মুকুন্দপুরের মনসা (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
ঊনতিরিশ
ডাক্তারবাবুকে আজ এ-বেলায় আর-কোথাও রুগি দেখতে যেতে হয়েছিল নিশ্চয়, তাই দিনের আলো থাকতে-থাকতে মুকুন্দপুরে আসতে পারেননি। হেমন্তকাল, দিনের আলো এখন ফুরিয়েও যায় খুব তাড়াতাড়ি, দুপুরের খানিক বাদেই যেন ঝুপ করে অন্ধকার নেমে আসে। বাইরের উঠোন অবশ্য এখন আর অন্ধকার নয়। ডাক্তারবাবু এসেছেন শুনেই সত্যপ্রকাশ হ্যাজাক জ্বালিয়ে বাইরের উঠোনের মাঝ বরাবর ঝুলিয়ে দিতে বলেছিলেন। চারিদিক তাই একেবারে দিনের আলোর মতো ফটফট করছে।
ডাক্তারবাবু আজ আর কাউকে রঙ্গিলার ঘরে ঢুকতে দেননি। পার্টিশানের এদিকে রামদাসের ঘর। সেখানে তিনটে চেয়ার আনিয়ে আমরা তিনজন বসে আছি। আমি, ভাদুড়িমশাই আর সত্যপ্রকাশ। বাইরের বারান্দার একদিকে একটা তক্তাপোশ পাতা। তাতে বসে আছেন গোবিন্দ ভট্ট্চাজ আর রঙ্গনাথ। পার্টিশানের দরজার কাছে রামদাস একেবারে পাথরের মূর্তির মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা যেখানে বসে আছি, সেখান থেকে রঙ্গিলার ঘর পালানো মা ঝুমরিকেও দেখতে পাচ্ছিলুম। ঝুমরি আজ বারান্দায় উঠে এসেছে। রামদাস তাকে বাধা দেয়নি।
রঙ্গিলার ঘর থেকে ডাক্তারবাবু বেরিয়ে আসতেই আমরা, চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালুম। যারা বারান্দায় ছিল, তারাও দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। সকলের মুখেই উদ্বেগের ছাপ। ডাক্তারবাবু কখন রঙ্গিলার ঘর থেকে বার হন, কী বলেন, তারই জন্যে সবাই চুপচাপ এতক্ষণ অপেক্ষা করছিল। কিন্তু এখন যেন কেউ কিছু জিজ্ঞেস করতে ভরসা পাচ্ছে না।
ডাক্তারবাবু বললেন, “আরে, কী ব্যাপার, সবাই এত গম্ভীর কেন?”
সত্যপ্রকাশ বললেন, “রঙ্গিলা কেমন আছে?”
“ভাল।… কই হে রামদাস, সাবানটা দাও।”
রামদাস সাবান এগিয়ে দিল। ডাক্তারবাবু হাত ধুয়ে, রামদাসের হাত থেকে তোয়ালেখানা টেনে নিয়ে মুখ তুলে সত্যপ্রকাশের দিকে তাকালেন। তারপর একগাল হেসে বললেন, “ভাল মানে খুব ভাল। চমৎকার, একসেলেন্ট! সেদিন বলেছিলুম, দি ওয়র্স্ট ইজ ওভার। তারপর ফের জ্বরটা আসায় একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলুম ঠিকই, তবে এখন বলছি, রঙ্গিলাকে নিয়ে আর আমি একটুও চিন্তা করছি না।”
সত্যপ্রকাশ বললেন, “জ্বরটা আর আসেনি তো?”
“না। গা একেবারে পাথরের মতো ঠান্ডা। কিন্তু তার চেয়েও বড় খবর, জ্ঞান ফিরে আসছে।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “সেটা কী করে বুঝলেন?”
“আমাকে যে চিনতে পেরেছে, সেটা ওর চাউনি থেকেই বুঝেছি। তা ছাড়া ঠোঁট নড়ছে। একটু গুঙিয়ে উঠল। মনে হচ্ছে, কিছু বলতে চায়…মানে জরুরি কিছু… কিন্তু ওয়র্ড-ফর্মেশানের একটা ব্যাপার আছে তো, সেটা ঠিক পেরে উঠছে না। কিন্তু পারবে, কাল সকালের মধ্যেই পেরে যাবে।…কী, আপনারা খুশি তো?”
রামদাস হাত জোড় করে দাঁড়ি েছিল। এখানে আসা অবধি তাকে হাসতে দেখিনি। এই প্রথম তার মুখে একটু হাসি ফুটতে দেখা গেল।
বারান্দা থেকে উঠোনে নামলেন ডাক্তারবাবু। মোটরসাইকেলে উঠে স্টার্ট দিলেন। তারপর কী যো ভেবে স্টার্ট থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “আয়া যে চলে গেছে, সে তো এসেই শুনলুম। নতুন আয়া কখন থেকে কাজে লাগবে?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “শিলিগুড়িতে নতুন একজনের সঙ্গে কথা বলেছি। ভেবেছিলুম, আমার সঙ্গে করেই তাকে নিয়ে আসব, কিন্তু নার্সিংহোমে হঠাৎ একজন হার্টের পেশেন্ট এসে পড়ায় মেয়েটি আজ ছাড়া পেল না। তবে টাকা দিয়ে এসেছি, কাল সকালে নিজেই বাসে উঠে এখানে চলে আসবে।”
ডাক্তারবাবু বললেন, “তার মানে রঙ্গিলার ঘরে আজ রাত্তিরে কেউ থাকছে না, কেমন?”
রামদাস বলল, “আমি থাকব।”
ঝুমরি এতক্ষণ একটাও কথা বলেনি। এবারে অস্ফুট গলায় বলল, “বলেন তো আমিও থাকতে পারি।”
ডাক্তারবাবু কী যেন চিন্তা করলেন কয়েক মুহূর্তে। তারপর বললেন, “সুস্থ অবস্থায় রঙ্গিলা তো ও-ঘরে একাই থাকত, তাই না?”
রামদাস বলল, “হ্যাঁ।”
“তা হলে একাই থাক।” ডাক্তারবাবু বললেন, “জ্ঞান হয়তো আজ রাত্তিরেই পুরোপুরি ফিরে আসবে। তখন যদি ঘরের মধ্যে আর-কাউকে দেখতে পায়, তা হলে হয়তো অবাক হয়ে যাবে। তার একটা খারাপ এফেক্ট হওয়া কিছু বিচিত্র নয়…মানে হঠাৎ একটা সেট-ব্যাক হয়ে যেতে পারে। সব দিক ভেবে তাই মনে হচ্ছে যে, আজকের রাতটা ওর একা থাকাই ভাল। লেট্স কিপ থিংস অ্যাজ নর্মাল অ্যাজ পসিবল।”
রামদাস বলল, “আমিও থাকব না?”
ডাক্তারবাবু বললেন, “বললুম তো, না-থাকাই ভাল। আর তা ছাড়া দরকারই বা কী। তুমি তো পাশের ঘরেই আছ। যদি ওর দরকার হয় তা হলে তুমি জানতেই পারবে। ঘরের মধ্যেই যে থাবতে হবে, এমন তো কোনও কথা নেই।…আর হ্যাঁ, কাল সকালেই আমি একবার আসব।”
কুণ্ঠিত গলায় ঝুমরি বলল, “ডাক্তারবাবু, আপনি তো হাসিমারায় খাচ্ছেন?”
‘হ্যাঁ। কেন বলো তো?”
“এখন তো আর বাস পাব না, আপনি যদি ওই পর্যন্ত আমাকে নিয়ে যান তো ওখান থেকে আমি হেঁটেই আমাদের বাগানে চলে যেতে পারব।”
“ওহো, তুমি তো দক্ষিণবাড়ি চা-বাগানে থাকো, তাই না?”
“হ্যাঁ, ডাক্তারবাবু।”
“বেশ, তা হলে উঠে পড়ো।”
মোটরসাইকেলের পিছনের সিটে ঝুমরিকে বসিয়ে নিয়ে ডাক্তারবাবু চলে গেলেন।
ডাক্তারবাবু যতক্ষণ ছিলেন, চুপ করে সবাই তাঁর কথা শুনছিলুম আমরা। এবারে রঙ্গনাথ তাঁর বাড়ির পথে পা বাড়ালেন। গোবিন্দ ভট্চাজও পা বাড়ালেন তাঁর ঘরের দিকে। সম্ভবত এবারে তিনি পুজোয় বসবেন। তবে সত্যপ্রকাশ যেহেতু বাড়িতেই রয়েছেন, তাই শাঁখ হয়তো বাজবে না, ঘন্টার আওয়াজও শোনা যাবে না। আমরা তিনজন বাইরের উঠোন পেরিয়ে ভিতর-বড়িতে চলে এলুম। আসতে-আস্পতেই দেখলুম, রামদাস হ্যাজাকটা নিবিয়ে দিচ্ছে। নিরুকে ঢায়ের কথা বলে দিয়ে সত্যপ্রকাশ বললেন, “চলুন, একটু বসা যাক।”
ভাদুড়িমশাই শিলিগুড়ি থেকে ফিরবার পর থেকে এখনও পর্যন্ত সত্যপ্রকাশের সঙ্গে তাঁর কোনও কথা হয়নি। এবারে সত্যপ্রকাশই জিজ্ঞেস করলেন, “কিছু হদিস করতে পারলেন?”
“কীসের হদিস?”
“সে কী!” সত্যপ্রকাশ অবাক হয়ে বললেন, “মনসামূর্তির খোঁজেই তো আপনি শিলিগুড়ি গিয়েছিলেন, তাই না?”
“শুধু মূর্তির খোঁজে যাব কেন? অন্য কয়েকটা ব্যাপার নিয়েও একটু খোঁজখবর করবার দরকার ছিল। তার মধ্যে দুটো খবর শুনে আপনি খুশি হবেন।”
“কীসের খবর?”
“প্রথম খবর ব্যাঙ্ক-লোনের। লোনটা আপনি সামনের মাসেই পেয়ে যাচ্ছেন।”
শুনে একেবারে হাঁ হয়ে গেলেন সত্যপ্রকাশ। তারপর নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বললেন, “সত্যি? খবরটা কার কাছে শুনলেন আপনি?”
“ব্যাঙ্কের জেনারেল-ম্যানেজারের কাছে। ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা করেছিলুম। তিনিই জানালেন।”
“আপনাকে চেনেন উনি?”
“বা রে, ব্যাঙ্গালোরের লোক, অথচ চারু ভাদুড়িকে চিনবে না, তাও কি হয় নাকি?”
সত্যপ্রকাশের মুখ দেখেই মালুম হচ্ছিল যে, তিনি কিছুই ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারছেন না। কুণ্ঠিত ভঙ্গিতে একটু কিন্তু-কিন্তু করে বললেন, “কত পার্সেন্ট দিতে হবে ওঁকে?”
“কিচ্ছু দিতে হবে না।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “সকলকেই আপনারা ঘুষখোর ভাবেন কেন বলুন তো? বিশ্বসুদ্ধ সব্বাই কি ঘুষখোর নাকি?”
“কিচ্ছু দিতে হবে না?” সত্যপ্রকাশ যেন ব্যাপারটা ঠিক বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না।
“এক আধলাও না।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “কী জানেন মিঃ চৌধুরি, দোষ আপনাদেরও কম নয়, ঘুষ দিতে-দিতে স্বভাবটাই আপনাদের নষ্ট হয়ে গেছে। তাই বুঝতে পারেন না যে, সংসারে যেমন বিস্তর চোর-জোচ্চোর রয়েছে, তেমনি আবার সৎ লোকেরও অভাব নেই।”
সত্যপ্রকাশ ইতিমধ্যে নিজেকে একটু সামলে নিয়েছিলেন। বললেন, “কিন্তু একটা কথা ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। ভদ্রলোককে ডিনারে ডেকেছিলুম। বলেছিলুম যে, আমিই গাড়ি পাঠিয়ে দেব। কিন্তু তিনি নেমন্তন্নটা অ্যাকসেপ্টই করলেন না। বললেন, ফরগেট্ ইট। এটা কেন করলেন বলুন দেখি।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “এটাও আপনাকে বুঝিয়ে বলতে হবে? আশ্চর্য! আরে মশাই, আপনাদের এইসব ডিনার-ফিনারও আসলে ঘুষ ছাড়া আর কিছুই নয়। নানজাপ্পা সেটা ভালই বোঝে, তাই অ্যাকসেপ্ট করেনি। কী জানেন চৌধুরিমশাই, বিয়িং অনেস্ট ইজ নট এনাফ, লোকে যাতে অসৎ না ভাবে, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হয়। আপনার হোটেলে গিয়ে ডিনার খেয়ে তারপর আপনার কাজটা করে দিলে সবাই বলত, লোকটা নির্ঘাত ঘুষ খেয়েছে। ধরে নিন, সেইজন্যেই নানজাপ্পা আসেনি।…ও হ্যাঁ, একটা কথা বলা হয়নি। লোনটা ন্যাংশান করার দুটো শর্ত আছে কিন্তু।”
“কী শর্ত?”
“প্রথমটা ওঁদের ইঞ্জিনিয়ারের। আপনাদের প্ল্যান দেখে ব্যাঙ্কের ইঞ্জিনিয়ার যে নোট দিয়েছেন, তাতে বলা হয়েছে যে, হোটেলে আগুন লাগার ঘটনা আজকাল আকছার ঘটছে। অথচ আপনাদের প্ল্যানে সে-দিকটায় তেমন নজর দেওয়া হয়নি। আর কিছু না করুন, ইমার্জেন্সি স্টেয়ারকেসটা আরও অন্তত এক ফুট আপনাকে চওড়া করতে হবে।”
আমি বললুম, “সেটা করা যাবে তো?”
সত্যপ্রকাশ হেসে বললেন, “ইট্স এ মাইনর ম্যাটার। জায়গা যা রয়েছে, তাতে এক ফুট কেন, আরও দেড় ফুট চওড়া করতে পারি। করে দেব। দ্বিতীয় শর্ত?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “সেটা ওঁরা লিখিত-পড়িতভাবে আপনাকে জানাবেন না। নানজাপ্পা বলল, শিলিগুড়িতে পৌঁছে অবধি তিনি শুনতে পাচ্ছেন যে, কনট্রাক্টর হিসেবে সম্পৎলালের বিশেষ সুনাম নেই, অনেক সময় ওরই জন্যে নাকি কন্সট্রাকশনের কাজ মাসের পর মাস পিছিয়ে যায়। তাই লেবার-কনট্রাক্টের কাজটা যদি সম্পৎলালের বদলে আর কাউকে…মানে অন্য যে-কোনও বড় কনট্রাক্টরকে দেন, ব্যাঙ্ক তা হলে নিশ্চিন্ত হতে পারে যে, কাজটা সময়মতো শেষ হবে। ফলে ক এখনকার এস্টিমেটের মধ্যেই থাকবে, ধাপে-ধাপে চড়ে যাবে না, আপনারও আর নতুন করে লোনের দরকার হবে না।”
“সম্পৎলালকে সরিয়ে দিয়ে আর কাউকে কাজ দিতে হবে?” সত্যপ্রকাশ যেন শিউরে উঠলেন, “ওরে বাবা, তাও কি হয়?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “কেন হবে না, খুব হয়। আর তা ছাড়া, সম্পৎলালকে আপনি পাচ্ছেনই বা কোথায়? কাল শিলিগুড়িতে গিয়ে আপনি যে তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি, তার কারণ জানেন?”
“কেন, সে কোথায় গিয়েছিল?”
“আপনার পক্ষে সেটাই হচ্ছে দ্বিতীয় সুখবর। সম্পৎলালের মতো লোকরা শেষ পর্যন্ত যেখানে যায়, সেখানেই গিয়েছিল। আপাতত আছেও সেইখানেই। নরকে। পরশু বিকেলে তো শিলিগুড়ি থেকে আমাদের নিয়ে আপনি মুকুন্দপুরে চলে আসেন। সেদিন রাত থেকেই নাকি সম্পৎলালের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। থানায় গিয়ে শুনলুম, আজই সকালে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনের রেল-ইয়ার্ডের একটা ওয়াগনের মধ্যে তার লাশের সন্ধান মিলেছে। গলাটা একেবারে দু-ফাঁক করা। খুন হয়েছে সম্ভবত পরশু রাত্তিরেই।”
সত্যপ্রকাশকে দেখে মনে হচ্ছিল তাঁর মুখ থেকে যেন সমস্ত রক্ত কেউ নিংড়ে বার করে নিয়েছে। স্খলিত গলায় তিনি বললেন, “সে কী!”
ভাদুড়িমশাই মৃদু হেসে বললেন, “এতে এত অবাক হচ্ছেন কেন? আমি তো বলেইছিলুম যে, নিজের গ্যাংকে ফাঁসিয়ে কোনও মাফিয়োসো কখনও পার পায় না। শয়তানদেরও একটা কোড অভ কনডাক্ট থাকে, মিঃ চৌধুরি। সেই কোড যে ভাঙে, একদিন না একদিন তাকে এইভাবেই মারা পড়তে হয়।”
সত্যপ্রকাশ কথা বলতে পারছিলেন না।
ভাদুড়িমশাই বললেন, “কাজটা ফকিরাই করুক আর যে-ই করুক, আপনি আপাতত নিশ্চিন্ত। যা-ই হোক, আমি এখন ঘরে যাচ্ছি। দু’একটা কাজ পড়ে রয়েছে, চটপট সেরে ফেলতে হবে। চা এলে বরং আমাদের ঘরে পাঠিয়ে দেবেন। চলুন, কিরণবাবু।”
আমরা আমাদের ঘরে চলে এলুম।
তার মিনিট দুয়েক বাদেই চায়ের ট্রে নিয়ে নিরু আমাদের ঘরে এসে ঢুকল। ভাদুড়িমশাই তার হাত থেকে ট্রেটা টেবিলে নামিয়ে রেখে বললেন, “কী খবর সুহাসিনী?”
নিরু বলল, “ভাল। কিন্তু জামাইবাবু এমন হতভম্ব হয়ে বসে আছেন কেন? কী হয়েছে ওঁর?”
ভাদুড়িমশাই কপট ধমকের গলায় বললেন, “ও-সব নিয়ে তোমাকে মাথা ঘামাতে হবে না, তুমি একেবারে চুপ করে থাকো।”
নিরু বেরিয়ে গেল। চায়ে চুমুক দিয়ে ভাদুড়িমশাইকে বললুম, “চাঁদুর সঙ্গে দেখা হয়েছিল?”
“তার আর দরকার হয়নি। অনেকদিনের চেনা একজনকে পেয়ে গিয়েছিলুম। আদালত, থানা, ব্যাঙ্ক…মানে যেখানে যেখানে যাওয়া দরকার, সে-ই নিয়ে গিয়েছিল আমাকে। এগারোটায় শিলিগুড়ি পৌঁছলুম, কাজ শেষ হতে-হতে তিনটে। নন্-স্টপ কাজ আর কাজ। বুড়ো এক উকিলের বাড়িতেও গিয়েছিলুম। রাজদেও কুর্মি কীভাবে খুন হয়েছিল, ভদ্রলোকের কাছে তার ডিটেল্স শোনা গেল।”
“তার মানে দুপুরে আজ আর ভাত খাওয়া হয়নি।”
“হয়নি তো কী হয়েছে? আরে মশাই, রোজ দু’বেলাই তো ভাত খাচ্ছি, একটা বেলা না হয় না-ই খেলুম। তবে কিনা আজ শাকভাজাটা খাওয়া উচিত ছিল।”
হঠাৎ মনে পড়ে গেল, দুপুরে আজ ভাতের পাতে গুচ্ছের শাকভাজা দেওয়া হয়েছিল। বললুম, “কী ব্যাপার বলুন তো, হাজার রকমের সুখাদ্য থাকতে হঠাৎ শাকভাজা নিয়ে এত মাতামাতি কেন?”
“বাঃ কিরণবাবু, আপনিও কি সাহেব হয়ে উঠলেন নাকি? কালীপুজোর আগের দিন যে চোদ্দোশাক খেতে হয়, ও বেমালুম ভুলে গেছেন?”
তাই তো, কালই কালীপুজো।
খানিক বাদেই নিরু আবার ঘরে এসে ঢুকল। চা খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। টেবিল থেকে ট্রেটা তুলে নিয়ে ভাদুড়িমশাইকে বলল, “একটু পরেই খেতে ডাকছি। ও-বেলা সম্ভবত আপনার কিছু খাওয়া হয়নি। এ-বেলা তাড়াতাড়ি খেয়ে নিন।”
নিরু বেরিয়ে গেল।
ভাদুড়িমশাই একটা সিগারেট ধরালেন। চুপচাপ টানলেন কিছুক্ষণ। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “দুপুরে কী করলেন আজ?”
বললুম, “ডায়েরিটা পড়লুম। সবটা নয়, ওই কিছু-কিছু জায়গা। গ্রামটার নাম যে আসলে মুকুন্দপুর নয়, মুচুকুন্দপুর, আজই সকালে সত্যপ্রকাশের মুখে এই কথাটা শুনে ভেবেছিলুম যে, অনেক কিছু জানলেও অন্তত এটা আপনি এখনও হয়তো জানতে পারেননি।”
“তা ডায়েরি পড়ে দেখলেন যে, কথাটার ওখানে উল্লেখ রয়েছে। তাই না?”
হেসে বললুম, “বিলক্ষণ। আর তা দেখেই বুঝলুম যে, ডায়েরিটা যখন আমার আগেই আপনি পড়েছেন, তখন এটাও আপনি আমার আগেই জেনে বসে আছেন।
ভাদুড়িমশাই কিছু বললেন না। হাসতে লাগলেন।
