ঋজুদা এবং ডাকু পিপ্পাল পাঁড়ে – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

পাঁচ

এখানে দেখতে দেখতে হয়ে গেল তিনদিন। মানে, সীমারিয়াতে।

সফর আলি মানুষটার বয়স হবে চল্লিশ। বেঁটে-খাটো, শক্ত সমর্থ। কট্টর মুসলমান, দিনে পাঁচওয়াক্ত নামাজ পড়ে। ফজিরের নামাজ থেকে শুরু করে ডিমান্ডউইচমন আর, ঈশার নামাজ অবধি। চোখের দৃষ্টি খুব প্রখর। যদিও চোখ দুটো কুতকুতে। তার চোখের দিকে চেয়ে কথা বলা যায় না। মাথায় সাদা ফুলকাটা টুপি। একটু তোতলা। কাঁধে একনলা মুঙ্গেরি বন্দুক। সম্ভবত বেপাশি।

আর লটকা মানুষটির বয়েসও ওই রকমই। বেজায় মোটা। কালো ভুচুং। পরনে, ঢোলা, লালচে-হয়ে-যাওয়া পায়জামা আর হাতা-গোটানো সাদা খদ্দরের পাঞ্জাবি। পায়ে চটি। তা থেকে গোড়ালির দিকের আধখানা পা বাইরে বেরিয়ে থাকে। হাতে একটি রোগা লাঠি। মুখে সবসময়ে পান-জরদা। কপালে সিঁদুরের টিপ। সকালে চান করে উঠেই সে কালীপুজো করে। কানে একটি জবাফুল গোঁজে। আর মেটে সিঁদুরের টিপ পরে। আর কথায় কথায় বলে, লেহ্ লটকা।

একজন গোঁড়া মুসলমান আর একজন গোঁড়া হিন্দুর মধ্যে আমরা দুজনে একেবারে স্যান্ডউইচড হয়ে আছি।

ডিম মুরগি খাব, আবার শিকার করা মাংসও খাব। তাই আমাদের প্রথম দিনই দুপুরের নিরামিষ খাবারের পরে ডাকবাংলোতে পাঠিয়ে দিয়েছে চন্দনমল পুগালিয়া। লগনবাবুর সীমারিয়ার ডিপোর কর্মচারি। সফর আলি, লটকা এবং আমাদের খিদমদগার রামখিলাওন সকলেই আমরা সীমারিয়ার ডাকবাংলোতেই আছি। জিপটা আমাদের সঙ্গেই আছে। চন্দনমল, পেট্রল পাম্পে আমাদের নিয়ে গিয়ে মালিকের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছে। বলেছে, যখনই তেল লাগবে বা অন্য যা কিছু লাগবে তা যেন দিয়ে দেন উনি লগনচাঁদ অ্যান্ড কোম্পানির। অ্যাকাউন্টে খরচ লিখে। এও বলেছে যে, কোম্পানির অডিটর এরা। কলকাতা থেকে শিকারে এসেছেন। দেখবেন, যেন কোনও অসুবিধা না হয়।

আমি ঋজুদাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, মুলিমালোঁয়া থেকে সীমারিয়া কত দূর? আমরা যখন ‘অ্যালবিনো’র রহস্য ভেদ করার জন্যে গেছিলাম মুলিমালোঁয়াতে তখন কি সীমারিয়াতেও গেছিলাম?

হ্যাঁ! সীমারিয়ার উপর দিয়েই গেছিলাম। এখন তো সব ভিড়ে-ভিড়াক্কার হয়ে গেছে। পিপ্পাল পাঁড়ের সঙ্গে যখন আমাদের টক্কর হয়েছিল সে তো চল্লিশ বছর আগের কথা। তখন সীমারিয়া বা টুটিলাওয়া খুবই শান্তির জায়গা ছিল। পৃথিবীর সব জায়গাতেই শান্তি ছিল। মানুষ বেড়ে গিয়ে, জনসংখ্যা গিনিপিগ-এর মতো বেড়ে গিয়েই সব কিছু শেষ হয়ে গেল। মানুষের বাসের যোগ্য আর রইল না। জঙ্গলও সব শেষ হয়ে গেল।

তা ঠিক। তিতির বলল।

অথচ জনসংখ্যা কমাবার জন্যে কারও কোনও মাথাব্যথাই নেই।

অশিক্ষিত, অভুক্ত মানুষ যত বাড়ে, ততই তো রাজনৈতিক দলেদের সুবিধা। ততই তো তাদের একটা ধুতি দিয়ে, চারটে রুটি দিয়ে, এক বোতল দিশি মদ দিয়ে, দশটা-বিশটা টাকা দিয়ে পাঁচবছর অন্তর ভোট কিনতে সুবিধা। দেশের মানুষ সবাই শিক্ষিত এবং সচ্ছল হয়ে গেলে তো ধোঁকা দিয়ে ভোট পাওয়াটা অসুবিধের হয়ে যাবে। দেশে প্রকৃত উন্নতি হয়ে যাবে যে! আর তা হলে ঋজুদার বন্ধু সুব্রতদার ভাষায় বলতে গেলে বলতে হয়, এই ধড়িবাজ মানুষগুলোর কী হবে? রাজনীতিই যাদের একমাত্র পেশা।

ভটকাই বলল।

ও বাবা। তুই দেশের জন্যও এত ভাবিস ভেটকু?

ঋজুদা বলল।

ভাবা তো সকলেরই উচিত ঋজুদা, তাইনা? তা ছাড়া দেশকে ভালবাসতে তো। তোমার কাছ থেকেই শিখেছি। দেশ তো আমাদের প্রত্যেকেরই সম্পত্তি। আর আমাদের বলে মনে করলে ভাল তো বাসতে হয়ই!

তিতির বলল, ঠিক বলেছ ভটকাই!

তারপর, বলল ঋজুদা।

আমি বললাম।

হ্যাঁ। ভোরবেলা বেরিয়ে একটু আধটু শিকার করি আমাদের সকলের খাওয়ার জন্যে, তিতির, বটের, ময়ূর, শুয়োর, কোটরা হরিণ, বন-মুরগি। হাঁটা হয় বেশ কয়েক মাইল। সঙ্গে সফর আলিও যায়। লটকা বাংলোতে থেকে ম্যানেজারি করে। স্যালাড বানায়। সীমারিয়ার কালুর দোকান থেকে বালুসাহি আনিয়ে রাখে, এবং রাবড়ি, বানোয়ারির দোকান থেকে মিষ্টি পান। রোজই ‘বিনিপয়সার ভোজ। দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর ঘুম লাগাই লম্বা তারপর সন্ধে লাগার আগে আগেই বানোয়ারির পানের দোকানের সামনের বেঞ্চে গিয়ে বসি দু’জনে। উলটো দিকের লালুর দোকান থেকে চা আনিয়ে খাই আর বানোয়ারির দোকানের পান।

কলেজে ওঠার আগেই তোমরা পান খেতে?

তিতির বলল।

আরে, পান খাওয়ার জন্যে কি আর যেতাম। প্রত্যেক ছোট জায়গায় পানের দোকানই হচ্ছে ‘গসিপ-সেন্টার। কত লোক আসছে যাচ্ছে। কেউ পায়ে হেঁটে, কেউ বাসে, কেউ বা সাইকেলে, ক্কচিৎকদাচিৎ কেউ গাড়িতে বা জিপে। পরচর্চার এমন জায়গা আর হয় না। অনেক কাপ চা আর পান না খেলে কোন অছিলাতে আমরা সেখানে বসে থাকি! তা ছাড়া, আমরা যে পরদেশি কোকিল তা তো স্থানীয় সকলেই জানে। নানা কথা, নানা আলোচনা কানে আসে। তার মধ্যে পিপ্পাল পাঁড়ের নতুন কীর্তিও ডালপালা বিস্তার করে আসে৷ যারা দোকানে আসে, তাদের মধ্যে পিপ্পাল পাঁড়ের চরও নিশ্চয়ই থাকে। নইলে তারাও বা খবর পাবে কী করে? কোন বড়লোকের বাড়িতে বিয়ে আসছে, কে গেজেতে করে বিস্তর টাকা নিয়ে গোরু কিনতে যাচ্ছে কোন হাটে, কে জঙ্গল ডাকতে যাচ্ছে হাজারিবাগের ডিভিশনাল ফরেস্ট অফিসারের অফিসে, যেখানে জঙ্গলের নীলাম ডাকা হবে, সেখানে বিস্তর ক্যাশ টাকা ডিপোজিট দিতে। এই সব খবর না পেলে, ডাকাতি করে পাবে কী? কখনও বা কোনও জমিদার বা বানিয়া কার ওপরে কী অত্যাচার করল তারও বৃত্তান্ত চুঁইয়ে আসে বানোয়ারির এই পানের দোকানে।

সেদিন সন্ধ্যাবেলা বানোয়ারির পানের দোকানে বসে থাকতে থাকতে রাত কত হয়েছে তার খেয়ালই ছিল না স্থানীয় মানুষদের গল্প-গাছাতে এমনই মগ্ন হয়ে উঠেছিলাম আমরা। ইতিমধ্যে দেখি, সফর আলি গুটি গুটি আসছে দোকানের দিকে। পরনে নীল-সাদা খোপ-খোপ লুঙ্গি তার ওপরে নীলরঙা ফুল শার্ট, মাথায় সাদা টুপি, পায়ে নাল লাগানো মোষের মোটা চামড়ার জুতো।

বানোয়ারির দোকানটা ছিল মস্ত একটা সাগুয়ান গাছের নীচে, চাতরা, হাজারিবাগ আর বাঘড়া মোড়-এর রাস্তার চৌমাথাতে। সফর আলি এসে বলল, লটকা আপলোগোঁকি আনেকি লিয়ে বোলিন। খানা বন গ্যয়া। ঠাণ্ডা হো রহা হ্যায়।

সফর আলি যখন আমাদের সঙ্গে কথা বলছে তখনি সাইকেলে করে একটি লোক এল চাতরার দিক থেকে। এসেই দুটো দিয়ে ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে বলল, দো পান। কালি-পিলি জরদা দে কর। ছিপছিপে লোক। বয়স চল্লিশ হবে। পরনে দেহাতি খদ্দরের একটা হলদে পাঞ্জাবি আর পায়জামা।

বানোয়ারি তাড়াতাড়ি পান দিল। তাকে যেন একটু নার্ভাস দেখাল।

পিচিক করে কিছুটা পানের পিক ফেলে, আর কিছুটা খুশবুদার জরদা দেওয়া পিক গিলে, সফর আলিকে সে বলল, আররে!মিঞাসাব তু এথিক্যা করলথু হো?

লোকটা আসতেই সবাই চুপ করে গেছিল। এবং বানোয়ারির তড়িঘড়ি পান দেওয়ার মধ্যে অস্বাভাবিকতা ছিল। লোকটা যে দুগগি-তিগগি কেউ নয়, তা তার চোখ দুটোই বলে দিচ্ছিল। আর ব্যক্তিত্বও।

সফর আলি লোকটাকে দেখে চমকে উঠল মনে হল।

বলল, ম্যায় মেহেমান লোগোঁকা সাথ আয়া।

কাঁহাসে আয়া তুমহারা মেহমান লোগোঁনে?

কলকাত্তা সে। কম্পানিকি অডিটর সাবকি লেড়কা ঔর উনহিকি দোস্ত।

তবতো বহত পয়সাওয়ালা আদমি হোগা। তু ইসি লিয়ে চামচাগিরি করলথু। ক্যা অডিট করনে কি লিয়ে আয়া ই ওড়াপুত্তান লোগ?

আমাদের খুব রাগ হয়ে গেল। নাজিম সাহেব আমাদের উঁওড়াপুত্তান বলেন সেটা অন্য ব্যাপার। এমন আনজান লোক আমাদের এমন তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করছে?

সফর আলি প্রতিবাদ করে বলল, ম্যায় ক্যা ঊরু? শেঠনে ভেজা, তবহি না আয়া। ম্যায়তো নোকরিহি না করতা হ্যায়।

লোকটা বলল, সাচ্চি বাত। মগর কওন হ্যায় তুমহারা শেঠ? কাঁহাকি শেঠ?

চাতরাকি। ঔর কাঁহাকি শেঠ মিলেগা মুঝে। ম্যায়তো চাতরামেই না রহতা হ্যায়।

নামতো বাতাও মেহেরবানি করকে, তুমহারা শেঠকি।

শেঠ লগনচাঁদ মালপানি।

আচ্ছি বাত।

তো হিয়া ঠাহরা হ্যায় কাঁহা? চন্দনমলকি ডিপোমে?

নেহি। ডাকবাংলা মে।

আচ্ছা বাত। তো অডিটর লোগোঁনে ক্যা অডিট করনেকে লিয়ে আয়া হিয়া?

শিকার খেলনেকে লিয়ে আয়া। ইনলোগোঁনে তো পড়তা হ্যায় কলিজমে। অডিটর থোরি বন গিয়া।

বলেই, আমাদের দুজনের আলাপ করিয়ে দিল সফর আলি, লোকটার সঙ্গে। আমাদের বলল, ঈভি বহতই ভারি শিকারি হ্যায়। পইলে গিরিডিমে অভ্রকি খাদানমে কাম করতা থা…

ইয়েভিতো বোলো মিঞা, যো তুমভি কাম করতা থা ওহি খাদানমে…

বলতেই, সফর আলি যেন মিইয়ে গেল।

বলল, ছোড়ো পিপ্পাল সব পুরানা বাঁতে।

আমি আর গোপাল চমকে উঠলাম ‘পিপ্পাল’ শুনে। এই কি তবে ডাকু পিপ্পাল পাঁড়ে?

লোকটি বলল, ম্যায় থোড়ি ভুলনে শকতা মিঞা। সব কুছহি মেরি ইয়াদ রহতা হ্যায়। ভুলনা ইতনা অ্যাহসান তো নেহি না হ্যায়!

সফর আলি যেন খুবই ভয় পেয়ে গেল।

বলল, চালিয়ে চালিয়ে খোকাবাবুলোগ।

উঁওড়াপুত্তানলোঁগ হিয়া কওনসি শিকারকি লিয়ে আয়া হুয়া হ্যায়? পাণ্ডুক কি শিকার?

এই কথাতে দোকানসুদ্ধ লোক চাপা হাসি হেসে উঠল।

গোপাল আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, সব গাঁওয়ার। কোনও ভদ্রতা জানে না।

পাণ্ডুক মানে কী?

তিতির জিজ্ঞেস করল।

পাণ্ডুক মানে, ঘুঘুপাখি।

গোপাল দোকানসুদ্ধ লোককে হাসতে দেখে গলাতে সামান্য তেতো মিশিয়ে লোকটাকে বলল, চিবিয়ে চিবিয়ে, আউর করে ক্যা? হিয়া পাণ্ডুক ছোড়কর কুছ হ্যায়ই নেহি। না জংগলমে, না বস্তিমে।

অ্যায়সি বাত?

সেই লোকটা মানে, পিপ্পাল, বলল। মনে হল, জায়গা মতোই বিধিয়েছে গোপাল।

জি হাঁ। অ্যায়সি হি বাত।

গোপাল বলল, তার ইয়ার্কির জবাবে গম্ভীর হয়ে।

আপলোগোঁনে কওনসা হাতিয়ার সে খেলিয়ে গা শিকার?

আবারও প্রশ্ন করল, লোকটা।

আমারও ততক্ষণে রাগ হয়ে গেছে। আমি বললাম, স্রিফ হাঁতোসে।

লোকটা বলল, হাঁতোমে বহতই তাগৎ হোগা আপলোগোঁকি।

জি হাঁ। সিরিফ হাঁতোমেহি নেহি। প্যায়েরোমেভি কাফি তাগৎ হ্যায়।

গোপাল বলল।

বহতই খুশি কি বাঁতে, বহতই খুশি কি সন্দেশ হ্যায় ঈ। হিন্দুস্তাঁ কি ঘর-ঘরমে এইসি নওজোয়ানোকি জরুরৎ পড়ি হ্যায় আজ।

তারপরই সাইকেলটা টেনে নিয়ে, লাল কালো চেক-চেক মাফলারটা গলাতে ভাল করে জড়িয়ে, সফর আলিকে হাত তুলে বলল, খুদাহ হাফিজ। ইনশাল্লা; ফিন মিলেঙ্গে। মিলনাতো হোগাই ইকদফে। কমসে কম।

তারপর, আমাদের দিকে মুখ ঘুরিয়ে বলল, নমস্তে খোকাবাবুলোঁগ। জি খোলকর পাণ্ডুক মারিয়ে। ক্যা জঙ্গলমে, ক্যা বস্তিমে। হিয়াতো স্রিফ পাণ্ডুক হি পাণ্ডুক ঔর ক্যা?

গোপাল বলল, শুনাতো থা যো বাঘোয়াভি হ্যায়। মগর মিলা স্রিফ পাণ্ডুক ঔর খরহা।

আচ্ছা?

বলেই, নোকটা সাইকেলে উঠে চলে গেল।

লোকটা চলে যেতেই সফর আলি বানোয়ারির দোকানের সামনের বেঞ্চে থপ করে বসে পড়ে বানোয়ারিকে বলল, ইক প্যাকেট কেঞ্চি সিগারেট লানা ভাই।

চলে-যাওয়া লোকটার জ্বলজ্বলে চোখ দুটো তখনও যেন চিতাবাঘের চোখেরই মতো আমাদের দিকে চেয়েছিল।

কেঞ্চি সিগারেটটা আবার কী জিনিস?

ভটকাই বলল।

সে তোরা দেখিসনি। আমাদের ছেলেবেলাতে ওই সব সিগারেটই পাওয়া যেত। Scissors বা কাঁচি, পাসিংশো। ভাল সিগারেট বলতে গোল্ডফ্লেক, ফাইভ-ফাইভ-ফাইভ।

তারপর বলো।

ভটকাই বলল। থামলে কেন ঋজুদা?

হ্যাঁ। ঋজুদা বলল, দোকানি বানোয়ারি সিগারেটের প্যাকেটটা এগিয়ে দিতে দিতে বলল, গিরিডিমে ক্যা হিসাব-কিতাব থা পিপ্পালসে তুমহারা মিঞা? লাগতা হ্যায় কি, পিপ্পাল কী কুছ হিসাব পড়ি হ্যায়। উধার-শুধার লিয়া থা ক্যা রুপাইয়া?

উধার মানে কী? উধার-শুধার?

তিতির বলল।

উধার মানে, ধার। উধার-শুধার মানে ধার-টার।

সফর আলি বলল, পিপ্পাল আভভিইনা বহত রহিস আদমি বনা। উসটাইম মে উসকো ম্যায় বহতই পিটতা থা অভ্র খাদানমে।

উসকো পিটতা থা? কাহে লা?

সমবেত পরচর্চাকারীরা অবাক হয়ে সমস্বরে শুধোলেন।

বদমাস থা ইক নাম্বারকি। ঔর হামারা মালিক বোলতা থা উসকো পিটনে কি লিয়ে। হামারা মালিক ভি আচ্ছা আমি নেহি থা। উসকা দুসরা হিসাব কিতাব ভি থা।

পানের দোকানি বানোয়ারি উৎকর্ণ হয়ে জিজ্ঞেস করল।

উস বাদই তো পিপ্পালকি পিতাজি গিরিডি ছোড়কর ঝুমরি তিলাইয়া চলে গ্যয়ে। উসকি বাদ হাজারিবাগ জিল্লামে আয়া হোগা। মুঝে পতা নেহি থা।

শুধু বানোয়ারিই নয়। অন্য অনেকেই বলল, জারা সামহালকে রহনা চাহিয়ে মিঞা। নেহিতো তুমকো সীমারিয়া ছোড়কর চলা যানা চাহিয়ে জলদি। বাঘড়া মোড় সে লেকর সীমারিয়া, টুটিলাওয়া বনাদাগ হোকর ইকদম হাজারিবাগ তক পিপ্পালকি রাজ হ্যায়।

আমি বললাম, কিউ? ক্যা হোগা?

বহত কুছ হোনে শকতা খোকাবাবু। পিপ্পাল করনে নেহি শকতা এইস্যা কোঈ কামই নেহি হ্যায়। সামহালকে রহিয়েগা। আপ দোনোঁকোভি উ গুম কর দেনে শকতা হ্যায়। বহতই কামিনা আদমি হ্যায়।

গোপাল বলল, কাহে? হামলোগোঁসে উসকি ক্যা মতলব?

গুম কর দেকে বহতই মোটা রুপাইয়া মাগো আপলোগোঁকি পিতাজিসে। ঔর ক্যা?

আমি বললাম, রুপাইয়া নেহি মিলনেসে?

নেহি মিলনেসে আপলোগোঁকি লাশ লেনেকে লিয়ে আনে পড়েগা উনলোগোঁকি কলকাত্তাসে।

আমি বললাম, যেন খুবই ভয় পেয়েছি এমনই ভাব দেখিয়ে, আরে! ইতো বড়ি খাতরা বন গ্যয়া।

জী খোকাবাবুলোঁগ। আভভি খাতরা বনা নেহি, মগর বননে শকতা।

আমি আরও ভয় পেয়েছি ভাব করে বললাম, কাল হি সুব্বে ভাগেগা হামলোগ হিয়াসে।

ঐসাহি করনা। নেহিতো কমসে কম ঈ মিঞাকো চাতরাওয়ালা সুব্বেকি বাসমে বৈঠা দিজিয়ে।

সফর আলি বলল।

গোপাল বলল, দেঁখে, ক্যা করে! শোচেগা।

তারপর আমরা তিনজন হেঁটে ডাকবাংলোর দিকে এগোলাম।

তারপর?

ভটকাই বলল।

একটু থেমে, পাইপে কুটি টান দিয়ে ঋজুদা আবার শুরু করল।

সপ্তমী কী অষ্টমী হবে। শুক্লপক্ষর রাত। চাঁদটা উঠেছে। এপ্রিলের প্রথম। কিন্তু তখনও সন্ধের পরে বেশ ঠাণ্ডা। রাতে একটা কম্বল লাগে। পথের লাল ধুলোয় আর পথপাশের গাছগাছালির গায়ের থেকে একটা মিশ্র গন্ধ উঠছে। দুটো পেঁচা ঝগড়া করতে করতে আমাদের মাথার উপর দিয়ে উড়তে উড়তে, যেন আমাদেরই পাইলটিং করে নিয়ে চলতে লাগল। দূরের বস্তি থেকে একসঙ্গে তিনচারটে কুকুর ডেকে উঠল। আমরা ওঠার পর পরই বানোয়ারির দোকানের বাইরের বাঁশ থেকে ঝোলানো হ্যাঁজাকটা নিভে গেল।

দোকানের ঝাঁপও বন্ধ হল। সাইকেলে বা পায়ে হেঁটে পরচর্চা করনেওয়ালারা। একে একে যার যার বাড়ির দিকে চলে গেল।

রাত সাড়ে আটটাতে জঙ্গলের মধ্যের ছোট্ট জায়গাতে অনেকই রাত। বাস চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। ডালটনগঞ্জ, রাঁচি আর হাজারিবাগ থেকে দিনে তখন। সবসুন্ধু গোটা দশেক বাস যেত-আসত। ট্রাক তখন ছিলই না বলতে গেলে। মোষের বা গোরুর গাড়িতেই বেশি মাল যেত-আসত। ওই সময়ে সীমারিয়া বা টুটিলাওয়াতে সাইকেল রিকশা ছিল না কোনও। চড়বে কে? অত বড়লোক কজন সেখানে?

সফর আলি বলল, আপলোঁগ ইতনা দের নেহি করনেসে তো হামকো পান দুকানমে যানা নেহি পড়তা থা। ঘড়িভিতে আপনোগোঁকি হাতোমে বান্ধা হুয়া হ্যায়, মগর ওয়াক্ত কিতনা হুয়া উও দিখনেমে হুরজা ক্যা থ্যা?

আমি বললাম, গলতি হো গ্যয়ে।

ওয়াক্ত মানে কি ঋজুকাকা?

তিতির বলল।

ওয়াক্ত উর্দু শব্দ। ওয়াক্ত মানে সময়, টাইম।

গোপাল বলল, খ্যয়ের, যো হুয়া সো আচ্ছাই হুয়া।

কাহে?

কাঁচি সিগারেটে এক জব্বর টান লাগিয়ে সফর আলি বলল।

আরে দেরি না করলে চাচা তুমিও আসতে না আর আমাদেরও ডাকু পিপ্পাল পাঁড়ের সঙ্গে মোলাকাত হত না। আমার ছেলেবেলা থেকেই অনেক ডাকাতের গল্প শুনেছি কিন্তু চোখে কখনও দেখিনি ডাকাত। এই প্রথম।

চেহারা দিয়ে কী বোঝা যায়। অনেক মানুষ আছে, ডাকাতের মতো দেখতে কিন্তু অতি সজ্জন। আবার অনেক ডাকাত আছে পির-এর মতো দেখতে। মানুষের বাইরের চেহারাটা কিছুই নয়, ভিতরের চেহারাটাই আসল। তবে ওকে আমি দোষ দিইনা কোনও, বরং ওকে সমর্থনই করি। ও আমাদের মতো লক্ষ লক্ষ অত্যাচারিত গরিব মানুষের আশা। ওকে এ অঞ্চলের মানুষে পুজো করে। এত অন্যায় অত্যাচার সয়েছে মানুষ, জমিদার, ক্ষমতাবান, পয়সাওয়ালাদের হাতে, পোলিটিকাল পাটির ক্যাডারদের হাতে, মুখ বুজে, যুগের পর যুগ, যে, পিপ্পাল-এর মধ্যে তারা সকলেই তাদের অপমান অসম্মানের প্রতিশোধের ভাষা খুঁজে পায়।

তুমি তো মুসলমান সফর চাচা। আর পিপ্পাল তত হিন্দু ব্রাহ্মণ।

তাতে কী? ওসব জাত-পাত সবই ফালতু। পৃথিবীতে জাত মাত্র চারটে।

মাত্র চারটে?

মানে?

আমি, তিতির আর ভটকাই একই সঙ্গে জিজ্ঞেস করলাম ঋজুদাকে।

ঋজুদা হেসে বলল, আমি আর গোপালও ঠিক এমনি করেই তোদেরই মতো একই সঙ্গে সফর আলিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম।

তো কী বলল? সফর আলি?

ভটকাই বলল।

ভটকাই, বেশ অনেকক্ষণ একটানা শোনা হয়েছে গল্প আবার তুই শুরু করলি। চুপ কর।

আমি বললাম।

ভটকাই নিজেই ডানহাতের তর্জনি নিজের ঠোঁটে চুঁইয়ে রেখে চুপ করে গেল।

সফর আলি বলল, চারটে জাত। একটা হল ক্ষমতাবান অত্যাচারী, সেই ক্ষমতা অর্থ থেকে, পদ থেকে, বা রাজনৈতিক ক্ষমতা থেকেও আসতে পারে। আর দ্বিতীয় হল অত্যাচারিত।

আর?

গোপাল বলল।

আর খারাপ এবং ভাল।

তারপর বলল এই চারটি জাত ছাড়া পৃথিবীতে কোনও জাত-পাতই নেই! আর সবই বানানো। গা-জোয়ারি জাত।

একটু চুপ করে থেকে ঋজুদা বলল। আজও মনে পড়ে, সীমারিয়ার সেই রাতটির কথা। শুক্লাসপ্তমীর নির্মেঘ চাঁদভাসি নীলকাশে অগণন স্নিগ্ধ তারারা ফুটে আছে। একটা মস্ত শিরিষ গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে চাঁদটা দেখা যাচ্ছে, আধখানা ডিমের কুসুমের মতো। শেষ চৈত্রের হালকা হিমেল রাত। আমের বোল-এর আর মহুয়ার গন্ধ ছমছম করছে নিবাত পরিবেশে।

এই রে! নিবাত শব্দটা কি হিন্দি ঋজুকাকা?

তিতির বলল, মুশকিলে পড়ে।

ঋজুদা হেসে বলল, এই সব সাহেব-মেমসাহেবদের নিয়ে পারি না।

তারপর আমার দিকে ফিরে বলল, এই যে লেখকমশাই মিস্টার রুদ্র রায়, আপনি একটু সাহায্য করুন না আমাকে।

আমি বললাম, বাত মানে যে শুধুমাত্রই গেঁটে বাতই তা ভেবো না। বাত মানে কথা, সংবাদও…

বাতিয়া বানাও নেহি বার বার মুসে

ভটকাই গেয়ে উঠল হঠাৎ।

ঋজুদা বলল, বাঃ! তুই দেখি রুদ্রকে সব ব্যাপারেই হারাতে চাস।

ভটকাই গম্ভীর গলাতে বলল, তুমিই সবসময়ে বলল যে, জীবনে যাই করবি তাতেই এক নম্বর হওয়ার সাধনা করবি।

তা বলে, তুই সেমসাইডে গোল করবি?

আমরা সকলেই হেসে উঠলাম।

হ্যাঁ। বাত মানে কথা, বাত মানে গেঁটে বাত, বাত মানে হাওয়াও।

হাওয়া?

তিতির অবাক হয়ে বলল।

ইয়েস। নির্বাত সংস্কৃত শব্দ। তা থেকে নিবাত। কেন তোরা কি পড়িসনি কোথাও? বঙ্কিমচন্দ্রও পড়িসনি? বাংলা সাহিত্যের প্রথম ঔপন্যাসিককে? ‘নিবাত, নিষ্কম্প’ অনেক জায়গাতে ব্যবহার করেছেন উনি।

এবারে বলো ঋজুদা। ডাকাত ছেড়ে ব্যাকরণে ঢুকে পড়ছ তুমি। ব্যাকরণকে আমরা ডাকাতের চেয়েও বেশি ভয় পাই।

হ্যাঁ।

তারপর গোপাল বলল, ডাকু পিপ্পাল পাঁড়ে যে সাইকেলে চড়ে বানোয়ারির দোকানে এসে জরদা পান খেয়ে আড্ডা মেরে গেল। কেউ কোতোয়ালিতে এই খবর দেবে না? পুলিশের চর নেই এখানে?

আছে। নিশ্চয়ই আছে। তারা পুলিশের কাছ থেকে পয়সাও নেয় আবার পুলিশকে ভুল খবরও দেয়। কারণ, মনে মনে ওরা সকলেই পিপ্পাল পাঁড়ের দলে।

এটা কি উচিত? মানে পয়সা নিয়ে কাজ না করা?

গোপাল বলল, এটা কি অসততা নয়?

সততা, ইমানদারি, এসব কথা তো ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে অভিধান থেকে বড়খোঁকা।

সফর চাচা আমি লম্বা চওড়া বলে আমাকে বড়খোঁকা আর গোপালকে ছোটখোঁকা বলছে। গোপাল যদিও বয়সে আমার চেয়ে এক বছরের বড়ই। এতে চটছেও গোপাল। কিন্তু আমি কী করব!

সফর আলি তারপরে বলল, সততা, ইমানদারি আর বোকামির মতলব এখন একই হয়ে গেছে।

আমরা আর কথা না বলে সীমারিয়ার ডাকবাংলোর দিকে এগিয়ে চললাম।

দূর থেকে দেখা যাচ্ছিল বাংলোর ফটকের বড় শিমুল গাছটাকে। শিমুলের ফুল পড়ে পড়ে লাল গালচের মতো দেখাচ্ছে জায়গাটা আর আমেরিকান আর্মির ডিসপোজাল থেকে কেনা জিপের বনেটটার উপরে চাঁদের আলো পড়ে চকচক করছে।

লটকা। হো লটকা।

সফর আলি চেঁচিয়ে ডাকল।

রামখিলাওন বাবুর্চিখানা থেকে উত্তর দিল, বহত জাদা ভাঙ পি লিয়া আজ লটকা বাবু। আপলোঁগ নহি রহেনেসেই এইসা হি করতা হ্যায় উনোনে।

ভাবলাম, ভাল লোকাল গার্জেনদের খপ্পরেই পড়লাম দেখছি। এক মিঞা ডাকু পিপ্পাল পাঁড়ের জানি দুশমন’ আর অন্য জন মহাদেবের জানি চেলা।

সফর আলি বলল, আপনারা খেতে বসে পড়ুন খোকাবাবুরা। আমি উজু করে, এশার নামাজটা পড়েই আসছি।

গোপাল বলল, লটকা বোধহয় আজকে আর খাবে না। সে এতক্ষণ ভাঙ-এর কল্যাণে রম্ভা-মেনকার নাচ দেখছে স্বপ্নে, মন্দাকিনী নদীর তীরে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *