তিন
বিশ্বল সাহেব আর বালাবাবু ঋজুদার কথামত সাম্বপানির রাজপুরোহিত থেকে শুরু করে পাঁঠা জোগাড় এবং খিচুড়ির বন্দোবস্ত একেবারে নিখুঁতভাবেই করেছিলেন। চণ্ডীমন্দির পরিষ্কার করে ধোয়ামোছাও হল। কতদিন পরে মন্দিরের পুজো হল কে জানে! ঝিংকুপানির মানুষেরা যেন নিজেদের চোখ-কানকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না। ভাবতেই পারছিল না যে এমন অসম্ভবও সম্ভব হতে পারে।
পুজো ও খাওয়া-দাওয়া শেষ হতে হতে বিকেল হয়ে এল। হেমন্তর বেলা। তিনটে বাজতে না বাজতেই ঋজুদা গ্রামে ফিরে যাবার জন্যে তাড়া লাগাল।
ফেরার সময়ে ঋজুদা এবং আমি গাঁয়ের লোকেদের সঙ্গে ফিরলাম না। কেউ কেউ ভয় পাচ্ছিল। ঋজুদা গ্রামের প্রধানকে ডেকে বলল, কিচ্ছু হবে না। আমার দায়িত্ব। বাঘ এই মুহূর্তে নিজের ভবিষ্যতের চিন্তায় মগ্ন। এই ভিড়ের মধ্যে আজ সে মানুষ ধরে নিজের চিন্তা বাড়াবে না। শিকারির হাঁচিও সে চেনে। সে এখানে এখন থাকলেও সে যে এখানে নেই এই কথাটাই প্রমাণ করতে সে ব্যস্ত হয়ে থাকবে।
যারা বনে মানুষ, বনেই যাদের জন্ম, বনের মধ্যেই যাদের বড় হয়ে ওঠা, বনই যাদের জীবনের সবকিছু তারা ঋজুদার মত শহুরে মানুষের এমন ভয়ডরহীন বেপরোয়া ভাব দেখে অবাক হল। নিজেদের হারিয়ে-যাওয়া সাহস যে তারা ফিরে পেলেও পেতে পারে এমন এক আশার ভাব তাদের চোখেমুখে জ্বলজ্বল করতে লাগল।
ভটকাই বলল, চল রুদ্র। এবারে আমরাও নামি।
কিন্তু ঋজুদা ভটকাইকে বালাবাবুদের সঙ্গে কুচিলাখাঁই পাহাড়ের নিচের বাংলোতে ফিরে যেতে বলে বলল, আমি আর রুদ্র রাতটা এখানেই থাকব। কথাটা ভটকাই-এর বিশ্বাস হল না।
ঋজুদা বলল, যা! আর দেরি করিস না ভটকাই। কাল একদম ভোরে এক ফ্লাস্ক গরম চা নিয়ে বালাবাবুর সঙ্গে ঝিংকুপানিতে চলে আসিস। রাতে ঘুমো গিয়ে আরাম করে।
আমি তাহলে এলাম কেন? কী লাভ হল ছাই আমার এখানে এসে!
অত্যন্ত হতাশা আর বিরক্তির গলায় বলল ভটকাই।
হবে হবে। লাভ হবে। অধৈর্য হোস না। এখন যা বলছি তা শোন। লক্ষ্মী ছেলে। ভটকাইকে ক্ষান্ত করে বলল ঋজুদা।
আমার সঙ্গে একরকম ব্যবহার করছে ঋজুদা, যেন সমান সমান মানুষ আর ওকে ছেলেমানুষ বলে সবেতেই বাদ দিচ্ছে। এই ব্যাপারটাই ভটকাই-এর আরও খারাপ লাগল। আর কিছু না বলে অন্যদের সঙ্গে সে নেমে গেল শিকারগড় থেকে ঝিংকুপানির গ্রামের দিকে।
ঋজুদা বলল, রুদ্র, তুই গিয়ে বোস যে রক-শেলটারের মধ্যে বাঘ মৃতদেহের শেষাংশ রেখেছিল, তার বাইরে নিচের উপত্যকার দিকে চেয়ে থাকা কোনো বড় গাছের ওপরে। আর আমি থাকছি নবহতখানাতে। এখান থেকে শিকার-গড়ের চারধারেই নজর রাখা যাবে। গড়ের দেওয়াল আর তুই যেখানে বসে থাকবি সেই জায়গাতেও।
বলেই, আমার দিকে ফিরে বলল, কোনো ভয় নেই।
ওখানে দাঁড়িয়েই বললাম, কোন্ গাছটাতে বসব বল?
ওদিকে ভাল করে চেয়ে থেকে ঋজুদা বলল, ঐ কুরুম গাছটাতেই বোস। চাঁরগাছটা বেশি ঝুপড়ি।
কুরুম গাছটাও তো খুব ঝুপড়ি। ঐ গাছে বসে গুলি করব কী করে? রাইফেলের সঙ্গে লাগানো টর্চও তো নেই। আগে জানলে…
–সে তো আমার রাইফেলেও নেই। ঋজুদা বলল।
তারপরই বলল, আজ বাঘকে যদি তুই দেখতেও পাস, তাহলে গুলি করিস না।
-কেন?
আমি চাই না যে তুই এই বাঘের মোকাবিলা করিস। আমি যদি দেখতে পাই তবে গুলি করব। অবশ্য শর্ট-রেঞ্জের মধ্যে পেলেই। এবং আমার যদি তোর সাহায্যের দরকার পড়ে তবে তুই সাহায্য করিস। কিন্তু গাছ থেকে না নেমে। মনে থাকে যেন। এমন একটা ডালে বসিস যেখান থেকে নিচের উপত্যকা আর নবহতখানা দেখা যায়। আমাকে অবশ্য দেখতে পাবি না। আমি থাকব নবহতখানার মধ্যের অন্ধকারে মিশে। যাঃ। আর কথা নয়। বেলা পড়ে গেছে। সাবধানে যাস। ঐ গাছে পৌঁছবার পথেই বাঘের সঙ্গে দেখা হতে পারে। খুব সাবধানে যাবি। কাল সকালে দেখা হবে। গুড লাক।
আমি এগিয়ে যেতে যেতে বললাম, গুড হান্টিং।
ফটক দিয়ে নামলাম না। যে জায়গা দিয়ে গতকাল আমরা দুজনে উঠে এসেছিলাম সেই জায়গা দিয়েই নামলাম। গাছের ছায়ারা লম্বা হয়ে আসছে। ময়ূর ডাকছে উপত্যকা থেকে। হেমন্তের সন্ধ্যার সঙ্গে শীতের সন্ধ্যার অনেক তফাত। ভাল খারাপের কথা নয়। আলাদা আলাদা যে সেইটাই কথা। কিছুটা নামতেই মনে হল, রাত নেমে এসেছে। ঝুপঝুপ করে ছায়ারা শব্দহীন দ্রুত পায়ে এসে আমায় ঘিরে ফেলল। একটা পেঁচা হুড়ম-হাড়ম করে ডাকতে ডাকতে কোটর ছেড়ে হেলিকপ্টারের মত সোজা উঠে গেল ওপরে। কালো পাতাদের চাঁদোয়া ফুঁড়ে। রাইফেলে দু হাত ছুঁইয়ে আমি দ্রুত এগিয়ে যেতে লাগলাম ঋজুদার নির্দেশমত কুরুম গাছটার দিকে। ভীষণই ভয় করতে লাগল। ঋজুদার সঙ্গে অনেক বিপদেরই সম্মুখীন হয়েছি আমি। মানুষখেকো বাঘের মোকাবিলা আমি ঋজুদার সঙ্গে আগেও করেছি বনবিবির বনেতে। আফ্রিকার জঙ্গলের গুগুনোগুম্বারের দেশে এবং রুআহা নদীর উপত্যকাতেও। কিন্তু সেই সব বিপদ সম্বন্ধে আগে জানা থাকলেও নিনিকুমারীর বাঘ-এর মত এতখানি জানা ছিল না। এই বাঘ যেন রূপকথারই কোনো দৈত্য। ঠাকুরানীর কৃপাধন্য। এই বাঘকে কব্জা করা বোধহয় কোনো মানুষের পক্ষেই সম্ভব নয়। যারাই সেই স্পর্ধা দেখাবে তাদেরই মৃত্যু অনিবার্য। মনে স্বীকার করি আর নাইই করি, এরকম একটা ধারণা যেন কেমন করে ঢুকে পড়েছে আমার মনেও। নইলে ঋজুদা সঙ্গে থাকলে কোনো বিপদকেই বিপদ বলে ভাবিনি। মানুষের সঙ্গে বা জানোয়ারের সঙ্গে অবশ্যই লড়া যায়, তা তারা যতই ভয়াবহ বা হিংস্র হোক না কেন! কিন্তু লড়া যায় না ঈশ্বর বা ভূতের সঙ্গে।
একসময় নিজেরই অজান্তে সেই প্রায়ান্ধকারে গাছতলায় পৌঁছে চারদিক ভাল করে দেখে নিয়ে গাছে হেলান দিয়ে জুতো খুলে দুটো জুতোর ফিতেতে গিট মেরে রাইফেলের মত কাঁধে ঝুলিয়ে কুরুম গাছটাতে উঠে গেলাম। গাছটার গড়ন ঋজু। ভাল মোটা ডাল বেরিয়েছে বেশ ওপরে পৌঁছে। যাই হোক, যে ডাল বাইরে উপত্যকার দিকে ছড়িয়ে গেছে এবং যে ডাল থেকে আবার উপশাখা বেরিয়েছে, তেমন একটা মোটা ডাল বেয়ে এগিয়ে গিয়ে দুটো ডালের সংযোগের জায়গাতে ঘোড়ায় চড়ার মত বসলাম। গাছের নিচে রক-শেলটারের দিকে ঘন অন্ধকার। যদিও সূর্য ডুবতে এখনও আধঘণ্টার মত দেরি। রাতে যে চোখ একেবারেই চলবে না তা তখনই বোঝা গেল।
থিতু হয়ে বসে, স্লিংএ ঝোলানো রাইফেলটাকে পিঠ থেকে খুলে নিয়ে ঊরুর ওপরে রেখে জুতো দুটোকে একটা ডাল থেকে ঝুলিয়ে দিলাম। তারপর চারদিকে চেয়ে কুরুম গাছটার সঠিক অবস্থান বুঝে নেবার চেষ্টা করোম। চমৎকার দেখাচ্ছে এখন সমস্ত উপত্যকাটি। উপত্যকা পশ্চিমে। সূর্য চলেছে দিগন্তে। বোতল-সবুজ এবং শুয়োপোকা-রোমশ ঘন জঙ্গলের মধ্যে এখুনি হারিয়ে যাবে রাঙাজবা সূর্য। কনসর নদীর আঁকাবাঁকা শাখার রুপোগলা জলে সেই রঙ লেগেছে ছোপ ছোপ। অগণ্য পাখির ডাকে। কাকলিমুখর হয়ে উঠেছে নিনিকুমারীর বাঘের বাসভূমি। এখান থেকে শিকার-গড়ের নবহতখানাও দেখা যাচ্ছে। পশ্চিমের বিদায়ী আলো এসে থামে আর গম্বুজে পড়ে আসন্ন সন্ধ্যার আগে পুরো শিকার-গড়কে থমথমে রহস্যে মুড়ে দিয়েছে। শিকার-গড় থেকে মুখ ফিরিয়ে আবারও উপত্যকার দিকে দুটো মদ্দা এবং সাতটি মাদিন শম্বর নদী পেরিয়ে ওদিক থেকে এদিকে এল সার বেঁধে। জলের আয়না ভেঙে চুরচুর হয়ে গেল। বিলিতি ক্যালেণ্ডারের ছবির মত দেখাচ্ছিল ঐ সন্ধের আকাশ, বন, নদী আর উপত্যকার মধ্যের নদী পেরুনো শম্বরদের।
কতক্ষণ চেয়ে ছিলাম জানি না। কিন্তু চোখ যেই ওদিক থেকে আবার ফিরিয়ে শিকার-গড়ের দিকে ফেললাম, কে যেন হঠাৎ আলোর সুইচটা নিবিয়ে দিল। অন্ধকার গিলে নিল সবকিছু। জেগে রইল শুধু পশ্চিমাকাশে দিগন্তরেখার কিছুটা ওপরে শান্ত স্নিগ্ধ সবুজ সন্ধ্যাতারাটি।
চাঁদ উঠতে এখনও অনেক দেরি। এখন এই কুরুম গাছের চতুর্দিকে এমনই গাঢ় অন্ধকার যে নিজের হাত পা-ই দেখা যাচ্ছে না। চোখের পাতা খুলতে গেলেও চাপ চাপ অন্ধকার। দু-চোখের সামনে থেকে তা সরাতে ফিনফিনে চোখের পাতাদের কষ্ট হচ্ছে। এখন অবশ্য চোখের কোনো ভূমিকাই নেই। কানদুটোই চোখের কাজ করছে। এবং নাকও।
সেই যে শম্বরের দলটিকে নদী পেরোতে দেখেছিলাম দিনান্তবেলাতে তাদেরও কোনো সাড়া শব্দ নেই। অথচ তারা যেভাবে নদী পেরোল তাতে মনে হল সোজাসুজি এলে তারা আমি যে কুরুম গাছে বসে আছি তাতেই এসে ধাক্কা খেত। শিকারগড়ের ফটকের কাছাকাছি একজোড়া পেঁচা কিঁচিকিঁচি-কিঁচির কিঁচি-কিঁচর করে ঝগড়া করতে করতে পুরো এলাকা সরগরম করে তুলছিল মাঝে মাঝে। মনে হচ্ছিল, তাদের ঝগড়া যেন এ রাতে শেষ হবার নয়। আর উপত্যকাতে নদীর ওপার থেকে একটি কপারস্মিথ পাখি ডেকে যাচ্ছিল অবিরাম। টাকু-টাকু-টাকু-টাকু। তার সাথী সাড়া দিচ্ছিল নদীর ওপার থেকে। টাকু-টাকু-টাকু-টাকু। সেই দূরাগত ডাক নদীর জলে ব্যাঙবাজির মত পিছলে উঠে নিনিকুমারীর বাঘের রাজ্যের এই নিচ্ছিদ্র অন্ধকার রাতের নিস্তব্ধতা যে কতখানি অমোঘ এবং জমাট তাই প্রমাণ করছিল।
ঝিংকুপানি গ্রামেও কোনো শব্দ নেই এখন। এমন পাহাড়ী জঙ্গলে সোয়া কিমি দূরেও কুয়ো থেকে কেউ জল তুললে সেই শব্দ পরিষ্কারই শোনা যায়। গ্রীষ্মবনের গাছ থেকে একটি পাতা খসলে সেই পাতা ঝরার শব্দও পটকার শব্দর মতই কানে বাজে।
ঝিংকুপানি গ্রাম সন্ধে নামার সঙ্গে সঙ্গেই নিঃসাড়। ঘুমিয়ে যেন কাদা হয়ে আছে। অনেকদিন পর তাদের সাহস ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা আজ ঋজুদার কল্যাণেই জেগে উঠেছিল। কিন্তু রাত নামার সঙ্গে সঙ্গেই আবার সে সব ঘুমিয়ে পড়েছে। নিনিকুমারীর বাঘ একটা সাঙ্ঘাতিক মনের রোগও। সে রোগ অসুস্থ, বিবশ করেছে স্ত্রী-পুরুষ, বড়-ছোট, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সকলকেই, এই কথাটা ঋজুদা যথার্থই বুঝেছে। এবং বুঝেছে বলেই তার মোকাবিলা করার আগে এই রাহুকবলিত মানুষদের মনের চিকিৎসায় লেগেছে। অসংখ্য অগণ্য সব গল্প-গাথায় তাদের প্রত্যেকের মনের স্বাভাবিকতা বাদার ঝাঁঝির মত চাপা পড়ে গেছে। এই ত্রাস থেকে এখানের মানুষদের মুক্ত করতে পারলেই নিনিকুমারীর বাঘের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই আধখানাই জেতা হয়ে যাবে।
জমাট বাঁধা অন্ধকারের মধ্যে নিজের ভাবনাতে বুঁদ হয়ে বসেছিলাম। এমন সময় হঠাৎ গাছতলায় কী একটা আওয়াজ পেলাম। কান খাড়া করে বোঝার চেষ্টা করলাম। আওয়াজটা কিসের। পরক্ষণেই বিকট দুর্গন্ধে ভরে গেল পুরো জায়গাটা। হায়না! হায়না এসেছে বাঘের প্রস্তরাশ্রয়ে। জানে বোধহয় যে, এখানে মাঝে মাঝেই প্রসাদ থাকে তার জন্যে। এঁটো-কাঁটা খেতে যাদের আপত্তি নেই এবং এঁটোকাঁটা খেয়েই যারা বেঁচে থাকে তারা উচ্ছিষ্টর খোঁজ তো রাখবেই।
হেমন্তের শিশির ভেজা বনকে কিছুক্ষণ দুর্গন্ধে কলুষিত করে হায়না চলে গেল। বাঘের ডেরার এলাকা পার হয়ে যাবার পর উপত্যকার দিকে নেমে যেতে যেতে হায়নাটা পাহাড়ী নদী চমকিয়ে ডেকে উঠল-হাঃ হাঃ হাঃ! হুঃ হাঃ। হাঃ হাঃ। যারা কখনও রাতের বনে আচমকা এ ডাক শোনেনি তাদের পক্ষে তার ভয়াবহতা ধারণা করাও মুশকিল।
হায়না চলে যাবার পর অনেকক্ষণ চুপচাপ। কপারস্মিথ পাখিরা দূরের বনের নদীপারে ডেকে ডেকে থেমে গেছে। হেমন্তর বনের রহস্যময় রাতে এই পাখির ডাক বুকের মধ্যে এক ধরনের ছমছমানি তোলে। সমস্ত রাতকে এক মোহময় অপার্থিবতায় মুড়ে দেয়। মুর্শিদাবাদী বালাপোষের মত। অন্ধকার এখন গাঢ়তর। বাঘের কোনো চিহ্নই নেই। অন্ধকারের মধ্যে শিকার-গড়ের শিলাবপু নক্ষত্রখচিত সবুজাভ আকাশ মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাদুড়ের ডানার শপশপ আওয়াজ সেই পাথুরে নিস্তব্ধতাকে মাঝে মাঝে মথিত করছে।
ঘুম পাচ্ছে আমার। সেই ভোরে উঠেছিলাম। তারপর অবেলাতে খিচুড়ি আর কষা মাংসের ভোজটাও বড় গুরু হয়ে গেছিল। চোখের পাতা দুটো বুজে আসছে। কুরুম গাছের মোটা ডালে হেলান দিয়ে রাইফেলটাকে দুই ঊরুর ওপরে রেখে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম নিজেই জানি না।
হঠাৎই যেন কানের কাছে বোমা ফাটল। গাছের প্রায় নিচেই দড়াম করে একটা কোটরা আমাকে প্রায় হার্টফেল করিয়ে একবার ডেকেই হিস্টিরিয়া রোগীর মত বন-বাদাড় গাছ-পাহাড় ভেঙে ঝড়ের বেগে দৌড়ে পালিয়ে যেতে লাগল উপত্যকার নদীর দিকে। ডাকতে লাগল দৌড়তে দৌড়তে, বনের সব প্রাণীকে সাবধান করে দিতে দিতে। তার সেই ডাকের ওম্-এ এই শীতের রাতের অন্ধকারের ডিম ভেঙে যেন সাদা চাঁদ বেরল। ভিজে বনপাহাড় আস্তে আস্তে পাটিসাপটা রঙা হয়ে উঠতে লাগল। বাইরেটা একটু পরিষ্কার হতেই গাছতলার অন্ধকার আরও ঝুপড়ি হয়ে এল এবং আমার মন বলতে লাগল যে বাঘ গাছতলাতে এসে আমাকে মনোযোগ দিয়ে নিরীক্ষণ করছে। বাঘকে খুব কাছে হঠাৎ না দেখতে পেলে কোটরা হরিণটা অমন পাগলের মত করত না। নিনিকুমারীর বাঘ কি গাছতলায় আমার জন্যে অপেক্ষা করে থাকবে? নাকি তার পাথুরে আশ্রয়ে বেড়ালের মত শুয়ে আমাকে নজর করবে, কে জানে? যখন এই সব ভাবছি গাছতলার নিবিড় অন্ধকারের তুমুল সন্দেহের শিকার হয়ে, ঠিক সেই সময়েই হুড়-দাড় আওয়াজ করে ঝিংকুপানির দিক থেকে সেই হারিয়ে যাওয়া শম্বরের দল ঘ্বাক-ঘ্বাক করে ক্কচিৎ সংক্ষিপ্ত ডাক ডাকতে ডাকতে উপত্যকার দিকে নেমে যেতে লাগল। এতক্ষণে বুঝলাম যে তারা ঝিংকুপানির সীমানাতে কারও বিরিডালের ক্ষেতে গেছিল বিরি খেতে। বাঘের কথা কোটরার মুখে জানতে পেরেই হুড়মুড়িয়ে পালাচ্ছে এখন। তার মানে বাঘ যে আমার ধারে কাছেই আছে সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ভীষণই অস্বস্তি হতে লাগল আমার। ভয়ও যে হল না তাও নয়। যে বাঘের গল্প শুনেই হাত পা পেটের মধ্যে সেঁধোয় সে কাছে এলে আমা-হেন শিকারির অবস্থা যে শোচনীয় হবেই, তাতে আর সন্দেহ কি?
কিন্তু বাঘের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হল এই যে, কাছে এসেও সে যে এসেছে একথা জানা না দেওয়া। বনের প্রাণীরাও বোঝে অনেকই দেরিতে। এই সব ভাবছি যখন, ঠিক তখনই বাঘের গন্ধও পেলাম মনে হল! ঠিক কিনা জানি না। মনের ভুলও হতে পারে। নিনিকুমারীর বাঘের রাজ্যে অনেকক্ষণ অন্ধকারের মধ্যে বসে, অন্ধকারের মধ্যে কান পেতে, অন্ধকারের দিকে চেয়ে থেকে আমার মন আর মনে ছিল না। কিন্তু তারপর আর কিছুই ঘটল না। না কোনও শব্দ হল, না কোথাও নড়াচড়া। অনিশ্চয়তায় ভরা আশা আর আশঙ্কা করতে করতে একসময় এমনই হল যে কিসের আশা বা আশঙ্কা করছিলাম তাই ভুলে গিয়ে আবার ঢুলতে আরম্ভ করলাম ঘুমে। চাঁদ জেগে রইল একা। দূরের নদীর শব্দ জোর হতে লাগল বন নিস্তব্ধতর হতেই।
হঠাৎই শিকার-গড়ের চণ্ডীমন্দিরের ঘণ্টাগুলো দারুণ জোরে এলোমেলো ভাবে বেজে উঠল। প্রায় মিনিট দু-তিন আগে-পরে জোরে-আস্তে বেজে গেল পুবের আকাশে অন্ধকার ফিকে হতে শুরু হবার সঙ্গে সঙ্গে। ভীষণই ভয় করতে লাগল আমার। নিনিকুমারীর বাঘ কি সত্যিই তবে ঠাকুরানীর বাঘ? আমি, সাউথ ক্যালকাটার রুদ্র রায়ও কি ঝিংকুপানির হাড় জিরজিরে পেটফোলা কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষদেরই মত সেকেলে হয়ে গেলাম?
চণ্ডীমন্দিরের ঘণ্টাধ্বনিতে বোধহয় দিন-পাখিরা সব জাগতে লাগল একে একে। হাজার গলার সুরে সুর মিলিয়ে তারা যেন শিকার-গড়ের চণ্ডীঠাকুরের আরাধনা শুরু করে দিল! কী চিকন মিষ্টি অথচ জোরাল তাদের গলার স্বর। কে যেন এত বিভিন্ন রূপের বিভিন্ন স্বভাবের বিভিন্ন স্বরের পাখিদের সৃষ্টি করেছিল জানি না। তবে তিনি যে হোন না কেন, তাঁর পায়ে প্রণাম জানালাম। বনে-পাহাড়ে রাত কাটালে এই সময়ে, রাত শেষ হয়ে ভোর আসার মুহূর্তটিতে মায়ের গলায় বহুবার শোনা রবীন্দ্রনাথের এই গানটির কথা মনে পড়ে আমার। আহা কী গান! সমস্ত শরীর মনে কী যেন কি একটা হয় এই গানটা মনে করলেই!
প্রাণের প্রাণ জাগিছে তোমারি প্রাণে,
অলস রে, ওরে, জাগো জাগো ॥
শোনো রে চিত্তভবনে অনাদি শঙ্খ বাজিছে–
অলস রে, ওরে, জাগো জাগো ॥
ঋজুদাকে নহবতখানা থেকে নামতে দেখলাম যখন তখনও সূর্য ওঠেনি, যদিও চারদিক পরিষ্কার হয়েছে। যতক্ষণ না গাছের নিচে ভাল করে নজর চলে ততক্ষণ অপেক্ষা করে একটু একটু করে নেমে শেষে গাছের নিচে এসে পৌঁছলাম। রক-শেলটারের দিকে তাকালাম। রাতের অন্ধকারে কত কিছুই কল্পনা করছিলাম। কত অবয়ব, কত বিপদ। বনের মধ্যে রাত কাটানোর পর সকাল যেন পৃথিবীর সব প্রসন্নতা নিয়ে এসে হাজির হয়।
সাবধানে এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঐ জায়গা ছেড়ে এসে পরিষ্কার জায়গাতে দাঁড়ালাম ঋজুদার অপেক্ষায়। ঋজুদা গড়ের প্রধান ফটকের কাছে দাঁড়িয়ে পাইপ ধরাচ্ছিল। আমাকে দেখে একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে নেমে এল। শুধোলাম, মন্দিরের ঘণ্টাগুলো ভোর হবার আগে অমন করে বাজল কী করে?
ঋজুদা হাসল, উত্তর না দিয়ে।
বলল, গেস্ কর। ভেবে দ্যাখ কে বা কারা বাজাতে পারে।
সারা রাত গাছের ডালে ঘোড়সওয়ার হয়ে বসে থেকে আর অন্ধকারে চারদিকে নিনিকুমারীর বাঘ দেখতে দেখতে আমার মস্তিষ্ক তখন আর কাজ করছিল না। সারেন্ডার করে বললাম, জানি না।
ঋজুদা বলল, বাদুড়। ভোর হওয়ার আগেই তারা ফিরে এসে ঘণ্টাগুলো যে লম্বা শিকল দিয়ে বাঁধা থাকে, তাতে এসে ঝুলে পড়ল। তাই ঐ ঢং-ঢঙা-ঢঙ। তারপরই নিজের মনে বলল, চল, তাড়াতাড়ি নামি নিচে। দেখি, ভটকাই চা নিয়ে এল কিনা?
নিচে নেমে দেখলাম তখনও বালাবাবু জিপ নিয়ে আসেননি। তবে এসে পড়বেন এখুনি। ভোর তো এই হল সবে। গ্রামের মধ্যে থেকে শব্দ আসছে নানারকম। চারপাশে বনমোরগ, ময়ূর, তিতির, বটের হরিয়াল, ঘুঘু, নানারকম ফ্লাইক্যাচার আর মৌ-টুসকি পাখিদের সম্মিলিত ডাকে একেবারে সরগরম হয়ে উঠেছে পুরো অঞ্চল। আমরা গিয়ে যখন গাছতলায় বসলাম তখন গ্রামের ঘরগুলোর দরজা একে একে খুলছে। দু-একজন এসে আমাদের জিজ্ঞেস করল, কী হল রাতে?
ঋজুদা বলল, গ্রামের দিকে বাঘ কি এসেছিল কাল রাতে?
সকলেই বলল, না। কিন্তু আপনারা কী দেখলেন?
–কিছু না।
–তবে সারারাত কষ্ট করে গাছে বসে রইলেন কেন? কোনো মড়ি বেঁধে বসলেও না হয় কথা ছিল। জগবন্ধুর বৌয়ের শরীরের কিছু তো আর বাকি ছিল না।
ঋজুদা বলল, জায়গাটা সম্বন্ধে একটু ধারণা করার জন্যে বসেছিলাম। বাঘ যে এখানে নেই এবং আসবে না তা জেনেও। এ বাঘ তো যে-সে বাঘ নয়! ঋজুদা যখন এসব কথা বলছে, ঠিক তখনই আমরা যে পথ দিয়ে নেমে এলাম শিকার-গড় থেকে, সেই পথ দিয়ে একটা ছোটখাটো লোক হাতে একটা গরু চরাবার লাঠি নিয়ে প্রচণ্ড দৌড়ে, দৌড়ে না বলে উড়েই বলা ভাল, আমাদের দিকে নেমে আসছিল। ক্রমশই তার চেহারা বড় হতে লাগল। ততক্ষণে অন্যদিক থেকে দূরাগত জিপের এঞ্জিনের ক্ষীণ আওয়াজও শোনা যেতে লাগল।
কাছে আসতে দেখলাম লোক নয়, একটা দশ-বার বছরের ছেলে। গায়ে সাজিমাটির কাঁচা হলুদ রঙের একটা জামা, মাথায় ফেটে-যাওয়া গামছা। ছেলেটা হাঁপাচ্ছিল।
ঋজুদা বলল-কউটি আসিলুরে তু পিলা?
হাঁপাতে হাঁপাতে সে শিকার-গড় ফুড়ে তার তর্জনী নির্দেশ করে বলল, সুঝানি।
-হেল্বা কঁড়?
মা বাপ্পাটাকু সে বাঘ্বটা কাল রাতবেলে আম্মা ঘর ভাঙ্গিকি নেই গলে।
বলেই, বাবু-উ-উ-উ বলে এক বুকফাটা আর্তনাদ করে ছেলেটি ঐ হিমপড়া লাল ধুলোর রাস্তায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল।
এমন সময় বালাবাবু আর ভটকাই জিপ থামিয়ে মস্ত ফ্লাস্কে চা নিয়ে নেমে এল।
ঋজুদা ঐ ছেলেটাকে দুহাতে তুলে ধরে জিপের সামনের সিটে বসাল। ফ্লাস্ক থেকে গরম চা ঢেলে সবচেয়ে আগে ওকে দিল।
ছেলেটিকে অমনভাবে দৌড়ে আসতে দেখে ঝিংকুপানির কিছু মানুষও এসে জিপ ঘিরে দাঁড়িয়েছিল। বালাসাহেব ওদের সঙ্গে ভাল করে কথা বলে সব জেনে নিলেন। ওদের সুঝনি গ্রাম ঠিক শিকার-গড়ের উল্টোপিঠে নয়, আরও গভীরে। সেখানে জঙ্গল অত্যন্ত গভীর। সে গ্রামে মাত্র আট-দশ ঘর মানুষের বাস। ওরা তামাক পাতা আর সর্ষের চাষ করে শুধু। ছেলেটার নাম যুধিষ্ঠির। তার বাবার নাম দশরথ। তার মত সাহসী, সৎ আর পরিশ্রমী মানুষ নাকি এ তল্লাটে ছিল না। এমন দুর্দিনেও যারা নিনিকুমারীর বাঘটে ডোন্টকেয়ার করে এসেছে তাদের মধ্যে সে অন্যতম। আর বাঘে কিনা শেষে তাকেই নিল। তাও তার ঘর ভেঙে।
বালাবাবু বললেন, আশ্চর্যের কথা স্যর, আজ অবধি ঐ সুঝানি গ্রামে কোনো কিল হয়নি।
ঋজুদা অত্যন্ত অপ্রস্তুত হয়ে পড়ছিল। আমারও মনে হচ্ছিল গোড়াতেই ঋজুদা একটু ওভার-কনফিডেন্ট হয়ে পড়ে নিনিকুমারীর বাঘকে যতখানি গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিল তা দেয়নি। তার গুনাগার আমাদের গুনতে হবে।
ছেলেটাকে গরম চা আর কিছু খাবার খাইয়ে চাঙ্গা করার চেষ্টা করছিলেন বালাবাবু। কিন্তু কোনো খাবারই সে ছুঁল না। বাচ্চা ছেলে, মাঝে মাঝেই হাউ হাউ করে কেঁদে উঠছিল। ওর মা মারা গেছেন দু বছর আগে, ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়াতে।
ঋজুদা বালাবাবুকে জিজ্ঞেস করল, সুঝানি গ্রামে জিপ চালিয়ে যাওয়া যাবে?
–হ্যাঁ। নদী পেরিয়ে যেতে হবে।
কত মাইল পড়বে? কতক্ষণ লাগবে যেতে?
কাক-উড়ানে গেলে মাইল তিন কী চার, কিন্তু জিপে গেলে তো ঘুরপথে যেতে হবে। তা মাইল দশেক পড়বে।
–ওখানে গেলে আমাদের সাহায্য করার জন্যে মানুষজন পাব?
–না পাবারই কথা। ছোট গ্রাম।
–এ গ্রাম থেকে কয়েকজন কি যাবে আমাদের সঙ্গে?
বালাবাবু গ্রামের ভেতরে গিয়ে প্রধানের সঙ্গে কথা বলে এসে গম্ভীরভাবে মাথা নাড়লেন। বললেন, ঠাকুরানীর বাঘকে চটানো ঠিক হয়নি বলে এদের সকলের ধারণা। তখন কিছু না বললেও চণ্ডীমন্দিরে পুজো আর শিকার-গড়ের চত্বরে পিকনিক করাটা ঝিংকুপানির মানুষেরা মোটেই ভাল মনে নেয়নি। এ বাঘ ঠাকুরানীর বাঘ। একে ছোট করে দেখার জন্যে আপনাদের নাকি এখন অনেক শাস্তি পেতে হবে।
ঋজুদা পাইপটা থেকে ছাই ঝাড়তে ঝাড়তে বলল, ম্যানইটার বাঘ পরপর দু’দিন এত কাছাকাছি গ্রামে মানুষ মারে এমনটা শুনিনি। দেখিওনি কখনও। ভেরি স্ট্রেঞ্জ! এবারে আমার…
কী? আমি বললাম।
মে বী, মাই লাক ইজ রানিং আউট। চল যুধিষ্ঠির। আমাদের সঙ্গে জিপে ওঠ। আমরা তোর গ্রামে যাব।
যুধিষ্ঠিরের দুচোখে কৃতজ্ঞতা আর প্রতিশোধের দীপ্তি ফুটে উঠল। বলল, আমার বাবা তিনদিন ধরে জ্বরে বেহুঁশ হয়ে ছিল। বাঘটা তো আমাকেও নিতে পারত?
ঋজুদা আর কথা না বাড়িয়ে নিজেই স্টিয়ারিঙে বসল। বালাবাবু আর যুধিষ্ঠির বসল সামনে। আমাদের পেছনে বসতে বলল ঋজুদা। তারপর জিপ স্টার্ট করে কিছুটা পেছনে গিয়ে বালাবাবুর নির্দেশে একটা বছরের পর বছর ধরে অব্যবহৃত পাতাচাপা পথে জিপ ঢোকাল।
–রাস্তা কেমন?
সাবধানে, আস্তে আস্তে চলুন। মাঝে দু জায়গায় রাস্তা কাটা ছিল। বুদ্ধি করে বেরোতে হবে।
আমার দুচোখ ঘুমে বন্ধ হয়ে আসছিল। ভটকাই-এর কাঁধে মাথা রেখে আমি ঘুমিয়ে পড়লাম।
.
অব্যবহৃত পথ দিয়ে জিপটা এঁকে বেঁকে এগিয়ে যাচ্ছিল। তখনও পথের ধুলো এবং গাছপালা শিশির ভেজা। চোখ বন্ধ করেই শুনতে পেলাম কঁক কঁক করে একদল বন-মুরগি ডানদিক থেকে বাঁদিকে গেল পথ পেরিয়ে। ঋজুদার জিপ প্রায় তাদের গায়ের ওপর দিয়েই চলে গেল। তবে মুরগি সচরাচর গাড়ি চাপা পড়ে না। পোষা মুরগিও না। ভটকাই আমার পেটে খোঁচা মেরে বলল, জাঙ্গল ফাউল। জাঙ্গল-ফাউল!
একবার খুলেই আমি আবার চোখ বন্ধ করে ফেললাম।
মিনিট পনেরো সেকেণ্ড ও থার্ড গিয়ারে যাওয়ার পর নদীতে এসে নামল জিপ। নদী পেরোবে এবার। সামনের চাকা দুটো জলে নামল বালি মাড়িয়ে, তার পর স্পেশাল গিয়ার চড়াল ঋজুদা বিশেষ সাবধানতা হিসেবে। দরকার ছিল না কোনও। ফার্স্ট গিয়ারেই এই হাঁটু জল পেরিয়ে যেত জিপ অনায়াসে। মাঝনদীতে হঠাৎ একটা ঝাঁকুনি দিয়ে থেমে গেল জিপ। ঋজুদা ব্রেক করেছিল। তাড়াতাড়ি চোখ মেললাম।
যুধিষ্ঠির বলল ঋজুদাকে, আউটিক্কে আগরু চালুন্ত। ভল্ব দিশিছি না এট্টু।
নদীটা পারই করে নিল ঋজুদা। তারপর ওপারে উঠে উঁচু ডাঙাতে দাঁড় করালো জিপটাকে। আমরা সবাই নামলাম। নদীর ডানপাড়ে খুব ঘন বাঁশজঙ্গল। ঘন সবুজ বাঁশপাতায় সকালের রোদ এসে পড়েছে। ভোরের ফিনফিনে কনে হাওয়াতে বাঁশে বাঁশে ঘষা লেগে কটকটি উঠছে। ছোট ছোট মৌটুসকি পাখি উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে এদিক। ওদিক ফুলে ফুলে মধু খেয়ে। ছায়াচ্ছন্ন ঝোপে, লজ্জাবতীর ঝাড়ে, হুড়োহুড়ি উঠছে।
ফিরে তাকিয়ে দেখলাম, বাঁশ জঙ্গলের বাঁ পাশে একটা শিমুল গাছের ডালে সার সার শকুন বসে আছে। ঋজুদা, যুধিষ্ঠির ও আমার সঙ্গে চোখাচোখি হল। ঋজুদা ফিসফিস করে বলল বালাবাবুকে, জিপটা আপনি একটু এগিয়ে নিয়ে পথের দু’পাশের ফাঁকা জায়গা দেখে অপেক্ষা করবেন। আমরা আসছি।
ভটকাই উৎসুক চোখে তাকাল ঋজুদার দিকে।
ঋজুদা ওর উৎসাহে জল ঢেলে বলল, তুই জিপেই যা।
আমরা তিনজনে এগিয়ে গেলাম। জিপটাও এগিয়ে গেল পথ ধরে। যদিও নামেই পথ। এ পথে মানুষজন বড় একটা চলে না আজকাল। পথের মধ্যে ডাল পাতা স্তূপীকৃত হয়ে আছে। একটু এগোতেই নদীর বালিতে নিনিকুমারীর বাঘের পায়ের দাগ দেখা গেল একটা শম্বরের দলের পায়ের দাগের ওপরে। কাল রাতের দলটি। শকুনরা যেদিকে মুখ করে বসেছিল সেদিকে সাবধানে এগোতে লাগলাম আমরা। শম্বরের বাচ্চা একটি। বছরখানেক বয়স হবে। অর্ধেকটা খেয়েছে। কিন্তু তার গলার দাগ দেখেই বোঝা গেল যে তাকে মেরেছে একটি মাদী চিতা বাঘে। মাঝারি সাইজের চিতা। যেটুকু আছে তাতে সে রাতে ফিরবে। এখন নিশ্চয়ই কাছাকাছি কোথাও রোদে শুয়ে আছে
ঋজুদা যুধিষ্ঠিরকে বলল, জীবি। এটি দেখিকি কঁড় হেব্ব?
চালুন্ত। স্বগতোক্তির মত বলল যুধিষ্ঠির।
ফিরে যেতে যেতে মড়ির কাছে চিতাটার পায়ের দাগ দেখতে পাওয়া যায় কিনা খুঁজলাম আমি। একটু পর পেয়েও গেলাম। নিনিকুমারীর বাঘের নদী পেরুনোর সঙ্গে এই চিতাটার হরক-এর কোনো মিল নেই। চিতাটা এসেছে এ-পারের গভীর জঙ্গল থেকে। এসে শম্বরের দল যখন নদী পেরোয় তখন এই বাচ্চাটিকে ধরে। ঋজুদা ক্যানাইন দাঁতের দূরত্ব দেখে বুঝেছিল এ চিতা খুব বড় নয়। আমি থাবার দাগ দেখে বুঝলাম।
ঋজুদা শিস দিল। অনেকটা এগিয়ে গেছে ঋজুদা ও যুধিষ্ঠির।
ওদিকে যেতে যেতে ভাবছিলাম নিনিকুমারীর বাঘ যদি শেষ রাতে নদী পেরিয়ে এ-পারে এসে থাকে তবে সুঝানি গ্রামে গিয়ে সে যুধিষ্ঠিরের বাবা দশরথকে ধরল কখন?
আমি শুধোলাম ওর কাছে গিয়ে, কখন ধরেছিল বাঘ? তোমার বাবাকে?
শেষ রাতে।
ঋজুদা বলল, তবু। ক’টার সময় আন্দাজ।
–এই তিনটে হবে।
বাঘটাকে তুমি নিজে দেখেছিলে?
–না বাবু। বাবা শেষ রাতে দরজা খুলে বাইরে গেছিল। হাতে কেরোসিনের কুপি নিয়ে। কাছেই গেছিল। বাড়ির সামনেই। জ্বরে কোঁকাচ্ছিল বাবা। আমি বললাম, সঙ্গে যাব? বাবা বলল না, না। তুই শো। আমার জন্যে দু’রাত ঘুম হয়নি তোর।
বলেই, কেঁদে ফেলল যুধিষ্ঠির।
আমি থমকে দাঁড়ালাম। এখান থেকে সকালের রোদ-পড়া শিকার-গড়কে কী সুন্দর দেখাচ্ছে গভীর জঙ্গলের মধ্যে মধ্যে। এই জায়গা দিয়েই কাল আমরা গাছ থেকে শম্বরের দলকে নদী পেরিয়ে আসতে দেখেছিলাম। গাছ থেকে এই সুন্দর নদীকে অস্তগামী সূর্যর আলোয় কী বিধুর দেখাচ্ছিল, আর এখন সদ্য উদিত সূর্যর আলোকে কী সুন্দরই দেখাচ্ছে!
জিপে উঠে ঋজুদা শুধোল যুধিষ্ঠিরকে, বাবাকে যে নিনিকুমারীর বাঘে নিল তা তুমি জানলে কী করে?
যুধিষ্ঠির বলল, বাবা বাইরে যাওয়ার পরই আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। দরজাটা ভেজিয়ে গেছিল বাবা। হঠাৎ আমার খুব শীত করতে লাগল। ঘরের মধ্যে আগুনও নিবে এসেছিল। হঠাৎ ঘুম ভেঙে আমি দেখি, ঘর অন্ধকার। বাবা নেই। দরজাটা খোলা। ফাঁক দিয়ে চাঁদের ঘোলাটে আলো এসে পড়েছে মাটির বারান্দায়। আমি টাঙ্গিটা হাতে নিয়ে বাবা বলে ডেকে দরজার কাছে এসে দাঁড়ালাম। দেখলাম, বাবা কোথাও নেই। ভাবলাম, হিসি করতে গিয়ে বুঝি অজ্ঞান হয়ে পড়ে-উড়েই গেল। তাই ঘরে ফিরে আগুনটাকে নতুন কাঠ দিয়ে জোর করে একটা জ্বলন্ত কাঠের টুকরো হাতে নিয়ে আমি বাইরে গিয়ে আশপাশে বাবাকে খুঁজলাম। বাবাকে পেলাম না, কিন্তু যে জায়গায় বাঘ বাবার ঘাড় কামড়ে নিয়ে গেছিল বাবাকে, সেই জায়গায় ধস্তাধস্তির দাগ আর জানোয়ারের। পায়ের দাগ ছিল। কুপিটা নিবে গেছিল। উল্টো হয়ে মাটিতে পড়ে ছিল।
–তুমি কী করলে তখন? যখন দেখলে যে,..
–আমি চেঁচিয়ে প্রতিবেশীদের বললাম, আমার বাবাকে বাঘে নিয়ে গেছে। তোমরা সব ওঠো। আমরা খুঁজতে যাই। কিন্তু কেউ সাড়াও দিল না। ওদের দোষ নেই। আমরাও সাড়া দিতাম না পাশের ঘরের মানুষ নিলে। নিনিকুমারীর বাঘ তো শুধু বাঘ নয়। সে যে ঠাকুরানীর বাঘ!
কিছুক্ষণ পর আমরা সুঝানি গ্রামে এসে পৌঁছলাম। যুধিষ্ঠিরের বাড়িতে পৌঁছে মহা সমস্যা দেখা গেল। আমি আর ঋজুদা দুজনেই খুব ভাল করে যুধিষ্ঠিরের বাবাকে যেখানে বাঘে ধরেছিল তার চারপাশের নরম মাটির ওপরে পায়ের দাগ পরীক্ষা করলাম, কিন্তু নিনিকুমারীর বাঘের পায়ের দাগ সেখানে ছিল না। ছিল একটা বুড়ো মদ্দা চিতা বাঘের পায়ের দাগ।
ঋজুদা ভটকাইকে বলল, ভটকাই! আর চা আছে নাকি?
ভটকাই চা ঢেলে দিল সকলকে। নিজেও নিল। ততক্ষণে সুঝানি গ্রামের কয়েকজন লোক এসে আমাদের ঘিরে দাঁড়িয়েছে। জিপের শব্দ শুনে বহুদূর থেকে তারা জমায়েত হচ্ছিল। বাচ্চাদের ও মেয়েদের দেখে মনে হল ওরা এর আগে কখনও জিপ গাড়ি দেখেনি।
লোকজন স্বাভাবিক কারণেই চিন্তিত। গ্রামের কোনো লোককে আগে কখনও মানুষখেকো বাঘে ধরেনি। তার ওপরে ঠাকুরানীর বাঘে। ঋজুদা যখন বোঝাতে গেল যে এটা বাঘ নয় চিতা, তখন ওরা সে কথা উড়িয়েই দিল। বলল, পায়ের দাগে কী আসে যায়? নিনিকুমারীর বাঘ নানারকম মূর্তি ধরে আসে। সে যে ঠাকুরানীর বাঘ!
ঋজুদা বলল, চল্ রুদ্র! ড্র্যাগ-মার্ক ফলো করে দেখা যাক। বোঝা যাচ্ছে এখানে একাধিক ম্যানইটার আছে। এই অঞ্চলের মানুষদের মনে নিনিকুমারীর বাঘ যে এখন ঠাকুরানীর স্নেহধন্য হয়ে গেছে তার ওপরেই সব দায়িত্ব চাপছে। একদিকে মানুষের মনের এরকম অবস্থা, আমাদের সঙ্গে সহযোগিতাও এরা কেউই আর করবে বলে মনে হচ্ছে না। অন্যদিকে মানুষখেকো বাঘ আর চিতা। অবস্থা সত্যিই গোলমেলে। ভটকাইকে এবারেও বালাবাবুর সঙ্গে থাকতে হল। অবস্থা যা দাঁড়াচ্ছে তাতে ভটকাইয়ের এবারে আসাটা সত্যিই ঠিকঠাক হয়নি। মঘা কী অশ্লেষা কী বারবেলা কিছু একটা নিশ্চয়ই ছিল ভটকাইয়ের যাত্রার সময়ে, নইলে এমন করে বেচারির যাত্রা নাস্তি হত না। কী যে ছিল তা ওর দিদিমার কাছেই খোঁজ নেওয়া যাবে কলকাতায় ফিরে। আপাতত কিছুই করণীয় নেই।
স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেল কাছেই, একটা পাহাড়ী ঝর্ণার ধারে। ঝর্ণাটা যেখানে আরম্ভ হয়েছে, সেখানে চিতার পায়ের দাগ, মৃত দশরথের শরীরের দাগ, ইতস্তত ছিটকে যাওয়া নুড়ি-পাথর আর বিধ্বস্ত সর্ষে গাছ দেখে মনে হল দশরথকে নিয়ে চিতাটা পড়ে গিয়েছিল এই ঝর্ণায়। নিজের ইচ্ছেয় সে যদি ঝর্ণায় নামত তার দাগ হত অন্যরকম।
ঋজুদাকে সে কথা বলতেই, ঋজুদা বলল ঠিক বলেছিস রুদ্র। আমিও লক্ষ করেছি। ব্যাপার কী ঠিক বুঝছি না।
ঝর্ণাটার বুকে নরম সবুজ ঘাস গজিয়ে গেছে বর্ষার পর। দু পাশে কমলা রঙের ফুল ফোঁটা পুটুস। তিক্ত কটু গন্ধ বেরুচ্ছে তখনও শিশিরে ভিজে-থাকা পাতাগুলি থেকে। প্রায় গজ পঁচিশেক নিচে ঝর্ণার মধ্যে একটি দহমত আছে। অনেক বড় বড় পাথরের স্তূপ চারপাশে আর নিচটা মসৃণ। সূক্ষ্ম বালুকণাময় সেই দহের মধ্যে চিতাটা যুধিষ্ঠিরের বাবাকে রেখেছে পুটুস ঝোপের নিচে, যাতে শকুনের চোখ না পড়ে। কিন্তু আশ্চর্য! শরীরের একটুও খায়নি সে। সেই জায়গাটাও ভাল নিরীক্ষণ করে এবং যে ভঙ্গিতে দশরথের শরীরটা পাকিয়ে মুচড়িয়ে পড়ে আছে তাতে মনে হচ্ছে দশরথকে কামড়ে ধরে থাকা অবস্থাতেই চিতাটা ওপর থেকে সোজা হুড়মুড় করে গড়িয়ে এসে এই দহতে আটকে গেছে।
মাচা বাঁধার মত গাছ কাছাকাছি নেই। এই দহের ওপরের দিকে সর্ষেক্ষেতের কোণে একটি মিটকুনিয়া গাছ আছে। আর ঝর্ণার দহের হাত পনেরো-কুড়ি দূরে পাহাড়ের গা থেকে সোজা উঠে আসা একটি মস্ত কুসুম গাছ।
ঋজুদা আমাকে বলল যুধিষ্ঠিরকে সঙ্গে নিয়ে অন্যান্য লোকদের সঙ্গে আমি যেন যুধিষ্ঠিরের বাড়ি ফিরে যাই। দশরথের শরীরের কোনও অংশ আজ দেওয়া যাবে না। অসম্ভব না হলে পুরো শরীরই ও পাবে কাল দাহ করার জন্যে। যুধিষ্ঠিরের কোনো প্রতিবেশীর বাড়িতে কিছু খাওয়াদাওয়া করে নিয়ে তুই এখানেই ঘুমিয়ে নে। মাচা বাঁধতে হবে কুসুম গাছটাতে। আমার ধারণা এবং পায়ের দাগও তো তাই বললো; চিতাটা উঠে আসবে নিচ থেকেই। ঝর্ণার রেখা ধরে সে নিচেই গেছে। কিন্তু মানুষ ধরার পরও সে কেন যে একটুও খেয়ে গেল না, সেটাই রহস্য। যাই হোক, তুই ভটকাইকে নিয়ে এসে ঐ কুসুম গাছের মাচাতে বসবি বিকেল বিকেল।
–আর তুমি?
আমি এখুনি বালাবাবুকে নিয়ে চলে যাব যেখানে নিনিকুমারীর বাঘ নদী পেরিয়েছে সেখানে। বালাবাবু আমাকে নামিয়ে দিয়েই আবার তোদের কাছে ফিরে আসবেন। কাল সকালে তোরা আবার আমাকে ঐ নদীর কোল থেকেই তুলে নিবি। কাল সারা দিনরাত বাংলোতে গিয়ে বিশ্রাম। পরের কথা পরে ভাবা যাবে।
–তোমার যাওয়াটা কি খুবই দরকার?
–হুঁ। ঋজুদা বলল।
-মানুষখেকো চিতার অপেক্ষায় মাচার নিচে মরা মানুষ নিয়ে গাছে বসাটা ভটকাইয়ের অ্যাপ্রেন্টিসশিপগিরির প্রথম রাতের পক্ষে একটু বেশি ডোজ হয়ে যাবে না?
হলে হবে। জেনেশুনেই তো এসেছে। তাছাড়া ওর বয়সী ছেলেরা ভিয়েতনামের যুদ্ধ লড়েছে, আরব আর ইজরায়েলে আজও লড়ছে। মানুষ হতে হলে হবে। নইলে বাঘের পেটেই যাবে। এমন অ্যাডভেঞ্চারের সুযোগই বা ওর বয়সী কলকাতার কটি ছেলে পায়? ও খুব খুশিই হবে। তুই বেশি গার্জেনি করবি না ওর ওপর। তবে মাচায় নিয়ে যাবার আগে সব শিখিয়ে-পড়িয়ে নিস।
ঐ জায়গা থেকে ফিরে আসার আগে ঋজুদা বলল কুসুম গাছটার দিকে চেয়ে, মাচাটা যেন মাটি থেকে কমপক্ষে হাত পনেরো উপরে হয়। ভটকাইকে নিয়ে বসবি সে কথা মনে থাকে যেন! আর ভুলে যাস না চিতা এবং বিশেষ করে মানুষখেকো চিতা নিঃশব্দে গাছে চড়তে পারে। খুব সাবধানে এবং অনড় হয়ে থাকতে হবে সারা রাত। মনে করিয়ে দিলাম।
ঝর্ণাটা বেয়ে উঠে আসার সময়ে ঋজুদা বলল, কিল কিন্তু চিতাটা বয়ে আনেনি ওপর থেকে। তারপর দাঁড়িয়ে পড়ে বলল, দ্যাখ ভাল করে কোথাও ড্র্যাগ-মার্ক আছে কি?
–না।
–কিল নিয়ে একলাফেতেই ঐ দহতে পড়েছে। ইচ্ছে করে কেন পড়বে বুঝছি না। আর অনিচ্ছাতে পড়লেও কেন পড়ল তা ভাবার অবকাশ আছে। অনিচ্ছায় পড়ে থাকলে চিতার নিজের হাড়গোড়ও কিছু ভাঙার কথা।
ঝর্ণাটা সর্ষেক্ষেতের যেখানে শুরু হয়েছে সেখানে বালাবাবু, যুধিষ্ঠির এবং যুধিষ্ঠিরের চার-পাঁচজন প্রতিবেশী দাঁড়িয়েছিল। শব-এর জন্যেই। ঋজুদা তাদের নিরাশ করে বলল, আজ শব দাহ করা সম্ভব নয়। কাল সকালে কোরো।
এই কথাতে তারা সকলেই একটু ক্ষুণ্ণ হল। প্রতিবেশীদের একজনের হাতে একটি গাদা বন্দুক ছিল। নিশ্চয়ই লাইসেন্সবিহীন। লোকটা বলল, একুট মুরব্বির মত স্বরে, এ তো নিনিকুমারীর বাঘ নয়। এরা বললে কি হয়। এ সেই বড় চিতাটা। যাকে আমি প্রায় মেরেই ফেলেছিলাম সেদিন রাতে। গোয়াল ঘরে আমার গরু ধরতে এসেছিল। অত কাছ থেকে গুলি করলাম পুরো চার আঙুল বারুদ ঠেসে। তবুও পালালো। এই চিতাও যে ঠাকুরানীর চিতা তাতে সন্দেহ নেই কোনো। ঋজুদা লোকটার আপাদমস্তক দেখল। মুখে কিছু বলল না।
বালাবাবুকে বলল চলুন আমাকে নদীতে ছেড়ে দিয়ে আসবেন। আর যা বলার রুদ্রকে বলেছি। কারও বাড়িতে আপনাদের ডাল ভাতের বন্দোবস্ত হয় কি না দেখুন ফিরে এসে। ফিরে এসে রুদ্রকে মাচাটা বাঁধতে একটু সাহায্য করবেন। আর বন্দুকধারী লোকটি সম্বন্ধে একটু খোঁজখবর করে রাখবেন তো!
কথাগুলো ঋজুদা ইংরিজিতেই বললো।
নিচে নেমে যুধিষ্ঠিরের বাড়ির মাটির বারান্দার দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসলাম আমি আর ভটকাই। যুধিষ্ঠির আর গ্রামের সেই তিন-চারজন লোক আমাদের সামনে উবু হয়ে বসে কথা বলতে লাগল নিজেদের মধ্যে। বালাবাবু ঋজুদার সঙ্গে চলে যেতে যেতে ওদের একজনকে বলে গেল বেলা দশটা সাড়ে দশটা নাগাদ আমাদের তিনজনের জন্যে একটু খাবারের বন্দোবস্ত করে রাখতে। পয়সা পাবে।
লোকটি বিরক্ত মুখে নিজের মনেই বলল অতিথি নারায়ণ। কিন্তু আগের দিন কি আর আছে? না হয় কোনো ফসল, না বসে হাট ঠিক-ঠাক। ভাত, মসুরের ডাল, বিড়ি বড়া আর রম্ভাভাজা, এই খাওয়াব। তবে পয়সা-টয়সা নেব না। কোনদিনই নিইনি, আজও নেব না। পয়সার কথা বলে আমাদের অপমান করা কেন?
ভটকাই থম্ মেরে ছিল। এই জঙ্গল পাহাড়, এই আশ্চর্য সুন্দর নৈসর্গিক দৃশ্য, এবং তারই মধ্যে এই অবিশ্বাস্য দারিদ্র্য, পরপর দু-দিন জঙ্গলের মানুষখেকো জানোয়ারের হাতে দুজন মানুষের প্রাণ যাওয়া, এসব দেখেশুনে ও স্তব্ধ হয়ে গেছিল। এখন আরও বেশি হল যখন যুধিষ্ঠিরের বাবা দশরথ ঐ পাহাড়ের ঝর্ণার মধ্যের দহতে পড়ে আছে শুনেও এই মানুষেরা, এমনকি যুধিষ্ঠিরও একটুও উত্তেজিত না হয়ে স্বাভাবিকভাবে কথাবার্তা বলছে, এমনকি রঙ্গরসিকতাও করছে নিজেদের মধ্যে, কোমরের গেরুয়া রঙা বটুয়া থেকে পান বের করে সুপুরি কেটে তাতে চুন খয়ের ধীরে-সুস্থে লাগিয়ে তার মধ্যে গুণ্ডি দিয়ে জম্পেশ করে পান খাচ্ছে।
ভটকাই-এর মনের কথা বুঝে আমি বললাম, এ সব হচ্ছে অকুপেশনাল হ্যাজার্ডস। বুঝলি! কলকাতায় প্রত্যেকদিন মিনিবাসে এবং প্রাইভেট বাসে চাপা পড়ে কজন লোক মারা যায় তার খবর কি আমরা রাখি? গ্রামের লোকেরাও বাঘের বা চিতার হাতে, বা সাপের কামড়ে যখন মরে, ভালুক বা বুনো শুয়োরের হাতে যখন ক্ষতবিক্ষত হয় তখন এ আর কী গোছের ভাব নিয়ে ঘটনাগুলিকে দেখে।
হুঁ। ভটকাই বলল।
-আজই তো তুই মাচাতে বসছিস। মানুষখেকো চিতার অপেক্ষায় মাচায় বসা কম শিকারির ভাগ্যেই ঘটে। আর তোর মেইডেন এক্সপিরিয়েন্সেই তা হয়ে যাবে। কনগ্রাচুলেশানস।
ভটকাইকে খুব চিন্তিত ও গম্ভীর দেখাচ্ছিল। যুধিষ্ঠিরের আর্থিক অবস্থা এবং তার বাবার এই রকম বীভৎস মৃত্যু তাকে যুধিষ্ঠিরের চেয়েও বেশি ব্যথিত করেছিল। যুধিষ্ঠিরদের সয়ে গেছে এসব। তার ঠাকুর্দা, তার বাবা এবং সে নিজেও এই জীবনকে নিয়েই খুশি থেকেছে। সুখী হতে যে এর চেয়েও বেশি কিছু দরকার এ সব কথা ভাবার অবকাশই হয়নি ওদের কখনও।
