ম্যানহাটানের ম্যাডম্যান (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত

শেয়ার করুনঃ

 

(২৫)

 

রবিবার জুন ৫, ২০১১

 

জন হেক্টারের অফিস চায়না টাউনে। জায়গাটা আমাদের বাড়ির কাছেই। ম্যানহাটানের এই অঞ্চল একটা টুরিস্ট স্পট। তরি-তরকারি, মাছ, মাংস থেকে শুরু করে ইলেকট্রনিক্স, ঘড়ি, ক্যামেরা, ইত্যাদি নানান গ্যাজেট ওখানে মেলে! দামও বেশি নয়। আমার এক চাইনিজ কলিগ, জনি চু একবার নিয়ে গিয়েছিল ওখানে। একটা ঘুপচি দোকান থেকে রোলেক্স ঘড়ি কিনেছিলাম মাত্র তিরিশ ডলারে। জেনুইন নয়, কিন্তু দেখে বোঝার উপায় নেই। সাবমেরিনার’ মডেলের সেই ঘড়ির লিস্ট প্রাইস ছিল ছ’হাজার ডলার! সেটা পরে প্রথম যেদিন কলেজে গিয়েছিলাম, আমার ডিপার্টমেন্ট হেডের তো প্রায় হার্টফেল হবার জোগাড়! এখনও ওটা আমার প্রাইজ পসেশন। তা সত্বেও বলব, চায়না টাউন যেতে আমার ভালো লাগে না। মাঝে মধ্যে যেতেই হয়। প্রমথ যখন ভীষণ মেজাজে থাকে, তখন মাছ রাঁধে। কিন্তু বাজারে কিছুতেই একা যাবে না। আমি রাঁধব তোমরা খাবে, কিন্তু হেল্প করবে না– তা তো হয় না!

 

ওর সঙ্গে বাজারে যাওয়াটা যে কী হেল্প, সেটা বুঝে উঠতে পারিনি। যখনই কোনও মাছ কিনতে সাজেস্ট করেছি, সঙ্গে সঙ্গে ‘না’ বলেছে। ওর হেল্পারের ডেফিনিশন হচ্ছে বশংবদের মতো পেছন পেছন ঘোরা, যেটা চায়না টাউনে সহজ নয়। রাস্তাগুলো সরু সরু, ফুটপাথগুলোও অপ্রশস্ত। তার ওপর অজস্র লোক আর গাড়ির দৌরাত্মি। এক সময় ক্রাইম অঞ্চল হিসেবেও এটার কুখ্যাতি ছিল। সব জায়গা ছেড়ে এই চায়না টাউনে জন হেক্টার কেন অফিস খুলেছিলেন, কে জানে!

 

প্রমথকে সেটা বলতেই খ্যাঁকখেঁকিয়ে উঠল, “দু-দিনের যোগী, ভাতকে বলিস পেস্পদ! কলকাতার থেকে এখানে ভিড় বেশি? রাস্তা সরু? এদিকে তো হুনান চিকেন খেতে জিভ থেকে জল গড়ায়, তাহলে চায়না টাউনের গালমন্দ করছিস কেন?”

 

থাক সে সব কথা। এখন জন হেক্টারের পার্সোনাল অ্যাসিস্টেন্ট প্যামেলা জোনসের প্রসঙ্গে আসি। প্যামেলা জোনস বহুদিন ধরে জন হেক্টারের সঙ্গে কাজ করেছেন। এ বছরই রিটায়ার করার কথা ছিল। সেটা একটু আগেই ঘটে গেল। অফিসটা খুবই ছোটো। বাইরের দিকের ঘরটায় প্যামেলা জোনসের অফিস। ভিতরের ঘরে জন হেক্টার বসতেন। এ মাসের ১৫ তারিখেই অফিসটা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। প্যামেলা ওঁর নিজস্ব জিনিসপত্রগুলো গুছিয়ে কার্ডবোর্ডের কয়েকটা বাক্সে ইতিমধ্যেই গুছিয়ে রেখেছেন। জন হেক্টারের জিনিস কে নেবেন, এখনও স্থির হয়নি। উনি অবিবাহিত ছিলেন। কোনও উইলও করে যাননি। দূর সম্পর্কের ভাগ্নে-ভাগ্নি আছে, কিন্তু তাদের সঙ্গে তেমন কোনও যোগাযোগ ছিল না। প্যামেলা বোধহয় কয়েকদিন একা একা বসে থাকার পর আমাদের শ্রোতা পেয়ে নিজের থেকেই অনেক কিছু বলে ফেললেন। ওঁর কথা শেষ হবার পর, একেনবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “ম্যাডাম, মিস্টার হেক্টার এবার ইন্ডিয়াতে গিয়েছিলেন কেন?”

 

“আপনারা সেটা জানেন না? এ নিয়ে তো পত্রিকাতেও লেখালেখি হয়েছে?” প্যামেলা বেশ অবাক হলেন।

 

“না, ম্যাডাম।”

 

“ওর সঙ্গে কিছুদিন আগে এশিয়া ইনস্টিট্যুটের মিস্টার আকাহাশির অনেক তর্কাতর্কি হয়েছিল ইন্ডিয়ার একটা মূর্তির ব্যাপার নিয়ে। মিস্টার আকাহাশি বলেছিলেন ওটা কম্বোডিয়ার, কিন্তু জন জানত ওটা ইন্ডিয়ার। জন তখন আকাহাশির কাছে প্রাভানেন্স চায়।”

 

“প্রাভানেন্স কী ম্যাডাম?”

 

“হিস্ট্রি অফ ওনারশিপ। কোত্থেকে মূর্তিটা এসেছে, এটা কার সম্পত্তি ছিল– তার প্রমাণ।

 

আকাহাশি সেটা দেখাতে অস্বীকার করেন, উলটে ওঁকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন প্রমাণ দেখানোর যে ওটা ইন্ডিয়ার জিনিস। ইন্ডিয়ায় তোলা ওই মূর্তিটার একটা ছবি জনের কাছে ছিল, কিন্তু সেটা দিয়ে কিছু প্রমাণ করা যায় না, তাই জন আরও প্রমাণ সংগ্রহ করার জন্যে ইন্ডিয়া গিয়েছিল।”

 

“প্রমাণ কি কিছু পেয়েছিলেন ম্যাডাম?”

 

“জন খুন হবার আগের দিন অফিসের দুয়েকটা কাজ নিয়ে কয়েক মিনিট কথা হয়েছিল। খুব খুশি আর উত্তেজিত মনে হচ্ছিল জনকে। জিজ্ঞেস করেছিলাম, ওখানকার কাজ কি রকম চলছে? উত্তরে বলেছিল, চমৎকার। কাজগুলো সব হয়েছে, কিন্তু আরেকটা বড় একটা জিনিস আবিষ্কার করেছে, যেটা নিয়ে হইচই পড়ে যাবে।”

 

“কী সেটা ম্যাডাম?”

 

“সেটা বলেনি। জন মুখে কিছু না বলে একেবারে কাগজে ছাপিয়ে জানায়, এটাই বরাবর দেখেছি।”

 

“একটা প্রশ্ন কিন্তু রয়ে গেল ম্যাডাম।”

 

“কী বলুন তো?”

 

“উনি কাজগুলো বললেন কেন? গিয়েছিলেন তো মূর্তিটা ইন্ডিয়ার প্রমাণ জোগাড় করতে?”

 

“ও, সেটা তো আপনাদের বলিনি। জন একটা সিন্ডিকেটেড সিরিজ বার করে ‘আফটার দে রিটার্ন’ নামে। যেসব ক্রিমিনাল বহু বছর জেল খাটার পর মুক্তি পেয়েছে, তারা নতুন করে সমাজের স্রোতে কী ভাবে মিশতে পেরেছে বা পারেনি, তার কাহিনি। শুধু এখানকার ক্রিমিনালদের কাহিনি নয়, এর মধ্যেই ক্যানাডা, মেক্সিকো, পোল্যান্ড, ইজিপ্ট আর ইন্দোনেশিয়ায় কাহিনি ছাপা হয়েছে। এবার ইন্ডিয়াতে যখন যাচ্ছে তখন ইন্ডিয়ার একটা কাহিনি পেলে লিখবে ঠিক করেছিল।”

 

“তার মানে ম্যাডাম, ইন্ডিয়াতে সে রকম কারোর খোঁজ পেয়েছিলেন?”

 

“ইয়েস এন্ড নো।”

 

“বুঝলাম না ম্যাডাম।”

 

“একজনের খোঁজ পেয়েছিলেন, কিন্তু তার সঙ্গে দেখা করতে পারেননি। অনেক বছর আগেই তিনি মারা গেছেন।”

 

“মহিলাটির নাম বোধহয় কল্পনা, তাই না ম্যাডাম?”

 

“দাঁড়ান, আপনি কী করে এটা জানলেন?” প্যামেলা অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন।

 

“জাস্ট এ গেস ম্যাডাম।”

 

প্যামেলা জোনসের বিস্ময় তাতে কাটলো না। না কাটারই কথা।

 

জিজ্ঞেস করলেন, “আপনিও কি তাকে চেনেন?”

 

“মিস্টার হেক্টার কি ওঁকে চিনতেন?”

 

“না, জন নয়। ক’দিন আগে বার্নার্ডস কলেজের এক রিটায়ার্ড প্রফেসর জনের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। তাঁর সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল, তখন আমি একটা কাজে ঘরে ঢুকি। তখনই শুনি উনি জনকে বলছেন, কল্পনা নামে ওঁর এক ছাত্রী ছিল। কিন্তু গ্রাজুয়েশনের ঠিক আগেই সে হঠাৎ দেশে ফিরে যায় আর একটা মার্ডারে জড়িয়ে পড়ে। জন বলে, ও এক কল্পনার খবর জানত। কিন্তু সেই কল্পনা যে এখানে পড়াশুনো করতে এসেছিল, সেটা জানত না। এবার গিয়ে কল্পনার খোঁজ করবে, তাকে পেলে তাকে নিয়েই ওর কাহিনি লিখবে।”

 

“কিন্তু তার দেখা তো পাননি।”

 

“সেটা ঠিকই, কিন্তু জন ওয়াজ এ গ্রেট ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টার।”

 

কিছু বলার আগেই একেনবাবু আরেকটা প্রশ্ন করলেন, “শেষ আপনার সঙ্গে কবে মিস্টার হেক্টারের কথা হয়?”

 

“মারা যাবার দিন সকালে খুব অল্পক্ষণের জন্যে। আমাকে বলে পরের দিন লুফথহানসার ফ্লাইট বুক করেছে।”

 

“ওঁকে কোন ব্যাপারে চিন্তিত বা বিচলিত মনে হয়নি?”

 

“একেবারেই না।”

 

“থ্যাঙ্ক ইউ ম্যাডাম, থ্যাঙ্ক ইউ ভেরি মাচ।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *