ম্যানহাটানের ম্যাডম্যান (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত
(১৭)
বৃহস্পতিবার মে ২৬, ২০১১
মিশেল বেসিমারকে দেখলে আশি বলে মনে হয় না। সোজা হয়ে হাঁটাচলা করেন। মুখের চামড়া এখনো কোঁচকায়নি। চোখটা হালকা নীল, একটু ঘোলাটে। কিন্তু এই বয়সেও মুখটা আকর্ষণীয়। বেভের সঙ্গে কিছুটা সাদৃশ্য আছে, হতে পারে আমার কল্পনা। অ্যাপার্টমেন্টটা ছোটো কিন্তু অ্যাসিস্টেড লিভিং ফেসিলিটির মধ্যে নয়। নিজের ঘরদোর মিশেল নিজেই সামলান। রান্নাবান্না দোকানপাট সব নিজে করেন। আমরা পরিচয় দিতেই সাদরে আমাদের অভ্যর্থনা করে বসালেন।
.
বাইরের ঘরটা বেশ বড়, লিভিং কাম ডাইনিং। ডাইনিং এরিয়াতে ছ’জন বসার মতো খাবার টেবিল বেশ এঁটে গেছে। টেবিল পার হলেই কিচেন। মধ্যে কোনও দেয়াল বা দরজা নেই। লিভিং এরিয়াতে সোফাসেট, কফি টেবিল ছাড়া আসবাব বলতে একটা বড় বইয়ের আলমারি। দেয়াল জুড়ে বেভের নানান বয়সের কয়েকটা ছবি। ব্যাস।
আমরা বসার পর বললেন, “বেভ তোমাদের কথা বলে গেছে। তোমরা অশোকের মার্ডার নিয়ে ইনভেস্টিগেশন করছ, তাই না?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ, আমিই শুরু করলাম। “একেনবাবু অশোক দুবে সম্পর্কে দুয়েকটা জিনিস জানতে চান। সেটা জেনেই আমরা চলে যাব। বেশিক্ষণ সময় নেব না।”
“যত সময় লাগে নাও। আমার কোনও তাড়া নেই।” তারপর আমাদের আপত্তি সত্বেও জোর করে এক প্লেট কুকি টেবিলে রেখে কফি বানাতে শুরু করলেন।
একেনবাবু উঠে ওঁর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “মিস্টার দুবেকে ম্যাডাম, আপনি কতদিন চিনতেন?”
মিশেল বললেন, “আমি বুড়ি ঠিকই, কিন্তু অতটা রেস্পেক্ট না দেখালেও চলবে। আমাকে মিশেল বলেই ডেকো।”
“ইয়েস, ম্যাডাম।” ‘ইয়েস, মিশেল,” বৃদ্ধা একেনবাবুকে শোধরাবার চেষ্টা করলেন। “সরি, ম্যাডাম।”
প্রমথ একেনবাবুকে উদ্ধার করল। “ম্যাডাম’ আর ‘স্যার’ বলা একেনবাবুর হ্যাবিট। বহু চেষ্টা করেও আমরা শোধরাতে পারিনি।”
“তাই নাকি?” মিশেল এবার একেনবাবুকে প্রশ্ন করলেন, “তুমি বিয়ে করেছ?”
“ইয়েস, ম্যাডাম।”
“বউকেও ম্যাডাম বল?” ঘোলা ঘোলা চোখেও দুষ্টুমি খেলল।
একেনবাবু লজ্জা পেয়ে বললেন, “কী যে বলেন ম্যাডাম!”
“ঠিক আছে, ম্যাডামই থাক। কী প্রশ্ন জানি করলে?”
“জিজ্ঞেস করছিলাম, আশোক দুবেকে আপনি কতদিন চিনতেন?”
“প্রায় দু’বছর।”
“কী ভাবে আলাপ হয়েছিল আপনার সঙ্গে?”
“দাঁড়াও, দাঁড়াও, আগে কফিটা বানাই। তারপর অশোক সম্পর্কে যা জানি, তোমাদের বলি। তারপরেও যদি প্রশ্ন থাকে, তাহলে কোরো, কেমন?”
“ইয়েস, ম্যাডাম।” বলে একেনবাবু সোফায় এসে বসলেন।
কফি খেতে খেতে মিশেল বেসিমার অশোকের কথা শুরু করলেন। দীর্ঘ কাহিনি আমি একটু সংক্ষেপ করছি।
মিশেল ব্লুমফিল্ড অ্যাভিনিউয়ে একটা স্যুপ কিচেন চালাতেন। মাইনে দিয়ে লোক রাখার সামর্থ ওঁর ছিল না, তাই মাঝেমাঝেই পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতেন ভলেন্টিয়ারের খোঁজে। সেই বিজ্ঞাপন দেখেই বছর দুই আগে অশোক আসে। সপ্তাহে একদিন করে অশোক কিচেনে কাজ করত। অশোকের যে হোটেল ম্যানেজমেন্টের ট্রেনিং ছিল, সেটা উনি প্রথমে জানতেন না। জানার পর অশোকের বিদ্যে-বুদ্ধি খুব কাজে লাগলো। মেনু তৈরি করা থেকে রান্নাবান্না অর্গানাইজ করা, খাবার সার্ভ করা, সব ব্যাপারেই অশোক ওঁকে সাহায্য করা শুরু করল। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই এমন অবস্থা হল, অশোককে ছাড়া মিশেলের চলত না। মাস ছয়েক আগে মিশেল হঠাৎ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। বেশ কয়েকদিন হাসপাতালে ছিলেন। তখন প্রতিদিন অশোক ওঁকে দেখতে আসত। হাসপাতাল থেকে ফিরে স্যুপ কিচেনের ডেইলি ডিউটি থেকে মিশেল ছুটি নেন, শরীর আর দিচ্ছিল না। কিন্তু অশোকের সঙ্গে ওঁর যোগাযোগটা থেকে যায়। মাঝে মাঝেই অশোক মিশেলের খোঁজখবর নিতে আসত। অনেক সময়ে মিশেল অশোককে খ্যাপাতেন। বলতেন, এই বুড়িকে দেখতে না এসে তোমার বয়সি কোনও মেয়েকে দেখতে যাও না। অশোক শুনে খুব হাসত। মাঝে মাঝে মিশেলের ইচ্ছে হত বেভের সঙ্গে অশোকের আলাপ করিয়ে দিতে। ভাবতেন অশোকের মতো ছেলের সঙ্গে বেভের বিয়ে হলে বেশ হয়। যাই হোক, এরমধ্যে একটা মেয়ের সঙ্গে অশোকের ভাব হল। ভারতীয় মেয়ে। অশোক তার ছবিও মিশেলকে দেখিয়েছিল, ভারি মিষ্টি চেহারা। মেয়েটির মা নিউ ইয়র্কে মেয়ের কাছে এসেছিলেন। হয়তো মেয়েটিই মাকে আনিয়েছিল অশোকের সঙ্গে পরিচয় করাতে। তারপর প্রায় সপ্তাহ কয়েক অশোকের সঙ্গে মিশেলের দেখা হয়নি। মিশেল ভেবেছিলেন নিশ্চয় মেয়েটি আর মেয়েটির মাকে নিয়ে অশোক কোথাও বেড়াতে গেছে। দুয়েকবার ফোনও করেছিলেন অশোককে, কিন্তু ধরতে পারেননি। এরপর যেদিন অশোক আসে, ওর চেহারা দেখে মিশেল বোঝেন একটা গুরুতর কিছু ঘটেছে। কী হয়েছে জিজ্ঞেস করাতে অশোক বলল, মেয়েটার সঙ্গে অশোকের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। মিশেল প্রথমে ভেবেছিলেন সাময়িক কোনও ভুল বোঝাবুঝি। পরে বুঝলেন, এই ছাড়াছাড়ির মূলে অশোক নিজেই। মেয়েটিকে বিয়ে করা অশোকের পক্ষে অসম্ভব। কারণ মেয়েটির ফ্যামিলি গোঁড়া হিন্দু, এখনও জাতপাত নিয়ে মাথা ঘামায়। অশোকের ওসবে বিশ্বাস নেই। মিশেল তখন জিজ্ঞেস করেন, ফ্যামিলি না হয় গোঁড়া হিন্দু, মেয়েটাও কি সেরকম? উত্তরে বুঝলেন, মুখে বলে না। কিন্তু অশোকের মানসিকতার সঙ্গে ওদের ফ্যামিলির মানসিকতার এত তফাৎ, বিয়ে করলে পরে মেয়েটা পস্তাবে। তাই অশোক নিজেই সরে এসেছে।
“আই সি। আচ্ছা ম্যাডাম, অশোকবাবু কি টাকাকড়ির অসুবিধা নিয়ে আপনাকে কিছু বলেছিলেন?”
“না, সেরকম তো কিছু শুনিনি। ও নিজে খুব সাধারণ ভাবে থাকত। তবে সেটা টাকা পয়সার অভাবের জন্যে নয়। শুনেছি ও দেশে গরীবদের জন্যে টাকা পাঠাত।”
“কিন্তু ওঁর হাজার দশেক ডলারের দরকার পড়েছিল, এমন কোনও কথা আপনি শোনেননি?”
“শুনেছি। কিন্তু সেটা ওর নিজের জন্যে নয়, কোনও একটা প্রজেক্টের জন্যে। আমি ওর প্রজেক্টে দু’শো ডলার দিতে চেয়েছিলাম, ও নিতে রাজি হয়নি।”
“শেষ পর্যন্ত কি উনি টাকাটা তুলতে পেরেছিলেন?”
“সেটা বলতে পারব না।”
.
ফেরার পথে আমি বললাম, “এই কাউ-বেল্টের লোকদের মধ্যে জাত-পাত নিয়ে এখনো যে এত সমস্যা, কল্পনা করা যায় না!”
“শুধু কাউ-বেল্টের নিন্দা করছিস কেন, বাঙালিরাও কিছু কম যায় না। পাত্র-পাত্রীর বিজ্ঞাপনগুলো দেখ না, বামুনের মেয়ের জন্যে কে শিডিউল্ড কাস্ট ছেলের খোঁজ করছে?” প্রমথ প্রতিবাদ করল।
“ওরকম ভাবে বিজ্ঞাপন কেন দেবে? কিন্তু কাস্ট নো বেরিয়ার’ অনেক জায়গাতেই লেখা থাকে।”
“তুই সেখানে অ্যাপ্লাই কর শিডিউল্ড কাস্ট পাত্র হিসেবে, দেখি কী রকম উত্তর পাস?”
“ডোন্ট বি অ্যান ইডিয়ট, আমার প্রশ্ন এখানে উঠছে কেন?”
“তার কারণ আমাদের মধ্যে একেনবাবুর বিয়ে হয়ে গেছে, আমিও হয়তো করে ফেলব। তোরই কোনও গার্লফ্রেন্ড নেই, পাত্র-পাত্রীর অ্যাডের পাতাই তোর ভরসা।”
“আমি কিন্তু কনফিউসড স্যার,” একেনবাবু বললেন, “দুবো তো ব্রাহ্মণ বলেই জানতাম!”
“আমার কাছে তার উত্তর পাবেন না,” প্রমথ বলে উঠল, “আমি জাত-ফাত মানি না। তাও গাঙ্গুলি, ব্যানার্জি হলে বলতে পারতাম। ওটা তো খোট্টা পদবি।”
“তুই অত্যন্ত ডিস-রেস্পেক্টফুল।”
“ও, কাউ-বেল্ট বললে রেস্পেক্টফুলি বলা হয়, আর খোট্টা বললেই দোষ।”
“শ্রীমালী আমি জানি ব্রাহ্মণ,” একেনবাবু আমাদের কথা কাটাকাটি পুরো উপেক্ষা করে মন্তব্য করলেন।
প্রমথ বা আমার কারোরই এতে ইন্টারেস্ট নেই। চুপ করে রইলাম।
.
বাড়িতে ফিরে একেনবাবু দেখলাম কম্পিউটার খুলে বসেছেন।
প্রমথ বলল, “আজ আর রান্না করতে ইচ্ছে করছে না। পিৎজা অর্ডার করি, কি বলিস?”
“বেশ তো, কর।”
প্রমথ ফোন করে একটা এক্সট্রা লার্জ পিজা অর্ডার করল, হাফ পেপরোনি, হাফ মাশরুম।
“তুই তো মাশরুম হেট করিস,” আমি বললাম।
“করি, কিন্তু একেনবাবুর তো ওটা না হলে চলে না।”
এই হল প্রমথ। একদিকে বাঁকা বাঁকা কথা বলবে, গালাগাল দিয়ে ভূত ভাগাবে, আবার খেয়াল রাখবে আমাদের কার কী পছন্দ বা অপছন্দ!
.
একটু বাদেই হাসি হাসি মুখে একেনবাবু বললেন, “ঠিকই বলেছিলাম স্যার। দুবে হল দ্বিবেদীর আরেকটা নাম। এঁরা হলেন সব সরফুপারের ব্রাহ্মণ, আদিবাস ছিল সরযূনদীর পাশে। শ্রীমালীরাও ব্রাহ্মণ তবে রাজস্থানের।”
“শুনে চমৎকৃত হলাম,” প্রমথ বলল। “কিন্তু এই জ্ঞানের ভাণ্ডটা আমাদের বিতরণ করে আপনার লাভ?”
“মানে আমি বলতে যাচ্ছি স্যার, শুধু ব্রাহ্মণ হলেই হয় না, বিয়ের ব্যাপারে আরও নিশ্চয় ভাগ-বিচার আছে।”
আমি বললাম, “শুনেছি সাউথ ইন্ডিয়ায় চোলিয়া ব্রাহ্মণদের অন্য ব্রাহ্মণরা নিচু চোখে দেখে। এছাড়া বিয়েতে গণ, গোত্র, কুষ্ঠী-ঠিকুজি কত কিছু দেখা হয়।”
“তোদের এই স্টুপিড কথাবার্তায় আমি সিক ফিল করছি,” প্রমথ বিরক্ত হয়ে বলল, “কোন যুগে পড়ে আছিস তোরা?”
“শ্চটছিস কেন, আমরা তো কেউ এসব মানি না। শুধু যারা মানে, তাদের চিন্তাধারাটা ফলো করার চেষ্টা করছি।”
“দে আর নট ডিসার্ভড টু বি ফলোড। আই হ্যাভ নো ডাউট, এইজন্যেই অশোক এসব ফ্যামিলির সঙ্গে জড়াতে চায়নি। এই পরিবারে বিয়ে করলে নিশ্চিত ডিভোর্স হত।”
