ঋজুদার সঙ্গে ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জে – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

তিতির বলল, আমার বাবা প্রায়ই বলেন এ কথা।

সেটা ঠিক যেমন, তেমন অন্য কথাও ভাবার আছে। তুই ইংল্যান্ডের যে কোনও কাউন্টিতে এখনও যদি পথ পেরুবার জন্যে পথের ধারে এসে দাঁড়াস, দ্রুত-ছুটে-যাওয়া গাড়ির সারি ভ্যাকুয়াম ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে পড়বে নিজেদের থেকেই, কোনও পুলিশ বা ট্রাফিক সিগন্যাল ছাড়াই। তুই জেব্রাক্রসিং দিয়ে পথ পেরিয়ে গেলে তারপরেই আবার চলতে শুরু করবে সব গাড়ি। যে-কোনও প্রকৃত স্বাধীন ও সভ্য দেশে ব্যক্তির দাম আছে। প্রত্যেকটি পথচারী মানুষকেও মানুষ’ বলে মান্য করা হয় সেখানে। ভদ্রতা সভ্যতা Please! Thank you! Excuse Me! এসব ওখানকার জীবনযাত্রার অঙ্গ। কিন্তু তোরা মনে কর চৌরঙ্গি বা ডালহৌসি দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিস তখন তোরা Excuse me please বলতে থাকলে বা কারও সঙ্গে ধাক্কা লেগে গেলে sorry বলবার জন্যে দাঁড়ালে লোকে তোদের পাগল তো ভাববেই, পা মাড়িয়ে দিয়ে ধাক্কা মেরে চলেও যাবে, তা ছাড়া তোরও এক পাও এগুনো হবে না।

যস্মিন দেশে যদাচারঃ বুঝলি না! আমাদের জনসংখ্যার বুজরুকিতেই সব ধান খেয়ে গেল, একটা সমস্যার সমাধান করলেই তো আরেকটা সমস্যা এসে ঘাড়ের ওপরে হুমড়ি খেয়ে পড়ে।

ভটকাই বলল।

ঋজুদা বলল, তোর হবে ভটু। আজকের দিনের সবচেয়ে লাভজনক যে পেশা, বিনা-লগ্নির পেশা, যা শুধু বক্তৃতাবাজিরই পেশা, সেই রাজনীতিতেই নেমে যা।

এমন সময় কিষুণ ফিরে এল।

ঋজুদা বলল, কেয়া বোলা মাজিদনে?

বোলিন কি, যো লিন্ডিল সাব পিতে হ্যায়।

ক্যা পিতে হ্যায়। পুছাতা?

নেহি তো হুজৌর।

ঠিক হ্যায়। তুম যা কর আরাম করো ওর কিচেনমে যা কর বোল দো ক্যায়া খায়েগা তুমনে। যো দিল চাহতা হ্যায় ওহি খাও।

বহত আচ্ছা হুজৌর।

কিষুণ চলে গেলে তিতির ঋজুদাকে বলল, এতবার হুজৌর হুজৌর করে কেন? অতি-ভক্তি চোরের লক্ষণ।

এটা ঠিক বললি না। এটা সহবৎ-এর ব্যাপার। ও যে আমাকে বা তোদের সম্মান দিয়ে কথা বলছে তাতে তো ও নিজেও সম্মানিত হচ্ছে। রাজা সবারে দেন মান, সে মান আপনি ফিরে পান’ ওটা শুধু রাজার বেলাই প্রযোজ্য নয়, সকলের বেলাতেই প্রযোজ্য। ওড়িশাতে সাধারণ মানুষ কথায় কথায় বলে আইজ্ঞাঁ, আইজ্ঞাঁ’, যারা একটু লেখাপড়া শিখেছে তারা বলে স্যর’, ‘স্যর। আবার অন্যত্র বলে, জি! জি! তুই যদি খুব বেশি সম্মানের যোগ্য হোস তবে বলবে স্যার! স্যার! স্যার! স্যার! জি! জি! জি! জি! চারবার।

আমরা সকলেই হেসে উঠলাম ঋজুদার কথা শুনে।

এতগুলো স্যার বা জি যারা বলে তারা নির্ঘাত চোর।

তিতির বলল।

ঋজুদা বলল, সেটা মন্দ বলিসনি।

ঋজুদা প্যাড থেকে আরেকটা স্লিপ ছিঁড়ে নিয়ে কী দু-তিনটে নাম লিখল। তারপর আমাকে বলল, এটা রেখে দে। যখন রাঁচি যাবি তখন মেইন রোড-এর ওপরে যে বড় দোকানটা আছে সেখান থেকে এগুলো কিনবি। কিষুণকেও বলে দেব। সে চেনে। মোহনের অ্যাকাউন্ট আছে ওই দোকানে। দোকানি আমাকেও চেনে। তবে টাকা না দিতে চাইলেও জোর করে দিবি।

পয়সা লাগবে না?

লাগবে না। মোহন যদি জানে যে, আমি ওর রাজত্বে এসেও কোনও জিনিসের দাম দিয়েছি, তাহলে কুরুক্ষেত্র বাধিয়ে দেবে।

ঠিক আছে।

ভটকাই বলল, ভাই হো তো অ্যায়সা।

.

এমনিতে দুপুরে কখনওই ঘুমোই না কিন্তু আজ গভীর ঘুমে ছিলাম।

রাতে ট্রেনে ভাল ঘুম হয় না। সে থার্ড ক্লাস স্লিপারেই তোক কি ফার্স্ট ক্লাস এ-সি-তে। দুপুরে খাওয়াটাও বেশি হয়ে গেছিল। অড়হর ডালটা বিহারিরা বড় ভাল বানায়। খুশবুদার চাল। বড় বড় টুকরো করে বেগুন ভাজা, বড় লঙ্কা ভাজা, ডিমের কারি এবং পুদিনার চাটনি। শেষে দই।

ভটকাই আর আমি এক ঘরে। এক পাশের ঘরে তিতির আর অন্য পাশের ঘরে ঋজুদা। ভটকাই ঘুমন্ত আমাকে এমনই এক ঠেলা দিল যে খাট থেকে পড়েই যাচ্ছিলাম। সে বলল, তিনটে বেজে গেছে। ঋজুদা দুবার দেখে গেছে যে, তুই কুম্ভকর্ণর মতো ঘুমোচ্ছিস। এত ঘুমকাতুরে হলে তোকে পরের বার আর আনবে বলেছে।

কাঁচা ঘুম ভেঙে উঠে আমি বাথরুমে গিয়ে চোখমুখে জল দিয়েই বললাম, যাচ্ছি। কিষুণ কোথায়?

সে তো গাড়ি নিয়ে দুয়ারে প্রস্তুত। কিন্তু তোকে তো একা ছেড়ে দেওয়া যায় না। তুই যা দায়িত্বজ্ঞানহীন হয়েছিস আজকাল। তাই আমাকেও যেতে বলেছে তোর সঙ্গে।

তাহলে তিতির কী দোষ করল?

সে তো নেচেই আছে।

আমরা যখন বারান্দা পেরিয়ে গাড়ির দিকে যাচ্ছি দেখি ঋজুদা তার ঘরের সামনের ইজিচেয়ারে বসে পাজামা-পাঞ্জাবি পরে পাইপ খাচ্ছে বারান্দার থামে পা তুলে দিয়ে।

আমাকে দেখে বলল, ওদেরও নিয়ে যাচ্ছিস নাকি? তা যা। তবে রাঁচিতে কাজ সেরেই চলে আসবি। যেতে আসতে তিন ঘণ্টা লাগবে। তোদের ফিরতে ফিরতে কম করে সাড়ে ছ’টা তো হবেই। তবে চিন্তার কিছু নেই। মিসেস কার্নির মাজিদ এসে খবর দিয়ে গেল একটু আগে যে মিঃ লিন্ডওয়াল আমাদের সকলকে রাতে ডিনারে ডেকেছেন। সাড়ে সাতটার সময় পৌঁছতে হবে। তার আগে তোরা ফিরলেই হবে। ফিরেও চানটান করে সাজুগুজু করে নিতে পারবি। যা, আর দেরি করিস না।

বুঝলাম যে ঋজুদা ভটকাইকে কিছুই বলেনি। ঋজুদার হাজারিবাগী বন্ধু গোপালদার ভাষাতে যাকে ‘তিড়ি’ মারা বলে তাই মেরেছে ভটকাই আমাকে। মহা খতরনাক হয়ে উঠছে ছেলেটা দিনে দিনে।

গাড়ি ছেড়ে দিল কিষুণ।

বললাম, খানা ঠিক থা? ঠিকসে খায়া তো?

জি মালিক। ডাটকে খায়া। জারা জলদি নিকালনেসে ঠিক থা। আতে আতে সাম হো যায়েগা। আজকাল সব্বে জংলি জাগেমে সামকো বাদ ডাকেইতি হোতা হ্যায়।

ভটকাই বলল, ঘেবড়িও না ভাইয়া, এই বাবুর কাছে কড়াক-পিং হ্যায়। হামলোক পুরি দুনিয়ামে ডাকাত শায়েস্তা করতা হ্যায়। উ সব ভয় হামলোগকো নেহি হ্যায়।

কিষুণ হাঁ করে ভটকাই-এর হিন্দি শুনছিল আর তিতির মুখ টিপে হাসছিল।

পকেট থেকে ঋজুদার দেওয়া ফ্যাক্স করবার চিঠিটা আরেকবার পড়লাম আমি। নাম্বারটাও দেখলাম। (613) 93282219 Ronald 13/110 Arden St. North Melbourn, 3051 Victorial Australia.

আর অন্য স্লিপে লেখা আছে One Bacardi Rum, One Black dog Whisky, One Gilby’s Gin.

সময় সবচেয়ে বেশি লাগল রাঁচি শহরের দশ কিমি আগে থেকে শহরে ঢুকতে। কিষুণ বলল, টাউন বাড়তে বাড়তে কোই রোজ বিজুপাড়াতক হি পৌঁছ যায়েগা।

বিজুপাড়া হচ্ছে সেই মোড়, যেখান থেকে আমরা রাঁচি থেকে ডানদিকে ঢুকেছিলাম। কিষুণই বলল, বিজুপাড়া রানচি সে বিশ মিল ওর ম্যাকলাসকি বিজুপাড়া সে পন্দরা মিল।

বিজুপাড়ার পরেই মান্দার। এখানে মিশনারিদের হাসপাতাল আছে, চার্চ আছে। এই হাসপাতালেই তাহলে ডরোথি মেমসাহেবের ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়া চিকিৎসা হয়েছিল।

বড় হাট বসে এখানে। না?

তিতির জিজ্ঞেস করল কিষুণকে।

জী হাঁ। মালকিন।

তুমি জানলে কী করে?

আমি জিজ্ঞেস করলাম তিতিরকে।

‘কোয়েলের কাছে’ উপন্যাসটি শেষ হয়েছে এই মান্দারেই এসে। বাস দাঁড়িয়ে আছে হাটের পাশে। লাতেহার থেকে বাসে চড়েছিল লাল সাহেব। অরণ্যর স্বর্গ থেকে বিদায় নিয়ে চলে যাচ্ছে কলকাতার নরকে। একটা ওঁরাও ছেলে একটা ওঁরাও মেয়েকে একটি কবিতা বলছে ফিসফিস করে।

হালফিল-এর মেয়েরা প্রজাপতির মতো নরম!
ঈসস। হাত ছুঁইয়ে দেখ, প্রজাপতির মতো নরম! ভটকাই হঠাৎ চিৎকার করে উঠে বলল, উঃ। আর পারা যায় না, আর পারা যায় না। হালফিল-এর মেয়েরা সব কাঁকড়া বিছে! প্রজাপতির মতো নরম না আরও কিছু!

.

ঋজুদা বলেছিল ঠিকই। ফিরতে ফিরতে আমাদের সোয়া ছ’টা হল। সবে অন্ধকার নেমেছে। তবে চাসা থেকে ম্যাকক্লাস্কির পথে কিযুণের টাটা-সুষমা ঢোকামাত্র আমি কোমরের সঙ্গে বাঁধা হোলস্টারের বোতাম খুলে পিস্তলটাকে বের করে ম্যাগাজিনটা আর চেম্বারটা দেখে নিয়ে আবার ম্যাগাজিনটাকে ঠেলে ঢুকিয়ে দিয়ে পিস্তলটাকে হোলস্টারে ঠেলে দিলাম। তবে বোতামটা আর বন্ধ করলাম না। যাতে প্রয়োজনে, এক লহমাতে হোলস্টার থেকে টেনে বের করা যায়। আমাদের দেশে এখন জান বাঁচানোর জন্যে পিস্তল রিভলভার বা অন্য কোনও আগ্নেয়াস্ত্রই রাখা যায় না। তা ব্যবহার করা, ব্যবহার না করার চেয়েও বিপজ্জনক। বিপদে পড়ে, লাইসেন্স যাদের আছে তারাই। চোরাই পিস্তল দিয়ে দিনে দুজন মানুষকে খুন করে বেড়ালেও তার কোনও দায়িত্ব নেই। ধরা আর কজন খুনি পড়ে এখানে! আইন যারা মানে, সব আইনই, তাদেরই সমূহ বিপদ!

ক্যামেরনের গেস্ট হাউসে আমরা যখন পৌঁছলাম তখন ঋজুদা বলল, ফ্যাক্স-এর উত্তর পেলি?

হ্যাঁ।

কী লিখেছে স্টিভ।

স্টিভকে ধরতে পারেনি তোমার বন্ধু রণ। এই দেখ।

FOR WRIJU BOSE, RANCHI/BIHAR/INDIA

DEAR WRIJU
SORRY! STEVE IS OUT FISHING. SPOKE TO HIS SISTER AND MOTHER. HE WILL SEND YOU A REPLY TOMORROW AT THE NUMBER GIVEN
LOVE!
TAKE CARE.
RON

নোটটা পড়ে ঋজুদা বলল, আই এস ডি-র বুথ-এ বলে এসেছিস?

হ্যাঁ। বলেছি, কিষুণকে পাঠাব আটটার মধ্যে। বাজার থেকে মাছ কিনে ফ্যাক্স মেসেজটা নিয়ে দশটার মধ্যে ফিরে আসতে পারবে, যাতে চাট্টি নদীতে পিকনিকে যেতে পারি আমরা।

পিকনিকে কেউ মাছ খায় শুনিনি তো!

ছোট মাছ ভাজা খাব। বড় মাছ যা পাবে তা ফ্রিজ-এ রাখতে বলব। মিস্টার লিন্ডওয়ালরা আমাদের খাওয়ালে আমাদেরও তো ওঁদের খাওয়াতে হবে একদিন। কিষুণকে মিষ্টিও নিয়ে আসতে বলেছি। এখানে তো ভাল মিষ্টি পাওয়া যায় না।

বাবাঃ। বুদ্ধি দেখি বেড়ে গেছে ম্যাকক্লাস্কিতে এসে।

ঋজুদা বলল, আমাকে।

আমি উঁচু বল পেয়েই স্ম্যাশ করলাম।

বললাম, বুদ্ধি বলে আমার কি আর কিছু আছে!

থাকবে না কেন? বুদ্ধি সকলেরই থাকে। তোর সুবুদ্ধি আর ভটকাই-এর কুবুদ্ধি।

আর তিতিরের?

তিতির তোদের দুজনের বুদ্ধির খটাখটি দেখে হতবুদ্ধি হয়ে গেছে।

তবে আমরা সকলেই বুদ্ধিজীবী তো!

তা তো নিশ্চয়ই! লেখাপড়া শিখলেই বুদ্ধিজীবী! তা সে মানুষ গাঁটকাটাই হোক কি মিথ্যাচারী, কি পরান্নপ্রত্যাশী। বুদ্ধিজীবীরাই আজ সবচেয়ে অসৎ, ধান্দাবাজ, নীচ, নীতিহীন। বুদ্ধিজীবী শব্দটার মানেই বদলে গেছে আমার কাছে।

তারপরই বলল, যা, তোরা চান-টান করে তৈরি হয়ে নে। আমরা ঠিক সাতটা কুড়িতে বেরোব। বোতলগুলো গাড়িতেই থাক কিযুণের জিম্মাতে।

তাই আছে।

ঠিক আছে। আমি চান করতে গেলাম।

হ্যাঁ। আমরাও যাচ্ছি।

.

লেভেল ক্রসিং-এর গেট বন্ধ ছিল। একটা প্রায় আধ কিমি লম্বা মালগাড়ি এল। সম্ভবত কয়লা নিয়ে আসছে। ধানবাদ বা রানীগঞ্জ এর খাদান থেকে। ওয়াগন যাচ্ছে তো যাচ্ছেই ঘটঘটর করে। শেষ নেই।

ভটকাই বলে উঠল, এ যে দেখছি সগর রাজা রে!

আমি আর ঋজুদা হেসে উঠলাম।

তিতির বলল, সে কে?

অ্যাই তো মেমসাহেব! ইংরেজিতে তুবড়ি ফোঁটাও। ফ্রেঞ্চ, জার্মান, অনর্গল বলতে পার, আর সগর রাজা যে কে, তাই জানো না। সগর রাজার ষাট হাজার ছেলে ছিল। এই ট্রেনটারও মনে হচ্ছে ষাট হাজার ওয়াগন।

আমরা গিয়ে পৌঁছলাম লিন্ডওয়ালদের ‘The Ucalypta’ বাংলোতে সাতটা বেজে পঁয়ত্রিশে।

গেট পেরিয়ে দুপাশের গাছ-গাছালির মধ্যে দিয়ে অনেকখানি গিয়ে বাংলোটা। চোদ্দ-পনেরো বিঘা জমি আছে মনে হয়। এখনও ফায়ার-প্লেস জ্বলে বেশি শীত পড়লে। রান্নাঘরের আর বসার ঘরের মাথার ওপরে ধুয়ো বেরবার জন্যে চারকোনা আকৃতির ইট-সিমেন্টের গম্বুজ মতো। ছবিতে ইংল্যান্ড বা স্কটল্যান্ডের বাড়িতে যেমন দেখা যায়। বারান্দাটা বেশ চওড়া। বড় বড় চেয়ার পাতা আছে। ঝুলছে পোড়ামাটির ছোট ছোট টবও, বারান্দার কাঠের কাঠামো থেকে। তিন-চার ধাপ সিঁড়ি বেয়ে বারান্দাতে উঠতে হয়। সাহেব আর মেমসাহেব আমাদের অভ্যর্থনা করলেন বারান্দাতে দাঁড়িয়ে। তারপর নিয়ে গিয়ে বিরাট লিভিংরুমে বসালেন।

ঋজুদা আমাকে বলল, কী রে রুদ্র। পোঁটলাটা আন।

আমি বললাম, পোঁটলা মানে?

আঃ মানে, প্রেজেন্ট-টা।

ও।

বলে গাড়িতে গিয়ে, রাঁচি থেকে কেনা জিনিসগুলো-ভরা প্লাস্টিকের ব্যাগটা নিয়ে এলাম।

ঋজুদা বলল, কিষুণকে বল, মাজিদকে নামিয়ে দিয়ে, ফিরে যাবে। খেয়েদেয়ে সাড়ে ন’টা নাগাদ যেন এখানে আবার আসে।

আমরা হেঁটে যেতে পারি না ফেরার সময়ে? সারাদিন তো বসাই বলতে গেলে।

তিতির বলল।

তাই ভাল। তাই বলে দে কিষুণকে। টর্চ এনেছিস কেউ?

টর্চ কী হবে? দ্যাখো না কেমন চাঁদ উঠেছে।

তিতিরই বলল।

ঋজুদা বলল, বাংলাতে কিন্তু আর কোনও কথাবার্তা নয়। সেটা অভদ্রতা হবে। কোনও ভাষা কেউ না জানলে সেই মানুষের সামনে সেই ভাষাতে কথা বলাটা চরম অভদ্রতা। আর ভটকাই, তুই যে বোবা ও কালা আমি ওদের জানিয়ে দেব। তুই বেঁচে গেলি। ইংরেজি বলতে হবে না। তুই হিন্দিটা বলতে পারলেও হত।

হিন্দি তো দারুণ শিখে গেছি। তুমি শোনেননি, তাই বলছ।

তিতির হেসে বলল, আমরা শুনেছি।

কখন?

যখন কিষুণের সঙ্গে বলছিলে।

কেমন? ভাল নয়।

আমি বললাম, গাধার পিঠে রাইডিং-এর মতো।

ভটকাই গুম মেরে গেল। তা দেখে বড় আহ্লাদ হল আমার।

বোবারা কিন্তু কালাও হয়।

ভটকাই ঋজুদাকে মনে করিয়ে দিল।

সেটা তুই মনে রাখিস, তাহলেই হবে।

বিরাট বসবার ঘরের দেওয়ালে একটা মস্ত বড় বাঘের চামড়া টাঙানো আছে। ভাল্লুকের মাথা। শম্বরের শিং। চিতল হরিণের মাথা। মাউন্ট করা। বহু পুরনো। নিশ্চয়ই মিসেস লিন্ডওয়ালের পৈতৃক সম্পত্তি হবে। ১৯৭২ থেকে শিকার বে-আইনি হয়ে গেছে। বে-আইনি শিকারের ট্রফি কেউ টাঙিয়ে রাখে না।

মিস্টার লিন্ডওয়ালের বয়স চল্লিশ মতো হবে। বেশ শক্ত সমর্থ সুপুরুষ। লম্বা। প্রায় ছ’ফিটেরও বেশি। ফ্ল্যানেলের কালো একটা ট্রাউজার-এর ওপরে বিস্কিট-রঙা টুইডের কোট। আর মিসেস লিন্ডওয়াল তো পরমা সুন্দরী। তাঁর বয়স ত্রিশ-বত্রিশ হবে।

ঋজুদা, আমাদের সকলের সঙ্গে একে একে তাঁকে আলাপ করিয়ে দিলেন।

ভটকাই-এর নাম শুনে, মিঃ লিন্ডওয়াল বুঝতে না পেরে বললেন, ভোডকা।

তিতির বলল, নো, নো। ভটকাই।

ঋজুদা ওঁকে তারপর বলল, গঞ্জে এসে সেটল করেন সাধারণত রিটায়ার্ড মানুষেরাই। সেই তুলনায় আপনি তো একেবারে ছেলেমানুষ। দ্বিতীয়ত এখানের আশিভাগ মানুষ যখন অস্ট্রেলিয়াতে চলে গেলেন এ দেশ ছেড়ে তখন আপনি অস্ট্রেলিয়া থেকেই এদেশে এলেন এইটা জেনেই আপনার সঙ্গে আলাপ করতে খুব ইচ্ছা হল। তা ছাড়া শিকারের কমন-ইন্টারেস্টও আরেকটা কারণ।

মিঃ লিন্ডওয়ালের ফাস্ট নেম কেনেথ আর মিসেস-এর ডরোথি।

কেনেথ হেসে বললেন উই আর অনারড। আপনার কথা আর একজন লেখকের কথা, এখানে আসার পর থেকে অনেকই শুনেছি বড়লোক-গরিবলোক অনেকেরই মুখে। তবে সেই লেখকই এই জায়গাটাকে ট্যুরিস্ট-স্পট বানিয়ে ফেলে এর সর্বনাশ করেছেন।

এখনও সর্বনাশ হয়নি কিন্তু। আশ্চর্য! আমিও তো বহুদিন পরে এলাম। ভিতরে ভিতরে জঙ্গল কাটা হয়েছে অবশ্যই, সেই আগের মতো নিবিড় বনাঞ্চলে মোড়া পাহাড়-উপত্যকা আর নেই। তবু এখনও সবুজ আছে, শান্তি আছে। এই বা কম কী?

তা ঠিক।

ঋজুদা মিসেস লিন্ডওয়ালের দিকে তাকাল। সিল্কের একটা সাদা ব্লাউজ আর কালো সিল্কের মধ্যে কাঁথার কাজের লাল ফুল তোলা একটা স্কার্টে তাঁকে পরীর মতো দেখাচ্ছিল।

তারপর বলল, আপনাকে আমি বলতে পারি যে, আপনার দিদিই বেশি সুন্দরী ছিলেন না আপনিই, তা বিচার করতে বসলে কাকে যে বেশি নম্বর দিতে হবে তা নিয়ে বিতর্ক উঠতেই পারে।

ডরোথি খুশি হয়ে বললেন, আপনি আমার দিদিকে চিনতেন?

বিলক্ষণ চিনতাম। মিসেস কিংকে কে না চিনত এখানে? ওরকম ডিগনিফায়েড সুন্দরী খুব কমই দেখেছি। আর কী ভাল কেক বানাতেন। একবার মনে আছে, আমার জন্মদিনে এখানে ছিলাম। আমার কিছু বন্ধু-বান্ধব এসেছিলেন। তাঁরাই গিয়ে মিসেস কিং-এর কাছে বার্থডে কেক-এর অর্ডার করে এল গিয়ে। অত সুন্দর ব্ল্যাক ফরেস্ট কেক কলকাতার স্কাইরুম বা তাজবেঙ্গলের পেশিপও করতে পারবে না। মনে আছে প্রতিদিন, প্রবল বর্ষার সময়টুকু ছাড়া, মিসেস কিং হেঁটে যেতেন আমার বাংলোর সামনে দিয়ে বিকেলে। কোথায় যেতেন তা বলতে পারব না। আমি আমার বারান্দাতে দাঁড়িয়ে তাঁকে উইশ’ করতাম। উনি ‘উইশ-ব্যাক’ করতেন। মিস্টার কিংকেই বরং দেখিনি কোনওদিন। কারণ উনি বিশেষ বেরতেনই না এবং আমিও কারও বাড়িতেই যেতাম না। মিসেস কিং-এর সঙ্গে হাঁটতে বেরিয়েও দেখা হত। এখানের বাংলো বিক্রি করে দেওয়ার অনেকদিন পরে কলকাতাতে বসেই একদিন প্যাট গ্লাসকিন-এর চিঠিতে যখন জানলাম যে উনি মারা গেছেন, ভীষণই দুঃখ পেয়েছিলাম।

ডরোথি বললেন, আমার জামাইবাবু তো মারা গেলেন তার পরপরই।

সে খবরও পেয়েছিলাম। কিন্তু ততদিনে গঞ্জ-এর সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে গেছিল।

এই প্যাকেটে কী আছে?

কেনেথ জিজ্ঞেস করলেন।

Some Booze, ঋজুদা বলল।

দিস ইজ নট ডান।

কেনেথ বললেন।

ইউ হার্ডলি নো আস।

কিন্তু আমাদেরও তো না-চিনেই নেমন্তন্ন করলেন ডিনারে। তা ছাড়া আমি আপনার বেটার-হাফকে তো চিনিই!

আপনার কথা আলাদা।

কেন?

ইউ আর আ সেলিব্রিটি।

কীসের জন্যে?

ফর ইওর ভার্সেটাইলিটি।

সো ইজ ইওর ওয়াইফ।

ফর হোয়াট?

ফর হার বিউটি।

সকলেই একসঙ্গে হেসে উঠলাম ও উঠলেন। কিন্তু হাসতে আরম্ভ করেই ভটকাই-এর মনে পড়ে গেল যে, ও কথাও বলতে পারে না, শুনতেও পায় না। তাই মাঝপথেই হাসি থামিয়ে ও একখানা মুখ যা করল, তা দেখে মনে হল ঢাকা আয়ুর্বেদিক ঔষধালয়ের সারিবাদি-সালসাই বুঝি আধ গেলাস গিলেছে এক চুমুকে।।

কেনেথ বললেন ঋজুদাকে, হোয়াটস ইওর ড্রিঙ্ক?

আপনি যা খাবেন তাই খাব। আমার নিয়মিত খাবার অভ্যেস নেই।

আমাদের তিনজনের চোখ কপালে উঠে গেল। ঋজুদা কখনই এসব খায় না। কেউ খেলে, অবশ্য বাধাও দেয় না। দুএকবার জঙ্গলে বিপদে-আপদে কনিয়াক খেতে দেখেছি আর বাঘমুন্ডার বাঘিনীটি যখন ঋজুদাকে আহত করে নন্দিনী নালার পাশে, তখন অংগুলের বিমলবাবুর দেওয়া স্কচ-হুঁইস্কি খেয়েছিল, স্ট্রেইট ফ্রম দ্যা বটল, ওষুধ হিসেবে, শক কাটাবার জন্যে, যাতে ঘুমিয়ে না পড়ে সে জন্যে।

কেনেথ বললেন, আমি কনটেসা রাম খাই। ডরোথিও তাই খায়। এখানে তো সবকিছু পাওয়া যায় না। রাঁচির এক আর্মি অফিসার আছেন তিনিই মিলিটারি কোটা থেকে তুলে রাখেন সস্তাতে, মাসে একবার রাঁচি গেলে নিয়ে আসি।

ঋজুদা বলল, আমি আপনারা কী খান তা না জেনে আন্দাজেই বাকার্ডি হোয়াইট রাম, গিলবীর্জ জিন আর ব্ল্যাকডগ হুইস্কি নিয়ে এসেছি। ব্ল্যাকডগ তো আজকাল এখানেই হচ্ছে।

বাঃ বাঃ করেছেন কী? এসব তো খুবই দামি জিনিস। এমন অপাত্রে দান। হাতে করে এনেছেনই যখন তাহলে আপনি হুইস্কিই খান।

না, না। এ সবই আপনাদেরই জন্যে। আমি, আপনারা যা খাবেন তাই খাব।

কেনেথ উঠে গেলেন লিভিং রুমের এক কোনাতে। সেখানেই তাঁর সেলার এবং ছোট্ট বার। ডরোথি ভিতরের খাবার ঘর থেকে বরফ নিয়ে এলেন। আর লেবুর স্লাইস। ডালমুট-এর একটি প্যাকেট খুলে বড় প্লেটে রাখলেন, তারপর আমাদের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বললেন, নাউ টেল মি ইয়াং ওয়ানস, হোয়াট আর ইওর ড্রিঙ্কস?

এনিথিং সফট।

তিতির বলল।

এখানে তো থাম্পসআপ বা কোক ভাল পাওয়া যায় না। ওসব আজকাল জালও হয় শুনি। তোমাদের অরেঞ্জ স্কোয়াশ বা লেমন স্কোয়াশ-এর সঙ্গে ঠাণ্ডা জল আর বরফ দিয়ে শরবত করে দিই?

ফাইন।

তিতির বলল।

তোমাদের বরফ দেব তো? না কি গান গাও কেউ?

হ্যাঁ, বরফ দিতে পারেন সকলকেই।

আমি বললাম।

ভটকাই সেই যে ইংরেজি বলতে হবে, সেই ভয়ে হাঁ হয়ে রয়েছে তো রয়েছেই। এমন করেই হাঁ করে আছে যে মুখে মশা ঢুকে যায়।

আইস ফর ড্য? মিঃ বোস?

ইয়েস প্লিজ! প্লেন্টি।

সকলের পানীয় যখন দেওয়া শেষ হল তখন ডরোথি বললেন, আমি একবার কিচেনে গিয়ে অবস্থাটা দেখে আসি। তোমরা গল্প করো। আমি এই এলাম বলে।

তিতির দাঁড়িয়ে উঠে বলল, ডু ইউ নিড এনি হেল্প মিসেস লিন্ডওয়াল?

থ্যাঙ্কস আ লট। কোনও দরকার নেই। আমার একজন মেইড আছে সাহায্য করার জন্যে। তোমরা গল্প করো।

মাজিদ বলছিল আপনার শিকারের খুব শখ আছে।

ছিল। একসময়ে।

তারপরেই বলল, আমাদের নেবার লেফটেন্যান্ট কর্নেল রামদাস-এর বাড়িটা এখন দেখলে তার আগের রূপ ভাবতেও পারবেন না। একেবারেই অন্যরকম ছিল। খামারবাড়ি যেমন হওয়া উচিত আর কী। এটা ছিল দাশগুপ্তর বাড়ি। ওঁরও শিকারের শখ ছিল। বাড়িটার সঙ্গে পেছনের জঙ্গলের সীমানার তো কোনও ঝগড়া ছিল না। শুয়োর, লেপার্ড, ভালুক সবই আসত।

আমার বাংলো থেকেও তো একদিন মালীর কুকুর নিয়ে গেল লেপার্ডে। পেছনের নালাতে ছিল ধেড়ে ধেড়ে শেয়ালের আড্ডা। রাতের বেলা বাংলোর হাতাতে ঢুকে এসে কামড়াকামড়ি করে পেয়ারা খেত।

ঋজুদা বলল।

সত্যি। এখানের গোরুরা, কুকুরেরা, শেয়ালেরা সকলেই পেয়ারা খায়। পরিবেশের সঙ্গে মানুষ এবং প্রাণী কী দারুণ মানিয়ে নেয় ভাবলেও ভাল লাগে।

এবারে বলুন শুনি শিকারের কথা। কী কী শিকার করেছেন আপনি অস্ট্রেলিয়াতে? এখানেই বা কী মারলেন? শুনেছি, আপনার নিজের ওয়েপন নেই?

না। এখানে নেই। তবে ওখানে ছিলই। অনেকই ওয়েপন ছিল আমার। যেমন সব স্পোর্টসম্যানেরই থাকে।

অস্ট্রেলিয়াতে কি শিকার-প্রাণী তেমন কিছু আছে?

আমি পূর্ব আফ্রিকাতেও সাফারি করেছি। উত্তর আমেরিকাতেও পারমিট নিয়ে। মুজ মেরেছি।

তাই? উত্তর আমেরিকাতেও? তা অস্ট্রেলিয়া তো শুনেছি ভীষণই সুন্দর জায়গা। দ্যা গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ–আরও কত কী আছে দেখবার। না?

হ্যাঁ। তাই ভাবি মাঝে মাঝে। কার ভাগ্য কার জীবন যে কবে কোথায় টেনে আনে কে বলতে পারে! ডরোথির সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল অস্ট্রেলিয়াতেই। এখানের মানে গঞ্জ-এর মিস্টার অ্যান্ড মিসেস কাব্রাল সিডনিতে সেটল করেছেন।

আরে! চেনেন না কি তাঁদের। আমি তো মিস্টার কাব্রাল-এর মেয়ের কাছ থেকেই গঞ্জ-এর বাংলোটা কিনি। আমাকে বিক্রি করার পরই তো ওঁরা অস্ট্রেলিয়াতে চলে গেলেন। তাঁর স্বামী মাইনিং ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। নামটা মনে করতে পারছি না।

ওর নাম জোসেফ।

হ্যাঁ। হ্যাঁ। মনে পড়েছে।

তারপর?

তারপর আর কী? আমি তো অস্ট্রেলিয়ার বাসিন্দা নই, আমিও গেছিলাম সেখানে বেড়াতেই। ডরোথির সঙ্গে কাব্রোলদের বাড়িরই এক পার্টিতে দেখা হল। তারপরই আমার জীবনের এই নতুন অধ্যায়।

তারপর একটু চুপ করে রইলেন তিনি। এমন সময়ে ডরোথি এসে ঘরে ঢুকলেন।

কেনেথ বললেন, ডরোথির সঙ্গে প্রেমে পড়লাম প্রথম দর্শনেই। যাকে বলে, হেড ওভার হিলস। কিন্তু ডরোথি ফেলল আমাকে বিপদে। সে বলল, দিদি-জামাইবাবুর কোনও ছেলেমেয়ে ছিল না আমার বাবা-মায়েরও আর কোনও সন্তানই ছিল না। সকলেরই যা-কিছু স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ছিল তা আমাকেই তাঁরা দিয়ে গেছিলেন। তার মূল্য টাকাতে বেশি নয়। কিন্তু সেন্টিমেন্টে অনেকই। আমি বললাম, আমি একজন ভাস্কর। পশ্চিমী দেশে বা নিদেনপক্ষে অস্ট্রেলিয়াতে। থাকলেও আমি যা উপার্জন করতে পারব তা যথেষ্ট আমাদের দুজনের পক্ষে। তোমাকে রানির মতো রাখতে পারব। কিন্তু…

কিন্তু কী?

কিন্তু ডরোথি বলল আমেরিকার বা অস্ট্রেলিয়ার সংস্কৃতির সঙ্গে আমার খাপ খায় না। তোমরা সবসময়ই ওপরের দিকে চেয়ে আছ। আমার দেশ ভারতবর্ষ। ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জে যাও তো দেখবে নির্জনে অমন কাজের পরিবেশ কোথাওই নেই। তোমাকেও আমি ভারতীয় দর্শনে প্রভাবিত করব।

বাঃ।

ঋজুদা বলল, একটা টাক শব্দ করে গ্লাসটা শেষ করে, সাইড টেবল-এ নামিয়ে রেখে।

আমরা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম ঋজুদার দিকে। কেনেথ ও ডরোথিও একটু অবাক হলেন, কারণ তাঁদের গ্লাস-এর এক-তৃতীয়াংশও খালি হয়নি তখনও।

কেনেথ উঠে বললেন, লেট মি ফিল উওর গ্লাস।

ঋজুদা বলল, নো নট নাউ। একসঙ্গেই নেব। তোমরাও বটমস আপ করো তাড়াতাড়ি। তারপরে।

আমি বুঝলাম পেট থেকে কথা বের করার জন্যে ঋজুদা ওঁদের বেশি মদ্যপান করাতে চায়। ওঁরাই যদি মাতাল হয়ে যান, মানে, যাঁরা রোজ এসব ছাইভস্ম খান, তাহলে তো ঋজুদাকে কাঁধে করে বয়ে ক্যামেরনের গেস্ট হাউসে নিয়ে যেতে হবে আমাদের।

আমরা তিনজনেই মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগলাম।

কেনেথ ও ডরোথি ঋজুদাকে কোম্পানি দেবার জন্যে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওঁদের গ্লাস শেষ করলেন। ডরোথি বললেন, ওয়েল, ইফ আই গেট ড্রাঙ্ক, ড্য ওন্ট হ্যাভ এনি ডিনার। মাইন্ড উ্য।

ডাজনট ম্যাটার।

ঋজুদা বলল।

হঠাৎ ডরোথি তিতিরকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা সকলেই পর্ক খাও তো?

ঋজুদা কথা কেড়ে বলল, শুয়োর তো রামচন্দ্রও খেতেন। শুয়োর কে না খায়।

ভাবলাম, এক গ্লাস খেয়েই কথা কাড়তে শুরু করল, এর পরে আর কী কাড়বে কে জানে।

বোবা ও কালা ভটকাই আপত্তি জানাতে চাইল খাওয়ার ব্যাপারে কিন্তু কী করে আপত্তি করবে ভেবে পেল না।

আমি ওর অবস্থাটা খুবই উপভোগ করছিলাম। তিতিরই ওকে শেষমেশ বাঁচাল। বলল, ভটকাই-এর জন্যে ডিমের যদি কিছু একটা করে দিতে বলেন। মেইডকে…

নিশ্চয়ই! বাই অল মীনস। তা ছাড়া, চিকেন বাটার-মশালাও আছে। পর্ক-এর ভিণ্ডালু করেছি।

ঋজুদা বলল, বাঃ।

ওরে রুদ্র। জমে যাবে আজ।

আমার লজ্জা করতে লাগল। আমরাই বুঝে গেলাম যে ঋজুদার নেশা হয়ে গেছে, তাহলে ওঁরা কী মনে করছেন!

‘ধূর্ত’ শব্দটা খারাপ অর্থেই ব্যবহৃত হয় কিন্তু আজ রাতে ঋজুদা যেভাবে কেনেথকে ফাঁসাবার জন্যে ধাপে ধাপে এগোচ্ছে তা দেখে ঋজুদা সম্বন্ধে আর কোন শব্দ ব্যবহার করব তা বুঝে উঠতে পারছিলাম না। মনে হল, কেনেথ বড় সরল আর ভাল মানুষ। সে যদি সত্যিই খুন করে থাকে স্টিভ এডওয়ার্ড-এর বন্ধুকে, কী করে করল সেই জানে। সত্যি সত্যি খুন তো নাও করে থাকতে পারে। স্টিভের কথাই যে ধ্রুব সত্যি তা ঋজুদা জানল কী করে! স্টিভেরও অন্য কোনও কারণে কেনেথের বা ম্যাক-এর ওপরে যে কোনও বিদ্বেষ নেই তাই বা জানল কী করে।

নানা কথা বলতে বলতে কেনেথ অনেকগুলো রাম খেয়ে ফেললেন। ঋজুদাও সমানে তাঁর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলল।

তিতির আমাকে আস্তে আস্তে ফিসফিস করে বলল রুদ্র তুমি কি হেঁটে গিয়ে কিমুণকে গাড়িটা নিয়ে আসতে বলবে? এরপরে কী হবে জানি না। রাত সাড়ে নটা বাজতে চলল। বাইরে তো নিশুতি রাত।

আমি বললাম, পাকালাম। তামিলনাড়ুর কামরাজ নাদার-এর মতো। পাকালাম একটি তামিল শব্দ। মানে হল, wait and see! এই শব্দটি প্রয়োজনে আমি আর তিতির দুজনেই ব্যবহার করি।

নানা কথার তোড়ে, হাসির বানে, শিকারের স্মৃতিচারণের মধ্যে দিয়ে কেনেথ যে কখন ঋজুদার পাতা ফাঁদে পা দিয়ে ফেললেন তা তিনি বুঝলেন না। গল্প করলেন উত্তর কানাডাতে মুজ মারার। বললেন, তাঁর সবচেয়ে প্রিয় রাইফেল ছিল হল্যান্ড অ্যান্ড হল্যান্ডের তৈরি পয়েন্ট থ্রি সেভেন্টি ফাইভ ম্যাগনাম। ডাবল ব্যারেল। কিন্তু মুজ-এর মতো বড় জানোয়ার, আফ্রিকাতে সিংহ, আমেরিকাতে জাগুয়ার বা বাইসন মারতে উনি ব্যবহার করতেন পয়েন্ট ফোর ফিফটি ফোর হান্ড্রেড ডি বি বি এল জেফরি নাম্বার টু।

ঋজুদা বলল, আমারও একটা করে আছে। জেফরির এ রাইফেলটা দিয়েই সুন্দরবনে এবং অন্যত্রও মানুষখেকো মেরেছি।

আমি হেসে বললাম, গত শীতে বাঘমুন্ডার বাঘিনী ম্যানইটারটা কী দিয়ে মেরেছিলে তাও বলো।

ঋজুদা হেসে উঠল।

কেনেথ আর ডরোথি হাসির কারণ না বুঝে বোকার মতো চেয়ে থাকলেন। মাতাল হলে মানুষকে বেশি বোকা লাগে।

গত বছর মেরেছেন?

হ্যাঁ। ম্যানইটার ডিক্লেয়ার্ড হয়েছিল তো। ওড়িশাতে।

আবারও কখনও গেলে আমাকে খবর দিয়ো কিন্তু।

ঋজুদা বলল, শ্যওর। ইটস আ ডিল।

ঋজুদার চোখ-মুখের ভাব যেন কেমন হয়ে গেছে। চোখদুটো লাল। কীরকম চোখে যেন তাকাচ্ছে ডরোথির দিকে। ডরোথি নিজেও অনেক মদ খেয়েছেন বলেই বোধহয় তা বুঝতে পারছেন না।

ভটকাই প্রায় আমার কানে কানে বলল, যতই সুন্দরী তোক আমার সেশ্যেলস-এর বউদির মতো নয়।

আমি হেসে ফেললাম।

খাওয়াদাওয়া শেষ হতে হতে প্রায় সাড়ে দশটা বাজল। দারুণ ভাল ক্যারামেল কাস্টার্ড বানিয়েছিলেন ডরোথি।

ঋজুদা জিভ দিয়ে বলল, নো ওয়ান্ডার। কার বোন তা দেখতে হবে তো।

আপনারা কদিন আছেন?

আমরা কালই চলে যাচ্ছি।

ঘরের মধ্যে বোমা ফাটিয়ে বলল, ঋজুদা।

আমি ভাবছিলাম, এই জন্যেই বাবা বলেন, মদ খাওয়া খুবই খারাপ।

ইসস। কালকেই? এক-দুদিন থাকলে এদের জন্যে একটু কেক করে পাঠাতাম।

পরের বার হবে। আমাদের একটু ডালটনগঞ্জে যেতে হবে। সেখানে আমার ছোট ভাইয়ের মতো, মোহন বিশ্বাসের শরীর খুবই খারাপ। ব্লাড সুগার ভীষণ হাই হয়ে গেছে। এদিকে এলামই যখন, তখন দেখেই যাই একটু।

ভটকাই-এর মুখ দেখে মনে হচ্ছিল বোবা এবারে কথা বলবেই। পৃথিবীর কোনও শক্তিই তাকে আটকাতে পারবে না।

আমি আর তিতির বুঝলাম ওর মাথাতে চাট্টি নদীর পিকনিক ঘুরছে। কিন্তু ঋজুদা কী করে, কেন করে, কখন করে, অন্য আনপ্রেডিকটেবল মানুষদেরই মতো তা শুধু সে-ই জানে!

ডাইনিং রুম থেকে লিভিং রুম-এ এসে ঋজুদা বলল, এরপরে একটু ড্রামুই অথবা কনিয়াক অথবা কোয়াস্ত্র হলে একেবারে জমে যেত।

ওসব কী জিনিস, খায় না মাথায় মাখে, আমাদের কারোরই জানা ছিল না।

কেনেথ আর ডরোথি খুবই লজ্জিত হলেন। বললেন সরি। আমার কাছে যে কিছুই নেই। দাঁড়াও! টাকাপয়সা সব আনাই। ইন্ডিয়ান সিটিজেন হয়ে নিই, তারপর তোমাদের আলাদা করে ডাকব তখন কলকাতা থেকে।

এই যে আমার কার্ড।

ঋজুদা পার্স খুলে কার্ড বের করে দিল।

অথচ কারোকেই সচরাচর দেয় না।

কেনেথ ডরোথিকে দেখিয়ে বলল, এখানে ওই আমার কার্ড।

তারপর বলল, পরের বার বন্দুক নিয়ে এসো শীতে। তখন কুলথি আর অড়হর ডাল খেতে আসে শম্বর, আর এখন থাকলে কালই শুয়োর মারতে পারতে মকাই-এর ক্ষেতে।

ডরোথি বলল, তুমি কার কাছে কী বলছ। মায়ের কাছে মাসির গল্প। ঋজু বোস জানেন না এমন কোনও খবর নেই ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জের।

হঠাৎই ঋজুদা উঠে পড়ে একে একে দুজনের হাত ধরে বলল, ওয়েল ইট ওজ, ভেরি ভেরি নাইস মিটিং ঊ্য টু। কাম অ্যান্ড ভিজিট মি অ্যাট ক্যাল। আই হ্যাভ আ স্পেশাস ফ্ল্যাট ইন আ নাইস নোকালিটি। উ্য মে পুট আপ উইথ মি, ইফ জ্য উইশ। আই উইল ফিল অনার্ড।

‘পুট আপ’ মানে, ওঠা বুঝলাম। কোথায় উঠেছেন? ইংরেজি হবে ‘হোয়ার হ্যাভ উ্য পুট আপ’ বুঝলাম। ভাল করে কান খুলে শুনলে যাঁরা ইংরেজি ভাল জানেন, শুধু ইংরেজিটাই কেন, যে-কোনও ভাষাই, শিখে নেওয়া যায় একটু একটু করে। তবে শেখার ইচ্ছেটা থাকা চাই।

ওঁরা বড় রাস্তা অবধি আমাদের পৌঁছে দিলেন দুজনে। তারপরে ‘গুডনাইট’! ‘গুডনাইট’! করে আমরা রওনা হলাম। ঋজুদা ডরোথির ধবধবে নরম ডান হাতটা নিজের হাতে নিয়ে সামনে ঝুঁকে তাঁর হাতের পাতাতে একটা আলতো চুমু খেল। ইংরেজি সিনেমাতে যেমন দেখা যায় আর কী! আজ একেবারে সাহেব হয়ে গেছে ঋজুদা।

একই অঙ্গে কত রূপ।

ভাবছিলাম, ঋজুদার সত্যিই অনেকই রূপ। যেখানে যেমন মানায়।

তিতির বলল, এত রাত হয়ে গেল, ডাকাতি করবে না তো কেউ?

কেনেথ কথাটা শুনে বললেন, এখানের মানুষেরা খুবই ভাল। কৃতজ্ঞও। গরিব, তাই ছিনতাই-টিনতাই করে মাঝে মাঝে। মানে মাগিং আর কী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *