ঋজুদা এবং ডাকু পিপ্পাল পাঁড়ে – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

চার

ঋজুদা পাইপটা অ্যাশট্রে থেকে তুলে নিয়ে নতুন করে টোব্যাকে ভরল। তিতির বলল, বলল ঋজুকাকা, তারপর কী হল? তবু বাঘটার কথা আরেকটু বলো।

হবে আর কী? আমাদের মন সত্যিই খুবই খারাপ হয়ে গেছিল। অতবড় বাঘ কি আর মারার সুযোগ পাব?

তখন অবশ্য আমাদের কারওরই জানা ছিল না যে, তার কয়েক বছর পরেই সুব্রত আর ইজাহার দু’জনে মিলে সীতাগড়া পাহাড়ে যে মানুষখেকো বাঘটা অত্যাচার শুরু করেছিল, পিজরাপোলের এবং সীতাগড়া পাহাড়ের নীচের গ্রামগুলির গোরু-মোষ এবং মানুষ মেরে, সেই বাঘটাকেই মারবে। সে বাঘ, এই বাঘের চেয়েও অনেকই বড়। দশ ফিট ছ ইঞ্চি ছিল।

বিটউইন দ্য কার্ভস?

তালেবর ভটকাই জিজ্ঞেস করল।

না। বিটউইন দ্য পেগস।

ঋজুদা বলল।

ঋজুদার গল্প শেষ হতে হতে আজ্জু মহম্মদ ফিরে এসেছিল নাখুদা মসজিদ থেকে মগরিব-এর নামাজ সেরে। আমাদের পাশে চেয়ার পেতে বসে গল্প শুনছিল। ঋজুদার এ সব গল্প, আমাদের চেয়ে তার তো আরও বেশি ভাললাগার কথা। কারণ, তার বাবা মহম্মদ নাজিম ওই সব নাটকের প্রধান ভূমিকাতে ছিলেন এবং ওই সব বনাঞ্চল তার জন্মভূমি হাজারিবাগেরই কাছে। অথচ তার বাবার মুখে এই সব গল্প শোনার সৌভাগ্য থেকে সে বঞ্চিত ছিল।

ঋজুদা, এই সব পুরনো দিনের গল্প বলতে বলতে প্রায়ই থেমে যায় আজকাল। মাঝে মাঝে বলে, দুসস্ এসব কথা মনে করতেও আর ভাল লাগে না। সবাই যে এত তাড়াতাড়ি চলে যাবে, কে ভেবেছিল!

ঋজুদার বন্ধু গোপাল সেন হঠাৎই সেরিব্রাল স্ট্রোক এবং হার্ট অ্যাটাক-এ চলে গেছেন কিছুদিন আগে। তার অল্পদিন পরেই সুব্রত চ্যাটার্জি বা নাজিম সাহেবের সুরবোতো বাবুও, ব্লাড ক্যানসারে। আর নাজিম সাহেব নিজে তো গেছেন আরও আগেই।

ঋজুদা তারপর আমার দিকে ফিরে বলল, এই সব গল্পগুলো তুই কিন্তু লিখিস রুদ্র। আমারও কবে কী হয়ে যাবে। এই সব গল্প বলার তো আর কেউই থাকবে। যারা তোদের ঋজুদার গল্প শুনতে তোরই কল্যাণে ভালবাসে, তারা, তোর লেখার মাধ্যমে অন্তত পড়তে পারবে। পড়ে, আনন্দিত হবে।

তিতির বলল, আজেবাজে কথা বলো না তো ঋজুকাকা! তোমার বন্ধুরা আগে আগে চলে গেছে বলে তোমাকেও যেতে হবে তার কী মানে আছে?

না, কোনও মানে নেই। তবে মানুষের জীবন তো! ঈশ্বর মানুষকে অনেকই জ্ঞানগম্মি দিয়েছেন কিন্তু কোন মুহূর্তে যে কাকে যেতে হবে, সেই খবরটুকুই জানতে দেননি। এই মুহূর্তেই হয়তো যমদূত আমার পেছনে দাঁড়িয়ে আমার কথা শুনছে আর মিটিমিটি হাসছে।

তারপরই তিতিরের দিকে ফিরে বলল, আচ্ছা তিতির, তুই কি টলস্টয়ের সেই বইটা পড়েছিস?

আমাদের মধ্যে তিতিরই পড়াশুনোতে ভাল বলে ঋজুদা সবসময়ে ওকেই জিজ্ঞেস করে এসব। তাতে আমাদের খারাপ যে একটু লাগে না, তা নয়। তবে

কথাটা তো সত্যিই যে তিতির আমাদের চেয়ে অনেকই বেশি জানে-শোনে।

তিতির বলল, কোন বইটার কথা বলছ ঋজুকাকা?

টলস্টয়ের ‘হোয়াট মেন লিভ বাই’। একটি চটি বই। একটা বড় গল্পই বলতে গেলে।

তিতির মাথা নাড়ল।

ভটকাই বলল, আমি পড়েছি। যদিও আমাকে তুমি জিজ্ঞেস করোনি, করেছ তিতিরকেই, তবুও নির্লজ্জের মতোই বললাম।

পড়েছিস! তুই! বলিস কী রে ভটকু? কে তোকে পড়তে দিল? আমাকে আর কে কী পড়তে দেয়! তোমারই মতো তো সকলেরই ধারণা যে আমি একটা হাঁদা ছেলে!

তবে ওই বই পেলি কোথায়?

আমাদের পাশের বাড়ির গোপেন মেসোমশাই মারা গেলেন গতমাসে, মিনিবাস চাপা পড়ে। তখন বেঁটে কাকা এই বইটি গোপেন মেশোর স্ত্রী, মানে মণিকাকিমাকে এনে দেন পড়বার জন্যে। কিন্তু মণিকাকিমা কৃষ্ণভামিনী স্কুলে ক্লাস ফাইভ অবধি পড়েছে মোটে। ইংরেজি বই পড়ে মানে বুঝলে তো? তবে বাংলা-নভেল-এর পোকা একেবারে। সুনীল গাঙ্গুলি, নিমাই ভট্টাচার্য, শংকরের বই গোগ্রাসে গেলে। তাই আমাকেই একদিন মণিকাকি বলল, বাবা ভটকু, তোর বেঁটে কাকা বইটা এনে দিল একটু পড়ে গল্পটা আমাকে বলে দিবি না? ইংরেজি যে!

তা, তোর বেঁটে কাকাকেই তো বলতে পারতেন উনি।

আমি জিজ্ঞেস করলাম।

দুসস। কী যে বলিস!

ভটকাই বলল, এমন ভাবে। যেন আমি জলের সঙ্গে তেল মিশাতে বলেছি।

কেন? দুসস্ কেন?

আরে বেঁটে কাকার সঙ্গে পাড়ার মেয়ে মণিকাকিমার ‘লভ’ ছিল ছেলেবেলাতে। পাড়ার সকলেই জানে। বেঁটে কাকার দুপুরবেলা একা মণিকাকিমাকে এ গপ্পো পড়ে শোনানোতে বিস্তর অসুবিধে ছিল। তাই তো অগতির গতি আমি!

ঋজুদা বলল, কার সঙ্গে কার ‘লভ’ ছিল তা আমাদের না জানলেও চলবে। কিন্তু আমি জানতাম যে, তোদের পাড়াতে তুইই সবচেয়ে কম শিক্ষিত। এখন দেখছি তোর চেয়েও….

ইয়েস। আমার চেয়েও কম শিক্ষিত অনেকেই আছে।

তা যাই হোক ভটকাই। ওই গল্পটা পড়েছিস যখন তুই, তিতির আর রুদ্রকে একসময়ে গল্পটা শুনিয়ে দিস।

তারপরে বলল, যে-মানুষেরা ঈশ্বরে বিশ্বাস করে না তাদের সকলেরই পড়া উচিত ওই গল্প। ঈশ্বরের ধারণার সঙ্গে যে বিজ্ঞানের বা যুক্তির কোনওরকম ঝগড়া নেই, তোরা আরও বড় হলে, আরও অনেক পড়াশুনো করলে, জানতে পারবি। যাদের পড়াশুনো কম, তারাই পুঁটি মাছের মতো অল্প জলে ফরফর করে। যারা সত্যিই জ্ঞানী, তাদের চলা জলের গভীরে, গহনে, জলের উপরে চেয়ে বোঝা পর্যন্ত যায় না তা।

আমি বললাম, আবার ফিরে চলো ঋজুদা টুটিলাওয়াতে। আমরা ডাকু পিপ্পাল পাঁড়ের গল্প শুনতে চাই।

হ্যাঁ। সেদিনই রাতে, খাওয়া-দাওয়ার পরে সুরবোতো বাবুকে হাজারিবাগে পাঠিয়ে দিলেন নাজিম সাহেব ইজাহারের সঙ্গে। খোলা জিপে।

খোলা জিপে কেন?

তা না হলে পিপ্পাল জানবে কী করে যে সুব্রত সেই জিপে নেই। জিপে সুব্রতর রাইফেল নিয়ে ইজাহার আর নাজিম সাহেবের রাইফেল নিয়ে ইমতিয়াজ বডিগার্ড হিসেবে সঙ্গে গেল। ইজাহার জিপ চালাবে, পাশে গুলি ভরা রাইফেল শুইয়ে রেখে। সুব্রতকে নিরাপদে পৌঁছে দিয়ে এস. পি. সাহেবের বাংলোতে, ওরা আবারও রাতেই ফিরে আসবে এবং এখানেই খাওয়া-দাওয়া করবে।

সুব্রতকে বর-রওয়ানা করিয়ে দেওয়ার মতো করে উলু দিয়ে রওয়ানা করিয়ে দেওয়া হল। তারপর আমি আর গোপাল বললাম নাজিম সাহেবকে এবার আমরা দু’জনে একটু ঘুরে আসি।

কোত্থেকে?

দু চোখ ডিপার করে বললেন, নাজিম সাহেব।

দেখি, পিপ্পাল পাঁড়ের সঙ্গে দেখা হয় না কি? কে যেন বলছিল যে ঠিকাদারের লোকেরা ওল্ড চাতরা রোডের পাশে আজই বিকেলে এসে ডেরা করেছে। গাছ কাটার জন্যেই ওরা এসেছে। ঠিকাদারের হয়ে। সবাই তো স্থানীয় লোকই। ওদের সঙ্গে একটু মিলে-মিশে দেখে আসি পিপ্পাল পাঁড়ের রাহান-সাহান জানা যায় না কি?

নাজিম সাহেব বললেন, একদিনে অনেকই ধকল গেছে। তা ছাড়া, রাতে আপনাদের আমি পিপ্পাল পাঁড়ের সঙ্গে টকরাতে যাবার জন্যে কখনওই ছাড়ব না। এ সখের শিকার নয় খোকাবাবুরা। এতে, জানকি খাতরা।

গোপাল রাগের গলাতে বলল, খোকাবাবুকো খোকাবাবু বলিয়ে গা। হামলোগোঁনে খোকাবাবু না হ্যায়।

তা বাঘ শিকারে কি জানকি খাতরা নেই?

আমি বললাম।

নাজিম সাহেব আমাকে ভেঁটে দিয়ে বললেন, আরে বাঘ তো ফাস-ক্লাস জেন্টিলম্যানই না হ্যায়! কিন্তু পিপ্পাল কী করতে পারে আর কী পারে না, তা কেউই বলতে পারে না। না, না। এক খোকাবাবুকে তো চালান করে দিলাম। কিছু একটা হয়ে গেলে আপনাদের মা-বাবাকে আমি কী বলব গিয়ে? খরগোস আর তিতির মারার নাম করে এসে ডাকাতের সঙ্গে টকরানো! ওই সব বদতমিজি করতে হয় তো নিজেরা একা একা এসে নিজেদের দায়িত্বে করবেন। নাজিম মিঞা উপস্থিত থাকতে ওই রকম দুঃসাহস বরদাস্ত করবে না। সাহস ভাল ছওড়াপুত্তান। দুঃসাহস কখনওই ভাল নয়। জবরদস্ত পুলিশসাহেব চ্যাটার্জিসাহেবের এতবড় ফোর্সই চোখের-জলে নাকের-জলে হয়ে গেল আর আপনারা তো বাচ্চা ছেলে। চালিয়ে, কাল হামলোগোঁনে ভি লটকে যায়েগা।

গোপাল মুখ গোঁজ করে বসে রইল। আমাদের না হল বাঘ মারা, না ডাকাতের সঙ্গে মোলাকাত।

তারপর?

তারপর আর কী? সেই যাত্রা হাজারিবাগ হয়ে কলকাতা ফিরে আসতে হল।

আমরা সবাই হতাশ হলাম ঋজুদার গল্প শুনে।

এ আবার গল্প হল নাকি!

ভটকাই বলেই ফেলল আমাদের সকলের মনের কথাটা।

হল না?

না। অ্যাকশান হল না, গুলি চলল না, কারওর খুপড়ি উড়ল না, গুলিতে হাত-পা খোওয়া গেল না একজনেরও, তো কীসের গল্প হল? ধ্যাত। সময়টাই নষ্ট হল আমাদের।

ঋজুদা হাসছিল।

বলল, সে যাত্রা দেবদর্শন হল না বলে কি পরেও আর কখনও হল না।

আমাদের এমন টেনশনে না-রেখে বলেই ফেলো না পুরোটা ঋজুকাকা!

তিতির বলল।

আরে ঘটনা যেমন যেমন ঘটেছিল আমি তো তেমন তেমনই বলব…না কী? আশ্চর্য তো!

আমি বললাম, আরে ধৈর্য ধরো না, হবে।

এমন সময়ে গদাধরদা চাকা-লাগানো ট্রলির ওপরে, চা-এর পেয়ালা পিরিচ আর চকোলেট-ক্রিম বিস্কিট নিয়ে এল। চা-এর পটে চা, দুধের পটে দুধ, চিনির পটে চিনিও নিয়ে।

আসা মাত্র তিতির কাজে নেমে পড়ল।

চা খাওয়া হলে ঋজুদা বলল, তখন আমার আর গোপালের ক্লাস টেন। টেস্ট পরীক্ষা দিয়েই অল্প ক’দিনের কড়ারে গেছিলাম। কলকাতা ফিরতেই স্কুল ফাইন্যাল পরীক্ষার আগে কোথাওই যাওয়া চলবে না বলে ফতোয়া জারি হল। অ্যাডিশনাল ম্যাথস পরীক্ষা যেদিন শেষ হল সেদিনই গোপালদের বাড়ির উলটোদিকে একটা মাদ্রাজি কফির দোকানে বসে দোসা আর কফি খেতে খেতে আমরা ঠিক করলাম, চাতরাতে যাব সোজা। সেখানে গোপালের বাবার বিড়িপাতার এক মস্ত ব্যবসাদার মক্কেল আছে। তার কাছে গিয়ে ডাকু পিপ্পাল পাঁড়ের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করব। আমি বললাম, নাজিম সাহেব প্রায়ই একটা কথা বলেন না, ‘গুরু গুড় চেলা চিনি। আমরা এবারে প্রমাণ করব যে প্রবাদটা সত্যিই।

আরও আগে বাড়ো ঋজুদা। সোজা চাতরাতে।

হ্যাঁ।

রেজাল্ট বেরোবার অনেকই দেরি। দু’জনে তো বন্দুক কাঁধে করে রাঁচি এক্সপ্রেস-এ চড়ে পড়লাম। তখনও হাটিয়াতে হেভি এঞ্জিনিয়ারিং-এর কারখানা হয়নি। রাঁচিতে নেমে রাতু রোড বাসস্ট্যান্ডে এসে চাতরার বাস ধরলাম। বিজুপাড়া হয়ে, কুরু হয়ে, চাঁদোয়া-টোড়ি হয়ে বাঘড়া বা জাবড়া মোড় হয়ে আমরা যখন চাতরাতে লগনপ্রসাদ অ্যান্ড কোং-এর গদিতে গিয়ে পৌঁছলাম তখন প্রায় সন্ধে হয় হয়। তখন তো আজকালকার মতো দ্রুতগামী বাস ছিল না। পথঘাটও ভাল ছিল না।

মাঝবয়সি লগনবাবু আমাদের খুব খাতির করে তাঁর অতিথিশালাতে ওঠালেন। ট্রেনে রাত জেগে এসেছি এবং সারাদিন বাসে এসেছি বলে গায়ে ব্যথা হতে পারে ভেবে দু’জনের জন্য দু’জন খিদমদগার ঠিক করে দিলেন। পুরি-সবজি তৈরি হতে লাগল। খাঁটি ঘিয়ের গন্ধে ভুরভুর করছিল চারদিক।

আমরা যে ডাকাতের সঙ্গে এনকাউন্টার করতে এসেছি তা তো আর ওঁকে বলিনি। বললে, গোপালের বাবা জেনে যেতেন। বলেছিলাম, শিকার করতেই যাচ্ছি।

লগনবাবু বললেন, আমি তো জৈন হচ্ছি, জীবনে মোশা ভি মারিনি মোশয়, শিকারের কিছু জানি না। আমি সফর আলির সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেব আর সঙ্গে দিয়ে দেব লটকাকে। ওদের নিয়ে যান আপনারা দু’জনে। আর একজন নোকর দিয়ে দেব রান্না-বান্না খিদমদগারি করার জন্যে। মিলিটারি ডিসপোজালের জিপটা নিয়ে যান। আপনারা দু’জনেই তো গাড়ি চালাতে জানেন।

ব্যস! ব্যস্! আর কিছুরই দরকার নেই।

আমরা একসঙ্গে বললাম।

রাতে খাওয়াটা জোর হল। নানারকমের আচার, আলুর চোকা, বেগুন ভাজা, কুলের চাটনি, তারপর রসগোল্লা আর রাবড়ি। তখন দুধ খাঁটি ছিল। আর চাতরার মিষ্টির খুব নামও ছিল। ঠিক হল, নাস্তা করেই আমরা বেরিয়ে পড়ব। বাঘড়া মোড় হয়ে সীমারিয়াতে গিয়ে সেখানে লগনবাবুর ব্রাঞ্চ অফিসেই থাকব।

বিড়ি হয় কেন্দু পাতা দিয়ে। জঙ্গলের কাজ শুরু হবে কিছুদিনের মধ্যে। তখন জঙ্গলের মধ্যে মধ্যেও নানা জায়গাতে ওঁদের ক্যাম্প পড়বে কেন্দু পাতা সংগ্রহর জন্যে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *