আমাদের নামিয়ে দিয়ে গেলেন। আশ্চর্য হলাম, ঋজুদা কাল ওঁকে গাড়ির বন্দোবস্ত করা সম্বন্ধে কিছুই না-বলায়। ওঁকে গুডনাইট করে হোটেলের লবিতে ঢুকে ঋজুদা বলল, আমরা ট্যাক্সি নিয়েই চলে যাব, বুঝলি?
ঋজুদার মুখের দিকে তাকিয়ে রহস্যের গন্ধ পেয়ে কিছু না বুঝেই বললাম, বুঝলাম।
প্রথমে ঋজুদার ঘরেই ঢুকলাম আমরা সবাই। ঘরে ঢুকেই ঋজুদা নাক টেনে বলল, হাঁউ মাঁউ খাঁউ, নতুন গন্ধ পাঁউ।
আমি বললাম, সিগারেটের গন্ধ। তানজানিয়া সিগারেটের।
তিতির বলল, রাইট। তার মানে, ঘরে কেউ ঢুকেছিল।
নাও হতে পারে। হয়তো ভুল আমাদের। ঋজুদা বলল।
তিতির বলল, আমার ঘরে গেলেই বোঝা যাবে।
কী করে?
ঘর থেকে বেরুবার আগে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ভাল করে গায়ে-মাখা কিউটিকুরা পাউডার ছড়িয়ে এসেছিলাম।
আমি তো শুনে অবাক। ঋজুদা কথা না বলে আমার দিকে তাকাল।
তিতির তাড়াতাড়ি নিজের ঘরের দিকে চলল, আমিও ওর পিছন পিছন। দরজা খুলতেই দেখা গেল পাউডার ছড়ানো আছে এবং কারোই পায়ের দাগ নেই। কিন্তু ঘরে ঢুকে আলো জ্বেলেই তিতির বলল, কোনো লোক ঢুকেছিল। কারণ আমার পাউডারের টিনটা দরজা থেকে ছুঁড়ে দিই যখন কার্পেটে, তখন মুখটা ছিল জানালার দিকে, আর এখন আছে দরজার দিকে। তাছাড়া যেখানে ছিল, সেখান থেকে অনেকটা বাঁ দিকে সরে আছে এখন।
ঘরে ঢুকেই আমি চমকে উঠলাম। তিতিরের ঘরের কাঠের টেবিলটার উপর ওয়াণ্ডারাবোদের ছোট্ট তীর দিয়ে গাঁথা একটা ছোট্ট চিঠি। বিচ্ছিরি হাতের লেখায় লাল কালি দিয়ে লেখা। গো হোম উ্য প্রেটি গার্ল। অর বী বেরিড ইন্ দ্যা উইল্ডারনেস্ অব আফ্রিকা।
আমার গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠল। তিতিরের দিকে তাকিয়ে মনে হল, ওরও মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। এমন সময় ঋজুদা এসে ঘরে ঢুকল। আমাদের দিকে তাকিয়েই ব্যাপারটা বুঝে নিয়ে চিঠিটা পড়ল। তারপর বলল, কী করবি তিতির? কাল বোম্বে চলে যাবি?
তিতির খুব জোরে হেসে উঠল। বলল, মাথা খারাপ তোমার ঋজুকাকা? ইফ আ ক্যাট হ্যাজ নাইন লাইভস্, আ সেৎসী ফ্লাই হ্যাজ টেন লাইভস, দেন তিতির হ্যাজ ইলেভেন লাইভস। চলে যাবার জন্যেই যেন এসেছি! খুব বললে ত তুমি! সবে কেস জমে উঠছে আর এখনই যেতে বলছ? বলেই, ঋজুদার দিকে চেয়েই সোয়াহিলিতে বলল, আলিনিপিগা কোফি লা উশো?
ঋজুদাও খুব জোরে হেসে উঠল। বলল, আশান্টে! আশান্টে!
আশান্টে মানে, থ্যাঙ্ক ঊ্য, আমি বুঝলাম; কিন্তু তিতির কী যে বলল, তার কিছুই বুঝলাম না। মেয়েটা বড়ই মুশকিলে ফেলছে আমাকে থেকে-থেকেই।
ঋজুদা আমার অবস্থা বুঝে নিয়ে বলল, কেমন বুঝছ, রুদ্রবাবু? কিছুই বুঝছ না তো? কথাটির মানে হল, লোকটা আমার গালে চড় কষিয়েছে। তিতির চড় খেয়েও রা কাড়বে না এমন পাত্রী মোটেই নয় সে; সুতরাং…ঠিকই আছে। লেট আস বার্ন ওল দ্যা ব্রিজেস বিহাইণ্ড। পিছনে ফেরার কথা আর নয়।
বললাম, তিতির, তুমি এত ভাল সোয়াহিলি শিখলে কী করে?
তিতির উত্তর না দিয়ে হাসি-হাসি মুখে তাকিয়ে রইল আমার দিকে।
ঋজুদা প্রশংসার চোখে তিতিরের দিকে তাকিয়ে রইল। আর আমি ঈর্ষা, লজ্জা এবং দুঃখের চোখে। সব দিক দিয়েই একটা মেয়ের কাছে হেরে যাচ্ছি। ছিঃ ছিঃ।
ঋজুদা আমাদের গুডনাইট করে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়তে বলে চলে গেল। মুখ দেখে মনে হল, এখন অনেক চিন্তা-ভাবনা করবে। কালকে মোম্বাসা যাব না বলেই আমার বিশ্বাস। মিঃ শাহকে ধোঁকা দেওয়ার জন্যেই ঋজুদা ও-কথা বলেছিল। তবে, যেখানেই যাই না কেন, কাল আমরা ডার-এস-সালাম এয়ারপোর্ট থেকে কোথাও একটা যাবই। এবং শহরের আশ্রয় ছেড়ে জঙ্গলে, যেখানে ভুষুণ্ডা এবং ভুষুণ্ডার মালিকের সঙ্গে দেখা হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে আমাদের, এমনই কোনো জায়গায়। কী প্ল্যান করেছে, তা ঋজুদাই জানে। সময় হলেই জানাবে।
তিতির বলল, গুড নাইট অ্যাণ্ড স্লিপ টাইট।
বললাম, পিস্তল থাকবে বালিশের নীচে। মনে রেখো।
ঠিক হ্যায়। বলে, তিতির ওর ঘরের দরজা বন্ধ করে দিল।
