ম্যানহাটানের ম্যাডম্যান (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত

শেয়ার করুনঃ

(৫)

বাড়ি ফিরে দেখলাম ফোনের মেসেজ লাইটটা জ্বলছে। মেসেজটা একেনবাবুর জন্য, ফোন করতে বলেছেন একেনবউদি।

 

আমি আর প্রমথ বহু চেষ্টা করেও একেনবাবুকে মোবাইল ফোন কেনাতে পারিনি। কথাটা তুললেই বলেন, ‘কে আর আমায় ফোন করে স্যার। আর রাখলেই তো একটা খরচা।’

 

প্রমথ মাঝে মাঝে চটে গিয়ে বলে, “ও, আপনি কনভিনিয়েন্স চাইবেন, কিন্তু তার জন্যে পয়সা খরচা করবেন না, তাই তো?”

 

‘কী মুশকিল স্যার, আমি তো কনভিনিয়েন্স চাইছি না।

 

‘আমরা তো চাই। আপনাকে কোনও খবর দিতে হলে, হয় আপনার অফিসে ছুটতে হয়, নয় ফোনে মেসেজ রাখতে হয়। তারপর আশায় থাকতে হয়, যদি আপনি খেয়াল করে মেসেজ চেক করেন। অবশ্য যদি সেটা কেয়ার না করেন, তাহলে অন্য কথা।

 

‘দেখুন স্যার, একেনবাবু তখন আমাকে সাক্ষী মানেন, ‘প্রমথবাবু জিনিসটা এত ঘুরিয়ে বলেন… আচ্ছা বলুন তো স্যার, আপনারা ছাড়া আমার আর কে আছে এখানে যে কেয়ার করব না?’

 

‘ওসব হেঁদো কথা ছাড়ন। ঠিক আছে, আমরাই না হয় আপনাকে একটা মোবাইল উপহার দেব, দায়টা যখন আমাদের।‘

 

‘না না স্যার, এবার একটা কিনব।’

 

এ ভাবেই মোবাইল প্রসঙ্গ শেষ হয়। আজকে একেবউদির ফোন মিস করায় প্রমথ বেশ বিরক্ত হয়েই বলল, “দেখলেন, বউদিও আপনাকে ধরতে পারছেন না। এখুনি ফোন করুন। হোপ এভরিথিং ইজ ওকে।”

 

“করছি স্যার করছি, সেইজন্যেই তো আপনাদের কাছে ইন্ডিয়ার টাইম জানতে চেয়েছিলাম।”

 

“কী ব্যাপার?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

 

একেনবাবু উত্তর না দিয়ে ঘরে ঢুকলেন ফোন করতে। টিপিক্যাল একেনবাবু প্রশ্নের উত্তর দেবার ইচ্ছে না থাকলে, না শোনার ভান করে এড়িয়ে যান।আমি নিজেকে খানিকটা আস্বস্ত করার জন্যেই প্রমথকে বললাম, “নিশ্চয় সিরিয়াস কিছু নয়, একেনবাবু বোধহয় জানেন, কেন ফোন করেছেন।”

 

প্রমথ উত্তর দিল না। দেখলাম টাইমস পত্রিকা খুলে কী জানি পড়ছে। ঘড়িতে দেখলাম রাত প্রায় ৯ টা। আমার মা খুব ভোরেই ওঠেন। ভাবলাম আমিও একটু ফোন করি। অনেকক্ষণ রিং করার পর ফোন ধরল চম্পা। ভুলে গিয়েছিলাম মা দিন কয়েকের জন্যে ছোটোমাসির কাছে বেড়াতে গেছে। আমার গলা শোনা মাত্র চম্পা শুরু করল, “কিছু হয়নি তো দাদা’, ‘সব ঠিক আছে তো’, ‘মাকে কিছু বলতে হবে’, ইত্যাদি হাজার প্রশ্ন।

 

চম্পা বহুদিন আমাদের বাড়িতে কাজ করছে। মা যদিও শুনলে রাগ করে, কিন্তু সত্যি শি ইজ নট দ্য শার্পেস্ট নেইল ইন দ্য বাকেট। জাস্ট ‘হ্যালো’ বলার জন্যে ফোন করেছি, সেটা ওর মাথায় ঢোকাতেই মিনিট পাঁচেক চলে গেল। যখন বাইরে এলাম, তখন প্রমথ টাইম ম্যাগাজিনের একটা পাতা খুলে এগিয়ে দিল।

 

“কী?”

 

“পড়ে দেখ। এডওয়ার্ড স্টাইচেন-এর ‘পন্ড-মুনলাইট’ আবার নিলাম হবে। ২০০৬ সালে ওটা ২.৯ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি হয়েছিল, এখন কত দাম হবে সেই নিয়ে স্পেকুলেশন চলছে।”

 

আমি বললাম, “এটা জেনে আমার কী লাভ, আমি তো আর কিনতে যাচ্ছি না।”

 

“পাতাটা ওলটা না, ইডিয়ট!”

 

পরের পাতায় পন্ড-মুনলাইটের ফটো। একটা পুকুরের উলটো পারে কতগুলো গাছ, আর তার ফাঁক দিয়ে চাঁদ হয় ডুবছে নয় উঠছে। ১৯০৪ সালে তোলা রঙিন ফটো, রঙগুলো অবশ্য চাপা। ফটোটা যখন দেখছি প্রমথ বলল, “আমি ভাবছি বিপাশা মিত্রের ফটোটার কথা। মনে আছে, কী ডেসক্রিপশন দিয়েছিল চুরি যাওয়া ফটোটার?”

 

“লেকের সামনে দাঁড়ানো দু’জনের ফটো।”

 

“রাইট। রঙিন ছবি, কিন্তু এখনকার মতো ব্রাইট রঙিন নয়। আর লেক না হয়ে ধর, সেটা ছিল পুকুর। এবার পন্ড-মুনলাইট ফটোতে দুটো লোককে দাঁড় করিয়ে দে।”

 

“তুই ভাবছিস ত্রিপুরার মহারাজ স্টাইচেনকে দিয়ে নিজেদের ফটো তুলিয়েছিলেন ওই একই পুকুরের সামনে? হতে পারে না বলছি না, কিন্তু হবার সম্ভাবনা খুবই কম।”

 

“কেন? যদি মনে করি, মহারাজ ছিলেন স্টাইচেনের বন্ধু। তিনজনে বেড়াতে গিয়ে ওই পুকুরের সামনে দুটো ফটো তুলেছিলেন। তারমধ্যে একটা পন্ড-মুনলাইট’ স্টাইচেন রেখে দিয়েছিলেন। আর অন্যটা, যেটাতে মহারাজ আর বিজয় মিত্র ফ্রেমের মধ্যে ছিলেন, সেটা মহারাজকে দিয়েছিলেন। সেটা সত্যি হলে বিপাশা মিত্র ফটো ফিরে পেতে কেন এত আকুল, তার কারণটা ক্লিয়ার হয়।”

 

“তা হয়, কিন্তু সেরকম কোনও ফটোর কথা কি এখানে লিখেছে?”

 

“না, আর সেইজন্যেই ওটা মহামূল্য। এক্সপার্টরা পরীক্ষা করে নিশ্চয় বলতে পারবে দুটো ফটো একই ক্যামেরায় তোলা কি না। আমি কী ভাবছি জানিস, এই পরীক্ষাটা বিপাশা হয়তো আলরেডি করিয়েছেন। হয়তো ঠিকও করেছিলেন ফটোটা নিলামে দেবেন। এখন খুঁজতে গিয়ে আবিষ্কার করেছেন ওটা মিসিং!”

 

এটা প্রমথর অবিশ্বাস্য কল্পনা না হলে, ফটোটা যে কেউই চুরি করতে পারে। আর সেটা বিপাশাকে কষ্ট দিতে নয়, নিজেরা লাভবান হতে। প্রশ্ন, বিপাশা কথাটা একেনবাবুকে খুলে বললেন না কেন? তিনজন সাস্পেক্টের নামই বা দিলেন কেন? যদি না ফটোটা যে এডওয়ার্ড স্টাইচেন-এর তোলা– বিপাশা শুধু এই তিনজনকেই বলে থাকেন।

 

এরমধ্যে একেনবাবু ফোন সেরে এলেন। মুখটা একটু খুশি খুশি।

 

“কি ব্যাপার, বউদি কী সুখবর দিলেন?” জিজ্ঞেস করলাম।

 

“আপনারা ঠিকই বলেন স্যার, এই ইন্টারনেট একেবারে ট্রলি অ্যামেজিং।”

 

“এত ক্রিপ্টিক্যালি কথা না বলে একটু বুঝিয়ে বলুন।” প্রমথ টাইম ম্যাগাজিনটা আমার হাত থেকে নিতে নিতে বলল।

 

“আমি কাল অনলাইনগিফ্ট কম-এ গিয়ে ফ্যামিলিকে ফুল আর কেক পাঠাতে বললাম, আজ সকালেই ওদের কাছ থেকে ফোন পেয়ে গেছে, ৯-টার সময় ডেলিভারি দেবে।”

 

একেনবাবু বউদিকে ফ্যামিলি বলেন। প্রথম দিকে বুঝতেই পারিনি কার কথা বলছেন! সাধারণত ওয়াইফ, স্ত্রী বা ওল্ড ফ্যাশন্ড মিসেস শুনে আমি অভ্যস্ত। কয়েকবার কথাটা শোনার পর কানেকশনটা ক্লিয়ার হয়েছিল। অনেক চেষ্টা সত্বেও ওঁর ফ্যামিলি বলার হ্যাবিটটা পাল্টাতে পারিনি।

 

প্রমথ জিজ্ঞেস করল, “বউদিকে ফুল আর কেক ব্যাপারটা কী?”

 

“আজ স্যার, আমাদের টেন-ইয়ার অ্যানিভারসারি।” একেনবাবু সলজ্জ মুখে জানালেন।

 

“কংগ্রাচুলেশনস, কিন্তু আমরা বাদ পড়ছি কেন? বউদি না হয় এত বছর আপনাকে সহ্য করেছেন, কিন্তু আমি আর বাপিও তো কম দিন আপনাকে সহ্য করছি না!”

 

“কী যে বলেন স্যার, আপনাদের তো খাওয়াব আমি ঠিকই করেছি।”

 

“আহা, এসব সদিচ্ছার কথা শুনতেও ভালো লাগে, কিন্তু ম্যাকডোনাল্ডসে নিয়ে গিয়ে সস্তায় সারবেন না।”

 

“আপনি যেখানে চান নিয়ে যাবেন, প্রমথর কথায় কান দেবেন না।” আমি ওঁকে আশ্বস্ত করলাম।

 

“না না স্যার, আপনাদের বুখারা গ্রিল’-এ নিয়ে যাব। ফ্যামিলিই বলল, আপনাদের ভালো কোথাও খাওয়াতে। ও আপনাদের দু’জনকে যা ভালোবাসে!”

 

“বাসবেন না কেন, বউদি অত্যন্ত বুদ্ধিমতী,” প্রমথ বলল। “শুধু বুঝি না, কেন আপনার মতো লোককে বউদি বিয়ে করলেন? যাক গে, দশ বছরের পুরানো কাসুন্দি ঘেঁটে লাভ নেই। কখন খেতে যাব?”

 

“পরশু, স্যার। কালকে সন্ধ্যাবেলায় তো আমরা ইন্দ্রবাবুর বাড়ি যাচ্ছি। আপনি ম্যাডাম ফ্রান্সিস্কাকে ফোন করুন, ওঁকেও তো ফ্রি থাকতে হবে।”

 

“ফ্রান্সিস্কাও ইনভাইটেড?”

 

“কী যে বলেন স্যার, আপনাকে খাওয়াব, কিন্তু ম্যাডামকে খাওয়াব না –সেটা হয় নাকি?”

 

ফ্রান্সিস্কা সুইটজারল্যান্ডের মেয়ে, প্রমথর গার্লফ্রেন্ড। নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতেই পিএইচ ডি করছে। ও আবার একেনবাবুকে খুব পছন্দ করে।

 

“সেটা আমি ম্যানেজ করছি, কিন্তু ‘বুখারা গ্রিল’-এ ভীষণ ভিড় হয়, আপনি আগে থেকে রিজার্ভেশান করে রাখুন। শেষে রিজার্ভেশান পেলাম না বলে ফালতু জায়গায় নিয়ে যাবেন না।”

 

একগাল হেসে একেনবাবু বললেন, “রিজার্ভেশান আমি করে রেখেছি ইন অ্যান্টিসিপেশন স্যার। তবে এর মধ্যে একটু ঝামেলা হয়ে গেছে, ম্যাডাম ফ্রান্সিস্কার হেল্প লাগবে।”

 

“কী ঝামেলা?”

 

“নীলাকে ইংরেজিতে কী বলে স্যার?”

 

“নীলা! মানে পাথরের কথা বলছেন?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

 

“হ্যাঁ, স্যার।

 

“ব্লু স্যাফায়ার।”

 

“ওটা কিনতে হবে। ফ্যামিলি খুব ধরেছে।”

 

“আপনি মশাই সামথিং,” প্রমথ বিরক্ত স্বরে বলল। “এদিকে মোবাইল ফোন কিনবেন না, কিন্তু ব্লু স্যাফায়ার কিনতে অসুবিধা নেই। যাই হোক, পরশু খাওয়াচ্ছেন, তাই আর গালমন্দ করব না। তা হঠাৎ নীলার দরকার পড়ল কেন?”

 

“আসলে স্যার, আমার শনির দশা শুরু হয়েছে। সাড়ে সাত বছর খুব বাজে যাবে। ফ্যামিলির বাড়ির জ্যোতিষী বলেছেন নীলা ধারণ করলে সেটা কেটে যাবে। নীলা স্যার দারুণ জিনিস– প্রচণ্ড পাওয়াফুল।”

 

“এসব বুজরুকি আপনি বিশ্বাস করেন?”

 

“কী যে বলেন স্যার, জ্যোতিষশাস্ত্র বলে কথা, তার ওপর ফ্যামিলির হুকুম না মেনে যাই কোথায়?”

 

“তা মানি,” প্রমথ বলল। “বিশেষ করে বিপাশা মিত্রের নজর যখন আপনার ওপর পড়েছে, তখন আপনার একটু সাবধান হওয়াই ভালো। এটা দেখেছেন?” বলে টাইম ম্যাগাজিনের পাতাটা খুলে একেনবাবুকে এগিয়ে দিল।

 

একেনবাবু পড়ে বললেন, “মাই গুডনেস স্যার, একটা ফটোগ্রাফ এত দামে বিক্রি হয়?”

 

“একটু আগে বাপিকে বলছিলাম, বিপাশা মিত্র ছবিটার যা ডেসক্রিপশন দিয়েছিলেন, তার সঙ্গে এর তফাৎ হল দু’জন লোক শুধু ছবিতে নেই। সুতরাং বুঝতেই পারছেন, ফটোটা ফেলনা নয়।”

 

“ভেরি ইন্টারেস্টিং স্যার।”

 

“এক্সাক্টলি। দেখতেই পাচ্ছেন দুটো সম্ভাবনা– হয় দামি ফটো, নয় দামি স্ট্যাম্প। অশোক দুবেকে নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে বিপাশা মিত্রের সমস্যাটার সমাধান করুন– কদিন বাদেই তো সুন্দরী ফোন করবেন।”

 

“সেই জন্যেই স্যার নীলাটা দরকার। এই শনির দশার জন্যেই বোধহয় মাথাটা ঠিক খেলছে না।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *