ঋজুদার সঙ্গে জঙ্গলে – বুদ্ধদেব গুহ
ছয়
ঋজুদা দু’দিনের জন্যে কটকে গেছিল কি সব কাজে, কনসার্ভেটর অব ফরেস্টস্-এর সঙ্গে দেখা করতে।
আমাকেও বলেছিল সঙ্গে যেতে। কিন্তু আমি বলেছিলাম, দুর, কটকে তো তুমি তোমার বন্ধুর বাড়িতে থাকবে–শহরে থাকতে আমার ভালো লাগে না। তুমি যাও, আমি এখানেই থাকি।
ঋজুদা বলেছিল, আমি যখন থাকব না, তখন জঙ্গলে একা-একা যেতে পারিস, কিন্তু একেবারে যেন একা বড় রাস্তা ছেড়ে যাস না। যদি যাস তো দুগা মুহুরীকে সঙ্গে নিয়ে যাস। অথবা অমৃতলালকে।
আমি শুধিয়েছিলাম, কেন? ভয় আছে?
ঋজুদা হেসেছিল; বলেছিল, এখনও ভয় আছে। তারপর বলেছিল, তুমি এখনও একা একা যাওয়ার মত শিকারী হওনি। হবে একদিন–যেদিন হবে সেদিন মানা করব না।
জীপে ওঠার সময় ঋজুদা বলেছিল, সাবধানে থাকিস; বাহাদুরী করিস না।
ঋজুদার অবর্তমানে এই দু’দিন আমি ক্যাম্পের এবং সা, রে, গা, মা, পা, ধা, নি-এর মালিক হয়ে গেলাম।
তবে, মালিকেরও মালিক থাকে। ঋজুদা অমৃতদাদাকে আমার লোকাল গার্জেন করে গেছিল। সে মাঝে-মধ্যেই হাঁক ছেড়ে আমার স্বাধীনতা খর্ব করত।
এর মধ্যে একদিন সা, রে, গা, মা, পা, ধা, নি-কে মিঠিপানি ঝর্ণাটায় চান করাতে নিয়ে গেছিলাম।
সে এক কাণ্ড।
কেউ জলে ডিগবাজী খেয়ে পড়ে যাচ্ছে, কেউ বা দৌড়ে সেই প্রপাতের দিকেই চলে গেল। কেউ বা পাথরের খাঁজের মধ্যে, জল যেখানে বেশী, এমন ভাবে গা ডুবিয়ে বসল যে, দূর থেকে শুধু তার লেজটুকুই দেখা যেতে লাগল। ঝাঁপাঝাঁপি, চেঁচামেচি, ধাঁই-ধাপ্পর করে আছাড় খাওয়া কিছুই বাদ রাখেনি তারা। আমার প্রায় পাগল হবার অবস্থা।
এক-একটিকে ধরে যেই আমি ডগ-সোপ মাখাচ্ছিলাম গায়ে, অমনি অন্যরা আমার চারধারে হুড়োহুড়ি করছিল। সাবান মাখাই তার সাধ্য কি?
আমি মুখ নীচু করে সারমেয়দের সংস্কারসাধন করছি, এমন সময় এক কাণ্ড হলো।
অনেকক্ষণ থেকে কতকগুলো মোষ মিঠিপানির অন্যপাশে জঙ্গলের মধ্যে চরে বেড়াচ্ছিল। তাদের গলার তামার ঘন্টার শব্দ শোনা যাচ্ছিল অনেকক্ষণ থেকে ঘুটু ঘুটু করে।
হঠাৎ, বলা নেই কওয়া নেই, একেবারে বিনা নোটিশে একটা মোষ সোজা আমাদের দিকে শিং উঁচিয়ে তেড়ে এল। জানি না, কেন।
আমি সেদিন একটা লাল-রঙা শর্টস পরেছিলাম, তার জন্যেও হতে পারে।
মোষটা তেড়ে আসা মাত্র সা, রে, গা, মা, পা, ধা, নি সাতজনেই সাত স্বরের মত, সূর্যের সাত রঙের মত সাতদিকে জলের সঙ্গে ছিটকে উঠল, আর আমি জীবনে যত জোরে কখনো দৌড়ইনি তত জোরে প্রাণ নিয়ে দৌড়লাম।
কিন্তু মোষ বাবাজীও নাছোড়বান্দা।
তিনিও অজস্র কাঁটা, পাথর ইত্যাদি মাড়িয়ে আমার পিছনে হড়বড় হড়বড় করে ধেয়ে চললেন।
আমি জঙ্গলের মধ্যে ঝর্ণার পাশে, ঝর্ণার মধ্যে গোল হয়ে ঘুরতে লাগলাম; সেও আমার সঙ্গে সঙ্গে মাথা নীচু করে গোল হয়ে ঘুরতে লাগল। সা, রে, গা, মা, পা, ধা, নি সকলে সমস্বরে পেট কুঁচকে, মুখ উপরে তুলে ভেউ ভেউ করে হেঁচকি তুলতে লাগল। কিন্তু তাতে সেই মোটা মোষের কোনো ভ্রূক্ষেপ ছিল না।
প্রাণের দায়ে মানুষ অনেক কিছু করে। আমি প্রাণ বাঁচাতে দৌড়তে দৌড়তেই আমার শর্টস্-এর বোতাম খুলে ফেলে শর্টষ্টা ছুঁড়ে মাটিতে ফেলে দিয়ে একটা ঝোঁপের আড়ালে গিয়ে দাঁড়ালাম।
মোষ বাবাজী ভোঁ ভোঁস করে সেটার উপর কিছুক্ষণ নিঃশ্বাস ফেলে সেটাকে শিং-এ গলিয়ে নিয়ে মুহূর্তের মধ্যে জঙ্গলের গভীরে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।
তখন আমার ডাক ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছা করল। মেজদি পূজার সময় ঐ শর্টস্টা কিনে দিয়েছিল গতবারে। আরো কাঁদতে ইচ্ছা করল এই ভেবে যে, আমি এখন ক্যাম্পে ফিরব কি করে?
কিছুক্ষণ বোকার মত দাঁড়িয়ে থেকে, কতগুলো বড় পাতাওয়ালা সেগুনের ডাল সেগুন গাছের চারা থেকে ভেঙ্গে নিয়ে কোমরের কাছে আগে-পিছনে চেপে ধরে সা, রে, গা, মা, পা, ধা, নি’র সঙ্গে দৌড়তে দৌড়তে এসে ক্যাম্পের মধ্যে ঢুকে পড়লাম।
ক্যাম্পে তখন কেউই ছিল না। শুধু মহান্তী কি যেন করতে রান্নাঘর থেকে বাইরে এসেছিল। মহান্তী আমাকে ঐ অবস্থায় দেখেই, আকাশের দিকে দু’হাত তুলে দুলে দুলে হাসতে লাগল।
আমি সভ্য হয়ে বাইরে বেরোতেই দেখলাম আমার দুরবস্থার কথা চতুর্দিকে রাষ্ট্র হয়ে গেছে। সকলেই মজা করছে আমাকে নিয়ে। তবুও, কি দারুণ বিপদে পড়েছিলাম, তা মহান্তীকে বললাম।
আমি যখন মোষ কি করে আমাকে তাড়া করল তার বর্ণনা দিচ্ছি, ঠিক তক্ষুনি আমাদের ক্যাম্পের পাশের পথ বেয়ে পাহাড়ের পাকদণ্ডী দিয়ে নেমে দুটি ছোট ছোট ছেলে গ্রামের দিকে যাচ্ছিল।
ছেলে দুটির বয়স আমার চেয়ে অনেক কম–। ভীতু ভীতু, রোগা-পাতলা দেখতে। একজনের হাতে একটি বাঁশের লাঠি, আরেকজনের হাতে দুটো সাদা জংলী ইঁদুর। বোধহয়, কোনো গর্ত থেকে ধরেছে, খাবে আগুনে সেঁকে নুন লাগিয়ে।
মহান্তী ওদের কি যেন বলল; বলতেই, ছেলেগুলো হাসি-হাসি মুখে আমার দিকে ঠাট্টার চোখে চেয়ে মিঠিপানির দিকে চলে গেল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখি, ছেলে দুটো একটা বিরাট মোষের উপরে বসে আমাদের ক্যাম্পের দিকেই আসছে। দেখি, মোষের কাঁধে আমার লাল শর্টষ্টা মাফলারের মত ঝুলছে।
এই মোষটাই আমাকে তাড়া করেছিল কি না তা বুঝতে পারলাম না।
আমার মানিব্যাগে এক টাকার নোট ছিল পঞ্চাশটা। আসার আগে দাদা দিয়েছিল। তার থেকে দুটো টাকা এনে ওদের দুজনকে দিলাম। ওরা খুব খুশী হয়ে আবার মোষের পিঠে চড়েই জঙ্গলে উধাও হয়ে গেল।
এ মোষ নিশ্চয়ই ওদেরই গ্রামের।
ওদের চলে-যাওয়া দেখতে দেখতে আমার মনে হলো, এই ঘটনাতে আমার লজ্জারও কিছু নেই, ওদেরও বাহাদুরির কিছু নেই। জঙ্গলের মধ্যে মোষে তাড়া করলে খালিহাতে আমার ভয় লাগা স্বভাবিক, অথচ ওরা মোটেই এসবে ভয় পায় না। হাতিতে তাড়া করলেও বোধহয় ওরা আমার মত ভয় পাবে না। আবার ওদের যদি কোলকাতায় গড়িয়াহাটের মোড়ে বিকেলবেলা নিয়ে গিয়ে রাস্তা পেরুতে বলা হয় তো এই ওরাই ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদতে থাকবে। আমি এবং ওরা অন্যভাবে মানুষ–ওরা জঙ্গলে আর আমি গ্রামে।
সেদিন দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর, বন্দুকটা কাঁধে নিয়ে, কয়েকটা গুলি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম একা একা।
এখন ঋজুদা নেই। অমৃতদাদাও নেই, আজ জঙ্গলে গেছে কাঠ লোড করতে। এখন আমি স্বাধীন।
অন্য সময়ের মত দুপুর বেলার জঙ্গলের একটা আলাদা জাদু আছে। শীতের মিষ্টি রোদ জঙ্গলের বুকের ভিতরে পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। সোনা আর সবুজে, হলুদে আর সোনাতে চতুর্দিক ঝলমল করছে।
জঙ্গলে পা বাড়ালেই আমার কেন ঝিম ধরে আসে–ভাল লাগার। নেশা করা কাকে বলে আমার জানা নেই, কারণ আমার কোনো নেশা নেই, চায়ের নেশাও নয়; কিন্তু মনে হয়, আমি যখন বড় হব, এই জঙ্গলকেই আমার নেশা করতে হবে।
জঙ্গলের পথে একা একা বন্দুক-কাঁধে অনেক কিছু নিজের মনে ভাবতে ভাবতে চলতে আমার কী যে ভাল লাগে সে আমিই জানি!
হাঁটতে হাঁটতে কতবার কল্পনায় বাইসন কি বাঘ মেরে ফেলি আমি, কতবার জঙ্গলের রাজার অদেখা রাজকন্যার সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। কত কি কথা শুনি, কত কি গান। গাছেদের, পাখিদের, পোকা, ফুল, প্রজাপতি এমন কি আকাশ, বাতাস, পথের রাঙা ধুলো-এদেরও যে কত কি বলার আছে তা আমি নতুন করে বুঝতে পাই। বারে বারে ঋজুদার প্রতি কৃতজ্ঞতায় মন নুয়ে আসে। মনে মনে বলি, তোমাকে ভালোবাসা ছাড়া দেবার মত আর কিছুই নেই আমার। ঋজুদা–কারণ, আমি তো নিজেই এখনও বড় হইনি, লেখাপড়া শেষ করিনি। যখন আমার তোমাকে কিছু দেওয়ার মত সামর্থ্য হবে, তখন দেখবে, তুমি আমাকে যা দিয়েছ সেই অসামান্য দানের বিনিময়ে আমি তোমাকে কত সামান্যই দিতে সমর্থ হই। আমি জানি, তোমার কি কি পছন্দসই জিনিস–পাইপ, বন্দুক, কলম, ভাল ভাল আনকোরা গন্ধের নতুন সব গাদা গাদা বই। তুমি দেখো ঋজুদা, দিই কি না তুমি দেখো! ক্যাম্প থেকে একটু গেলেই মিঠিপানি পেরুতে হয়।
এখানে মিঠিপানি উপর থেকে ঝর্ণা হয়ে নীচে পড়েছে, তারপর পথটার উপর দিয়ে গড়িয়ে গেছে। অথবা বলা যায়, পথটাই মিঠিপানির উপর দিয়ে গড়িয়ে গেছে।
নরম পেঁজা পেঁজা রাঙামাটির পথ।
পথের পাশে ছোট ছোট শালের চারায় টুই পাখি বসে পীটি-টুঙ পীটি-টুঙ পিটি-পিটি-পীটি-টুঙ করে শীষ দিচ্ছে।
পথের বাঁদিকে অনেকখানি ফাঁকা জায়গ্ম। জঙ্গল কেটে একসময় হয়ত চাষাবাদ করত। এখন কি কারণে চাষাবাদ বন্ধ, তা জানি না। কিন্তু গত বর্ষার জল পেয়ে সমস্ত ফাঁকা মাঠটি এখন সবুজ ঘাস-লতায় ছেয়ে গেছে। মাঠের মধ্যে মধ্যে বেগুনী ফুল ফুটেছে থোকা থোকা। মাঠের এক পাশে একটা খড়ের তৈরী ভেঙ্গে যাওয়া একচালা ঘর। অনেক-বর্ষায় খড় ধুয়ে গেছে, খড়ের নরম হলুদ রঙ এখন কালচে হয়ে গেছে। ভেঙে-যাওয়া দরজার পাশে একটা না-নউরিয়া ফুলের গাছ ছাদের ওপর হেলে রয়েছে। না-নউরিয়ার লাল রঙ সেই ক্ষয়ে-যাওয়া খড়ের ঘরের কালো পটভূমিতে, সেই নিস্তব্ধ দুপুরের রোদ পিছলানো চিকন সবুজ মাঠের রঙের সঙ্গে মিশে একটা দারুণ ছবি হয়েছে।
আমি অনেকক্ষণ সেদিকে চেয়ে রইলাম।
এই বনের পথে পথে এরকম কত শত দারুণ ছবি থাকে। চোখ থাকলে, সে-সব ছবি দেখা যায়; চোখ না থাকলে, শুধু পথের ধুলো, পথের কষ্টই চোখে পড়ে।
মনে আছে, একদিন ছুলোয়া শিকারের পর আমি আর ঋজুদা হেঁটে হেঁটে ক্যাম্পে ফিরছিলাম। ক্যাম্পের কাছাকাছি এসে পথের পাশে একটা ঝড়ে-পড়া বড় গাছের গুঁড়ির উপর আমি আর ঋজুদা বসেছিলাম। তখন সন্ধে হয়ে আসছিল। সমস্ত আকাশটাতে একটা অদ্ভুত গোলাপী আর বেগুনীতে কে যেন প্রলেপ বুলিয়েছিল। হঠাৎ আমার চোখে পড়ল, আমাদের সামনের একটা গাছে। গাছটা বেশী বড় ছিল না, এই দু’মানুষ সমান উঁচু হবে। গাছটার সব পাতা ঝরে গেছিল। শুনো কাটা ডালগুলো সেই নরম স্বপ্নময় আকাশের পটভূমিতে কি যে এক ফ্রেমে বাঁধানো ছবির সৃষ্টি করেছিল, কি বলব!
আমি অপলকে সেদিকে তাকিয়েছিলাম। মুখ তুলতেই দেখেছিলাম, ঋজুদাও সেদিকে তাকিয়েছিল। কিছুক্ষণ পর ঋজুদা আমার দিকে মুখ ফিরিয়েছিল। আমাদের চোখে চোখে একটা ইশারা হয়েছিল। দারুণ ইশারা।
দিদিদের সঙ্গে আমি অনেক আর্ট একজিবিশানে গেছি, কিন্তু এই সব ছবির সঙ্গে মানুষের আঁকা কোনো ছবিরই তুলনা হয় না।
সেই মাঠমতো জায়গাটা পেরুনোর পরই পথটা ঘন জঙ্গলে ঢুকে গেছিল। এখানে পথের পুরো অংশে রোদ পড়ে না। দু পাশে বড় বড় প্রাচীন গাছ। ভিতরে নানারকম ঝোঁপঝাড়, জঙ্গলের পর জঙ্গল–মাঝে মাঝে এক-এক ঝাঁক চিরুনি-চিরুনি রোদ পাতার আড়াল ভেদ করে এসে পড়েছে। সায়ান্ধকার জঙ্গলের মধ্যে যেখানে যেখানে রোদ পড়েছে, মনে হচ্ছে সেই জায়গাগুলোয় যেন সোনা জ্বলছে।
নানারকম পাখি ডাকছে দুপাশ থেকে। শীষ দিয়ে দিয়ে দোল খেতে খেতে ছোট ছোট মৌটুসী পাখিরা, বুলবুলিরা, মুনিয়া আর টুনটুনীরা এ ডাল থেকে ও ডালে, এ লতা থেকে ও লতায়, পাতা নাচিয়ে, লতা দুলিয়ে, লাফিয়ে লাফিয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে। ওদের উড়ে যাওয়া শীষ আমার মনকে হঠাৎ হঠাৎ কোনো অদেখা অজানা অচিপুরের হাতছানি দিয়ে যাচ্ছে।
কোথাও বা দিনের বেলাতেই ঝিঁঝি ডাকছে–সমস্ত জায়গাটা ঝিম ধরে আছে। গা শিরশির করছে।
আমার আগে আগে ঘুরে উড়ে চলেছে একটা বড় নীল কাঁচপোকা। তার ঘন নীল পাখনায় রোদের কণা লাগলেই রোদ ঠিকরে উঠছে–সে বুঁ-উ-উ-ই-ই-ই-ই আওয়াজ করে আমার নাকের সামনে দিয়ে এক্কা-দোক্কা খেলতে খেলতে চলেছে।
কি একটা খয়েরী-মত জানোয়ার হঠাৎ পথের ডান পাশ থেকে বাঁ পাশে দৌড়ে গেল। ছোট জানোয়ার।
অভ্যাসবশে আমি বন্দুক কাঁধে তুলে ফেলেছিলাম।
জানোয়ার ভাল করে না দেখে মারার কথা নয়। কিন্তু এসব জানোয়ার এত দ্রুতগতি যে, আমার মত শিকারীর জন্যে তারা দাঁড়িয়ে থেকে ভাল করে চেহারা কখনোই দেখায় না।
জঙ্গলে যে-সব লোকের অনেকদিনের চলাফেরা, অনেকদিনের অভিজ্ঞতা, ঋজুদার মতে তারা জানোয়ার বা পাখি বুঝতে অত সময় নেয় না। তারা যে-কোনো জানোয়ারের গায়ের রঙ, চলন বা দৌড়ের ঢঙ, এবং পাখির ওড়ার লয় ও ভঙ্গী দেখেই একমুহূর্তে বলে দিতে পারে জানোয়ারটা বা পাখিটা কি। কিন্তু তেমন হতে আমার এখনও অনেক দেরী আছে।
জানোয়ারটা বাঁদিকের জঙ্গলে ঢুকে পড়ার পর আমি বন্দুক নামিয়ে ফেললাম। যখন বন্দুক নামালাম, তখন আমার মনে হলো, এ জানোয়ার যেন কোথায় দেখেছি। তারপরই মনে পড়ল, এর নাম খুরান্টি-ইংরিজীতে বলে, মাউডিয়ার। খুব ছোট্ট ক্ষুদে একরকমের হরিণ। ঋজুদার সঙ্গে একদিন ভোরের বেলায় দেখেছিলাম, ঋজুদা বলেছিল, এ জানোয়ার কখনও মারবি না, এদের বংশ প্রায় নির্মূল করে এনেছে সকলে মিলে। এখানকার জংলী লোকেরা জাল দিয়েও ধরে এদের। এদের মাংস কিন্তু দারুণ খেতে, জানিস।
ভালই করেছি চিনতে না পেরে, নইলে এই খুরান্টি মেরে পরে ঋজুদার কাছে কানমলা খেতে হতো।
পথটা সামনেই একটা বাঁক নিয়েছে। বাঁকের মুখেই বড় বড় ঘাসে ভরা একটা ছোট মাঠ। বাঁক ঘুরেই দেখি হনুমানেদের সভা বসেছে সেখানে। তাদের হাবভাব দেখে না হেসে উপায় নেই। কতরকম যে মুখভঙ্গী করছে, তা বলার নয়। লম্বা লম্বা লেজগুলো ছড়িয়ে বসে আছে কেউ। কেউ কেউ বা লেজ পাকিয়ে গোল করে লেজ নিয়ে সার্কাস করছে।
আমাকে দেখে, পথের পাশেই যারা ছিল, তারা একটু নড়েচড়ে বসল শুধু। অন্যরা ভ্রূক্ষেপ মাত্র কল না।
ওদের পেরিয়ে প্রায় আরো আধমাইলটাক গিয়ে হুঁশ হলো, এবার ফেরার কথা ভাবা উচিত। কারণ এই গহন জঙ্গলে, যেখানে দিনের বেলাতেও লোকে একলা আসে না, এলে দলবদ্ধ হয়ে চলাফেরা করে, সেখানে সন্ধের মুখে আমার একা একা ঘুরে বেড়ানো বোকামির কাজ হবে।
ঋজুদার কাছে থেকে, তার সঙ্গে ঘুরে, একটা কথা বুঝতে পেরেছি যে, কেউই একদিনে সাহসী হয় না; হতে পারে না। যারা বনজঙ্গলকে না চিনে, বনজঙ্গলের হালচাল আদব-কায়দা না জেনেই রাতারাতি বনে এসে সাহস দেখায় এসব ব্যাপারে, তাদের ঠাট্টা করে “বাহাদুর” বলে ঋজুদা।
ঋজুদা বোধহয় ঠিকই বলে, পৃথিবীতে কোনো কিছুই অত সহজে আর তাড়াতাড়ি শেখা যায় না। অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সাহসী হতেও সময় লাগে।
অভিজ্ঞতার পর যে সাহস আসে, সেটাই সাহস, আর বাহাদুরির নাম হঠকারিতা। সেটাকে বলা উচিত সস্তা দুঃসাহস। এইসব জঙ্গল এমন একটা স্টেজ, এখানে এমন এমন সব থিয়েটার হয়, এমন এমন সব চরিত্র অভিনীত হয় যে, এখানে কোনো কিছুই “স্টেজে মারা যায় না। রিহাশলি না দিয়ে এখানে থিয়েটার করা বারণ।
যখন প্রায় ফিরব ভাবছি, ঠিক তখনই এক আশ্চর্য দৃশ্য দেখলাম।
পথের পাশে, বাঁদিকে বড় বড় গাছের নীচে একটুখানি খোলা জায়গায় চার-পাঁচটি নীলগাই দাঁড়িয়ে আছে আমার দিকে মুখ করে। নীলগাইকে এখানের লোকেরা বলে “ঘড়িঙ”। সেই শীতের দুপুরের মেঘ-মেঘ ছায়ায় দাঁড়ানো নীল-ছাই রঙা নীলগাইয়ের দল গাছ-গাছালির মাথা থেকে যে একটা বড় বলের মত গোল রোদ এসে পথে পড়েছিল, সেই দিকে চেয়ে ছিল। অন্ধকার আদিম বন থেকে ওদের আশ্চর্য চোখ তুলে এই সূর্যালোকিত বৃত্তের দিকে চেয়ে ছিল।
ওদের দেখেই আমিও ‘স্ট্যাচু’ হয়ে গেলাম।
আমাকে ওদের না দেখার কথা ছিল না–কিন্তু মনে হলো, ওদের দেখামাত্র আমি থমকে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়াতে ওরা আমাকে দেখতে পেল না। আমি জলপাই-সবুজ শিকারের ক্যামোফ্লেজিং রঙের পোশাক পরে ছিলাম।
নীলগাইগুলো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে, খেলতে শুরু করল। ওরা যেন কেমন ঝাঁকি দিয়ে দিয়ে দৌড়য়–মোটা মেয়েরা দৌড়লে যেমন দেখায়, ওরা দৌড়লেও ওদের শরীরের পিছনটা অমনি ঝাঁকতে থাকে।
সে খেলা দেখার মত। সেই ঠাণ্ডা, গা-ছমছম, ভর-দুকুরের বনে ওরা একে অন্যকে ধাওয়া করে করে সেই মাঠময় খেলতে লাগল। দূরে যেতে লাগল, আবার কাছে আসতে লাগল। এক একবার দলবদ্ধ হতে লাগল, দলবদ্ধ হয়ে পরক্ষণেই আবার দলছুট হতে লাগল।
কতক্ষণ যে ওরা এরকম খেলল জানি না।
আমার হঠাৎ হুঁশ হলো যখন আমার ঘাড়ে কার যেন ঠাণ্ডা হাতের ছোঁয়া লাগল। সে ছোঁয়া আসন্ন রাতের।
জঙ্গলে ও পাহাড়ে শীতের বিকেলে রোদটা আড়াল হলেই, আলো সরে গেলেই, কার অদৃশ্য ঠাণ্ডা হাত যেন ঘাড়ে ও কানের পেছনে এসে চেপে বসে। তখন বুঝতে হয়, ঘরে যাবার সময় হয়েছে। আর দেরী নয়।
আমি ফেরবার জন্যে যেটুকু নড়াচড়া করেছি তাতেই বোধহয় নীলগাইয়েরা আমাকে নজর করে থাকবে। আমি, এই বিশ্বাসঘাতক দুপেয়ে একটি প্রাণী, যে ওদের এত কাছে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম, তা যেন ওরা বিশ্বাসই করতে পারেনি। কিন্তু বিশ্বাস হতেই, সকলে একসঙ্গে প্রথমে দুলকি চালে, তারপর দ্রুত গতিতে পাহাড়ে বনে খুরের দ্রুত খটাখট আওয়াজ তুলে আলোর সীমানা পেরিয়ে আধো-অন্ধকার দিগন্তে হারিয়ে গেল।
আমি ক্যাম্পের দিকে ফিরতে লাগলাম। বড় বড় পা ফেলে।
কিছুক্ষণ হাঁটার পর দূর থেকে ক্যাম্পের শুঁড়িপথ চোখে পড়ল।
ক্যাম্পের দিকে হাঁটতে হাঁটতে আমি মনে মনে বলছিলাম, ঋজুদা, তোমার কাছে আমি বারবার আসব। এই জঙ্গলে, কি অন্য জঙ্গলে; কিন্তু জঙ্গলে। যে-কোনো জঙ্গলে।
আসব শীতে, বসন্তে, গ্রীষ্মে, বর্ষায়, এমনকি হেমন্তেও।
মনে মনে বলছিলাম, ঋজুদা, এই স্বর্গ থেকে তুমি আমাকে তাড়িও না। কোনোদিনও তাড়িও না কিন্তু।
