তিন
আজ সকালে ব্রেকফাস্টের পরেই বেরিয়ে পড়েছিলাম আমরা। ব্রেকফাস্টের বর্ণনাও আর নাইবা দিলাম, দিলে সকলেই মনে করতে পারে আমরা শুধু পেটুকই নই, রাক্ষসও বটে!
রাজাভাতখাওয়ার রেঞ্জার সাহেব নীলরঙা জিপ পাঠিয়েছিলেন আমাদের সেখানে নিয়ে যেতে। সঙ্গে অনুপ দাস ফরেস্ট গার্ড। আর তাঁর সুন্দর ছেলে। সে পরীক্ষা দিতে এসেছিল শহরে। পথে তাকে আমরা নামিয়ে দিলাম অনুপবাবুর বাড়িতেই।
দশ মিনিটের মধ্যেই নিবিড় জঙ্গলের মধ্যে এসে পড়লাম। নিবিড় জঙ্গল বললে সব বোঝায় না। উত্তর বাংলার হিমালয়ের পাদদেশের জঙ্গলের নিবিড়তার সঙ্গে ভারতের অন্যান্য বহু জায়গার জঙ্গলের তো বটেই, আফ্রিকার জঙ্গলেরও তুলনা হয় না। এমন নিচ্ছিদ্র বন এখানে যে, দৃষ্টি বাধা পায়। মন খারাপ হয়ে যায়। ঠিক এই ধরনের জঙ্গল আমি আসাম আর তেরাই অঞ্চল ছাড়া আগে দেখিনি। ঋজুদা অবশ্যই দেখে থাকবে।
অনুপ দাস বললেন, এই যে স্যার, ডানদিকে দেখুন মধু গাছ।
মধু গাছ মানে?
মানে জানি না। এর নীচে ঢিল-খাওয়া ঠাকুর আছেন।
তাই?
ভটকাই বলল, বিজ্ঞর মতন।
ঋজুদা কিছু বলল না।
এইখানে প্রায়ই ছিনতাই হয়।
অনুপবাবু বললেন।
কী করে?
জঙ্গলে লুকিয়ে থাকে। গাড়ি বা স্কুটারের শব্দ শুনলেই বেরিয়ে এসে ছিনতাই করে জঙ্গলে পালায়। কিন্তু জিপের শব্দ শুনলে আসে না। জানে, ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট বা পুলিশের গাড়ি হবে।
এই ছিনতাইবাজেরা কারা?
অধিকাংশই নেপালি উদ্বাস্তু। ভুটান থেকে তাড়া খেয়ে এসে এই সব করে।
মাত্র আধঘন্টার মধ্যেই আমরা পৌঁছে গেলাম রাজাভাতখাওয়াতে।
রাজাভাতখাওয়াতে ঢোকার পথেই পড়ল, ডানদিকে, বক্সা টাইগার প্রজেক্টের ইনফরমেশান সেন্টার।
মালপত্র সব নামিয়ে রেখে তারপর এখানে আসা যাবে। কী বলিস?
ঋজুদা বলল।
আমি বললাম, হুঁ।
কী মাম রে বাবা! রাজাভাতখাওয়া।
লাগাতার কথা বলা ভটকাই বলল।
ওর কথার তোড়ে মাথা ধরে যাওয়ার জোগাড় হল আমার।
হ্যাঁ। কোচবিহারের রাজা আর ভুটানের রাজার মধ্যে অনেকদিন আগে যুদ্ধ লেগেছিল। সেই যুদ্ধে সন্ধি হয়। তখন দুই রাজাই এখানে একসঙ্গে ভাত খেয়েছিলেন। অনুপবাবু বললেন।
তাই?
আমি বললাম।
একটি ছোট লাইনের লেভেল-ক্রসিং পেরিয়ে সুন্দর এবং ছোট্ট জনপদ রাজাভাতখাওয়াতে এসে পৌঁছলাম আমরা। নিবিড় জঙ্গলের মধ্যে এক স্কোয়ার কিমি, মতন জায়গা জুড়ে এই জনপদ।
বন-কেটে করা। তবুও বন যেন ঝুঁকে পড়ে চারপাশ থেকে ঘাড়ের উপরে নিঃশ্বাস ফেলছে। বাঁদিকে একটি সুন্দর একতলা বাংলো। অনুপবাবু বললেন, এখন এটা রেস্ট হাউস। আগে ছিল ডি. এফ. ওর বাংলো। বক্সা ডিভিশানের ডি. এফ. ও.র হেড কোয়ার্টার্স যখন রাজাভাতখাওয়াতে ছিল।
এখন কোথায়?
এখন টাইগার প্রজেক্ট হয়ে যাবার পরে আলিপুরদুয়ারে চলে গেছে। টাইগার প্রজেক্টের হেডকোয়ার্টার্সও তো সেখানেই।
আমরা কি ওই বাংলোতেই থাকব?
ভটকাই শুধোল।
না। এটা ভি. আই. পি.-দের জন্যে।
ভি. আই. পি. কারা? ঋজুদা কি ভি. আই. পি. নন?
কিছু মনে করবেন না স্যার।
উত্তরবঙ্গের জঙ্গলে ভি. আই. পি. হচ্ছেন গিয়ে শুধু হাতি আর কনসার্ভেটর অফ ফরেস্টস। এখন পালিত সাহেব আছেন বাংলোতে।
তিনি কে?
তিনি সিলিভিকালচারের কনসার্ভেটর।
সিলিভিকালচারটা কী জিনিস?
আমি বললাম।
ঋজুদা যেন কী বলতে গেল কিন্তু বলার আগেই অনুপবাবু বললেন, গাছপালা এই সবের কালচারকে বলে সিলিভিকালচার। মাছেদের বেলা যেমন পিসি কালচার। শোনেননি?
হ্যাঁ।
ভটকাই বলল, মাসি কালচারও আছে নাকি?
তারপরই দ্বিতীয় বাংলোটা দেখিয়ে বলল, এই বাংলোটাতে থাকব আমরা?
না, এটাতেও নয়। এটা ডর্মিটরি। এখানে প্রাণীতত্ত্ব নিয়ে যে সব ছাত্র পড়াশুনো করেন তাঁরা থাকেন। ডক্টরেট-এর জন্যে হাতেকলমে বন ও বন্যপ্রাণীদের যাতে জানতে পারেন, সেজন্যেই কিছু ছাত্র এসে আছেন এখানে এখন। খালি থাকলে, বাইরের লোকও অবশ্য পেতে পারেন।
তবে কি আমরা ওই দোতলা বাংলোটাতে থাকব?
হ্যাঁ। ওইটা ছিল অ্যাডিশনাল ডি. এফ. ও.র কোয়ার্টার আগে।
বাঃ!
ঋজুদা স্বগতোক্তি করল।
বন্ধ গেট-এর সামনে জিপ দাঁড় করিয়ে ড্রাইভার ডাকল, নর্বু, নর্বু।
তারপর হর্ন বাজাল।
ভিতর থেকে একটি বেঁটেখাটো নেপালি লোক, বছর পঁচিশেক বয়স হবে, দৌড়ে এসে গেট খুলল।
ও কি চৌকিদার?
ঋজুদা জিজ্ঞেস করল।
হ্যাঁ স্যার। চৌকিদার কাম কুক কাম-সবকিছু।
ওর পুরো নাম কী?
নর্বু তামাং।
গেট বন্ধ করে রেখেছে কেন?
গোরু ঢুকে বাগানের ফুলের গাছ খেয়ে ফেলে। ঘাস বা পাতা-টাতা তো এখানে অঢেল। রাজাভাতখাওয়ার গরুরা খুব ফুল-বিলাসী।
ওদের দুধে কি ফুলের গন্ধ হয়?
ওরিজিনাল মিস্টার ভটকাই প্রশ্ন করলেন।
আমি জোরে হেসে উঠলাম।
বিরক্ত হয়ে ও বলল, হাসার কী আছে বোকার মতন? ঋজুদা বলে না যে, ইনকুইজিটিভনেসই শিক্ষিত মানুষের লক্ষণ। সব কিছুই জানতে দোষ কী? তোর মতন কোনও পাঁঠা আমাকে বোকা ভাববে এই ভয়ে কি আমি আমার জ্ঞানলাভের সদা-সজাগ ইচ্ছেটাকে গলা টিপে মারব?
ঋজুদা বলল, জানার বা জ্ঞানের ইচ্ছাকে এককথায়, মানে এক শব্দে কী বলে?
জ্ঞানপিয়াসা।
ওভারস্মার্ট ভটকাই সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর দিল।
আমাদের নামিয়ে একতলা দোতলা ঘুরিয়ে দেখিয়ে অনুপবাবু চলে গেলেন।
