ঋজুদার সঙ্গে স্যেশেলসে – বুদ্ধদেব গুহ
‘মাহে’ দ্বীপের নাম। তবে স্যেশেলসের রাজধানী যদিও মাহেতেই কিন্তু রাজধানীর নাম হচ্ছে ভিক্টোরিয়া। ঝকঝকে তকতকে ছোট্ট শহর। একবার পাহাড়ে উঠেছে আরেকবার সমুদ্রে নেমেছে। আর সে সমুদ্রের কী মনোহর রূপ। অমন সাদা তটভূমিও কোথাওই দেখিনি আমরা আগে।
ঋজুদার কাছে তো শুনলামই যে ‘বো ভাঁলো বে’ এই সমুদ্রতটের সেরা হোটেল। সে তো হোটেল নয়, মনে হয় একটা আলাদা শহরই। সামনে সে হোটেলের বাঁকা-চাঁদের মতো নিজস্ব তটভূমি, তিন কিলোমিটার লম্বা।
পরিকল্পনামতোই কাল রাতে এখানে এসে উঠেছি আমরা। আমি আর ভটকাই এক ঘরে আছি, আর ঋজুদা অন্য ঘরে। ব্রেকফাস্ট করছিলাম ঋজুদার ঘরেই, ডাইনিংরুমে যাইনি। কারণ, মাদমোয়াজেল পুঁজের সঙ্গে দেখা হয়ে যেতে পারে। তাঁর বিশাল সুইট নেওয়া আছে এই হোটেলেই। পৌঁছেও গেছেন। ঋজুদারও ঘর নয়, স্যুইট। তবে ছোট স্যুইট। আলাদা বসার ঘর আছে। তাতে ফ্রিজ। ফ্রিজে কোকোকালা, লেমনেড আরও কত কী রাখা আছে। ফ্রিজের ওপরে নানারকম চকোলেট আর নোনতা বিস্কিট। বিরাট ফুট-বোল-এ নানারকম ফল। ফল অবশ্য আমাদের ঘরেও আছে।
ভটকাই মুখভর্তি স্ব্যাম্বল এগস আর বেকন নিয়ে চকোলেটগুলোর দিকে লুব্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল।
ঋজুদা বলল, ইংরেজিতে একটা কথা আছে রে ভটকাই। ডু নট বাইট মোর দ্যান উ ক্যান চু। যতখানি চিবোতে পারবি অনায়াসে, ততখানি খাবার মুখে কখনও পুরিস না।
ভটকাই লজ্জা পেল। ঋজুদা সেটা লক্ষ্য করে বলল, এ কথাটা শুধু খাবার সম্পর্কেই ব্যবহার করা হয় না রে। হাতের কাছে চলে-আসা যে কোনও জিনিস সম্পর্কেই কথাটা খাটে। অনেকই গভীর কথা। ভেবে দেখিস।
.
সকাল আটটার মধ্যে সারাদিনের মতো বেরিয়ে পড়লাম আমরা।
এয়ারপোর্টে পৌঁছেই কাউন্টারে গিয়ে বললাম, প্রাসলিন-এর তিনটে টিকিট দিন।
কাউন্টারের কালো, কিন্তু সুন্দরী মেয়েটি, হেসেই বাঁচে না। সে দুচোখে দুষ্টুমি নাচিয়ে বলল, উই প্রনাউন্স ইট অ্যাজ প্রালে।
প্রাসলিন হল প্রালে। প্রথমেই ধাক্কা খেলাম একটা।
মিনিট পনেরোরও কম সময়ে গিয়ে নামলাম প্রালেঁতে নারকেল বনের মধ্যের একটি মাঠে। এখানের জমিতে কাদা হয় না। মাটির রং দেখলাম লাল। এয়ার স্ট্রিপ-এর পাশে টার্মিনাল বিল্ডিং। রাডার-টাডার কিছু নেই। নারকেল পাতার ছাউনি দেওয়া একটি ঘর। বৃষ্টি নামলে তার নীচে এসে জড়ো হয় যাত্রীরা। নয়তো বাইরেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে। আমরা নামতেই, যারা প্লেনের অপেক্ষাতে ছিল, তারা সেই প্লেনে উঠে পড়ল। মাহেতেই যাবে, না অন্য কোথাও, তা জানতে ইচ্ছে করলেও তাঁদের জিজ্ঞেস করা হল না। অনেক দ্বীপইতো আছে। এখান থেকে অন্য কোনও দ্বীপেও যেতে পারে প্লেনটা।
দু-একটা ট্যাক্সি ছিল। কিন্তু অনেকেই দেখলাম হেঁটে বা সাইকেলেই যাচ্ছে। নারকেল গাছের ছায়ায় ছায়ায় কাঁচা রাস্তা। মাঝে মাঝেই দমক দমক বৃষ্টি আসছে দমকা হাওয়ার সঙ্গে। আফ্রিকাতে যে সময়ে শীতকাল, জুন-জুলাই মাসে, এখানে তখন আমাদেরই মতো বর্ষাকাল। দু কিলোমিটারের মতো হাঁটার পরে দেখা গেল একটি রেস্তোরাঁ। সমুদ্রের ওপরেই। লোকজন কেউই নেই। যাঁরা প্লেন থেকে নামল তাদের মধ্যে অধিকাংশই সম্ভবত স্থানীয় বাসিন্দা।
এক মধ্যবয়সী ভদ্রমহিলা, লম্বা, কালো কিন্তু খুব মিষ্টি চেহারার, ঋজুদাকে হেসে অভ্যর্থনা করলেন। বললেন, লং টাইম নো সি।
ঋজুদা হেসে বলল, দ্যাটস টু। নাইস টু সি ঊ্য মাদমোয়াজেল ব্লঁশ আফটার আ লং টাইম। হাউ আর থিংগস। হাউ ইজ মঁসিয়ে ব্লঁশ?
উনি চলে গেছেন।
চলে গেছেন মানে?
মানে, স্বর্গে যাননি। তাঁর তো গৃহীর স্বভাব নয়। তোমারই মতো স্বভাব। তোমার গল্প করতেন সপ্তাহে অন্তত একবার। খাবার টেবিলে বসে। তোমাকে খুবই পছন্দ ওঁর।
তা তিনি গেলেন কোথায়? আবারও তানজানিয়াতেই?
হ্যাঁ। আবারও। এবারে মাউন্ট কিলিমানজারোর কাছাকাছিই আছেন। তারপর সেরেঙ্গেটিতে ফোটোগ্রাফিক-সাফারিতে যাবেন কিছু স্যুয়েড পর্যটক নিয়ে।
ততক্ষণে ঋজুদার দেখাদেখি আমরাও বারান্দাতে চেয়ার টেনে বসেছি।
ভদ্রমহিলা আমাদের দিকে তাকিয়ে ঋজুদাকে প্রশ্ন করলেন চোখ দিয়ে।
ঋজুদা বলল, আমি এখন একটি কিশোরদের মাসির পত্রিকার সম্পাদক হয়েছি। এরা দুজনে আমার সহকারী। স্যেশেলসের ওপরে একটি বিশেষ সংখ্যা বেরোবে আমাদের পুজোর সময়ে।
হোয়াট ইজ পুজো?
আমাদের দুর্গাপুজো, তোমাদের ক্রিসমাসেরই মতো। অন্যতম প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠান। শরৎকালে হয়।
ও।
তারপর বলল, এরা আমাদের মাতৃভাষা বাংলা ছাড়া অন্য কোনও ভাষা জানে না, তাই হয়েছে মুশকিল। আমাকেই সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে হচ্ছে।
তা তোমাদের ফোটোগ্রাফারেরা কোথায়?
তারা আজ গেছে ‘লা ডিগ’ আইল্যান্ডে। এদিকেও আসবে। তবে কবে, তা সে তারাই জানে।
কেয়ার ফর সাম কফি?
মাদমোয়াজেল ব্লঁশ বললেন।
একটু পরে।
ঋজুদা বলল।
ভদ্রমহিলা বেশ ঘনঘন সিগারেট খান। যতবারই সিগারেট ধরাচ্ছিলেন, ঋজুদা তার লাইটার দিয়ে ধরিয়ে দিচ্ছিল। আর ভদ্রমহিলা বলছিলেন, ‘মেরসি’।
দাঁতগুলো খুব সুন্দর। মুক্তোর মতো। আরও সুন্দর হাসিটি।
ঋজুদা বলল, বলুন, গল্পসল্প সব শুনি। মঁসিয়ে ব্লঁশ যে গুপ্তধন খোঁড়ার কোম্পানি শুরু করার কথা বলছিলেন, তার কী হল? খুবই তো ভাল আইডিয়া। আমিও তো জয়েন করব বলেছিলাম পার্টনার হিসেবে। তারপর আর কোনও খবর তো দিলেন না।
উনি আর কী করবেন? মাহেতে তো সরকারই একজনকে সাহায্য করছে। ত্রিশ হাজার পাউন্ড স্টারলিং দিয়েছে। কিন্তু খুঁড়ে কিছুই বেরোয়নি। ঠিক হদিস জানা না থাকলে পাওয়া যাবে কী করে? ঠাকুরদা-বাবার কাছ থেকে শুনেছি, সব চেয়ে বেশি গুপ্তধন পোঁতা আছে অ্যাস্টভ দ্বীপে। সেখানে তো এখনও কেউ খোঁড়াখুঁড়ি করছে বলে শুনিনি।
তারপর বললেন, আসলে জাহাজডুবি, গুপ্তধন, নির্বাসিত ও জাহাজডুবির পরে সাঁতরে গিয়ে উঠে বেঁচে থাকা মানুষদের যত লোককাহিনী, যত রূপকথা, সবই তো অ্যাস্টভ দ্বীপ নিয়েই। শুনতে পাচ্ছি, ইদুলের এক বংশধর, মঁসিয়ে পঁপাদু, নাকি গুপ্তধন খুঁজতে উঠে-পড়ে লেগেছেন। ইঁদুলের দলের আর এক ডাকাত ফ্রেদরিকের পরিবারের মেয়ে প্রচুর ধনী মাদমোয়াজেল প্লুজেঁও ভিক্টোরিয়াতে এসে ‘বো ভাঁলো বে’ হোটেলে উঠেছেন। তাঁরও উদ্দেশ্য নাকি অ্যাস্টভে গোপনে খোঁড়াখুঁড়ি করা।
আপনাকে কে বলল?
ঋজুদা আমাদের দিকে তাকিয়েই মাদাম ব্লঁশকে জিজ্ঞেস করল।
আরে! মঁসিয়ে পিয়ের তো কালই রাতে মোটর বোটে করে এসে আমার হোটেলেই ছিলেন। সারারাত ম্যাপ-ট্যাপ নিয়ে কাজ করার পর প্রায় সকাল চারটে অবধি জেগে তারপর ঘণ্টা দুয়েক শুয়েই সকালের প্রথম ফ্লাইটে মাহেতে ফিরে গেছেন। যাওয়ার আগে বলে গেলেন, মাদমোয়াজেল প্লুজেঁর হয়েই কাজ করছেন এখন।
আর উনি যে বোটে এসেছিলেন, সেই বোট?
বোট তো ওঁকে নামিয়ে দিয়েই ফিরে গেছিল রাতারাতি। ঘণ্টাচারেক তো লাগে। বোটে চার ঘণ্টা, প্লেনে পনেরো মিনিট।
তা উনি এলেনই বা কেন, আর গেলেনই বা কেন?
তা বলতে পারব না। প্রালেঁতে একজন খুব বড়লোক থাকেন। মঁসিয়ে দেনো। তিনিও কাল রাতে আমার হোটেলে এসেছিলেন। রাত দুটো অবধি ছিলেন। কী একটা চুপ-চুপ গোপন-গোপন ভাব দেখলাম। তারপর মঁসিয়ে দেনো চলে গেলেন।
তাই?
হ্যাঁ। আমার মনে হচ্ছে, কোনও রহস্য আছে মঁসিয়ে পিয়েরের আসা সম্বন্ধে। আসলে মানুষটার বদনাম তো আছেই।
কীসের বদনাম?
কীসের নয়। ওর বাবাও ওইরকম ছিল।
বাবা খারাপ হলেই যে ছেলে খারাপ হবে, তার কী মানে আছে?
মানে নেই। তবে অনেক সময়েই তো হয়। ও ভাড়াটে খুনিও বটে। বাবা, আমি তো একাই থাকি। ফ্রেঞ্চ মেয়েটি চলে যায় রাত দশটায়, আসে সকাল ছটাতে। কুক, বেয়ারা ওরাও সব আসে ছটাতে। রাতে যদি হুজ্জত করত? তবে সারারাতই দুজনে মিলে মদই খেয়েছে। অন্য ঝামেলা বিশেষ করেনি।
আপনার এখানে বার-এর লাইসেন্স নিয়েছেন নাকি?
না, না। আমি কেন নিতে যাব? ওই সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল। কোনও গোপন ব্যাপারে এসেছিল বটে কিন্তু মঁসিয়ে পিয়ের কিছু ম্যাপ-ট্যাপ ফেলে গেছে। ভুলে।
কী করবেন এখন আপনি?
তাই ভাবছি। মঁসিয়ে দেনোকে কি ফোন করব?
করা তো উচিত। তবে মঁসিয়ে পিয়েরের কাগজপত্র অন্য কাউকেই দেওয়া উচিত নয়। যদি গুপ্তধনের খোঁজটোজ থেকে থাকে তাতে। দুল আর ফ্রেদরিক তো কুখ্যাত জলদস্যুই ছিল। প্লুজেঁ তো বলছেন সেই ফ্রেদরিকেরই বংশধর।
সেই জন্যেই। মঁসিয়ে দেনোকে বলব কি না ভাবছি।
না বলাই তো ভাল। যার জিনিস তাকেই জানানো উচিত।
ঠিক বলেছ। আমার স্বামী মানুষ চেনেন বলেই তোমার কথা এত বলেন।
তবে…
তবে কী?
ওই ম্যাপ আমি দেখে নিয়েছি।
ঋজুদা কথা বলল না। পাইপ টানতে লাগল। যেন, ওই ম্যাপ সম্বন্ধে তার কোনও ইন্টারেস্টই নেই এমন মুখ করে মনোযোগের সঙ্গে পাইপ টেনে যেতে লাগল। আমাদেরও যেন কোনওই ইন্টারেস্ট নেই এমন ভাবে আমরা বাইরে তাকিয়ে রইলাম। ইদানীং বহুতই স্মার্ট হয়ে-ওঠা ভটকাই আমাকে বাংলায় বলল, এই রোদদুর, এটা কী পাখি রে?
কোথায়?
ওই যে রোদদুরে বসে আছে।
ভটকাই অভিনয়টা ভালই করল। আমরা ইংরেজি জানিই না, তাই ঋজুদার সঙ্গে মিসেস ব্লঁশের কী কথা হচ্ছিল, তা আমাদের বোঝবার কথাই নয়।
আমি পাখিটার দিকে ভাল করে চেয়ে বললাম, মনে হচ্ছে টার্ন।
ঋজুদা বলল নডি-টার্ন। এখানে দুরকমের দেখা যায়। বড় আর ছোট। এ ছাড়া আছে সুটি-টার্ন। সাদাকালো। এ সব পাখি তো সমুদ্রপারেই দেখা যায়। টার্ন, স্যান্ডপাইপার, সোয়ালো, বুবি আরও কত পাখি। এখানে একটা অভয়ারণ্য আছে। লোকে তাকে বলে ‘গার্ডেন অফ ইডেন’। কতরকম গাছ যে আছে সেখানে, কতরকম পাখি, তা বলার নয়।
আমাদের এই কথোপকথন শুনে মাদমোয়াজেল ব্লঁশ বুঝতেই পারলেন যে, মঁসিয়ে পিয়ের বা মঁসিয়ে দেনো বা কারও পুঁতে রাখা গুপ্তধন নিয়ে আমাদের বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। কিন্তু কিছু মানুষ থাকেন, বিশেষ করে মেয়েদের মধ্যে, যাঁরা পেটে কথা মোটেই রাখতে পারেন না। তা ছাড়া, ভদ্রমহিলা একা থাকেন। স্বামী আবার আফ্রিকাতে চলে গেছেন। হয়তো মাঝে মাঝে ফোনে কথা বলেন। ছেলেমেয়ে আছে কি না তাও আমাদের জানা নেই। তা ছাড়া, প্রলে দেখছি এমনই জায়গা যে, এখানে খুব বেশি মানুষও পান না উনি কথা বলার, তাই একটু বাঁচালতায় তো পেতেই পারে ওঁকে।
আমাদের কথা শেষ হলে উনি বললেন, গুপ্তধনের ম্যাপগুলো কিন্তু অ্যাস্টভ দ্বীপেরই। পুব দিক দিয়ে পাহাড়ে উঠে তারপর দক্ষিণে পাঁচশো গজ গিয়ে সেখান থেকে উত্তরে…
ঋজুদা বলল, আপনি বিপদে পড়ে যাবেন মাদমোয়াজেল ব্লঁশ। আপনিই বলছেন যে, পিয়ের ভালমানুষ নয়। আপনিই বলছেন মাদমোয়াজেল প্লজেঁ ওকে লাগিয়েছেন ওঁর কাজে, আবার আপনিই সব গোপন খবর জানিয়ে দিচ্ছেন। এতে আপনার প্রাণহানিও হতে পারে।
কেন? বলেছি তো শুধু আপনাকেই। আপনি তো আর গুপ্তধন খুঁজতে যাচ্ছেন না।
না। তা যাচ্ছি না। কিন্তু দেওয়ালেরও কান আছে। আপনার কাজের মেয়েটি, হোটেলের কুক, বেয়ারারা, এত লোক আছে। তা ছাড়া টাকা সম্পত্তি এমনই একটা খারাপ জিনিস যে, যার জন্যে ছেলে বাবাকে খুন করে, জামাই শ্বশুরকে। তা ছাড়া এ সব তো পড়ে-পাওয়া ধন। অন্যের উপার্জিত সম্পত্তিতেই বেশি আঠা থাকে। কী দরকার আপনার?
এমন সময়ে ওঁর অফিসে ফোনটা বাজল। অফিসটা, সমুদ্রের ওপরের প্রকাণ্ড কাঠের উঁচু বারান্দাটা, যেটা ড্রইং কাম-ডাইনিং রুম, তারই এক প্রান্তের একটি ছোট্ট চেম্বারে।
মাদমোয়াজেল ব্লঁশ ফোন ধরতে উঠে গেলেন। আমরা লক্ষ করলাম যে, তিনি খুব উত্তেজিত হয়ে যেন কার সঙ্গে কথা বলছেন। মিনিট দু-তিন কথা বলেই ফোনটা নামিয়ে রাখলেন। আমাদের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে জোর করে হেসে বললেন, ন্যাউ, আই থিংক ইটস টাইম ফর আ কাপ অফ কফি।
ঋজুদা বলল, ওকে।
উনি কফির অর্ডার দেওয়ার জন্য টেবিলে রাখা ঘন্টাটা বাজালেন। বললেন, ইটস অন দ্য হাউস।
বেয়ারা এল। একটি স্যেশেলোয়া। মাঝবয়সি। তাকে ক্রেওল ভাষাতেই কফির অর্ডার দিলেন উনি। আমরা শুধু কফি’ শব্দটা বুঝলাম।
বেয়ারা যেতে না যেতেই ফোনটা আবার বাজল।
কর্ডলেসটা তিনি চেম্বার থেকে নিয়ে এসেছিলেন আসবার সময়ে। বললেন, কাফে দ্য প্ৰালে।
তারপরই খুব উত্তেজিত শোনাল তাঁর গলা। বার বার বলছিলেন, মঁসিয়ে পিয়ের!
তারপরই বললেন, মঁসিয়ে বোস ফ্রম কালকুত্তা।
ঋজুদার কান খাড়া হয়ে উঠল।
মঁসিয়ে পিয়ের মনে হল, মাদাম ব্লঁশকে খুব শাসালেন। ভয়ে মুখ কালো হয়ে গেল মহিলার। উনি বার বার বলছিলেন মঁসিয়ে বোস ইজ ফ্রম কালকুত্তা, ইন্দিয়া, হি ইজ আ ন্যাচারালিস্ট, আ রাইটার। নো নো আই অ্যাম শুওর। মাই হাজব্যান্ড ইজ ভেরি চাম্মি উইথ হিম।
তারপর বললেন, আমি সবই রেখে দিয়েছি। লোক পাঠালেই বন্ধ খামে দিয়ে দেব।
তারপর বললেন, কী? কী বলছেন? অ্যাস্টভ দ্বীপের কথা বলেছি কিনা? হ্যাঁ বলেছি। মঁসিয়ে বোস তো আমার সামনেই বসে আছেন। আপনার কোনও ক্ষতি কি আমি করতে পারি? মঁসিয়ে বোসের এতে কী ইন্টারেস্ট থাকতে পারে?
তারপরই ও প্রান্ত থেকে লাইনটা কেটে দেওয়া হল।
উনি স্তব্ধ হয়ে রইলেন কিছুক্ষণ।
ঋজুদা বলল, পৃথিবীতে শান্তির জন্যে, সে ঘরের শান্তিই তোক কি বাইরের শান্তি, দুটো একটা মিথ্যা বললে কোনও দোষ হয় না মাদমোয়াজেল ব্লঁশ।
তা হয় না। কিন্তু আপনাকে তো মঁসিয়ে পিয়ের বা মাদমোয়াজেল খুঁজে চেনেনই না। তবে আপনার সম্বন্ধে মঁসিয়ে পিয়েরের এত ভীতি কেন?
ভীতির কথা কেউ বলতে পারে? কেন যে কার ভীতি? আমাদের দেশে লজ্জাবতী নামের এক রকম লতা হয়। তার কাছাকাছি কেউ হাত নিলেও, কি তাকে ছুঁলেও, অবশ্যই সে কুঁকড়ে যায়। অনেক মানুষও ওইরকমই হয়। লজ্জাবতীরই মতো বাড়াবাড়িরকম অনুভূতিশীল।
ঋজুদা বলল, ওই যে অ্যাস্টভ দ্বীপ, সেটা ঠিক কোথায়? যাঁরা বেড়াতে আসেন তাঁরা তো সেখানে যান না। গতবারে আমি এসে তো মাহে, প্রালে, লা-ডি-এই ছিলাম। ওই দ্বীপের নাম তো শুনিনি।
মাদাম ব্লঁশ বললেন, ওগুলো ইনার আইল্যান্ডস। ওই তিনটে ছাড়াও আরও আছে কাছাকাছি। ফ্রিগেট আর আরিড। আরিডে বার্ড স্যাংচুয়ারি আছে। আরিডের সামান্য উত্তর-পশ্চিমে আছে বার্ড আইল্যান্ড।
দ্বীপের নামই বার্ড আইল্যান্ড?
হ্যাঁ।
আসলে স্যেশেলস বলতে অধিকাংশ মানুষ মাহে, প্রালে বা লা-ডিগই বোঝে। প্রালেঁতে এসেও এখানের যা আসল দ্রষ্টব্য ‘ভ্যালি দ্য মেইতেই বা কজন যায় তোমার মতো? তুমিও আমার স্বামীরই মতো জঙ্গল-পাগল বলেই তো।
তা ঠিক, মঁসিয়ে ব্লঁশ সঙ্গে না থাকলে তো অত ভাল করে দেখতেও পারতাম।
‘মিলিয়নিয়রস স্যালাড’ কাকে বলে জান?
মহিলা বললেন।
আমাদের কান নড়ে উঠল। কুকুরের কান যেমন শব্দ শুনে নড়ে ওঠে। কিন্তু আমরা অনেক কষ্টে কান কন্ট্রোল করলাম পাছে উনি বুঝে ফেলেন যে, আমাদেরও ইংরেজি একটু একটু আসে।
ঋজুদা বলল, লম্বা, পামিস গাছ, তার মাথায় তালের মুকুট। সেই তালেরই শাঁস তো। কোটিপতির রাঁধুনিরা পুরো গাছকে মেরে ওই স্যালাড বের করতেন আগে। এখন অবশ্য এমনি বেঁটে তালের শাঁস নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। কোকো-ডে-মেয়ের তো স্যেশেলস ছাড়া অন্য কোথাও দেখাও যায় না।
তা যায় না। আমাদের প্রালের সৌন্দর্যও কম নয়। মানুষে ‘বো ভাঁলো’ ‘বো ভাঁলো’ করে বটে, কিন্তু সে তো পৃথিবীর সব মানুষের ভিড়ে একটা বাজার হয়ে গেছে। এমন শান্তি আর কোথায় আছে? স্যামন মাছের রঙের রুপোলি গ্রানাইটের নানা আকৃতির বড় ছোট চাঙড়, সাদা কোরাল–গুঁড়ো বালির পাশে পাশে। টাকামাকা গাছেরা উজ্জ্বল সবুজ, বড় বড় পাতার ব্রেড-ফ্লুটের গাছের সারি। আর ভিতরে ঘন জঙ্গলের মধ্যে গাঢ়-লাল প্রবাল-রঙা পাহাড় চুড়ো। রাতেরবেলা এখানে জলের নীচে রং-বেরঙের ফুলের মতো প্রবালেরা তারাদের ছায়াতে ঘুমিয়ে থাকে।
বাঃ। আপনি কী সুন্দর বলেন, আপনি আমাদের কাগজের জন্যে একটি লেখা লিখুন না প্রালে সম্বন্ধে।
হাঃ। লেখা-টেখা কি সকলের আসে মঁসিয়ে বোস? লেখক হতে হলে ঈশ্বরের আশীর্বাদ লাগে। এ তো পাহাড়ে চড়া নয় যে, পড়তে পড়তে, উঠতে উঠতে, অধ্যবসায় থাকলে একদিন না একদিন ওঠাই যাবে! লেখক হতে গেলে POTPISTOLA TOSTI ‘Genius is one percent inspiration and ninety nine per cent perspiration.’ এই বাক্যটি লেখালেখির ব্যাপারে প্রযোজ্য নয়। লিখতে গেলে ইন্সপিরেশন দরকার হয় ঢের ঢের বেশি। বলে, একটু থেমে যোগ করলেন, পারলে হয়তো আমার স্বামী পারতেন। উনি যখন আমাকে আফ্রিকার গল্প বলেন কখনও অন্ধকার অথবা চাঁদের রাতে, আমার মনে হয় আমি যেন সেখানেই চলে গেছি। আশ্চর্য ক্ষমতা আছে ওঁর। কিন্তু ওই…
ওই কী?
কুঁড়েমি। ইন্সপিরেশন যথেষ্টই, কিন্তু পারস্পিরেশনের অংশটা শূন্য। লেখার টেবিলে ঘাম ঝরানোর কোনও ইচ্ছেই যে ওঁর নেই। তার চেয়ে ওঁর ঢের বেশি পছন্দ অনাবিষ্কৃত সৌন্দর্য খুঁজে বার করা, নতুন পথে পুরনো জায়গায় যাওয়ার হদিস-এর সন্ধান করা।
তা হলে, কলম চালাতেও perspiration লাগে বলছেন।
হাসতে হাসতে বলল, ঋজুদা।
হেসে উঠলেন মাদাম ব্লঁশ।
কফি এসে গেল। সঙ্গে টিনের কাজুবাদাম আর টাটকা-ধরা ম্যাকারেল মাছের ফ্রাই।
আরে, আমরা তো সকালে ব্রেকফাস্ট খেয়েছি।
তাতে কী, এখন তো প্রায় এগারোটা বাজে। ওদের নিয়ে ঘুরে-ঘারে ফিরবেন তো সেই সন্ধের মুখে। ভালই হল, লাঞ্চের জন্যে সময় নষ্ট করতে হবে না আর।
তারপরই আমাদের দিকে ফিরে বললেন, ইয়াং ল্যাডস। প্লিজ ক্যারি অন।
তারপর ঋজুদাকে বললেন, এদের নাম তো বললেন না?
ও হ্যাঁ।
ঋজুদা লজ্জিত হয়ে বললেন, প্রথমেই আলাপ করিয়ে দেওয়া উচিত ছিল। এঁরা হলেন মঁসিয়ে পিপু, আর মঁসিয়ে ফিসু।
কী নাম বললে?
আমরা নিজেদের নাম শুনে নিজেরা হেসে উঠতে গিয়েও জোর ব্রেক কষে থেমে গেলাম। ভটকাই একটা হেঁচকি তুলল, ইন দ্যা প্রসেস।
ঋজুদা কথা ঘুরিয়ে বলল, জানিস তো, যে কোকো-ডে-মেয়ের গাছ প্রালের ‘ভ্যালি দ্য মেই’তে পাওয়া যায়। আগে অনেকের ধারণা ছিল ওই গাছ জন্মায় সমুদ্রের গভীরে।
সত্যি?
আমরা বললাম অবাক হয়ে।
হ্যাঁ। এই প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড ছাতার মতো গাছগুলো আকাশ ঢেকে রাখে। নানারকম সরীসৃপ ডাকাডাকি করতে করতে এ গাছ থেকে সে গাছে দৌড়ে বেড়ায়। তলায় গভীর রহস্যময় অন্ধকার। তারই মধ্যে মধ্যে স্যেশেলস দ্বীপপুঞ্জের কালো টিয়ারা শিস দিতে দিতে উড়ে যায়। ওই বনভূমি দেখলে মনে হয় যেন অন্য কোনও যুগের কোনও বনভূমি দৈব-অভিশাপে এই পৃথিবীতে রয়ে গেছে। মানুষের এই বনভূমিতে কিছু করণীয় নেই, ওই সৃষ্টির পেছনে কোনও কেরামতিও নেই। এই বনভূমি, দূর থেকে দেখলেও মনে সম্ভ্রম জাগে। এই বনভূমিতে সব গাছই ঊর্ধ্বমুখী, সূর্যমুখী। নিজের নিজের আকাশটুকুর জন্যে যেন প্রত্যেকেই সংগ্রাম করছে।
এখানে এলে শুধু ওপর দিকেই তাকাতে হয়। মাঝে মাঝে হাওয়া দিলে মস্ত বড় বড় পাতা ছিঁড়ে নীচে পড়লে নিথর বনের মধ্যে যে শব্দ ওঠে, তা প্রতিধ্বনিত হয়। ঝড় উঠলে, ওই আশ্চর্য নারকেল বনের পাতায় পাতায় এক আওয়াজ ওঠে। যে, তা না শুনেছেন, তাঁর পক্ষে অনুমান করাও মুশকিল। তারই মধ্যে ধুপ করে শব্দ করে কোনও একটি কোকো-ডে-মেয়ের হয়তো খসে পড়ে নীচে। রোদ্দুর ভরা দিনের বেলায় ওপরে রোদ ঝলমল করলে কী হয়, নীচে যখন সে আলো নামে, তখন তা সবুজাভ হয়ে যায়।
ভটকাই বলল, ম্যাকারেল মাছের মধ্যে একেবারে কদবেলের মতো মজে গিয়ে, বনজ্যোৎস্নায়, সবুজ অন্ধকারে।
আমি বললাম, জ্যোৎস্না কোথায় পেলি। বল, বনরোদ্দুরে, সবুজ অন্ধকারে।
ওই হল।
কিন্তু বইটা কি পড়েছিস?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
বলল, ভটকাই। মাছভাজার টুকরোটা মুখে পুরে।
কফি, ম্যাকারেল ভাজা আর কাজুবাদাম খাওয়া শেষ হলে ঋজুদা বলল, আপনার কাছে স্যেশেলসের আউটার আইল্যান্ডগুলোর কোনও ম্যাপ আছে? না থাকলে কোথায় পাব?
পাবে হয়তো ট্যুরিস্ট অফিসে, কিন্তু আমার কাছে একটা একস্থা থাকলেও থাকতে পারে।
বলেই, তিনি ভিতরে চলে গেলেন।
কী বুঝছিস?
ঋজুদা বলল।
ভারী ভাল মহিলা। কিন্তু আমাদের শত্রু তো জেনে গেল যে, আমরা অ্যাস্টভ দ্বীপের ম্যাপের হদিস পেয়ে গেলাম ওঁর কাছ থেকে।
তা গেল।
তো কী হবে?
যা হওয়ার তা হবে।
আমরা কি কাল সকালেই বেরিয়ে পড়ব সেদিকে? কী করে যাবে? বোট চার্টার করে? খাবারদাবার এবং পানীয় জলও তো নিয়ে যেতে হবে সঙ্গে। কতদিন থাকতে হবে তার তো ঠিক নেই।
ভটকাই বলল।
দেখি।
কী যেন ভাবতে ভাবতে ঋজুদা বলল।
এমন সময় মাদাম ব্লঁশ একটি ম্যাপ নিয়ে এসে টেবিলের ওপরে মেলে ধরলেন। ধরে, তাঁর হাতে ধরা একটা রুপোর বলপয়েন্ট পেন দিয়ে দেখালেন…
ঋজুদা বলল, এই কলমটা শারানডাশ নয়?
হ্যাঁ। তুমি চেন?
চিনি। সুইজারল্যান্ডের নামকরা পেন আর বলপয়েন্ট। সোনার হয় আর রুপোর হয়।
তুমি দেখছি পেন-বিশারদ।
আমি যে লেখক। পেনই যে আমার হাতিয়ার। পেন, বলপয়েন্ট, তুলি।
এই দেখ, স্যেশেলস দ্বীপপুঞ্জে কত অসংখ্য দ্বীপ আছে। অগণ্য দ্বীপের এখনও নামকরণ হয়নি। তাদের সার্ভেও করা হয়নি। সেখানে কী কী গাছ বা কী কী প্রাণী থাকে, তারও খোঁজ নেওয়া হয়নি। মিষ্টিজল পাওয়া যায় কি না, তারও না। এই দ্যাখো, ইনার আইল্যান্ডসের কথা তো আগেই বলেছি। আউটার আইল্যান্ডসে চারটে পুঞ্জ আছে। আমিরান্তেস, আলফোঁস, ফারকুহার আর অ্যালডাবরা। এর মধ্যে স্বর্গের মতো সুন্দর অ্যাটলও আছে অনেক।
ঋজুদা মন দিয়ে শুনছিল। মাদাম কুঁশ থামতেই বলল, অনেক ধন্যবাদ। তবে, হাতে সময় তো বেশি নেই, ওদের যতটা সম্ভব ঘুরিয়ে দেখাই। একটা ট্যাক্সি কি ডাকা যাবে ফোনে?
তারপরই ঋজুদা বলল, টেক কেয়ার।
বলে, ওঁর ডান হাতটা ধরে, হাতের পাতার পিঠে আলতো করে চুমু খেল।
উনি বললেন, বাঈ!
বাঈ!
ট্যাক্সিটা এসে গেল। আমরা উঠে হাত নাড়লাম ওঁকে।
উনি হাসছিলেন, খোলা আকাশের পটভূমিতে সাদা রংকরা কাঠের বনবাংলোর মতো বাংলো-হোটেলের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে। ডান হাতের আঙুল দিয়ে গলার মুক্তোর মালার মুক্তোগুলো নাড়ছিলেন আর বাঁ হাত দিয়ে এলোমেলো-হওয়া চুল ঠিক করছিলেন। একটা ছাই-রঙা সিল্কের স্কার্ট পরেছিলেন উনি আর সাদা সিল্কের ব্লাউজ। সাদা জুতো। স্কার্টটা উড়ছিল জোর সামুদ্রিক হাওয়াতে। খুবই স্নেহময়ী মহিলা। আমার মায়েরই বয়সী হবেন। বেয়াল্লিশ-তেতাল্লিশ।
ট্যাক্সিটা ছেড়ে দিতেই উনিও হাত নাড়লেন।
