মেলাবেন তিনি মেলাবেন (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত
(১১)
বেভের আঙ্কল জ্যাক আমাকে দেখতে চেয়েছিলেন, কারণ উনি ইন্ডিয়া বেড়াতে যাবার প্ল্যান করছেন। ইচ্ছে সুন্দরবনেও একবার যাবেন। সুন্দরবন যেতে হলে কলকাতা হয়েই যেতে হবে। কিন্তু কলকাতা সম্পর্কে একটা ভীতি এদেশে অনেকের মধ্যেই দেখছি। আমার কাছে কলকাতার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে একটু জানতে চান। আঙ্কল আমার সাথে দেখা করতে চান বলে সেদিন বেভ এমন একটা সাসপেন্স সৃষ্টি করেছিল যে কী বলবেন ভেবে আমি একটু দুশ্চিন্তার মধ্যেই ছিলাম। কথাটা যে আমাদের দুজনের সম্পর্ক নিয়ে নয় সেটা জেনে নিশ্চিন্ত হলাম। দেখলাম কলকাতার ব্যাপারে উনি ইতিমধ্যেই যা খোঁজখবর নিয়েছেন, তা আমার জ্ঞানের থেকে বেশি ছাড়া কম নয়। লাভের মধ্যে আমাকে আর বেভকে লাঞ্চ খাওয়ালেন। লাঞ্চ খেতে খেতে বেভ রোদাঁর প্রসঙ্গ তুলল। ওঁর কাছে লুকোছাপার কিছু নেই, তাই ব্যাপারটা আমি খোলাখুলি ওঁকে বললাম। আঙ্কল জ্যাক সত্যিই রোদাঁর সম্পর্কে অনেক কিছু জানেন। রোদাঁর একটা মূর্তি টিম ব্যাসারাথের কাছে থাকাটা অসম্ভব নয়, সেটা বললেন। তবে সেই মূর্তি কারোর হাজার বা পনেরো-শো ডলারে কিনতে চাওয়াটা একেবারে হাইওয়ে রবারির চেষ্টা।
আমি বললাম, “এক্ষেত্রে যিনি কিনতে চাচ্ছেন, তাঁর ধারণা ওঁর ফ্যামিলিই ওটার আসল মালিক।”
“তাহলে তো উনি রিক্লেইম করবেন, কেনার চেষ্টা করবেন কেন?”
“রিক্লেইম করা যায়?” বেভ জিজ্ঞেস করল।
“নিশ্চয়, তবে সব সময়ে যে ফেরত পাওয়া যায় তা নয়। নাৎসীরা বহু দামি দামি আর্ট ইহুদিদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে অন্যদের বিক্রি করেছিল। সেগুলো নিয়ে কোর্টে বহু লড়াই হয়েছে, এখনও হচ্ছে। বিশ্বাস করে নাৎসীদের কাছ থেকে যারা কিনেছিল তাদেরও অনেক ক্ষেত্রে কেনা জিনিস ফেরৎ দিতে হয়েছে। মুশকিল হল এ ব্যাপারে কোনো ইউনিভার্সাল আইন নেই।” তারপর আমাকে বললেন, “আসলে জানো তো, রোদাঁর বহু কাজের খোঁজ পাওয়া যায়নি। পরে এদিক ওদিক থেকে সেগুলো মাথা চাড়া দিয়েছে। এই তো কিছুদিন আগেই পোটোম্যাক-এর একটা বাড়ি থেকে ব্রোঞ্জ আর মার্বেল তৈরি পা ভাঁজ করা নারীমূর্তি তিন-শো হাজার ডলারেরও বেশি দিয়ে নিলামে বিক্রি হয়েছে। যাঁদের বাড়িতে ওটা এতদিন ছিল তাঁরা জানতেনও না যে ওটা রোদাঁর সৃষ্টি।”
“ও মাই গড। কিন্তু জানা গেল কী করে যে ওটা রোদাঁর?”
“গুড কোয়েশ্চেন। এর কোনো নির্দিষ্ট উত্তর নেই। অনেক আর্ট এদিক ওদিক ছড়িয়ে থাকে, সেগুলো ক্যাটালগড নয়, কিন্তু প্রমাণ করার নানান উপায় আছে। ভাস্কর্যের ক্ষেত্রে কাজটা একটু কঠিন। হয়তো স্কাল্পটারের সই করা কোনো চিঠি বা যারা মূর্তিটির আগের মালিক ছিল, তাদের নাম-ঠিকানা, আর্টিস্টের কাছ থেকে কেনা হলে সেই বিক্রির রসিদ, সেই মূর্তিটা সম্পর্কে পত্রিকায় কোনো লেখা বা ছবি, বা এমন কারোর সংগ্রহ থেকে মূর্তিটা পাওয়া গেছে যাঁর সঙ্গে স্কাল্পটারের বন্ধুত্ব বা যোগাযোগ ছিল। অনেক সময়ে যাঁরা সেই স্কাল্পটারের কাজের বিশেষজ্ঞ, তাঁদের সার্টিফিকেটও প্রমাণ বলে ধরা যেতে পারে। পোটোম্যাকের ক্ষেত্রে ঠিক কোনটা আমি জানি না।”
“এত টাকা দিয়ে কেনে কারা?”
আমার গলার স্বরে বিস্ময়ের প্রাবল্য দেখে মনে হল একটু মজা পেলেন, আঙ্কল জ্যাক। “এ ধরণের আর্টের ক্ষেত্রে অঙ্কটা বিরাট কিছু নয়। তবে তোমার প্রশ্নের উত্তর হল, পেপারওয়ার্ক যদি ঠিক থাকে, তাহলে মিউজিয়াম, বড়োলোকেদের প্রাইভেট ট্রাস্ট, ইন্ডিভিজুয়াল কালেক্টর। আর এখন একটা কেনার বড়ো দল হয়েছে সো কল্ড মাফিয়া। রবের্তো স্যাভিয়ানো-র গোমোরাহ বইটা পড়েছ –ইটালির মাফিয়া গ্যাং- এর কীর্তি কাহিনি?”
“না, পড়িনি।”
“পড়লে জানতে এইসব মাফিয়া গ্যাং-মেম্বারদের কাছে ক্যাশ টাকা লেনদেনের থেকে আর্ট নিয়ে কারবার করা অনেক সেফ। ব্যাঙ্কে তো এরা কালো টাকা রাখতে পারবে না, মিলিয়নস অফ ব্ল্যাক মানি জমা থাকবে এইসব দুষ্প্রাপ্য চুরি করা আর্টের মধ্যে। ঐ বইয়ের লেখক তো এখন পুলিশ প্রোটেকশনে আছে। গোপন তথ্য ফাঁস করে দেওয়ার জন্য মাফিয়া গ্যাং ওঁকে খুন করবে বলে উঠে পড়ে লেগেছে। তাছাড়া দেখো না, পৃথিবীর নানান আর্কিওলজির সাইট থেকে হরদম পুরোনো আর্টিফ্যাক্ট চুরি হচ্ছে। কোথায় যাচ্ছে সেগুলো? গুন্ডা চোরের দল যারা ওগুলো চুরি করছে, কাদের কাছে তারা বিক্রি করছে? আমাদের মতো লোকের কাছে নিশ্চয় নয়। চুরির জিনিস রাখাটা তো একটা ক্রাইম।”
এসব আমার ফিজিক্সের জগৎ নয়, সম্পূর্ণ অন্য একটা পৃথিবী। ইতিমধ্যে লাঞ্চ এসে গেছে। খেতে খেতে হঠাৎ কেন ফনীন্দ্রনাথ বসুর কথা মনে হল জানি না। জিজ্ঞেস করলাম, উনি ফনীন্দ্রনাথ বোসের কথা শুনেছেন কি না।
“হ্যাঁ, নিশ্চয় শুনেছি। কাজ শিখেছিলেন স্কটল্যান্ডে, কিন্তু রোদাঁর কাছেও কিছুদিন ছিলেন। কমবয়সেই জলে ডুবে মারা যান। কিন্তু তুমি ওঁর কথা জানলে কী করে?”
সোর্সটা বললাম। “ভাস্করদের একটা বইয়ে ওঁর নামটা ছিল। আরও একজন ইন্ডিয়ানের নাম ছিল রোদাঁর ছাত্র হিসেবে, কিন্তু নামটা মনে করতে পারছি না।”
আঙ্কল জ্যাক ভুরু কুঁচকে একটু চিন্তা করলেন, তারপর বললেন, “বুঝতে পেরেছি, তুমি বোধহয় রহমানের কথা বলছ।”
আমি বললাম, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, রহমান!”
“রহমানের কথা যদি বইয়ে থাকে তাহলে সেটা ওর ভাস্কর্যের জন্য নয়। হি উইল ওনলি বি রিমেমবারড বিকজ অফ এ ট্র্যাজেডি। ইয়েস, রহমান রোদাঁর স্টুডিওতে কাজ করেছে এন্ড ওয়াজ ক্লোজ টু কেমিল ক্লদেল।”
আমি ক্লু-লেস বুঝে বেভ আমাকে বলল, “কেমিল আরেকজন গ্রেট স্কাল্পটার–রোদাঁর ছাত্রী-কাম-লাভার ছিলেন।”
“ও ইয়েস, দ্যাট উড বি দ্য বেস্ট ওয়ে টু ডেসক্রাইব হার।” আঙ্কল বললেন। “আমার মতে কেমিল রোদাঁকে ছাড়িয়ে যেতে পারতেন, বাট সি ওয়াজ মেন্টালি আনস্টেল এন্ড অলসো এ ভিকটিম অফ লাভ। ওঁর শকুন্তলা’ আর ‘এজ অফ ম্যাচিওরিটি’ দুটোই আমি দেখেছি। লাভার যখন পরিত্যাগ করে চলে যায়, তখন যে একাকিত্ব… নিদারুণ ভাবে ফুটে উঠেছে দুটো স্কাল্পচারে! বাই দ্য ওয়ে, শকুন্তলা তো তোমাদের দেশের গল্প, তাই না?”
“হ্যাঁ, শকুন্তলা-দুষ্মন্তের গল্প। হিন্দু এপিক মহাভারতে আছে।” আমি বললাম।
“আমাকে পরে গল্পটা বলবে,” বেভ বলল।
“শিওর।”
“কী প্রসঙ্গে কেমিলের কথা বলছিলাম বলো তো?” বুঝলাম আমার আর বেভের কথায় আঙ্কল জ্যাক হঠাৎ খেই হারিয়ে ফেলেছেন।
“আপনি রোদাঁর ভারতীয় ছাত্রের কথা বলছিলেন।”
“ও হ্যাঁ, আসলে কি জানো, রোদাঁ-কেমিলের প্রসঙ্গ এলেই আমি অন্যমনস্ক হয়ে যাই। ওঁরা ছিলেন আমার যৌবনের নেশা। পাবলিক লাইব্রেরীতে গিয়ে পুরোনো ‘লেকো দ্য প্যারি’, ‘লে পেতিত প্যারিসিয়েন’ পত্রিকাগুলো ঘেঁটে ঘেঁটে ওঁদের কথা পড়তাম। তখনই এই রহমান নামে রোদাঁর এক অ্যাসিস্টেন্টের নাম চোখে পড়েছিল। ওকে রোদাঁরই আরেক অ্যাসিস্টেন্ট গুলি করে মারে।”
“মাই গড” বেভ বলে উঠল।
“ইয়েস, হোয়াট এ ট্রেজেডি! রোদাঁ আর কেমিলের মধ্যে তখন ঝগড়াঝাঁটি শুরু হয়েছে। কেমিল চাপ দিচ্ছেন, কিন্তু রোদাঁ কেমিলকে বিয়ে করতে রাজি নন। কেমিলকে অ্যাবরশন করতে হয়েছে, ওঁরা ছাড়াছাড়ির মুখে। কেমিল নিজে আরেকটা স্টুডিও ভাড়া নিয়ে নিজের কাজগুলো একটু একটু করে সেই স্টুডিওতে নিয়ে যাচ্ছেন। সাহায্য করছেন রোদাঁর দুই অ্যাসিস্টেন্ট, যারা ছিল সুন্দরী কেমিলের ভক্ত। তাদের একজন এই রহমান। পুলিশ সন্দেহ করেছিল খুনটা হয়েছে লাভ ট্র্যাঙ্গেল থেকে। অন্য ফ্রেঞ্চ অ্যাসিস্টেন্টটি রহমানকে প্রবলভাবে ঈর্ষা করত কেমিলকে নিয়ে। কেমিল নিজেও খুব আনব্যালেন্সড ছিলেন, কখন কার দিকে ঝুঁকতেন কে জানে! একবার তো একটা পাবে কেমিলকে নিয়ে দু’জনের মধ্যে হাতাহাতি পর্যন্ত হয়েছিল। পুলিশ স্বভাবতই ফ্রেঞ্চ অ্যাসিস্টেন্টের পক্ষ নিয়ে রহমানকে লক-আপে ঢুকিয়েছিল।”
“ওহ নো, এর জন্য ওঁর শাস্তি হয়েছিল?” বেভ জিজ্ঞেস করল।
“আরে না। রহমানের রুমমেট পরদিন পুলিশ স্টেশনে গিয়ে ওকে ছাড়িয়ে আনে। এই ঘটনার কয়েকদিন বাদেই রাত্রিবেলা একটা ডিচের ধারে রহমান খুন হয়। আইডেন্টিটি ঢাকতে পেট্রল দিয়ে বডিটা জ্বালানো হয়েছিল। খুনি ওয়াজ পার্টলি সাকসেসফুল, কারণ পুলিশ বেশ কয়েকদিন বুঝতেও পারেনি মৃতদেহটা কার। শেষরক্ষা অবশ্য হয়নি, রহমানের আংটিটার কথা খুনি ভুলে গিয়েছিল।”
“সেই রুমমেটই কি বডিটা আইডেন্টিফাই করল?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“দ্যাটস ইন্টারেস্টিং, তুমি প্রশ্নটা করলে। সেই রুমমেটের সঙ্গে পুলিশ যোগাযোগ করতে পারেনি, কিন্তু কেমিল আংটিটা চিনতে পেরেছিলেন। অবভিয়াসলি কেমিল ওয়াজ ক্লোজড টু রহমান। রহমানের ফিউনারেলও কেমিল অ্যারেঞ্জ করেন।”
“খুনি ধরা পড়ল কী ভাবে?” বেভ প্রশ্ন করল।
“পাস্ট হিস্ট্রির জন্যে পুলিশের একটা সন্দেহ ছিল রোঁদার সেই ফ্রেঞ্চ অ্যাসিস্টেন্টের ওপরে। একজন পথচারীকে পাওয়া গেল যে সেই রাত্রে অ্যাসিস্টেন্টটিকে পিস্তল হাতে ছুটে যেতে দেখেছে। সেই পিস্তলটা উদ্ধার হল অ্যাসিস্টেন্টের বাড়ি থেকে। যে গুলিটা রহমানের পুড়ে যাওয়া শরীরে পাওয়া গিয়েছিল সেটা ওই পিস্তলেরই গুলি। রহমানকে গুলি করার কথা পুলিশি জেরায় শেষ পর্যন্ত স্বীকার করল অ্যাসিস্টেন্টটি, যদিও বলল বডিটা নাকি ও পোড়ায়নি! দ্যাট হার্ডলি ম্যাটার্স।”
“তোমার এত মনে আছে আঙ্কল জ্যাক!” বেভ সবিস্ময়ে বলল।
“কেন জানি না, কেমিল অলওয়েজ ইনট্রিগড মি। কেমিল সম্পর্কে যেখানে যা পেতাম পড়তাম। আর এই ঘটনাটা এত দাগ কেটেছিল যে প্রায় কিছুই ভুলিনি। এমন কি বছরটাও মনে আছে ১৮৯৩। দুয়েকটা ডিটেইলস হয়তো মিস করলেও করতে পারি।”
“সেগুলো তো খোঁজ করলে লাইব্রেরিতে পাওয়া যাবে।”
“তারও দরকার হবে না। লাইব্রেরির সেই কাগজগুলো কপি করে আমি একটা ফাইল ফোল্ডারে রেখে দিয়েছিলাম। এখনও হয়তো আমার অফিসেই কোথাও আছে।”
