মেলাবেন তিনি মেলাবেন (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত
(৭)
ক্যাফেটেরিয়াটা বিশাল, সবকিছুই ব্যুফে সিস্টেমে। ডেসার্টের টেবিলটা সত্যিই দেখার মতো। হরেক রকমের ফুট-কেক, চীজকেক, ডেনিশ, পাই, চকোলেট চিপস কুকির পাশে আপেল, আঙুর, ব্লুবেরি, স্ট্রবেরি, কলা ইত্যাদি ফল থরে থরে সাজিয়ে একটা চমৎকার স্ট্যাচু বানানো হয়েছে। ওটা অবশ্য শো-এর জন্য কিন্তু তারপাশে আনারস, তরমুজ, আম, ইত্যাদি অসংখ্য চেনা-অচেনা ফল খাবার জন্য রাখা আছে। এছাড়া নানান দেশের নানান খাবার বিভিন্ন সার্ভিং টেবিলে সাজানো। ভারতীয় খাবারও দেখলাম রয়েছে একটা টেবিলে।
এ ধরণের জায়গায় এলে যা হয়, যা খাওয়া উচিত তার থেকে অনেক বেশি প্লেটে তুলে একটা টেবিল বেছে আমরা বসলাম। আমরা ঢোকার কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখলাম ক্যাফেটেরিয়াতে আর কোনও টেবিল খালি নেই। বাইরে কিছু লোকে দাঁড়িয়ে আছে, টেবিল খালি হলে ঢুকবে।
খেতে খেতে গল্প করছি, এমন সময় দেখি টিম একটা ট্রে হাতে বসার জায়গা খুঁজছেন। আমি হাত নেড়ে ডেকে ওঁকে আমাদের টেবিলে বসালাম। টিমের সঙ্গে আলাপ হবার কথা একেনবাবু আর প্রমথকে এর মধ্যেই বলেছি। একজন ভালো রিসোর্স, ক্রুজ সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন থাকলে জেনে নেওয়া যাবে। একেনবাবু যখন সঙ্গে আছেন আমাদের তরফ থেকে প্রশ্নের কোনো অভাব হবে না।
টিম সত্যিই একজন গ্র্যান্ড লোক। এই লাইনে প্রচুর অভিজ্ঞতা। প্রমথ যে প্রমথ তার চোখমুখ দেখেও বুঝলাম ও-ও খুবই ইমপ্রেসড। ক্রুজ ডিরেক্টরদের যে কতরকম ঝামেলা পোহাতে হয়, সেটা টিমের মুখে না শুনলে বিশ্বাস করতাম না। ছোটোখাটো এমার্জেন্সি সার্জারি থেকে শুরু করে বাচ্চা ডেলিভারি, চুরি, খুন, জলে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা–সবরকম সমস্যার মধ্যেই ওঁকে পড়তে হয়েছে। মাঝে মাঝে সেটা ব্যক্তিগত পর্যায়েও চলে গেছে। এক মহিলা হঠাৎ ওঁর প্রেমে পড়ে গিয়ে ক্রুজের সাতটা দিন ওঁর জীবন হেল করে দিয়েছিলেন হাসতে হাসতে সেই গল্পটা করলেন। হ্যাপিলি ম্যারেড বলেও নিষ্কৃতি পাননি। মহিলাটির ভারসাম্যের খুবই অভাব ছিল। একদিন হঠাৎ ওঁর অফিসে ঢুকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে শুরু করেছিলেন! সার্ট খোলারও চেষ্টা করেছিলেন! লাকিলি এক মহিলা সহকর্মী সেখানে থাকায় ব্যাপারটা সামলানো গিয়েছিল।
‘মাই গড!’ আমি বললাম।
“হ্যাঁ এক আধসময়ে এরকম ঘটে। একজন বৃদ্ধা তাঁর নাতির জন্য আমার টুপিটা কিনে নিতে চেয়েছিলেন। আমি বললাম এরকম টুপি আপনি এই জাহাজের একটা দোকানেই পাবেন। বুড়ি তাতে রাজি নন। নাতির নাকি আমার টুপিটাই পছন্দ হয়েছে। তার জন্য তিনি দু’শো ডলার দিতেও রাজি!”
“ভালোই তো হত,” প্রমথ বলল। “দু’শো ডলার পকেটে আসত, আর আপনি ওটা হারিয়ে গেছে বলে রিপোর্ট করতেন। জাহাজের বাইরের ডেকে যা বাতাস, একজনের ক্যাপ তো আমার সামনেই উড়ে গেল!”
“মন্দ বলেননি,” টিম হাসলেন। “তবে দু’শো ডলার তো কিছুই না, মাস কয়েক আগে একজন ফ্রেঞ্চ ভদ্রলোক এসেছিলেন। উনি আবার ইংরেজি জানেন না। আমার ফ্রেঞ্চ জ্ঞান খুব ভালো নয়, তবে কাজ চালাতে পারি। অফিসে আমার টেবিলে একটা ছোট্ট পাথরের মূর্তি দেখে বললেন, ওটা কিনতে চান। আমি ওঁকে বোঝাবার চেষ্টা করলাম, জাহাজে আমি কোনো কিছু বিক্রি করতে পারি না। তাছাড়া ওটা জন্মসূত্রে পাওয়া আমার গ্রেট গ্র্যান্ড ফাদারের কালেকশন, বিক্রি করার প্রশ্ন উঠছে না। ভদ্রলোক মূর্তিটা হাতে তুলে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে ডেস্ক থেকে একটা কাগজ তুলে সেখানে লিখলেন ‘অফার এক হাজার ডলার। আমি মাথা নাড়লাম। ভদ্রলোক আবার কাগজটায় কী জানি লিখে এগিয়ে দিলেন। দুটো কোশ্চেন মার্ক –অ্যাড্রেস আর ফোন। আমি কোনো সিক্রেট লোকেশনে থাকি না। তাই ঠিকানা আর ফোন নম্বর লিখে দিলাম। ভদ্রলোক আর কিছু না বলে চলে গেলেন।”
“ইন্টারেস্টিং স্যার,”একেনবাবু বললেন। “আপনার গ্রেট গ্র্যান্ড ফাদারের কি অনেক কালেকশন ছিল?”
“অনেক কিনা বলতে পারব না, পাথরের কয়েকটা মূর্তি ছিল। নিজেও নাকি পাথর নিয়ে খুটখাট করতেন। সত্যিকথা বলতে কি, এসব কথা আমি জানতামও না। আমার স্ত্রী-ই বাবার কাছ থেকে শুনেছিলেন। গত বছর বাড়িটা বিক্রির জন্যে যখন মার্কেটে দেওয়া স্থির করেছি, তখন আমার স্ত্রী অ্যাটিকটা পরিষ্কার করান। পুরোনো অনেক জিনিসের মধ্যে একটা ধুলো-ধুসরিত ব্যাগের মধ্যে ওই মূর্তিটাও ছিল। আমার পছন্দ হওয়ায় ক্রুজ সিজন শুরু হবার সময় ওটা সঙ্গে নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু গল্পটার শেষ এখানে নয়, নিউ ইয়র্কে ফিরে…।”
টিম কথাটা শেষ করতে পারলেন না, এরমধ্যে একজন স্টাফ হন্তদন্ত হয়ে এসে টিমকে ডেকে কী জানি বলল। টিম উঠে পড়ে বললেন, “সরি আমাকে একটু সাহায্য করতে হবে। রিটায়ার করেও নিষ্কৃতি নেই।”
টিম চলে যাবার পর একেনবাবু বললেন, “টুলি অ্যামেজিং ম্যান স্যার, একেবারে ফ্যাসিনেটিং।”
আমরা তখনই ঠিক করে ফেললাম আমাদের ডিনার টেবিলেও টিমকে বসাব। তাতে কোনো অসুবিধা নেই, কারণ টেবিলে চারজন ধরে। কিন্তু একটাই মুশকিল টিম কোন স্টেটরুমে আছেন সেটাই জানা হয়নি। স্টেটরুম? ও হ্যাঁ, ক্রুজ শিপে ক্যাবিনকে বলা হয় স্টেটরুম।
