ম্যানহাটানের ম্যাডম্যান (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত

শেয়ার করুনঃ

 

(১৮)

 

শুক্রবার মে ২৭, ২০১১

 

সকালে অফিসে ঢুকতেই বেভ এসে হাজির। গত চারমাসে বেভের সঙ্গে আমার যা কথা হয়েছে গত এক সপ্তাহে তার থেকে বেশি হয়েছে।

 

“তোমার একটা চিঠি এসেছে,” বলে একটা চিঠি এগিয়ে দিল।

 

মনে হল এটা একটা ছুতো। আমার টেবিলের ওপর রেখে দিলেই চলত, আগে বরাবর তাই করেছে।

 

“চিঠিটা রেজিস্টার্ড চিঠি, আমি সই করে নিয়েছি, হোপ ইট ইজ ওকে উইথ ইউ।”

 

“নিশ্চয়।”

 

.

 

চিঠিটা ইন্ডিয়া থেকে এসেছে। একটু অবাকই হলাম। অফিসের ঠিকানায় আমায় কেউ চিঠি পাঠায় না, তার ওপর রেজিস্ট্রি করে পাঠানো। বেভের সামনেই চিঠিটা খুললাম। যাদবপুরের একটি ছেলে নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে মাস্টার্স করতে চায়। মার্কশিট, রেকমেন্ডেশন লেটার ইত্যাদি দিয়ে পাঠিয়েছে। যদি কোনও অ্যাসিস্টেন্টশিপের বন্দোবস্ত করে দিতে পারি। ছেলেটিকে চিনি না। চিনলেও এসে যেত না, এ ব্যাপারে আমার কোনও হাত নেই। উচিত ছিল অ্যাডমিশন অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করা। ইনফ্যাক্ট অবাকই হলাম, আজকের যুগে ইন্টারনেটে খোঁজখবর নিয়ে কেউ এরকম চিঠি পাঠাচ্ছে। তাও আবার আমার পুরোনো কলেজ যাদবপুরের ছাত্র। চিঠিটা যখন ট্র্যাশ ক্যানে ফেলতে যাচ্ছি, বেভ বলল, “লুকস লাইক সামওয়ান হ্যাঁস ওয়েস্টেড হিজ মানি।”

 

“ইউ আর রাইট।”

 

“স্ট্যাম্পটা আমি পেতে পারি?”

 

“তুমি স্ট্যাম্প জমাও?” আমার গলার স্বরে বিস্ময়টা চাপা রইল না। “মনে হচ্ছে তুমি অবাক হয়েছ?”

 

“তা একটু হয়েছি।”

 

“কেন জানতে পারি?”

 

এর উত্তরটা সত্যি করে বললে ভালো শোনাত না। স্ট্যাম্প যাদের জমাতে দেখেছি তাদের ক্যারেক্টারই আলাদা। বেভের মতো ইজি গোইং, ফান লাভিং, প্লে-ফুল নয়। এই অবস্থায় সবচেয়ে ভালো উত্তর কাঁধটা একটু ঝাঁকিয়ে বলা “আই ডোন্ট নো।”

 

“খামটা আমায় দেবে প্লিজ,” বেভ হাতটা এগিয়ে দিল। “স্ট্যাম্পটা দেখে লোভ হয়েছিল, তাই তোমার ডেস্কে রেখে যাইনি। কোথাও ফেলে দিলে আর পেতাম না।”

 

আমি খামটা ওর হাতে দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কতদিন ধরে তুমি স্ট্যাম্প জমাচ্ছ?”

 

“দশ বছর বয়স থেকে। আমার বাবা জমাত। বাবা মারা যাবার পর স্ট্যাম্পের অ্যালবামগুলো পাই। বাবার ইন্ডিয়ান স্ট্যাম্পের ভালো কালেকশন ছিল। নট দ্যাট হি ওয়াজ ইন্টারেস্টেড ইন ইন্ডিয়া, বাট হি ফেল ইন লাভ উইথ ইন্ডিয়ান স্ট্যাম্পস।”

 

আমি এ সুযোগটা ছাড়তে পারলাম না। বললাম, “তার মেয়ে তো বাবাকে টেক্কা দিয়েছে, শি হ্যাঁস ফলেন ইন লাভ উইথ অ্যান ইন্ডিয়ান ম্যান।”

 

“সো ট্রু।” ঝলমল করে হাসল বেভ।

 

আমার হঠাৎ মনে পড়ল সিন্ধ ডাক-এর কথা। জিজ্ঞেস করলাম, “সিন্ধ ডাক স্ট্যাম্পের নাম শুনেছ?”

 

“ইউ মিন সিন্ডে ডক।”

 

“না, ওটা আসলে সিন্ধ ডাক হবে।” প্রমথর জ্ঞানটা এই সুযোগে ঝেড়ে দিলাম।

 

“আমি এটা জানতাম না! থ্যাঙ্ক ইউ।”

 

“ওটা তো দামি স্ট্যাম্প, তাই না?”

 

“হ্যাঁ, শুনেছি ভালো কনডিশনে থাকলে বেশ কয়েক হাজার ডলার। ইট ইজ সো সারপ্রাইজিং তুমি এই স্ট্যাম্পের কথাটা তুললে। কিছুদিন আগে জর্জ এই স্ট্যাম্পের কথাটা বলছিল।”

 

“জর্জ কে?”

 

“ফিলাটেলিস্ট কর্নার-এর মালিক।“

 

“তুমি ওকে চেন?”

 

“হ্যাঁ, আমি মাঝে মাঝে ওর কাছ থেকে স্ট্যাম্প কিনি, তবে পাঁচ দশ ডলারের। ও প্রথম যখন দোকান খোলে বাবাই ছিল ওর ফার্স্ট কাস্টমার। কিন্তু জানো, দোকানটা ও বন্ধ করে দিচ্ছে।”

 

“কেন?”

 

“মেরি এখন আরথ্রাইটিস-এ একেবারে কাবু, দোকানে বেশি বসতে পারে না। জর্জের পক্ষে একা দোকান চালানো সম্ভব নয়।”

 

“মেরি কে?”

 

“ওর স্ত্রী।”

 

“ওর অন্য কোনও হেল্প নেই?”

 

“কেভিন কাজ করত, কিন্তু এখনও ওখানে আছে কিনা জানি না। জর্জ ওকে মাইনেপত্রও সময় মতো দিতে পারছিল না। এক কালে অনেকে স্ট্যাম্প জমাত, এখন কে জমায়? দু-পাঁচ ডলারের স্ট্যাম্প বিক্রি করে ম্যানহাটানে দোকান চালানো যায় না।”

 

“কিন্তু অনেক স্ট্যাম্প তো একশো হাজার ডলারেও বিক্রি হয়!”

 

“সেগুলো অকশন হাউস বিক্রি করে, এ ধরণের স্ট্যাম্পের দোকান থেকে কেউ কেনে । তাও জর্জ লাকি, ওর দুয়েকজন পয়সাওয়ালা কাস্টমার আছে। জর্জ ভালো স্ট্যাম্পের খবর পেলে ওদের দেয়। বিক্রি হলে তার থেকে কিছু কমিশন পায়।”

 

“তোমায় যখন সিন্ধ ডাক-এর কথা বলেছে, মনে হচ্ছে তুমিও জর্জের সেরকম একজন কাস্টমার।”

 

“ভেরি ফানি!” ওর ফোনটা বাজতে শুরু করায় বেভ চলে গেল।

 

.

 

আজ আবার একটা সেমিনার ছিল। সেটা শেষ হবার পর গেস্ট স্পিকারকে নিয়ে রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ খেতে গেলাম। এরকম একটা অ্যারোগেন্ট লোক বেশি দেখিনি। নিজেকে কী ভাবেন কে জানে! বাকি সবার কাজ অতি বাজে, উনিই একমাত্র বিজ্ঞানকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন! ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সেটাই আমাকে বারবার শোনালেন। আমাদের ডিপার্টমেন্ট হেড নিশ্চয় লোকটাকে হাড়ে হাড়ে চেনেন, তাই নিজে না এসে আমার মতো চুনোপুঁটিকে লাঞ্চে পাঠিয়েছেন। সেই কারণেই মনে হল গেস্ট স্পিকার আরও চটেছেন। আমি হ্যাঁ হুঁ করে যাচ্ছিলাম, কথা বাড়িয়ে কোনও লাভ নেই। লাঞ্চের পরে ডিপার্টমেন্ট অফিসে ওঁকে পৌঁছে দিলেই আমার ছুটি। ভদ্রলোকটির একটা গুণ, খুব তাড়াতাড়ি খান। এত বকবক করেও আমার আগেই খাওয়া শেষ। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কফি বা ডেসার্ট খাবেন কিনা। সংক্ষিপ্ত উত্তর, না।

 

লাকিলি সেই সময়ে দেবদূতের মতো হাজির হলেন আমাদের ডিন। বুঝলাম ওঁরা দু’জন পূর্ব-পরিচিত। ডিন স্পিকারমশাইকে বললেন লাঞ্চের পরে ওঁর অফিসে আসতে। সুযোগটা ছাড়লাম না। বললাম, “আমার জন্যে অপেক্ষা করবেন না। প্লিজ, ওঁর সঙ্গে যান।”

 

একলা বসে খাওয়া শেষ করছি। পাশে চেয়ার টানার শব্দ। প্রমথ আর ফ্র্যন্সিস্কা।

 

“তোরা কোথায় ছিলি?”

 

“ওই টেবিলটাতে, প্রমথ আঙুল দিয়ে দূরের একটা টেবিল দেখাল।

 

“খেয়াল করিনি তো!”

 

“খেয়াল হবে কেন, ইউনিভার্সিটির পয়সায় লাঞ্চ খাচ্ছিস!”

 

“এর থেকে নিজের পয়সায় লাঞ্চ খাওয়া ভালো। হোয়াট এ জার্ক!”

 

“সেটা তোমার মুখ দেখেই আমরা বুঝেছি,” ফ্রান্সিস্কা হাসতে হাসতে বলল।

 

“নে, আমাদের কফি আর আইসক্রিম খাওয়া, প্রমথ হুকুম দিল।

 

“আমি খাওয়াব কেন, তোরা নিজে খা।”

 

“তোকে তো খাওয়াতে বলছি না, তোর ডিপার্টমেন্টের পয়সায় খাওয়াবি। লোকটাতো চা-কফি খেল না। ওর বদলে আমাদের খাইয়ে দে, কে দেখতে যাচ্ছে?”

 

ফ্রান্সিস্কা সরল মনের মেয়ে, প্রমথর এইসব ফাজলামি একেবারেই পছন্দ করে না। “ডোন্ট বি সিলি, আমি তোমাদের খাওয়াচ্ছি।”

 

“না, সেটা তো তুমি সব সময়েই খাওয়াও। আজ বাপি খাওয়াক। একেনবাবুর সঙ্গে থেকে থেকে বাপিও কৃপণ হতে শুরু করেছে।”

 

“ডোন্ট বি সো মিন, ডিটেকটিভ আজ সকালে আমায় কফি খাইয়েছে।” ফ্রান্সিস্কা একেনবাবুকে পছন্দ করে, ‘মাই ডিয়ার ডিটেকটিভ’ বলে সম্বোধন করে।

 

“সে কি, আমায় তো বলনি?”

 

“কারণ ডিটেকটিভ বলেছে তোমাকে না বলতে।”

 

“কেন?”

 

“সেটা ডিটেকটিভকে জিজ্ঞেস কোরো।”

 

“আই সি, সেটা জানলে আমাদেরও খাওয়াতে হবে। দ্যাট মেকস সেন্স।”

 

“নো, নট দ্যাট। হি ওয়াজ ইন এ সিক্রেট মিশন।”

 

“কী সিক্রেট মিশন?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

 

“সেটা বললে সিক্রেসির আর কী থাকে?”

 

“তার মানে তুমি জানো, কিন্তু আমরা জানি না।”

 

“তাই তো দাঁড়াচ্ছে।”

 

“আজ থেকে হি উইল হ্যাভ টু কুক বাই হিমসেলফ। আমি অন্তত বেঁধে খাওয়াব না। তুই খাওয়াবি?” আমায় জিজ্ঞেস করল প্রমথ।

 

“আমি নিজেই ভালো রাঁধতে জানি না।”

 

“ইউ গাইজ আর রিয়েলি মিন।”

 

“আচ্ছা, প্রমথকে না হয় নাই বললে,” আমি বললাম। “আমাকে একটা হিন্ট দাও।”

 

ফ্র্যান্সিস্কা একটু চুপ করে থেকে বলল, “ঠিক আছে, দিচ্ছি। খুব সম্ভব, আজ বাড়ি গিয়ে দেখতে পাবে।”

 

“এটা একটা হিন্ট হল?” প্রমথ বিরক্ত হয়ে বলল, “কী খুঁজব বাড়িতে?”

 

এমন সময় একটা পরিচিত স্বর, একেনবাবু।

 

“আপনি এখানে?” আমি বেশ অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করলাম। একেনবাবু রেস্টুরেন্ট অ্যাভয়েড করেন, বড্ড বেশি খরচা হয় বলে। বাইরে খেতে হলে ইউনিভার্সিটি ক্যাফেটেরিয়ায় কিংবা পিজ্জা বা হ্যামবার্গার জয়েন্টে লাঞ্চ সারেন।

 

“ম্যাডাম বলেছিলেন, ওঁরা এখানে লাঞ্চ খাবেন আজ। আপনি যে থাকবেন জানতাম না।”

 

‘আমি এসেছিলাম বাধ্য হয়ে। কিন্তু ম্যাডামের সঙ্গে আপনার দরকারটা কী?”

 

একেনবাবু উত্তর দেবার আগেই ফ্র্যান্সিস্কা সস্নেহে একেনবাবুকে জিজ্ঞেস করল, “তোমার কাজ হল ডিটেকটিভ?”

 

“হল না মানে? সেইজন্যেই তো সোজা এখানে চলে এলাম! এই দেখুন,” বলে আঙুল ঘুরিয়ে ফ্রান্সিস্কাকে একটা আঙটি দেখালেন।”

 

“এটা কি?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

 

“এটার কথাই আমি বলছিলাম,” ফ্যান্সিস্কা বলল। “ওদেরও দেখিয়ে দাও।”

 

“এই যে স্যার, এই সেন্টারে হল প্রমথবাবুর আর্টিফিশিয়াল নীলা, আর পাশে সব সস্তা পাথর। ম্যাডামের এক বন্ধু বানিয়ে দিয়েছেন, মাত্র দশ ডলারে।”

 

ফ্র্যান্সিস্কা বলল, “প্রমথ ডিটেকটিভকে বলেছে ব্যাগে ওই পাথরটাকে নিয়ে ঘুরতে। হোয়াট এ সিলি অ্যাডভাইস! তাই ডিটেকটিভকে সকালবেলা আমার এক বন্ধুর কাছে নিয়ে গিয়েছিলাম। ও কস্টিউম জুয়েলরি বানায়। তারপর একেনবাবুকে বলল, “ইট লুকস ভেরি নাইস, ডিটেকটিভ।”

 

একেনবাবু মাথা একেবারে নুইয়ে গেল। “বিকজ অফ ইউ ম্যাডাম– অল বিকজ অফ

 

“নেমক হারাম, মাইরি,” প্রমথ আমায় বলল। “মালটা দিলাম আমি, আরেকজন পাচ্ছে বাহবা।”

 

“ইট ইজ বিকজ অফ ইওর সিলি অ্যাডভাইস,” বিজয়িনীর মতো মুখ করে ফ্রান্সিস্কা বলল।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *