ঋজুদার সঙ্গে আন্ধারী তাড়োবাতে – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

সাত

গরমের সময়ে তরিতরকারি তো কিছু পাওয়া যায় না, রুটি আর আলুর চোকা খেলাম, কঁচা পেঁয়াজ আর লঙ্কার সঙ্গে। জেঠুমনি চারটে আস্ত কাঁচা পেঁয়াজ রাখতে দিলেন বুশ কোটের বাঁ পকেটে। বললেন, খিদে পেলে পেঁয়াজ খাবি। না খেলেও পকেটে থাকলে লু থেকে বাঁচবি। নাগপুর থেকে আসার সময় ভুলে গেছিলাম আমি। রাখলে আর পেঁয়াজ খেলে লু লাগত না।

তারপর বললেন, বয়স যে হচ্ছে এবার বুঝতে পারছি রে ঋজু। তোমার হল শুরু আমার হল সারা।

আমি তৈরি হয়ে জেঠুমনিকে প্রণাম করে বেরিয়ে পড়লাম। জেঠুমনি রেলিং-এ ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আমায় হাত নাড়লেন।

বললাম, সারাদিন পান্তাভাত খেয়ে ঘুমোও।

ঠিক আছে। বললেন জেঠুমনি।

জিপটা কোলসার বাংলোর হাতার বাইরে বেরোতেই আমি বললাম ড্রাইভারকে, সঙ্গে ফরেস্টার বাবুও ছিলেন, যে আমাকে ও গ্রামে নামিয়ে সোজা মোহার্লি হয়ে চন্দ্রপুর চলে যেতে। সবচেয়ে ভাল ডাক্তারকে সঙ্গে করে কোলসাতে এনে জেঠুমনিকে দেখিয়ে ডাক্তারবাবুকে আবার চন্দ্রপুরে পৌঁছে দিয়ে তারপর আমার কাছে আসতে। তারপরই ঠিক করব রাতে মাচাতে বসব না কোলসাতে ফিরে আসব।

ভাবছিলাম, কানিটকার সাহেব কে আমি জানি না। আমার কাছে জেঠুমনিই সব। বাঘ মারা যাক আর নাই যাক জেঠুমনির শরীরের খোঁজটা আগে রাখতে হবে।

ফরেস্টার বাবু বললেন, টাকা? বড় ডাক্তার এত দূরে এলে তো অনেক টাকা চাইবেন।

টাকা ইজ নো প্রবলেম। বাইরে বেরিয়ে আমিই হলাম জেঠুমনির ক্যাশিয়ার। নিজের হাতে টাকার মতো নোংরা জিনিস ছোঁওয়া জেঠুমনি পছন্দ করতেন না। আমি পার্স খুলে একটি হাজার টাকার নোট বের করে দিলাম।

ফরেস্টার বাবুকে বললাম, ডাক্তারবাবুকে রোগের বর্ণনা দিয়ে সম্ভাব্য সব ওষুধপত্রও সঙ্গে নিয়ে আসতে বলবেন। বলবেন লু লেগে গেছে। পথ্যও যা বলবেন চন্দ্রপুর থেকে কিনে নেবেন, কিছুরই যেন ঘাটতি না পড়ে।

ফরেস্টারবাবু এবং ড্রাইভারদের মুখ দেখেই বোঝা গেল যে আগে কখনও হাজার টাকার ইয়া বড় নোট দেখেননি ও দেখেনি। তখনকার দিনে টাকার মূল্য ছিল অনেক। দশ টাকার বাজার করলে থলে ভরে যেত। আর একশো টাকায় তো কত কিছুই করা যেত। তখন পাঁচশো টাকার নোট ছিল না তাই হাজারের নোট দিলাম। কত বড় ডাক্তারবাবু জানি না। তার সারা দিনের পসার নষ্ট তার উপর ওই খারাপ জায়গায় লুবওয়া দিনে অতখানি পথ আসা-যাওয়া।

জিপ আমাকে নামিয়ে দিয়ে চলে গেলে একটি নিমগাছের নীচে চৌপাইতে বসে কালকে আমার চলে যাবার পরের খবরাখবর নিলাম। কোনও খবর নেই। তবে মাচাটা আমার যেখানে বেঁধেছিলাম এবং গোরুও যার সামনে বাঁধা ছিল, বাঘ তার খুব কাছ দিয়ে এবং বড় রাস্তার উপর দিয়েই দু’দুবার হেঁটে গেছে। গোরুটাকে ছোঁয়নি। আমার মনে হল গোরু না বেঁধে একটা বাছুর বাঁধলে হত। গাঁওবুড়ো আমাকে একটি যুবককে সঙ্গে দিলেন। তার নাম ঢাকিল। তার হাতে একটি মস্ত টাঙ্গি। এই গ্রামে কারওর কাছেই কোনও আগ্নেয়াস্ত্র নেই। এমনকী গাদা বন্দুকও নেই। বনবিভাগের ভয়ে বে-আইনি কাজ করে না কেউই কিন্তু এখন যে প্রাণ বিপন্ন। এখন বনবিভাগ তাদের বাঁচাবার জন্যে কী করছে? না একটা সদ্য গোঁফ-ওঠা ঘোড়াকে পাঠিয়েছে বড় এবং বুড়ো বাঘের সঙ্গে ইয়ার্কি মারার জন্যে। এই রকম কিছু বলাবলি করছিল ওরা নিজেদের মধ্যে। নইলে অত দুঃখের মধ্যেও এ ওর গায়ে হেসে গলে পড়ছিল কেন ওরা। বিশেষ করে মেয়েরা।

রাগে অপমানে আমার দু কান লাল হয়ে উঠল।

আমি বললাম, মাচার দিকে যাব। সঙ্গে ঢাকিল আর একজন মারাঠি ফরেস্ট গার্ড। তার নাম তেন্ডুলকার। সে মিনিটে মিনিটে পকেট থেকে বের করে লম্বা চুট্টা ধরায় আর শেষ হয়ে এলে সাবধানে মাটিতে ফেলে পায়ের জুতো দিয়ে নিভিয়ে দেয় যাতে আগুন না লেগে যায় বনে।

তুমি কি তখন পাইপ খেতে? আমি বললাম।

পাগল! পাইপ খেতে শুরু করি গ্র্যাজুয়েশনের পরে। তখন তো ক্লাস নাইনে পড়ি।

বলেই বলল, যাক ভাল কথা মনে পড়িয়ে দিয়েছিস। গলাটা শুকিয়ে এসেছে। একটু পাইপ খেয়ে নিই। এক ফিল।

বলেই, ভটকাইকে বলল, কীরে! ফিঙ্গার চিপস আর কফি-টফির গল্প তো খুব শোনালি। কিন্তু এল কই?

টাইম ইজ নট রাইপ ইয়েট। বলল ভটকাই। এক্কোবারে সাহেবি কেতায়।

আমি আর তিতির মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম।

তারপর ঋজুদাকে বলল, ঋজুদা যেন ওর ইয়ার, তোমার গল্প তো এখনও শিশু। সে যুবক হোক তখন আসবে। সব ইনস্ট্রাকশান দেওয়া আছে। ঘাবড়িও না।

সমবেত জনমণ্ডলী ভটকাইকে যতই দেখছেন ততই তার বিভিন্নমুখী প্রতিভা ও প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব দেখে একেবারে অবাক হয়ে যাচ্ছেন। আমি আর তিতির কোনও ফ্যাকটরই নই। ভেবে মনটা খারাপ হয়ে গেল।

তিতির মনটা অন্যদিকে করার জন্যে বলল, বলো ঋজুকাকা, পাইপটা একটু খেয়ে।

হ্যাঁ বলি।

আমরা তিনজনে আধ কিলোমিটার, তখন মাইল ছিল, আধ মাইল হেঁটে সেই অর্জুন গাছটার কাছে পৌঁছে দেখি গোরুটা তাকে রাতে যে ঘাস পাতা-টাতা খেতে দেওয়া হয়েছিল তা খেয়ে শেষ করে শুয়ে আছে। তার পিপাসাও নিশ্চয়ই পেয়েছে খুবই। ঢাকিল ভাল হিন্দি বলতেও পারে না, বুঝতেও পারে না। তেন্ডুলকারকে বললাম যে গোরুটাকে খুলে ঢাকিল যেন গ্রামে পৌঁছে দিয়ে আসে। তাকে দানা ও পানি খাইয়ে বিশ্রাম দিতে বললাম। বিকেলে এ জায়গাতেই তাকে আবার বাঁধা হতে পারে। ঢাকিল গোরুটাকে, গোরু তো নয় বলদ, নিয়ে গেল, ফিকে লাল রঙা বলদটা, এদের শিং বাংলার গোরুর মতো নয়।

ঢাকিলকে বলতে বললাম যে বলদটাকে পৌঁছে দিয়েই সঙ্গে সঙ্গে সে যেন আমাদের কাছে ফিরে আসে।

ওই গাছটার কাছে পথের ধুলোর উপরে বাঘটার পায়ের দাগ দেখলাম। সত্যিই বিরাট বাঘ। মদ্দা। তার পায়ের ছাপ দেখে তার পায়ে, কোনও পায়েই যে কোনও খুঁত আছে তা আমার মনে হল না। অবশ্য তখন আমার অভিজ্ঞতাই বা কতটুকু। জেঠুমনির কাছে শিক্ষানবিশি করে যতটুকু শেখা। তবে শিকার শুরু করার আগে থেকেই সাউথ ক্যালকাটা রাইফেল ক্লাবে ও লেকে পয়েন্ট টু-টু রাইফেল নিয়ে শ্যাডো প্র্যাকটিস করে পরে রাইফেল ছোঁড়া শিখেছিলাম। ক্লাস সিক্স-এ পড়ার সময় থেকেই জেঠুমনির সঙ্গে পাখি শিকারে যেতাম। সে সব অনেক কুকীর্তি। এখন ভাবলে বড় পাপবোধ করি। জেঠুমনির মুখের বুলিই ছিল ‘মার! মার! সে পাখিই হোক, কী বড় প্রাণী! শিকার করতেই শিখেছিলাম, যে বয়সে পশুপাখি চেনা দরকার, একা একা বনেবাদায় ঘুরে সত্যিকারের ভাল শিকারি হয়ে ওঠা সম্ভব ছিল, তা না হয়ে জেঠুমনির শিকারের যাত্রাদলের সভ্য হয়েছিলাম। জেঠুমনির শিকারে খাওয়া-দাওয়া হল্লাগুল্লা যে পরিমাণ হত সে পরিমাণ শিকার হত না। শিকারও এক সাধনার ব্যাপার। সেই সাধনাও একক নির্জনের সাধনা। দলে বলে যাত্রাপার্টিতে তা হয় না। তবুও শিখেছিলাম কিছু। ভাল ভাল শিকারি বন্ধু বান্ধব ছিলেন অনেক জেঠুমনির। তারাও যেতেন আমাদের সঙ্গে। তাঁদের কাছেও অনেক শিখেছিলাম।

যাই হোক, আমরা বাঘের পায়ের দাগ অনুসরণ করে আস্তে আস্তে এগিয়ে গিয়ে দেখলাম যে তার পায়ের দাগ ডানদিকের গভীর জঙ্গলে ঢুকে গেছে।

আধ মাইল যদিও জঙ্গলের মানুষের কাছে কোনও দূরত্বই নয়, তবু ঢাকিল ওই মানুষখেকোর জঙ্গলে একা একা ফিরে আসবে বলেই জঙ্গলের গভীরে না ঢুকে একটা বড় মহুয়া গাছের নীচে আমি আর তেন্ডুলকার ওর ফেরার অপেক্ষাতে বসে রইলাম। |||||||||| বাঘ শিকারে বিশেষ করে মানুষখেকো বাঘ শিকারে ধৈর্য ও ঈশ্বরের দয়া ছাড়া কিছুই ঘটে না। কালকে মারেনি বলে বলদটাকে আজও ধরতে আসবে না এমন মনে করার কোনও কারণ নেই। মিনিট পনেরো কুড়ি অপেক্ষা করার পর সোজা রাস্তাতে অনেক দূরে ঢাকিলকে আসতে দেখে আমরা বাঘ যেখানে ডানদিকের জঙ্গলে ঢুকেছে সেখানে এসে দাঁড়ালাম। বাঘ বোধ হয় ঘন বাঁশের জঙ্গলের ছায়াতে বিশ্রাম করবে বলেই ওখানে ঢুকেছিল। রাতে সেও ঘুমোয়নি। আমিও ঘুমোইনি রাত চারটে অবধি।

ঢাকিল প্রায় পৌঁছে গেছে আমাদের কাছে এমন সময়ে জঙ্গলের বাঁদিকের থেকে হঠাৎই একসঙ্গে নানা পাখির উত্তেজিত ডাক, ইংরাজিতে যাকে বলে ‘ক্যাকোনি’ তাই শোনা গেল। আমি ওদের দুজনকে মহুয়া গাছটাতে চড়ে পড়তে বলে সেই আওয়াজ যেখান থেকে হল সেদিকে রাইফেলটাকে রেডি পজিশনে ধরে সন্তর্পণে এগোতে লাগলাম। জঙ্গলে ঢোকামাত্র চোখে পড়ল যে এখানে কটি আমগাছ আছে একসঙ্গে। অথচ আন্ধারী-তাড়োবাতে আম নেই বললেই চলে। আমের গাছে আম এসেছে। কাঁচা আম। জংলি আম সকালে ভাল্লুক আর শয়েরা হয়তো খেতে আসবে কিন্তু কাঁচা আমে তাদের বিশেষ রুচি নেই। পনেরো কুড়ি পা যেতেই আমার কেমন গা-ছমছম করতে লাগল। একটা ভয়ের আর বিপদের অনামা অনুভূতি। বাঘের তো ডানদিকের জঙ্গলে যাবার কথা। এদিকে ভয়ের কী?

শ’ খানেক গজ এগোতেই একটা হুপী পাখি হুপী হুপী হুপী করতে করতে তীব্র বেগে প্রায় আমার নাকমুখ খিমচে দিয়ে বনের ভিতর থেকে উড়ে বাইরে চলে গেল। ময়ুর ডাকতে লাগল কেঁয়া কেঁয়া কেঁয়া করে। আরও দু পা গিয়েই আমি থমকে দাঁড়ালাম। আমার গা গুলিয়ে উঠল, মাথা ঘুরে গেল। আমার বয়সি একটি গোঁন্দ মেয়ে সম্পূর্ণ নিরাবরণা, আমার দিকে মুখ করে শুয়ে আছে আর তার মাথার কাছে তার শতচ্ছিম রক্তমাখা শাড়িটা ফালাফালা হয়ে পড়ে আছে।

দেখলাম মেয়েটির অনেক অংশই বাঘে খেয়ে নিয়েছে, সেখানে দগদগে বিরাট বিরাট ক্ষত। ডান কাঁধের কাছ থেকেও খেয়েছে কিছুটা। রাইফেলের সেফটি ক্যাচটা ঠেলে আনসেফ করে আমি রাইফেল শুটিং পজিশানে ধরে স্থানুর মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। ঘাড় না ঘুরিয়ে চোখ ঘুরিয়ে দুদিকে দেখলাম। শিকারি মাত্ৰকেই ছেলেবেলা থেকে একশো আশি ডিগ্রি vision-এ অভ্যস্ত হতে হয়। চোখ সোজা রেখেও একশো আশি ডিগ্রি দেখতে না শিখলে পায়ে হেঁটে শিকার করতে যাওয়া মুর্খামি।

বাঘ, মানুষ এবং সব জানোয়ারকেই পেছন থেকে এবং বাঁদিক থেকে আক্রমণ করে নেহাত বেগতিক না দেখলে। যে-কোনও মুহূর্তে বাঘ আমার ওপর লাফিয়ে পড়তে পারে। বাঁ পাশ থেকে বা ডান পাশ থেকেও। এক একটি মুহূর্ত কাটছে না যেন ঘণ্টা কাটছে। একবার মনে হল জেঠুমনির কাছে ফিরে গিয়ে, যদি ফিরে যেতে পারি আদৌ, তো গিয়ে বলি, জেঠুমনি, আমার ভয় করছে ভীষণ, আমার দ্বারা মানুষখেকো বাঘ মারা হবে না। কিন্তু পরমুহূর্তে নিজের বুকে অসীম সাহস ফিরে এল।

সেখানে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেও বাঘের কোনও সাড়াশব্দ পেলাম না। বুঝলাম যে বাঘও জানে এই কথাটা যে Discretion is the better part of val our. কারণ বাঘ তার চেহারা একবার দেখালে ফোর-হানড্রেড ফোর ফিফটি রাইফেলের গুলি তাকে নড়তে দিত না, তার উপরে বাঁদিকের ব্যারেলও ফায়ার করতাম প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। আজকে বাঘের সঙ্গে আমার dating হল না। দিনের বেলা বলেই হয়তো হল না। বাঘ হয়তো রাতেই dating করতে ভালবাসে।

বাঘ যে তার মুখের স্বাদু খাবার ছেড়ে সরে পড়েছে কোনও দুর্বোধ্য কারণে সে বিষয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে আমি ওদের নেমে আসতে বললাম গাছ থেকে।

খাবে বলে মানুষ মেরে তাকে ফেলে রেখে বাঘ চলে যে যায় না তা নয়, অনেক মানুষের সম্মিলিত চিৎকারে, আওয়াজে বন্দুকের গুলির শব্দে সে অসীম বিরক্তিতে মুখের খাবার ফেলে রেখে সরে যায় কিন্তু এমনই নিঃশব্দে সে একজন নিঃশব্দ এবং আনাড়ি শিকারির আগমনে যে চলে গেল এটা বড় অবাক করল। এমন ঘটনা বড় বড় শিকারিদের অভিজ্ঞতাতেও বেশি ঘটেছে বলে জানি না।

ওরা এলে আমি জেঠুমনির দেওয়া গামছাটা, যেটা টুপির নীচে জলে ভিজিয়ে পরেছিলাম, খুলে দিলাম। মেয়েটির শাড়িটার আর কিছু ছিল না। সেই গামছা দিয়ে কোনওক্রমে মেয়েটিকে জড়িয়ে নিল ঢাকিল। তার ঘাড় ভেঙে গেছিল এবং ঘাড়ের কাছে বাঘের ক্যানাইন দাঁতের দুটো গভীর দাগ ফুটে ছিল। রক্ত ঝরছিল তা থেকে অবিরাম। ঢাকিল তার পরনের হাফ হাতা নীলরঙা জামাটাও খুলে পরিয়ে দিল মেয়েটিকে।

ঘটনাটা সম্ভবত ঘটেছিল এরকম। পরে আমরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা। করে এই রকম ধারণাতেই আসি। মেয়েটি আম পাড়তে এসেছিল। এই গরমে আমবাটা চাটনি বা আমগোড়া শরবত খেত হয়তো। মানুষখেকো বাঘের জন্যেই এসব অঞ্চলে আজকাল ফরেস্ট গার্ডরাও আসে না। এই সুযোগে সে আম পাড়তে এসেছিল। মেয়েটির কাছে ফরেস্ট গার্ড যতখানি ভয়াবহ মানুষখেকো বাঘ তার চেয়ে বেশি ভয়াবহ ছিল না। তাই সে সাহস করে ওই সুযোগটি নিয়ে এসেছিল। ও যখন আমগাছের দিকে যাবে এমন সময় দূর থেকে উর্দিপরা তেন্ডুলকারকে সে সম্ভবত দেখে ফেলে। দেখে ফেলে, খুব তাড়াতাড়ি জঙ্গলের গভীরে আমগাছ তলাতেই লুকাবে বলে জঙ্গলের ভিতরে এগিয়ে যায়। এদিকে ডানদিকের জঙ্গলের থেকে বেরিয়ে বাঘ রাস্তা ধরে আমাদের পেছনে পেছনে সামান্য এসেই রাস্তা ছেড়ে বাঁদিকের জঙ্গলের ভিতরে ভিতরে আমাদের বাঁদিক দিয়ে পেছন পেছন আসতে থাকে। সে যে রাস্তা পার হয়েছে আমরা এগিয়ে আসার পরে আমাদের পিছন দিয়ে, তা আমরা বুঝতেও পারিনি। তার পায়ের দাগ পরে দেখতে পাই।

এমন সময় আমগাছের নীচে সে মেয়েটিকে দেখে অথবা হয়তো মেয়েটিকে আমাদের আগে আগে যেতে দেখেই তার পিছনে পিছনে তাকেই অনুসরণ করে সে যায়, আমাদের নয়। মেয়েটি চিৎকার করতে পারেনি। ফরেস্ট গার্ড তার চিৎকার শুনলেও তার বিপদ হত। বাঘ শুনলেও তাই।

এত সব তত্ত্ব আমরা পরে গাঁওবুড়ো এবং আরও কয়েকজন অভিজ্ঞ মানুষকে সঙ্গে করে অকুস্থলে ফিরে এসে, মেয়েটির পায়ের দাগ, বাঘের পায়ের দাগ এসব দেখে সকলে অনুমান করি। ওদের অভিজ্ঞতা আমার চেয়ে অনেকেই বেশি। মৃত্যুই হাতছানি দিয়ে ওকে আমগাছগুলোর কাছে নিয়ে যায়।

এবারে কফি এসে গেছে ঋজুদা।

ভটকাই অ্যানাউন্স করল।

ফাইন। বলল, ঋজুদা।

চা খাবেন কি কেউ? ভটকাই জিজ্ঞেস করল।

তিতির হাত তুলল। প্রদীপকাকুও। আমিও বললাম চা-ই খাব।

ফিঙ্গার চিপসগুলো দারুণ হয়েছে। ক্রিসপ। কিন্তু গল্পটা তার চেয়েও দারুণ। তাপসকাকু বললেন।

প্রদীপকাকু বললেন, তারপরে বলুন দাদা। কেউ কথা বোলো না। উনি ডিসট্রাকটেড হয়ে যাচ্ছেন।

হ্যাঁ। ঋজুদা বলল, সচরাচর হিউম্যান কিল যদি ম্যানইটার করে, তবে সেই কিল-এর ওপরেই শিকারির বসাটা স্বাভাবিক। কিন্তু আমার পক্ষে ওই সুন্দরী যুবতী মেয়েটিকে দেখার পরে আমারই সামনে বাঘ তাকে টুকরো করে ছিঁড়ে খাবে এই ভাবনাই বরদাস্ত হচ্ছিল না। তা ছাড়া, মেয়েটির স্বামী ও মা-বাবা তার সৎকারের জন্যেও অধীর ছিল। অপঘাতে মৃত্যু হলে তো পোড়ায় না, ওকে কবর দেওয়া হল গ্রামের কবরভূমিতে। আমার মনে একটু সুখ হল মেয়েটির শেষতম পরিণতিটা বাঘের দাঁতে হল না বলে। আমি ভাবছিলাম, অত বড় বাঘটা যে অদৃশ্য হয়ে গেল, কেমন করে অদৃশ্য হয়ে গেল? তার আওয়াজ পর্যন্ত আমি পেলাম না। ভোজবাজির মতো।

এই হল বাঘ। বাঘকে যারা ভাল করে জেনেছেন শুধু তারাই জানেন বাঘ কী!

গ্রামের লোকেরা ইতিমধ্যেই আমার বিরুদ্ধে অনুযোগ করতে শুরু করেছিল। তারা বলেছে, দিনের বেলায় হাতে রাইফেলধারী শিকারির নাকের ডগা থেকেই যখন বাঘ মেয়েটিকে ধরে ফেলে মেরে ফেলল, আর একটু হলে পুরোপুরি খেয়েও ফেলত, সেই শিকারি রাতের বেলা এ বাঘ মারতে পারবে তার স্থিরতা কী? এদিকে এ নিয়ে অতজন মানুষ মরল বাঘের হাতে। এই সদ্য গোঁফ গজানো শিকারিকে চলে যেতে বলে কোনও পাকা শিকারিকে আনা হোক। এখনই।

তাদের ভাবনা ও দাবি যে অনায্য এমনও বলতে পারি না। আদৌ পারি না। বাঘের সঙ্গে যোগাযোগ কেন যে হল না তা কিছুতেই ভেবে পাচ্ছিলাম না। তবে এটুকু বুঝেছিলাম যে অকুস্থলে আমি গিয়ে পৌঁছানোর আগেই বাঘ সরে পড়েছিল।

আমি পড়লাম ভারী বিপদে। পরামর্শ করার মতোও কেউ নেই।

ওরা দুপুরে আমাকে ভাত-তরকারি খেতে দিয়েছিল। আমি খেলাম না। খুব করে জল আর একটা পেঁয়াজ খেয়ে একটি বড় সেগুন গাছের নীচে ঘুমাবার চেষ্টা করতে লাগলাম যাতে বুদ্ধিটা খোলে এবং গত রাতের ক্লান্তিটাও যায় সেই জন্যে। কিন্তু এই গরমে ঘুম কিছুতেই এল না। বাইরের গরমের মতো মাথাও গরম ছিল খুবই।

বিকেলে নোটাতে ফোঁটানো দুধসর্বস্ব চা খেলাম। চা তৈরি হয়েছিল তেন্ডুলকারের নির্দেশে। তারপর বলদটার দড়ি ধরে আমরা এগোলাম সেই অর্জুন গাছটার দিকে। বাঘ সারাদিন এবং গত রাতেও কিছু খায়নি। কপাল ভাল থাকলে সে হয়তো বলদটাকে আজ মেরে খাবার জন্যে আসতে পারে। সে প্রায় অভুক্তই। আছে। বাঁধা খাবারের লোভ না ছাড়তেও পারে।

বাঘ খুব একটা দূরেও নেই। সকালে সে যখন এতটাই কাছে ছিল, এই লুবওয়া দুপুরে সে নিশ্চয়ই খুব দূরে যায়নি। কোনও জলা বা ভেজা জায়গাতে কোনও বড় গাছের নীচে বা বাঁশঝাড়ের মধ্যে নিশ্চয় সে দুপুরে শুয়ে ছিল। অর্জুন গাছটা থেকে দুশো গজের মধ্যে বনবিভাগের খোঁড়া একটা পুকুর মতো আছে। সেখানে বাঘের পানীয় জলের সংস্থান হতে পারে। কাঁচা রক্ত-মাংস খাবার পর ওদের পিপাসা পায় খুব। অনেক ভেবেচিন্তে আমার আর কোনও চয়েস না থাকাতেই ওই অর্জুন গাছেই বসব পাঁচটার আগে গিয়ে এমনই ঠিক করেছিলাম। ঢাকিল আমার সঙ্গে মাচাতে বসতে চাইছিল কিন্তু ভাষা একটা বড় সমস্যা। যদিও মানুষখেকো বাঘের অপেক্ষায় বসে থাকা শিকারির কথা বলা তো দূরস্থান নড়াচড়াও করা বারণ। ইঙ্গিতেই সঙ্গীর সঙ্গে কথা বলতে হয়। অনেক বিশ্বস্ত সঙ্গীও গুবলেট করে ফেলে মোক্ষম সময়ে আর এ তো সম্পূর্ণই অপরিচিত আমার। তেন্ডুলকারকে বসতে অনুরোধ করলাম। কিন্তু হুশিয়ার সে বলল, অভয়ারণ্যের মধ্যে বাঘ শিকার, এতে আমি অংশ নিলে পরে আমার চাকরি নিয়ে টানাটানি, সে বাঘ মানুষখেকোই হোক আর যাই হোক। কানিকটার সাহেবের মতো সাহসী তো সবাই নয়। তা ছাড়া কানিটকার সাহেবের সঙ্গে আপনাদেরও বিপদ হতে পারে পরে। এই ব্যাপারটা তাড়াতাড়ি খতম হলে এক কথা। যতই দেরি হচ্ছে ততই এতে ঝুঁকি বাড়ছে সকলেরই। কারণ বনবিভাগের ওপরতলাতে কানিটকার সাহেবের ওপরেও আরও অনেক সাহেব আছেন।

ব্যাপারটা যে আমি বুঝলাম না, তা নয়। ভাল করেই বুঝলাম, কিন্তু করণীয় কী?

ডাক্তার রাঠোরকে নিয়ে জিপ চন্দ্রপুর চলে গেছিল। শুনলাম জেঠুমনি খুবই রাগ করেছেন আমার ওপরে। ড্রাইভার বলল। জিপটি ফিরল তিনটে নাগাদ। আমি জিপটাকে আটকে রাখলাম। আমার মাথাতে অন্য বুদ্ধি খেলল। ঠিক করলাম রাত এগারোটা অবধি মাচাতে বাঘের জন্যে অপেক্ষা করে তারপর বাকি রাত খুব আস্তে আস্তে জিপ নিয়ে চক্কর দেব পুরো জঙ্গলে। সব কিছুই তো বে-আইনিই হচ্ছে, পুরোটাই বে-আইনি হোক, যদি বাঘটাকে মারা যায়। কৃষ্ণপক্ষের রাত। বাঘের চোখ চিনে নিতে ভুল হবে না আমার পাঁচ ব্যাটারির বন্ডের টর্চের আলোতে। তা ছাড়া জিপের হেডলাইট তো থাকবেই। আমেরিকান আর্মির ডিসপোজালের জিপ। তার স্টিয়ারিং তিন পাক ফলস।

জিপের ড্রাইভারকে বললাম যে, রাত এগারোটা অবধি যদি মাচার দিক থেকে গুলির শব্দ না শোনো তবে এগারোটাতে তুমি ওই গাছটার কাছে আসবে জিপ চালিয়ে।

মুঝে খা লেগা বাঘ। মাফ কিজিয়েগা হুজৌর।

সে ভয়ার্ত গলাতে বলল। মেয়েটির পরিণতির কথা সে ফেরামাত্র শুনেছিল।

বলল, হামকি চার গো লেড়কি হ্যায় বাবু। এককোভি কি সাদি নেহি হুয়ি। হামকো মারাইয়ে মাৎ।

আমি বললাম, তুম পাগল হো! কুছ নেহি হোগা। তোমার তো জিপ থেকে নামতে হবে না। হেডলাইট জ্বালিয়ে ও এঞ্জিন পুরো স্টার্টে রেখে তুমি জিপের মধ্যেই বসে থাকবে। আমি মাচা থেকে নেমে তোমার জিপে এসে উঠব। আর যদি মাচার দিক থেকে গুলির শব্দ পাও গ্রামে বসে তবে তার আধ ঘণ্টা পরে ওই ভাবেই জিপ নিয়ে আসবে। তোমার কোনওই ভয় নেই। পৃথিবীর কোনও বাঘ স্টার্টে-থাকা আলো জ্বলা জিপ থেকে মানুষ নেয়নি। তুমি নিশ্চিন্তে থাকো।

বলদটাকে নিয়ে মাচা অবধি এলাম। পেছন পেছন জিপও এল। আমি আর তেন্ডুলকার হেঁটে গেলাম। আমি রাইফেল হাতে আর তেন্ডুলকার বলদের দড়ি হাতে। বলদটাকে বেশ উৎফুল্ল দেখাচ্ছিল। উৎফুল্ল, কারণ সারাদিন সে বিশ্রাম পেয়েছে, খাদ্য-পানীয়ও পেয়েছে। জন্মাবধি এত খাতির সে কখনওই পায়নি। তবে গত রাতে বড় বাঘটা দুবার এসেছিল তখন সে দড়ির শেষ প্রান্তে টান মেরে বাঁধন ঘেঁড়ার চেষ্টা করেছিল খুব, কিন্তু পারেনি। তারপর দু-দুবারই বাঘ তাকে দেখে চলে গেছিল। এসব মাচার নীচে নানা চিহ্ন দেখেই বুঝেছিলাম আমরা।

জলের বোতল, টর্চ এবং রাইফেল এক এক করে আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে তেন্ডুলকার এবং ঢাকিল জিপে উঠল। আমি মাচায় ওঠার আগেই ওদের বললাম, আমি মাচাতে বসলে তোমরা তিনজনে খুব হল্লাগুল্লা করতে করতে জিপ খুব আস্তে আস্তে চালিয়ে ফিরে যাবে যাতে বাঘ ভাবে যারা এসেছিল তারা সকলেই ফিরে গেল। এরা একজনও ভিতু নয়। বরং আমার চেয়েও অনেকই সাহসী। আমার হাতে তো জেফরির ফোর-ফিফটি ফোর হান্ড্রেড ডবল ব্যারেল রাইফেল আছে। ওরা যে নিরস্ত্র। সাহসের ওদের সত্যিই অভাব নেই। তেন্ডুলকার বলল, ম্যায় জাগতে রহে গা। ড্রাইভারকি সাথ ম্যায় ভি আওয়েগা।

কী আর বলি! বললাম সুক্রিয়া।

কে জানে! বাঘ আমাদের কথোপকথন শুনল কি না? শুনলেও বুঝত না নিশ্চয়ই। জেঠুমনির কাছে শুনেছিলাম যে উত্তরবঙ্গের এক চা বাগানে বাঘ মারার জন্যে ক্ষেপে-ওঠা এক কলকাত্তাইয়া শিকারি জেঠুমনিকে বলেছিলেন, May I Speak in English? মাচায় বসে কথা বলতে বারণ করাতেই উনি এই প্রশ্ন করেছিলেন। অর্থাৎ দিশি বাঘ, বিলিতি বুলি কি বুঝবে?

জিপটা এবং সঙ্গে ওরাও চলে গেলে হঠাৎই জঙ্গলটা খুব নিস্তব্ধ হয়ে গেল। আমার খুব ভয় করতে লাগল। এক জোড়া কপারস্মিথ ডাকছে। একটা আছে জঙ্গলের ডানদিকে অন্যটা বাঁদিকে। দোসর। সাড়া দিচ্ছে একে অন্যকে। এই জঙ্গলে র‍্যাকেট-টেইলড ড্রঙ্গো আছে। তারাও ডাকছে তাদের ধাতব শব্দে। ওই পাখিগুলোই সকালকে পথ দেখিয়ে আনে। আলো ফোঁটার অনেক আগে থাকতে এদের ঝগড়া ঝগড়া খেলার ধাতব শব্দ শুনতে পাওয়া যায়। এরা জাগার অনেকেই পরে জাগে বনমোরগ এবং ময়ুর, বুলবুলি, নানা ফ্লাইক্যাচার, থ্রাশার, হানিসাকার ইত্যাদিরা। এদের ডাক শুনলেই বোঝা যায় ভোর হতে খুব দেরি নেই, আধঘন্টাটাক পরেই আলো ফুটবে।

চারদিকে চেয়ে দেখলাম অনেকগুলো ভূত গাছ আছে ওখানে। আশ্চর্য! আগে কেন যে লক্ষ করিনি কে জানে। বোতল খুলে ভাল করে জল খেয়ে নিলাম। এখনও বেশ গরম। হাওয়াটা এখন মরে গেছে একেবারে। গরম হোক আর যাই হোক, হাওয়া থাকলে তাও একরকম। হাওয়াহীন দাবদাহ অসহ্য।

বসে বসে নানা কথা ভাবছি। ভাবছি, জেঠমনি এখন কেমন আছেন? ডাক্তার নাকি বলেছেন যে কালকের মধ্যে ফিট হয়ে যাবেন। হলেই ভাল। ভাবছি, বাঘটা দুপুরে কোথায় কোন দিকে বিশ্রাম নিচ্ছিল। বাঘ জীবনে খুব কমই ডাকে। শিকারের সময়ে সে কখনওই ডেকে তার অবস্থান জানায় না। যখন বাঘিনীর সঙ্গে থাকে বা সঙ্গী খোঁজার আগে বাঘ ডাকে। তখনকার ডাক যারা শুনেহেন শুধু তারাই জানেন। আর বাঘ যখন কখনও কখনও গুলি খেয়ে হুংকার দেয় রাগে, তখনকার ডাকও যারা শুনেছেন তাঁরাও জানেন তার প্রকৃতি। বাঘ কিন্তু অনেক সময় গুলি খেয়েও ডাকে না। এরকম সংযম আর কোনও প্রাণীর আছে কি না জানি না, মানুষের তো নেই-ই। গুলি খেয়ে সঙ্গে সঙ্গে মরে গেলে তো গেলই কিন্তু মারাত্মক আহত হয়েও টু শব্দটি করে না বাঘ পাছে তার অবস্থান জানান দেওয়া হয়। বাঘ এক আশ্চর্য জানোয়ার। অসীম সাহসী, ব্যক্তিত্বময়, ধৈর্যবান এবং সাধক। বড় সাধু-সন্ন্যাসীদেরই মতো তার সাধনা নিন এককের। চেলা-চামুন্ডাতে তার বিশ্বাস নেই। সে স্বয়ম্ভর, একাই একশো।

তারপর? থামলে কেন? বলো ঋজুকাকু। তিতির বলল।

কখন যে দিন চলে গিয়ে রাত এল বোঝা পর্যন্ত গেল না। বুনো হাঁসেরা যেমন করে বালিয়াড়ি ছেড়ে জলে নামে জলে প্রায় কাঁপন না তুলেই তেমনি করে দিন রাতের মধ্যে মিশে যায়। যেন বলে তারা ফুটে উঠল একে একে। সন্ধ্যাতারা, কালপুরুষ, শতভিষা, ক্রতু, পুলত, স্বাতী কত নাম জানা ও অজানা তারা। অন্ধকার যতই আঁকিয়ে বসতে লাগল ততই ভূত গাহুগুলো তাদের আধিভৌতিক সাদা চেহারা এবং ডালপালা অনেক সাদা হাতের মতো অন্ধকারে বিস্তার করে একেক জন একেক পোজে দাঁড়িয়ে রইল। তারা কি নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে? না কি তারা চলছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই-ট্রেডমিল টেস্ট করার মতো। গাহেরা যুগ যুগ ধরে এক জায়গাতে দাঁড়িয়ে হেঁটে যাচ্ছে কত না পথ, পৌঁছে যাচ্ছে কত না দেশে। ভাবলেও রোমাঞ্চ হয়।

পথের পিছন দিক থেকে একটি ইয়ালো-ওয়াটেল ল্যাপউমিঙ্গ টিটিরটা ঢিটিরটি করে ডাকতে ডাকতে উড়ে আসতে লাগল আমায় মাচার দিকে।

বাঘ কি চলতে শুরু করেছে? বাঘ নাও হতে পারে। ওরা বনে-জঙ্গলে কোনও নড়াচড়া দেখলেই ওমনি করে ডাকে এবং চলমান জানোয়ার বা মানুষের মাথার ওপরে উড়তে উড়তে ওদের লম্বা লম্বা পা দোলাতে দোলাতে চলতে থাকে হাওয়াতে ভেসে। ওদের চোখ এড়ানো সবচেয়ে বড় শিকারি বাঘের পক্ষেও সময়ে সময়ে অসম্ভব হয়।

একটা হুতোম প্যাচা ডেকে উঠল বিকট শব্দ করে উলটোদিকের বন থেকে। অন্ধকারে তার সাদা ডানা মেলে দিয়ে একটি লক্ষ্মী প্যাচা উড়ে এসে একটি ভূত গাছে বসতেই ভূত গাছের সাদাতে সে অদৃশ্য হয়ে গেল। তারাদের নীলাভ আলো ভূত গাছেদের গায়ে হালকা নীলের আভাস ছোঁয়ান্স। শম্বর ডাকল মোহার্সির দিক থেকে ঘা-ঘা-ঘা করে। একটা কোটরা হরিণ হঠাৎই ভয় পেয়ে অ্যালসেশিয়ান কুকুরের মতো ঘাউ ঘাউ ঘাউ করে ডেকে বনের মধ্যে এক আলোড়ন তুলে দিল। তার ডাক প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এল উলটোদিকের বন থেকে।

রাত আটটা নাগাদ কোনও একটা জানোয়ার, মাংসাশী জানোয়ার এল, মাচার পেছন দিক থেকে এসে বলদটাকে দেখতে লাগল। সে যে মাংসাশী তা বোঝা গেল বলদটার হাবেভাবেই। সে ভয় পেয়েছে। যেদিকে জন্তুটা আছে তার একেবারে বিপরীতে দড়ির শেষ প্রান্তে খোটার সঙ্গে টান দিয়ে চার পা গুটিয়ে বলদটা ধড়ফড় করছে। জানোয়ারটা কোনও চিতা-ফিতাও হতে পারে। আমি উদগ্রীব, উৎকর্ণ, উৎকণ্ঠিত হয়ে দু উরুর উপরে শোয়ানো রাইফেলের ট্রিগার-গার্ডে আঙুল ছুঁইয়ে বলদটার দিকে চেয়ে বসে আছি। ফিকে লালরঙা বলদটাকে নিকষ কালো অন্ধকারে সাদাই দেখাচ্ছে।

বাঘ এলে, আমায় অন্ধকারেই গুলি করতে হবে। রাইফেলে অন্ধকারে মারা যায় না কারণ রাইফেলে দুটি সাইট থাকে। ব্যাক সাইট ও ফ্রন্ট সাইট। শটগান থাকলে রাতে মারতে সুবিধা হত। শটগানের শুধু মাছি থাকে একটা দু নলের প্রান্তে, মাঝখানে। নিশানা না নিয়েও শটগানে মারা যায়। তবে আমি তখনও তত পোক্ত হইনি। তা ছাড়া শটগান তো আছে মেনির কাছে। বাঘ যদি বলদটাকে ধরতে আসে তবে গুলি খেয়ে বাঘ মারাত্মক জখম হবে, তারপর সেই আহত বাধাকে মারতে হবে। অত শত ভাববার সময় নেই এখন আর। আজ রাতের মধ্যেই একটা হেস্তনেস্ত করতে হবে।

বলদটা আবার স্বাভাবিক হল। বুঝলাম যে আগন্তুক এসেছিল ফিরে গেল, সে কে এবং কোথায় গেল সেই হচ্ছে কথা।

রাত কত তা কে জানে। আমার ঘড়ির ডায়ালে রেডিয়াম নেই। টর্চও জ্বালা যাবে না। অতএব কত রাত তা জানা গেল না। ভারী ঘুম পাচ্ছে। কাল রাত চারটে অবধি জেগে আজও দুপুরে ঘুম হয়নি। ঘুমে চোখের পাতা বুজে এসেছিল। হঠাৎই একটা অস্বস্তি হওয়াতে চোখ খুলে দেখি সকালের কালো গোঁন্দ মেয়েটি মাচার সামনে, বলদটার কাছেই দাঁড়িয়ে আছে। সে খুব হাসছে। কিন্তু তার রং ছিল ঘোর কালো, চুলে একটা লাল রিবন ছিল। এখন তার সর্বাঙ্গ সাদা, তার মাথার চুলও সাদা। সে দুটি হাত দুদিকে ছড়িয়ে যেমন করে মাটিতে শুয়েছিল যেমন করে শূন্যে ভাসতে ভাসতে একটা ভূত গাছে গিয়ে বাঁদিকের ডালে বসল যেন। কিন্তু তারপরেই তাকে আর দেখা গেল না। ভূত গাছের উজ্জ্বল সাদা রং তাকে গ্রাস করে ফেলল। আর তার আলাদা কোনও অস্তিত্ব রইল না।

আমার ঘুম-টুম সব উবে গেল। সে মিলিয়ে যেতে আমার যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল।

আবারও কি ঘুম বা ঘোর এসেছিল? বলতে পারব না, ঘোর ভাঙল জিপের ইঞ্জিনের শব্দে। তার মানে এগারোটা বেজেছে। হেডলাইটের আলোর বন্যা বইয়ে জিপটাকে এনে পথের উপরে যখন দাঁড় করাল ড্রাইভার ঠিক তখনও গ্রামের দিক থেকে পাখিটা খুব জোরে জোরে ডাকতে লাগল, ডিড উ্য ডু ইট ডিড ঊ্য স্যু ইটটিটিরটি টিটিরটি টিটি টিটি। আমি ওয়াটারবটল গলায় ঝুলিয়ে এক হাতে টর্চ আর অন্য রাতে রাইফেল নিয়ে মাচা থেকে নেমে জিপের সামনের সিটে বসতেই তেন্ডুলকার বলল, দিল কহতা হ্যায় কি বাঘ গাওকি তরফ গ্যয়া।

কী করে বুঝলে?

গ্রামের কুকুরগুলো খুব চিৎকার করছিল।

চিতা-টিতাও দেখে থাকতে পারে।

নেহি। ইক কুটরা ভি বহত তড়পতাত্মা গাঁও কি নজদিকহি মে। আদমি পাকড়নেকি লিয়ে বাঘ সায়েদ গ্রামহিমে ঘুষা। উওতো জানতাই হ্যায় যো উসকি ডরনেকা কোঈ বাত নেহি গাঁওমে।

আমার বুক ধ্বক করে উঠল। সকালে মেয়েটিকে মারল আবার রাতে যদি আর কারওকে মারে তবে আর লজ্জা রাখার জায়গা থাকবে না সবে গোঁফ-ওঠা শিকারির।

আমি বললাম, ড্রাইভারকে, তাড়াতাড়ি জিপ ঘুরিয়ে নিয়ে গ্রামের দিকে চলল।

ড্রাইভার তাড়াতাড়ি জিপ ঘুরিয়ে গ্রামের দিকে এগিয়ে চলল।

গ্রামের কাছাকাছি যেতেই, সকালে যে মহুয়া গাছটার নীচে গাঁওবুড়োর সঙ্গে কথা বলছিলাম, তারই একটু পরে গ্রামের দিকে একটি বিরাট লাল উজ্জ্বল চোখ দেখা গেল। বাঘের চোখ। কিন্তু একটা কেন? একটাই কোনও সন্দেহ নেই। দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেল। জিপটা ততক্ষণে পৌঁছে গেছে ওই জায়গাতে।

পথের পাশে নালা কাটা ছিল বনবিভাগের। এও এক ধরনের ফরেস্ট লাইন। আগুন লাগলে আগুন গর্তে পড়ে যাতে মরে যায় সে জন্যে। বাঘটা নিশ্চয়ই সেই নালার মধ্যে নেমেছে লুকোবার জন্যে। তেন্ডুলকার আমাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরা সত্ত্বেও, ড্রাইভার জোরে জোরে মাৎ উতারিয়ে, মাৎ উতারিয়ে বলা সত্ত্বেও আমি রাইফেল হাতে লাফিয়ে নামলাম জিপ থেকে। আমার খুন চেপে গেছিল। দিগ্বিদিক জ্ঞান ছিল না। ড্রাইভার জিপটাকে বাঁদিকে সাইড করে দাঁড় করাল। ওর বুদ্ধি থাকলে ও জিপটাকে একটু ব্যাক করে দাঁড়াতে পারত যাতে জায়গাটা হেডলাইটের আলোতে দেখা যায়। জিপটা বাঁদিকে সরে যেতেই আমি অন্ধকারে পড়ে গেলাম কিন্তু জিপ থেকে নেমেই আমি নালার পাশে চলে এসেছিলাম। এসেই দেখি বাঘ নালা ধরে দৌড়ে পালাচ্ছে। বেশ দূরেই চলে গেছিল, প্রায় ষাট গজ হবে। রাইফেল তুলে অন্ধকারেই আমি গুলি করলাম বাঘের পিঠ লক্ষ করে। একেবারে যে অন্ধকার তা নয়, জিপের হেডলাইট পেছনে থাকলেও আলোর আভাস ছিল একটু।

গুলি করতেই, বাঘটা একটা বিরাট লাফ মারল। সোজা উপরে। অনেক দূর উঠে গেল। নালাতেই যখন পড়ল তখন তার মুখটা হল আমার দিকে। নালাতে পড়েই সে সারা শরীর মাটিতে শুইয়ে দিয়ে কান দুটো পেছনে লেপটে দিয়ে লেজ সোজা করে উল্কার মতো আমার দিকে যেন উড়ে আসতে লাগল। বুঝতে পারলাম যে গুলি পিঠে লেগেছে। কিন্তু মেরুদণ্ডে লাগেনি।

তারপর? তারপর? তুমি কী করলে?

দাঁত দিয়ে নখ কাটতে কাটতে ভটকাই বলল।

আমি আর তিতির তো বটেই অন্য সকলেই উৎকর্ণ হয়ে বসেছিলেন। গল্প শুনেই আমার যাকে বলে সিটিং উইথ আওয়ার হার্টস ইন আওয়ার মাউথ।

ঋজুদা বলল, তখন কিন্তু আমি একটুও হড়বড় করলাম না। কোথা থেকে জানি না, মনের মধ্যে খুব জোর এল, মাথা ঠান্ডা হল, সমস্ত একাগ্রতা দিয়ে বাঘকে দেখতে লাগলাম আমি।

আজকে পেছনে তাকিয়ে যখন ভাবি তখন ষোলো বছরের একটি ছেলের দুঃসাহসের কথা ভেবে নিজেই অবাক হয়ে যাই। ট্রিগারে আঙুল, পেছনের ট্রিগারে, নতুন গুলি ভরার সময় তো নেই। বাঘ আরও কাছে এলে তার মাথা আর ঘাড়ের সংযোগস্থলে বাঁদিকের ব্যারেলের গুলিটি দেগে দেব সেই প্রতীক্ষাতে অধীর হয়ে রুদ্ধশ্বাসে আমি দাঁড়িয়েছিলাম। তিরিশ-চল্লিশ গজ আসতে বাঘের তিরিশ সেকেন্ডও লাগেনি। বাঘ নালার বুক বেয়ে এসে আমাকে যখন প্রায় ধরে ফেলবে, জেঠুমনির বন্ধু দুর্গা রায়ের ভাষায় বলতে গেলে বলতে হয়, তখন ‘পাইড়্যা ফেলাইবে’ ঠিক তখনই আমি ট্রিগারটা টেনে এক লাফে ডানদিকে রাস্তার মাঝখানে পড়েই রাইফেলের ব্রিচ খুলে পকেটে রাখা গুলি তুলি নিয়ে এক ঝটকায় দুটো গুলি ভরে নিয়ে আবারও এক লাফে বাঁদিকে সরে নালার দিকে এগিয়ে গেলাম রাইফেল বাগিয়ে ধরে।

ততক্ষণে নিরস্ত্র তেন্ডুলকার অসীম ও অবিশ্বাস্য সাহসে টর্চটা হাতে ধরে জিপের পেছন থেকে নেমে টর্চ জ্বালিয়ে আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। বাঘটা নালাতেই পড়ে আছে-নালাটা বাঘের শরীরে ভরে গেছে। তার দুচোখের উপরে বন্ড-এর টর্চ-এর আলো পড়তেই অঙ্গারের মতো জ্বলে উঠল এক চোখ। এবারে তার দুচোখের মাঝে ডানদিকের ব্যারেলের গুলি দেগে দিলাম আমি। সেই গুলিটি লাগতেই খোলা চোখটি আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে এল।

তেন্ডুলকার আনন্দের চোটে আমার হাত থেকে রাইফেলটা ছিনিয়ে নিয়ে আকাশের দিকে মুখ করে বাঁদিকের ব্যারেলটা ফায়ার করেই রাইফেলের ধাক্কাতে নিজেই মাটিতে পড়ে গেল। হো হো করে হাসতে হাসতে আমি রাইফেলটাকে কোনওক্রমে ধরে সেটাকে জখমের হাত থেকে বাঁচালাম। হেভি রাইফেল দিয়ে গুলি করার সময়ে ‘হোল্ডিং’ যদি ভাল না হয় তবে কলার বোনও ভেঙে যেতে পারে। ড্রাইভার আনন্দে জিপের হর্নের ওপর শুয়ে পড়ল। যদিও তা করাটা খুবই অন্যায়। অভয়ারণ্যে হর্ন বাজানোই মানা। সেখানে হর্ন এর উপরে শুয়ে পড়লে জন্তুদের খুবই বিরক্তি উৎপাদন করা হয় কিন্তু কখনও গ্রামবাসীদের আনন্দও উৎপাদন করা হয়।

ওরা ক্রমশ এই বাঘের বিভীষিকাকে মেনে নিয়ে এক কাফু কবলিত জীবনে অভ্যস্ত হওয়া শুরু করেছিল, ঠিক সেই সময়েই তাদের মুক্তি এল সবে গোঁফ-গজানো আমার হাত দিয়ে।

তারপর? তারপর? মনটা ভারী খারাপ হয়ে গেল। একজন মহাবলের এই রকম মৃত্যুর কথা ভেবে।

বলেই, ঋজুদা বলল, আর কোনও প্রশ্ন নয়। ভটকাই, ডিনার সার্ভ করতে বলো। অদ্যই শেষ রজনী। কাল খুব ভোরে উঠে জঙ্গলে যাব তারপরে ফিরে চান করে ব্রেকফাস্ট করে আন্ধারী-তাড়োবাকে এবারের মতো টা টা করে দিয়ে নাগপুরের দিকে রওয়ানা হব আমরা মোহাৰ্লি গেট হয়ে চন্দ্রপুর হয়ে।

ভটকাই বলল, জি হুজৌর।

ঋজুদা বলল, আমি আর কোনও প্রশ্নের জবাব দেব না কিন্তু তোমাদের সকলকে কটি প্রশ্ন করব। তোমরা ভাববা, আলোচনা করো, তারপরে নাগপুরে ফিরে সন্ধেবেলা প্রশ্নগুলির উত্তরগুলো দিয়ে।

কী প্রশ্ন? সকলেই প্রায় সমস্বরে বলে উঠলাম ও উঠলেন।

প্রথম প্র: বাঘটা মানুষখেকো হল কেন?

দ্বিতীয় প্রশ্ন: বাঘটা বেশি খেতে পারত না কেন?

তৃতীয় প্রশ্ন: বাঘটা কানা হয়েছিল কোন কোন সম্ভাব্য কারণে?

তার চামড়া ছাড়ানোর সময়ে আমরা দেখেছিলাম যে সে খুবই রোগা হয়ে গেছিল। এবং তার একটা চোখ কানা ছিল। বাঘটার শরীরে কোনও ক্ষত ছিল না, মানে কোনও শিকারির গুলিতে আহত হয়ে তার এই বৈকল্য ঘটেনি।

বাঘটার কি পোস্টমর্টেম হয়েছিল? তিতির বলল।

হয়েছিল। বনবিভাগেরই একজন ভেট করেছিলেন।

তার রিপোর্ট কী ছিল? প্রদীপকাকু জিজ্ঞেস করলেন।

তা বলব না। মানে, নাগপুরেই বলব যা বলার। তোমরা এ দুদিন গেসওয়ার্ক করো।

এ তো মহা কুইজ দিলে তুমি। ভটকাই বলল।

তারপর বলল, রাতের খাওয়াটাই বরবাদ হয়ে যাবে, রাতে ঘুমও হবে না। কোনও মানে হয়। বলেই দাও না বাবা উত্তরগুলো।

ঋজুদা পাইপটা ধরিয়ে বলল, বলব। নাগপুরে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *