মেলাবেন তিনি মেলাবেন (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত

শেয়ার করুনঃ

(১২)

বাড়ি ফিরে দেখি একেনবাবু নিবষ্টমনে একটা বই পড়ছেন।

 

“কী পড়ছেন?”

 

“ওই –যে বইটার কথা টোনি র‍্যামাডিন সেদিন বললেন। কাল লাইব্রেরি থেকে নিয়ে এলাম। ভেরি ইন্টারেস্টিং স্যার। ১৮৮৫ সাল থেকেই হুগলি জেলা থেকে বাঙালি মুসলমানদের ছোটো ছোেটো দল ট্রাঙ্ক ও বস্তাভর্তি এমব্রয়ডারি করা সিল্কের শাল, টেবিলক্লথ, বালিশের ওয়াড় ইত্যাদি নিয়ে নিউ ইয়র্কে আসা শুরু করেছিলেন। সত্যি স্যার, কীরকম এন্টারপ্রেনার ছিলেন ওঁরা! আর এখনকার বাঙালিদের দেখুন, ব্যাবসা করতেই ভুলে যাচ্ছে!”

 

“বুঝলাম, তা সারাদিন বসে বসে বই পড়ছিলেন?”

 

“না স্যার লাঞ্চও খেয়েছি। আসলে ইংরেজি বই তো, পড়তে একটু সময় লাগে। আপনি কি করলেন সারাদিন?”

 

আমি আঙ্কল জ্যাকের সঙ্গে দেখা হবার কথা বললাম। একেনবাবু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব কিছু শুনলেন। তারপর মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, “ভেরি ইন্টারেস্টিং স্যার, ভেরি ইন্টারেস্টিং… তাহলে তো ঠিকই লেখা ছিল ক্রুজশিপের সেই বইটাতে!”

 

“হ্যাঁ, আমিও সেটা ভাবছিলাম আঙ্কল জ্যাক যখন গল্পটা করছিলেন।”

 

“ওই যাঃ, গল্পে গল্পে আসল কথাটাই তো ভুলে গেলাম আপনাকে বলতে!” একেনবাবু হঠাৎ ব্যস্ত হয়ে বলে উঠলেন। “আরেকটা ডেভালপমেন্ট হয়েছে স্যার, এড ফাউলার সাহেবের পরিচয়টা পাওয়া গেছে।”

 

“কে? রিক স্প্রে?”

 

“আরে না স্যার, লোকটা একটা জেলখাটা আর্ট-চোর। তবে ইন্টারেস্টিং ক্যারেক্টার। উনি চুরি করে টাকা রোজগার করতেন না। টাকা পেলে চুরি করতেন।”

 

“সেটা আবার কী ধরনের প্রফেশন?”

 

“ক্লিন প্রফেশন স্যার। চোরাই মাল নিয়ে ভাবতে হয় না, সেটা পাচার করার ভার অন্য লোকের। উনি শুধু ওঁর চুরি করার ক্ষমতাটা ব্যবহার করতেন।”

 

“বাঃ, ডিভিশন অফ লেবার। কিন্তু ওঁর ক্লায়েন্ট কারা ছিল?”

 

“রেস্পেক্টেবল কেউ নয় স্যার। যতটুকু জেনেছি একটা মাফিয়া গ্যাং, তার বেশি কিছু জানতে পারিনি।”

 

“বেশ। তা ফাউলার সাহেবের এই পরিচয়টা পেলেন কী ভাবে?”

 

“ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্ট বললেন। এফবিআই-র ফিঙ্গারপ্রিন্ট ডেটাবেস থেকে ওঁর আসল পরিচয়টা চট করেই পুলিশ পেয়ে গিয়েছিল। এতদিন চুপচাপ ছিল, কারণ ওঁর নেটওয়ার্কে কারা আছে, সেটা বার করার চেষ্টা চলছিল।”

 

“ধরে নিচ্ছি এখন পাওয়া গেছে। কিন্তু একটা জিনিস আমার কাছে স্পষ্ট নয়। আপনি বললেন, উনি টাকা পেলে ক্লায়েন্টের জন্যে চুরি করতেন। সেক্ষেত্রে বাংলা দেশে ওঁর চিঠি পাঠানোর কারণটা তো স্পষ্ট হচ্ছে না।”

 

“একদম খাঁটি কথা বলেছেন স্যার। একদম খাঁটি কথা… এই রে চারটে বেজে গেছে!” ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আমাকে একটু বেরোতে হবে স্যার” বলে একেনবাবু অদৃশ্য হলেন।

 

টিপিক্যাল একেনবাবু, মাথায় কখন কি ঘুরছে দেবা না জানন্তি!

 

উনি ফিরলেন সেই সন্ধেবেলায়। হাতে একটা কাগজ। আমি আর প্রমথ তখন বসে চা খাচ্ছি আর প্রমথকে বেভের আঙ্কলের সঙ্গে আমাদের দেখা হবার কথাটা বলছি। প্রমথ অ্যাস ইউয়াল আমার লেগপুল করছে। “হঠাৎ কলকাতায় যাবার কথা ভাবছেন কেন, ভাগ্নির ভাবি শাশুড়ির সঙ্গে দেখা করতে?”।

 

“তোর চ্যাঙড়ামি মাঝে মাঝে সীমা ছাড়িয়ে যায়। যা বলছি, সেটা বোঝার চেষ্টা কর– আর্টের এই যে বিশাল মার্কেট, সেটা শুধু শিল্পের প্রেম থেকে নয়।”

 

“সেটা একেনবাবু দেখুন। যদিও বলি, এই কেসটায় বেগার খাটছেন, একটা পাইসও ওই ফ্রেঞ্চবুড়ো দেবে না, আর মামুদের খালু-রহমান সাহেবের কাছ থেকেও কিছু মিলবে না।”

 

একেনবাবুকে ঘরে ঢুকতে দেখে প্রমথ বলল, “এই যে আপনার কথাই হচ্ছিল। Pro bono কেসটা নিয়ে কদুর এগোলেন?”

 

‘প্রো বোনো’ মানে বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করা। একেনবাবু মুচকি হেসে হাতের কাগজটা এগিয়ে দিলেন।

 

কাগজটাতে একটা ফোটো আর তার নীচে মনে হয় সেই ফোটোর উলটোপিঠের ছবি ফটোকপি করা।

 

“এটা কি?” প্রমথ জিজ্ঞেস করল।

 

“ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্ট দিলেন। অরিজিনাল ছবিটা কুইন্সের পুলিশের কাছে। এই ছবিটার সঙ্গে মিস্টার ব্যাসারাথের বাড়ির তিনটে স্ট্যাচুও পুলিশ স্টেশনে আছে। সবগুলোই উদ্ধার করা হয়েছে মিস্টার ফাউলারের ঘর থেকে।”

 

ছবিটা পুরোনো, বোঝা যাচ্ছে বেশ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। একজন মেমসাহেবের সঙ্গে একটি ভারতীয়। ছবির পিছনে হাতে লেখা। mon cher ami Maqbul Hossain de Gaibasa, Bengal নীচে একটা সই Camille Claudel।

 

“এর অর্থ?” আমি প্রমথকে জিজ্ঞেস করলাম। আমাদের মধ্যে প্রমথই যা একটু ফ্রেঞ্চ জানে।

 

প্রমথ উত্তর দিল, “আমার প্রিয় বন্ধু মকবুল হোসেন, গাইবাসা, বাংলা।” তারপর বিজ্ঞের মতো বলল, “পুরোনো ছবি, ১৯০৫-এর আগে তোলা।”

 

“কী করে বুঝলি?”

 

“কারণ বঙ্গভঙ্গ হয়েছিল ১৯০৫ সালে। ছবিটা তার পরে তোলা হলে পূর্ববঙ্গ লিখত।

 

“এক্সলেন্ট স্যার।”

 

“থ্যাঙ্ক ইউ, এবার বলুন, এই ছবি থেকে আমরা আর কী কী সিদ্ধান্তে আসব?”

 

“তার আগে এককাপ কফি হলে সুবিধা হত স্যার। আপনাদের এই চা ঠিক জমবে না।”

 

“এমন ক্রিটিক্যাল সময়ে অনুরোধটা করেন যে ঠিক ফেলা যায় না।” বলে প্রমথ বিরক্ত মুখে কিচেনের দিকে এগোল। ওর পেছন পেছন আমরা সবাই কিচেনে হাজির হলাম।

 

গ্রাইন্ডারে কফির বিন গুঁড়ো করে, কফি মেকারে জল চাপিয়ে যখন ব্রুইং চলছে, তখন একেনবাবু শুরু করলেন, “স্যার এই ছদ্মনাম নেওয়া এড ফাউলার আসলে যে একজন আর্টচোর ছিলেন সেটা তো বলেছি। একটু আগে জানলাম ওঁর ক্লায়েন্ট ছিল শিকাগোর একটা মাফিয়া গ্যাং। বিজনেস এক্সপ্যানশনের জন্যে উনি আরেকটা গ্যাং-এর হয়েও কাজ করা শুরু করেছিলেন। মাস তিনেক আগে একটা লোকাল নিউজ পেপারে দেখেছিলেন একজন ফ্রেঞ্চম্যান পনেরো-শো ডলার দিয়ে হার্লেমের এক ভদ্রলোকের কাছ থেকে একটা মূর্তি কেনার চেষ্টা করেছেন। শুধু সেই মূর্তিটা নয়, আরও কয়েকটা মূর্তি সেই ভদ্রলোকের বাড়িতে এখনও পড়ে আছে। সবগুলো মূর্তিই বাড়ির মালিকের ঠাকুরদার বাবার সম্পত্তি, অর্থাৎ বেশ পুরোনো। বুঝতেই পারছেন স্যার কোন মূর্তিগুলোর কথা বলছি?”

 

“না বুঝতে পারার কথা নয়।” প্রমথ একটু বিরক্ত হয়ে বলল, “অত ভনিতা না করে একটু তাড়াতাড়ি বলুন।”

 

“তাড়াতাড়ি বলতে গেলে স্যার, আমার গুলিয়ে যায়।”

 

“আঃ, ফোড়ন কাটিস না তো, প্রমথ। আপনি নিজের মতো করে বলুন।”

 

“থ্যাঙ্ক ইউ স্যার। হ্যাঁ, যেটা বলছিলাম, এড সাহেব বুঝতে পারলেন মূর্তিগুলো যখন এত পুরোনো, সেগুলোর একটা মূল্য থাকবে। উনি সেই বাড়িটা একবার দেখেও এলেন। ওখান থেকে কিছু চুরি করা ওঁর পক্ষে জলভাত। সুযোগও মিলল, যখন মিস্টার ব্যাসারাথরা বাইরে গেছেন। চুরি করার সময়ে স্ট্যাচুগুলো ছাড়া একটা পুরোনো ছবিও দেখলেন অ্যাটিকের ব্যাগে আছে। এই সেই ছবি যার কপি আপনারা দেখেছেন। মনে হয় এই ছবিটাই মোড়া ছিল খবরের কাগজ দিয়ে। আগেই বলেছি স্যার, এই ফাউলার যুক্ত ছিলেন শিকাগোর একটা ক্রাইম ফ্যামিলির সঙ্গে। তাদের প্রাইভেট আর্ট কলেকশনের ব্যাপারে অনেক কাজকর্ম করেছিলেন। নিজে আর্ট চোর বলে আর্ট সম্পর্কে কিছু জ্ঞানও ছিল। কেমিল ক্লদেল নামটা তাঁর কাছে নিশ্চয় অপরিচিত ছিল না। এড সাহেব হিসেব করে দেখলেন বাড়ির মালিকের ঠাকুরদার বাবা কেমিল ক্লদেলের সমসাময়িক। কিন্তু এই ছবি আর মূর্তিগুলো ওঁর কাছে এল কী করে? অ্যাস সাচ এই ছবিটা মূল্যবান, কিন্তু এর মূল্য অনেক হবে যদি প্রমাণ করা যায় যে এই মূর্তিগুলোও কেমিলের তৈরি। সেইজন্যেই তিনি একটা চিঠি পাঠিয়েছিলেন রহমান সাহেবের বাড়িতে।”

 

“এক সেকেন্ড,” আমি বললাম। “সময়ের হিসেবটা কি ঠিক ছিল?”

 

“তাই তো মনে হয় স্যার। লোকাল পত্রিকায় টিমের বয়স দেওয়া ছিল ৬০ বছর, তার মানে জন্ম ১৯৫৫ সালে। যদি ভাবা যায় অ্যাভারেজ ৩০ বছর বয়সে সন্তানদের জন্ম হয়েছে। তাহলে একটা রাফ এস্টিমেট করা যায়। টিমের বাবার জন্ম ১৯২৫, টিমের ঠাকুরদার জন্ম ১৮৯৫ আর ঠাকুরদার বাবার জন্ম ১৮৬৫ সালে। উইকিপেডিয়া অনুসারে কেমিলের জন্ম ১৮৬৪-তে। সুতরাং কোনো সন্দেহই নেই যে টিমের ঠাকুরদার বাবা ব্রায়ান ব্যাসারাথ কেমিলের সমবয়সি ছিলেন। কিন্তু প্রশ্ন হল ব্রায়ান ব্যাসারাথের কাছে এই ছবিটা এল কী করে? সেক্ষেত্রে কি ফ্রেঞ্চ লেডি ব্রিজিট ম্যাডামের বাবা দাবিয়াল সাহেবের অভিযোগ সত্যি? ব্রায়ান ব্যাসারাথ এগুলো চুরি করেছিলেন দানিয়াল সাহেবের পূর্বপুরুষের ফ্যামিলি ট্রেজার থেকে? ব্রায়ান ব্যাসারাথ নিজে নিশ্চয় করেননি, করেছিলেন তাঁর ছেলে, যেহেতু এটা চুরি হয়েছিল দানিয়েল সাহেবের ঠাকুরদার কাছ থেকে।

 

অঙ্কে এগুলো মিললেও দিস ডাস নট মেক এনি সেন্স। তারপরেও একটা প্রশ্ন থাকছে হু কিলড এড ফাউলার? ফ্র্যাঙ্কলি আই ওয়াজ কনফিউজড স্যার। ভেরি ভেরি কনফিউজড। আসলে স্যার আমি সবকিছু মেলাবার চেষ্টা করছিলাম, আর সেটাই ছিল আমার প্রবলেম। ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইভেন্টকে কানেক্ট করার চেষ্টা করলে অ্যাবসার্ড রেজাল্ট আসে। এড ফাউলারের মৃত্যুর সঙ্গে টিম ব্যাসারাথের মূর্তি মেলাতে গিয়েই হয়েছে যত ঝামেলা। যদি মনে করি দুই মাফিয়া গ্যাং-এর সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে উনি দু’দলেরই বিষনজরে পড়েছিলেন। আর এদের হাত থেকে বাঁচার জন্যে উনি নাম ভাঁড়িয়ে এড হয়েছিলেন এবং খুনও হয়েছিলেন এদেরই কারোর হাতে, তাহলে একটা বড়ো কনস্ট্রেইন্ট অদৃশ্য হয়। অর্থাৎ এই স্ট্যাচুগুলো বা ছবির সঙ্গে এডের মৃত্যুর কোনো যোগ নেই। বাকি রইল স্যার তিনটে স্ট্যাচু, যার একটি মিস্টার দানিয়েলের দাবি ওঁদের ফ্যামিলির ট্রেজার থেকে চুরি করা হয়েছে। তাঁর দাবিটা জোরদার হচ্ছে, কারণ যে ছবিটা ঐ মূর্তির সঙ্গে পাওয়া গেছে, সেখানে ব্যাসারাথ নেই, আছেন এক মকবুল রহমান। আর এই মকবুল রহমানকে ধরে নেওয়া যেতে পারে রোদাঁর সেই ছাত্র যিনি পরে খুন হন। এঁর কথাই আমি ক্রুজ শিপে একটা বইয়ে পড়েছি আর বাপিবাবুও এই গল্প অনেক ডিটেইলে শুনেছেন বেভ ম্যাডামের আঙ্কল জ্যাকের কাছে।

 

“হঠাৎ স্যার আমার মনে হল, আমরা নাম নিয়ে বিভ্রান্ত হয়েছি। নাম দিয়ে কি আসল মানুষ চেনা যায়? হ–জ–ব-র-ল’র হিজি বিজিবিজ আর তাই তো একই লোক?

 

“হোয়াট ডু ইউ মিন?”প্রমথ বলল।

 

“বলছি স্যার, তার আগে বলুন, একজন মানুষকে মেরে পুড়িয়ে দেবার অর্থ কি?”

 

“খুবই সিম্পল, যাকে খুন করা হয়েছে, তাকে যেন কেউ চিনতে না পারে। সেক্ষেত্রে সেই লোকটিকে খুন করার যাদের মোটিভ থাকবে, তারা পিকচারেই আসবে না।”

 

“ কিন্তু যে খুন করেছে সে তো খুনের কথা অস্বীকার করেনি, শুধু পোড়ানোর কথা অস্বীকার করেছে।”

 

“স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে কারণ ধরা পড়ে গেছে বলে।”

 

“কিন্তু পোড়ানোর কথা স্বীকার করলেও তো শাস্তি বেশি হতো না।”

 

“কিন্তু সেই যে পুড়িয়েছে, সেটাই বা আপনি ধরছেন কেন?”

 

“ঠিক কথা স্যার। ইন ফ্যাক্ট, এ নিয়ে তো অজস্র গল্প আছে। একটা মৃতদেহ পুড়িয়ে নিজেকে মৃত প্রমাণ করে আত্মগোপন করা।”

 

“আপনার পয়েন্টটা কি?”এবার আমি বললাম।

 

“বলছি স্যার। আসলে আমার চোখ খুলে গেল বিবেক বন্ডের বইটা পড়তে পড়তে। ঐ বইটা পড়ে জানলাম ১৮৮৫ সাল থেকে হুগলি জেলা থেকে বাঙালি মুসলমানদের নিউ ইয়র্কে আসার কথা। এঁদের সবাই প্রথমে থাকার জায়গা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন স্প্যানিশ হার্লেম, যেখানে মিস্টার ব্যাসারাথরা আছেন। আপনাদের মনে আছে কিনা জানি না স্যার, সেদিন প্রফেসর টনি র্যমাডিন মিস্টার ব্যাসারাথের বাড়িতে একটা প্ৰফাউন্ড কথা বলেছিলেন।”

 

“কী কথা?”

 

“নতুন দেশে স্বজাতীয়দের সঙ্গে থাকাটা শুধু বুদ্ধিমানের কাজ নয়, নিশ্চিন্তে বেঁচে থাকারও উপায়। সব মুসলিম বাঙালি ওখানে গিয়ে আস্তানা গড়ার প্রসঙ্গে প্রফেসর র‍্যামাডিন একটু ঠাট্টা করেই মিস্টার ব্যাসারাথকে বলেছিলেন, আপনারা হচ্ছেন হংস মধ্যে বকথা। কথাটা শুনে তখনই আমার একটু খটকা লেগেছিল… হোয়াই? মিস্টার ব্রায়ান ব্যাসারাথ ত্রিনিদাদের লোকেদের থাকার জায়গা লং আইল্যান্ড বা ব্রুকলিনে না গিয়ে স্প্যানিশ হার্লেমে গেলেন কেন? তিনি কি জাহাজের বাঙালি মুসলমানদের সঙ্গেই বেশি একাত্ম বোধ করেছিলেন, যদিও উনি নিজে চিকন ব্যবসায়ী ছিলেন না!

 

“জাহাজে করে যারা নিউ ইয়র্কে এসে নেমেছিলেন, তাদের রেকর্ড স্যার নেট-এ এখন পাওয়া যায়। ব্রায়ান ব্যাসারাথের এদেশে আসার কোনো রেকর্ড আমি নেট থেকে বার করতে পারিনি। ১৮৯২ থেকে ১৮৯৭ সালের বেশ কিছু রেকর্ড আগুনে পুড়ে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ধরে নিচ্ছি ঐ সময়ের মধ্যেই উনি এসেছিলেন। প্রশ্ন হল যে ব্রায়ান ব্যাসারাথ নিউ ইয়র্কে এসেছিলেন, তিনি সত্যিই ব্রায়ান ব্যাসারাথ কিনা। আমার থিওরি হল ব্রায়ান ব্যাসারাথ নাম নিয়ে যিনি এসেছিলেন, তিনি হলেন মকবুল রহমান।”

 

“দাঁড়ান, দাঁড়ান, এই থিওরির বেসিস কি?” আমি প্রশ্ন করলাম।

 

“এবার মুশকিলে ফেললেন স্যার। যেটা আমরা জানি, সেটা হল মকবুল রহমানের একজন রুমমেট ছিল। এই রুমমেটই মকবুল রহমানকে থানা থেকে ছাড়িয়ে এনেছিলেন। থানা থেকে ছাড়া পাওয়ার ক’দিন বাদে মকবুল রহমান যখন খুন হন। মকবুল বাড়ি ফিরছে না দেখে, সেই রুমমেট কিন্তু থানায় খোঁজ নিতে আসেননি। কয়েকদিন বডিটা মর্গে পড়ে থাকার পর আঙুলের আংটি দেখে মকবুলের বডি বলে সনাক্ত করেছিলেন কেমিল ক্লদেল। বডি আইডেন্টিফাই করার জন্য পুলিশ সেই রুমমেটকে পায়নি। এমন কি মকবুলের ফিউনারেলও কেমিল অ্যারেঞ্জ করেন। রুমমেটের এই অদৃশ্য হয়ে যাওয়াটা বদারড মি স্যার, বদারড মি এ লট। মুশকিল হল, সেই রুমমেটের নাম পত্রিকায় ছিল না। এখন এটা কি সম্ভব স্যার, মকবুল রহমানের সেই রুমমেটের নাম ছিল ব্রায়ান ব্যাসারথ। আর প্যারিসে যিনি খুন হয়েছিলেন তিনি মকবুল রহমান নন, তিনি ব্রায়ান ব্যাসারাথ। অন্ধকারে মকবুল ভেবে ওঁর লাভ–রাইভাল ব্রায়ান ব্যাসারাথকে খুন করেন। মকবুল নিশ্চয় কাছেই ছিলেন। তিনি দ্রুত নিজের আংটি ব্রায়ান ব্যাসারাথের আঙুলে পরিয়ে দিয়ে পেট্রল বা কিছু দিয়ে মৃতদেহটা জ্বালিয়ে দেন।”

 

“দ্যাক্স ক্রেজি! কেন?” প্রমথ প্রশ্ন তুলল।

 

“কারণ স্যার মকবুলের নিশ্চয় ভয় হচ্ছিল, একবার মিস হয়ে গেলেও দ্বিতীয় গুলিটা হয়তো ওঁর বুকেই লাগবে।”

 

“এটা বুঝলাম না,” আমি বললাম। “পুলিশে তো খবর দিতে পারতেন?”

 

“তা পারতেন, কিন্তু ক’দিন আগেই তো প্যারিস পুলিশ ওকে লক-আপে পুরেছিল! পুলিশের ওপর ওঁর আস্থা না থাকাটাই স্বাভাবিক। আর মনে হয় স্যার, খুব ভয়ও পেয়েছিলেন। ভেবেছিলেন রুমমেট-খুনের দায় ওই ফ্রেঞ্চ অ্যাসিস্টেন্টটি এবার ওঁর ঘাড়ে চাপিয়ে না দেন! এদিকে ব্রায়ান ব্যাসারাথও বেঁচে নেই যে ওঁকে সাহায্য করবেন! তখনই ঠিক করলেন নিজের মৃত্যু প্রচার করে ব্রায়ানের পরিচয়ে মার্কিনমুলুক পাড়ি দেবেন। সেইজন্যই স্যার ওই আংটি পরানো আর দেহ পুড়িয়ে দেওয়া।”

 

“এটা কিন্তু খুবই ফার ফেচড লজিক।” আমি বললাম।

 

প্রমথ তো আমাকে সাপোর্ট করলই না, উলটে বলল, “ইট মেকস সেন্স। সেক্ষেত্রে সবকিছুই এক্সপ্লেইন করা যায়। কেন কেমিল আর মকবুলের ছবি আর স্ট্যাচুগুলো টিমের বাড়িতে ছিল।”

 

“না যায় না,” আমি বললাম। “এদেশে এসে নিজের পরিচয় না দিয়ে ব্রায়ান ব্যাসারাথ হয়ে থাকার মানেটা কি?”

 

“তুই একটা স্টুপিড, কারণ নিজের পরিচয় দিলে হি উইল বি অ্যারেস্টেড ফর কমিটিং এ ক্রাইম। ডেডবডি পুড়িয়ে এভিডেন্স নষ্ট করা, পুলিশকে ভুলপথে নিয়ে যাওয়া… কি বলেন, একেনবাবু, ঠিক?”

 

“আপনি আর কবে ভুল বলেন স্যার?”

 

“আমি আরও একটা সাজেশন দিই।”

 

“দিন স্যার?”

 

“মনে হচ্ছে মামুদের ওই খালু, মানে রহমান সাহেবদের গ্রাম জেনেটিক্যালি স্পিকিং এখনও বেশ পিওর রয়েছে। আপনি মামুদকে বলুন রহমান সাহেবের সেই চাচার একটা স্যালাইভা স্যাম্পল নিয়ে অ্যানসেস্ট্রির খোঁজ করতে; আর এদিক থেকে আরেকটা স্যাম্পেল নিন টিম ব্যাসারাথের। যে কোনো অ্যানসেস্ট্রি ফাইন্ডিং কোম্পানি একশো দেড়শো ডলারের মধ্যেই করে দেবে কাজটা। ডিএনএ ম্যাচ হলে দু’দলই একটা ফরচুনের মালিক হবে। কিন্তু তার জন্য আমাদের বাপিকে একটা কাজ করতে হবে।”

 

“সেটা কী স্যার?”

 

“বাপি ব্যাটাকে বিয়ে করতে হবে বেভকে। তারপর বেভকে বুঝিয়ে ওর দাদুর সম্পত্তির মালিকানা নেওয়াতে হবে। তারপর তো কোনো সমস্যাই নেই– এক মিলিয়ন ডলার দিয়ে মূর্তিগুলো কিনে ফেলা।”

 

আমার ইচ্ছে করছিল প্রমথটাকে ধরে রান্নাঘরের মেঝেতে ফেলে হাতা দিয়ে ঠ্যাঙাই। একেনবাবুর কিন্তু কথাটা মনে ধরল। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “প্রমথবাবু কিন্তু খুব ইনসাইটফুল কথা বলেন স্যার।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *