ম্যানহাটানের ম্যাডম্যান (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত
(২২)
শুক্রবার জুন ৩, ২০১১
ডাঃ দাসের বাড়িতে আজ বাইরের কেউ নেই। আমরা তিনজন, ডাঃ দাস আর মিসেস দাস, অজয় (ডাক্তার দাসের ভাইপো) আর ইন্দ্রাণী। সাধারণত ওঁদের বাড়ির পার্টিতে অসংখ্য অতিথি আসে। তাঁদের সামাল দিতে ওঁরা হন্তদন্ত থাকেন, কথা বলার তেমন ফুরসত থাকে না। আজকে এই প্রথম রিল্যাক্সড হয়ে বসে আমাদের সঙ্গে দু’জনে গল্প করলেন। ডাঃ দাস গল্প করতে ভালোবাসেন, তবে মাঝেমাঝেই স্থান কাল পাত্র একটু গুলিয়ে ফেলেন। মিসেস দাসের একেবারে স্টিল ট্র্যাপ মাইন্ড, সবকিছু পুঙ্খানুপুঙ্খ মনে থাকে। স্ত্রী ভুল ধরিয়ে দিলে আবার হেসে ফেলেন। ‘আঃ ডিটেলস নিয়ে এত মাথা ঘামাচ্ছ কেন, গল্পের রসটা তো ঠিকই আছে।’ মিসেস দাস তখন ধমক দেন, ‘একজনের কথা আরেকজনের ঘাড়ে চাপাচ্ছ, ওরা তো তোমাকে চেনে না, লোকদের ভুল বুঝবে।’
.
খানিকবাদে অ্যান্ডিও এল। কথায় কথায় বেরল যে মিসেস দাস প্রমথর মাকে চিনতেন। এরপর যা হয় শুরু হল– একে চিনি কি না, ওকে চিনি কি না। ডাঃ দাস বহু লোককে চেনেন, যাঁদের ব্যক্তিগত ভাবে না চিনলেও নামে চিনি। শুধু চেনেন তাই না, অনেকের সঙ্গে ওঁর যথেষ্ট বন্ধুত্বও আছে। বহু সেলিব্রেটি নিউ ইয়র্কে এসে ওঁর বাড়িতে থেকে গেছেন শুনলাম। তবে সবচেয়ে অবাক হলাম যখন শুনলাম উনি বিপাশা মিত্রের বাবা সুজয় মিত্রকে চিনতেন। কথাটা অবশ্য উঠল ওঁর বন্ধুদের মধ্যে কতজন দেয়ালে ছবি হয়ে গেছেন সেই প্রসঙ্গে।
“বুঝলে, আমার এখন লাস্ট অয়েল চেঞ্জ চলছে,” ডাঃ দাস বললেন।
“তার মানে কী স্যার?” একেনবাবু জিজ্ঞেস করলেন।
“গাড়ির মাইলেজের সঙ্গে যদি মানুষের জীবন তুলনা কর, এক হাজার মাইল হচ্ছে এক এক বছর, তাহলে বড় জোর আর বছর দশেক বাকি আছে আমার জীবনের। পরের অয়েল চেঞ্জের সময় আসার আগেই গাড়ি বিকল।”
“বাবা, তুমি এত বাজে কথা বলতে পার, ইন্দ্রাণী রাগ করল।
“আরে, আমার চেনা জানার সংখ্যা তো প্রতি বছর কমছে। এ বছরই তো দু’জন মারা গেল।” তারপর আঙ্গুল গুণে গুণে কে কে মারা গেছে শুরু করলেন। ইন্দ্রাণী রাগ করে অ্যান্ডিকে নিয়ে অন্য একটা ঘরে চলে গেল। ডাঃ দাস যখন মোটর অ্যাকসিডেন্টে রিয়েল এস্টেট কিং সুজয় মিত্রের মৃত্যুর কথা বললেন, তখন প্রমথ জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি বিপাশা মিত্রের বাবার কথা বলছেন?”
“ও ছাড়া আর কে রিয়েল এস্টেট কিং আছে?”
“আপনার সঙ্গে ওঁর কী সূত্রে পরিচয়?”
“সে এক দীর্ঘ কাহিনি।” তারপর মিসেস দাসের দিকে তাকিয়ে বললেন, “মনে আছে?”
“থাকবে না, প্রিয়াঙ্কার সেকেন্ড বার্থডে ছিল।”
“এক্সাক্টলি, ১৯৭৪ সালের পয়লা নভেম্বর।”
“তোমার মাথাটা একেবারে গেছে, নিজের মেয়ের জন্মদিন মনে রাখতে পার না। ১৯৭৪ নয়, ১৯৭৫।”
“আরে যাহা বাহান্ন, তাহাই তিপ্পান্ন। মোটকথা বহুদিন আগে, আমরা তখন দিল্লীতে। মেয়ের জন্মদিনে বেশ কয়েকজন বন্ধুকে ডেকেছিলাম। তখন ধ্রুবর সঙ্গে সুজয় মিত্র এসেছিল।”
“ধ্রুব নয়, বিজনবাবুর সঙ্গে।”
“ওই হল। বিজনের বাড়িতে উনি গেস্ট ছিলেন। বাড়িতে একা না রেখে বিজন ওকে নিয়ে এসেছিল, পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল নিউ ইয়র্কের এক বিজনেসম্যান হিসেবে। বেশিক্ষণ অবশ্য ছিল না। সুজয় তার পরের দিন নিউ ইয়র্ক ফিরে যাচ্ছে। ওরা চলে যাবার পর আমরা হাসাহাসি করছিলাম বিজনের সঙ্গেই সব বিজনেসম্যানদের বন্ধুত্ব বলে।”
মিসেস দাস ব্যাপারটা বিশদ করলেন, “বিজনবাবু ছিলেন কাস্টমসের একজন বড় অফিসার। কিন্তু সেটার জন্যে নয়, সুজয় ছিলেন বিজনের দূর সম্পর্কের ভাই।”
“এর কয়েক মাস বাদে আমি কলাম্বিয়াতে পড়াতে আসি। তখন বিজনের সূত্রেই নতুন করে সুজয়ের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। ওর বিয়েও আমরা অ্যাটেন্ড করেছি।”
“সেকেন্ড বিয়ে,” মিসেস দাস বললেন।
“ওঁর প্রথম স্ত্রীকে কি স্যার আপনারা দেখেছেন?”
“না,” মিসেস দাস উত্তর দিলেন। তিনি মারা যাবার পর উনি ইন্ডিয়া যান। গল্প করতে করতে একবার বলেছিলেন, দুঃখ ভুলতে মেয়েকে বাবার কাছে রেখে মাস কয়েক ইন্ডিয়াতে গিয়ে ছিলেন।”
“ভেরি ইন্টারেস্টিং স্যার, আমি জানতাম না ওঁর সঙ্গে ইন্ডিয়ার এত যোগাযোগ ছিল,” একেনবাবু বললেন।
“মনে হয় না তেমন ছিল বলে,” ডাঃ দাস বললেন। “এর পরে তো আর কখনো যায়নি।”
