ঋজুদার সঙ্গে ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জে – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

মালপত্র নামিয়ে দিয়ে আমরা স্টেশনটি দেখতে গেলাম। স্টেশন দেখাও হবে, গাড়ির খোঁজও করা যাবে। কিষুণকে ছেড়ে দেওয়াই মনস্থ করেছে ঋজুদা। কিষুণ শনিবারই চলে আসবে দুপুরে। কোনও কারণে যদি আমরা যাওয়াটা পিছেই তবে ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জ স্টেশনের মাস্টারমশাইকে দিয়ে ডালটনগঞ্জে স্টেশনমাস্টারকে টক্কা-টরে টক্কা-টরে করে খবর দিয়ে দিলে উনি মোহন বিশ্বাসকে ফোন করে দেবেন কিষুণকে পাঠিয়ে দেবার জন্যে। ফোন পেয়েই মোহনবাবু কিষুণকে পাঠিয়ে দেবেন।

রাঁচিতে এস ই আর হোটেলে ফোন করে টিকিটেরও বন্দোবস্ত করে দেবেন। নইলে ডালটনগঞ্জ থেকে শক্তিপুঞ্জ এক্সপ্রেস-এর টিকিটও করতে পারেন। অথবা রাঁচি থেকে প্লেনের টিকিট।

মানে? যদি ফিরে যাওয়ার দিন এগনো-পেছনো হয়। রিটার্ন টিকিট তো তুমি কেটেই এসেছ।

তিতির বলল।

ইয়েস।

ঋজুদা বলল।

মোহন বিশ্বাসকে সকলে ‘দ্য প্রিন্স অফ পালাম’ বলেন। পালা জেলা তো বটেই, রাঁচি থেকে নিয়ে একদিকে নেতারহাট, অন্যদিকে চাইবাসা, আর একদিকে ডালটনগঞ্জ হয়ে ঔরঙ্গা রোড, রাংকা আর আরও অন্যদিকে চান্দোয়াটোড়ি হয়ে চাতরা অথবা বাঘরা মোড় হয়ে সীমারিয়া টুটিলাওয়া হয়ে হাজারিবাগ পর্যন্ত প্রিন্স অফ পালামুর রাজত্ব বিস্তৃত। এই পুরো এলাকাতেই His wish is a com mand to all.

প্লাটফর্মটি উঁচু নয়, মাটিরই সমতলে। রেল লাইনের ওদিকেও জঙ্গল। তারই ফাঁকফোকর দিয়ে দু-একটি বাড়ি চোখে পড়ছে।

তিতির বলল, এইরকম প্লাটফর্ম আমি জীবনে দেখিনি।

তোমার জীবনটা তো বেশি লম্বা হয়নি এখনও মা!

ভটকাই বলল তিতিরকে।

মিসেস কার্নির দোকানের সিঙাড়া খাবি তোরা?

ব্রেকফাস্ট তো খেয়েছি দু’ঘণ্টাও হয়নি।

তা হোক। মিসেস কার্নি তো মারা গেছেন আজ বহুদিন হল। ভারী ভাল ছিলেন মহিলা, শেষ জীবনে গরিব হয়ে গেছিলেন খুব কিন্তু আত্মসম্মানজ্ঞান একটু টলেনি। অ্যাংলো ইন্ডিয়ানদের মধ্যে সাহেবদের ভাল গুণ-এর অনেকই দেখেছি আমি, দোষেরই সঙ্গে। কিন্তু মিসেস কার্নি একজন মহীয়সী মহিলা ছিলেন। তোদের দুর্ভাগ্য যে, তোদের দেখাতে পারলাম না তাঁকে। এক একটা জায়গার সঙ্গে একেকজন মানুষের স্মৃতি এমন করে মিশে যায় যে, যাঁরাই তাঁকে চিনতেন, তাঁদেরই চোখে জায়গাটার চরিত্রই পাল্টে যায়, যদিও পথঘাট, পাহাড়-জঙ্গল বাড়ি বাংলো সব একইরকম থাকে।

এই সিঙাড়া আমি খাব না, এ নির্ঘাত ট্রাকের পোড়া-মবিলে ভাজা।

এই সিঙাড়াই সকলে চাঁদমুখ করে খাচ্ছে দেখছিস না! এ সব খাস না বলেই তো তোদের ইম্যুনিটি কমে যায়। তোরা কি সব আমেরিকান হয়ে গেলি না কি? বাতিকগ্রস্ত! এটা খাব না ওটা খাব না, মিনারাল ওয়াটার ছাড়া খাব না। যত্ত সব!

বলল ঋজুদা।

তারপর বলল, তোরা ওই গাছতলার সিমেন্টের বেঞ্চটাতে বোস। আমি গিয়ে দেখি, একটু কথাবার্তা বলি। ওইটাই তো এখন ম্যাকক্লাস্কির ক্লাব। গল্প-গাছা শুনেও আমাদের উদ্দেশ্য সফল হতে পারে।

একটি মুসলমান লোক, মাঝবয়সী, দোকানের মালিক, মিসেস কার্নি নাকি তাকেই দিয়ে গেছেন দোকানটা। তখন সে ছেলেমানুষ ছিল, মিসেস কার্নির ডানহাত। রুটির ফ্যাক্টরি ছিল। রুটি বানাতেন, কেক বানাতেন। ভারী মিষ্টি হাসি ছিল বুড়ির।

আমি বললাম, আমিও তোমার সঙ্গে যাই ঋজুদা ভিতরে?

চল। বলেই ভটকাইদের দিকে ফিরে বলল, তোরা ছিনছিনারি দ্যাখ। গরমাগরম ভেজে পাঠাচ্ছি সিঙাড়া। চা খাবি তো?

তিতির বলল, না।

ভটকাই বলল, ইয়েস।

ঋজুদার চেহারা গত পঁচিশ বছরে অনেকই পাল্টে গেছে যদিও তবুও মালিক তাঁকে চিনতে পেরে সেলাম করল।

ম্যায় তো বিলকুল বুঢ়ঢ়া বন চুকে হ্যায়, তুম পহচানে কেইসে হামে?…

ম্যায়ভি তো খুদই বুঢ়া বন গ্যায়ে সাহাব। আপকী ক্যা কসুর?

ইয়ে বাত তো সাহি হ্যায়।

তারপর ঋজুদা আমার সঙ্গে তার আলাপ করিয়ে দিয়ে বলল, এ মাজিদ। আর এ হল রুদ্র রায়, রাইটার।

তারপর বলল, ম্যাকক্লাস্কির চেহারা তো অনেকই পাল্টে গেছে। পুরনোদের মধ্যে কারা কারা আছেন আর নতুন এলেন কারা কারা?

পুরনো সাহেবদের মধ্যে অর্ধেক মরে গেছে আর অর্ধেক অস্ট্রেলিয়া চলে গেছে। হলাণ্ডুয়া সাহেবকে মনে আছে? আপনার বাড়ির উল্টোদিকে, নালার পাশে ঝুপড়ি মতো জায়গাতে যে বাড়ি…

হ্যাঁ হ্যাঁ মনে থাকবে না! অস্ট্রেলিয়া থেকে এসেছেন বলতেন। তখনই তাঁর আশি বছর বয়স ছিল। বুড়ি ছিল পোলিশ।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, হলাণ্ডুয়া, সাহেবের নাম ছিল?

ঋজুদা হেসে বলল, নারে। নাম ছিল হল্যান্ড। এরা ডাকত হল্যান্ডুয়া বলে। প্যাট গ্লাসকিনকে ডাকত, ল্যাংড়া লাসকিন। ব্রিগেডিয়ার স্টিভেন্সকে ডাকত, বিগাড়িও সাহাব বলে।

আমি হেসে বললাম, তাই?

ঋজুদা জিজ্ঞাসা করল মাজিদকে, কী ভাল হবে এখন?

আলুর চপ খান সাহাব। একেবারে গরম গরম ভেজেছি।

বেশ তাই দাও। আর বাইরে দু প্লেট পাঠাও। একজন চা খাবে। দুধ চিনির ব্যাপারটা জিজ্ঞেস করে নিও।

ঠিক আছে।

তারপর মি. হল্যান্ডের সম্বন্ধে কী যেন বলছিলে তুমি? হল্যান্ডুয়া আর বুড়ি দু’জনেই মরে গেল ছ’মাসের মধ্যে। তাদেরই এক ভাতিজা এসেছেন দেশ থেকে। বেশ পয়সাওয়ালা লোক। বুর্থস ফার্ম-এর দিকে একটা ছোট বাড়ি কিনে থাকে। খেতি-জমি করে। কিংসসাহেবের ছোট শালী, যিনি হান্টারগঞ্জে থাকতেন, তাঁকে বিয়ে করছেন। নিজেদের ছেলেমেয়ে নেই।

পোপাষা মুরগিরা ডিম পাড়ে প্রচুর। আমি তো ওঁর কাছ থেকেই ডিম কিনি।

কী মুরগি?

রোড আইল্যান্ড, লেগ-হর্ন। বড়কা বড়কা ডিম হয়। সাহেবদের কাছে মুরগিও বিক্রি করেন। এখন যাঁরা থাকেন এখানে তাঁদের মধ্যে অনেকেই বাড়ির বাগানে মুরগির বার-বি-কিউ করেন। এখন এই ফ্যাশান হয়েছে। আগে সাহেবরা করত সাকলিং-পিগ-এর।

সেটা কী জিনিস?

আমি ঋজুদাকে বললাম।

ঋজুদা বলল, সাকলিং-পিগ।

ওঃ। আমি হেসে ফেললাম। দুগ্ধপোষ্য শুয়োরছানা। মনে ছিল না।

এখানে নাকি আজকাল ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়া হচ্ছে খুব?

তা হচ্ছে। আগে ওসব ছিল না। সাহেবরা খুব সাফ-সুতরো থাকত। এখন। বেশিই আমাদেরই মতো রাঁচি জেলার লোক। বস্তিও হয়ে গেছে দু-তিনটে।

তারা কারা?

বাংলাদেশ-এর যুদ্ধের পরে পশ্চিম বাঙ্গাল দিয়ে বর্ডার পেরিয়ে আসা অনেক বিহারি মুসলমানরা। আমরা তো ছিলামই এখানে। কী করবে। তারাও মুরগি পুষছে, যা পারছে তাই করছে, খিলাড়ির খাদানে কাজ নিয়েছে। জবরদখল জমিতে আন্ডাবাচ্চা নিয়ে ঘিঞ্জি হয়ে থাকে। ক্রিশ্চানরা অনেক পরিষ্কার। আমরা তো সাহাব তা নয়। এই তো সেদিন ডরোথি মেমসাব প্রায় মরো মরো হয়েছিল। মান্দারের মিশনের হাসপাতালে গিয়ে কোনওক্রমে জান বাঁচে।

ডরোথি মেমসাব কে?

ওই যে বললাম না কিং সাহেবের ছোট শালী। তাকে অস্ট্রেলিয়া থেকে আসা লিন্ডাল সাহাব বিয়ে করেছে।

লিন্ডাল সাহেবের বয়স কত হবে?

এই হবে চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ। সাহাব-মেমসাহাবদের বয়স তো ঠিক ঠাহর করতে পারি না আমরা!

তারপরই বলল, লিন্ডাল সাহেব খুব ভাল শিকারি। নিজের বন্দুক রাইফেল নেই যদিও, মুংগতুরামের বেপাশি বন্দুক দিয়ে প্রায়ই শুয়োর ধড়কে দেয়।

তোমরা তো মুসলমান। শুয়োর খাওয়া তো তোমাদের হারাম।

ঋজুদা বলল।

তওবা, তওবা সাব। আমরা খাব কোন দুঃখে। কিন্তু আমরা না খেলে কী হয়? এখানের আদিবাসী কুলিনকামিন, ঠিকাদারবাবুরা বাঙালি আর বিহারিবাবুরা সবাই ‘ভিন্ডিলি’ না কী বলে, তাই বানিয়ে খায়।

আমি বললাম, ভিন্ডিলিটা কী ব্যাপার?

ঋজুদা বলল, ভিন্ডালুই হবে। সবই কি আর জিজ্ঞেস করতে হয়? ও তো আর তোর মতো লেখাপড়া-না জানা ইংরেজিনবিশ নয়! লিন্ডওয়ালকে লিন্ডাল বলে ওরা, ভিভালুকে ভিডিলি। তাতে কীই-বা এল গেল।

লিন্ডওয়াল সাহেব বুঝি অস্ট্রেলিয়াতে শিকার করতেন?

বলেন তো তাই। ওখানে ঘোড়ার মতো বড় একরকমের হরিণ আছে– আমাদের সম্বরের মতো। তাই মেরেছেন ওখানে অনেক।

তারপরই বলল, আমি দিয়ে আসি ওঁদের আলু-চপগুলো বাইরে। স্যালাড দেব কি?

ঋজুদা একটা অ্যালুমিনিয়ামের গামলাতে কেটে-রাখা শশা পেঁয়াজ টম্যাটো ইত্যাদির দিকে এক ঝলক তাকাল। আমি দেখলাম জল ছাড়ছে সেগুলো থেকে।

ঋজুদা বলল, লাগবে না।

চলে গেলে বলল, জানিস তো কাঁচা-পেঁয়াজের মতো ভাল জিনিস খুব কমই আছে। নিয়মিত পেঁয়াজ খেলে যক্ষ্মা হয় না, সর্দি কাশি হয় না, প্রচুর স্ফুর্তি ও কাজের ক্ষমতা পাওয়া যায়।

তাই ট্রাক-ড্রাইভারেরা অত খায়!

আমি বললাম।

শুধু তারাই কেন, যে-কোনও বন্দরের মুসলমান অবাঙালি কুলিরা দেখবি কত কাঁচা পেঁয়াজ খায়। তাদের গায়ে কত জোর। কত পরিশ্রম করতে পারে তারা! রসুনও ভাল।

তারপর বলল, তোর জানার কথা নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে বার্মাতে, এখনকার, মায়ানমারে যখন বেধড়ক মার খাচ্ছে ব্রিটিশরা, তখন জেনারেল উইংগেট বলে এক ইংরেজ জেনারেল বার্মার জঙ্গলে মারাত্মক সব কাণ্ড-মাণ্ড করেছিলেন। তাঁর সৈন্যদলকে বলা হত ‘উইংগেস্টস সার্কাস’। সেই উইংগেট নাকি শুধু কাঁচা পেঁয়াজ খেয়েই থাকতেন এমনই জনশ্রুতি আছে পৃথিবীর তাবৎ সৈন্যমহলে।

তাই?

আমি বললাম, অবাক হয়ে।

ঋজুদা বলল, ঠিক তাই।

তা যেমন ঠিক তেমন এও সকলেরই জানা উচিত যে পেঁয়াজ খাবার সময়েই ছাড়িয়ে নিয়ে খেতে হয়। আগে ছাড়িয়ে রাখলে রাজ্যের যত রোগের বীজাণুর বাসা হয়ে যায় তারা। অনেক আগে ছাড়িয়ে বা কেটে-রাখা পেঁয়াজ খেলে উপকারের চেয়ে অপকার অনেকই বেশি হয়।

তাই?

তাই তো। কিন্তু যেকর্মে এখানে আসা তার কিছু সূত্র কি পাওয়া গেল?

ঋজুদা বলল।

কীসের সূত্র?

আমি বললাম।

বুঝলি না?

না তো।

নাঃ। ভটকাইকেই দেখছি ডাবল-প্রমোশন দিয়ে তোর জায়গাতে আনতে হবে। ও আমার সঙ্গে থাকলে ঠিকই বুঝতে পারত কী বলতে চাইছি।

লজ্জায় আমার কান লাল হয়ে গেল।

বললাম, কী? ডরোথির স্বামী লিন্ডওয়ালই আসলে ম্যাক টেইলর?

আসলে কি না বুঝতে পারছি না এখনও, তবে গড়বড় একটা আছে।

কেন একথা বলছ?

বলছি, কারণ অষ্ট্রেলিয়াতে তো সম্বার অথবা সম্বরের মতো বড় কোনও জানোয়ার নেই, ক্যাঙারু ছাড়া।

ক্যাঙারুর বর্ণনাই বোধহয় ও দিল।

আমি বললাম, ও মানে?

মানে, মাজিদ।

ও কি আর মুজ-এর নাম শোনেনি?

মুজ-এর নাম ও কোথা থেকে শুনবে? উত্তর আমেরিকা আর কানাডার বরফাবৃত অঞ্চলের মুজ-এর কথা আর ক’জন জানে? অ্যালগারনন ব্ল্যাকউড-এর কথাই বা ক’জনে শুনেছে?

ইতিমধ্যে মাজিদ ফিরে এল তিতির আর ভটকাইকে গরম গরম আলুর চপ আর চা দিয়ে।

ঋজুদা বলল, বুঝলে, এবারে আমাদেরও দাও।

জি সাহাব।

ও আমাদের খাবারটা ঠিকঠাক করতে লাগল।

এখানের সংস্কৃতি ছিল পথেঘাটে যেখানেই অচেনা মানুষজন এবং শিশুদের সঙ্গেও দেখা হত, প্রত্যেকেই হাত তুলে বলত ‘সেলাম সাহাব’। আমি যখন এখানে নিয়মিত আসতাম জায়গাটা অন্যরকম ছিল। এই যাকেতাকে সেলাম করার মধ্যে যেমন একটা গোলামি গোলামি গন্ধ আছে, তেমন একটা নিয়মানুবর্তিতা এবং মান্যতাও তার সঙ্গে মিশে ছিল। যা নইলে, শৃঙ্খলাবোধ তৈরি হয় না। নীরদ সি চৌধুরী যে ইংরেজদের এবং ব্রিটিশ শাসনের প্রশংসা করতেন তা এমনি এমনি নয়। উইনস্টন চার্চিল বলেছিলেন, ভারতীয়রা হচ্ছে Men of Straw, তাদের স্বাধীনতা দিলেও তারা তা রাখতে পারবে না। ভারত বিরাট রাষ্ট্র। তার বহু ভাষা, বহু ধর্ম, বহু সংস্কৃতি। তাই হয়তো এখানে মিলিটারি Coup হয়নি কিন্তু ইংরেজ, ফরাসি, জার্মান, বেলজিয়ানরা, যেসব ছোট-ঘোট উপনিবেশকে স্বাধীনতা দিয়েছে সেইসব দেশ, সেইসব দেশের অবস্থা তো পড়িসই কাগজে। স্বাধীনতার যোগ্য নিজেদের পুরোপুরি না করতে পারলে সেই স্বাধীনতা খায় না মাথায় মাখে, তাই বুঝে উঠতে পারে না সেই দেশ। উগান্ডার মতো, আফগানিস্তানের মতো, জায়রের মতো। আমাদের দেশ কিন্তু মস্ত বড়। কিন্তু ভৌগোলিক বিরাটত্বই তো বিরাটত্বর একমাত্র মাপ নয়।

মাজিদ আমাদের এনে দিল আলুর চপ প্লেটে করে।

ঋজুদা বলল, আজ আপ-ট্রেন টাইমে আছে?

জি সাহাব। এখন পর্যন্ত তো আছে, পরে কত লেট করবে কে বলতে পারে।

ঋজুদা আমাকে বলল, তা হলে কিষুণকে তাড়াতাড়ি খাইয়ে নিয়ে তুই টাটা সুমোটা নিয়ে কিষুণকে স্টেশনে ছেড়ে যাস এসে। ও কী করবে এখানে বসে থেকে।

তারপর মাজিদকে বলল, আপাতত তুমি ড্রাইভারকেও এক প্লেট আলুর চপ আর গরম এক গ্লাস চা পাঠিয়ে দাও তো গাড়িতে কারোকে দিয়ে।

জি সাহাব।

আমি বললাম, তুমি যা ভাল মনে করবে কিযুণের ব্যাপারে তাই হবে।

কতদিন শিকার করি না। একদিন লিন্ডওয়াল সাহেবের সঙ্গে গেলে মন্দ হয় না।

মাজিদের দিকে ফিরে বলল, ঋজুদা।

আপ কভভি শিকার খেলথে থে সাহাব? ম্যায় তো কভূভি দিখা নেহি ম্যাকক্লাস্কিমে আপকো শিকার খেলথে হুয়ে।

ঋজুদা হাসল।

আমার ভয় হল থলে থেকে বেড়াল এই বেরিয়ে পড়ল বুঝি।

আমি ভাবলাম বলি যে, তুমি আর কতটুকু জেনেছ বাবা! ঋজু বোস-এর ‘খাল-খরিয়াৎ’, ‘রাহান-সাহান’-এর কথা আমাদের মতো তুমি জানবেই বা কোত্থেকে!

ঋজুদা আবার বলল, কী হে? মোটে দিন তিনেক তো থাকব। আজ সন্ধের পরে তো আর কোনও গাড়িও নেই।

কেন? শক্তিপুঞ্জ?

আমি বললাম।

শক্তিপুঞ্জের প্যাসেঞ্জার তো নামতে পারে না। মানে, চা খেতে নামতে পারে। এক মিনিট তো স্টপেজ তাও আবার মাঝ রাতে।

আমরা ক্যামেরনের গেস্ট হাউসেই উঠেছি। বুঝেছ মাজিদ, চলে এসো। তোমাকে সঙ্গে নিয়ে তোমার লিন্ডাল সাহেবের সঙ্গে আলাপ করে আসব। তারপর যদি একটু শিকার-টিকার হয়।

একটু চুপ করে থেকে বলল, এখন এখানে কিছু জানোয়ার আর আছে কি? দাশগুপ্ত সাহেব, রাণা সাহেবরা মিলে তো সবই শেষ করে দিয়েছেন।

সাহাব। গলা নামিয়ে বলল মাজিদ একটু আস্তে কথা বলুন। দেওয়ালেরও কান আছে।

তারপর বলল, না সাহাব। আছে। বড় বাঘ এপাশে নেই, তবে চামার রাস্তাতে আছে, ম্যাকক্লাস্কির নোজ-এর গুহাতে থাকে। তা ছাড়া বাঘ মেরে হজম করাও তো সহজ নয়। এপাশে লেপার্ড আছে, ভালুক, শুয়োর, কুটরা, জানোয়ারদের মধ্যে। আর পাখির মধ্যে তিত্বর, বটের আর মোরগা। কালিতিত্বরও আছে।

ঠিক আছে। এসো তো তুমি আজ। সন্ধের মুখে মুখে।

এখন সময়ে একজন মোটাসোটা ইংরেজ তরুণী প্লাটফর্মে এসে ঢুকলেন। ঋজুদাকে দেখেই বললেন, হ্যালো!

ঋজুদা বলল, হ্যালো।

তারপর বলল, গোয়িং ব্যাক টু ডে?

ইয়া!

বলেই মেমসাহেব একটি দেহাতি ছেলের সঙ্গে লাইনের ওপারে চলে গেলেন।

আমি জিজ্ঞেস করলাম ঋজুদাকে, কে উনি?

মিস এলিসন ব্লান্ট। উনি ইংল্যান্ড থেকে এসেছেন অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের উপরে একটা থিসিস-এর জন্যে।

তুমি চিনলে কী করে?

কলকাতাতে সেদিন আমাকেও ইন্টারভু করলেন যে।

কেন?

যেহেতু আমার একসময়ে যাতায়াত ছিল ওখানে।

তারপরে বলল মাজিদ মিঞাকে, একটা খবর পাঠিয়ে দিয়ে তোমার লিন্ডিল সাহেবের কাছে যে, আমরা যাব। এখানের সব বাসিন্দাই তো সন্ধে সাতটাতে ‘সাপার’ খেয়ে শুয়ে পড়ে। আগে না জানিয়ে গেলে…।

তা ঠিক। মাজিদ বলল।

ঋজুদা বলল, তারপরে দোকান থেকে বেরিয়ে গাছতলার বেঞ্চে বসে-থাকা ভটকাই আর তিতিরের দিকে যেতে যেতে বলল, বারকাকানা থেকে ডালটনগঞ্জ-এর ট্রেন আসতে আসতে তো দুপুর গড়িয়ে যাবে। চল, চা, আলুর-চপ খাওয়া তো হল, চাট্টি নদী দেখিয়ে নিয়ে আসি তোদের।

সেটা কোথায়?

সেটা ম্যাকক্লাস্কির একেবারে অন্য প্রান্তে। সেদিকে বাড়িঘর লোকজন খুবই কম। তবে জাগৃতি-বিহার আর ব্রিগেডিয়ার রামদাস-এর নতুন বাড়িতে ওদিকের ভোলই পাল্টে গেছে। তবে চাট্টি নদীতে যেতে আরও দূরে যেতে হবে ডানদিকে। শেষকালে কিছুটা হাঁটতেও হতে পারে।

ভটকাই বলল, মহাপ্রস্থানের পথে বা অমরনাথে যেতে কিছুটা হাঁটতে তো হবেই। কষ্ট না করলে কি আর কেষ্ট মেলে? তবে একটা জিনিসেরই অভাব। পড়ল।

কীসের?

একটা কুকুরের। যুধিষ্ঠিরের পায়ে পায়ে একটা কুকুর গেছিল না? তা ঋজুদা, তুমি কি সারমেয়হীন যাবে?

তিতির ফিক করে হেসে উঠল।

হাসলে যে বড়।

হাসব না? তুমি এমন এমন বাংলা শব্দ বলছ যে, মানেই বুঝি না।

তিতির বলল, বাংলা হলেও না হয় বোঝা যেত। এ যে সংস্কৃত শব্দ।

ইয়েস। এই সংস্কৃত আরবি, ফারসি ছেড়ে শুধু ইংরেজিনবিশ হওয়াতেই তো আজ আমাদের এই অবস্থা!

এনাফ ইজ এনাফ।

ঋজুদা ভটকাইকে থামিয়ে দিল।

তারপর স্টেশনের গেট পেরিয়ে গাড়ির দিকে এগোতে এগোতে বলল, আজকে কিষুণকে পাঠানো যাবে না।

কেন?

চল, আমরা চাট্টি নদী থেকে ঘুরে আসি। তারপর দুপুরের খাওয়ার পরে রুদ্র তোর একবার রাঁচি যেতে হবে। দেড় ঘণ্টা লাগবে। একটা কাজ দেব।

ভটকাই বলতে গেছিল, আমি যাব না?

কিন্তু সামান্য আগেই ঋজুদার বকুনি খেয়ে চেপে গেল।

তিতির বলল, ওই মেম সাহেবটি কে ঋজুদা?

মিস এলিসন ব্লান্ট এসেছেন ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জ-এর অ্যাংলো ইন্ডিয়ানদের ওপরে। কাজ করবার জন্যে লন্ডন থেকে।

ভটকাই বলল, আজকাল তরুণী অথ মোটা মেমসাহেব দেখাই যায় না?

আমরা হেসে ফেললাম ওর কথায়।

পি এইচ ডি করছেন কি?

তিতির জিজ্ঞেস করল।

পি এইচ ডি করছেন এই বিষয়ে। তবে তিনি তো অলরেডি ডক্টর ব্লান্ট। বেশ রলি-পলি গাবলু-গুবলু মহিলা। বয়স বেশি নয়। ইংল্যান্ডের সাউদাম্পটন ইউনিভার্সিটির জিওগ্রাফি ডিপার্টমেন্টে আছেন।

চল এবারে গাড়িতে ওঠ।

ঋজুদা সামনে, আমরা তিনজনে পেছনে।

দারুণ লাগছে জায়গাটা। মনে হয়, গোয়া বা পুরনো চন্দননগরে চলে এসেছি। ছোট কটেজ, প্রকাণ্ড হাতাওয়ালা বাংলো লাল-মাটি পথের দু’পাশে। এক একটি বাংলোর হাতাই হবে দশ-পনেরো বিঘা করে। কত যে গাছ, কতরকমের, তা বলার নয়। ভারী শান্ত, সুন্দর ছবির মতো জায়গাটা। আমরা ডানদিকে মস্ত প্রায় একশো বিঘা এলাকার বুথ’স ফার্ম ছাড়িয়ে ডানদিকে জাগৃতি-বিহারের সুন্দর বাংলোটি ছাড়িয়ে লেফটেন্যান্ট জেনারেল রামদাস-এর দারুণ বাড়িটাকে বাঁদিকে রেখে চাট্টি নদীর দিকে এগোলাম ডানদিক দিয়ে। বেশ অনেকখানি পথ গিয়ে দাঁড়াবার কথা বলল, ঋজুদা।

না থেমে, কিষুণ বলল, তকলিফ হোগা হুজৌর। সুমো ইতমিনানসে পৌঁছ যায়েগা নদ্দীতক৷ আপলোগ মজেমে বৈঠিয়ে।

আরও কিছুক্ষণ এবড়ো-খেবড়ো পথ বেয়ে গিয়ে যেখানে পৌঁছলাম সে জায়গাটা দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল। বিরাট বিরাট পাথরের চাঙর, নীচ দিয়ে জল বয়ে যাচ্ছে। সাদা বালির চর। দুপারেই জঙ্গল। চড়ুইভাতি করার আদর্শ জায়গা।

বাঃ। কালকে এখানেই পিকনিক করলে হয়।

করলেই হয়। লিন্ডওয়াল এবং মিসেস লিন্ডওয়ালকেও নেমন্তন্ন করা যায়। মেনুটা তোরা ঠিক করে ফেল। কিন্তু রান্না করবে কে? তোরা তো সব ওয়ার্থলেস।

ওয়ার্থ যাচাই না করেই যদি আমাদের বাতিল কর, তা হলে আর কী বলি!

ভটকাই বলল।

তুই রাঁধবি?

পরীক্ষা করেই দেখ।

তবে তাই হোক। তুই কি চুলও কাটতে পারিস?

আমি বললাম।

মানে?

না। গাধার সঙ্গে তোর যখন অমন নিবিড় সম্পর্ক, তুই আমাদের লন্ড্রিম্যান হতেই পারিস। তদুপরি কুক। বাকি থাকল হাজামগিরি। তাই জিজ্ঞেস করছিলাম।

হাজামৎ মানে কী?

তিতির প্রশ্ন করল।

নাপিত।

ঋজুদা বলল।

তাই?

হ্যাঁ। তা হলে তোর ভূমিকাটা আমাদের দলে একেবারে স্থায়ী হতে পারে আর কী। কোনও সময়েই তোকে দল থেকে বাদ দেওয়ার উপায়ই আর থাকবে না।

তিতির বলল, সবই ভাল ভটকাই কিন্তু তুমি গাধার পিঠে রাইডিং প্র্যাকটিসটা করে কাজটা ভাল করনি।

কেন?

আমার বারবারই জীবনানন্দর সেই পঙক্তিটিই মনে পড়ে যাচ্ছে।

কোন পঙক্তি?

আবহমানের ভাঁড় এসেছে গাধার পিঠে চড়ে।

আমি আর ঋজুদা হেসে উঠলাম তিতিরের কথাতে।

ভটকাই অন্যদিকে মুখ করে, মুখটাকে উটের মতো উঁচু করে, শূন্যে চেয়ে রইল।

এখানে তো সিনেমার শুটিং হওয়া উচিত।

হয়ই তো। এই তো কিছুদিন আগেই ‘বনফুল’ বলে একটা ছবির শুটিং করলেন শমিত ভঞ্জ। পল্লবী, ইন্দ্রাণী, রবি রায়, চিন্ময়বাবু কমেডিয়ান সব এসে তো সোমনাথের বাড়িতেই ডেরা করেছিলেন।

তাই?

তা তুমি একটা স্ক্রিপ্ট যদি লিখে দাও তো আমরাও ম্যাকক্লাস্কির পটভূমিতে একটা ছবি করতে পারি।

ওসব আমার কর্ম নয়। লেখক মিস্টার রুদ্র রায় তো আছেনই।

ভটকাই বলল, একটা সুন্দর জায়গাতে এসেছি। একটু আনন্দ করব তা নয়। কী যে ভ্যাজর-ভ্যাজর শুরু করলে তোমরা। তার চেয়ে আমি বরং ওইদিকটাতে একটু ঘুরে আসি।

যাচ্ছিস যা। তবে সাবধানে যাস। ওইদিকেই ভরদুপুরে একটা ভালুকে গ্রুপ সাহেবের পশ্চাৎদেশের দেড় কিলো মাংস খাবলে নিয়েছিল।

ঋজুদা বলল।

দেড় কিলো?

হ্যাঁ। সবুজ টেরিলিনের ট্রাউজারের কাপড়সুদ্ধ।

টেরিলিনও খেল ভালুক? পেট খারাপ হয়নি?

তিতির ভালুকের জন্যে রীতিমতো উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করল।

ভালুক মানে Sloth Bear, তো মাংস খায় না।

তবে মাংস খাবলে নিলই বা কেন?

আমি বললাম।

মাংসের জন্যে খাবলায়নি। হয়তো কাপড়ের কোনও দোকানি অথবা ভটকাই-এর মতো কোনও দর্জি তাকে একটা সবুজ টেরিলিনের ট্রাউজার বানিয়ে দিতে গররাজি হয়েছিল। কে কী করে, কেন করে, কখন করে, তা কে বলতে পারে!

তবে কাল এখানে চড়ুইভাতি হচ্ছে তো?

তিতির বলল।

তোমরা করলেই হবে। তা হলে কিষুণকে রেখেই দেওয়া যাক।

ও খুব ভাল লিট্টি বানায়। এক রাতে খাওয়া যাবে। তা ছাড়া ও থাকলে আমাদের নানা উপকারে আসবে। এদিকারই মানুষ তো!

লিট্টিটা কী জিনিস ঋজুকাকা?

তিতির জিজ্ঞেস করল।

সে এক জিনিস। ছাতু দিয়ে বানায়। গোল গোল। কচুরির মতো। কিন্তু ক্রিকেট বলের মতো সলিড। বানাতে বহতই মেহনত লাগে। পার লিট্টি এক পো করে বিশুদ্ধ গাওয়া ঘি লাগে। খেতে কিন্তু অমৃত। ঝাল-লঙ্কার আচার এবং রাবড়ি বা রসমালাই দিয়ে খেতে হয়। খাওয়ার সময়ে সুখে মরে যেতে ইচ্ছে করে কিন্তু পরদিন খাওয়ার সময়েও দুখে…

তিতির বলল, মানে কী হল?

ভটকাই বলল, খুকি। সব কথার মানে হয় না। কিছু কিছু খুকি চিরদিন খুকিই থাকে।

তা হলে চল এবারে ফেরা যাক।

গাড়িতে বসে ঋজুদা কিষুণকে বলল, আমাদের গেস্ট হাউসে না গিয়ে কিষুণ তুমি একবার স্টেশনে গিয়ে মাজিদ মিঞাকে জিজ্ঞেস করে আসবে তার লিন্ডিল সাহেব মদ খায় কি না? গেলে, রাঁচিতে যখন রুদ্র অন্য কাজে যাবেই, তখন আনিয়ে নেব ওকে দিয়ে সাহেবের জন্যে। আরও জিজ্ঞেস কোরো সাহেব কী খান?

মতলব নেহি সমঝা হুজৌর।

মতলব ক্যা? বহত কিসিমকি দারু হোতা না হ্যায়। পুছনা, উন কি পসন্দ ক্যা হ্যায়, সমঝা না?

জি হুজৌর। ম্যায় আভভি পুছকর আতা।

গেস্ট হাউসে পৌঁছে আমরা নেমে যাবার পরে কিষুণ চলে গেল স্টেশনে। কিযুণের খাওয়ার কথাও বলে দিল ঋজুদা ক্যামেরনের লোককে। তারপর বারান্দাতে চেয়ারে বসে ভটকাইকে বলল, আমার চামড়ার হ্যান্ডব্যাগটা আন তো ঘর থেকে ভটু।

আমি আর তিতির মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগলাম। ভটকাই এতই প্রিয় হয়ে গেল ঋজুদার যে, ভটকাই থেকে আদরে একেবারে ভিটু’ হয়ে গেছে!

ভটকাই গদগদ মুখে ঋজুদার ঘরে গিয়ে ঋজুদার কালো ক্রোকোডাইল-লেদারের ব্রিফকেসটা নিয়ে এল ঘর থেকে। এই ব্যাগটা নামনি আসামের গারো পাহাড়ের পাদদেশ দিয়ে বয়ে যাওয়া জিজিরাম নদীর একটি বুড়ো ‘ঘড়িয়াল’ কুমিরের চামড়া দিয়ে বানানো। কলকাতার গভর্নমেন্ট প্লেস ইস্ট-এর আর্মেনিয়ান ট্যাক্সিডারমিস্ট মিস্টার ফ্লেভিয়ান-এর দোকান, কাৰ্থবাটসন অ্যান্ড হারপার-এর ম্যানেজার হালদারবাবু যত্ন করে বানিয়ে দিয়েছিলেন। ভটকাই আজকে ‘ভটু’ হতে পারে কিন্তু এসব খবর সে জানবে কোত্থেকে! ও তো দুদিনের বৈরাগী, তাই ভাতকে বলে ‘অন্ন’। এসব জানে একমাত্র রুদ্র রায়ই।

ভাবছিলাম, আমি।

ব্যাগটা খুলে, ডিজিটাল ডাইরিটা বের করে, আমার হাতে দিয়ে বলল, ‘H’ বার কর তো।

বার করলাম।

এবার বের কর Ronald Harper

বের করে বললাম, করেছি। পু

রো ঠিকানা ও ফ্যাক্স নাম্বার বের করে ফেল।

করলাম।

ভাল করে রেখে দে তোর কাছে।

এ কোথাকার ফ্যাক্স নাম্বার?

আমি জিজ্ঞেস করলাম।

সিডনির ফ্যাক্স নাম্বার। অস্ট্রেলিয়ার। ঠিকানাটা বুঝি দেখলি না?

পাওয়ার অফ অবসার্ভেশান বেটার কর আরও।

তাই। রোনান্ডও আমার এক বন্ধু। রোনাল্ড, স্টিভ-এরও বন্ধু।

স্টিভ ওয়া?

এবার তিতির বলল।

আজ্ঞে না স্টিভ হলেই কি ওয়া হতে হবে? তোকেও দেখি ভটুর রোগে ধরল! শচীন হলেই কি তেণ্ডুলকার হতেই হবে? শচীন শাসমল, শচীন আঢ্য, বা শচীন তলাপাত্ররা কি কেঁদে মরবে তা হলে? স্টিভ এডওয়ার্ড। স্টিভ নিউজিল্যান্ডে তার দিদির কাছে গেছে। তিনদিনের জন্যে। তাই এই নোটটা লিখে দিচ্ছি তুই রোনাল্ডকে একটা ফ্যাক্স করে দিয়ে উত্তরের জন্যে অপেক্ষা করবি। উত্তর না পেলে, আই এস ডি বুথ-এ বলে আসবি যে, কাল ভোরেই তুই আবার যাবি উত্তরটা নিয়ে আসতে। উত্তর অবশ্যই আসবে। বলেই, ঋজুদা স্ক্রিবলিং প্যাড বের করে তার পকেটের ক্রস বল পয়েন্ট পেনটা তুলে নিয়ে লিখল, DEAR RON,

PLEASE CONTACT STEVE AT NEWZEALAND RIGHT NOW AND PLEASE ASK HIM ABOUT THE WEAPONS MAC TAILOR USED MOST. PLEASE ALSO ASK HIM WHETHER ANY PARTIC ULAR WEAPON WAS USED BY MAC FOR SHOOTING MOOSES.

PLEASE TREAT THIS AS VERY IMPORTANT AND REQUEST HIM TO FAX BACK THE INFORMATION IMMEDIATELY AT THE FAX NUMBER QUOTED ABOVE. PLEASE CONVEY TO HIM THAT I HAVE REACHED THE GUNJE THIS MORNING, AND AM TRYING TO GET IN TOUCH WITH HIS SHOOTING PAL.

REGARDS TO YOU AND STEVE.

YOURS WRIJU BOSE

C/O. MR. CAMERON’S GUEST

HOUSE MCCLUSKIEGUNGE. DT. RANCHI.

Message-টা লিখে কাগজটা আমার হাতে দিল ঋজুদা।

এই কাগজ ফ্যাক্স মেশিনে নেবে তো?

তিতির সন্দেহের গলাতে বলল।

আমার এই প্যাডটা ফ্যাক্স-এর কাগজ দিয়েই তৈরি।

এতগুলো please লিখলে কত টাকা বেশি লেগে যাবে। please গুলো বাদ দিলে হয় না?

ভটকাই বলল।

Text থেকে please বাদ দেওয়া ধড় থেকে মুণ্ডু বাদ দেওয়ারই মতো অপরাধ। ভদ্রতার বালাই তো স্বাধীন হয়ে যাবার পরে আর রাখিনি আমরা!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *