ঋজুদার সঙ্গে বক্সার জঙ্গলে – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

ছয়

শিলিগুড়ি থেকে সিলিভিকালচারের অ্যাসিস্ট্যান্ট ডি. এফ. ও. ভগবান দাস সাহেব এসেছিলেন পালিত সাহেবের সঙ্গে। উনিই বলে গেছিলেন আমাদের বাংলোতে এসে যে, জয়ন্তীতে যাওয়ার সময়ে যেন বনের মধ্যের কাঁচাপথ দিয়ে ওয়াচ টাওয়ার হয়ে যাই।

ভটকাই বলল, আচ্ছা ঋজুদা, কনসার্ভেটর পালিত সাহেব তো তোমার সঙ্গে আলাপ করতে এলেন না?

কেন আসবেন? আমি তো ওঁর উপরওয়ালা নই। সরকারি আমলাও নই। তাছাড়া আমি কে এমন মানুষ যে আমার সঙ্গে সকলের এসে আলাপ করতেই হবে? আমি বন-বিভাগের উপদেষ্টা-টেষ্টা হলেও না হয় কথা ছিল। বন-জঙ্গলকে ভালবাসি, এটুকু ছাড়া অন্য কোনও পরিচয়ই তো আমার নেই! যার পদাধিকার নেই তাকে এদেশে কেই-বা চেনে বা মান্য করে, বল? তা ছাড়া, উনি এসেছেন নিজেরই কাজে। কাজ নিয়েই আছেন। আর ওঁদের কাজ তো ঘড়ি-ধরাও নয়। খাওয়া-দাওয়ারও ঠিক থাকে না কোনও। পরে কোনওদিন আলাপ নিশ্চয়ই হবে, বনে অথবা কলকাতাতেই।

খাওয়া-দাওয়ার পরে আমরা যখন বেরোলাম তখন মেঘলা করেছিল আকাশ। রেললাইনটা পেরিয়ে স্টেশানের পাশ দিয়ে একটু গিয়েই ঘন বনের মধ্যের কাঁচাপথে ঢুকে পড়ল পথটা। দু পাশে হাজার হরজাই গাছ উপরে চন্দ্রাতপের সৃষ্টি করেছে। অধিকাংশ গাছই আমার অচেনা। ঋজুদাও দেখি মনোযোগ দিয়ে দেখছে দু পাশে। বলল, ওই দ্যাখ, ওই সবকটা মহীরুহই শিরিষ। চাঁপ গাছ আর জারুল আছে। দ্যাখ, হালকা সবুজ নতুন পাতা এসেছে। মনে হচ্ছে সবে যেন বসন্ত এল।

ভটকাই বলল, ও মা! কী সুন্দর লাল ফুল ফুটেছে ওই মস্ত গাছটাতে! ওটা কী গাছ ঋজুদা?

গতকাল সকালে দেখালাম না তোকে ইনফরমেশান সেন্টারে যাওয়ার পথে! পারুল রে!

ও হ্যাঁ হ্যাঁ, ভুলে গেছিলাম।

এই গাছগুলো কী গাছ? প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড।

ড্রাইভারই বলে দিলেন ঋজুদা বলে দেবার আগেই, চাঁপ গাছ।

চাঁপা?

ঋজুদা বলল, চাঁপা না রে চাঁপ।

একী! কলকাতার মুসলমানী খাবার সাবির বা সিরাজের চাঁপ? মাটন বা চিকেন?

সেগুলো চাঁব। চাঁপ নয় রে দিগগজ। অনেক বাঙালিই অবশ্য বলেন চাঁপ।

তাই?

ভটকাই অবাক হল তার প্রিয় খাবারের নাম এতদিন ভুল জানত বলে।

ওগুলো কী ফুল বল তো? এই যে গাছগুলোতে, মানে, ঝড়ে পর্যন্ত হয়েছে?

ঋজুদা আমাদের জিজ্ঞেস করল।

খুব চেনা। চেনা লাগছে কিন্তু চিনতে পারছি না।

আমি বললাম।

ভটকাইও বলল, সত্যিই খুব চেনা চেনা।

জানে না বললে ও যে আমার চেয়ে কম জানে এই কথাই প্রমাণিত হয়ে যাবে এই জন্যেই চেনে যে না, তা কবুল করল না।

ঋজুদা বলল, ঘেঁটু ফুল। এটা তো আর বিহার ওড়িশা কি মধ্যপ্রদেশ নয় রে, এই যে আমাদের বঙ্গভূমি। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখাতে পড়িসনি ঘেঁটু ফুলের কথা? নামটা আনরোম্যান্টিক হলে কী হয়, বিভূতিভূষণের কলম, বাংলাসাহিত্যে অমর করে দিয়ে গেছে এই সাধারণ গ্রাম্য ফুলকেই।

আমি চুপ করে রইলাম।

ভাবছিলাম, আমি এই অধম রুদ্র রায়ও যে ঋজু বোসকে বাংলাসাহিত্যে অমর করে দিয়ে গেলাম এটা যেন কোনও ঘটনাই নয়!

মুখে বললাম, ঋজুদা, গাছগুলো চিনিয়ে দাও না।

আরে আমিই কি সব চিনি? ড্রাইভার ভাইকে বল, এঁরা রোজ এই পথে দিন রাত যাতায়াত করছেন, এঁরাই ভাল জানবেন। আমরা তো শহরের মানুষ, উড়ে-আসা চিড়িয়া।

তোমার নাম কী ভাই?

অভয়।

তবে আর চিন্তা কী? কোনও ভয়ই নেই আমাদের।

ড্রাইভার ভাই বললেন, না ছার। আমি ঋজুদার সব বইই পড়ছি। আপনে কত বনে বনে ঘোরেন। আমরা আর কতটুকু জানি! আপনে তো সবই জানেন।

ঋজুদা হেসে বলল, ওই আশীর্বাদটা কোরো না ভাই। অমন অভিশপ্ত যেন আমাকে কোনওদিনও হতে না হয়। তুমিও কি চাও আমিও আরেকজন সর্বজ্ঞ হই, আমিময় মুকুজ্যের মতন? সর্বজ্ঞ হওয়ার শিক্ষা আমার সাধারণ বাবা আমাকে দেননি।

তিনি আবার কিনি? আমিময় মুকুজ্যে?

ভটকাই বলল।

আমি বললাম, আছেন, আছেন। তিনি এক চিজ! পরে তোকে বলব।

বাইসন! বাইসন!

বলে, চাপা গলাতে চেঁচিয়ে উঠলেন অভয়। চাপা গলাতেও যে চ্যাঁচানো যায়, সেই প্রথম জানলাম।

একটি দলে তারা পথ পেরোল ডান দিক থেকে বাঁ দিকে। সঙ্গে একটি বাচ্চাও ছিল। সবসুন্ধু আটটি। একটি আমাদের দিকে মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে রইল শিং বাগিয়ে। যতক্ষণ না পুরো দলটি অদৃশ্য হয়ে যায়। সকলকে নিরাপদে রাস্তা পার করিয়ে দিয়ে সকলের শেষে সেও গেল।

ওরা চলে গেলে, ভটকাই বলল, সাদা মোজা পরে রয়েছে যে হাঁটু অবধি!

হ্যাঁ। ভগবানই মোজা পরিয়ে পাঠিয়েছেন ওদের। দু পায়ে হাঁটু অবধি সাদা মোজা, কপালেও সাদা সিঁদুর লেপা। এও বিধাতারই কারসাজি।

ঋজুদা বলল।

এই মোষগুলো, এক একটা কত কেজি করে দুধ দেবে বলো তো ঋজুদা? উরিঃ ফাদার! মাদার ডেয়ারি’ এদের ধরে নিয়ে যায় না কেন?

ঋজুদা হেসে উঠল।

তারপর বলল, এরা বুনো মোষও নয়, বাইসনও নয়।

বাইসন নয়?

ড্রাইভার সাহেব একটু অবাক হয়ে বললেন।

নয়। বাইসন, উত্তর আমেরিকার প্রাণী। তারা অনেকেই ছোট হয় এদের চেয়ে। তাদের এমন সাদা পা এবং কপালও থাকে না। এদের দেখা, শুধুমাত্র ভারতেই মেলে। পুব ভারতের নানা জঙ্গলে, দক্ষিণ ভারতের নীলগিরিতে এদের দেখা যায়। মধ্যভারতে আছে। তবে কম। এদের নাম গাউর।

কী বানান?

Gaur। এরাই হাতি গণ্ডারের পরেই সবচেয়ে বড় ভারতীয় তৃণভোজী প্রাণী। শম্বর, বারাশিঙা ইত্যাদিও বড় হয় বটে কিন্তু গাউরদের ধারে কাছে আসে না। তবে বুনো মোষও বড় হয়।

টাঁড়বারো।

ভটকাই বলল।

সেটা কী জন্তু হল?

অভয় বললেন।

ভটকাই, ঋজুদা জবাব দেবার আগেই বলল, সেটা কোনও জন্তু নয়, বুনোমোষদের দেবতা। বিভূতিভূষণের ‘আরণ্যক উপন্যাসে আছে। আরণ্যক কি পড়েছেন?

না।

পড়বেন পড়বেন। আরণ্যকই পড়েননি আর আপনি অরণ্যচারী! এ কী প্যারাডক্স!

শুধু অরণ্যচারীই কেন? বাংলা যাঁরা পড়তে পারেন তেমন প্রত্যেক মানুষেরই ‘আরণ্যক পড়া উচিত। সে তো উপন্যাস নয়, বনবাণী।

তা ঠিক। আমি বললাম।

ওই দ্যাখ, চিক্রাসি, আর ওইদিকে ময়নার ভিড়।

ঋজুদা বলল।

ময়না? গাছের নাম? আমি তো জানতাম পাখিরই নাম।

হ্যাঁ রে।

ময়নাগুড়ি জায়গার নাম কি এই গাছেরই জন্যে?

তা জানি না। তবে নট আনলাইকলি। এই ময়না গাছগুলোও দ্যাখ, শিমুলেরই মতন দুদিকে সমান্তরালে শাখা ছড়ায়। কাণ্ডর মূলেও শিমুলেরই মতন ভাগ ভাগ থাকে। তবে ময়নার গায়ে কিন্তু শিমুলের মতন কাঁটা থাকে না। খুব বড় বড় হয় এ গাছগুলো। থোকা থোকা ফুল ফোটে হালকা বেগুনি রঙা, মার্চ-এপ্রিলে।

এটা কী গাছ?

আমি জিজ্ঞেস করলাম।

ড্রাইভার ভাই বললেন, এটা লাটোর।

লাটোর?

হ্যাঁ। এর শক্ত কাঠ দিয়ে ভাল তক্তা হয়।

আরে! এটা কী গাছ? চেনা চেনা লাগছে অথচ…

আমি আবারও বললাম।

পাঁচটি করে পাতা এক একটি থোকাতে?

ভটকাই বিশদ করে বলল।

এটাই তো ছাতিম।

ও হ্যাঁ। শান্তিনিকেতনের পত্তন তো এই গাছের জন্যেই। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ গ্রীষ্মে পালকি করে যেতে যেতে বীরভূমের সেই বিশ্বটাঁড় জায়গাতে ছাতিম গাছের ছায়াতে বিশ্রাম করবার জন্যে যখন থামেন, তখনই তো…

ভটকাই-ই বলল।

আঃ! তুই বড্ড কথা বলিস ভটকাই। কত গাছ অজানা অচেনা চারদিকে, চিনে নে ভাল করে।

ঋজুদা বলল।

এখানে কিন্তু ছাতিম কয় না ছার। বন-বিভাগেও ছাতিম কয় না। এর নাম ছইতান বা ছাতিয়ান।

ঠিক ঠিক। গোয়ালপাড়ার ধুবড়ি শহরেও একটি পাড়া আছে। তার নামই ছাতিয়ানতলা, ইতু পিসি, রুবী কাকিমারা থাকেন।

ফুল ফোটে ছাতিয়ান গাছে?

আমি শুধোলাম।

হ্যাঁ। ফোটে বইকী! ছোট ছোট সাদা ফুল ফোটে, এপ্রিল-মে-তে।

হ্যাঁ। এপ্রিল-মেতেও একবার আসতে হবে গন্ধ বিধুর সমীরণের বাস পেতে।

আমি বললাম।

যা বলেছিস।

এটা কী গাছ ভাই?

ঋজুদা জিজ্ঞেস করল।

দেখলাম, ঋজুদার চোখ-মুখের ভাব অন্যরকম হয়ে গেছে। ঋজুদারও অচেনা এতরকম গাছ দেখে ঋজুদা অভিভূত, বিস্মিত। যে সব গাছ অচেনা, সেগুলির নাম জানবার জন্যে ব্যাকুল হয়ে উঠেছে।

এটার নাম কাটুস।

কাটুস?

হ্যাঁ।

আবার ওই দেখেন ওই গাছটা, ওইটার নাম কাট্টুস।

কাট্টুস?

হ্যাঁ। বটানিকাল নাম Hystrix।

আর কাটুসের বটানিকাল নাম।

Castanopsis।

বাঃ। তুমি ভাই কতদূর পড়াশুনো করেছ? Botany নিয়ে পড়েছ না কি ভাই?

হাঃ। এতগুলান মানুষের সংসার চালাম কামনে হেই চিন্তাতেই সব চুল পাইক্কা গেল গিয়া। ক্লাস নাইনেই পড়াশুনার ইতি করছি। কুচবিহারে এক গাড়ির মেরামতির কারখানায় হেল্পার আছিলাম। তারপর হাতে-পায়ে ধইর‍্যা ড্রাইভারি শিখ্যা এই অবধি আসছি। তবে ইংরাজি বাংলা পড়তে তো পারিই। তাই সাহেবগো লগ্যে ঘুইরা ঘুইর‍্যা যেটুকু পারি শিইখ্যা লইছি। ডিগ্রির সঙ্গে শিক্ষার কী সম্পর্ক কয়েন ছার? আমি তো অশিক্ষিত ডেরাইভার।

বাঃ।

মুগ্ধ হয়ে বলল, ঋজুদা।

তারপর বলল, তোমার মতন অশিক্ষিত আমাদের দেশে আরও অনেক থাকলে দেশের উন্নতি হত। ডিগ্রির সঙ্গে শিক্ষার যে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনওই সম্পর্ক নেই একথা আমিও বিশ্বাস করি।

আপনারাও য্যান কেমনধারা মানুষ।

অভয় বললেন।

কেন?

আমি বললাম।

কত সাহেব গো লইয়াই তো এইসব জঙ্গলে ডিউটি করি কিন্তু কই কারোরেই দেখি না ঘেঁটু ফুল বা ছাইতন বা কাটুস লইয়া এমন মাথা ঘামাইতে। আমাগো ফরেস্ট ডিপার্টের অনেক সাহেবদেরও দেখি না।

ভটকাই বলল, আমরা যে ভালমানুষ নই একেবারেই।

বলেই রবীন্দ্রনাথের ফাল্গুনীর গান গেয়ে দিল :

‘ভালো মানুষ নইরে মোরা ভালো মানুষ নই–
গুণের মধ্যে ওই আমাদের, গুণের মধ্যে ওই ॥
দেশে দেশে নিন্দে রটে, পদে পদে বিপদ ঘটে–
পুঁথির কথা কই নে মোরা, উলটো কথা কই ॥
গুণের মধ্যে ওই।
ভালো মানুষ নই রে মোরা ভালো মানুষ নই।

গান শেষ করেই ভটকাই চেঁচিয়ে উঠল, দাঁড়ান! দাঁড়ান অভয়দা। কাঁটাল গাছ। একটা গাছ-পাঁঠা পেড়ে নিয়ে যাই। জয়ন্তীতে যদি পাওয়া না যায়?

অভয় হেসে উঠে বললেন, ওগুলো বন কাঁটালের গাছ। এঁচড় বা কাঁটাল কিছুই ফলে না ওই সব গাছে। ও গাছের কাঠ দিয়ে ভাল আসবাব হয়, মানে ফার্নিচার।

তাই?

ভটকাই বলল।

ওগুলো কী লতা ঋজুদা?

ও। ওগুলো তো আসামী লতা। সংকোশ নদীর পাশের যমদুয়ারেও অনেক আছে। আর ওই দ্যাখ, ওই লতাটার নাম আরারিকাটা। এদের আবার তিনরকম আছে। Mimosa Himalayana…

ড্রাইভার সাহেব বললেন, তাদের নাম, আকাসিয়া পেনাল্টা আর আকাসিয়া এসেসিয়া-জংলি। বটানিকাল নাম।

বাঃ।

উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল ঋজুদা।

তারপর বলল, তুমিই আমাদের সব জায়গাতে এবার থেকে নিয়ে যাবে অভয়। তোমার রেঞ্জার সাহেবের নাম যেন কী বললে?

বিমান বিশ্বাস।

হুঁ, তাকে বলব।

এই দ্যাখ রুদ্র, আবার শিরিষ। আসলে শিরিষের পাঁচরকম আছে।

কী কী?

টাটা, হররা, সেতো, কারকুর, কালো।

শিরিষের বটানিকাল নাম কী ঋজুদা?

পাঁচ ভ্যারাইটির পাঁচ নাম।

ALBIZZIA LUCIDA, ALBIZZIA IIAMGLEI, PROCERA, PDORATISSIMA, ONS NARCINATA– পঞ্চকন্যার পাঁচ নামl

কী সব হিজবিজবিজ নামরে বাবা!

ভটকাই বলল।

আমরা কতরকম আকাসিয়া, আলবিজিয়া সব দেখেছিলাম আফ্রিকাতে, না ঋজুদা? জলের পাশে পাশে, ইয়ালো-ফিভার আকাসিয়া! মনে আছে? ন্যাবা-ধরা হলুদ।

আমি বললাম।

হ্যাঁ। ঋজুদা বলল।

ও সব তো আছে ঋজুদা সমগ্রর প্রথম খণ্ডে নয় দ্বিতীয় খণ্ডে। পড়েছি আমি। তাছাড়া পড়েছি পঞ্চম প্রবাস এবং গুগুনোম্বারের দেশেও।

আমিও পড়েছি আফ্রিকার ‘পঞ্চম প্রবাস’ আর ‘ইলমোরানদের দেশে’।

অভয় বললেন।

আমি বললাম, শেষ দুটো বইতে ঋজুদার কাহিনী তো নয়। আমার লেখাও নয়। অন্যের লেখা।

যাই বলো ঋজুদা, আমার বন্ধু রুদ্র কিন্তু তোমার কীর্তি কুকীর্তি সব লিখে তোমাকে বিখ্যাত করে দিয়েছে।

ভটকাই আমার সঙ্গে শান্তিস্থাপনের জন্যে বলল।

ঋজুদা চাপা হাসি হেসে বলল, রুদ্র তোর বন্ধু বুঝি? জানতাম না তো! বিখ্যাত কি কুখ্যাত তোরা জানিস। তবে রুদ্রর লেখার হাত যে ভাল সে কথা সকলেই বলে।

আমি দু হাতে শার্টের কলারটা তুলে দিয়ে বললাম, হুঁ হুঁ।

এ যাত্রায় আমাদের সকলেরই হাত তো খালি। বন্দুক রাইফেল পিস্তল কিছুই তো সঙ্গে আনিনি! এই বক্সা বাঘ-প্রকল্পের সীমানার মধ্যে সেসব আনাও তো বে-আইনি। জেলে যেতে হবে। কিন্তু দুটি হাতই মুক্ত বলেই নতুন অভিনেতাদের মতন দুটি হাত কোথায় রাখি, তাদের নিয়ে কী করি, এই এক সমস্যা হয়েছে।

এই দ্যাখ রে আবার লালি। এইটা দুধে লালি আর ওইটা এমনি লালি। দ্যাখ দ্যাখ, কেমন মিনিয়েচার মাকাল ফলের মতন লাল লাল গোল গোল ফুল ধরেছে লালি গাছে। দারুণ সুইট।

ভটকাই বলল।

অভয় বললেন, ওই ফলগুলো বছরের এই সময়েই পাড়া হয়। পেড়ে রেখে দেওয়া হয় বীজের জন্যে। বনের যেসব অঞ্চলে এই লালি লাগানো দরকার সেই সব অঞ্চলে এই বীজ থেকে গাছ করবেন বন-বিভাগ পরে।

ঋজুদা, এই যে, আবারও পেয়েছি।

ভটকাই চেঁচিয়ে উঠল।

কী?

আকাতরু?

জামগাছের মতন মস্ত গাছ কিন্তু পাতাগুলো পাকুড় গাছের মতন। ঋজুদা বলল। সাদা রঙা আমের বোলের মতন ফুল ফোটে মার্চ-এপ্রিল মাসে। এই গাছেদের বটানিকাল নাম হেইনি ট্রিজুগা (Heynce Trijuga), রক্স-সাহেবের দেওয়া নাম, B. Rox।

লালি গাছের ফল তো দেখলাম। ফুল কখন হয়?

ভটকাই বলল।

ফুল তো ফলের আগেই হয়। তাও কি জানো না বৎস?

আমি বললাম।

লালি গাছে সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর অবধি লাল লাল ফুল ফোটে।

ফুলগুলো সুপুরির খোলার মতন খোলা দিয়ে ঢাকা থাকে।

ড্রাইভার অভয় বললেন।

তাই? একবার আসতে হবে তো সেপ্টেম্বর-নভেম্বরে লালির ফুল দেখতে।

আরে! সামনে পথের মধ্যে ওটা কী?

ওটাই তো ওয়াচটাওয়ার।

ড্রাইভার অভয় বললেন।

আমরা কয়েক মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম ওয়াচটাওয়ারে। কংক্রিটের তৈরি গোলাকৃতি, চার-মানুষ সমান উঁচু টাওয়ার। বনের সঙ্গে মিশে যাওয়ার জন্যে সবজে-হলদে রং করা। ঘোরানো সিঁড়ি উঠে গেছে উপরে। ছোট্ট বারান্দা আছে, চেয়ার পেতে বসে বনের প্রাণী দেখবার। টাওয়ারের জনা চারেক নেপালি ফরেস্ট গার্ডও দেখলাম। তাঁরা নাকি দিনে এবং রাতেও থাকেন। সেখানেই রান্নাবান্না করে খান। একজন সাইকেল নিয়ে রাজাভাতখাওয়া গেছেন রসদ আনতে। সামনেই একটি নুনী’ বানানো হয়েছে জঙ্গল সাফ করে এবং বস্তা বস্তা নুন ফেলে। নানা তৃণভোজী জানোয়ার আসে সেই নুন চাটতে। হাতিও আসে প্রায়ই। গার্ডরাই বলল। তৃণভোজীদের পেছনে পেছনে আসে মাংসভোজীরা। কখনও-সখনও।

আমরা সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে গেলাম। দেখলাম, চারদিক থেকে চারটে কাঁচাপথ এসে যে চৌমাথাতে মিশেছে, সেখানেই এই টাওয়ার। জঙ্গলে ওয়্যারলেস ফোন আসার আগে এই টাওয়ারই হয়তো তোক মারফৎ চারদিকে খবর লেনদেন-এর ব্যাপারে মুখ্য ভূমিকা নিত। কে জানে!

টাওয়ার থেকে নেমে, সেই মোড় থেকে আমরা বাঁ দিকে ঘুরে চললাম জয়ন্তীর পথে।

ড্রাইভার ভাই বললেন, আপনারা রেঞ্জার সাহেবরে কইবেন, আপনাগো সংহাই রোডে লইয়া যাইবেন উনি।

সেটা কী ব্যাপার?

সি এক সাংঘাতিক পথ। ঘনঘোর জঙ্গলের মধ্য দিয়া যাইতে হইব। দেখনোর মতন জঙ্গল। দিনমানেও গা ছমছম করবঅনে। আর যখন জয়ন্তী থিক্যা ভুটান ঘাটে যাইবেন তখন যাইবেন পীপিং-এও। ভুটান ঘাট থিক্যা।

পীপিং মানে? বেজিং-এ?

ভটকাই অবিশ্বাসের গলাতে বলল।

না, না। পীপিং হইতাছে ভুটান আর ভারতের বর্ডার। সেইখানেই তো রাইডাক নদী পাহাড় থিক্যা সমতলে নামছে। আহা! কী ছিন-ছিনারি কী কম ছার আপনাগো! অবশ্যই যাইবেন। আপনে তো পিরথিবী ঘুইরাই আইছেন। আমাগো বক্সার জঙ্গলেও ভাল কইরা ঘুইরা যান। বক্সাও ফ্যালনা নয় আমাগো।

তারপর আমার দিকে ফিরে বললেন, রুদ্রবাবু যদি কলকাতা ফিরা আমাগো লইয়া কিছু ল্যাখেন তাইলে তো বইতা যা গিয়া।

লিখবেন। লিখবেন। অবশ্যই লিখবেন।

ভটকাই আমার লোকাল গার্জেনের মতন বলল, অভয় ভাইকে আশ্বস্ত করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *