ঋজুদার সঙ্গে বক্সার জঙ্গলে – বুদ্ধদেব গুহ
দুই
ডিমা আর নোনাই নদীর আঁচলের শহর আলিপুরদুয়ারের সার্কিট হাউসের হাতার লন-এ ঋজুদা বসেছিল পাইপ-মুখে একটি চেয়ারে। আর ঋজুদার পায়ের কাছে বাধ্য বাঁদরের মতন বসেছিল ভটকাই। তেল কিছু লাগাতে পারে বটে! আমি চান করতে করতে বাথরুমের খোলা জানালা দিয়ে দেখছিলাম।
একটুও ইচ্ছে ছিল না আমার, ভটকাই আসুক এভাবে আমাদের সঙ্গে এই বক্সার জঙ্গলে। তিতির দিল্লীতে গেছে জে. এন. উ্য-তে কী কাজে, তাই যেতে যে সে পারবে না, তা আগেই জানিয়েছিল।
ভটকাইটা আগে ভাগেই গন্ধ পায় প্রতিবারে ঋজুদা কোথাওই গেলে। গন্ধগোকুল হয়েছে আজকাল। কিন্তু ও জানে না যে, আমিও ওর গন্ধ পাই I can very well smell a rat. তাও, কী ছল্লাটাই করল আসার আগে! ঢঙ।
আজ দুপুরে কামরূপ এক্সপ্রেস থেকে আলিপুরদুয়ার স্টেশনে নামার পরই খুব ঝড় উঠেছিল। সারা রাত উথাল-পাথাল করেছে হাওয়া। তবে ঝড়টা ওঠাতে আবহাওয়া ভারী মনোরম হয়েছে দুপুরের পর থেকেই। দুপুরে সার্কিট-হাউসেই মুরগির ঝোল আর ভাত খেয়ে ঘুম লাগিয়েছিলাম আমরা। রাতে ট্রেনে ভাল ঘুম তো হয়নি!
চান করতে করতেই দেখলাম একটা মোটর সাইকেল ঢুকল গেট পেরিয়ে। দেখলাম, তপনদা আর বিদ্যুৎদা এলেন। সঙ্গে কোলবালিশ-এর মতন বড় দুটি টিফিন ক্যারিয়ার। আমাদের সার্কিট হাউসের খাওয়া রাতে খেতে দেবেন না বলেছিলেন ওঁরা। বিদ্যুৎদার বাড়ি থেকে এখন রান্না করা খাবার এল তাই।
ভারী মজার এই দুই ভদ্রলোক। তপনদা, মানে তপন সেন, আলিপুরদুয়ার কোর্টের অ্যাসিস্ট্যান্ট পাবলিক প্রসিকুটার। ঋজুদার একেবারে অন্ধ ভক্ত। আলিপুরদুয়ারে নন্দাদেবী ফাউন্ডেশান আছে। মিনি পর্বতারোহীদের ক্লাব। তপনদারা সে ক্লাবের সভ্য। সেখানে বিকেলে ঋজুদাকে ধরে নিয়ে গেছিলেন ওঁরা। ঋজুদা ফ্যান ক্লাবও করেছেন একটা। দেখে খুব ভাল লাগল যে, শুধু আমরাই ঋজুদার ভক্ত নই। বইয়ের দোকান লিপিকা’-তেও গেছিলাম। মালিক বিজুবাবু চা খাওয়ালেন। দারুণ ঝাল ঝাল সিঙ্গারাও। ঋজুদার অনেক বইই রাখেন যে। আমার একটু গর্ব হল। বইগুলি লেখাতো রুদ্র রায়েরই।
পশ্চিমবঙ্গর এই বক্সার জঙ্গলে কোনওদিনও হয়তো আসাই হত না ঋজুদার। যদি বক্সা টাইগার প্রজেক্টের ডিরেক্টর এস. এস. বিস্ত সাহেব ঋজুদাকে একাধিকবার ফোন না করতেন। অবশ্য তাঁর উৎসাহের পেছনে আমার অর্থাৎ এই রুদ্র রায়ের লেখা ঋজুদা কাহিনীগুলিই!
তিনি ঋজুদার ভক্ত হয়ে উঠেছিলেন বটে কিন্তু বিস্ত সাহেবের আমন্ত্রণের পেছনে তপনদাদের উৎসাহও অবশ্যই ছিল। বিস্ত সাহেব দেরাদুনের মানুষ অথচ চমৎকার বাংলা বলেন এবং বাংলা পড়তেও পারেন।
রাজাভাতখাওয়া ইনফরমেশান সেন্টার উদ্বোধন করতে কিন্তু ঋজুদা যেতে পারেনি। বম্বেতে খুবই জরুরি কাজ পড়ে গেছিল। কিন্তু তখনি বিস্ত সাহেবকে কথাও দিয়েছিল যে, পরে একবার অবশ্যই যাবে। অবশেষে আসার সময় যখন করতে পারল বক্সা টাইগার রিসার্ভ-এ ততদিনে বিস্ত সাহেব নিজেই বদলি হয়ে দার্জিলিং পাহাড়াঞ্চলের কনসার্ভেটর হয়ে দার্জিলিং-এ চলে গেছেন।
এবারে সুশান্তদার খুব ইচ্ছে ছিল আমাদের সঙ্গে আসার। কিন্তু জিরাফের বাচ্চা হবে সেই টেনশন-এ আসা হল না। সুশান্তদা কলকাতার চিড়িয়াখানার অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর। ঋজুদার একজন ভক্ত। ব্যাচেলর। ঋজুদা বলে যে, জীব-জানোয়ার, পাখি এবং গাছ-গাছালি সম্বন্ধে সুশান্তদার সত্যিকারের আগ্রহ এবং ভালবাসা আছে। অনেক জানে-শোনে, পড়াশুনোও করে। সুশান্তদাকে ঋজুদা ডাকেন পাগলা বলে। তিনি বন-জঙ্গল পাগল তো বটেই, ঋজুদা-পাগল বলেও। সুশান্তদাকে একবার বেতলাও ঘুরিয়ে নিয়ে এসেছিল ঋজুদা বছর তিনেক আগে।
বিদ্যুৎদা, গ্রামীণ স্কুলমাস্টার। বিদ্যুৎ সরকার। আরেক পাগল। সার্কিট হাউসের ডাইনিং রুম থেকে বেরিয়ে দুই কোমরে দু হাত রেখে হাঁক দিলেন, আরে ও তপনদা! আপনারা করেনটা কী! খাবার লাগাইয়া দিছে যে। তাড়াতাড়ি আসেন। ফ্যান ঘোরতাছে বাঁই বাঁই কইর্যা। সবোই ঠাণ্ডা হইয়া যাইবনে।
তপনদা আমাদেরই মধ্যে থেকে বিদ্যুৎদার এজেন্ট হয়ে তাড়া লাগালেন। বললেন, চলো দাদা, চলো।
ডাইনিং রুমে সকলে পৌঁছে দেখি ইলাহি ব্যাপার।
ঋজুদা শুঁটকি মাছ খেতে ভালবাসে তাই লইট্টা শুঁটকি রান্না হয়েছে।
ভটকাই, ল্যব্রাডর গান-ডগ-এর মতন মুখ ছুঁচলো করে নাক দিয়ে গন্ধ শুঁকে দূরে চলে গেল। এক কোণে চেয়ার টেনে বসে বলল, আমি হলুম গিয়ে নর্থক্যালকাটার বনেদি পরিবারের ছেলে। এই সব বাঙালের খাদ্য খেয়ে জাত খোয়াতে মোট্টে রাজি নই। বমি হয়ে যাবে।
ঋজুদা বলল, তুই দূরেই বোস।
তারপর বলল, বাঃ বাঃ! এ করেছ কি বিদ্যুৎ? এ যে ফাঁসির খাওয়া। কত্ত পদ! এত পদ মানুষে খাবে কী করে?
তা কী করন যাইব। মায়ে রাঁইধলো দুই পদ, বৌ-এ রাঁইধলো এক, আর ভাই বৌ-এ রাঁইধলো আর এক। হক্কলেই যে আপনের ভক্ত। নৈবেদ্য। বোঝলেন কিনা!
কথা তো শিখেছ খুব।
ঋজুদা বলল।
তপনদা বলল, উকিলে আর মাস্টারে যদি কথাই না কইতে পারব তাইলে তো না খাইয়াই থাকন লাগব।
তা অবশ্য ঠিক।
খাওয়া শুরু করার আগে ঋজুদা বলল, কী কী আছে বল দেখি বিদ্যুৎ?
কইতাছি। শুরু তো করেন। ঠাণ্ডা হইয়া যাইবনে।
আগে বলই শুনি।
আছে, ভাত, কাতল মাছের মাথা-দেওয়া ভাজা মুগের ডাইল, শিলবিলাতি আলু ভাজা।
শিলবিলাতি আলু? সেটা আবার কী জিনিস?
ভটকাই পাকার মতন বলল। অবশ্য মতন আর কী! ও তো পরম পাকাই!
হ। তাইলে আর কই কী? এই আলু আমাগো এই অঞ্চল ছাড়া আর কোথাও পাওনই যাইব না।
আমি দেখলাম, মিনি আলু ভাজা। সাইজ যা, চার-পাঁচটা আলু যোগ করলে একটি বড় আঁশফল-এর সাইজ হবে। এমন আলু সত্যিই দেখিনি আগে কোথাওই। নতুন আলু ছোট ছোট হয়, যখন ওঠে। কিন্তু এই পুঁটকি পুঁটকি শিলবিলাতি আলু সত্যিই অবাক করল।
ঋজুদা বলল, গাড়োয়ালে একরকমের আলু খেয়েছিলাম তার নাম যোশীমারী আলু। সেগুলো অবশ্য ছোট নয়। কিন্তু শিলবিলাতি কখনও খাইনি।
ভটকাইকে বললাম, নে রে খা। এ তোর বনেদি নর্থ ক্যালকাটাতে পাবি না। হাত গুটিয়ে বসে থাকলে ফুরিয়ে যাবে।
ঋজুদা বলল, বলল, বলল, কোনটা কী তা বলে দাও বিদ্যুৎ।
এ্যা। এই তো হইল শিলবিলাতি আলু, ওই লইট্টা শুঁটকি। আর এইটা হইতাছে তেকাটা মাছের ঝালচচ্চড়ি।
তেকাটা মাছটা আবার কী মাছ?
তেরে কেটে তেরে নাক!
বলল, ভটকাই। আমি ওর মধ্যে নাই। একেবারে লাল যে! এই বুনো বাঙালদের রাজত্বে বেচারি ঘটি কি মারা যাবে? পেকৃতই মারা যাবে? নিনিকুমারীর বাঘ-এর জাল থেকে বেঁচে এসে শেষে কি বাঙালদের ঝালে মৃত্যু হবে র্যা আমার? কী রে মিস্টার রুদ্র রায়?
আমি বললাম, বিহেভ। বিহেভ। তোর এই সব রসিকতা পুরনো হয়ে যাচ্ছে ভটকাই। এঁরা বোরড হয়ে যাচ্ছেন।
এই তেকাটা মাছও কিন্তু অন্যত্র পাওয়া যায় না। শুধু এই অঞ্চলের নদ-নদীতেই হয়। বোঝলা দাদা।
তপনদা বললেন।
আর এইটা হইল গিয়া বোরোলি মাছের ঝোল। কাতল মাছের ঝোলও আছে।
বোরোলি মাছটা কী মাছ?
এও এখানকার নদ-নদীতেই পাওয়া যায়।
কী কী নদী আছে এখানে? মানে নদ এবং নদী?
ভটকাই শুধোল।
গণ্ডায় গণ্ডায় আছে। কয়বচ্ছর আগেইত শ্যাষ কইরা দিছে এই হক্কল অঞ্চল। কী বন্যা, কী বন্যা! কী কমু! মানুষ মরে নাই বটে কিন্তু বাড়ি-ঘর ভাইস্যা গেছে মেলাই। গরু মরছে কত্ত। ইস রে! ল্যাখাজোখা নাই। আলিপুরদুয়ার শহরে কার বাড়িতে জল ঢোকে নাই তখন? ঈঃ! সে এক ন্যাচারাল ক্যালামিটি যারে কয়, তাই আর কী!
কোন নদীতে বান ডেকেছিল?
আমি বললাম।
সব নদীতেই। ডিমা, নোনাই, জয়ন্তী, সংকোশ, ফাসখাওয়া, রায়ডাক, কালচিনি। এক নদী ফুইল্যা গেলেই তো অন্যে ফুইল্যা যায় অটোম্যাটিকালি। বোঝলেন কি না!
এখন এতরকম অদৃষ্টপূর্ব এবং অনাঘ্রাত খাবার সামনে সাজিয়ে রেখে বন্যা-শাস্ত্র নিয়ে আলোচনার ইচ্ছা আমার আদৌ নেই। নে রুদ্র। শুরু কর। এদিকে এসে বোস ভটকাই, ফাজলামি না করে।
ঋজুদা বলল।
আরে ওইটা আবার কী পদ?
ঋজুদা জিজ্ঞেস করল।
কই? কোনটার কথা কন? ওঃ। ওইটা হইল গিয়া এক্কেরে শ্যাষে খাওনের। রুসগুল্লার লগ্যে খাইবেন অনে।
আরে জিনিসটা কী তা বলবে তো!
ইটা আমাগো বাণেশ্বরের দই।
বাণেশ্বরটা কোথায়?
এতরকম পদের মধ্যে রীতিমতো দিকভ্রান্ত হয়ে ঋজুদা বলল।
কুচবিহার জেলাতে পড়ে।
তাই?
ইয়েস।
বিদ্যুৎদা বললেন।
