ঋজুদার সঙ্গে ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জে – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

শিখলাম, ছিনতাই-এর ইংরেজি মাগিং।

তারপর বললেন, ঋজু বোসকে ওরা কিছু বলবে না। ঋজু বোস আর সেই লেখকই তো এই অজপাড়াগাঁকে মান দিয়েছেন।

শেষবার গুডনাইট বলে আমরা পথে পা বাড়ালাম।

নিশুতি রাত। শিশিরে পথের ধুলো ভিজে গেছে। রাত পাখিরাও আজ ঘুমোতে চলে গেছে মনে হয়। দুপাশের গাছ-গাছালি থেকে সুন্দর এক মিশ্র গন্ধ বেরোচ্ছে।

ঋজুদা সোজা পা ফেলে হেঁটে যেতে লাগল। আমাদের আগে আগে। পা একটুও টলল না।

কী লোকরে বাবা!

তিতির বলল, ফিসফিস করে।

একটিও কথা বলল না আমাদের সঙ্গে ঋজুদা।

তার মুড দেখে আমরাও কথা বলার সাহস হারিয়ে ফেললাম। বেশ ঠাণ্ডা। কে যেন বরফের সাঁড়াশি দিয়ে কান দুটো ছিঁড়ে নিচ্ছে।

কুয়াশার জন্যে চাঁদের আলো উপভোগ করা যাচ্ছে না।

একটু পরেই ঋজুদা কী একটা গান গাইতে লাগল। বারে বারে। প্রথমে গুনগুন করে। তারপর আস্তে আস্তে গানটা জোর হতে লাগল। এবারে বোঝা যেতে লাগল কথাগুলো। সেই নিঝুম শীতের রাতে গাছগাছালির মধ্যের জঙ্গলে লাল মাটির পথে আর শিশির ঝরানো আকাশে গানটার অনুরণন উঠতে লাগল। ঋজুদা আমাদের অনেক সময় গাইতে বলেছে কিন্তু নিজে কখনও এমন করে গান গায়নি একা একা। আমরা উৎকর্ণ হয়ে শুনতে শুনতে চলতে লাগলাম ঋজুদার একটু পেছন পেছন। কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে।

Show me the way to go home
I am tired,
And I want to go to bed
Show me
I had a little drink about an hour ago
Which has gone right to my head
Show me the way to go home
I want to go to bed.

তিতির আমাকে হাত ধরে কাছে টেনে বলল, অ্যাই রুদ্র! এই গানটাই তো আছে Pat Glaskin-এর গলাতে একটু উষ্ণতার জন্যে উপন্যাসের শেষে।

তার মানে?

তার মানে, ঋজুদা বইটা পড়েছে।

আমি বললাম, তোমার নেশা হয়ে গেছে এতজন মাতালের সঙ্গে থেকে। খেয়েদেয়ে কাজ নেই ঋজুদার! তোমার ওই ন্যাকা-বোকা বুদ্ধদেব গুহকে দু চোখে দেখতে পারে না ঋজুদা।

পরদিন উঠতে উঠতে একটু দেরিই হল। ঋজুদা এখনও ওঠেনি। আমি তিতির আর ভটকাইকে বললাম, তোরা থাক। কাল রাতে কী ব্যাপার হল কিছুই বোঝা গেল না। আমি ফ্যাক্স মেসেজটা নিয়ে আসতে একাই যাচ্ছি। কিষুণ অবশ্য থাকবেই সঙ্গে। এখন তো সাড়ে ছটা বাজে। আটটার মধ্যেই রাঁচি পৌঁছে যাব। ঋজুদার বন্ধু স্টিভ যদি ফ্যাক্সটা পাঠিয়ে থাকে তবে আমি আটটাতে পৌঁছেই সেটা পাব। না পেলেও কিছু করার নেই। ফিরে আসব।

চা খেতে খেতে তিতির দুঃখ করছিল যে, এত সুন্দর জায়গা ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জ অথচ ভাল করে ঘুরে দেখার আগেই চলে যেতে হবে।

আমি বললাম, ঋজুদা আস্তে আস্তে অনেকই বদলে যাচ্ছে, গেছে, দেখছি। আগের মতো আর নেই।

ভটকাই আরেক কাপ চা ঢেলে দু চামচ চিনি আর তিন চামচ দুধ দিয়ে গুলে শরবত করে চা-টা তারিয়ে তারিয়ে খেতে খেতে বলল, আমাদের দিকে না তাকিয়ে, নীচের নদীর দিকে তাকিয়ে, বৎস বদলেরই আরেক নাম হচ্ছে জীবন। চলতে চলতে বদলে যাওয়াই মানুষের ধর্ম, বাঁক-নেওয়া, চর-ফেলা, পাড়-ভাঙা। নদী আর জীবন একই।

বাবাঃ।

তিতির বলল।

ও রুদ্র! এসব কী শুনছি। ভটকাই কলম ধরলে তো তোমার ঋজুদাকে ভাঙিয়ে লেখালেখি সব শেষ।

আমি আমার ঠাকুমা যেমন করে বলতেন, তেমন করে বললাম, হায়। হায়। সক্কালবেলায়।

ভটকাই বলল, রাঁচি যখন যাচ্ছিসই একটু রাবড়ি নিয়ে আসিস তো। আনতে বলতাম জিলিপিই কিন্তু রাঁচি থেকে আসতে আসতে তারা তো ফ্রিজে রাখা চষি-পিঠে হয়ে যাবে।

যথা আজ্ঞা।

আমি বললাম।

তারপর বেরিয়ে পড়লাম এ কথা বলে যে, ঋজুদাকে তুলিস না। হ্যাঁঙ্গওভার হয়েছে বোধহয়। অভ্যেস তো নেই।

পথে যে পড়ে মাথা ফাটেনি এই তো যথেষ্ট। কী যেন গানটা! আই হ্যাড আ ড্রিঙ্ক অ্যাবাউট অ্যান আওয়ার এগো হুইচ হ্যাঁজ গান টু মাই হেড/ শো মি দ্য ওয়ে টু গো হোম / আই ওয়ান্ট টু গো টু বেড।

ভটকাই বলল।

আমি চলে যেতে যেতে শুনলাম তিতির বলছে, বাবা মুখস্থ করে ফেলেছে যে! গান ‘রাইট টু মাই হেড।

আমার স্মৃতিশক্তি কখনও কখনও বেগ-চিরা হয়ে যায়।

সেটা কী?

মানে বেগে মগজে প্রবেশ করে এবং যা করে, তা চিরদিন থেকে যায়।

.

কিষুণ গাড়ি চালাচ্ছিল। সঙ্গে তিতিরও এল। সকালের হৈমন্তী প্রকৃতি। তখনও রাতের শিশির পুরোপুরি বাষ্প হয়ে উড়ে যায়নি। ঝকমক করছে রোদ ক্লোরোফিল-উজ্জ্বল জঙ্গলে। যেখান থেকে ঋজুদা গাড়ি থেকে নামিয়ে আমাদের ‘ম্যাকলাস্কিজ নোজ’ দেখিয়েছিল তার অনেকখানি নীচে একটি বিস্তীর্ণ জঙ্গলময় উপত্যকা। তার মধ্যিখানে ছোট্ট একটি গ্রাম। তিতির ফিসফিস করে বলেছিল বাসারিয়া।

কী করে জানলে?

‘একটু উষ্ণতার জন্যে’ পড়ে।

ভাবছিলাম, কলকাতাতে ফিরে পড়ে ফেলব বইটা। যদিও লেখক আমার সঙ্গে শত্রুতা করছেন। তবে জানেন তো না যে আমিও ঋজু বোস-এর চেলা, আমার নাম রুদ্র রায়–তোমারে বধিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে।

তারপরই মনে হল যে, আজই তো আমাদের ম্যাকক্লাস্কি ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা। অথচ তেমন কথা তো ছিল না। পুরো ব্যাপারটিরই কোনও মাথা-মুণ্ডুই বুঝতে পারছি না। এখন দেখা যাক ঋজুদার বন্ধু স্টিভ এডওয়ার্ড নিউজিল্যান্ডে সিডনির বন্ধু রোনাল্ডার পাঠানো ফ্যাক্স আদৌ পেল কি না এবং পেলেও উত্তর দিল কি না!

রাঁচিতে যখন ঢুকছে কিযুণের টাটা-সুমো, ও বলল, রাবড়িটা আগে নিয়ে নিই। তারপরে ফিরে আই এস ডি বুথ হয়ে একেবারে টিকিয়া-উড়ান চালিয়ে ফিরে যাব।

বেশ।

.

রাবড়ি এক কেজি নিলাম। যদিও ভটকাই বলবে, এ তো আমি একাই সাবড়ে দেব। তুই এত হাড়কিপটে যে পরের টাকা খরচ করতেও তোর বুক ফেটে যায়। নিজের টাকা হলে যে কী করতিস!

রাবড়ি নিয়ে বড় রাস্তাতেই রাতু বাসস্ট্যান্ডের কাছে আই এস ডি-র বুথে নামতেই সাতসকালেই মুখে-পান-ভরা আতরের খুশবু ছড়ানো সবুজ-খদ্দরের পাঞ্জাবি পরা যুবকটি বললেন, আ গ্যয়া। লিজিয়ে।

কিতনা দেনা পড়ে গা?

আরে সাব কুছো নেহি। কাল তো বহত রুপেয় লেহি লিয়া।

ইয়ে গাড়ি ডাল্টনগঞ্জকি মোহনবাবুকি হ্যায় উ মেরি পতা নেহি থা। আপলোগ লওট যানেকি বাদ বগলওয়ালা পানকি দুকানিনে মুঝে বাতায়া। ঔর স্রিফ দোহি তো লাইন হ্যায়। ছোড়িয়ে।

ভাবছিলাম, ঋজুদার এই অদেখা ছোট ভাই মোহনবাবু’টিকে একবার দেখা দরকার। তিনি যে দেড়শ কিমি পথ দিয়ে যাওয়া আসা করেন তার দু পাশের সবাই এক নামে তাঁকে চেনে এবং খাতির করে। এমন তো আজকালকার দিনে দেখা যায় না।

দেখলাম সত্যি দু লাইনের ফ্যাক্স মেসেজ।

DEAR WRIJU,
THANK’S A LOT. HE HAD MANY WEAPONS BUT USED .375 MAGNUM DBBL HOLLAND & HOLLAND AND .450-400 JEFFRY NO. 2. FOR BIG GAMES. JEFFRY WAS HIS FAVOURITE!
TAKE CARE
STEVE.

সুক্রিয়া! বহুত সুক্রিয়া। বলে, আমি উত্তেজিত হয়ে গাড়িতে ওঠার আগে ভাবলাম, নিজেই একটা Fax করে দি Steve-কে এ কথা জানিয়ে যে, আপনার MAC TAILOR ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জে Kenneth Lindwal সেজে বহাল তবিয়তে বাস করছে।

তারপরে ভাবলাম, সেটা হয়তো বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে করাটা, ঋজুদাকে জিজ্ঞেস না করে! ঋজুদা যদি বলে, তবে আবারও ফিরে আসব। মিঃ ক্যামেরনের ফোনটা খারাপ। তবু কিষুণকে বলে, ফিরে গিয়ে আরেকবার চেষ্টা করে দেখব ভাবলাম। টেলিফোনে আর সাধু-সন্ন্যাসীদের মধ্যে তফাত তো খুব নেই। এঁদের যখন-তখন ইচ্ছামৃত্যু, তেমন যখন-তখন আবার প্রাণ প্রতিষ্ঠা। পকেট থেকে টেলিফোনের বইটা বের করে সি-তে খুঁজতেই বেরিয়ে পড়ল Cameron D. R. P.O. Macluskigung, Ranchi, Bihar, Pin: 829208 Phone: 06531-6340.

সবুজ-পাঞ্জাবি ভদ্রলোককে বললাম, একবার লাগান তো। ফোনটা খারাপ ছিল, ভাল হল কি না! সংখ্যা শুনে বলে বলে উনি বোতাম টিপলেন। বললেন, লিজিয়ে! রিং তো হো রাহ্যাঁ হ্যায়।

হো রাহা হ্যায়?

বলে আনন্দে নেচে আমি এগিয়ে গেলাম। ফোনটা বাজছিল।

হাল্লো বলে কানফাটানো চিৎকার করে কেউ একজন ধরল। বলল, গেস্ট হাউস। ঋজুদাকে চাইলাম। ঋজুদা এসে ধরতেই Fax-টা পড়ে শোনালাম ঋজুদাকে।

ঋজুদা বলল, সে তো জানাই ছিল।

কী করব? তোমার বন্ধু স্টিভ এডওয়ার্ডসকে কি ফ্যাক্স পাঠিয়ে দেব কেনেথ লিন্ডওয়াল-এর কথা জানিয়ে দিয়ে?

কী বললি?

ঋজুদা রীতিমত ধমকে বলল আমাকে।

কে জানে কী হল? এখনও কি কালকের নেশা কাটেনি? এমন করে তো কখনও বকেনি ঋজুদা আমাকে।

বলছিলাম, খবরটা কি পাঠিয়ে দেব?

তোমার কিছু করতে হবে না রুদ্রদা৷ তুমি দয়া করে ফিরে এসো। তুমি মস্ত গোয়েন্দা হয়ে গেছ।

তারপরই তিক্ততার সঙ্গে বলল, তোরা নিজেরাই একটা ডিটেকটিভ ফার্ম খুলে ফেল। তোরা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি অভিজ্ঞ হয়ে গেছিস। আমার সঙ্গে তোদের আর কোথাওই যাওয়ার দরকার নেই। এবার থেকে আমি সব জায়গাতে একাই যাব। প্রয়োজনে তিতিরকে নেব শুধু।

ঠিক আছে। ছাড়ছি। আসছি আমি।

তাই এসো।

ঋজুদা বলল।

.

ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জে গিয়ে পৌঁছতে পৌঁছতে আমার প্রায় দশটা হল। গিয়ে দেখি, ঋজুদারা দুজনে চানটান করে তৈরি হয়ে বারান্দাতে বসে আছে। যেরকম চেয়ারের ভাঁজ করা হাতল লম্বা করে দিলে ‘পাতোল’ হয়ে যায় পা তুলে বসার জন্যে, সেইরকম একটা চেয়ারে পা তুলে দিয়ে বসে ঋজুদা পাইপ খাচ্ছে। দেখে মনে হল সকলের ব্রেকফাস্টও হয়ে গেছে। গত রাতে শুধু ভটকাই বোবা ছিল। আজ মনে হচ্ছে ঋজুদাও বোবা।

রাবড়িটা কিষুণকে খাওয়ার ঘরের ফ্রিজ-এ ভোলার বন্দোবস্ত করতে বলে বললাম, তুম নাস্তা কর লেও কিষুণ। ইতিমধ্যে গেস্ট হাউসের বাবুর্চি দৌড়ে এসে বলল, ছোটা-হাজরি লাগা দু’ সাব?

‘ছোটা-হাজরি’ শব্দ দুটো শুনে ব্রিটিশরাজ-এর কথা মনে পড়ে গেল। এখনও গঞ্জের পুরনো মানুষেরা ওই সব শব্দ ব্যবহার করে দেখছি। মিস্টার ক্যামেরন এখানে ঘোড়ার প্রজনন-এর জন্যে অনেকখানি জায়গা নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলেন। সে ব্যবসা চলল না কিন্তু জায়গাটির প্রেমে পড়াতে বাঁধা পড়ে গেছেন নাকি। তাঁর সঙ্গেও এ যাত্রা দেখা হল না। শুনেছি কালো অ্যাংলো।

আমি বললাম, আমি কিছু জানি না। তুমি বড়াসাবকে জিজ্ঞেস করে এসো। কেন? ওঁরা নাস্তা করেননি এখনও।

না তো। আপনার ইন্তেজারিতেই তো আছেন।

তাই?

জি হুজৌর।

আমি বারান্দাতে গিয়ে পৌঁছাতেই তিতির বলল, ব্রেকফাস্ট দিতে বলি ঋজুদা?

বল। রুদ্র তো এসেই গেছে।

আমি কোনও কথা না বলে ফ্যাক্স মেসেজটা ঋজুদার হাতে তুলে দিলাম।

ঋজুদা বলল, ব্রেকফাস্ট করে আমরা স্টেশনে যাব। তাড়াতাড়ি চান করে নে তুই। স্টেশনে আমাদের ছেড়ে দিয়ে কিষুণ গাড়ি নিয়ে, বাই রোড এগিয়ে যাবে। ওপথে বিজুপাড়া থেকে সমান রাস্তা ক্ষেতি-জমিন-টাঁড়-বেহড়-এর মধ্যে মধ্যে গেছে। কুরু থেকে রাস্তা ডানদিকে ঘুরেছে চান্দোয়া-টোড়ির দিকে। সে পথে জঙ্গল ও ঘাট আছে। আমঝারীয়ার বাংলো আছে দেখার মতো। যাকগে, যেতে যেতে এসব বলব এখন। আমরা এগোচ্ছি। তুই কাক-চান করে আয়। রাতে ভাল করে চান করিস মোহনের ওখানে। পরশু তোদের বেতলা ন্যাশনাল পার্ক-এ নিয়ে যাব। কোয়েলের কাছে। তারপর বেতলা হয়ে, কেঁড় হয়ে গাড়র কাছের পাকা ব্রিজ দিয়ে কোয়েল পেরিয়ে, মীরচাইয়া ফলস-এর পাশ দিয়ে নিয়ে যাব মারুমার-এ।

তিতির চেয়ারটা ঠেলে উঠতে উঠতে বলল, ‘কোজাগর’-এর ‘ভালুমার’-এর কাছে?

ভালুমার বলে কোনও জায়গা নেই। যেমন রুমান্ডি বলেও কোনও জায়গা। নেই। ওসব তোর ফেভারিট লেখকের লোক-ঠকানোর ধান্দা। তবে মারুমার-এর সঙ্গে ভালুমার-এর মিল যেমন আছে অনেকই, তেমন রুমান্ডির সঙ্গে কুমান্ডির।

তুমি পড়েছ? ‘কোয়েলের কাছে’ বা ‘কোজাগর’?

ওসব ট্রাশ লেখকের বাজে লেখা পড়ার সময় আমার নেই।

ওরা ডাইনিং রুমের দিকে হেঁটে যেতে যেতে তিতির বলল, আমি শুনলাম আমার ঘরে ঢুকতে ঢুকতে, কাল রাতে তুমি একটি গান গাইছিলে সেই গানটি, প্যাট গ্লাসকিন-এর মুখে আছে ‘একটু উষ্ণতার জন্যে’র শেষে।

তাতে কী? সেই গানটা কি তোর লেখকের পার্সোনাল প্রপার্টি? প্যাট গ্লাসকিনকে আমিও চিনতাম। আমারও কি বাংলো ছিল না এখানে? প্যাটের মুখে ওই গানটি আমি বহুবার শুনেছি।

তিতির চুপ করে গেল।

ওরা খাওয়া শুরু করতে করতে আমি গিয়ে বসলাম। ঋজুদা বলল, তোদের ট্রেনে করে নিয়ে যাচ্ছি ডালটনগঞ্জ কারণ এই পথটা দেখার মতো। ফেরার সময় তো কিযুণের সঙ্গেই গাড়িতে রাঁচি এসে ট্রেন ধরব, তখন গাড়ির পথ দেখতে পাবি। এইসব জায়গাতে দিনের বেলা ঘুরে বেড়াতে হয় পায়ে হেঁটে, কি গাড়িতে, কি ট্রেনে, বসন্তকালে। আহা কী রূপ তখন। ভারতের বসন্তবনের যা রূপ তেমন রূপ পৃথিবীর আর কোনও জঙ্গলেরই নেই।

কোন কোন স্টেশন পড়বে পথে?

কত স্টেশন। এই লাইনের, মানে গোমোবারকাকানা-বারকাকানা-চৌপান রুটের স্টেশনগুলির নাম এত সুন্দর, সব আদিবাসী নাম, যে তা বলার নয়।

যেমন?

যেমন মহুয়া-মিলন, চান্দোয়া, টোড়ি, খিলাড়ি, রিচুঘুটা, হেহেগাড়া, হেন্দেগির, চিপাদোহর, লাতেহার, আরও কত বলব!

বাঃ।

ভটকাই উত্তেজিত হয়ে বলল।

কেচকী জায়গাটা কোথায় ঋজুদা?

কাল দেখাব। সেখানে কোয়েল আর ঔরঙ্গা এসে মিলেছে। ছোট্ট বাংলো আছে। একটা। তিতিরের ফেভারিট লেখকের কল্যাণে বন থেকেও শান্তি চলে গেছে। কেচকী থেকেও। সবসময়ে কলকাতার কিচির-মিচির-পার্টিরা এসে পিকনিক করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *