মউলির রাত (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ
হলঙ
বাগডোগরা এয়ারপোর্টে যখন বোয়িং প্লেনটা নামল তখন ভরদুপুর।
একজন কালো মতন ভদ্রলোক, চশমা-পরা, প্লাস্টার করা ডান হাত স্লিংয়ে ঝোলানো, এগিয়ে এসে ঋজুদাকে নমস্কার করলেন।
ঋজুদা বলল, কী বিকাশ? কেমন আছ? যাচ্ছ তো হলঙে আমাদের সঙ্গে?
ভদ্রলোক বললেন, কী করে যাই? দেখতেই পাচ্ছেন। গাড়ি অ্যাকসিডেন্টে ডান হাত ভেঙেছি। তাছাড়া কাল ভোরেই কলকাতা যাব, বিশেষ কাজ আছে।
তারপর বললেন, আপনি একা জীপ নিয়ে যেতে পারবেন তো? ড্রাইভার ছাড়া আমি যে অচল।
ঋজুদা বললেন, না, না, ঠিক আছে। একা যেতে পারব না কেন? তাছাড়া একা তো নই, সঙ্গে আমার চেলা, এই রুদ্রচন্দ্র আছে। কোনওই অসুবিধে নেই।
আমি জীপের পেছনে উঁকি দিয়ে দেখলাম, ছ’টা মুরগি কঁক কঁক করছে। পাশে একটা বড় প্যাকিং বাক্স। তাতে চাল, ডাল, তরকারি, ফল, তেল ঘি– এই সব।
বিকাশবাবু বললেন, সবই দিয়ে দিয়েছি, আপনার কোনওই অসুবিধে হবে না। ওখানে তো পাওয়া যায় না কিছু। এবার দেরি না করে বেরিয়ে পড়ন। অনেকখানি পথ।
ঋজুদা স্টীয়ারিং-এ বসল। আমি গিয়ে পাশে বসলাম।
তারপর বিকাশবাবুর সঙ্গে কী সব কথাবার্তা বলে জীপ স্টার্ট করল ঋজুদা।
চলি, বলে ডান হাতটা বিকাশবাবুর দিকে তুলে জীপের অ্যাকসিলেটরে চাপ দিল। তারপর জীপ ছুটে চলল।
ঋজুদা বলল, দূর, এই জীপ ভাল না।
আমি শুধোলাম, কেন?
এটা বড্ড ভাল। জীপের স্টীয়ারিং কমপক্ষে আড়াই-তিন পাক ফল না হলে কি চালিয়ে আরাম! বাঁই বাঁই করে তিন পাক স্টীয়ারিং ঘুরে গেলে তবে চাকা একটু সরবে, সেই-ই তো মজা।
দেখতে দেখতে আমরা এয়ারপোর্টের এলাকা পেরিয়ে এসে ফাঁকায় পড়লাম। দার্জিলিং-এ যাওয়ার রাস্তা বাঁদিকে ফেলে বাইপাস দিয়ে এসে আমরা সেভক রোড ধরলাম।
বেশ ঠাণ্ডা এখন, এই দুপুরেও। হাওয়া লাগছে চোখে-মুখে। মাথার উপর ঝকঝকে নীল আকাশ– দুপাশে ঘন শালের জঙ্গল, সেগুনের প্ল্যানটেশান মধ্যে দিয়ে আর্মির বানানো চওড়া কালো অ্যাসফল্টের রাস্তা সোজা চলে গেছে। তিস্তা অবধি। তিস্তা পেরিয়ে সেভক ব্রীজ পেরিয়ে ডুয়ার্সে যাওয়ার পথ, আর সোজা গেলে, খরস্রোতা তিস্তার গায়ে গায়ে কালিম্পং যাওয়ার রাস্তা।
বেশ জোরেই জীপ চালাচ্ছিল ঋজুদা। জীপের এঞ্জিনটা মাঝে মাঝে স্পীড কমে গেলেই, সে যে তত ভাল ছেলে নয়, যতটা ঋজুদা ভেবেছিল, তা প্রমাণ করার জন্যে মাথা নাড়ছিল পাগলের মতো। সঙ্গে সঙ্গে জোরে একটা লাথি মারছিল ঋজুদা ক্লাচে। অমনি আবার সে ভাল ছেলে হয়ে যাচ্ছিল। সেভকে এসে বিখ্যাত করোনেশন ব্রীজ পেরোলাম আমরা। ব্রীজের পর বেশ কিছুটা পথ আঁকাবাঁকা পাহাড়ী পথ, তারপর আবার সটান, সোজা, আদিগন্ত।
ওদলাবাড়ি ছাড়িয়ে এসে আমরা মালে পৌঁছে বাস-স্টপের পাশে একটা চায়ের দোকানেই খেয়ে নিলাম। দারুণ রসগোল্লা, কালোজাম আর সিঙাড়া। দোকানটাতে খুব ভিড়।
ঋজুদা বলল, ভাল করে খেয়ে নে রুদ্র। জীপ যেরকম মাথা নেড়ে মাঝে মাঝেই আপত্তি জানাচ্ছে, শেষ পর্যন্ত উদোম পথে ঝামেলায় না ফেলে। সারা রাত থাকতে হলে ঠাণ্ডায় কুলপি মেরে যাব।
খেয়ে-দেয়ে আবার এগোলাম আমরা।
চালসাও পেরুনো হল। এখান থেকে ময়নাগুড়ির পথ বেরিয়ে গেছে।
অনেকক্ষণ আগে থেকেই পথের দুপাশে চা বাগান আরম্ভ হয়েছে। বাগানের পর বাগান। কেসিয়া ভ্যারাইটির ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া গাছ, নীচে চায়ের সবুজ নিবিড় সমারোহ পেছনে নগাধিরাজ হিমালয়ের শোভা।
গোঁ গোঁ করে জীপ চলেছে। মাঝে-মধ্যে কোনও চা বাগানের জীপ বা ট্রাকের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। চা বাগানের কুলি-কামিন কাজ সেরে নিজেদের ঘরে ফিরছে গান গাইতে গাইতে। অনেক সাঁওতাল দেখলাম এখানে। কোথা থেকে কোথায় কাজ করতে আসে এরা, ভাবলে অবাক লাগে!
তারপর বানারহাট, বীরপাড়া হয়ে আমরা প্রায় সন্ধের সময় মাদারীহাটে এসে পৌঁছলাম। ডানদিকে কোচবিহারের পথ বেরিয়ে গেছে। সোজা গেলে হাসিমারা হয়ে ফুংসোলিন। ভুটানের সীমান্ত। এপথে একটু এগিয়েই আমরা ডানদিকে চেক-নাকা পেরিয়ে ঢুকে পড়লাম হলঙে।
ঋজুদার কাছ থেকে রিজার্ভেশন স্লিপ দেখে তারপর আমাদের ঢুকতে দিল ফরেস্ট গার্ড। সাদা পাথুরে মাটি আর নুড়ি-ঢালা পথ সোজা চলে গেছে। হলঙের দিকে। সাত কিলোমিটার।
একটু পরই সন্ধে হয়ে যাবে। পথের পাশে পাশে একটি নরম লাজুক ছিপছিপে নদী চলেছে গাছপালা লতাপাতার আড়ালে। পরে জেনেছিলাম যে, এই নদীর নামই হল। নদীর নামে জায়গার নাম। এই সন্ধে হব-হব গভীর জঙ্গলে সেই নদীর মৃদু কুলকুল আওয়াজ ভারী সুন্দর লাগছে। পথের দুপাশে অনেকগুলো ময়ূর দেখলাম। আমাদের জীপের শব্দ শুনে ভারী শরীর নিয়ে কষ্ট করে উড়ে গিয়ে গাছের ডালে বসছিল। রাত প্রায় নেমে এল। এমনিতেই তো ওদের এখন গাছে গিয়ে বসার কথা।
ঋজুদা জঙ্গলে ঢুকলেই কেমন যেন হয়ে যায়। চোখ-মুখ সব পালটে যায়। শহরের ঋজুদা আর জঙ্গলের ঋজুদা অনেক তফাত। স্টীয়ারিংয়ে হাত রেখে পথের দিকে চেয়ে আমাকে ফিসফিস করে ঋজুদা বলল, “চিতা বাঘ বড় শখ করে ময়ূর ধরে খায়, তা জানিস? বড় বাঘও ময়ূর ভালবাসে।
আমি বললাম, ময়ূরের মাংস খেলে নাকি লোকে পাগল হয়ে যায়? ঋজুদা হেসে উঠল। বলল, যে এ কথা বলে, সেও একটি পাগল। ময়ূরের মাংসের মতো মাংস হয় না, তা জানিস? পৃথিবীতে এত ভাল হোয়াইট নেই-ই বলতে গেলে তবে এখন তো ময়ূর ন্যাশনাল বার্ড। ময়ূর মারার প্রশ্নই ওঠে না।
আমি বললাম, চিতাবাঘে মেরে খায় যে!
ঋজুদা বলল, চিতাবাঘের কথা ছাড়। আইন-কানুন, সংবিধান কিছুই মানে না ওরা। ওরা যা খুশি তাই করে।
যখন হলঙ-এর দোতলা কাঠের বাংলোয় গিয়ে পৌঁছলাম আমরা, তখন সবে অন্ধকার নেমেছে। শ্রীবিবেক রায় এলেন আমাদের দেখাশোনা করতে। আমি যখন আড়ালে ডেকে তাঁকে ঋজুদার নাম বললাম, তখন তো তিনি খুব খুশি এবং উত্তেজিত। ঋজুদাকে এসে বললেন, আপনাকে কীভাবে আপ্যায়ন করতে পারি, বলুন?
ঋজুদা হাসল; বলল, কিছু করতে হবে না মশাই, আমার এই চেলাটিকে একটু বাঘ দেখান। পারবেন তো?
বিবেকবাবু বললেন, বাঘ তো এখানে রাস্তার কুকুরের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। তবে দেখা পাওয়া ভাগ্যের কথা। আপনার খাতিরে অবশ্য শুভদৃষ্টি হলেও হতে পারে।
আমি ঋজুদাকে মনে করিয়ে দিলাম, তুমি তেল ভরলে না ঋজুদা, যদি রাতে কোথাও যাও, আর কাল তো ফুংসোলিন যাব আমরা!
ঋজুদা বলল, ঠিক বলেছিস।
তারপর বিবেকবাবুকে বললেন, যাবেন নাকি আমাদের সঙ্গে মাদারীহাট? তেল ভরতে যাব।
বিবেকবাবু বললেন, বরাতে থাকলে ঐটুকু যাওয়া-আসার পথেই বাঘ দেখতে পাবেন। তবে, আমার কাজ সেরে আসি। আরও যাঁরা এসেছেন তাঁদের খবরাখবর সুখ-সুবিধার খোঁজ নিয়ে আসি। ততক্ষণে আপনারা চা খেয়ে চাঙ্গা হয়ে নিন।
ঋজুদা হেসে বলল, ফেয়ার এনাফ।
বিবেকবাবু বললেন, বাঘ যদি সত্যিই সামনে পড়ে, তাহলে জীপ চালাবে কে? ড্রাইভার ভীতু হলে কিন্তু বিপদ।
ঋজুদা বলল, আমিই চালাব, আমিই ড্রাইভার।
এ কথা শুনে বিবেকবাবু একটু চিন্তিত হয়ে পড়লেন। কারণ বাঘ দেখার পর এক-একজন লোকের এক এক রকম অবস্থা হয়। ভগবান বা ভূত দেখার মতো। কিন্তু মুখে কিছুই বললেন না ঋজুদাকে। লজ্জা পেলেন।
আমার মজা লাগল। কারণ ঋজুদাকে আমি যেমন চিনি, উনি তো তেমন চেনেন না।
কোন চা বাগানের প্রেস্টিজ ব্ৰাণ্ড তা জানি না, তবে বিকাশবাবু ফার্স্ট ক্লাস চা দিয়েছিলেন। ডানলোপিলো লাগানো বিছানায় পিঠের নীচে বালিশ দিয়ে বসে ঋজুদা চা খেতে খেতে একটা বড় বোলের পাইপ বের করে ধরাল। পাইপের। মিষ্টি তামাকের গন্ধে ঘর ভরে গেল।
ঋজুদা বলল, কী হে বৎস, আর এক কাপ চা করে খাওয়াও, একটু গুরুসেবা করো, ড্রাইভারের গায়ে জোর করো, নইলে বাঘ দেখে ড্রাইভার অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে তো!
আমি হাসলাম; বললাম, ড্রাইভারকে আমি তো চিনি।
তারপরই আধ চামচ চিনি দিয়ে যথারীতি দুধ কম দিয়ে ঋজুদাকে চা বানিয়ে দিলাম। একটু পরে কাজটাজ সেরে বিবেকবাবু আমাদের মেহগনি কাঠ দিয়ে বানানো ঘরের দরজায় এসে টোকা দিলেন।
কোট-টোট চড়িয়ে, মাথায় টুপি পরে আমরা নীচে নামলাম। ঋজুদা জাপান থেকে একটা জার্কিন কিনে এনেছিল, সেটা পরলে ঋজুদাকে ভীষণ কিম্ভুতকিমাকার দেখায়। ঋজুদা স্টীয়ারিং-এ বসল, মধ্যে আমি; বাঁ-দিকে বিবেকবাবু।
বাংলো থেকে বেরিয়ে হলঙ নদী পেরিয়ে বিবেকবাবুর কোয়াটার্স, মাহুত ও হাতিদের আস্তানা ছাড়িয়ে বড়জোর আধমাইলটাক গেছি আমরা, হঠাৎ বিবেকবাবু চেঁচিয়ে উঠলেন, বাঘ! বাঘ!
দূরে রাস্তার উপরে এক জোড়া লাল চোখ দেখা গেল। ঋজুদা জোরে জীপ ছোটাল। হেডলাইটের আলোয় দেখা গেল একটা বিরাট বড় রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার রাস্তা ছেড়ে বাঁদিকের জঙ্গলে নেমে যাচ্ছেন। আমরা পৌঁছতে পৌঁছতে জঙ্গলে ঢুকে গেলেন তিনি।
বিবেকবাবু উত্তেজিত হয়ে বললেন, দেখলেন?
ঋজুদা বলল, বড় লাজুক বাঘ। তারপর বলল, কী রে রুদ্র, দেখলি?
হুঁ। আমি বললাম।
ঋজুদা বলল, মনে হচ্ছে না দেখলেই খুশি হতিস।
আমি বিবেকবাবুর সামনে লজ্জা পেয়ে বললাম, যাঃ!
পাঁচ মিনিটও হয়নি, আবার বিবেকবাবু বললেন, বাঘ! বাঘ!
ঋজুদা জোরে অ্যাসিলারেটরে চাপ দিল। দেখতে দেখতে বাঘের মুখোমুখি! মাঝারি সাইজের রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। রাস্তার ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছে।
ঋজুদা স্টার্ট বন্ধ করে দিয়ে হেডলাইটটা জ্বালিয়ে রাখল বাঘের উপর। দশ হাত দূর থেকে বাঘটা অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল আমাদের দিকে। সন্দেহের চোখে। তারপর আস্তে আস্তে রাস্তা ছেড়ে বাঁদিকের খোলামতো জায়গায় নেমে গিয়ে একটা বড় সেগুন গাছের নীচে বসে পড়ল আমাদের দিকে মুখ করে।
ঋজুদা ফিসফিস করে বলল, বিবেকবাবু, মনে হচ্ছে আপনাকে পছন্দ হয়েছে।
বিবেকবাবুর বাঁ পাটা বাইরে ছিল। টক করে পাটা ভিতরে টেনে নিলেন উনি।
ঋজুদার কথায় ও বিবেকবাবুর পা সরানোর শব্দে বাঘের কান খাড়া হয়ে উঠল।
আমি বললাম, ঋজুদা, ব্যাক করে চলল। অ্যাটাক করবে।
ঋজুদা বলল, বলছিস তুই? বলেই, একটু ব্যাক করল জীপটা স্টার্ট দিয়ে।
দেখলাম, জীপের পেছোনোর সঙ্গে সঙ্গে বাঘটাও মুখ ঘুরিয়ে যাচ্ছে। আমাদের দিকে আস্তে আস্তে।
আবার স্টার্ট বন্ধ করে দিল ঋজুদা। জার্কিনের পকেট থেকে দেশলাই বের করে ফস্ করে পাইপ ধরাল।
বাঘটার কানটা আবার খাড়া হয়ে উঠল।
ঋজুদা বলল, ভাল করে দেখ নে রুদ্র, নইলে কলকাতায় গিয়ে বন্ধুদের গুল মারলে ওরা তোর সম্বন্ধে সন্দেহ করবে।
দুসস, আমি বললাম। বললাম বটে, কিন্তু আমার বুকের কাছটা ব্যথাব্যথা করছিল। ভীষণ গরম লাগছিল। গলা শুকিয়ে শুকনো হয়ে গেছিল। একটু জল হলে ভাল হত।
কোথাও কোনও শব্দ নেই। শুধু জঙ্গলের গন্ধ। ডানদিকের হল নদীর কুলকুল শব্দের সঙ্গে ভেজা মাটির সোঁদা সোঁদা গন্ধ। আর বাঘের গায়ের বোঁটকা গন্ধ। ঋজুদার পাইপে নিকোটিন আর জল জমে যাওয়ায় প্রত্যেক টানের সঙ্গে হুঁকোর মতো ভুড়ক ভুড়ক আওয়াজ বেরোচ্ছে।
এমন সময় বিবেকবাবু ফিসফিস করে বললেন, এমন খোলা জীপে বাঘের এত কাছে বসে থাকা কি ঠিক হবে?
ঋজুদা বলল, কথা বলবেন না মশায়!
বাঘটা একদৃষ্টে আমাদের দিকে তাকিয়ে নট-নড়নচড়ন নট-কিছু হয়ে বসে আছে তো আছেই। সেও আমাদের দেখছে, আমরাও তাকে দেখছি। শুভদৃষ্টি হল শেষ পর্যন্ত।
অনেকক্ষণ পরে ঋজুদা জীপ স্টার্ট করল। জীপ স্টার্ট করতেই বাঘটা উঠে দাঁড়াল। জীপটাকে ফাস্ট গীয়ারে দিয়ে একটু সামনে গড়িয়ে দিতেই বাঘটা উঠে দাঁড়িয়ে জীপের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। সমস্ত শরীরটা চার পায়ের মধ্যে ঝুলিয়ে দিয়ে।
হঠাৎ ঋজুদা খুব জোরে অ্যাকসিলারেটরে চাপ দিল। ইঞ্জিনের শব্দে ও হঠাৎ এগিয়ে যাওয়াতে বাঘটা একটু হকচকিয়ে গেল।
একটু দূরে গিয়ে ঋজুদা জীপটাকে থামাল।
আমরা পেছন ফিরে দেখলাম, বাঘটা রাস্তার মাঝখানে এসে আমাদের জীপের দিকে তাকিয়ে আছে। জীপটা থেমে যেতেই এক পা এক পা করে জীপের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল।
আমার হঠাৎ মনে হল, কলকাতাটা কী সুন্দর জায়গা! এমন সন্ধেবেলায় বঙ্গসংস্কৃতি সম্মেলনের আলোজ্বলা মেলায় ঘুরে বেড়াতে পারতাম মজা করে, তা নয়, ঋজুদার সঙ্গে এসে কী বিপদেই পড়লাম!
হঠাৎ হো-হো করে হেসে উঠল ঋজুদা। তারপর জীপটা স্টার্ট করে এগিয়ে চলল।
বাঘটাকে তখনও লক্ষ করছিলাম আমি ঘাড় ঘুরিয়ে। কিছুদূর হেঁটে এসে ও নাক তুলে আমাদের চলমান জীপের দিকে চেয়ে রইল।
বিবেকবাবু বললেন, হাসছেন কেন?
মজা দেখে, ঋজুদা বলল।
আমি বিরক্ত গলায় বললাম, মজাটা কীসের?
ঋজুদা গীয়ার বদলে বলল, বাঘটা বাচ্চা। এসব হচ্ছে বাচ্চা বাঘের স্বভাব। ও যা করছিল, তা সবই ওর অদম্য কৌতূহলের ফল। ওর কাছ থেকে কোনওই ভয় ছিল না। কিন্তু বিপদ ছিল ওর মায়ের কাছ থেকে। অবশ্য যদি জীপ থেকে নামতিস। ওর মা ধারেকাছেই ছিল।
আমি অবাক হয়ে বললাম, অত বড় ধেড়ে বাঘ যদি বাচ্চা হয়, তাহলে তো আমিও বাচ্চা!
ঋজুদা বলল, তুই তো বাচ্চাই। তুই যে নিজেকে বড় বলে সব সময় জাহির করতে চাস, এইটেই প্রমাণ করে যে তুই বাচ্চা।
স্বল্প-পরিচিত বিবেকবাবুর সামনে ঋজুদার এমন কথাবার্তা আমার পছন্দ হল না। চুপ করে রইলাম।…
অন্ধকার থাকতে থাকতে দরজায় ধাক্কা দিয়ে, টি-কোনিতে মোড়া টি-পটে করে গরম চা দিয়ে গেল বেয়ারা। হলঙের সমস্ত টুরিস্ট লজটা জেগে উঠেছে। বাথরুমে বাথরুমে জল পড়ার শব্দ হচ্ছে। ইলেকট্রিক আলো নেই। জেনারেটরের আলো সন্ধে থেকে রাত দশটা অবধি জ্বলে।
যখন আমরা কাঠের সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামলাম, দেখি চারটে হাতি দাঁড়িয়ে আছে পিঠে গদি নিয়ে। বনবিভাগের হাতি। ঋজুদা আর আমি একটা হাতির পিঠে উঠে পড়লাম। অন্য হাতিগুলোতে অন্য ঘরের লোকেরা। তারপর হাতিগুলো চলতে লাগল একসারিতে।
তখনও ম্লান চাঁদ আছে। শীতের শেষরাতে কুয়াশা, শিশির আর চাঁদে কেমন মাখামাখি হয়ে গেছে। সারা আকাশের বনেজঙ্গলে কোনও জাপানী চিত্রকর যেন ওয়াশের কাজের কোনও ছবি এঁকেছেন।
রাস্তার দু পাশে কতগুলো উঁচু উঁচু সোজা মেরুদণ্ডের গাছ। গাছগুলোর গায়ের রঙ সাদা। গুঁড়িগুলো মজার। খোপ খোপ করা। ঋজুদাকে শুধোলাম, কী গাছ এগুলো?
ঋজুদা বলল, তোকে ধরে মারব আমি। বাঙালীর ছেলে শিমুল গাছ চিনিস না?
একটু পরই অন্ধকার হালকা হতে লাগল। হেঁয়ালির রাত শেষ হয়ে প্রাঞ্জল দিন ফুটতে লাগল ফুলের মতো। হাতিরা হলঙ নদী পেরুল। জল থেকে ঠাণ্ডার ধোঁয়া উঠছে। ময়ূর ডাকল এদিক ওদিক থেকে। দেখতে দেখতে রুপো গলে গিয়ে সোনা এল। বুলবুলি জাগল, ময়না জাগল, টিয়ার ঝাঁক কোথায় না কোথায় কথা রাখতে তীরের মতো উড়ে গেল ট্যাঁ-ট্যাঁ করতে করতে।
আমরা শিমুল অ্যাভিন ধরে চলতে লাগলাম।
মাহুত বলল, এ পথটা গেছে জলদাপাড়ায়। যেখানে আমাদের বনবিভাগের পুরনো বাংলো আছে।
দুধারে গভীর বন। শাল, সেগুন, রাই-সেগুন। বড় বড় পুড়ী ঘাস– পাতা তাদের চওড়া, সতেজ, সবুজ। শিশু গাছ সরু সরু। ডানদিকে পড়ে আছে বিস্তীর্ণ তৃণভূমি খেয়ালী তোসা নদীর ফেলে-যাওয়া পথে। গভীর জঙ্গলের ফাঁক-ফোঁক দিয়ে চোখে পড়ে। গণ্ডারের আস্তানা ওখানে।
এই হল-জলদাপাড়ার জঙ্গল ঘিরে আছে অনেক নদনদী। ভারী সুন্দর এদের নাম সব। হল, বুড়ি তোসা, তোসা, চূড়াখাওয়া, বেলাকোওয়া আর মালঙ্গী।
একটু দূর গিয়ে পথ ছেড়ে বাঁদিকের নুনীতে নামল হাতিগুলো। এখানে জঙ্গল ফাঁকা করে কিছুটা জায়গায় মাটির সঙ্গে নুন মিশিয়ে রাখে বনবিভাগের লোকো। জংলী জানোয়ারেরা নুনের নেশায় আসে এখানে। জানোয়ারেরা তো আর বিড়ি-সিগারেট, পান-টান খায় না–ওদের নেশা বলতে নুন খাওয়া। হরিণ সম্বর অবশ্য মহুয়ার দিনে মহুয়া খেয়ে নেশা করে ভাল্লুকরাও। এই নুনী থেকে পায়ের দাগ দেখে সেই পায়ের দাগ অনুসরণ করে হাতি নিয়ে জঙ্গলে ঢোকে মাহুতরা।
আমি ঋজুদাকে বললাম, কী থ্রিলিং! এসে ভালই করেছি, কী বলো?
ঋজুদা ইয়ার্কি করল আমার সঙ্গে, বলল, যা বলেন!
তারপর বলল, বুঝলি রুদ্র, ঘণ্টা কয়েকের জন্যে বেশ রাজারাজড়া কি মন্ত্রী-টন্ত্রী মনে হচ্ছে না নিজেদের? যতদূর দেখা যায়, গাছগাছড়া, মানুষ কাঁকড়া সবকিছুর মালিক আমরা। হুজুর মা বাপ। বলো, হাতির পিঠে কেমন যাচ্ছি?
আমি বললাম, তা ঠিক। কিন্তু কোমরে ব্যথা করছে।
ঋজুদা চাপা হাসি হাসল। বলল, ভাত আর আলু খাওয়া বন্ধ কর, আইসক্রীমও। এতটুকু ছেলে, পেটে চর্বি থাকবে কেন?
হঠাৎ মাহুতরা মুখ দিয়ে একটা অদ্ভুত আওয়াজ করে হাতিগুলোকে এক এক করে নুনী থেকে বের করে আনল। পথে উঠতেই দেখলাম, দুটো গাঢ় খয়েরী রঙের বেশ বড় হরিণ ছুটে রাস্তা পেরিয়ে এদিকে জঙ্গল থেকে ওদিকের জঙ্গলে গেল।
হরিণ! হরিণ! করে চারটে হাতি থেকে জনা পনেরো লোক সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠল। আর সেখানে হরিণ থাকে? মাইল দুয়েক চলে যাবে বোধহয় এক দৌড়ে।
ঋজুদা গম্ভীর মুখে বলল, বনবিভাগকে সাজেস্ট করব যে, সকলের মুখ ভোরবেলা স্টিকিং-প্লাস্টার দিয়ে সেঁটে দেবে।
আমি ফিসফিস করে বললাম, কী হরিণ ওগুলো? ওড়িশাতে তো দেখিনি? বিহারেও না!
ঋজুদা বলল, এগুলো হডিয়ার। এগুলো এই রকম জঙ্গলেই দেখা যায়। আমাদের কাজিরাঙ্গায় গেলে দেখতে পাবি সোয়াম্প ডিয়ার। আরও বড় হয়। জলকাদা ঘাসবনে পাওয়া যায় ওগুলো।
এবারে মাহুতেরা হঠাৎ খুব সাবধানী হয়ে গেল। হাতিগুলোর সঙ্গে কী সব সাংকেতিক ভাষায় কথাবার্তা বলতে লাগল। মাঝে মাঝে ডাঙ্গসের বাড়ি মারতে লাগল মাথায়। একটা হাতির সঙ্গে একটা ছোট সুনটুনী-মুনটুনী বাচ্চা ছিল। সেটা মায়ের পায়ে পায়ে যাচ্ছিল, মাঝে মাঝে মা দাঁড়িয়ে পড়লেই চুকচুক করে একটু দুধ খেয়ে নিচ্ছিল। ঋজুদা ফটাফট তার ছবি তুলছিল।
হাতিগুলো ডানদিকের নলবনে খুব সাবধানে এগোতে লাগল। এত গভীর নলবন যে হাতি ডুবে যায়। নলের ফুলগুলো কী সুন্দর! যার চোখ আছে সে-ই দেখতে পায়। রুপোলি আর লালে মেশা কী নরম রেশমী ফুলগুলো। গালে চেপে ধরে চুমু খেতে ইচ্ছে করে।
ঋজুদা ফিসফিস করে কী শুধোল যেন মাহুতকে।
মাহুত বলল, তেঁড়া। বলেই সতেজ সবুজ ঘাসের বনে ঢুকল।
সবুজ পাইপটা জার্কিনের পকেটে ঢুকিয়ে রেখে, ক্যামেরাটা দুহাত দিয়ে ধরল ঋজুদা।
আমরা একটা জায়গায় এসে পড়লাম, সেখানে ঘাসের বন বিরাট জায়গা জুড়ে জমির সঙ্গে সমান হয়ে গেছে। গণ্ডার বা গেঁড়ারা রাতে এখানে শুয়েছিল। ভারী চমৎকার সবুজ, নরম নিত্য-নতুন বিছানা ওদের। মাথায় গাছের চাঁদোয়া– নীচে ঘাসের বিছানা, পাতার বালিশ। দিব্যি আছে।
এ জায়গায় পৌঁছে হাতি ও মাহুতেরা একটু আড়ষ্ট হয়ে গেল। হঠাৎ বড় হাতির মাহুত কী একটা আদেশ করল তার হাতিকে। হাতিগুলো একে একে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে ঘাস জঙ্গল ভেঙে এগোতে লাগল। এদিকে বড় বড় পুড়ী ঘাস, চওড়া সতেজ সবুজ পাতা এদের। সোজা উঠেছে।
এখন গাছের চাঁদোয়া নেই। নীল আকাশে রোদ চকচক করছে। মাথার উপরে বাজপাখি উড়ছে চক্রাকারে। দারুণ এক সুগন্ধী প্রভাতী নিস্তব্ধতা চারিদিকে। শুধু হাতির পা ফেলার নরম শব্দ ছাড়া কোনও শব্দ নেই।
সামনে চোখ পড়তেই আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। সেঞ্চুরিয়ান ট্যাঙ্কের মতো তিনটে একশিঙা গণ্ডার ও একটা বাচ্চা গণ্ডার দাঁড়িয়ে আছে সামনের ফাঁকা জায়গাটাতে। তাদের পেছনে আদিগন্ত নলবন। খেয়ালী তোসর ফেলে-যাওয়া পথে গজিয়ে-ওঠা নল। আরও দূরে মেঘ-মেঘ ভুটান পাহাড়। ওদের দুপাশে সবুজ সুস্পষ্ট পুড়ীর জঙ্গল। পায়ের নীচে মিষ্টি গন্ধের বাংলার মাটি, নুড়ি, সাদা বালি। মাথার উপরে ঝকঝকে নীল আকাশ। ওদের নাকে স্বাধীনতার গন্ধ, চোখে সাহসের দ্যুতি।
কতক্ষণ যে তাকিয়েছিলাম মনে নেই তা। হঠাৎ এক ভদ্রমহিলার হাত থেকে একটা চা-ভর্তি থামোফ্লাস্ক থপ করে নীচে পড়ল।
ব্যাস্। গণ্ডারগুলোর মধ্যে চঞ্চলতা দেখা গেল। ওরা পরাধীন হাতির পিঠে-বসা শিক্ষিত, জামা-কাপড় পরা ভীতু প্রাণীগুলোর থেকে দূরে, আরও দূরে সরে যেতে লাগল।
দিগন্ত ওদের সবসময় হাতছানি দেয়। খোলা আকাশ, খোলা বাতাস ওদের ডাকে। ওরা আমাদের পেছনে ফেলে ঘৃণায় পা ফেলে ফেলে, অবহেলায়, দ্রুত চলে যেতে লাগল।
ওদের যতক্ষণ দেখা গেল, চুপ করে চেয়ে রইলাম। চোখের দূরবীক্ষণেও যখন ওদের আর দেখা গেল না, ওরা মিলিয়ে গেল দিগন্তের নলবনে, তখন হুঁশ হল আমার।
ঋজুদা বলল, তাহলে এবার ইডেনে গো-হারান ডাংগুলি খেলা না দেখে ভালই করেছিস বল?
আমি হেসে ফেললাম।
বললাম, যা বলেছ। টিকিট না পাওয়ার জন্যে আর দুঃখ নেই।
ঋজুদা বলল, কলকাতা ফিরে তোর সব বন্ধুদের বলবি, ক্রিকেট ছাড়াও উত্তেজনাকর আরও অনেক কিছু আছে। আমাদের বনবিভাগ এত সুন্দর সব বন্দোবস্ত করে রেখেছে, তোরা ছেলেমানুষরা যদি এসব না দেখবি, প্রকৃতির মধ্যে এসে প্রকৃতিকে না উপলব্ধি করবি, না জানবি, তাহলে এত আয়োজন কাদের জন্যে?
আমি অনেকক্ষণ চুপ করে থাকলাম। ভাল লাগায় আমার বুক ভরে উঠেছিল।
হাতিগুলো এবারে দূরের নলবনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকল।
এরাও কি দিগন্তের দিকে যাচ্ছে? এই জড়বুদ্ধি পরাধীন জানোয়ারগুলোরও কি স্বাধীন হওয়ার শুভ ইচ্ছা জাগল মনে? এদের নাকেও কি খোলা আকাশ, খোলা বাতাসের বাস লেগেছে?
কে জানে!
