ঋজুদার সঙ্গে জঙ্গলে – বুদ্ধদেব গুহ
তিন
জানিসাহীর দিকের জঙ্গলের কূপে কাজ হচ্ছিল। সেখানে গিয়েছিল অমৃত দাদা ট্রাক লোড করতে। ট্রাক লোড করে ক্যাম্পে এসে খাওয়াদাওয়া করে কাল শেষরাতে ও আবার কটক রওয়ানা হয়ে যাবে।
অমৃত দাদার সঙ্গে ঋজুদার সাতটি কুকুর-সা, রে, গা, মা, পা, ধা, নি সঙ্গে গেছে ট্রাকে চড়ে একটু হাওয়া খেতে।
নি-কে নিয়ে একটু ঝামেলা যাচ্ছে। পরশু দিন নি বাবু ক্যাম্পের সীমানার পাশেই একটি খরগোশকে দেখতে পেয়ে তাকে তেড়ে যান। তখন সবে সন্ধ্যে হব-হব। পথ ছেড়ে নি বাবু তো কানখাড়া খরগোশের পিছু পিছু ধেয়ে গিয়ে জঙ্গলের মধ্যে একটা ছোট ফাঁকা মাঠে এসে পড়ল। সেখানেই ছিল খরগোশদের গর্ত। খরগোশ ভায়া তো গর্তে ঢুকে গেল। নিবাবু জিভ বের করে হাঁপাতে হাঁপাতে এদিক-ওদিক দেখছেন, এমন সময় নি বাবুর গা-টা কেমন ছমছম করে উঠল। লেজটা অজান্তে কেমন গুটিয়ে গেল। হঠাৎ, নিবাবু দেখলেন, সেই মাঠের ওপাশে ঝোঁপের মধ্যে কি যেন একটা জানোয়ারের গোল মাথা নড়ে উঠল।
বেলা পড়ে গেছিল, আলোও যাই-যাই; নিবাবুর নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল ভয়ে।
চিতাবাঘের গন্ধ পেয়ে সে তো প্রাণপণে পড়ি-কি-মরি বলে ছুট।
মজা করার জন্যে কিনা জানি না, চিতাবাঘটাও তার পেছনে একটুক্ষণ ছুটে এসে নি বাবুকে ভীষণ রকম ভয় খাইয়ে দিয়ে বনের মধ্যের গাছতলায় বসে জিভ বের করে হাঃ হাঃ করে ভীষণ হাসতে লাগল।
এদিকে নিবাবু দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে দৌড়ে আসতে আসতে কাঁটায় পাথরে সারা গা ছড়ে ফেললেন। এসে একেবারে ক্যাম্পের বারান্দায় হাত-পা ছড়িয়ে প্রায় অজ্ঞান।
ঋজুদা বলছিল, নিটা আজ খুব বেঁচে গেল।
জানিস তো রুদ্র, চিতাবাঘের সবচেয়ে প্রিয় খাদ্য কি!
আমি বললাম, কি?
পোষা কুকুর।
সত্যি? আমি শুধোলাম। তারপর বললাম, তাহলে বাঘের সবচেয়ে প্রিয় খাদ্য কি?
ঋজুদা বলল, দেশী পোষা ঘোড়া।
আমি বললাম, যাঃ, তুমি ঠাট্টা করছ।
ঋজুদা বলল, আরে! বিশ্বাস কর। সত্যিই তাই।
প্রায় সন্ধ্যে হয়ে এসেছিল।
আমি ক্যাম্পের সামনের রাস্তায় একটু হাঁটতে গেছিলাম। সা, রে, গা, মা, পা, ধা, নি সঙ্গে নেই, তাই বাচোয়া, নইলে ওরা সবসময় এমন পায়ে পায়ে হাঁটে না যে, হোঁচট খেয়ে মরতে হয়। আর নি-বাবুটা সবচেয়ে ছোট বলে ও তো সবসময়ই দুপায়ের মধ্যে ঢুকে পড়ে। ওর জন্যে হাঁটাই মুশকিল।
এই সন্ধ্যেবেলাটা ভারী সুন্দর লাগে।
শীতকালের সোনালি নরম বেলা পড়ে এসেছে। গাছগাছালির গায়ে একটা হালকা আবছা সোনালি আভা লেগেছে। আভা লেগেছে পথের নরম লাল ধুলোয়। ডিম্বুলি গ্রাম থেকে নানারকম শব্দ ভেসে আসছে। গলায় কাঠের ঘন্টা দোলানো গরু-মোষগুলো গ্রামে ফিরে যাচ্ছে। তাদের পায়ে পায়ে লাল ধুলোর মেঘ উড়ছে তাদের মাথার উপর। সেই ধুলোর চোখেও সূর্যের আঙুল লেগেছে।
গরু-মোষের গায়ের গন্ধ, ধুলোর গন্ধ, জঙ্গলের বুনো বুনো গন্ধ সব মিলেমিশে এমন একটা গন্ধ উঠছে চাৰ্বদিক থেকে যে, কি বলব!
গাছে গাছে, ঝোপেঝাড়ে পাখিরা নড়েচড়ে সরে সরে বসছে; রাতের জন্যে তৈরী হচ্ছে। চারপাশ থেকে ঝিঁঝি ডাকতে আরম্ভ করেছে ঝি-ঝি করে। কতগুলো শ্যাওলা-ধরা পাথরের আড়াল থেকে একটা কালো বুড়ো কটকটে ব্যাঙ ঘুম ভেঙ্গে হাই তুলল। নাকি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল! কে জানে? বুড়োর বোধহয় আর কেউই নেই।
দুপুরে চান করার সময় আঙ্গাপাঙ্গা হয়ে পাথরের উপর, জলের উপর দাঁড়িয়ে, যেমন দু’হাত তুলে সূর্যকে ধন্যবাদ জানাই, এখন এই দিনশেষের নরম বেলাতেও মনে মনে সূর্যকে হাত নেড়ে বলি, আবার এসো। তুমি না এলে, না থাকলে সব অন্ধকার, শীতল আর একাকার। তুমি আবার এসো।
রাতের খাওয়াদাওয়ার পর ঋজুদা বলল, কি রে? যাবি না শুয়োর মারতে? চ, ঘন্টা দু-তিন বসে চলে আসি।
তাড়াতাড়ি ভাল করে গরম জামা চাপিয়ে, মাথায় টুপী পরে তৈরী হয়ে নিলাম। ঋজুদা একটা বড় পাঁচ ব্যাটারীর টর্চ নিল সঙ্গে আর তার রাইফেল। রাতে নিশানা নেবার সুবিধার জন্যে ঋজুদার রাইফেলে আলো লাগানো আছে। আন্দাজে নিশানা নেবার পর বাঁ হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে আলোর সঙ্গে লাগানো একটা পাতলা লোহার পাতকে ছুঁলেই আলোটা জ্বলে ওঠে, তখন ঠিক করে নিশানা নিয়ে মুহূর্তের মধ্যে গুলি করতে হয়।
সঙ্গে আমিও আমার বন্দুকটাকে নিয়ে নিয়েছি। বন্দুকের সঙ্গে ক্ল্যাম্নে টর্চ লাগানো আছে। আসলে বন্দুকটা আমার নয়। ঋজুদারই। ঋজুদা আমাকে আপাতত এটা দান করেছে।
আঠারো বছর না হলে কাউকে বন্দুকের লাইসেন্স দেওয়া হয় না।
ঋজুদা কাঁধের উপর একটা কম্বলও ফেলে নিয়েছে। বাইরে জঙ্গলের মধ্যে অতক্ষণ বসে থাকতে হলে খুবই শীত করবে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা ডিম্বুলি গ্রামের সীমানায় পৌঁছে গেলাম।
গ্রামের মধ্যেই পুরোনো মহুয়া গাছতলায় প্রধানের ঘর।
গ্রামের প্রধানকে ডাকতেই সে বেরিয়ে এল। সে এবং আর একটি লোক নিঃশব্দে আমাদের নিয়ে চলল ক্ষেতের মধ্যের ঝোড়াতে, যেখানে আমরা বসব।
ক্ষেতের মধ্যে ছোট্ট একটা খড়ের চালাঘর চারটে খুঁটির উপর বসানো। এত ছোট যে, পাশাপাশি দুজনের কষ্ট করে বসতে হয়। উপরেও খড়, নীচেও খড়।
প্রধানের সঙ্গে যে লোকটি এসেছিল, সে আমাদের দুজনের মধ্যে একটা কালো হাঁড়ি রেখে দিল। হাঁড়িটাতে হাত লাগাতেই হাতে ছেকা লাগল। তাকিয়ে দেখি, হাঁড়িটার মধ্যে কাঠকয়লার আগুন।
আগুন জ্বলছে ধিকিধিকি করে অথচ আগুনটা ভিতরে থাকায়, বাইরে থেকে দেখাও যাচ্ছে না। তাই আগুন দেখে জানোয়ারদের ভয় পেয়ে পালিয়ে যাবার কোনো কারণ নেই।
প্রধান এবং লোকটি ঋজুদাকে ফিসফিস করে কি সব বলে গ্রামে ফিরে গেল।
ঋজুদা শুধু একবার বলল, কম্বলটা জড়িয়ে বোস্, খুব ঠাণ্ডা আছে। ঠাণ্ডা লেগে যাবে।
আমরা দুজনে নিঃশব্দে সেই খড়ের ছাউনির নীচে বসে রইলাম।
শিশিরে সমস্ত ক্ষেত ভিজে চপচপ করছে। হাঁটতে গেলে প্যান্ট ভিজে যায়।
কৃষ্ণপক্ষের রাত। চতুর্দিকে ঘুটঘুঁটে অন্ধকার। ক্ষেতের উপরের অন্ধকারকে ঘিরে রয়েছে চারপাশের বনের ঘনান্ধকার। মিঠিপানির পিছনের পাহাড়টাকে আকাশের পটভূমিকায় ঠিক একটা হাতির পিঠ বলে মনে হচ্ছে। উপরে তাকালে দেখা যায় আকাশময় তারাগুলো জ্বলজ্বল করছে। তারাগুলোরও যেন খুব শীত করছে, তাই যেন ওরা কেঁপে কেঁপে উঠছে।
হঠাৎ একটা কোটরা হরিণ ডেকে উঠল বাঁ দিকের জঙ্গল থেকে। কয়েকবার ভীষণ ভয়-পাওয়া বা ধ্বাক্ আওয়াজ করে ডাকতে ডাকতে পাহাড়তলির জঙ্গলে দৌড়ে বেড়াল।
তারপর সব চুপচাপ। শুধু একটা কুম্ভাটুয়া পাখি আমাদের ক্যাম্পের কাছ থেকে সমানে একটানা ডেকে চলল–গুব গুব গুব গুব।
আধঘন্টাখানেক পর একটা বড় হায়না এল। হায়নাটা কোথাও যাচ্ছিল। শর্টকাট করার জন্যে বোধহয় এই মাঠের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল। হায়না দেখলেই আমরা গা কেমন করে ওঠে। যে ক’বার হায়না দেখেছি জঙ্গলে, ততবারই এমন মনে হয়েছে। পিছনের পা দুটো ছোট, কেমন একটা চোর চোর চেহারা, গায়ে বোঁটকা গন্ধ। হায়নাটা একটু করে হাঁটে, একটু করে থেমে দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক দেখে। অন্ধকারে ওকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল না, তবে জঙ্গলে পাহাড়ে ঘুরতে ঘুরতে চোখ অন্ধকারে অভ্যস্ত হয়ে গেলে, অন্ধকারের মধ্যেও জানোয়ারদের আয়তন ও চলন দেখে মোটামুটি বোঝা যায়।
হায়নাটা চলে যাবার পর আর কিছুই ঘটল না।
রাতে ভুনি-খিচুড়ি খেয়েছিলাম, মুগের ডালের। নারকোল কুচি আর কিশমিশ দেওয়া। খিচুড়িটা খুব ভাল হয়েছিল। তাই খাওয়াটাও বেশি হয়ে গেছিল। এখন এই ঠাণ্ডায় ঘুম পেয়ে যাচ্ছে।
মাচায় অথবা এরকম ঝোড়াতে বসে যখনি ঋজুদার মুখের দিকে তাকিয়েছি, তখনি আমার মনে হয়েছে, ঋজুদা যেন কিসের ধ্যান করছে। চোখের পলক পড়ছে না, শরীর নড়ছে না, এমনকি শ্বাস নিচ্ছে কিনা তাও বোঝা যাচ্ছে না। রাইফেলটা কোলের উপর আড়াআড়ি করে শোওয়ানো আছে। নিজে সহজ ঋজু ভঙ্গিমায় বসে আছে।
প্রথম প্রথম ভাবতাম, ঋজুদা বুঝি একদৃষ্টে জানোয়ার দেখে।
একদিন জিজ্ঞেস করাতে ঋজুদা হেসে বলেছিল, এই অন্ধকারে জানোয়ার নিজে না দেখা দিলে কি তুই দেখতে পাবি? তাছাড়া ওদের দেখতে পাবার আগেই তো ওদের আসার শব্দ শোনা যায়। তাই চোখ বন্ধ করে থাকলেও বোঝা যায় যে ওরা আসছে, বা এসেছে।
আমি শুধিয়েছিলাম যে, তুমি তাহলে অমন করে বসে আছ কেন?
ঋজুদা হেসেছিল। বলেছিল, ওরকমভাবে অনড় হয়ে না বসলে জানোয়াররা টের পেয়ে যাবে যে, আমরা এখানে বসে আছি। তাছাড়া কি জানিস রুদ্র, একা একা এরকম জায়গায় বসে থাকলে মনের মধ্যে কত কি ভাবনা আসে। তুই এখন ছোট আছিস, বুঝবি না, বড় হলে বুঝতে পারবি, যে-দিনগুলো চলে যাচ্ছে সেগুলোই ভাল। আমার বসে বসে পুরোনো কথা ভাবতে ভালো লাগে; অনেকের কথা, হয়ত ভবিষ্যতের কথাও কিছু ভাবি। ঠিক কি ভাবি, তোকে বলতে পারব না, তবে দারুণ ভাল লাগে ভাবতে।
আমি অবাক হয়ে ঋজুদার মুখের দিকে চেয়েছিলাম। এখন কি ভাবছে ঋজুদা! কার কথা ভাবছে! কে জানে?
বসে বসে আমি বোধহয় খুঁটিতে হেলান দিয়ে ঘুমিয়েই পড়েছিলাম, এমন সময় হঠাৎ আমার হাঁটুতে ঋজুদার হাত এবং আমাদের চারধারে ঘোঁত-ঘোঁত আওয়াজে ঘুম ভেঙ্গে গেল। চোখ খুলে দেখি, ঋজুদা দুহাতে রাইফেল ধরে রয়েছে, গুলি করার জন্যে তৈরী হয়ে।
ঋজুদা আমাকে ওখানে বসার আগেই বলে রেখেছিল যে, তৈরী হয়ে থাক। জানোয়ার এলেই আমি গুলি করার পর তুইও গুলি করবি। ভাল করে দেখে, তবে মারবি। মিছিমিছি আহত করিস না। যাকে মারবি সে যেন মরে।
আজ ঋজুদা তার ডাবল ব্যারেল রাইফেল আনেনি। এনেছে সিঙ্গলব্যারেল ম্যাগাজিন রাইফেল–যাতে পর পর তাড়াতাড়ি অনেকগুলো গুলি ছোঁড়া যায়।
ঋজুদা এবার তৈরী হয়ে নিজের রাইফেলের সঙ্গে লাগানো বাতির বোম টিপল।
আমিও বন্দুক সামনে নিশানা করে আলোর বোতাম টিপলাম। দুটি টর্চের আলো সমস্ত ক্ষেতে ছড়িয়ে যেতেই যা চোখে পড়ল, তা বহুদিন মনে থাকবে।
সমস্ত ক্ষেতময় দেড়শ’ বুনো শুয়োরের একটা দল ঘুরে বেড়াচ্ছে। এরা আধঘন্টা এ ক্ষেতে থাকলে কোনো ফসলের ‘ফ’-ও আর অবশিষ্ট থাকবে না। দলের মধ্যে বড় বড় দাঁতওয়ালা প্রায় গাধার সমান উঁচু শুয়োরও আছে, আবার ছোট ছোট সুনটুনি মুনটুনি বাচ্চারাও আছে। সকলেরই লেজ খাড়া। মুখ দিয়ে, পা দিয়ে অনবরত বিচ্ছিরি সব ফোঁ-ফোঁ, ঘ্যাঁত-ঘোঁত আওয়াজ করছে।
আমি শুয়োরের দল দেখতে দেখতে তন্ময় হয়ে গেছি, এমন সময় কানের কাছে ঋজুদার রাইফেল গর্জে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে আমিও একটা বড় দাঁতাল শুয়োরের ঘাড় লক্ষ্য করে গুলি করলাম। গুলি করার সঙ্গে সঙ্গে শুয়োরটা পড়ে গেল। আমি অন্য শুয়োরের দিকে নিশানা নেব কিনা ভাবছি, ইতিমধ্যে সেই শুয়োরটা মাথা তুলে উঠে পড়ে ভোঁ দৌড় লাগাল।
ঋজুদা ইতিমধ্যে তিন-চারটে শুয়োর ফেলে দিয়েছে। রাইফেলের বোল্ট খোলার চটাপট আওয়াজ শোনা যাচ্ছে, পোড়া কার্তুজের মিষ্টি গন্ধ, নল থেকে একটু একটু নীলচে ধোঁয়া। আর মাঠময় প্রলয় কাণ্ড হচ্ছে। শুয়োরের দলের ধাড়ি, মাদী ও বাচ্চাদের তীক্ষ্ণ চিৎকারে ও চতুর্দিকে ছোটাছুটিতে মনে হচ্ছে, কি যেন একটা দারুণ যুদ্ধ লেগেছে এখানে।
দেখতে দেখতে সব শান্ত হয়ে গেল। শুয়োরের দল নিরাপদে পাহাড়ের নীচের অন্ধকারে ফিরে গেল। মাঠের মধ্যে চারটে বড় বড় শুয়োর পড়ে রইল। সবগুলোই ঋজুদা মেরেছে। আমার শিকার আমাকে ধোঁকা দিয়ে পালিয়ে গেল, তা কি করব? আর সেই ধোঁকায় আমি এমন বোকা বনে গেলাম যে আর গুলিই করতে পারলাম না।
ঋজুদা শুধোলো, কি রে রুদ্র, পড়েছে? তুই যেটাকে মেরেছিলি, পড়েছে?
বললাম, না। পড়েছিল, কিন্তু উঠে দৌড় লাগিয়েছে।
ঋজুদা বলল, কোনদিকে?
সোজা।
চল্ তো দেখি ব্যাটা কতদূর গেছে। রুদ্রবাবুর শিকার এমনভাবে হাতছাড়া হবে, এটা কি ভাল কথা? তোকে কিনা একটা বিচ্ছিরি শুয়োর ধোঁকার ডালনা খাওয়াবে?
আমি বললাম, এই অন্ধকারে অত বড় আহত শুয়োরকে ফলো করবে, কাজটা কি ভাল হবে?
ঋজুদা বলল, চল্ তো তুই।
আমরা দুজনেই যে যার হাতিয়ারে গুলি পুরে ঘন অন্ধকার পাহাড়তলির দিকে এগোলাম। আমরা যখন ঝোড়া ছেড়ে নামি, তখনই দেখি যে, গ্রাম থেকে একটা মশাল হাতে নিয়ে কয়েকজন লোক ক্ষেতের দিকে আসছে। গুলির শব্দে ওরা বুঝেছে যে শিকার হয়েছে।
আমরা দুজনে ক্ষেত ছেড়ে দিয়ে ঝোঁপঝাড়ের মধ্যে আলো ফেলতে ফেলতে এগিয়ে চললাম। একটু যেতেই আমাদের গরম জামাকাপড় ডালপাতার শিশিরে ভিজে জবজবে হয়ে গেল। আমরা দুজনে পাশাপাশি যাচ্ছিলাম।
আমরা বেশ অনেকখানি এগিয়ে গেলাম কিন্তু আমার শিকার পাওয়া গেল না। এমন সময় আমাদের আলোতে হঠাৎ একজোড়া লালচে-সবুজ চোখ জ্বলজ্বল করে উঠলো।
সামনেই একটি শুকনো নালা। সেই নালার মধ্যে আমরা প্রায় নেমে পড়েছি এমন সময় চোখদুটো দেখা গেল। দেখি, নালার ঐ পাড়ে একটা মরা গাছের গুঁড়ির আড়ালে শরীরটা লুকিয়ে রেখে একটা চিতাবাঘ আমাদের দিকে চেয়ে আছে। একেবারে মাটির সঙ্গে মিশে আছে যেন। সেই জ্বলজ্বলে ভুতুড়ে চোখের দিকে চাইতেই বুকের ভিতরটা কেমন যেন ঠাণ্ডা হয়ে গেল। হঠাৎ ঋজুদা আমার কাঁধে হাত দিয়ে বলল, মার রুদ্র, ভয় নেই, আমি তোর পাশে আছি।
কি হয়ে গেল জানি না, আমি বন্দুক তুলে চিতাটার জ্বলজ্বলে দু’চোখের মধ্যে নিশানা নিয়ে দিলাম গুলি চালিয়ে। আর অমনি চিতাটা মারল এক লাফ আমাদের দিকে। আশ্চর্য! আমি ভাবলাম ঋজুদা তক্ষুনি গুলি করবে, ঋজুদা কিছু করল না, শুধু রাইফেল কাঁধে ঠেকিয়ে, দাঁড়িয়েই রইল। সামনে তাকিয়ে দেখি চিতাটা নালার মধ্যে, যেখানে কতগুলো বড় বড় পাথর আছে, সেখানে আছড়ে এসে পড়ল। একটু হাত-পা ছোঁড়াছুঁড়ির আওয়াজ হলো। তারপর সব চুপ। আশ্চর্য! এই সমস্ত ঘটনা ঘটে গেল কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যে।
ঋজুদা আমার দু কাঁধে দু চড় মেরে বলল, সাব্বাস রুদ্র। যাঃ, তুই তো আজ বাঘ শিকারী হয়ে গেলি। তোর দাদা জানতে পেলে নির্ঘাৎ হার্টফেল করবে।
আমরা একটুক্ষণ পর ওদিকে নেমে গেলাম। যাবার আগে ঋজুদা কয়েকটা পাথর ছুঁড়ে মারল। তারপর বলল, চল, সব ঠিক হ্যায়।
নালায় ঢুকতে ঢুকতে আমি বললাম, তুমি গুলি করলে না কেন? আমার এত ভয় করেছিল না, আর একটু হলে তো ঘাড়ে এসে পড়ত।
ঋজুদা হাসল; বলল, আরে আমি তো তৈরীই ছিলাম। তোর গুলিটা একেবারে মগজ ভেদ করে দুচোখের মধ্যে দিয়ে ঢুকে গেছিল, আর কী করবে সে? তবে, বুঝলি রুদ্র, বাঘ, চিতা কি অন্য যে কোনো বিপজ্জনক জানোয়ারকে কখনো সামনাসামনি গুলি করিস না। একেবারে নিরুপায় না হলে। সবসময় চেষ্টা করবি পাশ থেকে মারতে।
আমরা যখন পাথরগুলোর কাছে পৌঁছে আমার প্রথম শিকারের বাঘটাকে তারিফ করছি, এমন সময় গাঁয়ের লোকেরা মশাল নিয়ে টর্চের আলো দেখে দেখে আমাদের কাছে চলে এল। তারা বলল যে, আমাদের কাছে আসার সময় এই দিকের ঝোপে তারা একটা বড় শুয়োর পেয়েছে–সেটা গুলি খেয়েও দৌড়ে এসেছিল অনেকদূর।
ঋজুদা বলল, আলো বাপ্পালো, (ঋজুদা মাঝে মাঝেই মজা করার জন্যে বলে–আলো বাপ্পালো। উড়িয়াতে একথার মানে হলো ওরে বাবা।) একই সন্ধ্যায় শুয়োর এবং বাঘ মেরে দিলিনাঃ, তোকে তো দেখছি এবার সমীহ করতে হবে!
আমি রেগে বললাম, ভাল হবে না ঋজুদা। কিন্তু মনে মনে বেশ খুশিই হলাম।
শুয়োরগুলো পেয়ে লোকগুলো ভারী খুশি। কিছুদিন আর কোনো শুয়োর নিশ্চয়ই এ-মুখো হবে না। তাছাড়া কাল ডিম্বুলি গ্রামে যে দারুণ খাওয়াদাওয়া হবে সে তো জানা কথাই। গ্রামের যে প্রধান, সে তখনই আমাদের নেমন্তন্ন জানিয়ে রাখল, আমরা যেন সন্ধ্যেবেলা অবশ্য অবশ্য গ্রামে আসি ওদের ভোজে ও উৎসবে যোগ দিতে।
মশাল-টশাল জ্বেলে আমরা ক্যাম্পের কাছে যখন এলাম, তখন অমৃত দাদা ডোরাকাটা পায়জামা পরে মাথায় গামছা জড়িয়ে খড়ের বিছানায় আরামে ঘুমিয়ে ছিল। সে দৌড়ে এসে ঘুমচোখে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল, আরে রুদ্র দাদা, তুমনে ক্যা কিয়া? তুমনে কামা ক দিয়া।
সেদিন অনেক রাত অবধি আমার ঘুম এল না। কারণ পরদিন আলো ফুটলেই ঋজুদা বাঘটার ছবি তুলবে। আর বলেছে, বাঘটার সঙ্গে শিকারীরও একটা তুলবে।
