উপত্যকার ওই ছায়াচ্ছন্ন নিবিড় বনময় ঘেরাটোপের মতো নিশ্চিদ্র জায়গাটিতে যেন কেউ কামান ছুঁড়ল। এইরকম শব্দ হল। দহর কাছে যত জীবজন্ত ও পাখি ছিল এবং যত জীবজন্তু ও পাখিও এই রাইফেলের বজ্রনির্ঘোষ শুনল তারা সকলে মিলে একই সঙ্গে প্রচণ্ড হইচই তুলল। তাদের ভয়ার্ত চিৎকার আহত হাতির ভয়কে আরও একশো গুণ বাড়িয়ে দিল। এবং সেই ক্যাকোফোনির মধ্যে হতভম্ব আমি দেখলাম যে, হাতিটা যেমন দাঁড়িয়ে ছিল, ঠিক তেমনই দাঁড়িয়ে রইল। ফোর-সেভেনটি-ফাইভ-এর গুলিও হজমি-গুলির। মতো হজম করে নট-নড়ন-নট-কিচ্ছু হয়ে সে দাঁড়িয়ে রইল।
গুলি কি তবে মিস করলাম? এত কাছ থেকে?
নাভার্স হয়ে গেলে সবই হতে পারে। বড়-বড় ওলিম্পিকে কমপিটকরা শিকারি দেড় হাত দূরে খরগোশ মিস করে কিন্তু খরগোশ তো গুণ্ডা হাতি নয়। হয়তো ট্রিগার-পুলিং ঠিক হয়নি গুলি হাতির পিঠের উপর দিয়ে চলে গেছে। কিন্তু গুলি মিস করলে আওয়াজ তো অন্যরকম হত। রাইফেল তুলে নিশানা নিয়েই মেরেছিলাম। তাও এত কাছ থেকে। হাতির গায়ে না লাগলে কোনও-না-কোনও গাছের ডালে লাগতই।
বাঁ দিকের ব্যারেলেও হার্ড-নোজড বুলেট আছে আমি জানি। কারণ দুটি রাইফেলেরই গুলি আমিই এনেছি বাঘ্যমুণ্ডা থেকে। তবে যে গুলিটি করলাম তা সফট-নোজড হলে আমার মতো সুখী কেউ হত না। জানোয়ারকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিতে সফট-নোজড-এর জুড়ি নেই।
কী হল ভাবছি, আর রাইফেলের ট্রিগার গার্ডে আঙুল ছুঁইয়ে বসে একদৃষ্টে সেই ভৌতিক হাতির দিকে চেয়ে আছি। ঠাকুরানির বাঘের পরে কি ঠাকুরানির হাতির খপ্পরে পড়লাম! অবিশ্বাস্য ব্যাপারস্যাপার বেশিদিন ভাল লাগে না আমার। মন দুর্বল হয়ে যায় বড়।
একদৃষ্টে চেয়ে আছি রাইফেল হাতে। মনে হল, হাতির লাল পাগুলো একটু একটু কাঁপছে যেন। তারপরই মনে হল থরথর করে কাঁপছে। যেই অমন মনে হল সঙ্গে-সঙ্গে কে যেন কোন মন্ত্রবলে হাতির গায়ে একটি ফোয়ারা ফুটিয়ে দিল, আর মুহূর্তে সে ফোয়ারা খুলে গেল। ঝরঝর করে ফিনকি দিয়ে নয়, ফোয়ারারই মতো মোটা এবং শব্দময় উৎসারে হাতির বুক থেকে রক্ত ছুটতে লাগল। হাতিটা আমার এতই কাছে ছিল যে যদি গুলি খেয়ে সে আমার দিকে হঠাৎ পড়ত তো আমি হাতির নীচে চাপা পড়েই মরতাম।
ওখান থেকে পালাব কি না ভাবছি, এমন সময় দেখি রক্তের ফোয়ারা আরও জোর হল এবং হাতিটা হাঁটু গেড়ে আস্তে আস্তে বসে পড়ল। যেন প্রার্থনা করবে হাতিদের দেবতাদের কাছে, স্তোত্র পড়বে যাবার বেলায়।
তখন আমি দাঁড়িয়ে উঠে কিছুটা বাঁ পাশে সরে গেলাম। মনটা ভীষণই খারাপ লাগতে লাগল। হাতিটার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইলাম আবার ওঠে কি না তার উপর নজর রেখে। কিছুক্ষণ বসে থাকার পর দুটি ছোট গাছ এবং একটি অগুন গাছ ভেঙে হাতিটা ডান পাশে কাত হয়ে শুয়ে পড়ল। খুব জোরে নিশ্বাস নিল একবার। তারপর আরও জোরে নিশ্বাস ফেলল।
আমি রাইফেলের সেফটি ক্যাচটাকে অফফ করে দিয়ে এবারে পেছন ফিরলাম। দেখি, দুর্গাদা সেই গর্তের মধ্যে থেকে দাঁড়িয়ে উঠেছে, দুহাত মাথার উপর তুলে ধেইধেই নাচ নাচছে। এবং আমার রাইফেলটাকে রেডি পজিশনে ধরে ঋজুদা শিমুলের শিকড়ে হেলান দিয়ে বসে আছে। চোখ এদিকে। তখনও যে-কোনও ইভেনচুয়ালিটির জন্য তৈরি।
হাতি যে আর কোনও দিনও উঠতে পারবে না তার ওই শয্যা ছেড়ে এই কথা বুঝতে পেরে দুর্গাদা গর্ত ছেড়ে তিড়িং-বিড়িং করে লাফাতে লাফাতে এসে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরল। আমি বললাম, চুপ করো। কারও মৃত্যুর সময়েই গোলমাল করতে নেই। যে যাচ্ছে তাকে শান্তিতে যেতে দাও। মৃত্যুপথযাত্রী বা মৃত প্রত্যেক জীবিতর চেয়ে বেশি সম্মানের। সে যে চলে যাচ্ছে এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে।
দুর্গাদা বলল, পিলা। তু গুট্টে কাণ্ড ঘটাইলু আজি। কঁড় কহিবি মু।
বলেই, গুণ্ডিপানের গন্ধভরা মুখে আমার মাথায় একটা জব্বর চুমু খেল।
আমার কথা শুনল না দুর্গাদা। কী বলতে চাই বোঝে না।
ঋজুদা গর্ত থেকেই চেঁচিয়ে বলল, ব্র্যাভো রুদ্র। ওয়েল ডান্। এদিকে আয়।
ঋজুদার কাছে যেতেই অনেকক্ষণ পর পাইপটা বের করে তাতে আগুন দিয়ে সেটা ধরিয়ে মুখে পুরে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল।
আছ কেমন এখন? পারবে উঠতে? আমি বললাম। ঠিক আছি। ঠিক হয়ে যাব। এখন হাতির কথা বল। এমন সময়ই আছাড়টা খেলাম, আর এমনভাবে যে, আজ তোর এবং আমাদের অবস্থাও কম্মুর মতো হলেও আশ্চর্য হবার কিছু ছিল না।
তুমি শেষ মুহূর্তে রাইফেল বদল করলে কেন?
কেন করলাম তা রাইফেলের মার দেখেও বুঝলি না? ওই গুলিটাই তোর নিজের রাইফেল দিয়ে করলে হাতি হয়তো তোকে এবং আমাদের মেরে দিত নিজে মরবার আগে। আফ্রিকার বিখ্যাত হাতি-শিকারি এবং বিশেষজ্ঞ পোণ্ডারো-সাহেব, জন টেলর, লিখেছিলেন যে, এই ফোর-সেভেনটি-ফাইভ রাইফেল দিয়ে ইভন ইফ ড্য শুট অ্যাট দ্য রুট অব দ্য টেইল অব অ্যান এলিফ্যান্ট, ইট উইল রান থু দ্য হল লেথ অব ইটস বডি অ্যান্ড রিচ দ্য ব্রেইনস। এতই ক্ষমতা এই রাইফেলের। আমি আশঙ্কা করেছিলাম যে, গুলি করতে হলে তোকে অত্যন্তই শর্ট-রেঞ্জ থেকে করতে হবে এবং সেগুলি যদি হাতিকে সে যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে সেই জায়গাতেই থামাতে না পারে তা হলে তোর তো নিশ্চিতই, আমাদের সকলেরও বিষম বিপদ।
হাতি কিন্তু তোমাদের দিকেই তাকিয়ে চুপটি করে দাঁড়িয়ে ছিল। আমাকে দ্যাখেইনি। শোনেওনি। তোমার জন্যই আমি বেঁচে গেলাম এ-যাত্ৰা।
ঋজুদা একগলা ধোঁয়া ছেড়ে বলল, আমিও, মানে, আমি আর দুর্গাও তোরই জন্যে।
দুর্গাদা হেসে বলল, আমাকে একটু ভাল বাসনার তামাকু দাও, খৈনি করে খাব।
ঋজুদা পাইপের টোব্যাকোর পাউচটা বের করে দিল। ৩৫০
ঋজুদার কোমরে চোট সত্যিই খুব জোর হয়েছিল, হাড় ভেঙেছে কি ভাঙেনি, তা অবশ্য অঙ্গুলে গিয়ে এক্স-রে না করালে বোঝা যাবে না। নিজে দু-একবার ওঠার চেষ্টা করল তারপর দুর্গাদা বলল, আমি টাঙ্গি দিয়ে তোমার জন্যে একটা লাঠি কেটে আনছি, তারপর আমাদের দুজনের কাঁধে হাত দিয়ে আস্তে-আস্তে চলতে পারবে।
ততক্ষণে অন্ধকার হয়ে গেছিল। যে বাঘের ডাক অনেকক্ষণ আগে শুনেছিলাম, তারই বিরক্তির চাপা আওয়াজ শুনলাম দহর একেবারে কাছে। গর-র-র-র-র-র করে। আমরা যে সেখানে আছি তা সে জেনেছে, কিন্তু এও জেনেছে যে, আমরা তাকে শিকার করতে আসিনি। শিকারি যারা, তারা এত অসাবধান হয়ে জোরে জোরে কথাবার্তা বলে না। বাঘেরাও কোন্ মানুষ কী করতে কোথায় উপস্থিত, তা বিলক্ষণই জানে।
বাঘ জল ছেড়ে চলে গেল। একদল গন্ধ এল। তাদের মেজাজ শরিফ থাকলে ভয়ের কিছুই নেই।
দুর্গাদা যে কোন্ চুলোয় বাঁশ কাটতে গেল টাঙ্গি হাতে অন্ধকারে, গন্থদের ঘাড়ে গিয়ে না পড়ে।
গল্বরাও ওঁয়াও-বোঁয়াও আওয়াজ করে জল ছেড়ে চলে গেল। এখন এই খোলের মধ্যে অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। যেখানে-যেখানে সামান্য ফাঁকফোকর আছে, সেখানে-সেখানে অন্ধকার একটু হাল্কা মনে হচ্ছে। অন্য সব জায়গায় ঝুপড়ি ঝুপড়ি অন্ধকার। এই ঘেরাটোপের বাইরে শুক্লাদশমীর চাঁদ এতক্ষণে বিশ্বচরাচর উদ্ভাসিত করে উঠেছে নিশ্চয়ই আর উঠেছে পশ্চিম দিগন্তে সন্ধ্যাতারা। কিন্তু তাতে রূপ খুলেছে মেমসাহেবদের গায়ের রঙের মতো ফরসা গেলি বনেরই কিন্তু সে-বনে পৌঁছতে পারলে তবেই না! বাঁশের ঝাড় আছে দূরের দহর কাছে।
বাঘ ও গল্বদের বিদায় করার পরই বাঁশ কাটতে লাগল দুর্গাদা। বাঁশের উপর টাঙ্গির কোপ পড়ছে তো মনে হচ্ছে বোমা পড়ছে। এই খোলের মধ্যের ঘন জঙ্গলের অডিটোরিয়ামের এমনই অ্যাকুস্টিকস্।
একটু পরই একটি পোক্ত লাঠি নিয়ে ফিরে এল দুর্গাদা। যে-দিকে ঋজুদা ধরবে, সেদিকে যাতে তার হাতে না লাগে, সেজন্য নানারকম পাতা মুড়ে লতা দিয়ে বেঁধে নিয়ে এসেছে ভাল করে। আমরা দুজনে দুহাতে ধরে ঋজুদাকে দাঁড় করালাম। কিছুক্ষণ মুখ-বিকৃতি করে দাঁড়িয়ে রইল ঋজুদা। তারপর আমাদের দুজনের কাঁধে হাত দিয়ে লাঠি ভর করে গর্ত থেকে উঠে দাঁড়াল। খুবই আস্তে-আস্তে।
বললাম, দেখি, এবার হাঁটি-হাঁটি পা-পা করে একটু-একটু এগোও। ব্যথা কমে আসবে।
ঋজুদা হেসে বা হাসবার চেষ্টা করে বলল, অসহায় একেই বলে।
হাতি এবং গুণ্ডা-হাতির সামনেই ওই বিপজ্জনক মুহূর্তে পড়ে যাওয়াতে ব্যথার সঙ্গে শও মিশে ছিল নিশ্চয়ই। মানুষের উপরে তার মনের প্রভাব, শরীরের প্রভাবের চেয়ে অনেকই বড়।
ঐরাবত ধরাশায়ী হওয়াতে এখন শক্টা চলে গেছে মনে হল। মনে হল কোমরের হাড়ও ভাঙেনি। ভাঙলে, ঋজুদা হাঁটতে পারত না আদৌ। প্রথমে দুর্গাদা ঋজুদার রাইফেল এক কাঁধে নিয়ে অন্য কাঁধে টাঙ্গি ঝুলিয়ে আগে আগে থেকে অন্ধকারে সাবধানে দেখে পা ফেলতে লাগল। পেছনে ঋজুদা। তার পেছনে আমার রাইফেল কাঁধে আমি।
কিছুদূর যেতেই গাছগাছালির কাণ্ড ও ডালপালার ফাঁকফোকর দিয়ে যেন এক স্বপ্নরাজ্য ধীরে-ধীরে ভাস্বর হয়ে উঠতে লাগল আমাদের সকলের মুগ্ধ চোখের সামনে।
দুর্গাদা বলল, সাপে না কাটে! গরমের দিন। তায় অন্ধকার। একটা টর্চ থাকলে ভাল হত।
যা নেই তার চিন্তা করে আর কী হবে। ঋজুদা বলল।
তারপর বলল, দুর্গা, তোমার আর রাজেনের ভার, কাল ভোরে লবঙ্গি আর পম্পাশর থেকে লোক এনে দাঁত দুটো এবং চারটে গোড়ালির ব্যবস্থা করার। হাতির লেজের চুল যেন লোপাট না হয়ে যায়।
তারপর আমার দিকে ফিরে বলল, বালা আর লকেট বানিয়ে দিতে হবে রুদ্রর মাকে। নয়নাও চেয়েছিল।
একসময় আমরা সেই অন্ধকার অডিটোরিয়াম-এর ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে এসে গেণ্ডুলির বনে দাঁড়ালাম।
আহা!
জ্যোৎস্নার কী রূপ! মাথা ঘুরে গেল। মস্ত ন্যাড়া শিমুলের মগডালে একটি লাল বুক ঈগল স্থবির হয়ে বসে ছিল। যেন মহাকাল। দূরের একটা ছোট গেণ্ডুলির ন্যাংটো ডালে বসে কোনও পাগলা কোকিল ডেকে যাচ্ছিল অবিরত। আর ব্রেইন-ফিভার পাখিরা উড়ে উড়ে ডাকছিল, ব্রেইন-ফিভার ব্রেইন-ফিভার, পিউ-কাঁহা, পিউ-কাঁহা।
দূর থেকে তার দোসর সাড়া দিচ্ছিল।
আমাদের মস্তিষ্কেও জ্বর। অনেক জ্বর। অনেকই কারণে।
আমরা কোনাকুনি এগোলাম শর্টকাট করার জন্য।
ঋজুদা খুবই আস্তে-আস্তে হাঁটছিল পা টেনে টেনে। এবার আমরা পাতা ঝরা গেণ্ডুলি বনের মাঝামাঝি চলে এসেছি। এখানে শুধুই গেলি। যেন হাজার-হাজার মেমসাহেবদের সটান উরুর মধ্যে মধ্যে হেঁটে চলেছি আমরা। সুন্দর একরকম গন্ধ গেলি বনের গায়ে। জ্যোৎস্নায় ভরে গেছে দশ দিক।
বাঁ দিকে দূরে নীল মেঘের মতো দাঁড়িয়ে আছে লবঙ্গির পাহাড়শ্রেণী। ডান দিকে ঘন গভীর বন। যেখানে হাতিটা পাশ ফিরে ঘুমোচ্ছে তার শরীরের এবং মনের সব জ্বালা নিভিয়ে দিয়ে। চিরশান্তির ঘুম।
অত বড় একটা প্রাণী, বয়সে সে হয়তো আমার ঠাকুমার বয়সীই হবে, তাকে মেরে আমার মন বড় ভারী হয়েছিল।
ঋজুদা বলল, দুর্গা, তুমি এগিয়ে গিয়ে কচ্ছুর দাহর বন্দোবস্ত এগিয়ে রাখো। বুঝেছ! রাজেন জ্বাল-কাঠ কেটে রেখেছে কি না কে জানে! আমাদের পৌঁছতে তো সময় লাগবে। রাইফেলটা নিয়েই যাও। বাঁদিকের ব্যারেলে গুলি আছে। সেফটি ক্যাচটা দেখিয়ে দে রুদ্র দুর্গাকে।
ঠিক আছে ঋজুবাবু। ভয় আর কিছুকেই করি না। এক ভালু ছাড়া। কথা নেই, বার্তা নেই খামোখা তেড়ে এসে নাক-মুখ খুবলে নেয় পাজিরা।
আমি ওকে সেফটি ক্যাচটা কোথায় আছে দেখিয়ে দিলাম। দুর্গাদা বাঁ কাঁধে টাঙ্গি ঝুলিয়ে ডান কাঁধে ঋজুদার রাইফেলটা নিয়ে হনহন করে এগিয়ে গেল চাঁদের বনে। বন্যেরা বনে সত্যি সুন্দর।
একটু এগোতেই দুর্গার্দার গান ভেসে এল। জ্যোৎস্নায় ভেসে এসে নিমেঘ নীল তারাভরা আকাশে অকলুষিত, আর বাঁ দিকের লবঙ্গি পাহাড়শ্রেণীতে ধাক্কা খেয়ে প্রতিধ্বনি তুলে সে গান ফিরে আসছিল। দুর্গাদা গাইছিল :
ফুলরসিয়ারে মন মোর ছুঁয়ি ছুঁয়ি যা
তো লাগি বিকশি চাহিছে এ কুঞ্জে
গুঞ্জন দেই যা যা।
যা না রে ফেরি, আসসি পাশে যা না
গা মন ভরি, করো না তু মনা
ঝুরিলে কি আউ আসিবে এ দিম্ব
হসসি, লেটি, গাই যা যা
সাজি কেতে কুঞ্জে, কেতে ফুম্ব সেজে
মহক ছটাই মরে নিতি লাজে
লাজ ত্যজি আজি করুছি আরতি
থরে ধীরে চাহি যা যা।
চমৎকার সুরেলা গান।
কী গান এটা? আমি শুধোলাম।
ঋজুদা হাসল।
বলল, টিকরপাড়ায় ঘাটের বাঁশের ভেলা-ভাসানো মাঝিরা এইসব গান। গাইতে গাইতে এমন চাঁদনি রাতে চলে সারারাত সাতকোশিরা গণ্ডে। টিকরপাড়ার ঘাসিয়ানি মেয়েরাও গায়।
তারপরেই বলল, জানিস, রুদ্র, ভারী চমৎকার এই আমাদের দেশ। এই ভারতবর্ষ, না রে? অতি চমৎকার এই দেশের মানুষ।
বলেই, চুপ করে গেল।
আমি জানতাম, কী ভাবছে ঋজুদা।
পরক্ষণেই বলল, একটা গান গা রুদ্র।
কী গান?
ধন ধান্য পুষ্পে ভরা।
আমি খোলা গলায় গান ধরলাম একেবারে তারায়।
ধন ধান্য পুষ্পে ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা
তাহার মাঝে আছে দেশ এক
সকল দেশের সেরা।
সে যে স্বপ্ন দিয়ে তৈরি।
সে-দেশ স্মৃতি দিয়ে ঘেরা।
ঋজুদার গলা গাঢ় হয়ে এল।
বলল, গা-গা থামলি কেন, পুরোটা গা।
এগিয়ে চললাম আমরা যেখানে ক্যু পড়ে আছে সেদিকে।
কম্ফুর বউ সীতা আর ছেলে কুশ তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল বলে সেই দুঃখেই সে উন্মাদ হয়ে গিয়েছিল। কম্ফুর কথা বিস্তারিত ঋজুদা নিজেই লিখেছে লবঙ্গীর জঙ্গলে উপন্যাসে। অনেকদিন আগেই। বড় গুণী লোক ছিল কম্ফু।
হাতিটাও উন্মাদ হয়ে গিয়েছিল প্রায় একই কারণে। তার প্রিয়জনে ভরা দল, পরিবার এবং গোষ্ঠী থেকে ক্ষতবিক্ষত অপমানিত হয়ে বিতাড়িত হয়ে।
আমরা পাগলা কোকিল আর পিউ-কাঁহার অবিশ্রান্ত ডাকের মধ্যে, পরিষ্কার ধবধবে সুন্দরী গেণ্ডুলি বনের মধ্যে মধ্যে, শুক্লাদশমীর বনজ্যোৎস্নায় আর নক্ষত্ৰজ্যোৎস্নায় ভেসে ভেসে হাঁটতে লাগলাম, খিদে এবং তৃষ্ণার সব কথা ভুলে গিয়ে।
ঋজুদা খুবই আস্তে-আস্তে হাঁটছিল।
আমার মনে হচ্ছিল, আমরা যেন কতদিন ধরেই চলেছি এমনি করে। উদ্ভাসিত আলোয় এবং ক্কচিৎ অন্ধকারে আমরা চলবও।
কম্ফু হাতিটা আমি ঋজুদা।
আমরা সকলেই।
