ম্যানহাটানে মিস্ট্রি মার্ডার (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত

শেয়ার করুনঃ

এক

[প্রথমেই বলে নিই, এই কাহিনিটি একেনবাবুর নিউ ইয়র্কে ফিরে আসার অল্প কিছুদিন পরের ঘটনা। বহুদিন আগে এটি নোটবুকে লিখে রেখেছিলাম। ওখানেই পড়েছিল এতদিন, ছাপানো হয়নি।]

 

.

 

বাইরে বেশ ঝুর ঝুর করে বরফ পড়ছে… ব্রেকফাস্ট খেতে খেতে আমি আর প্রমথ আলোচনা করছি স্নো-ডে বলে আজ ইউনিভার্সিটি ছুটি দিয়ে দেবে কিনা। একেনবাবুর মুখ দেখতে পাচ্ছি না, খুব মন দিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমস পড়ছেন, মাঝে মাঝে ঠ্যাং দুটো নাচছে। আলোচনায় ছেদ পড়ল ডোর বেলের ডিং-ডং আওয়াজে।

 

“এই সাতসকালে বরফের মধ্যে আবার কে এল?” একরাশ বিরক্তি নিয়ে সোফা থেকে উঠে প্রমথ দরজা খুলতে গেল। বাইরে কিছুক্ষণ কথা বলার পর যাঁকে নিয়ে ঘরে ঢুকল তাঁর মুখটা কোথায় জানি দেখেছি। কাঁচা-পাকা চুল, মুখে-চোখে অকাল বার্ধক্যের ছাপ। দুর্দান্ত শীতেও গায়ে সিল্কের সার্টের ওপর ডেনিমের জ্যাকেট। কারণটা আর্থিক অসচ্ছলতা নয়, জ্যাকেটের ওপর ‘গুচি’-র লেবেল দেখেই বোঝা যাচ্ছে।

 

প্রমথ পরিচয় করিয়ে দিল, “ইনি হচ্ছেন মিস্টার দিলীপ কাপাদিয়া।”

 

দিলীপ কাপাদিয়া! নো ওয়ান্ডার কেন এত চেনা-চেনা লাগছিল! দিলীপ কাপাদিয়া নিউ ইয়র্কের একজন ভারতীয় ফিল্ম প্রোডিউসার। ইসমাইল মার্চেন্টের মতো নামকরা না হলেও নিউ ইয়র্কের ভারতীয়দের প্রায় সবাই দিলীপ কাপাদিয়ার নাম জানে। এই ক’দিন আগেও ইন্ডিয়া অ্যাব্রড-এ ওঁকে ফিচার করে ছবি দিয়ে বড়ো একটা লেখা বেরিয়েছে!

 

মিস্টার কাপাদিয়া আমাকে নমস্কার করে বললেন, “খবর না দিয়ে হুট করে চলে এলাম! উপায় ছিল না, আপনার ফোন নম্বরটা জানতাম না।”

 

আমি প্রাণপণ বোঝার চেষ্টা করছি, আমাকে ওঁর কেন দরকার! প্রমথর কথায় ব্যাপারটা পরিষ্কার হল।

 

“মিস্টার কাপাদিয়া, আপনি লোক ভুল করছেন। একেনবাবু হচ্ছেন ইনি, বলে একেনবাবুকে দেখিয়ে দিল।”

 

মিস্টার কাপাদিয়াকে দোষ দেওয়া যায় না। একেনবাবুর চেহারা বা পোশাক- আশাক কোনোটাই ভক্তির উদ্রেক করে না। উশকোখুশকো চুল, খাবলা খাবলা দাড়ি, বিচ্ছিরিভাবে কোঁচকানো হলুদ ছোপে ভরতি সাদা পাঞ্জাবি— মাতব্বরি করে ক’দিন আগে ডালে সম্বার দিতে যাবার ফল!

 

প্রমথর কথা শুনে একমুহূর্তের জন্য দিলীপ কাপাদিয়ার মুখের যে অবস্থা হল সেটা ক্যামেরা-বন্দি করে রাখার মতো। চট করে নিজেকে সামলে নিলেন।

 

“আই অ্যাম সরি, মিস্টার সেন। হাজাররকম চিন্তা নিয়ে ঘুরছি। কখন কাকে দেখছি, কাকে কী বলছি, কিচ্ছু ঠিক নেই।”

 

একেনবাবু উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “কী যে বলেন স্যার, আসুন আসুন, বসুন।

 

প্রমথ বলল, “একেনবাবু, আপনি জানেন কিনা জানি না, মিস্টার কাপাদিয়া কিন্তু নিউ ইয়র্কের ফেমাস ফিল্ম মেকার।”

 

“ফিল্ম মেকার!” একেনবাবুর গলায় উত্তেজনার ভাবটা স্পষ্ট। “তার মানে আপনি স্যার মুভি তোলেন?”

 

দিলীপ কাপাদিয়া মনে হয় এইরকম রিয়্যাকশন দেখে অভ্যস্ত। শান্তভাবে উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ।”

 

এই সংক্ষিপ্ত উত্তরে একেনবাবুর সন্তুষ্টি হল না। “মানে স্যার যেগুলো সিনেমা হল-এ দেখানো হয়!”

 

এবার দিলীপ কাপাদিয়ার ঠোঁটে মুচকি হাসি। “তা মাঝে মাঝে দেখানো হয় বই কী!”

 

প্রমথ বলল, “ওঁর ইমগ্রেন্ট’স ড্রিম’ তো কয়েক মাস আগেই ভিলেজ সিনেমাতে চলছিল।”

 

“দিস ইজ অ্যামেজিং স্যার, ট্রলি অ্যামেজিং!” মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন একেনবাবু। “জানেন স্যার। আমার ফ্যামিলি শুনলেও বিশ্বাস করবে না আপনার মতো ফেমাস ফিল্ম মেকারের সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছে! সত্যি স্যার, ওর আবার ভীষণ সিনেমার শখ।”

 

‘ফ্যামিলি’ কথাটার তাৎপর্য দিলীপ কাপাদিয়ার কাছে স্পষ্ট নয়, চোখ-মুখ দেখেই বুঝতে পারছিলাম। তাই বুঝিয়ে দিলাম, “উনি ওঁর স্ত্রীর কথা বলছেন।”

 

এবার আর মৃদু হাসি নয়, হো-হো করে হেসে উঠলেন। “আপনার স্ত্রীকে বলবেন, শুধু আলাপ হয়নি— আমি আপনাকে সিনেমাতেও নামাতে চাই।”

 

“ঠাট্টা করছেন স্যার!” চোখ কপালে তুলে অদ্ভুত ভঙ্গিতে পিছিয়ে যাবার ভান করলেন একেনবাবু।

 

“একদমই নয়!”

 

“দাঁড়ান স্যার, দাঁড়ান!” এবার চোখ কুঁচকে, ঘাড় চুলকোতে চুলকোতে একেনবাবু বললেন, “আপনি বলছেন আমি আপনার মুভি-তে একটা ক্যারেক্টার হব? সেটা সিনেমা হলে দেখানো হবে, আর হাজার হাজার লোক সেটা দেখবে!”

 

“এক্ষেত্রে হয়তো লক্ষ লক্ষ, কারণ এটা টিভি-তে দেখানো হবে।”

 

“উইথ দ্য গ্রেটেস্ট রেসপেক্ট অ্যাবাউট ইওর ট্যালেন্ট,” একেনবাবু নাটকীয় ভঙ্গিতে হাতজোড় করে বললেন, “অ্যালাও মি টু সে স্যার, ইউ আর আউট অফ ইওর মাইন্ড!”

 

“কেন বলুন তো?”

 

“গাধা পিটিয়ে ঘোড়া করতে পারবেন, কিন্তু আমাকে দিয়ে অ্যাক্টিং করাতে পারবেন না! একেবারে ইমপসিবল টাস্ক স্যার।”

 

“যদি আপনাকে বলি আপনাকে অ্যাক্টিং করতে হবে না, আপনি নিজেই হবেন নিজের ক্যারেক্টার।”

 

“তার মানে?”

 

“বুঝিয়ে বলছি, দূরদর্শন আমাকে একটা ডকুমেন্টারি তোলার ভার দিয়েছে। এদেশে এসে যেসব ভারতীয় অল্প সময়ে নিজেদের সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন তাঁদের নিয়ে ডকুমেন্টারি। আমি চার জনকে কভার করব ভেবেছি। পলিটিক্যাল ফিল্ডে রবি চেরিয়ান, বিজনেসে বল্লভ শাহ, সায়েন্সে কুমার ব্যানার্জি, আর আমেরিকার একমাত্র ভারতীয় গোয়েন্দা হিসেবে আপনি। বেসিক্যালি আপনার একটা ইন্টারভিউ থাকবে, আর আপনার কয়েকটা বিখ্যাত কেস, যেমন ‘মুনস্টোন মিস্ট্রি’র টিভি কভারেজ থেকে কিছু ইনসার্ট, ব্যস।”

 

“দিস ইজ আনবিলিভেবল স্যার!” আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন একেনবাবু!

 

“বাট ইট ইজ ট্রু, এবার বলুন আপনি রাজি কিনা। আমার হাতে বিশেষ সময় নেই, দশ দিনের মধ্যে পাইলট সাবমিট করতে হবে।”

 

একেনবাবু মাথা চুলকোচ্ছেন দেখে, প্রমথ বলল, “আলবাত উনি রাজি। আপত্তি করার অজুহাত কোথায়?”

 

আমিও বললাম, “অ্যাবসোলিউটলি। রাজি হয়ে যান একেনবাবু, আপনি ‘না’ বললে আপনার ফ্যামিলির কাছে ফোন যাবে।”

 

একেনবাবু অসহায় মুখ করে বললেন, “এরকম প্রেশারের পরে আর ‘না’ বলি কী করে!”

 

“চমৎকার!” খুশি হলেন মিস্টার কাপাদিয়া। “আর এক জন শুধু বাকি, তাঁর অনুমতি পেলেই আমার প্রিলিমিনারি কাজ খতম!

 

“সেটা কার?” আমি প্রশ্ন করলাম।

 

“মিস্টার বল্লভ শাহর। ভদ্রলোক কিছুতেই মত দিতে চাইছেন না।”

 

“সে কী! কেন?”

 

“আর বলবেন না, ভদ্রলোকের মাথায় ভূত চেপেছে, কেউ ওঁকে খুন করার চেষ্টা করছে। তাই লোকজন খুব অ্যাভয়েড করছেন।”

 

“বল্লভ শাহ কে স্যার?” একেনবাবু প্রশ্ন করলেন।

 

“ওঁকে চেনেন না!” অবাক হলেন দিলীপ কাপাদিয়া, “উনি হচ্ছেন ‘রাজারানি’ রেস্টুরেন্টের মালিক!”

 

একেনবাবু এখানে বেশিদিন থাকেননি, নইলে বল্লভ শাহকে চেনে না, এমন লোক এখানকার দেশি মহলে খুব বেশি নেই। ম্যাকডোনাল্ড, বার্গার কিং, উইম্পি-র মতো বাঘা বাঘা ফাস্ট-ফুড চেইন-এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ওঁর ‘রাজারানি’ এখন নিউ ইয়র্ক শহরে প্রায় ডজন খানেক। শুরু হয়েছিল মাত্র আট বছর আগে ছোট্ট একটা দোকান দিয়ে!

 

কথাটা শুনে একেনবাবু লজ্জা পেলেন, “দেখুন দেখি স্যার, রাজারানি আমার ফেভারিট দোকান, অথচ মালিকের নাম জানতাম না। দিস ইজ ব্যাড স্যার, নট গুড অ্যাট অল।” তারপর দিলীপ কাপাদিয়াকে প্রশ্ন করলেন, “আচ্ছা স্যার, মিস্টার শাহ কেন অত ভয় পাচ্ছেন জিজ্ঞেস করেছিলেন?”

 

“করেছিলাম, কিন্তু সঠিক উত্তর পাইনি। ইন ফ্যাক্ট আপনার কথাও বলেছিলাম। পুলিশকে না হোক, আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে। কিন্তু ওঁকে এ ব্যাপারে খুব সিক্রেটিভ মনে হল। হয়তো বিজনেস রিলেটেড কিছু হবে।”

 

“দ্যাটস নট গুড স্যার।”

 

“আই নো, আশাকরি ওঁর ভয়টা অহেতুক। কিন্তু এ ব্যাপারে মুখ না খুললে কী করা যায় বলুন?”

 

“তা তো বটেই স্যার।”

 

“আচ্ছা আজ চলি, নেক্সট উইকের মধ্যেই যোগাযোগ করব। শুটিং-এর ডেটগুলো তখনই ঠিক করা যাবে। ভালোকথা, আপনার ফোন নম্বরটা যদি লিখে দেন।”

 

.

 

দিলীপ কাপাদিয়া চলে যেতেই প্রমথ একেনবাবুকে নিয়ে পড়ল, “কী মশাই, এবার তো দেখছি একেবারে ফিল্মস্টার হতে চললেন! আমাদের কথা মনে রাখবেন তো?” আমি বললাম, “ভুলে যাবেন না, নিউ ইয়র্কে আপনার প্রথম বন্ধু কিন্তু আমি।”

 

“আপনারা দু-জন স্যার বড্ড টিজ করেন।”

 

“টিজ! একেনাদ্বিতীয়মকে?

 

“সেটা আবার কী স্যার?”

 

“মানে হল একেন অদ্বিতীয়ম, অদ্বিতীয় একেনবাবু!”

 

লজ্জা-লজ্জা মুখে একেনবাবু বললেন, “কী যে বলেন স্যার!”

 

“কেন মশাই, আপনি অদ্বিতীয় নন! আর ক’টা একেনবাবু আছেন আমাকে দেখান!”

 

“ঘাট মানছি স্যার আপনার কাছে।

 

“আচ্ছা, একেনবাবু,” এবার আমি প্রশ্ন করলাম, “আপনার কি মনে হয় বল্লভ শাহ সত্যি সত্যিই খুন হবেন বলে ভয় পাচ্ছেন, না ডকুমেন্টারিতে না নামার ফন্দি!”

 

“প্রশ্নটা বোকার মতো করলি… তোর কাছ থেকে অবশ্য আর কী আশা করব,” প্রমথ আমাকে ঠুকল। “শোন, কোনো ব্যবসায়ীই ফ্রি পাবলিসিটির সুযোগ হারায় না। তেমন ভয় থাকলে ফিল্ম ক্রু-দের ঘরে ঢুকতে দেবার আগে সিকিউরিটি চেক করে নিলেই তো হয়!”

 

“আমারও স্যার তাই মনে হচ্ছিল, কিন্তু ‘বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি!”

 

“একদম ঠিক,” প্রমথ টিপ্পনী কাটল, “দেশে দেশে কত না খুন-রাহাজানি!”

 

দুই

দিলীপ কাপাদিয়া আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন এক সপ্তাহও হয়নি, এর মধ্যেই প্রমথ ওঁর সম্পর্কে অজস্র খবর জোগাড় করে ফেলেছে! দূরদর্শনের জন্য ডকুমেন্টারি ছাড়াও উনি নাকি একটা বড়ো বাজেটের ফিচার ফিল্ম করছেন। তার শুটিং ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। কিছুটা হচ্ছে নিউ ইয়র্কে, বাকিটা ওয়াশিংটন ডিসি-তে। দিলীপ কাপাদিয়ার আগের ছবিগুলোর থিম ছিল এথনিক, অর্থাৎ এখানকার ভারতীয়রাই ছিল মুখ্য চরিত্র। নতুন ছবিতে বেশ কয়েক জন আমেরিকান অভিনেতা-অভিনেত্রী আছে। যিনি হিরোইন, তিনি এদেশের একটি পপুলার টেলিভিশন সিরিয়ালে খুবই পরিচিত মুখ— জামাইকান, কিন্তু ভারতীয় বংশোদ্ভূত। দিলীপ কাপাদিয়া এটা নিয়ে এতই এক্সাইটেড, আশা করছেন অস্কার পাবার মতো ছবি হবে। একটাই নট সো গুড নিউজ, অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও হলিউডের কোনো কোম্পানিকে দিয়ে ছবিটা প্রোডিউস করানো যায়নি। হলিউডের প্রোডাকশন হলে ছবির ডিস্ট্রিবিউশন নিয়ে দৌড়োদৌড়ি করতে হয় না। ফাইনান্স, পাবলিসিটি, প্রোমোশন সব ওরাই ম্যানেজ করে।

 

“উনি কি ভেবেছিলেন হলিউড এটা প্রোডিউস করবে? এটা আশা করাই তো অবাস্তব!” প্রমথকে বললাম।

 

“কেন স্যার?” প্রশ্নটা একেনবাবুর। এতক্ষণ খুব মন দিয়ে টেলিফোন-বিল চেক করছিলেন। লিস্ট থেকে কোন কোন কল ওঁর করা, খুঁজে খুঁজে সেগুলোতে দাগ দিচ্ছিলেন। সেই অনুযায়ী উনি ওঁর অংশ দেবেন। ইন্টারন্যাশনাল কলও নয় যে টাকার অঙ্ক বড়োসড়ো কিছু। স্রেফ দু-দশ ডলার বাঁচাবার জন্যে কেউ এত পরিশ্রম করতে পারে, প্রথম বার দেখে বিশ্বাস করতে পারিনি! আমি আর প্রমথ যখন সাতাশ ডলারের লং ডিস্টেন্স কল-এর চার্জকে তিন দিয়ে ভাগ করে ন’ডলার করে দিতে যাচ্ছি, উনি বলে উঠলেন, “আমার ভাগটা স্যার সাত ডলার আঠাশ সেন্ট।”

 

“হোয়াট!” প্রমথ প্রায় আঁতকে উঠেছিল।

 

“এই যে স্যার,” বলে দাগ দেওয়া বিল-এর ডিটেল কল-লিস্টটা দেখালেন।

 

ন’-এর বদলে সাত ডলার আঠাশ! এক ডলার বাহাত্তর সেন্ট বাঁচানোর জন্য কত পরিশ্রম!

 

“আপনি মশাই সামথিং!” প্রমথ না বলে পারেনি।

 

“না না স্যার, হিসেব ঠিক থাকাই ভালো। এর পরের বার হয়তো আমার চার্জ বারো ডলার হবে। আপনারা কেন বেশি দেবেন!”

 

“ঠিক আছে, আপনি সাত ডলারই দিন, শুধু শুধু আর খুচরো বার করবেন কেন?”

 

“কী যে বলেন স্যার।”

 

এটা বিস্তারিত লিখলাম এই জন্য যে, বিলের ডিটেলস চেক করার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে পুরোপুরি মন না দিয়ে উনি যে আমাদের কথায় কান দিচ্ছিলেন সেটা বুঝিনি।

 

“আপনি কি বিল চেক করছেন না আমাদের কথা শুনছেন?” জিজ্ঞেস করলাম।

 

“দুটোই স্যার,” ঠ্যাং নাচাতে নাচাতে উত্তর দিলেন একেনবাবু। “যাই বলুন স্যার, এখানকার টেলিফোন কোম্পানিগুলো কিন্তু অ্যামেজিং! কবে কখন ক’মিনিটের জন্য ফোন করেছি— সব খবর রাখে। ফাঁকি দেবার উপায় নেই। ও কথা থাক স্যার, আগে আমার প্রশ্নের উত্তরটা দিন।”

 

“কোন প্রশ্ন?”

 

“ওই যে বললেন স্যার, হলিউড প্রোডিউস করবে না…”

 

“ও হ্যাঁ, যেটা বলতে চাচ্ছিলাম, হলিউড ইজ ফুল অফ প্রেজুডিসড পিপল। হোয়াইট আমেরিকান বা ইউরোপিয়ান ডিরেক্টর না হলে, ব্যাকিং পাওয়া ইম্পসিবল।”

 

“জিনিসটা ঠিক ক্লিয়ার হল না স্যার।”

 

“কী ক্লিয়ার হল না?”

 

“ক্লিয়ার হল না এই জন্য, আমি আমি ধরে নিচ্ছি প্রোডিউসাররা লাভ করার জন্য ছবিতে টাকা ঢালেন। মিস্টার কাপাদিয়ার ছবি যদি প্রমিসিং হয়, তাহলে সেটা করবেন না কেন?”

 

একেনবাবুর মাথায় যদি একটা কথা ঢোকে! “সেটাই তো আপনাকে বোঝাবার চেষ্টা করছি, বিকজ দে আর প্রেজুডিসড!”

 

“কিন্তু আরেকটা সম্ভাবনা আছে স্যার। হলিউডের প্রোডিউসাররা জানেন, আমেরিকানরা মুখে যাই বলুক না কেন, এটা একটা রেসিস্ট কান্ট্রি, মানে কিনা বর্ণবিদ্বেষী। সাদা চামড়ার ডিরেক্টর না থাকলে বাজারে বই চলবে না। যেটা বলতে চাইছি স্যার, হলিউড ইজ নট নেসেসারিলি প্রেজুডিসড, ওরা শুধু নিজেদের লাভ- লোকসান দেখছে। কিন্তু আমেরিকানস আর ডেফিনিটলি রেসিস্ট।”

 

আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, “আপনি মশাই সব সময়ে আমেরিকার খুঁত ধরতে ব্যস্ত। এতই যদি বাজে জায়গা মনে হয়, তবে আবার ফিরে এলেন কেন?”

 

“এই দেখুন স্যার, আপনি চটে গেলেন! আমি তো শুধু একটা পসিবিলিটির কথা বলছি।”

 

“বাপিটা দিনকে দিন প্রো-আমেরিকান হয়ে যাচ্ছে! কোনদিন দেখব সিটিজেনশিপ নিয়ে আমেরিকান এয়ারফোর্সে ঢুকে ভারতের ওপরেই বোমা ফেলছে!”

 

“বাজে কথা বলিস না।”

 

“বলব না, কিন্তু হলিউড সম্পর্কে তোর ধারণা ভুল।”

 

“কী ভুল?”

 

“হলিউড এখন অনেক কালো ডিরেক্টর, কালো অ্যাক্টর নিয়ে ফিল্ম প্রোডিউস করে। স্পাইক লি, বিল ক্রসবি, রিচার্ড প্রায়র… এঁদের ছবি হচ্ছে না? তবে এটা ঠিক এশিয়ানদের ছবি তেমন হচ্ছে না।”

 

“কিন্তু স্যার, হলিউডের বড়ো বড়ো অনেক কোম্পানি তো এখন জাপান, মানে এশিয়ানদের হাতে… ভুল বললাম কি স্যার?”

 

“আপনার পয়েন্টটা কী?”

 

“তুই একটা ইডিয়ট! এটাও বুঝছিস না!” প্রমথ ধমক দিল। “প্রোডিউসার এশিয়ান হলেও এশিয়ানদের হিরো-হিরোইন করে ছবি করছে না, কারণ এদেশে সে ছবি চলবে না। সেই রেসিজিমের ব্যাপার।

 

আমাকে লজ্জা থেকে বাঁচাবার জন্যেই বোধহয় একেনবাবু বললেন, “ও কথা থাক স্যার, আমরা তো ফিল্ম তুলতে বা অভিনয় করতে যাচ্ছি না।

 

“দাঁড়ান মশাই, বহুবচন ব্যবহার করলেন কেন? আমি বা বাপি নিশ্চয় যাচ্ছি না, কিন্তু আপনি তো যাচ্ছেন! ইউ হ্যাভ আলরেডি সাইনড আপ ফর এ ফিল্ম! তবে ভালোকথা, ক্যামেরার সামনে দাঁড়াবার আগে আপনার আদ্যিকালের ঘিয়ে-কোটটা বিসর্জন দিন। আজকেই চলুন মেসিজ-এ সেল চলছে, ভদ্র-গোছের কিছু কিনবেন।

 

“কেন স্যার, কোটটা খারাপ কী?”

 

“প্রথমত, ওটা আর ঘিয়ে রঙের নয়… কেচ-আপ, ঝোল, তেল ইত্যাদি পড়ে মাল্টি-কালার হয়ে গেছে। দ্বিতীয়ত, ওটা অন্তত তিরিশ বছরের পুরোনো, তৃতীয়ত…।”

 

“কী যে বলেন স্যার, ওটা আমার বিয়ের সময়ে বানানো কোট!”

 

“তাহলে তো একশো বছর! না, সিরিয়াসলি, একটা নতুন কোট এবার কিনে ফেলুন। লক্ষ লক্ষ লোক আপনাকে দেখবে। কিপ্টেমির জন্য যদি না পারেন, তাহলে বলুন। আমি আর বাপিই না হয় চাঁদা তুলে কিনে দেব।”

 

“আপনারা না স্যার, সত্যি! এমন সিরিয়াসভাবে কথা বলেন যে ঠাট্টা বুঝতে সময় লাগে! আচ্ছা বাপিবাবু, আপনি বলুন তো— কোটটা কি একেবারেই আন- অ্যাকসেপ্টেবল?”

 

কী আর বলি, ভদ্রতা করলাম, “এক বার ধুয়ে নিলে বোধহয় মন্দ হয় না।”

 

“এটা ঠিক বলেছেন স্যার, আপনি বলায় মনে পড়ে গেল কয়েক বছর হল ওটা ড্রাই ক্লিনিং করা হয়নি।”

 

“এখন আর ড্রাই ক্লিনিং-এ চলবে না,” প্রমথ বলল, “বয়েলিং ওয়াটারে সুপার-স্ট্রং ডিটারজেন্ট দিয়ে হেভি-ডিউটি ওয়াশিং মেশিনে ধুতে হবে।”

 

“তুই সত্যি লোকের পেছনে লাগতে পারিস!” প্রমথকে ধমকালাম।

 

“পেছনে লাগছি মানে! একেনবাবু বন্ধু বলে উপদেশ দিচ্ছি। তোর মতো গা বাঁচিয়ে আমি চলি না। আরেকটা কথা একেনবাবু, আপনিও বাপির মতো বড্ড ইংরেজি-বাংলা মিশিয়ে কথা বলছেন। দেশের লোকেরা ওরকম ফট ফট ইংরেজি শুনলে চটবে।”

 

“এটা কিন্তু ঠিক বলেছেন স্যার, সেদিন ফোনে ইংরেজি শুনে ফ্যামিলি রাগ করেছিল!”

 

“একটু রাগ, না ধাতানি?”

 

“ধাতানিই স্যার। আসলে ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্ট সাহেবের সঙ্গে একটা মিটিং-এ যেতে হয়েছিল, তাই টাই পরেছিলাম। টাই-ফাই পরলেই মুখ থেকে ইংরেজিটা বেশি বেরোয়।

 

“তাহলে তো বাপির উলটো। বাপির আবার টাই পরলে গলায় ইংরেজি আটকে যায়! যাই হোক, প্রবলেমের তাহলে সহজ সলিউশন… ধুতি-পাঞ্জাবি পরে শুটিং-এ যাবেন, তাহলে আর ইংরেজি বেরোবে না, আর আপনার ঘিয়ে কোর্টের সমস্যাও মিটে যাবে!”

 

তিন

শনিবার রাত্রে অবিনাশের বাড়িতে আমাদের সবার নেমন্তন্ন ছিল। অবিনাশ একসময় প্রমথর সঙ্গে অ্যাপার্টমেন্ট শেয়ার করত। মাস ছয়েক হল মস্ত বড়ো একটা বাড়ি কিনে লং আইল্যান্ডে চলে গেছে।

 

বিশাল পার্টি, কাউকেই প্রায় চিনি না। প্রচণ্ড বোর হচ্ছিলাম আর অবিনাশের মুণ্ডুপাত করছিলাম নেমন্তন্ন করেছে বলে! ওখানেই পরিচয় হল আনন্দ গুপ্ত বলে এক ভদ্রলোকের সঙ্গে। উনিই এসে আমাদের সঙ্গে আলাপ করলেন। ভদ্রলোক একজন সিএফএ, যার অর্থ সার্টিফায়েড ফাইনান্সিয়াল অ্যাডভাইজার- লোকদের টাকাকড়ি নিয়ে অ্যাডভাইস দেন। মনে হয় ওঁর মতলব ছিল আমাদের ক্লায়েন্ট বানানো। ইমপ্রেস করার জন্য স্টক মার্কেটে কী করে টাকা বানানো যায় বোঝাচ্ছিলেন- লেভারেজ বায়িং, মার্জিন, শর্ট-সেলিং, ইত্যাদি, ইত্যাদি- যার প্রায় কিছুই বুঝতে পারছিলাম না! ঠিক এইসময়ে শুনি বিকট চিৎকার! যে লোকটা চেঁচাচ্ছিল তার বয়স বছর পঁচিশেক হবে। চুলগুলো অবিন্যস্ত, চোখে-মুখে উন্মাদ উন্মাদ ভাব! কয়েক জন মিলে লোকটাকে শান্ত করার চেষ্টা করছিল। কোথায় কী, লোকটা চেঁচিয়েই চলেছে, “হি বেটার নট কাম হিয়ার ইফ হি কেয়ার্স ফর হিজ লাইফ!”

 

আমাদের কয়েকটা চেয়ার দূরে বসেছিলেন এক বয়স্ক ভদ্রলোক, তিনি উঠে লোকটাকে ধমক দিলেন, “অরুণ, ডোন্ট টক সিলি! এটা ছেলেমানুষি করার জায়গা নয়!”

 

ধমকে বোধহয় একটু কাজ হল। অরুণ ছেলেটা একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলল, “কিন্তু ডক্টরসাব, আপনি তো জানেন ওই লোকটার কী জঘন্য চরিত্র! উই কান্ট ওয়েলকাম হিম হিয়ার!”

 

এটা শুনে দেখলাম ডক্টরসাবের চোয়ালটা শক্ত হয়ে উঠল। নিজেকে খুব সংযত রেখে বললেন, “এটা অবিনাশের বাড়ি, কে এখানে আসবে না আসবে অবিনাশের ডিসিশন। তোমার-আমার বা অন্য কারোর নয়!”

 

ইতিমধ্যে আরও কয়েক জন দেখলাম অরুণ ছেলেটাকে কিছু বোঝাবার চেষ্টা করছেন। কী হচ্ছে জানতে ইচ্ছে করলেও, অভদ্রতা হবে বলে যেখানে ছিলাম সেখানেই বসে রইলাম। ইতিমধ্যে অবিনাশও এসে হাজির। ও এসে কী সব বলাতে সব কিছু থিতিয়ে গেল!

 

আমরা একেবারে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি দেখে আনন্দ গুপ্ত বললেন, “ছেলেটার নাম অরুণ শেঠ, অবিনাশের দূর সম্পর্কের ভাই হয়।”

 

“ডক্টরসাব ভদ্রলোকটি কে স্যার?” একেনবাবু প্রশ্ন করলেন।

 

“হি ইজ মাই নেম সেক, ডক্টর আনন্দ শর্মা। ম্যানহাটানে প্র্যাকটিস করেন।” আনন্দ গুপ্ত জবাব দিলেন।

 

“আর অরুণবাবু, উনি কী করেন স্যার?”

 

“আই অ্যাম নট শিওর অরুণ এখন কী করে! বোধহয় কোনো ব্যাঙ্কে কাজ করছে, অন্তত আগে করত। ছেলেটা বরাবরই একটু খ্যাপা।”

 

পরে অবিনাশের কাছে ব্যাপারটা ভালোভাবে জানতে পারলাম। অরুণের সঙ্গে বল্লভ শাহর সম্পর্ক হচ্ছে সাপে-নেউলে। হঠাৎ কে জানি ওকে খ্যাপাবার জন্যেই বোধহয় বলেছিল বল্লভ শাহও পার্টিতে আসছে। তারই রিয়্যাকশন আমরা দেখেছি!

 

“রিয়্যাকশনটা কি একটু অস্বাভাবিক নয়?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

 

“অরুণের পক্ষে নয়,” অবিনাশ জবাব দিল। “ও বরাবরই একটু ছিটগ্রস্ত। হঠাৎ খেপে উঠলে কী বলে না বলে- ঠিক থাকে না। তবে পাঁচ-দশ মিনিট বাদেই আবার ঠান্ডা।”

 

“বল্লভ শাহের ওপর ওঁর এত রাগের কারণটা কী স্যার?” একেনবাবু প্রশ্ন করলেন।

 

“আই ডোন্ট এক্স্যাক্টলি নো। তবে এটুকু আপনাকে বলতে পারি, বল্লভ শাহ হ্যাজ এ ভেরি ফিউ ফ্রেন্ডস ইন দ্য এন্টায়ার ওয়ার্ল্ড।”

 

“কেন স্যার?”

 

“দ্যাটস অল আই নো।” বুঝলাম অবিনাশ এ বিষয়ে আর কিছু বলতে চায় না।

 

.

 

আমরা যখন ফিরছি অবিনাশ বলল, “একটা উপকার করতে পারবে? আমার মায়ের এক বন্ধু কুইন্সে থাকেন, তাঁকে একটু বাড়ি পৌঁছে দিতে হবে। আমিই দিতাম, কিন্তু পার্টি চলছে তো তাই…”

 

“আরে তাতে কী হয়েছে, নিশ্চয়।”

 

ভদ্রমহিলার বয়স প্রায় সত্তরের কাছাকাছি, চুলগুলো সব সাদা, খুব শান্ত চেহারা। আমাদের বললেন, “বেটা, তোমাদের অসুবিধা হবে না তো?”

 

পাছে প্রমথ উলটোপালটা কিছু বলে, আমি তাড়াহুড়ো করে বললাম, “একদমই না।”

 

“আসলে আমার ছেলের আসার কথা ছিল, কিন্তু কাজ নিয়ে খুব ব্যস্ত। খালি কাজ, কাজ, আর কাজ। বেটার দিলে কোনো শাস্তি নেই।”

 

মনে মনে ভাবলাম মায়ের মন!

 

“কী কাজ করেন আপনার ছেলে?” প্রমথ জিজ্ঞেস করল।

 

“ছবি করে, ফিল্ম।”

 

আরে! এবার আমি বুঝতে পারলাম। আসলে চেহারা দেখেই ধরা উচিত ছিল। খুব মিল আছে দিলীপ কাপাদিয়ার সঙ্গে!

 

“আপনার ছেলে কি মিস্টার কাপাদিয়া?”

 

“হ্যাঁ, তোমরা ওকে চেনো?”

 

ভদ্রমহিলা ভারি সুন্দর গল্প করতে পারেন। উনি নিজেও একসময়ে সিনেমায় অভিনয় করেছেন। ছোটোখাটো রোলেই অবশ্যি। এদেশে এসে প্রায় ষাট বছর বয়সে মেক-আপ করানোর আর্ট শিখেছেন। ছেলের সব ফিল্মেই উনি কস্টিউম সিলেকশন আর মেক-আপের ভার নেন। তবে বুঝলাম এবারের এত বড়ো প্রজেক্ট নিয়ে ওঁর দুশ্চিন্তা আছে।

 

“আমি ওকে বলেছি, আর এরকম বড়োসড়ো ব্যাপারে যেয়ো না, মনের শান্তি সব নষ্ট হবে!” বেশ কয়েক বার বললেন কথাটা।

 

মিসেস কাপাদিয়াকে নামাতে গিয়ে দিলীপ কাপাদিয়ার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। উনি কোত্থেকে যেন ফিরছিলেন। ছেলেকে দেখামাত্র মিসেস কাপাদিয়া আমাদের এত অজস্র প্রশংসা শুরু করলেন, কী বলব! দিলীপ কাপাদিয়া হাসি হাসি মুখে সেগুলো শুনে বললেন, “মা, তোমাকে এঁদের সম্পর্কে কিচ্ছু বলতে হবে না, এঁদের সবাইকে আমি চিনি।” তারপর আমাদের অনেক ধন্যবাদ দিলেন, মাকে পৌঁছে দেবার জন্যে

 

মিসেস কাপাদিয়ার ইচ্ছে ছিল যে আমরা একটু মিঠাই খেয়ে যাই। পরে আরেক দিন আসব কথা দেবার পর মুক্তি পেলাম। গাড়িটা ঘুরিয়ে নিতে নিতে বাড়িটার দিকে এক বার তাকালাম। দোতলা বাড়ি। এদেশে এ ধাঁচটাকে বলা হয় কলোনিয়াল। কিন্তু অবিনাশের বাড়ির তুলনায় নিতান্তই সাদামাটা।

 

প্রমথও নিশ্চয়ই একই কথা ভাবছিল। বলল, “বাড়িটা মোটেই ইম্প্রেসিভ নয়। কিন্তু গাড়িটা দেখলি, মার্সিডিজ ৫০০ এসএল, একেবারে বাঘের বাচ্চা! কী রে, তাই না?”

 

‘না’ বলি কী করে! ঝকঝকে কালো মার্সিডিজটা দেখলেই বোঝা যায় আমাদের মতো স্কুলমাস্টারের গাড়ি নয়।

 

একেনবাবু আমার মুখের দিকে এক ঝলক তাকিয়ে প্রমথকে জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা স্যার, গাড়িটার দাম কত হবে?”

 

“হাজার চল্লিশেক হবে, মোর অর লেস।”

 

“চল্লিশ হাজার!” চটপট ক্যালকুলেশন করে একেনবাবু বললেন, “তার মানে

 

তো প্রায় পঁচিশ লাখ টাকা! তাই না স্যার?”

 

“তা তো বটেই।” আমি একটু বিরসভাবেই উত্তর দিলাম।

 

“মাই গুডনেস স্যার! ও গাড়িতে এমন কী আছে যা আপনার এই টয়োটা গাড়িটাতে নেই?”

 

প্রমথ আমার গাড়ি সবচেয়ে বেশি চড়ে, আর সবচেয়ে গালমন্দ করে! বলল, “কীসের সঙ্গে কীসের তুলনা মশাই—উটের পিঠের কুঁজ আর পূর্ণিমার চাঁদ! একবার উঠে দেখুন ও গাড়িতে। ওটা এই টয়োটা টার্সেলের মতো টিনের বাক্স নয়! মার্সিডিজে পাবেন লাক্সরিয়াস ইন্টিরিয়র, না আছে ঝাঁকুনি, না আছে শব্দ। তার ওপর প্রিসিশন ক্রুজ কন্ট্রোল, লেইন অ্যাসিস্ট, টার্বো চার্জার, সুপার-ডুপার এসি, ফ্যান্টাস্টিক অডিও সিস্টেম, আরও সব কী কী…।”

 

“দাঁড়ান স্যার, দাঁড়ান… ওটা কি আকাশে উড়ে যায়, না এই গাড়ির মতো রাস্তায় গড়িয়ে গড়িয়ে চলে?”

 

প্রমথকে সেকেন্ডের জন্যে থতমত খেতে দেখে আমি বললাম, “গড়িয়ে গড়িয়ে চলে।”

 

“তাহলে বলব স্যার, এসবের জন্য অতগুলো টাকা খরচা করা ফুলিশ, টোটালি ফুলিশ!”

 

আমার সামর্থ নেই। তবু মনে হয়, সামর্থ থাকলেও আমি কখনো গাড়িতে অত টাকা খরচা করতাম না। তাই একেনবাবুর কথা শুনে ভারি ভালো লাগল। আরও ভালো লাগল প্রমথটা গজগজ করছে দেখে!

 

চার

বুধবার আমার ক্লাস শেষ হয় পাঁচটায়। বাড়ি ফিরতে ফিরতে প্রায় সন্ধে। সাধারণত বাড়ি ফিরে আমার কাজ হল সাড়ে ছ’টার লোকাল নিউজ দেখা। আজকেও দেখব বলে টিভি খুলেছি, কিন্তু পেছনে রান্নাঘরে যে তাণ্ডব চলছে অ্যাটেনশনটা বার বার ওদিকেই চলে যাচ্ছে! তাণ্ডবের মূলে অবশ্য একেনবাবু। হঠাৎ ওঁর রান্না শেখার সাধ হয়েছে, গুরু ধরেছেন প্রমথকে। রান্নার ব্যাপারে প্রমথ হল পারফেকশানিস্ট, সুতরাং পদে পদে ধমকাধমকি চলছে। এইভাবে চললে আজ ডিনার সময়মতো হবে কিনা কে জানে! তাই টিভি দেখতে দেখতে ভাবছি ওদের দু-জনকে কিচেন থেকে তাড়িয়ে পিৎজা অর্ডার করব। ঠিক এমনি সময়েই মিশেল ব্রিঙ্কলির খবর পড়া শুরু হল।

 

“আজকের সবচেয়ে বড়ো খবর হল লোকাল ফাস্ট-ফুড চেইন, ‘রাজারানি’র প্রতিষ্ঠাতা বল্লভ শাহের সন্দেহজনক মৃত্যু। মিস্টার শাহের মৃতদেহ পুলিশ বিকেল পাঁচটা নাগাদ ওঁর ম্যানহাটান অ্যাপার্টমেন্টে আবিষ্কার করে। পুলিশ সন্দেহ করছে যে গলায় ফাঁস লাগিয়ে ওঁকে হত্যা করা হয়েছে। আমাদের রিপোর্টার রেক্স রিড এই মুহূর্তে বল্লভ শাহের অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং-এর সামনে দাঁড়িয়ে, ওঁর কাছে বিস্তারিত শোনা যাক…”

 

রেক্স রিডের ওপর ক্যামেরা ফোকাস করতেই দেখলাম জায়গাটা লোকে গিজগিজ করছে। বল্লভ শাহের মৃতদেহ তখন অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হচ্ছে। রেক্স রিড তাঁর ইউজুয়াল নাটকীয় ভঙ্গিতে বলছে, “সেন্ট্রাল পার্কের উলটো দিকে এই হাইরাইজ অ্যাপার্টমেন্টগুলোর একটাতে থাকতেন দ্য কিং অফ এশিয়ান-ইন্ডিয়ান ফাস্ট-ফুড চেইন, বল্লভ শাহ। পনেরো বছর আগে বল্লভ শাহ যখন এদেশের মাটিতে প্রথম পা দিয়েছিলেন, তখন তাঁর পকেটে একটা পয়সাও ছিল না। আজ পনেরো বছর পরে উনি যে সম্পত্তি রেখে গেলেন তা কম করেও হবে পঞ্চাশ মিলিয়ন ডলার! বল্লভ শাহ আমেরিকার জন্যে ভারত ছেড়েছিলেন বটে, কিন্তু ভারতীয় খাবার কোনোদিন ত্যাগ করেননি। সাধারণ নিউ ইয়র্কবাসীরা যাতে সে সুস্বাদু খাবারের আস্বাদ পায় সে সুযোগ তিনি করে দিয়ে গেছেন। তিন-তিন বার দেউলিয়া হয়েও তিনি তাঁর লক্ষ্য হারাননি, বার বার ফিরে এসেছেন ভারতীয় খাবারকে প্রত্যেকটি নিউ ইয়র্কবাসীর ফেভারিট খাবারের তালিকায় জায়গা করে দিতে। মাত্র পঞ্চান্ন বছর বয়সে এই উদ্যোগী পুরুষের জীবন শেষ হল। পুলিশ জানে না কে তার জন্য দায়ী। আমরা শুধু জানি যে এক জন কঠোর পরিশ্রমী দূরদর্শী ব্যবসায়ী, যিনি …।”

 

রেক্স রিড নিশ্চয়ই আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু আরে, এ কী! হঠাৎ কোত্থেকে অরুণ শেঠ এসে রেক্স রিডকে ধাক্কা দিয়ে মাইক্রোফোনটা ছিনিয়ে নিয়ে চেঁচাতে শুরু করেছে, “দ্যাটস এ লাই, দ্যাটস এ টোটাল লাই। বল্লভ শাহ ছিল একটা শয়তান। দ্যাটস হোয়াই আই হ্যাড টু কিল হিম। ইয়েস, অল দ্য ভিউয়ার্স, আই কিলড হিম…।”

 

অরুণ আর কী বলল শোনা গেল না। কেউ একজন টেলিভিশন ক্যামেরাটা আড়াল করে দিল। মাইক্রোফোনটা নিয়েও ধস্তাধস্তি হচ্ছে বোঝা গেল। কয়েক সেকেন্ড মাত্র, তারপরই টিভি স্ক্রিনে আবার ছবি ফুটে উঠল। দেখলাম পুলিশ অরুণ শেঠকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে।

 

মিশেল ব্রিঙ্কলি রেক্স রিডকে জিজ্ঞেস করলেন, “রেক্স, আর ইউ ওকে?”

 

রেক্স হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, “ইয়েস মিশেল, আই অ্যাম ওকে।”

 

“লোকটা কে তোমার ধারণা আছে?”

 

“না, কোনো ধারণাই নেই। দেখে মনে হল ভারতীয়, উচ্চারণেও ভারতীয় টান স্পষ্ট। কিন্তু আমার ভুলও হতে পারে। পরিচয় জানতে পারলেই তোমাদের জানাব।”

 

“থ্যাংক ইউ রেক্স,” বলে মিশেল ব্রিঙ্কলি অন্য নিউজে চলে গেল।

 

আমি এত মন দিয়ে খবর শুনছিলাম যে খেয়াল করিনি প্রমথকে নিয়ে একেনবাবু কখন আমার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছেন।

 

প্রমথ রিমোট টিপে টিভি বন্ধ করে দিয়ে বলল, “আই কান্ট বিলিভ ইট! দিস ম্যান ইজ কমপ্লিটলি ইনসেইন! হোয়াই ডিড হি ডু দিস?”

 

জবাব দেব কী, আমিও ব্যাপারটা দেখে হতভম্ব!

 

“কী মশাই, কিছু বুঝতে পারছেন?” প্রমথ একেনবাবুকে প্রশ্ন ছুড়ল।

 

“ভেরি কনফিউজিং স্যার।” একেনবাবু মাথা চুলকোতে চুলকোতে বললেন।

 

কিন্তু ওঁর গলার স্বরে কিছু ছিল যাতে একটু সন্দেহ হল। জিজ্ঞেস করলাম, “আপনার কী মনে হয়, অরুণ শেঠ সত্যি সত্যিই মার্ডার করেছে?”

 

“কে জানে স্যার, তবে উনি তো স্বীকার করলেন।”

 

“আলবাত খুনি, নইলে ওখানে ও গেল কী করে?” প্রমথ কনফিডেন্টলি বলল, “বাজি ধরে বলতে পারি মার্ডার করার পর পুলিশকে খবরও ওই-ই দিয়েছিল যাতে নাটকীয়ভাবে অপরাধটা সবাইকে জানাতে পারে! হি ওয়ান্টেড সেনসেশন! হোয়াট উড ইউ এক্সপেক্ট ফ্রম এ নাট?”

 

“দ্যাটস অ্যান ইন্টারেস্টিং পয়েন্ট স্যার,” একেনবাবু বললেন। “ভেরি ইন্টারেস্টিং পয়েন্ট।”

 

“কী ‘ইন্টারেস্টিং পয়েন্ট’?” জিজ্ঞস করলাম।

 

“ইন্টারেস্টিং পয়েন্ট এই জন্য স্যার, পাগলে কী না বলে আর ছাগলে কী না খায়! অরুণ শেঠকে যদি আমরা পাগলই মনে করি, তাহলে ওঁর এই স্বীকারোক্তিকে কিন্তু খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া উচিত হবে না।”

 

“দাঁড়ান গোয়েন্দামশাই,” প্রমথ প্রশ্ন করল, “আপনি আমাকে বুঝিয়ে দিতে পারেন হঠাৎ অরুণ শেঠের ওখানে আগমন হল কেন?”

 

“সেটা বোধহয় পারা যায় স্যার। অরুণ শেঠ সম্পর্কে গত দু-দিন একটু খোঁজ নিয়েছি। উনি কিছুদিন হল মেট্রোপলিটান মিউজিয়ামে পার্ট-টাইম কাজ করছেন। এও শুনেছি মিস্টার শাহের অ্যাপার্টমেন্ট মিউজিয়ামের ঠিক উলটো দিকে। হয়তো অফিস থেকে বেরোবার পথে ভিড় দেখে অরুণবাবু থেমেছিলেন।

 

“ও, তার মানে আপনি লুকিয়ে লুকিয়ে ইতিমধ্যেই তদন্ত শুরু করেছেন!” প্রমথ তির্যক মন্তব্য করল।

 

“কী যে বলেন স্যার, তদন্ত আবার কী? কোনো ঘটনা ঘটলে তো তদন্ত!”

 

প্রমথ বলল, “তা বললে চলবে কেন, ঘটনা তো একটু আগেই দিব্যি ঘটে গেল! কিন্তু সে-কথা থাক, যেটা আমি বলতে চাই তা হল, অরুণ শেঠের স্বীকারোক্তিটা জাস্ট পাগলামি বলে উড়িয়ে দেওয়াটা ডাউন রাইট সিলি।”

 

“না, না, অরুণ শেঠের পক্ষেও দোষী হওয়া সম্ভব।” একেনবাবু স্বীকার করলেন। “তবে আমি শুধু আরেকটা অ্যাঙ্গেল থেকে দেখার চেষ্টা করছিলাম।”

 

“গুড,” প্রমথ গম্ভীর মুখে বলল। “কিন্তু আপনি মশাই সব অ্যাঙ্গেল থেকেই দোষী।”

 

“কেন স্যার?”

 

“আপনার এই সিংকিং সিংকিং ড্রিংকিং ওয়াটারের হ্যাবিটটা ছাড়ুন তো! অত্যন্ত ধড়িবাজ লোক আপনি। গোপনে সব খবর জোগাড় করে আমাদের আগেই দোষী ধরে ফেলার চেষ্টা চালাচ্ছেন!”

 

“কী যে বলেন স্যার।”

 

“বেশ, তাহলে চটপট বলুন, লুকিয়ে লুকিয়ে এখন পর্যন্ত যা যা জেনেছেন।”

 

“স্যার, রান্নাটা আগে করে ফেললে হত না!” একেনবাবু কাঁচুমাচু মুখে বললেন।

 

“আরে রাখুন আপনার রান্না! আমি পিৎজা অর্ডার করছি, হোম ডেলিভারি। আপনি শুরু করুন।”

 

“এক্সেলেন্ট আইডিয়া!” প্রমথও সায় দিল।

 

“আমার ইনফর্মেশন কিন্তু খুব লিমিটেড স্যার, কনফার্মডও নয়।”

 

“আঃ, শুরু করুন তো মশাই ভণিতা না করে!” প্রমথ ধমক লাগাল। “না না, শুরু করছি স্যার। প্রথম খবর হল, অরুণ শেঠ বল্লভ শাহের শ্যালকপুত্র, মানে স্ত্রীর ভাইয়ের ছেলে।”

 

“এইটে ইন্টারেস্টিং। ক’দিন আগেই তো ইন্ডিয়া অ্যাব্রড-এ ওঁর ওপর একটা লেখা পড়লাম, স্ত্রীর কোনো উল্লেখ ছিল না তো সেখানে!”

 

“হি ওয়াজ এ উইডোয়ার। স্ত্রী প্রায় বছর সাতেক হল মারা গেছেন। ইন ফ্যাক্ট এদেশেই সাঁতার কাটতে গিয়ে ডুবে মৃত্যু।”

 

“মাই গড! খবরটা পেলেন কোত্থেকে?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

 

“ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্টের কাছে শুনেছি স্যার। আসলে ওঁর মৃত্যুটা তখন রহস্যজনক বলে মনে হয়েছিল। তার একটা কারণ রুক্মিণী শাহ, মানে বল্লভ শাহের স্ত্রী বেশ ভালো সাঁতার জানতেন।”

 

“সাঁতার জেনেও মানুষ ডুবে মরতে পারে,” আমি বললাম। “আমার এক বন্ধুই তো রবীন্দ্র সরোবরে পায়ে ক্র্যাম্প ধরে মারা গিয়েছিল।”

 

“তা পারে স্যার, কিন্তু এ ছাড়াও আরেকটা কারণ ছিল। মিস্টার বল্লভ শাহ স্ত্রীর নামে একটা মোটা লাইফ ইন্সিয়োরেন্স করিয়েছিলেন, ম্যাডামের মৃত্যুর মাত্র মাস পাঁচেক আগে।”

 

“যাঃ, দিলেন তো ব্যাপারটাকে নিরামিষ করে!” প্রমথ হতাশ মুখ করে বলে উঠল, “কোথায় রগরগে একটা পরকীয়া কেচ্ছা শোনাবেন, না বস্তাপচা মোটিভ ‘ডলার’-কে টেনে আনলেন! কী বলতে চাচ্ছেন, হি কিলড হার টু গেট ইন্সিয়োরেন্স মানি?”

 

“এক্স্যাক্টলি, স্যার। কিন্তু তদন্তে কোনো ফাউল-প্লে পাওয়া যায়নি। ফলে বল্লভ শাহ ইন্সিয়োরেন্সের টাকাগুলো যথারীতি পেয়ে যান এবং সেই টাকা থেকেই নতুন করে ‘রাজারানি’ রেস্টুরেন্ট শুরু করেন। শেষটা অবশ্য আমার অনুমান স্যার। *

 

“রুক্মিণী শাহের কোনো ছেলেপুলে ছিল না?” আমি প্রশ্ন করলাম।

 

“হ্যাঁ স্যার, একটি মেয়ে ছিল। ঘটনাটা যখন ঘটে, মেয়েটি তখন হাই স্কুলে সিনিয়র ইয়ারে পড়ছে। আরও একটা খবর, অরুণ শেঠও তখন বল্লভ শাহের বাড়িতে থাকতেন। ম্যাডাম ওঁকে দেশ থেকে আনিয়েছিলেন আমেরিকান কলেজে পড়াবেন বলে।”

 

“এটা আপনি জানলেন কার কাছ থেকে?” প্রশ্ন করলাম।

 

“আঃ, তুই চুপ কর তো! সোর্স জেনে তোর লাভ কী?” প্রমথ আমায় ধমকাল। “থামবেন না, চালিয়ে যান একেনবাবু।”

 

“থ্যাংক ইউ স্যার। … কী বলছিলাম জানি? ও, হ্যাঁ, রুক্মিণী শাহের মৃত্যুর অল্পদিনের মধ্যেই ওঁর মেয়ে ক্যালিফোর্নিয়াতে পড়াশোনা করতে চলে যায়। এখন বোধহয় আলাস্কা বা ওরকম কোনো একটা ঠান্ডা জায়গায় থাকে। নিউ ইয়র্কে কদাচিৎ আসে।”

 

প্রমথ টিপ্পনী কাটল, “শ্যালক-পুত্রের সঙ্গে বল্লভ শাহের পৈঠ খায় না সেটা তো নিজের চোখেই দেখেছি। আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে, মেয়ের সঙ্গেও সম্পর্কটা আহামরি নয়!”

 

“সেটাই মনে হয় স্যার। তবে অরুণ শেঠের সঙ্গে কিন্তু একসময় বল্লভ শাহের খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। ইন ফ্যাক্ট রুক্মিণী শাহের মৃত্যুর পরও বহুদিন পর্যন্ত অরুণ শেঠ বল্লভ শাহের কাছেই থাকতেন। শুধু তাই নয় স্যার, নিজের কোম্পানিতে মিস্টার শাহ ওঁকে ভালো কাজও দিয়েছিলেন।”

 

“ওইরকম একটা ছিটগ্রস্ত লোককে? হলই না হয় শ্যালকপুত্র!” আমি বললাম।

 

“আমার ধারণা স্যার, অরুণ শেঠকে উনি নিজের ছেলের মতোই দেখতেন।”

 

“তাই যদি হয়, তাহলে এ অবস্থাটা হল কী করে?”

 

“সেটা একটা রহস্য স্যার। বছর দুই আগে বল্লভ শাহ-র সঙ্গে অরুণ শেঠের এমন একটা তোলপাড় হয় যে অরুণকে উনি অন দ্য স্পট চাকরি থেকে বরখাস্ত করেন। দ্যাটস অল আই নো স্যার।”

 

“দ্যাটস নট ট্রু।” প্রমথ খুব গম্ভীর হয়ে বলল।

 

“হোয়াট নট ট্রু স্যার?”

 

““দ্যাটস অল’ তো হতে পারে না, মিউজিয়ামের চাকরি পাবার কথাটা তো বললেনই না?”

 

“কী মুশকিল স্যার, ওটা তো একটু আগেই বলেছি। ঠিক আছে, বাকিটুকুও কমপ্লিট করে দিচ্ছি। ‘রাজারানি’ ছাড়ার পর অরুণ শেঠ এক বছরের মতো কেমিক্যাল ব্যাঙ্কে ছিলেন। সেখান থেকেও ওঁর চাকরি যায়। তারপর থেকে উনি নানা রকমের পার্ট-টাইম কাজ করে বেড়াচ্ছেন। আপাতত মেট্রোপলিটান মিউজিয়ামে কাজ করছেন। দ্যাটস অল স্যার, ব্যস!”

 

“হ্যাঁ, এই বার দ্যাটস অল,” প্রমথ বলল।

 

পাঁচ

পিৎজা খাচ্ছি বটে, কিন্তু মাথায় ঘুরছে বল্লভ শাহের মৃত্যু। প্রমথ ইতিমধ্যে একবার দিলীপ কাপাদিয়াকে ধরার চেষ্টা করেছে, যদি মৃত্যুর খবর না পেয়ে থাকেন! বল্লভ শাহ যে মৃত্যুর আশঙ্কা করছিলেন সেটা তো ওঁর কাছ থেকেই আমাদের শোনা। দিলীপ কাপাদিয়া অবশ্য বাড়িতে ছিলেন না, শুটিং করতে কোথায় জানি গিয়েছিলেন! ফোন ধরেছিলেন ওঁর মা। প্রমথ অবশ্য বুদ্ধি করে বল্লভ শাহের খবরটা ওঁকে দেয়নি। কী হবে বৃদ্ধাকে শুধু শুধু একটা দুঃসংবাদ দিয়ে!

 

আমি এদিকে একেনবাবুকে উসকাচ্ছিলাম ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্টকে ফোন করে লেটেস্ট ডেভালাপমেন্ট কী হয়েছে খোঁজ নিতে। একেনবাবুর সঙ্গে ক্যাপ্টেনের এখন খুবই দোস্তি, প্রায়ই দু-জনে একসঙ্গে লাঞ্চ -টাঞ্চ খান। এমনকী গোলমেলে কেস এলে একেনবাবুর অ্যাডভাইসও ক্যাপ্টেন নেন, সুতরাং ফোন করলে নিশ্চয় সব খবরই দেবেন। একেনবাবু ফোন করতেই যাচ্ছিলেন, হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, “স্যার, আজ কত তারিখ?”

 

“দশ।”

 

“দশ!” উনি আঁতকে উঠলেন, “সর্বনাশ স্যার, আমার হেলথ ইন্সিয়োরেন্স গতকাল এক্সপায়ার করে গেছে!”

 

আমি বললাম, “তাতে কী হয়েছে, কালকে এজেন্টকে ফোন করে রিনিউ করিয়ে নেবেন! ইট ইজ নট এ বিগ ডিল।”

 

“কী বলছেন স্যার! আজ রাত্রে যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যায়? উইদাউট এ হেলথ ইন্সিয়োরেন্স, আই উইল বি ডেড স্যার!”

 

দুশ্চিন্তাটা অমূলক নয়, আমেরিকাতে হেলথ ইন্সিয়োরেন্স ছাড়া থাকা বিপজ্জনক। হাসপাতালের খরচ এক এক দিনেই চার-পাঁচশো বা তার অনেক গুণ বেশি হতে পারে… এবার টাকায় হিসেব করুন! কিন্তু তাই বলে এক রাত ইন্সিয়োরেন্স ছাড়া কাটাতে এত কী ভয় বুঝলাম না!

 

প্রমথ ধমকাল, “মশাই, চেহারা তো টিংটিঙে, ব্লাড প্রেশার নর্মাল, কোলোস্টরালও নিশ্চয়ই লো— আপনার দুশ্চিন্তা কীসে?”

 

তাও একেনবাবু এমন ঘ্যানঘ্যান জুড়লেন বাধ্য হয়ে বললাম, “এতই যখন দুশ্চিন্তা, আমার এজেন্ট বব ল্যাশকে ফোন করতে পারেন। খুব হেল্পফুল, উইক এন্ডেও দিনে-রাতে ফোন ধরে। যদি সম্ভব হয় নিশ্চয় সাহায্য করবে।”

 

একেনবাবু উৎফুল্ল হয়ে বললেন, “নম্বরটা তাহলে দিন স্যার।”

 

“বলছি, ফোনটা তুলুন… আমাদের এরিয়া কোড দিন, তারপর টিপুন বব ল্যাশ।”

 

“বুঝলাম না স্যার, আমি তো নম্বরটা চাইছি!”

 

“তাই তো দিলাম, প্রথমে বি-ও-বি, তারপর এল-এ-এস-এইচ। উত্তর না পেলে আমার নাম করে একটা মেসেজ রেখে দেবেন।”

 

“এখনও বুঝলাম না স্যার।”

 

একেনবাবুর বিস্ময়টা উপভোগ করলাম। “বুঝতে পারছেন না? ল্যান্ড ফোনের বাটনগুলো দেখুন। প্রত্যেকটা বাটনে নম্বর ছাড়া তিনটে করে লেটার… দেখতে পাচ্ছেন?”

 

“ও, হ্যাঁ স্যার, এগুলো আগেও দেখেছি। দেশের ডায়ালে তো এগুলো থাকে না, তাই ইম্পর্টেন্সটা ঠিক বুঝিনি। কিন্তু দাঁড়ান স্যার, সবগুলো বাটনে কিন্তু লেটার নেই।”

 

“তাতে কিছু এসে যায় না। প্রথমে বব, মানে BOB অর্থাৎ টু সিক্স টু টিপুন, তারপর ল্যাশের নামের লেটারগুলো খুঁজে খুঁজে টিপুন, ওটাই হল ওর নম্বর।”

 

“আই সি! দাঁড়ান দেখি, L হচ্ছে ফাইভ, A হচ্ছে টু, S হচ্ছে সেভেন, আর H হচ্ছে ফোর। কিন্তু স্যার A আর B- দুটোই তো হচ্ছে টু?”

 

“ওটা নিয়ে ভাববেন না, এদেশের টেলিফোন সিস্টেম ঠিক বুঝে যাবে।”

 

“অ্যামেজিং স্যার! তার মানে ওঁর নম্বর হল টু সিক্স টু ফাইভ টু সেভেন ফোর। দিস ইজ ক্লেভার স্যার। নামটা মনে রাখা নম্বরের থেকে অনেক সহজ। আর নাম মনে রাখলেই নম্বরটাও জানা হয়ে গেল। নাঃ, ভেরি ভেরি ক্লেভার! এই না হলে আর ইন্সিয়োরেন্স এজেন্সি খুলেছেন!”

 

ফোনে বব-এর সঙ্গে কথা বলে একেনবাবু আরও ইম্প্রেসড। আমাকে বললেন, “যাই বলুন স্যার, থিংস মুভ ফাস্ট হিয়ার। আজ কলকাতা হলে… নাঃ, কীসের সঙ্গে কীসের তুলনা!”

 

আমি খোঁচা দিলাম, “ক’দিন আগেই তো সাহেবদের নিন্দায় পঞ্চমুখ হয়েছিলেন।”

 

“হয়েছিলাম বুঝি! কী করব স্যার, দোষে-গুণে হচ্ছে মানুষ। পজিটিভ থাকলেই স্যার, নেগেটিভ থাকতে হবে। ঠিক কিনা?”

 

চুপ করে রইলাম।

 

“যাই হোক, ভাগ্য করে বাপ-মা ওঁর এই নামটা রেখেছিলেন স্যার!”

 

“কার কথা বলছেন, বব-এর?”

 

“হ্যাঁ স্যার, ভেবে দেখুন যদি ওঁর আড়াই-গজি নাম হত, তাহলে সব কিছু জলে যেত!”

 

“আপনিও তো মশাই ভাগ্যবান,” প্রমথ টিপ্পনী কাটল। সেন একেন, এস ই এন এ কে ই এন। মাপা সাত অক্ষরে! যখন এদেশে ডিটেকটিভ এজেন্সি খুলবেন, মনে করে নিউ ইয়র্ক টেল-কে হাজার ডলার দিয়ে ফোন নম্বরটা নামের অক্ষর মিলিয়ে করিয়ে নেবেন।

 

“বলেন কী স্যার, অত টাকা লাগে?”

 

“অত লাগে কিনা জানি না, তবে আপনার কাছে হয়তো বেশি চাইবে!”

 

“ইডিয়টামি করিস না।” আমি প্রমথকে ধমক দিলাম। তারপর একেনবাবুকে বললাম, “কই, আপনি ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্টকে ফোন করলেন না?”

 

“করছি স্যার, করছি। কিন্তু একটা কথা স্যার,” বলে প্রমথর দিকে তাকিয়ে বললেন, “ক্যাপ্টেনের ইনফর্মেশনগুলো কিন্তু আর কাউকে জানাবেন না। তাহলে উনি-আমি সবাই বিপদে পড়ব।”

 

প্রমথ বলল, “এটা কী হল মশাই, সতর্কবাণীটা শুধু আমার দিকে তাকিয়ে করছেন কেন জানতে পারি?”

 

“কারণ, তোর পেট পাতলা বলে।” একেনবাবু কিছু বলার আগেই বলে উঠলাম।

 

.

 

মিনিট পাঁচেকের মতো ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্টের সঙ্গে একেনবাবুর কথা হল। ক্যাপ্টেনের কোনো কথা কানে না এলেও একেনবাবুর কথা থেকে ব্যাপারটা আঁচ করতে পারছিলাম। মিসিং পয়েন্টগুলো পরে একেনবাবু পূরণ করে দিলেন। যেটা বুঝলাম, বল্লভ শাহ দুপুর বারোটা নাগাদ মারা গেছেন। পোস্ট-মর্টেম শেষ হতে অবশ্য এক- আধ দিন লাগবে। তবে ক্যাপ্টেনের ধারণা মারা গেছেন অ্যাসফিক্সিয়েশনের ফলে, অর্থাৎ দড়ির ফাঁসে দম বন্ধ হয়ে। ডেডবডি পাওয়া গেছে বসার ঘরে সোফার ওপর, গলায় তখনও দড়ির ফাঁসটা লাগানো। দরজা ভেঙে বাড়িতে কেউ ঢোকেনি। বল্লভ শাহ একাই বাড়িতে ছিলেন। ওঁর বাড়িতে যে পোর্টারিকান মেয়েটি কাজ করত, সে কিছুদিনের জন্য ছুটি নিয়ে দেশে গেছে। সুতরাং মনে করা যেতে পারে বল্লভ শাহ আততায়ীকে চিনতেন, নিজেই দরজা খুলে দিয়েছিলেন। ঘরের সব কিছুই অটুট অবস্থায়। চুরি বা ডাকাতির কোনো উদ্দেশ্য ছিল বলে মনে হয় না। ধস্তাধস্তির বিশেষ কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। আরেকটা ইন্টারেস্টিং পয়েন্ট, পুলিশ বল্লভ শাহের বাড়িতে অরুণ শেঠের কোনো ফিঙ্গারপ্রিন্ট পায়নি। জজ অবশ্য অরুণ শেঠকে জামিন দেননি। যে লোকটা বুক ফুলিয়ে সগর্বে টিভি ক্যামেরার সামনে সবাইকে জানিয়েছে ‘হ্যাঁ, আমি খুন করেছি,’ তাকে জামিন দিতে যাবে কোন আহাম্মক! ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্টের লোক এখনও অরুণ শেঠকে ঠেসে ইন্টারোগেট করছে। সাইকিয়াট্রিক ইভ্যালুয়েশনও চলছে। কোনো অ্যালিবাই আছে কিনা তার খোঁজও পুলিশ করছে।

 

আমি একেনবাবুকে বললাম, “শুধু আপনি নয়, মনে হচ্ছে ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্ট ও অরুণ শেঠকে আততায়ী বলে মেনে নিতে পারছেন না।”

 

“ঠিকই ধরেছেন স্যার, ব্যাপারটা পাজলিং। কেউ যদি খুন করে সবার সামনে দোষ স্বীকার করবে বলেই ঠিক করে থাকে, তাহলে সে এত সাবধানে ফিঙ্গার প্রিন্ট না রেখে খুন করতে যাবে কেন?”

 

“কারণ লোকটা অর্ধোন্মাদ!” প্রমথ বলল।

 

“দ্যাটস দ্য ওনলি এক্সপ্ল্যানেশন স্যার। বাট ইট ইজ ইনডিড পাজলিং।” কথাগুলো বলে মাথা চুলকোতে চুলকোতে একেনবাবু শুতে চলে গেলেন।

 

ছয়

এর মধ্যে একটা কাজে আমি বেশ কয়েক দিন বাইরে গিয়েছিলাম। ফিরে এসে শুনি ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্ট একটা মাফিয়া মার্ডার নিয়ে এত হিমশিম খাচ্ছেন যে বল্লভ শাহের কেসটাতে সময় দিতে পারছেন না। নিজের অ্যাসিস্ট্যান্টদের ওপরও বোধহয় খুব একটা আস্থা নেই, তাই একেনবাবুর সাহায্য চেয়েছেন। একেনবাবু যে নিউ ইয়র্ক পুলিশের কনসালটেন্ট সেটা পরিষ্কার করে আমাদের কখনো বলেননি, আশ্চর্য লোক একটা!

 

.

 

বল্লভ শাহের মেয়ে সুজাতা এখন নিউ ইয়র্কে, বাবার মৃত্যুর খবর পেয়েই মনে হয় এসেছিল। তদন্তের স্বার্থে তার সঙ্গে একেনবাবুকে কথা বলতে হবে। দেখা করার কথা ‘রাজারানি’র হেড অফিসে। মুশকিল হল সেখানে যেতে আবার এক বার ট্রেন পালটাতে হয়। নিউ ইয়র্কের সাবওয়েতে একেনবাবু এখনও মাঝে মাঝে কনফিউজড হয়ে যান, তাই আমাকে ধরলেন সঙ্গে যাবার জন্য।

 

সুজাতা অফিসে বসে আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছিল। রোগা ছোট্টখাট চেহারা, সুন্দরী বলা যাবে না, কিন্তু বুদ্ধিদীপ্ত ঝকঝকে চোখ-মুখ। আত্মপ্রত্যয়ের ছাপ সেখানে সুস্পষ্ট।। প্রাথমিক পরিচয়পর্ব শেষ হলে ওর বাবার মৃত্যু নিয়ে দুঃখপ্রকাশ করে বল্লভ শাহ সম্পর্কে ভালো ভালো দু-চারটে কথা যা শুনেছি সেগুলো বললাম। সুজাতা তাতে কতটা কান দিল বুঝলাম না। উলটে আমি এখানে কতদিন আছি, পড়াতে কেমন লাগছে ইত্যাদি মামুলি কিছু প্রশ্ন করল। এরই মধ্যে একেনবাবু, “আপনি কি স্যার,” বলে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন। কথাটা বলেই অবশ্য বুঝতে পারলেন গোলমাল করে ফেলেছেন! তাই তাড়াতাড়ি শুধরে নিয়ে বললেন, “ … আই মিন ম্যাডাম। আপনি কি ম্যাডাম এবার নিউ ইয়র্কে ফিরে আসার কথা ভাবছেন?” একেনবাবুর দুর্গতিতে মজা লাগল। আমি আর প্রমথ ওঁর এই ‘স্যার’ ‘স্যার’ বলা বন্ধ করানোর প্রচুর চেষ্টা করেছি। আমেরিকাতে নাম ধরে ডাকাই দস্তুর। সম্মান জানাতে হলে মিস্টার অমুক ডাকলেই যথেষ্ট। এরকমভাবে ‘স্যার’ ‘স্যার’ বা ‘ম্যাডাম’ কেউ বলে না! প্রতি বারই আমাদের জ্ঞান দেওয়া শেষ হলে একেনবাবু মাথা চুলকোতে চুলকোতে বলেছেন, ‘কী করব স্যার, ওগুলো আমার চাইল্ডহুড হ্যাবিট!”

 

সুজাতা বলল, “প্লিজ, আমাকে সুজাতা বলে ডাকবেন।”

 

“থ্যাংক ইউ স্যার, মানে মিস সুজাতা,” কাঁচুমাচু হয়ে বললেন একেনবাবু।

 

সুজাতার ভুরু একটু যেন কোঁচকাল। “শুধু সুজাতা। আই প্রেফার প্লেন অ্যান্ড সিম্পল ‘সুজাতা’। থ্যাংক ইউ।”

 

কার মুখ দেখে আজ উঠেছেন একেনবাবু!

 

“ও হ্যাঁ,” একেনবাবু নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, “আচ্ছা, আপনি কি এখানে থাকবেন?”

 

“মানে?”

 

“বলতে চাচ্ছিলাম ম্যা… মানে কোম্পানিটা চালাতে?”

 

“না, সেরকম কোনো প্ল্যান আমার নেই।”

 

“তার মানে, যেখানে আছেন সেখান থেকেই বিজনেসটা চালাবেন?”

 

“না।” সুজাতা খুব সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল।

 

“তাহলে এটা চালাবে কে ম্যাডাম?” একেনবাবু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।

 

আমার সঙ্গে সুজাতা মোটামুটি নর্মালি কথা বলছিল। কিন্তু একেনবাবুর ‘স্যার’, ‘ম্যাডাম’, ‘মিস’-এর ফুলঝুরিতে নিশ্চয় একটা নেগেটিভ রিয়্যাকশন হয়েছে। কাঠ কাঠ উত্তর দিল, “মিস্টার সেন, আপনার বোধহয় জানা নেই আমার সঙ্গে বাবার সম্পর্ক মোটেই মধুর ছিল না। তাই এই ব্যাবসা চলবে কি চলবে না, সে নিয়ে আমার কোনো দুশ্চিন্তা নেই।”

 

“আই সি,” একেনবাবু মাথা চুলকোলেন। “তার মানে কি বিজনেসটা আপনি বেচে দেবেন, মিস শাহ?”

 

কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে সুজাতা বলল, “ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্ট আমাকে বলেছিলেন, আপনি বাবার মৃত্যু নিয়ে তদন্ত করতে আসছেন। তাই আমি আপনার সঙ্গে দেখা করতে রাজি হয়েছিলাম। কিন্তু যেসব প্রশ্ন আপনি করছেন, সেগুলো নিতান্তই ব্যক্তিগত। আর আমার বিশ্বাস, দে আর নট রেলেভেন্ট ফর দিস ইনভেস্টিগেশন।” সুজাতার গলার স্বর আরও কঠোর।

 

“আই অ্যাম সরি, মিস শাহ। ইউ আর রাইট, ইউ আর অ্যাবসোলিউটলি রাইট। এগুলো জাস্ট আমার কৌতূহল। আপনাকে জিজ্ঞেস করা উচিত হয়নি। আর আমার এই ‘স্যার-ম্যাডাম’ বলাটাও আপনি মাপ করে দেবেন।”

 

“দ্যাটস ওকে।”

 

“থ্যাংক ইউ। সত্যি কথা বলতে কি স্যার, মানে ম্যাডাম, আমার শুধু কয়েকটা প্রশ্নই আছে। প্রথম প্রশ্ন, আপনি নিউ ইয়র্কে কবে এলেন?”

 

“মঙ্গলবার বিকেলে।”

 

“মানে আপনার বাবার মৃত্যু হবার আগে?”

 

“হ্যাঁ।”

 

“কেন এসেছিলেন জানতে পারি কি, অবশ্য যদি পার্সোনাল কিছু না হয়।”

 

“না, কোনো ব্যক্তিগত ব্যাপারে নয়, এসেছিলাম ওয়াইল্ড-লাইফ সোসাইটির একটা কনফারেন্সে।”

 

“আই সি। তার মানে মঙ্গলবার থেকেই আপনি কনফারেন্সে?”

 

“কনফারেন্স আরম্ভ হবে এই সোমবার থেকে। আমি পুরোনো বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে সময় কাটাব বলে ক’দিন আগেই এসেছি।”

 

“বুঝলাম, মিস শাহ। আচ্ছা, ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্ট আমাকে বলেছেন, বুধবার সকালে খুব ভোরে আপনি হোটেল থেকে আপনার স্কুলের এক বন্ধুর কাছে যান, সেখানেই সন্ধ্যা পর্যন্ত কাটান। ইজ দ্যাট রাইট?”

 

“হ্যাঁ, আমি অর্চনার বাড়িতে ছিলাম। সেখানে ডিনার খেয়ে রাত ন’টা নাগাদ বাড়ি ফিরি।”

 

“পুরো সময়টাই ওখানে ছিলেন?”

 

“হ্যাঁ।”

 

“জিজ্ঞেস করতে খুব খারাপ লাগছে মিস, আপনার বাবার মৃত্যুর খবর কি ওখানেই টিভি-তে পেলেন?”

 

“না, পরে জেনেছি।” বোঝাই যাচ্ছে এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে সুজাতার খুবই কষ্ট হচ্ছে।

 

“থ্যাংক ইউ মিস। আরও কয়েকটা প্রশ্ন আমাকে করতে হবে, আসলে আমাদের কাজটা বড্ড নচ্ছার। মঙ্গলবার আপনি কোথায় ছিলেন স্যার, আই মিন মিস শাহ?”

 

“হোটেলেই ছিলাম, কয়েক ঘণ্টার জন্যে একটু শপিং করতে বেরিয়েছিলাম।”

 

“কারোর সঙ্গে কি দেখা হয়েছিল আপনার, শপিং করার সময় বা হোটেলে?”

 

“হ্যাঁ, অরুণভাই হোটেলে দেখা করতে এসেছিল।”

 

“অরুণভাই মানে মিস্টার অরুণ শেঠ?”

 

“হ্যাঁ।”

 

“উনি আপনার কে হন?”

 

“মামাতো ভাই।”

 

“ক’টার সময়?”

 

“রাত আটটা নাগাদ।”

 

“আই সি।” একেনবাবু ঘাড় চুলকোলেন কিছুক্ষণ। তারপর হঠাৎ বললেন, “আমি কিন্তু একটু কনফিউজড।”

 

সুজাতা শাহকে বিরক্তিভরে তাকাতে দেখে নিজেকে ব্যাখ্যা করলেন একেনবাবু, “আই মিন ম্যাডাম, আপনার এই হোটেলে এসে ওঠার ব্যাপারটা। আপনার বাবার সঙ্গে না হয় আপনার বনে না, কিন্তু আপনার মামাতো ভাই মিস্টার শেঠের এখানে যখন বাড়ি আছে… কিছু মনে করবেন না ম্যাডাম, এবার একটা পার্সোনাল কোয়েশ্চেন করছি, এটা কিন্তু রেলেভেন্ট। আপনাদের ভাই-বোনের মধ্যে সম্পর্কটা কেমন, মানে এতদিন কেমন ছিল?”

 

সুজাতা একটু চুপ করে থেকে বলল, “খুবই বাজে। আমার মায়ের মৃত্যুর পর থেকে ওর সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগ ছিল না।”

 

“তাহলে অরুণবাবু হঠাৎ আপনার সঙ্গে দেখা করতে এলেন কেন?”

 

এতক্ষণ নিজের ইমোশন চেপে রেখে সুজাতা প্রায় যন্ত্রের মতো কথোপকথন চালাচ্ছিল। এই প্রথম ওর মুখ-চোখ দেখে মনে হল সেটা যেন ধীরে ধীরে সামলানোর বাইরে চলে যাচ্ছে।

 

“অরুণভাই আমার কাছে ক্ষমা চাইতে এসেছিল।”

 

“কীসের জন্যে ম্যাডাম?”

 

সুজাতা শাহ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর বলল, “এ লং স্টোরি, মিস্টার সেন। যাঁরা এর মধ্যে জড়িত ছিলেন তাঁরা আর নেই, হোয়াটস দ্য পয়েন্ট?”

 

“বিশ্বাস করুন স্যার, আই মিন মিস সুজাতা, ইট কুড বি ভেরি ইম্পর্টেন্ট। কেন উনি ক্ষমা চাইতে এসেছিলেন?”

 

হঠাৎ দেখলাম সুজাতার মুখটা লাল, চোখ জলে ভরে আসছে। আস্তে আস্তে বলল, “আমার সব সময়েই মনে হত আমার মায়ের মৃত্যুর সঙ্গে বাবা সামহাউ জড়িত। মায়ের মৃত্যুর পর পরই আমি অরুণভাইকে সেটা বলেছিলাম। সে সময়ে অরুণ ভাই ওয়াজ ক্লোজ টু মি। ও কথাটা শুনে আমার ওপর ভীষণ রেগে গিয়ে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিল! আমি নিজেও বুঝতে পেরেছিলাম ওরকম চিন্তা করা পাপ, বাট আই কুডন্ট হেল্প ইট। তারপর থেকে অরুণভাইয়ের সঙ্গে কোনো যোগাযোগই আমার ছিল না। এবার অরুণভাই কোত্থেকে জানি খবর পায় আমি হোটেলে এসে উঠেছি। মঙ্গলবার রাত্রেই আমার কাছে ও আসে, এতদিন যোগাযোগ রাখেনি বলে অনেক ক্ষমা চায়। তারপর বলে ও এখন নিশ্চিত, আমার মায়ের মৃত্যুর জন্যে বাবাই দায়ী। আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম, কীভাবে ও সেটা জানল?

 

“ও বলল, হিসেবের কাগজপত্র থেকে। তারপর যা বলল তা হচ্ছে, বাবা নাকি কমিউনিটির চেনাজানা প্রায় সবার কাছ থেকে টাকা ধার নিয়েছিলেন বড়োসড়ো রিটার্নের লোভ দেখিয়ে। একজন তো তাঁর স্ত্রীর বিয়ের সমস্ত গয়না বন্ধক রেখেছিলেন বাবাকে ধার দিতে। তারপর নানান কারচুপি করে তাদের কারোর টাকা শোধ না করে কোম্পানিকে লাটে তুলেছিলেন। মা সেটা ধরতে পেরে বাবাকে চাপ দিয়ে যাচ্ছিলেন যে করে হোক সব ধার শোধ করে দেবার জন্য। আই গট সো আপসেট, আর কোনো প্রশ্ন আমি করতে পারিনি, কেঁদে ফেলি। অরুণভাইও আমার সঙ্গে কাঁদতে থাকে। উই ক্রায়েড অ্যান্ড ক্রায়েড।” সুজাতা শাহ আর নিজেকে সামলাতে পারল না, ফুঁপিয়ে উঠল। দেখি ওর চোখ থেকে টস টস করে জল পড়ছে।

 

আমি স্তব্ধ! একেনবাবুও কেমন জানি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছেন। আর কোনো প্রশ্ন না করে, ‘সরি’, ‘টরি’ বলে বিদায় নিলেন।

 

.

 

‘রাজারানি’র অফিস থেকে বেরিয়ে আমরা সাবওয়ে স্টেশনের দিকে হাঁটা দিলাম। একেনবাবু দেখলাম গম্ভীরভাবে কিছু ভাবছেন। আমার সুজাতার জন্য খুব খারাপ লাগছিল। কী নিদারুণভাবে বাবা-মা দু-জনকেই ও হারাল! যাই হোক এসব কাজে ইমোশনাল হলে চলে না। জীবন থাকলেই মৃত্যু থাকতে হবে, আমি নিজেকে বোঝালাম। ডেথ ইজ এ পার্ট অফ লাইফ। গীতার কয়েকটা শ্লোক মনে করার চেষ্টা করছিলাম। ‘নৈনং ছিন্দন্তি শস্ত্রাণি, নৈনং দহতি…।” দূর, এই হাড়-কাঁপানো ঠান্ডায় ওসব কী আর মনে আসে! চিন্তায় অবশ্য ছেদ পড়ল একেনবাবুর আত্ম-সমালোচনায়।

 

“বুঝলেন স্যার, আমার ‘স্যার’ বলাটা একটু কনট্রোল করতে হবে। মহিলাদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে এত ভুল করি, লজ্জা লাগে।”

 

“আপনারও লজ্জা লাগে তাহলে!” না খুঁচিয়ে আর পারলাম না।

 

“কেন স্যার, আমি কি এতই নির্লজ্জ?”

 

“তা নয়, তবে শুধু স্যার নয়, ‘মিস’ বলাটাও আপনাকে ছাড়তে হবে।”

 

“কেন স্যার, ‘মিস’ কথাটাতে ভুল কোথায়?”

 

“ভুল কিছু নয়, কিন্তু মহিলা যদি বিবাহিত হন তাহলে একটু এমব্যারাসিং হবে! তার থেকে ‘মিজ’ বলুন না, এক ঢিলে দুই পাখি মারতে পারবেন!”

 

“এইটে মোক্ষম বলেছেন স্যার, আজকাল বোধহয় ‘মিজ’ কথাটা খুব চলছে।”

 

“ঠিক, ম্যাডামটা একটু বেশি ভারিক্কি হয়ে যায়…”

 

আমাদের মিস, মিজ আর ম্যাডামের আলোচনা হয়তো আরেকটু চলত, কিন্তু এর মধ্যে শুনলাম, “হ্যালো মিস্টার সেন, হাউ আর ইউ?”

 

তাকিয়ে দেখি দিলীপ কাপাদিয়া।

 

“আপনি এখানে স্যার?” একেনবাবু জিজ্ঞেস করলেন।

 

“ক্যামেরা প্রো-তে এসেছিলাম কয়েকটা লেন্সের খোঁজ করতে। ভালোই হল দেখা হয়ে, আপনাকে আমি ফোন করতে যাচ্ছিলাম।”

 

“কী ব্যাপার স্যার?”

 

“মুনস্টোন মিস্ট্রি সলভ করার পর ডব্লুসিবিএস টিভি আপনার যে ইন্টারভিউ করেছিল, আপনার পারমিশন না পেলে ওরা রিলিজ করবে না। আমি কনসেন্ট ফর্মটা আনিয়ে রেখেছি, তাতে আপনার সইয়ের দরকার।”

 

“নো প্রবলেম স্যার। আপনি ফর্মটা মেল করে দিন, আমি সই করে ফেরত পাঠিয়ে দেব।”

 

“তা করা যায় অবশ্যি, কিন্তু শুভস্য শীঘ্রম। আপনারা এখন কোথায় যাচ্ছেন?”

 

“বাড়ি,” আমি জবাব দিলাম।

 

“গাড়ি নিয়ে এসেছেন?”

 

“না, সাবওয়ে ধরে এসেছি।”

 

“তাহলে আমার গাড়িতে আসুন। আমার অফিসে কাগজপত্রগুলো আছে। আপনার সই করা হয়ে গেলে, আমিই গাড়ি করে আপনাদের বাড়ি পৌঁছে দেব।”

 

মিস্টার কাপাদিয়ার গাড়ি রাস্তার উলটো দিকে পার্ক করা। রাস্তা ক্রস করতে

 

করতে উনি বললেন, “আচ্ছা কী কাণ্ড বলুন দেখি!

 

“কী কাণ্ড স্যার?”

 

“এই বল্লভ শাহের মার্ডার! পুলিশ তো আমাকেই প্রায় এক ঘণ্টা জেরা করল!”

 

“সে কি স্যার?” একেনবাবু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।

 

“না না, আমাকে সাসপেক্ট করে নয়,” দিলীপ কাপাদিয়া আমাদের আশ্বস্ত করে বললেন। “আমি তো সেদিন ওয়াশিংটন ডিসি-তে। ওদের জেরা সব অরুণ শেঠকে নিয়ে।”

 

“আপনি মিস্টার শেঠকে চেনেন নাকি?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

 

“নট ভেরি ওয়েল। কিন্তু অবিনাশের বাড়িতে ওর সঙ্গে আমার মায়ের আলাপ হয়েছিল গত বছর। সেই সূত্রে মাঝেমধ্যে আমার বাড়িতে এসেছে।”

 

“আপনার কী মনে হয় স্যার, উনি কি গিল্টি?”

 

“কে জানে মিস্টার সেন! সামহাউ আই ডোন্ট থিংক সো। কিন্তু ও যখন স্বীকার করেছে, তখন আমার বিশ্বাস-অবিশ্বাসে কী এসে যায়, তাই না?”

 

“তা ঠিক স্যার। ব্যাপারটা ভারি কনফিউজিং।”

 

.

 

দিলীপ কাপাদিয়ার অফিস হল ম্যানহাটানে, ফর্টি-থার্ড আর ফিফথ-এর ওপর ছ’তলায়, রাস্তার দিকে মুখ করে। ছোট্ট অফিস, কিন্তু ভারি সুন্দর করে সাজানো, আর ওয়েল ইকুইপড়। একটা আইবিএম-এর পার্সোনাল কম্পিউটার, ক্যানন কপিয়ার-কাম-ফ্যাক্স মেশিন, এটিএনটির মার্লিন টেলিফোন সেট— সবই টপ অফ দ্য লাইন। ঘরের দুই কোণে দামি সেরামিক পটে দুটো বিশাল ইন্ডোর রাবার প্ল্যান্ট, আর দেয়াল জুড়ে অজস্ৰ ফোটো। ফোটোগুলো দেখলে বোঝা যায় রাজনৈতিক ও সিনেমা জগতের অনেক নামকরা লোকের সঙ্গে দিলীপ কাপাদিয়ার দহরম-মহরম! এ ছাড়া নানান ফোটোগ্রাফি আর ভিডিয়োর জিনিসে ভরতি। ক্যামেরা, হাজার গণ্ডা লাইট, বড়ো বড়ো ফিল্টার, রিফ্লেক্টিভ বা ডিফিউজার আমব্রেলা— ঠিক কী বলে ওগুলোকে তাও জানি না, আরও কীসব যেন!

 

দিলীপ কাপাদিয়া আমাদের বসিয়ে রেখে, ‘এক্সকিউজ মি ফর এ মিনিট’ বলে কোথায় জানি গেলেন! আমি এই ফাঁকে ঘুরে ঘুরে ফোটোগুলো দেখছি, একেনবাবু ওদিকে অ্যাজ ইউজুয়াল খুটখাট শুরু করেছেন। আই ক্যান নেভার ফিগার হিম আউট! এদিকে গ্যাজেটকে ভয় পান, কিন্তু পুশ-বাটন দেখলেই দুম করে সেটা এক বার টিপে দেবার অভ্যাস ওঁর গেল না! কিছুর মধ্যে কিছু না, ডিজিটাল টেবিল ক্লকের কোন বাটনটা টিপলেন জানি না, হঠাৎ টাইম-ডিসপ্লেটা ব্লিংক করতে আরম্ভ করল! তখন ভয় পেয়ে আর্তনাদ করে উঠলেন, “স্যার, এটা একটু ঠিক করে দিন।”

 

ওঁর ধারণা আমেরিকার সমস্ত গ্যাজেটেরই নাড়িনক্ষত্র আমার জানা। ক্লকটা নিয়ে ধস্তাধস্তি করছি হঠাৎ টেলিফোনে ডায়ালের আওয়াজ। তাকিয়ে দেখি সেটের লিকুইড ক্রিস্টাল ডিসপ্লে-তে ২৬২-৭৪২৪ ফুটে উঠেছে। আর একেনবাবু ভীষণ নার্ভাস হয়ে আর্তস্বরে বলছেন, “কী করে এটা বন্ধ করব, স্যার?”

 

তাড়াতাড়ি ফোনটা হুক থেকে তুলে আবার নামাতেই কানেকশনটা কেটে গেল।

 

“ভুলে স্যার রিডায়াল’ বাটনটা টিপে ফেলেছি,” কাঁচুমাচু মুখে বললেন।

 

“কিছুতে হাত দেবেন না তো মশাই! আপনার হ্যাপা সামলাতেই আমার হার্ট অ্যাটাক হবে বুঝতে পারছি!”

 

ভাগ্যিস দিলীপ কাপাদিয়া এর মধ্যেই ফিরে এলেন।

 

“সরি টু কিপ ইউ ওয়েটিং,” বলে মিস্টার কাপাদিয়া ড্রয়ার থেকে কনসেন্ট ফর্মটা বার করতে করতে বললেন, “দিস ইজ দ্য প্লেস, হোয়্যার আই জেনারেট মাই ক্রিয়েটিভ আইডিয়াজ। আমার মেইন স্টুডিও থার্টি থার্ড স্ট্রিটে।”

 

“ভারি সুন্দর অফিস।” আমি মন্তব্য করলাম।

 

“তবে স্যার, বড্ড কমপ্লিকেটেড গ্যাজেটে ভরতি। আমার আবার গ্যাজেট দেখলেই নার্ভাস লাগে।” বুঝলাম একেনবাবুর ভয় তখনও যায়নি! দিলীপ কাপাদিয়ার মুখে মুচকি হাসি, “তাই নাকি!”

 

“আপনি কি স্যার রোজই এখানে আসেন?”

 

“রোজ না হলেও একদিন অন্তর তো আসিই। তবে ইন্টারেস্টিংলি আজ এলাম প্রায় এক হপ্তা বাদে… শুটিং-এর কাজ চলছে ওয়াশিংটন ডিসি-তে, ডাবিং আর এডিটিং-এর সব কাজ মেইন স্টুডিওতে। নিন, এবার এই ফর্মের প্রথম পাতায় একটা ইনিশিয়াল দিন আর পরের পাতায় যেখানে ক্রস চিহ্ন দেওয়া আছে সেখানে সই করুন, তাহলেই আপনার ছুটি।”

 

সাত

দিলীপ কাপাদিয়া আমাদের নামিয়ে দিলেন বাড়ি থেকে মাত্র দু-ব্লক দূরে ওয়াশিংটন পার্কে। আমিই বললাম ওখানে নামাতে। বাড়ির সামনে নামাতে হলে ওয়ান-ওয়ের জন্য ওঁকে একটু ঘুরতে হত। রাস্তায় নেমে হাঁটতে হাঁটতে একেনবাবু হঠাৎ বলে উঠলেন, “বুঝলেন স্যার, একজনকে ভালোবাসলে তার জন্যে অনেক কিছু করা যায়।”

 

“কী বলতে চাইছেন আপনি?”

 

“এই অরুণ শেঠের কথা ভাবছি।”

 

“কী ভাবছেন?”

 

“মানে স্যার, ভাই-বোনের মধ্যে ভালোবাসা নিয়ে।”

 

“হোয়াট! অবৈধ প্রেম?”

 

“আরে না স্যার, ছি ছি!”

 

“তাহলে?”

 

“ভাবছিলাম উনি হয়তো সুজাতা দেবীকে সেদিন বোঝাবার চেষ্টা করছিলেন, পুলিশ নিয়ে ওঁর চিন্তিত হবার কোনো কারণ নেই, সন্দেহের সব তির এখন ওঁর দিকে। কিন্তু জানেন স্যার, তার তো কোনো দরকারই ছিল না!”

 

“তার মানে! আপনি বলতে চান অরুণ খুন করেনি?”

 

“তা তো বলিনি স্যার।”

 

বাড়িতে যখন প্রায় এসে গেছি, তখন কথাটা ক্লিয়ার হল। ঠিক ঢোকার মুখে ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্টের সঙ্গে দেখা। একেনবাবুকে বললেন, “তোমাকে ফোন করতাম, কিন্তু যখন এ পথ দিয়েই যাচ্ছি, ভাবলাম খবরটা দিয়েই যাই। ইউ আর রাইট একেন্ড্রা, ইউ আর রাইট অ্যাবাউট অরুণ শেঠ।”

 

একেনবাবু উজ্জ্বল মুখে বললেন, “তার মানে হি হ্যাড অ্যান অ্যালিবাই?”

 

“ইয়েস, অ্যান্ড মাইট বি এ গুড ওয়ান। যখন ওকে বললাম সুজাতা শাহ-র একটা অ্যালিবাই আছে, সুজাতাকে জেরা করছি না, ওর মুখ-চোখ একেবারে উজ্জ্বল হয়ে গেল! তখন জেরা না করতেও নিজের থেকেই অনেক কিছু বলে ফেলল! যাই হোক, ব্যাপারটা হল অরুণ প্রায়ই ডক্টর আনান্ড শর্মা নামে এক ইন্ডিয়ান ডক্টরের বাড়ি যেত লাঞ্চ খেতে। নট এভরি ডে, কিন্তু ইট ওয়াজ অলমোস্ট এ রুটিন। এই ডক্টর শর্মার বাড়ি অরুণ শেঠের অফিস থেকে মাত্র ছ’ব্লক দূরে, সুতরাং হেঁটেই যাওয়া যায়। সেদিনও ও বেরিয়েছিল লাঞ্চে যেতে। কিন্তু রাস্তায় বেরিয়ে এক ব্লক যেতে না যেতেই চোখে পড়ল ডক্টর শর্মার গাড়ি রাস্তায় পার্ক করা। ওটা ‘নো পার্কিং’ এরিয়া। একটু অবাকই হল, হয়তো ওঁর কোনো এমার্জেন্সি কল এসেছে ভেবে অরুণ একটা গ্রিক রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ খেয়ে ফিরে যায়। যদি ডক্টর শর্মার বাড়িতে লাঞ্চ খেত, তাহলে এতদিন ওকে আমাদের আটকে রাখার কোনো প্রয়োজনই হত না। চট করেই অ্যালিবাইটা বেরিয়ে পড়ত।”

 

একেনবাবু দেখলাম তুরু-টুরু কুঁচকে কী জানি তাছেন।

 

“কিন্তু ডক্টর শর্মা তো বাড়ি ছিলেন না!”

 

“তা ঠিক।”

 

“আপনি স্যার গ্রিক রেস্টুরেন্টটা চেক করেছেন তো?”

 

“ইয়েস। লাকিলি একাধিক বার অরুণ ওখানে খেয়েছে। একজন ওয়েটার কনফার্ম করেছে।”

 

“আর আমার ইনফর্মেশনটা স্যার?”

 

“সেটাও আজ-কালের মধ্যে এসে যাবে।

 

“কী ইনফর্মেশন?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

 

একেনবাবু আর ক্যাপ্টেন দেখি দু-জনে দু-জনের দিকে তাকালেন। একেনবাবু বললেন, “ওটা স্যার, অন্য ব্যাপার।”

 

.

 

ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্ট চলে যেতেই একেনবাবুকে বললাম, “কী ব্যাপার বলুন তো, জিনিসটা কি আরও পাজলিং হয়ে যাচ্ছে না?”

 

“ওয়াশিংটন ডিসি এখান থেকে যেতে কতক্ষণ লাগে, স্যার?”

 

“আমার প্রশ্নের পিঠে এই উলটো প্রণের পারম্পর্য ঠিক বুঝলাম না। কিন্তু তা নিয়ে প্রশ্ন না তুলে বললাম, “সেটা নির্ভর করছে কীভাবে যাবেন তার ওপর।”

 

“তাও তো বটে,” একেনবাবু ভুলটা বুঝতে পেরে মাথা নাড়লেন। “ধরুন স্যার, যদি গাড়ি করে যাই?”

 

“তাহলে সাড়ে তিন ঘণ্টার মতো।”

 

“আর প্লেনে?”

 

“প্লেন আকাশে ওঠার পর মিনিট পঁয়ত্রিশ। কিন্তু তার সঙ্গে যোগ করুন এয়ারপোর্ট যাবার টাইম আর প্লেনের জন্য রিপোর্টিং টাইম। আরও যোগ করতে হবে টেক অফ আর ল্যান্ডিং-এ কতক্ষণ লাগবে…।”

 

“বুঝেছি, বুঝেছি স্যার, ভারি গোলমেলে হিসেব।”

 

.

 

বাড়িতে ঢুকেই “আসছি” বলে একেনবাবু নিজের ঘরে গিয়ে কাকে জানি ফোন করতে গেলেন। কিচেনে প্রমথ তেড়ে রান্না করছে। আমাকে দেখে ফাজলামি করে জিজ্ঞেস করল, “কী রে, তোদের সাসপেক্ট কে? পাঁচকড়ি দে?”

 

“মানে?”

 

“একেনবাবুকে ভাঙিয়ে গোয়েন্দা কাহিনি লেখার চেষ্টা করছিস, অথচ পাঁচকড়ি দে-র নাম শুনিসনি? বাংলাসাহিত্যের এক্কেবারে আদিযুগের গোয়েন্দা কাহিনিগুলো তো ওঁর হাত থেকেই বেরিয়েছে! ওসব থাক, সাসপেক্ট কে বল?”

 

“একেনবাবু কী উত্তর দেবেন জানি না, আমার মতে বাটলার, এক্ষেত্রে রাঁধুনি ব্যাটাই দোষী!”

 

“তার মানে তো আমি!” খুন্তি নাড়াতে নাড়াতে প্রমথ হো-হো করে খানিকক্ষণ হাসল। তারপর বলল, “ফাজলামি নয়, একেনবাবুকে একটা পাকা খবর দিই। মার্ডারের সময় দিলীপ কাপাদিয়া কিন্তু ম্যানহাটানেই ছিলেন।”

 

“এটা তুই কী করে জানলি?”

 

আমাকে অবাক করতে পেরেছে দেখে প্রমথ মজা পেল। গম্ভীরভাবে বলল, “খবর রাখতে হয় বন্ধু, খবর রাখতে হয়।”

 

আসলে ব্যাপারটা খুবই সিম্পল। প্রমথ অচ্যুতের সঙ্গে আড্ডা দিতে গিয়েছিল সোমবার, অর্থাৎ বল্লভ শাহের মৃত্যুর ঠিক দু-দিন আগে। অচ্যুত আমাদের কয়েক বছরের জুনিয়র। কিছুদিন হল ম্যানহাটানে ছোটোখাটো ট্র্যাভেল এজেন্সি খুলেছে। ক্লায়েন্টরা সব ভারতীয়। কোনো এক প্রসঙ্গে দিলীপ কাপাদিয়ার কথা যখন হচ্ছিল, অচ্যুত বলেছে খানিক আগেই ও দিলীপ কাপাদিয়ার জন্য ওয়াশিংটন ডিসি থেকে নিউ ইয়র্কে আসার প্রিপেড টিকিটের বন্দোবস্ত করে দিয়েছে।

 

খবরের সোর্সটা জেনে বললাম, “তোর ইনফর্মেশন হয়তো ঠিক, কিন্তু কনক্লুশনটা ঠিক নয়।”

 

“তার মানে?”

 

“মানে হল, দিলীপ কাপাদিয়া বুধবার ওয়াশিংটন ডিসি-তে ছিলেন। আজ দুপুরেই ওঁর কাছ থেকে কথাটা জানলাম।”

 

“তাহলে হয়তো মঙ্গলবার উনি আবার ব্যাক করেছিলেন। এখন মনে হচ্ছে শুধু প্রিপেড টিকিটের কথা বলেছিল। ওয়ান-ওয়ে না রিটার্ন খেয়াল করিনি। ঠিকই বলছিস, শুটিং-এর কাজে নিশ্চয় ওঁকে এরকম শর্ট-ট্রিপ নিতে হচ্ছে। আগের শনিবারও তো ওঁর সঙ্গে আমাদের দেখা হল, বললেন ওয়াশিংটন ডিসি থেকে ফিরেছেন। তার মানে রোববারও উনি ডিসি-তে গিয়েছিলেন।”

 

“ফিল্ম মেকারদের ব্যাপারস্যাপারই আলাদা! যাই হোক, আর কিছু জানলি এর মধ্যে?”

 

“বিশেষ কিছু নয়। তুই সেদিন কলেজে ছিলি… একেনবাবুকে দিলীপ কাপাদিয়া বলছিলেন, ডকুমেন্টারির জন্য রিসার্চ করতে গিয়ে বল্লভ শাহ সম্পর্কে উনি একটা ইন্টারেস্টিং তথ্য আবিষ্কার করেছেন।”

 

“সেটা কী?”

 

“দিলীপ কাপাদিয়া জানার চেষ্টা করছিলেন বল্লভ শাহ ওঁর ফাস্ট-ফুড-এর ব্যাবসা অল্প সময়ের মধ্যে এত বিশাল করে ফেললেন কীভাবে? খুব সহজে নাকি ব্যাপারটা ঘটেনি— দু-দু বার দেউলিয়া হয়ে গিয়েছিল ওঁর কোম্পানি। তবে বল্লভ শাহ খুবই চালু ব্যবসায়ী, দুটো কোম্পানিই ছিল লিমিটেড লায়াবিলিটি কর্পোরেশন। কোম্পানি ডকে উঠলেও মার খেয়েছিল ইনভেস্টররা, যাদের বেশিরভাগই ছিল দেশি ভাই… ব্যবসায়ী, ডাক্তার, উকিল, অর্থাৎ— অর্থবান ভারতীয়রা। তাদের পুরো ইনভেস্টমেন্ট জলে গিয়েছিল! নতুন করে যখন বিজনেস শুরু করলেন, ওঁর ব্যাঙ্কাপ্টসি রেকর্ড দেখে ব্যাঙ্ক নাকি প্রথমে ধার দিতে চায়নি। নিজের অ্যাসেট আর স্ত্রীর ইনসিয়োরেন্স থেকে পাওয়া টাকা দিয়ে ব্যাবসার মূলধন জোগাড় করেছিলেন। পরে ব্যাবসা মোটামুটি দাঁড়িয়ে গেলে ব্যাঙ্ক আবার টাকা ধার দিতে শুরু করে। অর্থাৎ, একদিক থেকে ‘রাজারানি’ শুরু হয়েছিল একটা টুলি কমিউনিটি-বেসড ভেঞ্চার হিসেবে, কিন্তু কমিউনিটিকে ফাঁকি দিয়ে। তাই ইন্ডিয়ান কমিউনিটির টাকাওয়ালা অনেকেই ওঁর শত্রুর দলে।”

 

“এই বার বুঝতে পারছি, কেন সেদিন অবিনাশ পার্টিতে ওইরকম একটা হিন্ট দিয়েছিল।”

 

“শোন, এটাই শেষ নয়। দিলীপ কাপাদিয়ার আরও পাজলিং লেগেছে… ডক্টর আনন্দ শর্মা, যিনি ওঁর ফিল্ম কোম্পানির সবচেয়ে বড়ো অংশীদার, তিনি হঠাৎ বল্লভ শাহের সঙ্গে কম্পিটিশন করে ইন্ডিয়ান ফাস্ট-ফুড চেইন খোলার তোড়জোড় করছেন! সোজাসুজি না বললেও দিলীপ কাপাদিয়াকে একটা হিন্ট দিয়েছেন, রেস্টুরেন্ট বিজনেসে ওঁকে নামতেই হবে ওঁর পরলোকগত স্ত্রীর কথা ভেবে! কোনো রহস্য নিশ্চয় এর মধ্যে আছে। মৃত্যুভয় নয়, ডক্টর শর্মা এই ডকুমেন্টারির কো- প্রোডিউসার জানতে পেরেই বল্লভ শাহ ডকুমেন্টারিতে অংশ নিতে চাচ্ছিলেন না।”

 

“সেটা কেন?”

 

“বুঝতে পারছিস না! কমিউনিটির বন্ধুবান্ধবদের এইভাবে ফাঁকি দেবার কাহিনিগুলো যদি নতুন করে টিভি-তে প্রচারিত হয়ে যায়! নিশ্চর সেই ভয় থেকে।”

 

আট

পরদিন বিকেলে আবার ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্ট বাড়িতে এলেন। চেহারাটা যদিও পরিশ্রান্ত, কিন্তু মনে হল বেশ মুডেই আছেন। একেনবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “একটু চা চলবে স্যার?”

 

“ও ইয়েস,” ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্ট বললেন, “দেয়ার ইজ নাথিং বেটার দ্যান এ কাপ অফ ইন্ডিয়ান টি।”

 

প্রমথর ফাজলামির হাত থেকে আজকাল ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্টও রেহাই পান না। আমাকে কাঁচা বাংলায় বলল, “মোলো যা! তোদের চা খাওয়া তো গরম জলে আড়াই সেকেন্ড টি ব্যাগ ডুবিয়ে। ইন্ডিয়ান টি-র মর্ম তোরা কী বুঝিস!”

 

ক্যাপ্টেন বাংলা না বুঝলেও ওঁর সম্পর্কেই যে কথা বলা হচ্ছে সেটা ধরতে পারলেন। বললেন, “ইয়েস প্রমঠ?”

 

প্রমথ অম্লানবদনে গুল মারল, “আপনার চায়ের ভালো টেস্ট, সেটাই বাপিকে বলছিলাম।”

 

“দ্যাটস নাইস অফ ইউ, থ্যাংকস।”

 

একেনবাবু কেটলিতে জল চাপিয়ে এসে বললেন, “ক্যাপ্টেন স্যার, আপনাকে একটু খুশি খুশি লাগছে?”

 

“ও ইয়েস, টু ডে ইজ নট এ ব্যাড ডে, ফাইনালি উই আর হেডিং সামহোয়্যার।”

 

“একটু বুঝিয়ে বলুন স্যার?”

 

“আজ সকালে পুলিশ কম্পিউটার চেক করে দেখলাম বুধবার পৌনে বারোটার সময় ডক্টর আনন্ড শর্মার গাড়ি মিউজিয়ামের উলটো দিকে পার্ক করা ছিল। অর্থাৎ অরুণ শেঠ ঠিক কথাই বলেছে।”

 

একেনবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “ডক্টর শর্মাকে এ নিয়ে প্রশ্ন করেছেন স্যার?”

 

“হি ইজ ডিনায়িং এভরিথিং! ওঁর বক্তব্য, পুলিশ লাইসেন্স প্লেটের নম্বর টুকতে ভুল করেছে।”

 

“সেটা কি একেবারেই অসম্ভব?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

 

ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্ট আমার দিকে তাকিয়ে একটু অনুকম্পার হাসি হেসে বললেন, “পুলিশ শুধু লাইসেন্স প্লেটের নম্বর টোকে না, কী গাড়ি, তার কী রং- সব কিছুই নোট করে। গাড়িটা কালো মার্সিডিজ, অর্থাৎ ডক্টর শর্মার ঠিক যেরকম গাড়ি তাই।”

 

একেনবাবু বললেন, “তার মানে ডক্টর শর্মার এটা নিয়ে কোনো এক্সপ্ল্যানেশন নেই।”

 

“নো। বাট হি হ্যাজ অ্যানাদার নট দ্যাট-বিলিভেবল স্টোরি। ওঁর গাড়ির এক সেট চাবি নাকি কিছুদিন আগে হারিয়ে গিয়েছিল। ওঁর বক্তব্য সেই চাবি দিয়ে ওঁর অজান্তে নিশ্চয় কেউ গাড়িটা চালিয়েছে!”

 

“বলেন কি স্যার!”

 

“এখানেই শেষ নয়, সেই হারিয়ে যাওয়া চাবি ডক্টর শর্মা নাকি ফেরতও পেয়েছেন! যে গাড়িটা চালিয়েছে, সে-ই চাবিটা গ্লাভ কম্পার্টমেন্টে রেখে চলে গেছে! কী মনে হয়, বিশ্বাসযোগ্য এক্সপ্ল্যানেশন?”

 

“একেবারেই নয় স্যার,” বলে একেনবাবু ক্যাপ্টেনকে প্রশ্ন করলেন, “আচ্ছা, পৌনে বারোটার সময় ডক্টর শর্মা কোথায় ছিলেন?”

 

“উনি তো বলছেন নিজের বাড়িতেই ছিলেন। সাধারণত উনি রোগী দেখে সাড়ে এগারোটার সময় বাড়ি আসেন, আর অরুণ শেঠ আড্ডা দিতে আসে বারোটা নাগাদ। গল্প করতে করতে একসঙ্গে বসে ওঁরা লাঞ্চ খান। ওদিন উনি রেগুলার টাইমেই বাড়ি আসেন, কিন্তু অরুণ শেঠ না আসায় একা একাই লাঞ্চটা সারেন। তারপর ঘণ্টা দুয়েক বাড়িতে বিশ্রাম করে দুটো নাগাদ ম্যানহাটানে ওঁর ক্লিনিকে যান।”

 

“অর্থাৎ ওই দিন উনি একাই বাড়িতে ছিলেন স্যার?” একেনবাবু জিজ্ঞেস করলেন।

 

“এক্স্যাক্টলি। নো উইটনেস টু কনফার্ম দ্যাট। বাট দেয়ার ইজ মোর। ওঁর ম্যানহাটান ক্লিনিকের রিসেপশনিস্ট গ্লোরিয়া বেটসের সঙ্গে কথা বলে আমি জানতে পেরেছি বুধবার বারোটার একটু আগে বল্লভ শাহ ফোন করেছিলেন। ডক্টর শর্মার নাকি দুপুরে বল্লভ শাহের কাছে যাবার কথা ছিল, যাননি কেন জানতে। অর্থাৎ ব্যাপারটা দাঁড়াল এই, দুপুরে ডক্টর শর্মার এক জায়গায় যাবার কথা ছিল, কিন্তু উনি সেখানে যাননি। শুধু ওঁর গাড়িটা কী করে জানি ঠিক সময়ে সেখানেই গেছে!”

 

“মাই গুডনেস, স্যার! কিন্তু ওঁর রিসেপশনিস্ট এটা এতদিন রিপোর্ট করেননি কেন?”

 

“ওয়েল, ডক্টর শর্মা যখন ক্লিনিকে আসেন, তখন গ্লোরিয়া ফোন আসার কথাটা জানায়। ডক্টর শর্মা কথাটা শুনে খুব অবাক হন, অন্তত অবাক হবার ভান করেন। উনি বলেন গ্লোরিয়া নিশ্চয় ভুল শুনেছে। গ্লোরিয়া এমনিতে হয়তো পুলিশকে ঘটনাটা জানাত, কিন্তু অরুণ শেঠ দোষ স্বীকার করায় প্রয়োজনবোধ করেনি।”

 

“এবার বুঝলাম স্যার, আপনার খুশির কারণটা। গাড়ি যখন ওখানে ছিল, তখন অপরচুনিটি তো ছিল। কিন্তু মিস আর মোটিভ কি ধরতে পারা গেছে?”

 

“মোটিভ একটা আছে। এটা ওঁর মেয়ে সুজাতা আর অরুণ শেঠের সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পেরেছি। বল্লভ শাহর ট্রিকারিতে ডক্টর শর্মা স্ত্রীর বিয়ের সমস্ত গয়না বন্ধক রেখে খুইয়েছিলেন, যা টাকা দিয়েও এখন ফেরত পাবার উপায় নেই! ওঁর স্ত্রী আজীবন সেই শোক ভুলতে পারেননি। অরুণ তার সাক্ষী। তিনি মারা গেছেন গত বছর। মনে হচ্ছে সেই কষ্টের তাড়না ধীরে ধীরে ডক্টর শর্মার অসহ্য হয়ে উঠেছিল। মিন্‌সটা মিসিং মানছি। কিন্তু ওটা তো একটা দড়ি মাত্র!”

 

.

 

ক্যাপ্টেন চলে যাবার পর থেকে একেনবাবু কেমন জানি নিষ্প্রভ, হয়তো কেসটা নিজে সলভ করতে পারেননি বলেই! আমার ধারণা অবশ্য একেনবাবুর জন্যেই ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্ট এত দূর এগোতে পেরেছেন। কেসটার টার্নিং পয়েন্ট নিঃসন্দেহে, অরুণ শেঠের প্রথমে দোষ স্বীকার করে পরে হঠাৎ অস্বীকার করা, যেটা একেনবাবুর সুজাতা শাহ সম্পর্কে ইনফর্মেশন দেবার জন্যেই ঘটেছে। কিন্তু এসব নিয়ে ওঁকে প্রবোধ দেওয়ার কোনো অর্থ হয় না।

 

লোকাল ইভনিং নিউজে ডক্টর শর্মাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশের নিয়ে যাবার খবরটা ছিল। অর্থাৎ ব্যাপারটা এখন আর গোপনীয় কিছু নয়। তবে ফর্মালি ওঁকে অ্যারেস্ট করা হয়নি। রাত্রে প্রমথর ডিপার্টমেন্টে একটা সেমিনার ছিল। প্রমথ যখন বেরোচ্ছে একেনবাবু বললেন, “আমাকেও স্যার একটু লাইব্রেরিতে যেতে হবে।”

 

ওরা দু-জন চলে যেতেই আমি ঘরদোর পরিষ্কার করা শুরু করলাম। কাল সকালে দিলীপ কাপাদিয়া দলবল নিয়ে শুটিং করতে আসছেন। সেটা আবার হচ্ছে আমার অ্যাপার্টমেন্টে। নীচে প্রমথর অ্যাপার্টমেন্টের ইদানীং যা অবস্থা, পরিষ্কার- পরিচ্ছন্ন করে সেটা ভদ্রস্থ করে তুলতে তিন-চার দিন লেগে যাবে। সাড়ে ন’টা নাগাদ ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্টের ফোন। একেনবাবুকে নীচে ধরতে না পেরে আমার অ্যাপার্টমেন্টে ফোন করেছেন। একেনবাবু এখানেও নেই শুনে খবরটা আমাকেই দিলেন। ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্টের গলায় খুশি খুশি ভাব। ডক্টর শর্মার গাড়ি সার্চ করে ট্রাঙ্ক থেকে নাকি একটা দড়ির বান্ডিল পাওয়া গেছে। যে দড়িটায় ফাঁস দিয়ে বল্লভ শাহকে হত্যা করা হয়েছে সেই দড়িটা নাকি এই বান্ডিল থেকেই কাটা হয়েছিল! দারুণ খবর- মোটিভ, অপরচুনিটি সঙ্গে এখন মিসটাও পাওয়া গেল! ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্টের উৎফুল্ল হওয়ার কারণ বুঝতে এতটুকু অসুবিধা হল না।

 

“আরেকটা কথা,” ক্যাপ্টেন বললেন, “একেন্ড্রাকে জানিয়ে দিয়ো ফোন কলটা বুধবার সাড়ে এগারোটার সময় করা হয়েছিল।”

 

“কোন কলটা?”

 

“হি উইল আন্ডারস্ট্যান্ড।”

 

ইন ফ্যাক্ট প্রশ্নটা করামাত্র আমারও মনে পড়ল। নিশ্চয় ডক্টর শর্মার ক্লিনিকে বল্লভ শাহের ফোন করার কথাটা বলছেন।

 

এদিকে সারাদিন কাজ করে আমার ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। মেসেজটা নীচে রেখে এসে শুয়ে পড়লাম।

 

নয়

দিলীপ কাপাদিয়া তাঁর দলবল নিয়ে বেশ সকাল সকালই এলেন। সঙ্গে দু-দুটো ভিডিয়ো ক্যামেরা, সাউন্ড রেকর্ডার, নানান সাইজের লাইট, রিফ্লেক্টর, ফিল্টার, ইত্যাদি বিভিন্ন সরঞ্জাম নিয়ে! মুহূর্তের মধ্যে বাইরের ঘরে আর তিল ধারণের জায়গা রইল না। একেনবাবু রেডি হয়েই ছিলেন। প্রমথের বকুনি খেয়ে ঘিয়ে কোটটা আজ পরেননি, তার বদলে বেঢপ সাইজের ফিকে নীল হাত কাটা সোয়েটার। বোঝা যায় খুবই আনাড়ি হাতের কাজ। প্রমথ একটা নির্দয় মন্তব্য করতে গিয়েছিল, ভাগ্যিস করেনি! কথায় কথায় বেরিয়ে গেল ওটা একেনবউদির নিজের হাতে বোনা!

 

একেনবাবু বেশ গর্ব গর্ব মুখ করেই সোফায় বসেছিলেন। কফি টেবিলের অন্যদিকে দিলীপ কাপাদিয়া।

 

“আপনি রেডি?” দিলীপ কাপাদিয়া জিজ্ঞেস করলেন।

 

“হ্যাঁ স্যার।”

 

কেউ একজন হুকুম দিলেন, “চুপ, সবাই চুপ।” তারপর শুনলাম ‘লাইট’, ‘সাউন্ড’, ‘ক্যামেরা’ ইত্যাদি কয়েকটা কথা। একেনবাবুরা যেখানে বসেছেন জায়গাটা হঠাৎ আলোয় আলোকিত। যেই চোখে আলো পড়ল আড়ষ্ট হয়ে একেনবাবুর চোখ পিটপিট শুরু হল। দিলীপ কাপাদিয়া এত আলোর মধ্যেও সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। খুব সহজ ভঙ্গিতে মুনস্টোন মিস্ট্রি ছাড়াও দেশের কয়েকটা কেস নিয়েও বেশ কিছু প্রশ্ন করলেন। প্রথম দিকের জড়তা কাটিয়ে একেনবাবু দিব্যি উত্তর দিলেন। দিলীপ কাপাদিয়া তখন জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা মিস্টার সেন, আপনার কাছে সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং কেস কোনটা?”

 

একেনবাবু ঘাড় চুলকে বললেন, “কে জানে স্যার, আমার কাছে কেস মাত্রই ইন্টারেস্টিং। ধরুন, এখন যে কেসটা করছি সেটা তো নিঃসন্দেহে খুবই ইন্টারেস্টিং।”

 

“কোন কেস?”

 

“বল্লভ শাহের মৃত্যুর তদন্ত।”

 

“ওটা আপনি করছেন?”

 

“ঠিক আমি না স্যার… তবে পুলিশকে একটু সাহায্য করছি।”

 

“আমাদের দেশে হয়তো অনেকে জানেন না,” দিলীপ কাপাদিয়া ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে টিভির শ্রোতাদের উদ্দেশে বললেন, “নিউ ইয়র্কের ভারতীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে একটি পরিচিত মুখ ছিলেন মিস্টার বল্লভ শাহ। রেস্টুরেন্ট বিজনেসে মিস্টার শাহ মাত্র আট বছরের মধ্যে অসামান্য সাফল্য লাভ করেছিলেন। এই প্রোগ্রামে ওঁর একটা পরিচিতি দেবার পরিকল্পনাও আমার ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত শুটিং শুরু হবার মাত্র কয়েক দিন আগে কোনো এক আততায়ীর হাতে ওঁর মৃত্যু ঘটে। এই কেসটা সমাধান করতে মিস্টার সেন নিউ ইয়র্ক পুলিশকে সাহায্য করছেন এবং এর মধ্যেই ডক্টর আনন্দ শর্মা নামে একজন বিশিষ্ট চিকিৎসককে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।” কথাগুলো বলে দিলীপ কাপাদিয়া একেনবাবুর দিকে ঘুরে প্রশ্ন করলেন, “এবার বলুন মিস্টার সেন, কেন এই কেসটা আপনার কাছে এত ইন্টারেস্টিং লাগছে?”

 

এতক্ষণে একেনবাবু মনে হল একটু স্বাভাবিক হয়েছেন। ওঁর নর্মাল স্টাইলে ঘাড় ঘষতে ঘষতে বললেন, “কারণ খুব সিম্পল স্যার, আই থিংক উই কট দ্য রং পার্সন।”

 

“রং পার্সন?” দিলীপ কাপাদিয়া হতভম্ব হয়ে প্রশ্নটা করলেন।

 

“হ্যাঁ স্যার, রং পার্সন। আমার বিশ্বাস ডক্টর শর্মা আসল খুনি নন। “দ্যাটস ইন্টারেস্টিং! কুড ইউ এক্সপ্লেইন দ্যাট?”

 

“এই ক্যামেরার সামনে স্যার! আর এটা তো আমার অনুমান, পুলিশের নয়!”

 

বুঝলাম এটা নিয়ে কিছু বলা একেনবাবুর একেবারেই মনঃপূত নয়। কিন্তু দিলীপ কাপাদিয়া পাত্তা দিলেন না। বললেন, “হোয়াই নট? এটা আপনার ইন্টারভিউ, আপনার কথা শোনার জন্যেই তো এখানে আসা!”

 

একেনবাবু কয়েক মুহূর্ত কী জানি ভাবলেন। তারপর বললেন, “ঠিক আছে স্যার, বলছি। কিন্তু তার আগে স্যার আপনাকে একটা প্রশ্ন করি, মানুষ মানুষকে খুন করে কেন?”

 

“আর ইউ আস্কিং মি?” দিলীপ কাপাদিয়া কপট বিস্ময়ে প্রশ্নটা করলেন।

 

একেনবাবু অনেক সময়েই ঠাট্টা ধরতে পারেন না। সিরিয়াস মুখে উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ স্যার।”

 

“ওয়েল, আমি আপনার মতো ক্রাইম এক্সপার্ট নই। বাট আই ক্যান থিংক অফ এ নাম্বার অফ রিজনস… ওটা ক্রাইম অফ প্যাশন হতে পারে অথবা টাকা, সম্পত্তি, পলিটিক্যাল মোটিভ, রিভেঞ্জ — অনেক কিছুই পেছনে থাকা সম্ভব।”

 

“দ্যাটস, এনাফ স্যার।” একেনবাবু মিস্টার কাপাদিয়াকে থামিয়ে বললেন, “এবার খেয়াল করুন স্যার, এই প্রত্যেকটা কারণের পেছনে একটা কমন পয়েন্ট আছে।”

 

“আই ডোন্ট আন্ডারস্ট্যান্ড।

 

“লেট মি এক্সপ্লেইন স্যার। কমন পয়েন্ট হল প্রত্যেকটিই ভিক্টিম সংক্রান্ত। অর্থাৎ, লোকটাকে হত্যা করা হয়েছে কারণ লোকটার সম্পত্তি কারও হাতে আসবে, পলিটিক্যালি কেউ লাভবান হবে, লোকটা কোনো ক্ষতি করেছিল— তার প্রতিশোধ নিতে। বুঝতে পারছেন স্যার, কী বলতে চাচ্ছি?”

 

“আই থিংক সো। কিন্তু বুঝতে পারছি না, আপনার পয়েন্টটা কী!”

 

“পয়েন্টে আসছি স্যার। কিন্তু তার আগে কাইন্ডলি আরেকটা প্রশ্নের উত্তর দিন। ডক্টর শর্মার খুন করার মোটিভটা কী?”

 

“আই ক্যান ওনলি স্পেকুলেট মিস্টার সেন।” দিলীপ কাপাদিয়া গম্ভীরভাবে বললেন। “বাজারে গুজব আছে মিস্টার শাহ বহু লোককে ঠকিয়ে ওঁর বিজনেসটা এত বড়ো করেছেন। ইট ইজ পসিবল ডক্টর শর্মাও ওঁর ভিক্টিম হয়েছিলেন। এটা সেই ক্ষতির প্রতিশোধ নেওয়া। “

 

“ঠিক স্যার, অবশ্যই সেটা হতে পারে। তবে আরেকটা সম্ভাবনাও উপেক্ষা করতে পারি না!”

 

“আরেকটা সম্ভাবনা?” দিলীপ কাপাদিয়া অবাক হয়ে একেনবাবুর দিকে তাকালেন।

 

“হ্যাঁ স্যার। ধরুন, মিস্টার শাহকে যিনি মার্ডার করেছেন তাঁর সঙ্গে মিস্টার শাহের কোনো সম্পর্কই নেই। সেক্ষেত্রে মিস্টার শাহের সঙ্গে কার সম্পর্ক খারাপ বিচার করে খুনী ধরতে গেলে বিরাট ভুল হয়ে যাবে।”

 

“বুঝলাম না কী বলতে চাচ্ছেন!” মুখ দেখে বুঝলাম এরকম একটা অর্থহীন কথা যে একেনবাবু বলতে পারেন, উনি কল্পনাও করেননি!

 

শুধু দিলীপ কাপাদিয়া নয়, আমিও একেনবাবুর বক্তব্যের মাথামুণ্ডু খুঁজে পেলাম না।

 

“সেই জন্যেই কেসটা এত ইন্টারেস্টিং স্যার। আমার ধারণা ডক্টর শৰ্মা, অর্থাৎ যাঁকে খুনী বলে সাজানো হয়েছে, তাঁর মৃত্যুদণ্ড বা জেল হলে যাঁর লাভ, তিনিই হচ্ছেন আসল হত্যাকারী। বল্লভ শাহের খুন হবার একমাত্র কারণ হল সেটাই।”

 

“দাঁড়ান, মিস্টার সেন। আপনি কি প্রমাণ করতে পারবেন ডক্টর শর্মার বল্লভ শাহকে মারার কোনো মোটিভ বা কোনো সুযোগ ছিল না? নাকি ওঁর কোনো অ্যালিবাই ছিল?”

 

“না স্যার। কোনোটাই প্রমাণ করতে পারব না।”

 

“তাহলে?”

 

“মোটিভ-এর ব্যাপারে আপনি একদম রাইট স্যার। কিন্তু অপরচুনিটির ব্যাপারটায় আমি শিওর নই। আমি যদ্দূর জানি, এমন কেউ নেই যে ডক্টর শর্মাকে বুধবার দুপুরে বল্লভ শাহের বাড়িতে ঢুকতে দেখেছে!”

 

“ঢুকতে না দেখলেও ডক্টর শর্মার গাড়ি বল্লভ শাহের বাড়ির পাশের রাস্তায় দাঁড় করানো ছিল, তাই না?” দিলীপ কাপাদিয়া বললেন, “আর কী প্রমাণের দরকার?”

 

“সেটাই প্রশ্ন স্যার। আর ব্যাপারটা সত্যিই পাজলিং টু মি! ভেবে দেখুন, নিউ ইয়র্কের মতো শহরে দিনে-দুপুরে ‘নো পার্কিং’ এরিয়াতে গাড়ি দাঁড় করিয়ে কাউকে খুন করতে যাওয়া… পুলিশ তো নির্ঘাত সেটা জানবে!

 

“সেটা অস্বীকার করব না, একটু পাজলিং নিশ্চয়,” দিলীপ কাপাদিয়া স্বীকার করলেন। “তবু আমি বলব ট্যাক্সি চেপে খুন করতে যাওয়ার থেকে ওটা অনেক নিরাপদ। সেক্ষেত্রে ট্যাক্সি ড্রাইভার এক জন প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে থেকে যেত!”

 

“এটা স্যার ভুল বলেননি। কিন্তু ডক্টর শর্মা ট্যাক্সিকে বল্লভ শাহের বাড়ির সামনে দাঁড় না করিয়ে এক ব্লক দূরে দাঁড় করাতে পারতেন; আর ট্যাক্সিরই-বা কী দরকার ছিল, উনি হাঁটতে পারতেন! মাত্র তো ছ’ব্লক-এর পথ! শীতের মধ্যে হাঁটতে ইচ্ছে না করলে, স্বচ্ছন্দে সাবওয়ে নিতে পারতেন! সেটাই তো পারফেক্ট হত!

 

“বোঝাই যাচ্ছে মিস্টার সেন, উনি আপনার মতো স্মার্ট নন!” আলোচনাটা একটু লঘু করার জন্যেই বোধহয় দিলীপ কাপাদিয়া একটু হেসে বললেন। “তাই যদি হতেন, তাহলে যে দড়ি গলায় পেঁচিয়ে খুন করেছেন, সেই দড়ির বান্ডিলটাই গাড়ির ট্রাঙ্কে ফেলে রাখতেন না, কিংবা বল্লভ শাহর সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে খুন করতে যেতেন না। এগুলো অবশ্য গত রাত্রে লোকাল নিউজ চ্যানেলের খবর। সত্যি-মিথ্যা আপনারা ভালো জানবেন।”

 

“না স্যার, আপনি ঠিকই বলেছেন। আর সেটাই স্যার ট্রলি টুলি পাজলিং। একটা বুদ্ধিমান লোক একসঙ্গে এতগুলো বোকামি করবেন কেন!”

 

“অ্যাপারেন্টলি হি ডিড।” দিলীপ কাপাদিয়া বললেন।

 

“সেটাই পুলিশের ধারণা স্যার। কিন্তু আমার ধারণা তারা ভুল পথে এগোচ্ছে।”

 

“কেন?”

 

“তার দুটো কারণ তো আপনিই এক্ষুনি বললেন স্যার। যে দড়ি খুন করতে ব্যবহার করেছেন, তার বান্ডিল নিজের গাড়ির ট্রাঙ্কে রেখে দিলেন কেন?”

 

“অন্য কোথাও ফেলার সুযোগ হয়তো পাননি।”

 

“খুনের পরে তো বহু ঘণ্টা কেটে গেছে। এতটা সময়ের মধ্যেও?”

 

“হয়তো খেয়ালও করেননি যে বান্ডিলটা পড়ে আছে।”

 

“আসল খুনি কিন্তু খুবই সতর্ক লোক।”

 

“কী সেটা করে বুঝলেন?”

 

“ওই যে, অফিসে কোনো ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেই, অর্থাৎ সব সময়ে তিনি গ্লাভস পরেছিলেন। যিনি এরকম হিসেব করে চলেন তিনি এতগুলো মারাত্মক ভুল করবেন কেন—নো-পার্কিং এরিয়াতে গাড়ি পার্ক করা, অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে খুন করতে যাওয়া, দড়ির বান্ডিল গাড়িতেই ফেলে রাখা…”

 

একেনবাবুকে থামিয়ে দিয়ে দিলীপ কাপাদিয়া বললেন, “সেটাই তো আপনাকে বললাম, বুদ্ধিমান হওয়া সত্ত্বেও ভুলগুলো করেছিলেন।”

 

“এর থেকে অনেক সহজ এক্সপ্ল্যানেশন কিন্তু আছে স্যার। ডক্টর শর্মা বলেছেন ওঁর এক সেট চাবি খোয়া গেছে। সেটা যদি হত্যাকারীর হাতে যায়, তাহলে তার পক্ষে দড়ির বান্ডিলটা একসময় ট্রাঙ্কে ঢুকিয়ে দেওয়া মোটেই কঠিন ব্যাপার নয়। এমনকী হত্যাকারীর পক্ষে গাড়িটা চুরি করে ‘নো পার্কিং’ এরিয়াতে পার্ক করে হত্যাকাণ্ডটি সেরে আবার স্বস্থানে গাড়ি রেখে আসাটাও অসম্ভব নয়। ঠিক কিনা স্যার?”

 

“দ্যাটস ননসেন্স!” দিলীপ কাপাদিয়া বিরক্ত হয়ে বললেন। “আপনি যা বলছেন তা হল ডক্টর শর্মার কথা। কিন্তু আমি যদ্দূর শুনেছি পুলিশ অনেক পরীক্ষা করেও ডক্টর শর্মার গাড়ি আর কেউ চালিয়েছিল বলে প্রমাণ পায়নি। আমি ফরেনসিক এক্সপার্ট নই বটে, কিন্তু এটা জানি যে কেউ সিটে বসলে তার জামাকাপড়ের সূক্ষ্ম ফাইবার প্রায় সব সময়েই সিটে লেগে থাকে। অবশ্য আপনি বলতে পারেন খুনি লন্ড্রি থেকে ডক্টর শর্মার জামাকাপড় চুরি করে গাড়িতে বসেছিল।” চেষ্টা সত্ত্বেও দিলীপ কাপাদিয়া তাঁর গলার স্বর থেকে শ্লেষের ভাবটা এড়াতে পারলেন না।

 

“না, আমি সেটা বলব না। কিন্তু আরেকটা সম্ভাবনার কথা ভাবুন স্যার। ডক্টর শর্মার মতো কালো মার্সিডিজ আরও অনেকের আছে—একই ইয়ারের, একই স্টাইলের। তাঁদের কেউ যদি ডক্টর শর্মার গাড়ির যে নম্বর প্লেট তার একটা নকল নিজের গাড়িতে লাগিয়ে নেন?”

 

দিলীপ কাপাদিয়া এবার একটু কপট গাম্ভীর্য নিয়ে বললেন, “মিস্টার সেন, আপনার এই সম্ভাবনার মধ্যে কিন্তু আমিও পড়ি। তবে আমার বোধহয় দুশ্চিন্তা করাটা উচিত হবে না, কারণ আমি মঙ্গলবার রাত্রে ওয়াশিংটন ডিসি-তে যাই, ফিরি বৃহস্পতিবার সকালে। অর্থাৎ মার্ডারের সময়ে আমি ছিলাম ওয়াশিংটন ডিসি-তে।”

 

“ইয়েস স্যার, সেটাই আপনি পুলিশকে বলেছেন।”

 

“শুধু বলেছি তা নয়, পুলিশকে সেখানে যাবার প্লেনের টিকিট, ওয়াশিংটনে হায়াত রিজেন্সি হোটেলের পেমেন্টের রেকর্ড, তা ছাড়া ওখানের গাড়ি ভাড়ার রসিদ, সব কিছুই দেখিয়েছি। আর হ্যাঁ, ভাড়া গাড়িটা আমি মাত্র চল্লিশ মাইল চালিয়েছিলাম, সুতরাং সেটা নিয়ে আমার পক্ষে নিউ ইয়র্কে আসা যে সম্ভব নয়, সেটা নিশ্চয় বুঝতে পারছেন।”

 

“ইউ আর রাইট স্যার, অ্যাবসোলিউটলি রাইট। আমার এরকমভাবে সম্ভাবনাগুলো আলোচনা করা উচিত হয়নি। তাই তো বলছিলাম ক্যামেরার সামনে এসব আলোচনা করা একদম ভুল।”

 

“দ্যাটস ওকে, আপনি আপনার সন্দেহের কথা বলছেন, নাথিং রং দেয়ার।” দিলীপ কাপাদিয়া অনেকটা মিটমাটের সুরেই বললেন। “এবার আসুন আবার আমাদের ইন্টারভিউয়ে ফিরে যাওয়া যাক। আপনার মতে…।”

 

একেনবাবু দিলীপ কাপাদিয়াকে থামিয়ে বললেন, “স্যার, এতটা যখন ধৈর্য ধরে শুনলেন, তাহলে আরেকটা সম্ভাবনার কথাও আপনাকে বলে ফেলি, কেমন?”

 

দিলীপ কাপাদিয়া একটু থতমত খেয়ে বললেন, “বলুন।”

 

“আমি স্যার প্রমথবাবুর কাছে শুনলাম আপনি নাকি সোমবারও ওয়াশিংটন ডিসি-তে ছিলেন। সেখান থেকে একটা ফ্লাইট নিয়ে রাত্রে নিউ ইয়র্কে ফিরে এসেছিলেন। আবার সন্ধেয় ডিসি-তে ফিরে যান।”

 

“হ্যাঁ, তা এসেছিলাম। তার কারণ শুটিং-এর কিছু জিনিসপত্র ফেলে গিয়েছিলাম।”

 

“না, না, সেটা আমার সমস্যা নয়, স্যার। আপনি নিশ্চয় কোনো দরকারের জন্যেই ফিরে এসেছিলেন। আমার সমশ্যাটা অন্য। আমি বার করার চেষ্টা করছিলাম ঠিক কোন ফ্লাইট নিয়ে আপনি ওয়াশিংটন ডিসি-তে গিয়েছিলেন! অনেক খোঁজ করেও সেটা আমি বার করতে পারিনি।”

 

“দেয়ার ইজ এ গুড রিজন ফর দ্যাট,” দিলীপ কাপাদিয়া বললেন, “শুটিং-এর জন্য কিছু ভারী জিনিসপত্র নিতে হবে বলে আমি রোববার আমার ক্যামেরাম্যানের গাড়িতে রাইড নিয়ে ডিসি-তে গিয়েছিলাম। ইউ কুড হ্যাভ আস্কড মি দ্যাট কোয়েশ্চেন, সহজেই আপনার সমস্যার সমাধান হয়ে যেত!”

 

“ঠিক, সেটাই আমি ভেবেছিলাম স্যার, গাড়িতে গিয়েছিলেন। প্রথমে ভেবেছিলাম আপনি নিজের গাড়িতে গিয়েছিলেন। পরে মনে হল অবশ্যই না, তাহলে ওখানে আবার গাড়ি ভাড়া করলেন কেন….

 

দিলীপ কাপাদিয়া হতাশভাবে একেনবাবুর দিকে তাকিয়ে আছেন- বুঝতে পারছেন না কী বলতে চাচ্ছেন একেনবাবু।

 

“আসলে ভাবছিলাম স্যার, এই ক’দিনের মধ্যেই আপনাকে কত বার ডিসি- নিউ ইয়র্ক করতে হল— কম খরচার ব্যাপার তো নয়।”

 

“শুনুন একেনবাবু, এইসব খরচা কিছুই নয়,” অনুকম্পা ঝরে পড়ল দিলীপ কাপাদিয়ার গলায়। “শুটিং-এ এক এক দিনে কত খরচ হয় আপনার কোনো ধারণা আছে?”

 

“না স্যার, তবে শুনেছি একশো-দুশো কোটি টাকা লেগে যায় একটা সিনেমা বানাতে।”

 

“তাহলে? আর আপনি মাথা ঘামাচ্ছেন, কত বার আমি ডিসি-নিউ ইয়র্ক করছি তাই নিয়ে?”

 

“এটা ঠিকই বলেছেন স্যার। এইসব ভাবতে ভাবতেই সম্ভাবনাটা আমার মাথায় ঝিলিক দিল!”

 

“কী সম্ভাবনা?” দিলীপ কাপাদিয়ার স্বরে বিরক্তি আর বিস্ময় দুটোই ধরা পড়ল।

 

“যে কথাটা একটু আগে আপনাকে বলছিলাম স্যার, ডক্টর শর্মা জেলে গেলে কার খুব লাভ হয়?

 

“হোয়াট আর ইউ টকিং অ্যাবাউট?”

 

এবার গলার স্বরে কোনো বিস্ময় নেই, দিলীপ কাপাদিয়া বেশ রূঢ়ভাবেই প্রশ্নটা করলেন।

 

“আমি বলতে চাচ্ছি স্যার, উনি জেলে গেলে আপনার নিশ্চয় লাভ হবে।”

 

দিলীপ কাপাদিয়া একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন দেখে একেনবাবু ব্যাখ্যা করে বললেন, “ভেবে দেখুন স্যার, ডক্টর শর্মা তাঁর অন্য সব বিজনেস গুটিয়ে ইন্ডিয়ান ফাস্ট-ফুড বিজনেসে নামছেন, এটা অনেকেই জানেন। এদিকে আপনার ফিল্ম কোম্পানির মোটা অংশ হচ্ছে ওঁর। উনি যদি ওঁর টাকাগুলো সরিয়ে নেন, তাহলে আপনি যে নতুন ফিল্ম-এ হাত দিচ্ছেন, তার কী হবে?”

 

দিলীপ কাপাদিয়া কোনো উত্তর দিলেন না।

 

একেনবাবু বলে চললেন, “আমার বিশ্বাস স্যার, ডক্টর শর্মা আপনাকে বলেছিলেন উনি ওঁর প্রাপ্য অংশ নিয়ে চলে যাবেন। সঙ্গে সঙ্গেই আপনি বুঝতে পেরেছিলেন তাড়াতাড়ি কিছু না করতে পারলে আপনার যুগান্তকারী ছবি তৈরির প্ল্যান বানচাল হয়ে যাবে! আপনি নিশ্চয় স্যার নানান জায়গা থেকেই ইনভেস্টর খুঁজছিলেন, কিন্তু জোগাড় করে উঠতে পারছিলেন না। ডক্টর শর্মা এই প্রজেক্ট থেকে এখন চলে গেলে নতুন কাউকে পাওয়া অসম্ভব হবে। আপনি নিশ্চয় ডক্টর শর্মাকে বোঝাবার চেষ্টা করেছিলেন, এরকম একটা দুর্দান্ত প্রজেক্ট থেকে চলে না যেতে। কিন্তু ভালো ছবির মর্ম তিনি কী বুঝবেন! ওঁর কাছে আর্ট আর ফুড একই ব্যাপার! …এক্সকিউজ মি স্যার,” বলে একেনবাবু কফি টেবিলে রাখা জলের বোতলের ছিপি খুলতে খুলতে বললেন, “লাইটগুলো স্যার সূর্যের আলোকে হার মানায় … গলাটা একেবারে শুকিয়ে গেছে, একটু ভিজিয়ে নিই।”

 

দিলীপ কাপাদিয়ার মুখ রাগে থমথম করছে! কিন্তু একেনবাবু একেবারেই ভাবলেশহীন। ঢক ঢক করে আধ বোতল জল খেয়ে বললেন, “ও হ্যাঁ স্যার, যেটা বলছিলাম… আপনাকে এখন এমন একটা কিছু করতে হবে যাতে ডক্টর শর্মা আপনার ফিল্ম কোম্পানি থেকে ওঁর টাকাগুলো সরাতে না পারেন। তার একটা সহজ উপায় ডক্টর শর্মাকে খুন করা। কিন্তু সেটা খুবই রিস্কি, পুলিশের মনে সন্দেহ জাগতে পারে! তখন আপনার মাথায় এই দারুণ আইডিয়াটা এল— আপনি এমন একজন লোককে খুন করবেন যার সঙ্গে আপনার কোনো সম্পর্ক নেই, কিন্তু ডক্টর শর্মার গণ্ডগোল চলছে! এটা কিন্তু ব্রিলিয়ান্ট স্যার, কারণ সবাই ডক্টর শর্মাকেই এ ব্যাপারে সন্দেহ করবে, তালেগোলে আপনি আপনার সৃষ্টি সম্পূর্ণ করতে পারবেন!”

 

“আপনি উন্মাদ! আউটরাইট ক্রেজি!” দিলীপ কাপাদিয়া আর স্থির থাকতে পারলেন না, চেঁচিয়ে উঠলেন।

 

আমি টেরিয়ে টেরিয়ে সবার রিয়্যাকশন দেখার চেষ্টা করছি। ক্যামেরাম্যান- এর চোখ আর ক্যামেরায় নেই, প্রমথ নার্ভাস হয়ে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে, শুধু একেনবাবুই নির্বিকার। বোতলের বাকি জলটুকু শেষ করে বললেন, “না স্যার, উন্মাদ আমি নই। এবার আপনাকে বলি, আপনি কী করলেন। আপনি মোটামুটি জানতেন ডক্টর শর্মা বল্লভ শাহকে ঘৃণা করেন। যদিও কারণটা আপনি পরিষ্কার জানতেন না। হয়তো বল্লভ শাহ একসময়ে ডক্টর শর্মাকে ঠকিয়েছিলেন। সম্ভবত বিজনেসের জন্য টাকা ধার নিয়ে ফেরত দেননি, মিস্টার শাহ অনেকের ক্ষেত্রে তাই করেছেন। তাই যদি না হবে তাহলে বল্লভ শাহের পরম শত্রু অরুণ শেঠের সঙ্গে ওঁর এত বন্ধুত্ব হবে কেন? শুধু তাই নয়, ডক্টর শর্মা হঠাৎ করে ফুড বিজনেসে নামছেন কেন— সেটা কি শুধু টাকার জন্যে না বল্লভ শাহকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে ওঁর ক্ষতি করতে? যাই হোক, আপনার মনে হল বল্লভ শাহকে খুন করার একটা মোটিভ ডক্টর শর্মার আছে। অর্থাৎ, ডক্টর শর্মাকে ফাঁসাতে হলে মিস্টার শাহ-ই হলেন খুন হবার উপযুক্ত ক্যান্ডিডেট। এরপর আপনি স্যার খুনের প্ল্যানটা পাকা করতে শুরু করলেন। একটা দুশ্চিন্তা আপনার ছিল, নিউ ইয়র্ক পুলিশ আপনার সাজানো ক্লু-গুলো ঠিকঠাক ধরতে পারবে কিনা। ইউ ওয়ান্টেড টু গিভ দ্য পুলিশ অল দ্য হেল্প ইউ কুড যাতে ডক্টর শর্মা তাড়াতাড়ি ধরা পড়ে যান! কেউ নিশ্চয় আমার কথা আপনাকে বলেছিল। সেই জন্যেই স্যার আই অলসো বিকেম এ পার্ট অফ ইওর ডকুমেন্টারি। আপনি আমার মধ্যেও বল্লভ শাহ সম্পর্কে একটা কিউরিওসিটি জাগিয়ে দিলেন, যাতে তাঁর মৃত্যুতে আমিও নিজের থেকে একটা অনুসন্ধান চালাতে শুরু করি! এরপর নিজের একটা অ্যালিবাই তৈরি করার কাজে লাগলেন, যাতে প্রমাণ থাকে খুনের সময় আপনি বাইরে ছিলেন…।”

 

দিলীপ কাপাদিয়ার চোয়াল দেখলাম শক্ত হয়ে গেছে আর ঠোঁটটা থরথর করে কাঁপছে। বুঝতে পারছিলাম উনি একেবারে ফিউরিয়াস! নিতান্ত ভদ্রলোক বলে আত্মসংবরণ করে আছেন। একেনবাবুর দীর্ঘ বক্তৃতা শেষ হবার আগেই উনি কড়া গলায় বললেন, “মিস্টার সেন, আই ওয়ান্ট ইউ টু আন্ডারস্ট্যান্ড, যেসব মারাত্মক অভিযোগ আমার বিরুদ্ধে আপনি আনছেন, তার কণা মাত্র ভিত্তি নেই। আই ওয়ান্ট ইউ টু উইথড্র দেম রাইট নাউ।”

 

“সরি স্যার, সেটা তো পারব না,” একেনবাবু ঘাড় চুলকোতে চুলকোতে বললেন, “যদি না আপনি বুঝিয়ে বলেন, কেন আপনি প্রথম বার গাড়ি চড়ে গেলেন, কিন্তু প্লেনে রিটার্ন টিকিট কেটে মিস্টার শাহর খুন হবার দু-দিন আগে এসে সেদিনই কয়েক ঘণ্টা বাদে ফিরে গেলেন। ওখানে গিয়েই আবার হোটেলে চেক ইন করে গাড়ি ভাড়া করলেন। হোয়াই স্যার? …”

 

দিলীপ কাপাদিয়ার এতক্ষণে খেয়াল হল, ক্যামেরা অন’ আছে। “কাট” বলে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে একেনবাবুকে বললেন, “মিস্টার সেন, আমি এতক্ষণ ভাবছিলাম আপনার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা আনব কিনা…” দিলীপ কাপাদিয়ার গলার স্বরে এবার পরিষ্কার তাচ্ছিল্য, “কিন্তু তারপর ভাবলাম তাতে জিতে আমার কী লাভ! আপনার ব্যাঙ্ক ব্যালেন্সের অবস্থা যদি আপনার জামাকাপড়ের মতো হয় তাহলে ক্ষতিপূরণ হিসেবে আমার কানাকড়িও জুটবে না। ইট উইল বি এ ওয়েস্ট অফ টাইম। বাট লেট মি টেল ইউ, চাইলে আপনাকে একটা কেন দশটা কারণ দেখাতে পারি, কেন আমি রিটার্ন টিকিট কেটে এসেছিলাম, কিন্তু আপনার এই অবাস্তব অভিযোগের কোনো উত্তর আমি দেব না। বিকজ ইট ইজ টোটালি ইনসেইন।”

 

একেনবাবু দমলেন না। “আপনি নিশ্চয় স্যার অনেক কারণ দেখাতে পারেন। তবে দুটো কারণ আমি অনুমান করতে পারি, যদিও সে-দুটো আপনি বলবেন না। আপনি একটা দড়ি থেকে এক টুকরো কেটে রেখে বাকি বান্ডিলটা সঙ্গে এনেছিলেন। সেইসঙ্গে এনেছিলেন একটা গাড়ির নিউ ইয়র্ক স্টেটের নম্বর প্লেট। ডিসি-তে সেটা বানিয়েছিলেন আপনার চেনাজানা সিনেমার কোনো প্রপ-মেকারকে দিয়ে। কেন এনেছিলেন, সেটা স্যার বলি?”

 

“কেন নয়। এতটাই যখন বানাতে পারলেন, ওটাও বলুন।” গলায় শ্লেষ ঝরে পড়ল দিলীপ কাপাদিয়ার।

 

“প্লেন থেকে নেমেই, আপনি সোজা আপনার বাড়িতে গিয়ে আপনার নিজের গাড়ির নম্বর প্লেট সরিয়ে ডিসি থেকে নিয়ে আসা নম্বর প্লেটটা লাগালেন— ওটা ছিল ডক্টর শর্মার গাড়ির নম্বর। এবার দড়ির বান্ডিলটা নিয়ে ডক্টর শর্মার গাড়ির ট্রাঙ্কে সেটা রাখলেন। আপনি জানতেন ডক্টর শর্মার গাড়ি কোথায় থাকে, আর তার এক সেট চাবি আগেই আপনি চুরি করেছিলেন। কাজটা সেরে চাবিটা গ্লাভ কম্পার্টমেন্টে ফেলে দিয়ে আপনি ডিসি-তে ফিরে গেলেন।”

 

দিলীপ কাপাদিয়া হাততালি দিয়ে বললেন, “চমৎকার গল্প। কিন্তু তাও তো ফাঁক রয়ে গেল। যেদিন খুনটা হল সেদিন তো আমি ডিসি-তে! ফিরেছি তার পরের দিন।”

 

“সেটাই আমি ভাবছিলাম। তখন হঠাৎ মনে হল স্যার, সেক্ষেত্রে আপনার অফিস থেকে খুনের দিন কে ফোন করেছিলেন ডক্টর শর্মার অফিসে। ফোন যে করা হয়েছিল আমি জানি স্যার। আপনার অফিসে লাস্ট কল ডায়ালড ভুল করে টিপে আপনার মার্লিন ফোনের ডিসপ্লে-তে যে নম্বরটা পেয়েছিলাম, সেটা ছিল ২৬২- ৭৪২৪। কী করব স্যার, ফোটোগ্রাফিক মেমারি আমার- নম্বরগুলো সব সময়ে চোখের সামনে ভাসে। পুলিশ চেক করে জানিয়েছে নম্বরটা ডক্টর শর্মার ফোনের। যিনি ফোন করেছিলেন, ডক্টর শর্মার সেক্রেটারিকে তিনি বল্লভ শাহ বলে পরিচয় দিয়েছিলেন। এইখানে স্যার অঙ্ক মিলছে না। ফোন করা হয়েছে আপনার অফিস থেকে, আমি নিজের চোখে তার প্রমাণ পেয়েছি। ফোনটা গেছে ডক্টর শর্মার অফিসে। কখন সেই সময়টাও পুলিশ চেক করে জেনেছে। অথচ আপনি তখন ডিসি-তে। কী অদ্ভুত ব্যাপার না স্যার!”

 

দিলীপ কাপাদিয়ার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে, “কিন্তু আমি তো তখনও ডিসি- তে, পরের দিন আমি চেক আউট করি হোটেল থেকে, গাড়ি রিটার্ন করি। তারপর নিউ ইয়র্কে ফিরে আসি ক্যমেরাম্যানের গাড়িতে।” কোনোমতে কথাগুলো বলে যোগ করলেন, “পুলিশ প্লেনের রেকর্ড চেক করে দেখতে পারে।”

 

“কিন্তু অন্যভাবেও তো যাতায়াত করা যায় স্যার, খুব দ্রুত গতিতেই। সেটাই আপনি করেছিলেন ট্রেন ধরে। খুনের দিন সকালে ট্রেনে করে বাড়ি এসে নিজের গাড়ি পার্ক করলেন বল্লভ শাহর অফিসের সামনে নো-পার্কিং জোন-এ। গাড়ি থেকে নেমে ওঁর অফিসে গিয়ে অতর্কিতে বল্লভ শাহকে আক্রমণ করে গলায় দড়ি পেঁচিয়ে ভদ্রলোককে খতম করতে বেশি সময় আপনার লাগেনি। বেরিয়ে এসে ইতিমধ্যে দেখলেন গাড়িতে পুলিশের টিকিটও পেয়েছেন। ব্যস, মিশন অ্যাকমপ্লিশড। গাড়ি নিয়ে বাড়িতে গিয়ে গাড়ি থেকে ডক্টর শর্মার ভুয়ো নম্বর প্লেটটা সরিয়ে নিজের আসল নম্বর প্লেট লাগালেন। তারপর সেই ভুয়ো নম্বর প্লেটটা নিয়ে আবার ট্রেন-এ করে ফিরে গেলেন ডিসি-তে। এটাও তো আপনি করে থাকতে পারেন স্যার, তাই না? যা বললাম, সেগুলো কিন্তু পুলিশ নানানভাবেই চেক করতে পারবে। … আজ আমার ইন্টারভিউ আর হবে না স্যার। আপনি শুটিং-এর সব যন্ত্রপাতি প্যাক করতে বলুন। ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্ট আসছেন আপনাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে নিয়ে যাবার জন্য।”

 

 

 

পরিশিষ্ট

 

“দিলীপ কাপাদিয়া স্ট্র্যাটেজিতে ভুল করেছেন আপনাকে ইনভল্ভ করে, কিন্তু আপনিও মশাই স্ট্র্যাটেজিতে একটা ব্লান্ডার করেছেন।” প্রমথ খুব সিরিয়াস মুখ করে বলল।

 

“কোথায় স্যার?”

 

“আপনার ডকুমেন্টারি শেষ হবার পর মিস্টার কাপাদিয়াকে ধরিয়ে দেওয়া উচিত ছিল। তাহলে দূরদর্শনে আপনার ইন্টারভিউটা সবাই দেখতে পেত!”

 

“কথাটা ভুল বলেননি স্যার, আমি আবার বড়াই করে আমার ফ্যামিলিকে টিভির কথাটা লিখে ফেলেছি।”

 

“অর্থাৎ আপনার কপালে অনেক দুঃখ আছে!

 

“তা একটু আছে স্যার। নাঃ, এই অ্যাঙ্গেল থেকে সত্যিই একদম চিন্তা করিনি।”

 

“সেটাই তো আপনার সমস্যা, অলওয়েজ সিংকিং সিংকিং ড্রিঙ্কিং ওয়াটার। আপনার প্ল্যানটা আগেভাগে আমাকে জানালে উপদেশটা সময়মতো পেতেন!”

 

আমি প্রমথকে বললাম, “চুপ কর, ওঁকে আর জ্বালাস না।” তারপর একেনবাবুকে বললাম, “জানেন, আমি কিন্তু প্রমথকে অনেক আগেই বলেছিলাম দিলীপ কাপাদিয়াই খুনি।”

 

একেনবাবু বললেন, “তাই নাকি স্যার, কী করে?”

 

প্রমথ বলে উঠল, “আপনিও যেমন! বলেছিল না মুণ্ডু!”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


সূচিপত্র