ম্যানহাটানের ম্যাডম্যান (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত
(৬)
রবিবার মে ১৫, ২০১১
হোবোকেনে রওনা হবার একটু আগে ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্টের কাছ থেকে একেনবাবুর ফোন এল। অকারণে ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্ট ফোন করেন না।
“কী বললেন ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্ট?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“অশোকবাবুর পোস্ট মর্টেমের রিপোর্টটার জন্যে ওঁকে রিকোয়েস্ট করেছিলাম। সেটা পেয়েছেন। কিন্তু একটা স্যাড নিউজ দিলেন স্যার, বব ক্যাসেল মারা গেছেন।”
“বব ক্যাসেল! মানে বিপাশা মিত্রের সেক্রেটারি?”
“হ্যাঁ স্যার, সম্ভবত সুইসাইড।”
“কিন্তু বব ক্যাসেলের খবরটা হঠাৎ আপনাকে দিলেন কেন?”
“বিপাশা মিত্রের অফিসে বব ক্যাসেলের সঙ্গে হয়তো আমাদের পরিচয় হয়েছে স্যার, এই ভেবে। বিপাশা মিত্র তো আমাদের ডেকেছিলেন ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্টের রেকমেন্ডশনে।”
নিউজটা এত আকস্মিক, আমাদের কারোর মুখেই কোন কথা নেই। আমি একটু বাদে জিজ্ঞেস করলাম, “সম্ভবত’ সুইসাইড মানে? ওঁর কি ধারণা এটা খুনও হতে পারে?”
“এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে সময় লাগে স্যার।”
“কী করে মারা গেলেন?”
“হাইরাইজ বিল্ডিং থেকে লাফ দিয়ে।”
“মাই গড! কোন জায়গায়?”
“থার্ড অ্যাভেনিউ আর ফিফটি সেকেন্ড স্ট্রিটের কাছাকাছি।”
“আপনার সাহায্য চাইলেন নাকি?”
ম্যানহাটানে আমাদের দেশের কেউ খুন হলে, অনেক সময়ে কনসাল্টেন্ট হিসেবে একেনবাবুর ডাক পড়ে। কালচারাল অ্যাঙ্গেল থেকে কিছু কিছু বিচার বিবেচনা এসে পড়তে পারে সমস্যার সমাধানে। এক্ষেত্রে তার অবশ্য কোনও প্রয়োজন নেই।
প্রমথ শুধু বলল, “আশাকরি খুন নয়, খুন হলে…।” বলে চুপ করল।
“খুন হলে কী?”
“কে জানে, হঠাৎ মনে হল এর সঙ্গে বিপাশার ফটো চুরি জড়িয়ে নেই তো?”
এলোমেলো কিছু কথা হল এই নিয়ে।
“বিপাশা নিশ্চয় খুব আপসেট। কালকে ওকে একটা ফোন করা উচিত আপনার, আমি একেনবাবুকে বললাম। “তাছাড়া অন্য দু’জন সাসপেক্টের ফোন নম্বরও তো আপনাকে ওঁর দেবার কথা।”
“অবশ্যই স্যার, অবশ্যই।”
হোবোকেনে আমরা গাড়ি করেই গেলাম। রবিবার সন্ধ্যে সাতটা, লাকিলি রাস্তায় আজ ভিড়টা একটু কম। আমাদের বাড়ি থেকে হোবোকেনে যাবার সবচয়ে সহজ রাস্তা হাডসন নদীর নীচ দিয়ে হল্যান্ড টানেল ধরা। টানেলের মুখ প্রায় সবসময়েই একটু জ্যাম থাকে, তাই হাতে একটু সময় নিয়েই বেরিয়েছি। কিন্তু আজকে দেখি টানেলের মুখ ফাঁকা, বলতে গেলে সাঁ করে বেরিয়ে গেলাম। আটকা যেটা পড়লাম সেটা টানেল থেকে বেরিয়ে ডান দিকে মেইন বুলেভার্ডে ঢুকে। রাস্তায় কিছু কাজ হচ্ছে বলে একটা লেন বন্ধ। তাও
আটটার অনেক আগেই হোবোকেনে পৌঁছে গেলাম।
ইন্দ্রকে আটটার আগে পাওয়া যাবে না। একেনবাবু বললেন, “চলুন স্যার, অশোকবাবু যেখানে খুন হয়েছেন, সে জায়গাটা একটু দেখা যাক।”
রাস্তার নামটা মনে ছিল। আমার গাড়িতে একটা জিপিএস আছে। সেখানে রাস্তার নাম ঢুকিয়ে দিলে, কম্পিউটার ভয়েস-এ ডিরেকশন পাওয়া যায়। বাঘের বাচ্চা টেকনোলজি, খুঁজে পেতে কোনও অসুবিধা হল না।
বহু বছর ধরে অবহেলিত নির্জন রাস্তা, ওয়ান-ওয়ে। এক দিকে একটা পরিত্যক্ত ফ্যাক্টরি। দুটো উঁচু শেড, সঙ্গে লাগোয়া বিল্ডিং। বিল্ডিং-এর পলস্তারাগুলো জায়গায় জায়গায় খসে পড়েছে। জানলাগুলোর কাঁচ বেশির ভাগই ভাঙ্গা। পুরো চত্বরটা ইটের দেয়াল দিয়ে ঘেরা। সামনে তালা দেওয়া লোহার গেট। এককালে রঙ বোধহয় সবুজ ছিল। মরচে ধরে এখন সবুজত্বের প্রায় কিছুই নেই। রাস্তার উলটো দিকে ভাঙাচোরা কংক্রিটের পার্কিং লট। সেটা কেউ ব্যবহার করে বলে মনে হয় না। ফাটা কংক্রিটের ফাঁক-ফোকর দিয়ে এখানে সেখানে আগাছা গজিয়েছে। চতুর্দিকে প্ল্যাস্টিক, ভাঙ্গা কাঁচ, বিয়ারের বোতল, কাগজ আর হাবিজাবি জিনিস ছড়ানো। পার্কিং লটের পাশে বেশ কয়েকটা দোকান এককালে ছিল। এখন সবগুলোই উঠে গেছে। দোকানগুলোর দরজা-জানলা প্লাইউডের বোর্ড দিয়ে ঢাকা। তার উপর চিত্রবিচিত্র নানা রঙের গ্রাফিতি। বোর্ডগুলোরও জরাজীর্ণ অবস্থা, দুয়েকটা প্রায় খুলেও এসেছে। আটটা এখনো বাজেনি। মে মাসের মাঝামাঝি বলে সূর্য অস্ত যায়নি, চারিদিকে যথেষ্ট আলো। গাড়ি থেকে নেমে কিছুক্ষণ এদিক ওদিক ঘুরলাম। ভাবছিলাম রাস্তার ধারে যদি কোথাও রক্তের দাগ থাকে। আর কিছু না থাক, পুলিশের আঁকা চকের মার্কিং থাকবে। কিছুই না, ক’দিন আগে এখানে একটা খুন হয়ে গেছে, তার কোনও চিহ্নই নেই। একেনবাবু দেখলাম লোহার গেটের ফাঁক দিয়ে ভিতরে উঁকিঝুঁকি মারছেন।
“কী খুঁজছেন?”
“কিছু না স্যার, চলুন যাওয়া যাক প্রায় আটটা বাজতে চলল।”
আমি যাবার জন্যে রেডি। এতক্ষণ এখানে আছি, এর মধ্যে একটা গাড়িও এখান দিয়ে যায়নি! চারিদিকে একটা থমথমে ভাব– কী জায়গারে বাবা!
যখন গাড়িতে উঠছি তখন দেখি পার্কিং লটের পাশে পরিত্যক্ত দোকানগুলোর পেছন থেকে একটা লোক আমাদের দিকে হাত নাড়তে নাড়তে বেরিয়ে আসছে। মুখে দাড়িগোঁফের জঙ্গল, চুলে চিরুনি পড়েনি বহুদিন, গায়ে নোংরা সার্ট, প্যান্টটা জায়গায় জায়গায় ছেঁড়া। লোকটা স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। হাতে খয়েরি কাগজে ঢাকা একটা বোতল। সেখান থেকে
এক ঢোঁক খেয়েও নিল। নিশ্চয় ভাঙা দোকানগুলোর পেছনে বসে এতক্ষণ মদ্যপান করছিল।
প্রমথ ফাজলামি করল, “একেবারে জনশূন্য নয়। কথা বলবি নাকি লোকটার সঙ্গে? মনে হচ্ছে আই-উইটনেস হতে পারে!”
“তুই বল,” গাড়ি স্টার্ট করে লোকটাকে যখন পাশ কাটিয়ে যাচ্ছি, ‘হেই’ বলে চেঁচিয়ে জানলায় দুয়েকটা থাবড়া মারল। মাতালের সঙ্গে ঝগড়া করার কোন অর্থ হয় না। একেনবাবু দেখলাম পেছন ফিরে তাকাচ্ছেন। প্রমথকে জিজ্ঞেস করলেন, “আর কাউকে দেখতে পাচ্ছেন স্যার, দোকানগুলোর পেছনে?”
আমরা যে অ্যাঙ্গেলে আছি সেখান থেকে দোকানগুলোর পেছন ভালোভাবে দেখা অসম্ভব। আমি বললাম, “দেখতে পান বা না পান, আমি গাড়ি থামাচ্ছি না।”
ইন্দ্রের বাড়ি গাড়ি করে পৌঁছতে প্রায় মিনিট দশেক লেগে গেল। হেববাকেনের বাস সার্ভিস সম্পর্কে আমার কোনও ধারণা নেই। কাছাকাছি বাস না পেলে ওই ভাঙাচোরা ফ্যাক্টরি থেকে হাঁটা পথে বাড়িতে আসতে অশোকবাবুর অনেক সময় লাগত। কেন উনি ওরকম নির্জন জায়গায় গিয়েছিলেন কে জানে? মনে হয় মৃত্যু রহস্যটা সেখানেই লুকিয়ে আছে।
ইন্দ্রদের বাড়িটা পুরোনো, কিন্তু পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। চারতলার ওপরে একটা টু-রুম ফ্ল্যাট। একটা বসার ঘর, তার সঙ্গে লাগোয়া ছোট্ট কিচেন। বসার ঘর থেকে একটা প্যাসেজ চলে গেছে ভিতরের দিকে। তার দু’পাশে দুটো বেডরুম। প্যাসেজের শেষে একটা কমন বাথরুম। বসার ঘরটা একেবারে ছবির মতো সাজানো। আমাদের অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকলে প্রথমেই চোখ পড়বে কফি টেবিলে ডাঁই করে রাখা নিউ ইয়র্ক টাইমস, আধ-খাওয়া কফির কাপ, যত্রতত্র কাগজের টুকরো, কোকাকোলার ভোলা ক্যান,…। আমরা সবাই এর কন্ট্রিবিউটার, তবে একেনবাবু নিঃসন্দেহে আমাদের লিডার।
আমি তো বসার ঘর দেখে মুগ্ধ। বলেই ফেললাম, “আপনার অ্যাপার্টমেন্ট খুব গোছানো।”
“থ্যাঙ্ক ইউ।”
ইন্দ্র আমাদের জন্যে কফি বানানোর চেষ্টা করছিলেন, সবাই মিলে নিরস্ত করলাম। বেশি সময় নষ্ট না করে অশোকের ঘরটা দেখে চলে যাব।
অশোকের বেডরুমে ফার্নিচার বলতে একটা টুইন সাইজের বেড, চেস্ট অফ ডুয়ার্স আর পড়ার টেবিল। চেস্ট অফ ড্রয়ার্স-এর ওপর দুটো বুক-এন্ড-এর মধ্যে বেশ কয়েকটা বই। টেবিলটা বেশ বড়। সেখানে অনেকটা জায়গা জুড়ে ওয়েবক্যাম লাগানো বিশাল কম্পিউটার মনিটর। তার এক দিকে ক্রিস্টালের একটা সুন্দর ফুলদানি। অন্য পাশে বয়স্ক দম্পতির ফ্রেমে বাঁধানো ফটো, সম্ভবত অশোকের বাবা-মা। এই সাইজের মনিটর বা ক্রিস্টালের ফুলদানি খুব একটা সস্তা নয়। আমি সেগুলোর দিকে তাকিয়ে আছি দেখে ইন্দ্র বলল, “কম্পিউটার আমরা হোটেল থেকে পাই।”
“ফুলদানিটা মনে হচ্ছে ক্রিস্টালের তাই না?” আমি প্রশ্ন করলাম।
“হ্যাঁ, এটা ক’দিন আগে বিপাশা মিত্র অশোককে উপহার দিয়েছিলেন– ওঁর একটা পার্টি অশোক খুব ভালো ভাবে অর্গানাইজ করেছিল বলে।”
“আপনারা বিপাশা মিত্রকে চেনেন?” আমি একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
“চিনি মানে কাজের সূত্রে। ওঁর অনেক পার্টি আমরা অর্গানাইজ করি। গতবারের পার্টি অশোক করেছিল। অশোক অবশ্য ঝিনচা পার্টি পছন্দ করে না। কিন্তু বিপাশা মিত্র সেটাই চেয়েছিলেন বলিউড স্টাইলের পার্টি, মানি নো অবজেক্ট। অশোক হল প্রফেশনাল। নিজের রুচির সঙ্গে না মিললেও মোস্ট গ্ল্যামারাস একটা পার্টি অ্যারেঞ্জ করেছিল। হলিউডের বেশ কয়েকজন সেলিব্রেটি এসেছিলেন।”
“কতদিন আগে ওই পার্টিটা হয়েছিল স্যার?” একেনবাবু প্রশ্ন করলেন।
“এই সপ্তাহ তিনেক হবে।”
“বব ক্যাসেলকেও আপনি নিশ্চয় চেনেন স্যার?”
“চিনি, তবে তেমন করে নয়।”
“অশোকবাবু চিনতেন?”
“খুব ভালো করে। বিপাশা মিত্রের পার্টির ব্যাপারে অশোকের প্রাইমারি কন্ট্যাক্ট ছিলেন উনিই। সেই সূত্রেই এক আধবার আমার সঙ্গে কথা হয়েছিল। আপনারা চেনেন বব ক্যাসেলকে?”
“অল্পই স্যার।” বলে আর কিছু বললেন না একেনবাবু। মনে হল একেনবাবু ওঁর মৃত্যুর খবরটা দিতে চান না। আমরাও ব্যাপারটা নিয়ে উচ্চবাচ্য করলাম না।
পুলিশ যে জিনিসপত্রগুলো লণ্ডভণ্ড করেছে সেটা বোঝা যায়। বিশেষ করে চেস্ট অফ ডুয়ার্সের ভিতরে সবকিছুই ওলট-পালট। ওপরে বইগুলো স্থানচ্যুত হয়নি ঠিকই, কিন্তু সাজানো অবস্থাতেও নেই কয়েকটা আপসাইড ডাউন, মনে হয় পুলিশের বাংলা না জানার ফল। বিছানাটা শুধু পরিষ্কার করে পাতা। বেড-কভার টান টান। ওগুলোতে হয় পুলিশ হাত দেয়নি অথবা পরে ঠিক ঠাক করেছে।
একেনবাবু বিছানার তোশকটা তুলে তুলে দেখলেন নীচে কিছু আছে নাকি। বইপত্রগুলো একটু ঘাঁটলেন। ইন্টারেস্টিং তেমন কিছু আমার চোখে পড়ল না। হোটেল ম্যানেজমেন্টের গোটা দুই বই, ক্রস-ওয়ার্ড পাজল-এর বেশ মোটা একটা বই, আর যে দুয়েকটা ইংরেজি বই ছিল, সেগুলো মনে রাখার মতো নয়। তবে ‘ব্যোমকেশ সমগ্র’ আর ফেলুদার কয়েকটা বই ছিল। অশোক বোধহয় ব্যোমকেশ সমগ্র’ পড়ছিল, বইয়ের মাঝামাঝি পেজমার্ক করার জন্যে একটা কার্ড গোঁজা। একেনবাবু সেটা বার করে পড়লেন। অশোকের কোম্পানির দেওয়া কার্ড, কিন্তু তাতে ওর নিজের পার্সোনাল ইমেল অ্যাড্রেসও কালি দিয়ে লেখা। অ্যাড্রেসটা বেশ মনে রাখার মতো ashoknhhny@hotmail.com। হটমেল-এ অজস্র অশোক আছে, তাই এই লেজুড়। নামের পেছনে সংক্ষেপে নিউ হেরিটেজ হোটেল নিউ ইয়র্ক দিয়ে নামটাকে একমেবাদ্বিতীয়ম করা হয়েছে। একেনবাবুকে কার্ডটা রেখে দিচ্ছিলেন, কী ভেবে ওটাকে পকেটে পুরলেন। একেনবাবু যখন ড্রয়ার হাতড়াচ্ছেন, তখন আরেকটা বই আমার চোখে পড়ল, ‘হাউ টু প্লে পোকার’। বইটার পাতা উলটে দেখলাম ওটা অশোককে দেওয়া এড গুয়ান্সিয়ালের উপহার।
আমি পাতাটার দিকে তাকিয়ে আছি দেখে ইন্দ্র বললেন, “আমরা অশোককে দলে টানার চেষ্টা করছিলাম। তাই এড বইটা এনে ওকে দিয়েছিল।”
“পোকার বাজি রেখে খেলতে হয় না?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
প্রশ্নটাতে ইন্দ্র একটু যেন বিচলিত। “আমরা মাত্র দু-এক পয়সা বাজি রাখি, খেলার শেষে পাঁচ দশ ডলারের বেশি কেউ জেতে না।”
প্রমথ বলল, “চিপসের বদলে পয়সা ব্যবহার করলেও সেটা কিন্তু গ্যাম্বলিং। নিউ জার্সিতে এটা কি লিগ্যাল?”
প্রশ্নটাতে ইন্দ্র একটু নার্ভাস হয়ে গেলেন। “এড তো বলল, অল্প বেটে কোনও অসুবিধা নেই। ওর কাছেই আমি পোকার খেলতে শিখেছি।”
“তা শিখুন, কিন্তু অল্প-প্রেগনেন্ট বলে কোনও কথা নেই, হয় প্রেগনেন্ট কিংবা নয়। সেরকম অল্প-গ্যাম্বলিং বলে কোনও কথা নেই, অল্প-গ্যাম্বলিংও গ্যাম্বলিং। একটু খোঁজ নিয়ে দেখবেন। দু-চার পয়সার জন্যে হাজতবাস করবেন কেন?”
প্রমথটার সত্যি কোনও কাণ্ডজ্ঞান নেই। চেনা হোক, অচেনা হোক –অকারণে মানুষকে ঘাবড়ে দিতে ভালোবাসে। ইন্দ্রের মুখটা কেমন শুকিয়ে গেল।
আমি ইন্দ্রকে ভরসা দিতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু কিছু বলার আগেই ড্রয়ারগুলো বন্ধ করতে করতে একেনবাবু প্রশ্ন করলেন, “এখান থেকে কি কোনও জিনিস পুলিশ নিয়ে গেছে স্যার?”
“তা তো বলতে পারব না। যখন পুলিশ এসেছিল, তখন আমি ছিলাম না, দেবরাজদা ছিল।”
“অশোকবাবু কি অফিসে ওঁর পার্সোনাল জিনিস কিছু রাখতেন?”
“তাও বলতে পারব না। একটা পার্সোনাল লকার আমাদের আছে। সেখানে যদি কিছু থেকে থাকে।”
“তার চাবি?”
“অফিস সিকিউরিটির কাছে একটা থাকবে। আর সব কিছু এখন পুলিশের হেফাজতে।”
“পুলিশ কী কী নিয়েছে তার লিস্ট কি আপনার কাছে আছে?”
“না, দেবরাজদার কাছে বোধহয় কপি আছে।”
“ফাইনাল প্রশ্ন স্যার, অশোকবাবুর কাছে বা ওঁর ঘরে কোনও ফটোগ্রাফ দেখেছিলেন?”
“হ্যাঁ, ওই তো। আঙ্কল আর আন্টির ছবি। ইন্দ্র আঙুল দিয়ে দেখালেন।
“না, না, স্যার, এটা না। এই ধরুন, একটা পুকুরের সামনে দু’জন লোকের ছবি।”
“না, তেমন কোনও ফটো তো চোখে পড়েনি!” ইন্দ্রর চোখে বিস্ময়।
“কোনও খাম দেখেছিলেন স্যার, স্ট্যাম্প লাগানো পুরোনো খাম?”
“ইন্ডিয়ার?”
“হ্যাঁ স্যার।”
“ইন্ডিয়া থেকে এক আধটা চিঠি আসতে দেখেছি।”
“ওঁর চিঠিপত্রগুলো কোথায় থাকে?”
“যা থাকার ঐ ড্রয়ারেই থাকে। বহু চিঠি ও ফেলে দিত।”
“ড্রয়ারে কোনো চিঠি নেই স্যার।”
“যেগুলো ছিল, সেগুলো হয়তো পুলিশ নিয়ে গেছে।”
ইন্দ্রের বাড়ি থেকে যখন বেরোচ্ছি, তখন একেনবাবু হঠাৎ থেমে মুখ ঘুরিয়ে যে প্রশ্নটা করলেন, সেটা আমি এক্সপেক্ট করিনি। কারণ পোকার নিয়ে যখন আমরা কথা বলছিলাম, উনি তখন ড্রয়ার নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। কানে একটা কথাও ঢুকছিল বলে মনে হয়নি। কিন্তু হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, “ও হ্যাঁ স্যার, আরেকটা প্রশ্ন করতে তো ভুলে গেলাম, অশোকবাবু কি কোনোদিন আপনাদের সঙ্গে পোকার খেলতে বসেছিলেন?”
আবার পোকার নিয়ে প্রশ্নে ইন্দ্রের মুখেচোখে অসোয়াস্তিটা পরিষ্কার। বললেন, “একবার এড প্রায় জোরজুলুম করে বসিয়েছিল।”
“হেরেছিলেন, না জিতেছিলেন?”
“ঠিক মনে নেই।”
“কতদিন আগের কথা স্যার?”
“প্রায় দিন কুড়ি।”
“কিন্তু আপনার মনে নেই স্যার?”
“বোধহয় জিতেছিল। ও হ্যাঁ, মনে পড়েছে, জিতেছিল। বিগিনার্স লাক।”
“তারপর উনি আর খেলেননি?”
“না।”
“থ্যাঙ্ক ইউ স্যার?” বলে হাঁটা দিলেন একেনবাবু। আবার থামলেন। মাথা চুলকোতে চুলকোতে ফিরে তাকিয়ে একটু চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “উনি কি স্ট্যাম্প জমাতেন
স্যার?”
ইন্দ্র ঘরের দরজা প্রায় ভেজিয়ে ফেলেছিলেন। মুখটা বার করে বললেন, “না।”
“থ্যাঙ্ক ইউ, থ্যাঙ্ক ইউ ভেরি মাচ স্যার।”
ইন্দ্রর মুখের এক্সপ্রেশনটা দেখার মতো। আমরা অদৃশ্য না হওয়া পর্যন্ত উনি দরজা খুলে দাঁড়িয়ে রইলেন। পাছে আরেকটা প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়।
গাড়ি স্টার্ট দিয়ে আমি জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি ফটো আর স্ট্যাম্প নিয়ে এত প্রশ্ন করলেন যে? আপনার কি ধারণা বিপাশার ফটো চুরির সঙ্গে অশোকের মৃত্যুর কোনো যোগ আছে?”
“আই হ্যাভ নো ফ্লু স্যার। বিপাশা ম্যাডামকে অশোক চিনতেন জানলাম, সুতরাং ফটোটা দেখে থাকতে পারেন। টাকার লোভে হয়তো চুরিও করতে পারেন। হু নোজ?”
“করে থাকলে তো আপনার সুবিধাই হয়, এক ঢিলে দুই পাখি মারা যায়!” প্রমথ বলল।
“এটা ভালো বলেছেন স্যার।”
“হয়তো বব ক্যাসেলও ফটো চুরির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্টকে ব্যাপারটা জানিয়ে রাখবেন।” প্রমথ ঠাট্টার ছলেই কথাটা বলল।
“কিছুই অসম্ভব নয় স্যার।”
“বিশেষ করে অশোক আর বব ক্যাসেল যখন দু’জনে দু’জনকে চিনতেন। বব ক্যাসেল যদি সত্যিই খুন হয়ে থাকেন ইট উড বি টু মাচ অফ এ কোয়েন্সিডেন্স। আপনি এটা নিয়ে সিরিয়াসলি একটু খোঁজ খবর করুন,” আমি বললাম।
“তা তো করতেই হবে স্যার, আপনারা যখন সন্দেহ করছেন ফটো চুরির সঙ্গে দুটো খুনের যোগ আছে।”
“ও, আর আপনি করছেন না? শুধু আমরা বলছি বলেই আপনি ওতে মাথা গলাবেন! আপনি মশাই সামথিং!” প্রমথ বলল।
একেনবাবু আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “প্রমথবাবু না স্যার, সত্যি!”
“প্রমথর কথা ছাড়ন,” আমি বললাম, “ওর শুধু একটাই গুণ আমাদের রান্না করে খাওয়ায়। সেই গুণে সব দোষ মাপ।”
“তোদের পছন্দ করি বলেই, খোঁচাগুলো দিই। মনে রাখিস, তোমার প্রেমে আঘাত আছে, নয় তো অবহেলা’– প্রমথ গুনগুন করে গেয়ে উঠল।”
“ওরে বাবা, একেবারে গুরুদেবের গান ধরলি, আমি ইমপ্রেসড!”
“শুনলেন,” একেনবাবুকে প্রমথ বলল, “কে কাকে খোঁচা মারছে?”
