ম্যানহাটানের ম্যাডম্যান (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত
(৯)
বাড়ি পৌঁছে দেখি একেনবাবু ধ্যানস্থ হয়ে বসে আছেন।
“কী ব্যাপার?”
“বুঝলেন স্যার, নীলাটা না কিনলে চলছে না।”
“কিনুন না, আপত্তি করছে কে, সেদিন তো অন-লাইনে দেখলেন আপনার বাজেটের মধ্যেই পাচ্ছেন।”
“তা পাচ্ছি স্যার, কিন্তু ওগুলো জেনুইন নয়।”
“কম্পোজিশন তো এক, প্রমথর লেকচার শুনলেন না সেদিন?”
প্রমথ যে রান্নাঘরে আমি বুঝিনি। একটা হুঙ্কার দিল সেখান থেকে, “আমার নামে একটা বাজে কথা বলেছিস তো, তোর মাথা ভাঙব।”
“বাজে কথা বলব কেন, তোকে সাপোর্ট করেই তো বলছি।”
“টোনটা সাপোর্টের নয়।”
“বেশ, সাপোর্টিং টোনেই বলছি।” বলে একেনবাবুকে বললাম, “দুশ্চিন্তা না করে, প্রমথের উপদেশ মতো আর্টিফিশিয়াল নীলা কিনে ফেলুন। কিছু উপকার তো হবে, আর যদি কোনও কারণে স্যুট না করে, বড়সড় ক্ষতি অন্তত হবে না।”
“বুঝলাম না স্যার।”
“কেন, সেদিন শুনলেন না, জেনুইন নীলা ধারণ করায় জন হেক্টারের ট্র্যাজেডি? আজ আরও ভালো করে জানলাম।”
প্রমথ দুকাপ কফি হাতে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে জিজ্ঞেস করল, “কী জানলি?”
আমি চুগানীদের সঙ্গে যা কথাবার্তা হয়েছে বললাম।
সাধারণত একেনবাবু আর প্রমথকে একসঙ্গে কিছু বলা সহজ ব্যাপার নয়। প্রমথ শুনতে চায় সামারি বা চুম্বক, আর একেনবাবু চান পুংখানুপুঙ্খ ডিটেলে। পদে পদেই থামিয়ে প্রশ্ন করে চলেন… ‘এ কথাটা যখন বললেন স্যার, তখন কি ওঁর মুখটা খুব গম্ভীর ছিল?’, ‘উনি কি খুব রিল্যাক্সড ছিলেন না উত্তেজিত ছিলেন?’, ‘বডি ল্যাঙ্গোয়জ কিরকম ছিল স্যার?’… এরকম হাজারো প্রশ্ন। ফলে ওঁকে কিছু বলতে যাওয়া একটা বিড়ম্বনা। আজ দেখলাম একেনবাবু অন্যমনস্ক। বিশেষ কোনও প্রশ্ন করলেন না, যা বললাম চুপচাপ শুনে গেলেন। বলা শেষ হলে প্রমথই জানতে চাইল, “জন হেক্টার খুন হলেন কেন সে সম্পর্কে কিছু জানা গেছে?”
“তার উত্তরটা শোনা হয়নি। আমার মনে হয় হেমন্তের আঙ্কল জানেন না, কারণ যেদিন খুন হবার খবর পান সেদিনই তিনি দেশ ছেড়েছেন।”
“আই, সি,” প্রমথ টেবিল থেকে ল্যাপটপটা তুলে চালু করল। “কী দেখছিস?”
“কয়েকদিন আগে কিছু ঘটলেও ইন্টারনেটে পাওয়া যাবে।”
প্রমথ যখন হেক্টারের খবর খুঁজছে, তখন হঠাৎ মনে পড়ল.. বললাম, “ও আরেকটা কথা বলতে তো ভুলেই গেছি, একটু মজারই। কফি কর্নারে যাবার সময় অচেনা একটা লোক আচমকা আমায় রাস্তায় দাঁড় করিয়ে বলল, আমার স্ট্যাম্পের এক খদ্দের পেয়েছে। পরে অবশ্য ভুল বুঝতে পেরে অদৃশ্য হল।“
এই প্রথম একেনবাবু মুখ খুললেন, “ভেরি ইন্টারেস্টিং স্যার। রাস্তায় আপনাকে ধরে হঠাৎ এই কথা বলল?”
“ওয়েল, রাস্তাতেই, তবে একটা স্ট্যাম্পের দোকানের সামনে। নিশ্চয় দোকানের কোনও লোক, আমায় দেখতে পেয়ে বেরিয়ে এসেছিল।”
“দোকানটা কোথায় স্যার?”
“সালিভ্যান স্ট্রিটে।”
“ও হ্যাঁ, ফিলাটেলিস্ট কর্নার।”
“আপনি দোকানটা দেখেছেন?”
“পথেই তো পরে স্যার।”
“আমি তো খেয়ালই করিনি আগে!”
প্রমথ আমাদের কথা কানে দিচ্ছিল না। হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল, “ইউরেকা, পেয়েছি!”
“কী পেলি?”
“কী করে নিউজটা মিস করেছিলাম জানি না, নিউ ইয়র্ক টাইমস-এই বেরিয়েছিল। জন হেক্টারকে খুনই করা হয়েছে। পড়ছি, শোন–
ওঁর হোটেলের ঘর থেকে টাকাকড়ি, ক্যামেরা, ঘড়ি, ল্যাপটপ সবকিছু নিয়ে কেউ অদৃশ্য হয়েছে। পুলিশের ধারণা চুরি করাই ছিল উদ্দেশ্য। শুক্রবার রাত্রে উনি কারোর সঙ্গে ডিনার খেতে বেরিয়েছিলেন। অজ্ঞাত কারণে তাড়াতাড়ি ফিরে আসেন। ঘরে ঢুকে আততায়ীদের দেখতে পান, তখনই ওঁকে খুন করা হয়। সম্ভবত সিকিউরিটি গার্ডের কেউ এর সঙ্গে জড়িত, তদন্ত চলছে। ইন্ডিয়া জন হেক্টারের অতি পরিচিত ও প্রিয় জায়গা। সত্তর দশকে গিয়ে উনি প্রায় বারো বছর ওখানে ছিলেন বেশ কিছুদিন দ্য টাইমসের রিপোর্টার হিসেবে। পরেও বহুবার বেড়াতে গেছেন। ..
“হেমন্তের আঙ্কল তাহলে ভুল কিছু বলেননি,” আমি বললাম।
‘মার্ডারের ব্যাপারটা ভুল বলেননি, তবে…”, প্রমথ কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে গেল।
“তবে কী?”
“ভাবছি, এই হেক্টার লোকটা ঠিক কে?”
“তার মানে?”
“একটা লোক মন্দিরের ওপর বই লিখবে বলে ইন্ডিয়াতে গেল, প্রচুর ছবি তুলল, শুধু বইটা লিখল না। অথচ রিপোর্টার হয়ে বারোটা বছর কাটিয়ে দিল! এখনও মাঝে মাঝেই ইন্ডিয়ায় যায়। হোয়াই? এটা কি ইন্ডিয়া-প্রেম, না হি ওয়াজ ইনভভড ইন সামথিং এক্স।”
“কী সামথিং এন্স?”
“নিশ্চয় সিআইএ এজেন্ট, তা ছাড়া কি? রিপোর্টার সেজে থাকত, চমৎকার কাভার। নানান জায়গায় ঘুরে বেড়ানো, যত্রতত্র ছবি তোলা, সবকিছুই রিপোর্টিং-এর মধ্যে পড়ছে। আমি বাজি ধরছি, ওঁর খুনিরা সিম্পলি চুরি করতে ঢোকেনি, ঢুকেছিল হয় ইনফরমেশনের খোঁজে, নয় ওঁকে খতম করতে। সাধারণ চোর নয়, আলকায়েদা অন্য কোনও কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের লোক।”
প্রমথর কল্পনাশক্তি যে আমার থেকে বেশি অস্বীকার করতে পারি না। কিন্তু মাঝে মাঝে সীমা ছাড়িয়ে যায়!
“আপনি কী বলেন একেনবাবু?” জিজ্ঞেস করলাম।
একেনবাবু পা নাচাতে নাচাতে ওঁর ফেভারিট লাইনটা আওড়ালেন, “বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি।”
.
এইসব কথাবার্তার মধ্যে মনে পড়ল কিশোরের কাছে অ্যাপলাইজ করা হয়নি। যখন দেরি হচ্ছিল তখনই ওকে ফোন করা উচিত ছিল। যাইহোক, এখন অন্তত করি। মোবাইলটা পকেট থেকে বার করতে যাচ্ছি, প্রমথ জিজ্ঞেস করল, “কাকে ফোন করছিস?”
“কিশোরকে।”
প্রমথ বেভ আর কিশোরের ব্যাপারটা জানত। কিশোর যে মাঝে মধ্যে এ ব্যাপারে আমার অ্যাডভাইস নেয় সেটাও অজ্ঞাত নয়। আমায় খোঁচা দিল, “আবার অ্যাডভাইস? এক অন্ধ পথ দেখাচ্ছে আরেক অন্ধকে!”
“চুপ কর, রাস্কেল,” বলে আমি কিশোরের নম্বর বার করে কল বাটন টিপলাম। কয়েকটা রিং-এর পরেই কিশোর ফোন ধরল।
আমি ‘সরি’ বলতে না বলতেই বলল, “আরে, আমি তো বুঝতেই পেরেছিলাম কিছুতে আটকা পড়েছ, এত সরি বলার কী আছে!”
কিশোরের গলার স্বর শুনে মনে হল বেশ উজ্জীবিত, বেভের সঙ্গে নিশ্চয় পজিটিভ কিছু ঘটেছে। বলল, “অনেক কথা আছে তোমার সঙ্গে, ফোনে হবে না।”
“তুমি যদি চাও, কালকে কফি খেতে পারি,” ওকে বললাম।
“কালকে হবে না। বেভকে নিয়ে হোবোকেনে ওর আন্টি মিশেলের কাছে যাচ্ছি। রবি, সোম থাকছি না। মঙ্গলবারও নয়, ওই দিনও বোধহয় বেভকে নিয়ে আন্ট মিশেলের কাছে যেতে হবে। হাউ অ্যাবাউট বুধবার– সেইম টাইম, সেইম প্লেস।”
“দ্যাট্স ফাইন।”
.
মিশেল নামটা শুনে আমার খষ্কা লাগল। ফোন নামিয়ে একেনবাবুকে বললাম, “হহাবোকেনের এক মিশেল আমাদের সেক্রেটারি বেভের মাসি।”
“তাতে হলটা কি?” প্রমথ বলল। “হোবোকেনে হয়তো পাঁচশো মিশেল আছে, তাদের মধ্যে শ-দুয়েক হয়তো কারো না কারো মাসি।”
এর উত্তরে কিছু বলার আগেই একেনবাবু প্রসঙ্গটা সম্পূর্ণ পালটে দিয়ে বললেন, “ভালো কথা স্যার, সোমবার কখন আপনি ইউনিভার্সিটি যাবেন?”
“সকাল দশটা নাগাদ। কেন?”
“আমিও আপনার সঙ্গে বেরোবো।”
“বেশ তো, কোথায় যাবেন?”
“একবার ওই স্ট্যাম্পের দোকানটায় যাব ভাবছিলাম।”
আমি আঁচ করতে পারছি, একেনবাবুর মাথায় কী ঘুরছে। কিন্তু এমন সময়ে মিত্রা মাসির একটা ফোন আসায় সেটা নিয়ে প্রশ্ন করা হল না। মিত্রা মাসি মায়ের মাসতুতো বা পিসতুতো বোন, শিকাগোতে ছেলের কাছে বেড়াতে এসেছেন। মাঝে মাঝে আমাকে ফোন করেন। ব্রেভিটি ইজ নট হার স্ট্রং পয়েন্ট। এক থেকে দু’ঘণ্টা আমার সময় নষ্ট করে তারপর ফোন ছাড়েন। কথা শেষ হতে হতে একেনবাবু দেখলাম কোথায় অদৃশ্য হয়েছেন।
