ম্যানহাটানের ম্যাডম্যান (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত
(১৫)
ক্যাথি ক্যাসেলের অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং খুঁজে পেতে অসুবিধা হল না। ওয়েবার অ্যাভেনিউ যেখানে শেষ হয়েছে তার একটু আগে বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের থাকার জন্যে বিশাল অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং। এ ধরণের জায়গায় আগে কখনো আসিনি। সতীশ কুমার একেনবাবুকে বলেছিলেন উনি লবিতে আমাদের জন্যে অপেক্ষা করবেন। মিসেস ক্যাসেলের কথা বলতে একটু অসুবিধা হয়। তাই সতীশকেও উনি আসতে বলেছেন। কিন্তু আমরা যখন পৌঁছলাম সতীশ তখনও এসে পৌঁছোননি। তাই অপেক্ষাটা আমরাই করলাম। লবিতে যে রিসেপশনিস্টটি বসেছিল, বেশ হাসিখুশি মেয়ে। তার সঙ্গে কথা বলে গোল্ডেন লজ সম্পর্কে অনেক কিছু জানলাম। এখানকার বাসিন্দাদের কাউকে রান্না করতে হয় না, ভাড়ার মধ্যে থাকা খাওয়া দুটোই থাকে। একটা বড় রেস্টুরেন্ট আছে, প্রতিদিন সেখানে ব্রেকফাস্ট লাঞ্চ আর ডিনার সার্ভ করা হয়। হাউজ কিপিং-এর লোক আছে। বাথরুম পরিষ্কার করা, ঘর ভ্যাকুয়াম করা, বিছানা তোলা, চাদর পালটানো, এমন কি লন্ড্রি করাও তাদের দায়িত্ব। সপ্তাহে দু’দিন বুড়োবুড়িদের গাড়ি করে দোকানে নিয়ে যাওয়া তো আছেই, এছাড়া বিল্ডিং-এর মধ্যেই বিনোদনের নানান বন্দোবস্ত লাইব্রেরি, এক্সারসাইজ করার জায়গা, পুল টেবিল, সুইমিং পুল, আর্টস এন্ড ক্র্যাফটস রুম, ইত্যাদি আছে। এখানে থাকতে কত লাগে সেটা অবশ্য মেয়েটি ঠিক জানে না। এইসব কথাবার্তার মধ্যেই সতীশ কুমার এসে গেলেন। সতীশ কুমার এখানে আগেও কয়েকবার এসেছেন। মেয়েটি দেখলাম ওঁকে চেনে।
.
মিসেস ক্যাসেল থাকেন বারোতলায় এক-বেডরুমের একটা অ্যাপার্টমেন্টে। ঘরের দরজায় টোকা দিতেই ভেতর থেকে অস্পষ্ট গলায় কেউ বললেন, “আসুন, দরজা খোলা।”
বসার ঘরটা আমাদের বসার ঘরের সাইজের মতোই হবে। একটা বড় জানলা। গদি অলা হালকা উইকার সোফাসেট আর কফি টেবিল। দেয়ালে লাগানো টিভি। তার নীচে একটা রাইটিং ডেস্ক ও বসার চেয়ার, পাশে মাঝারি সাইজের বুক-শেলফ। ফার্নিচারগুলো নতুন, বেশ সুন্দর করে সাজানো।
মিসেস ক্যাসেল একজন শীর্ণকায়া বৃদ্ধা। ফুট রেস্টে পা তুলে সোফায় বসে আছেন। সোফার পাশে একটা ওয়াকার। হাতে বই ধরা, কিন্তু দুটো হাতই থরথর করে কাঁপছে। মুখ-চোখ দেখে বোঝা যায় ভদ্রমহিলা বেশ অসুস্থ।
মিসেস ক্যাসেলের কথাগুলো বোঝা সত্যিই কঠিন। সতীশ থাকাতে সুবিধা হল। মাঝেমাঝেই ওঁর সাহায্য লাগছিল কথাবার্তার মর্মোদ্ধার করতে। যেটুকু বুঝলাম সেটা হল, মিসেস ক্যাসেল মাত্র ছ’মাস হল এখানে এসেছেন। আগে থাকতেন নিজের বাড়িতে, নিউ জার্সিতে। ছেলেও সেখানে থাকত। বছর দেড়েক আগে মিসেস ক্যাসেল খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন। ঠিক কী অসুখ, সেটা অবশ্য স্পষ্ট করে জানতে পারলাম না। দুরারোগ্য এটুকু বুঝলাম। সেই অসুখের জেরে হাসপাতাল ও নার্সিং কেয়ারে বহুদিন থাকতে হয়েছিল। তার আকাশ ছোঁয়া বিল মেটাতে ওঁকে বাড়িটা বিক্রি করতে হয়। সঞ্চয় বলতে এখন কিছুই নেই। মাসে মাসে যা পান, সেটা হল সোশাল সিকিউরিটির টাকা। তাতে এখানে থাকা যায় না। বব ক্যাসেলই এখানে থাকার টাকাটা দিচ্ছিলেন। এখন সে ছেলে আর নেই। ছেলের মৃত্যুতে মায়ের তীব্র বেদনা তো আছেই, তার ওপর যোগ হয়েছে আর্থিক চিন্তা। এ ব্যাপারে একেনবাবু ঠিক কী করতে পারেন, সেটা আমার মাথায় ঢুকছিল না। সত্যিকারের সাহায্য যিনি করতে পারেন, তিনি হলেন বিপাশা মিত্র। একজন বৃদ্ধাকে ভরণপোষণ করাটা ওঁর কাছে কিছুই নয়। বিশেষ করে সেই বৃদ্ধা যখন ওঁর সেক্রেটারির মা। আমি সতীশ কুমারকে একটু নীচু স্বরেই জিজ্ঞেস করলাম, “বিপাশা মিত্র কি ওঁর সমস্যার কথা জানেন?”
প্রশ্নটা মিসেস ক্যাসেলের কান এড়াল না। বললেন, “আই ডোন্ট ওয়ান্ট চ্যারিটি।”
একেনবাবু মিসেস ক্যাসেলকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার ছেলের কোনও লাইফ ইন্সিওরেন্স ছিল না ম্যাডাম?”
“ছিল আর সেটাই হল প্রব্লেম।” উত্তর দিয়ে বৃদ্ধা সতীশকে বললেন, ব্যাপারটা আমাদের বুঝিয়ে বলতে। তারপর ওয়াকার ধরে টুকটুক করে হেঁটে বোধহয় বাথরুমে গেলেন।
সতীশ বললেন, “বব তিনশো হাজার ডলারের একটা লাইফ ইন্সিওরেন্স করেছিল বছর দুই আগে। ক্যাথি ছিল নমিনি। কিন্তু সেই টাকা ইন্সিওরেন্স কোম্পানি দিচ্ছে না।”
“কেন দিচ্ছে না স্যার?”
“কারণ ইন্সিওরেন্সটা করা হয়েছিল ২০০৯ সালের পয়লা জুলাই। ইন্সিওরেন্সের একটা ক্লজ ছিল, যেটা প্রায় সব ইন্সিওরেন্সেই থাকে। ক্লজটা হল যার লাইফ ইন্সিওরেন্স সে যদি দু’বছরের মধ্যে আত্মহত্যা করে, তাহলে ইন্সিওরেন্স কোম্পানি কোনও টাকা দেবে না। বব দু’বছর পার হবার আগেই মারা গেছে। পুলিশ বলছে সম্ভবত সুইসাইড। সুতরাং ইন্সিওরেন্স কোম্পানি ন্যায্য অজুহাত আছে টাকা না দেবার।”
“আই সি স্যার। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না, আমি কী ভাবে ম্যাডামকে সাহায্য করতে পারি?
“আমি জানি ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্ট আপনার বিশেষ বন্ধু, সতীশ বললেন। “এই মহিলার কথা বিবেচনা করে তিনি যদি এটাকে হোমিসাইড বলে ইনভেস্টিগেট করেন। খুনি না হয় নাই ধরা পড়ল, কিন্তু সেক্ষেত্রে ক্যাথির সমস্যার সমাধান হয়।”
“সেটা আমি কী করে অনুরোধ করব স্যার, আর করলেও ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্ট এরকম অন্যায় অনুরোধ রাখবেন কেন?”
সতীশ কথাটা শুনে চুপ করে গেলেন।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “পুলিশ এটা সুইসাইড বলে ভাবছে কেন জানেন?”
“আমি যতটুকু জেনেছি একটা ফোনের মেসেজ থেকে।”
“কী মেসেজ স্যার?”
“ক্যাথি যখন নীচে ডিনার খেতে গিয়েছিলেন, তখন বব এখানে ফোন করে। মেসেজটা ছিল ‘আমাকে পাবে না, তোমার সব সমস্যার সমাধান করতে যাচ্ছি।”
“দ্যাটস লিটল স্ট্রেঞ্জ স্যার।”
“পুলিশ মনে করছে, এটাই ববের সুইসাইড মেসেজ। ইন্সিওরেন্সের টাকা ছাড়া কী করে সব সমস্যার সমাধান হয়? বব বোধহয় ভুলে গিয়েছিল ইন্সিওরেন্সের দু’বছরের ক্লজ এর কথা।”
“আই সি। আচ্ছা এখানে থাকা কি খুব খরচার ব্যাপার?”
“মাসে সাড়ে তিন হাজার ডলার।”
“সেটা কি স্যার মিস্টার ক্যাসেলের পক্ষে দেওয়া কঠিন ছিল?”
“নিশ্চয় কিছুটা, কিন্তু না দিতে পারার মতো নয়। মুশকিল হল এর পরেও চিকিৎসা সংক্রান্ত আরও অনেক খরচা আছে, যা ববের পক্ষে দেওয়া সম্ভব হত না।”
“এদেশে তো সরকারের অনেক স্কিম আছে মেডিকেইড না কী সব?” আমি বললাম।
“তাতে এরকম জায়গায় থাকতে পারতেন না। মা কষ্ট করে থাকবে, সেটা ববের পক্ষে নেওয়াটা কঠিন হত। মাকে ভীষণ ভালোবাসত বব। বাইরে প্রকাশ করত না, কিন্তু এ নিয়ে ও খুবই দুশ্চিন্তায় ভুগছিল। আর কেউ না জানলেও আমি জানতাম।”
“আমি একটু কনফিউসড স্যার,” একেনবাবু বললেন, “কেন মিস্টার ক্যাসেল বললেন, আমাকে পাবে না।”
“ক্যাথি প্রত্যেক দিন ডিনার খেয়ে নিজের ঘরে এসে ববকে ফোন করত। সেইজন্যেই নিশ্চয়। যাই হোক, আমি ভেবেছিলাম আপনি সাহায্য করতে পারবেন। কিন্তু মনে হচ্ছে। পারবেন না। দেখি যদি বিপাশাকে বলে অন্যভাবে কিছু করতে পারি। মুশকিল হল ক্যাথি ইজ ভেরি অ্যাডামেন্ট অ্যাবাউট অ্যাকসেপ্টিং চ্যারিটি।”
“আই অ্যাম রিয়েলি সরি স্যার।”
“না, সরি হবার কি আছে। আসলে ক্যাথির দৃঢ় বিশ্বাস বব আত্মহত্যা করেনি। তাই আপনার কথা মনে হয়েছিল। আপনি হয়তো পুলিশকে অন্যভাবে চিন্তা করতে সাহায্য করবেন। আপনি বলুন, পুলিশ কী করে শিওর হতে পারে এই একটা টেলিফোন মেসেজ থেকে যে বব আত্মহত্যা করেছে!”
“মিস্টার ক্যাসেলের কোনও শত্রু আছে বলে আপনি জানেন স্যার, যিনি ওঁকে খুন করতে পারেন?”
“মনে হয় না, হি লিভড এ ক্লিন লাইফ।” তারপর একটু থেমে বললেন, “যদ্দুর আমি জানি।”
“কতদিন আপনি চিনতেন স্যার মিস্টার ক্যাসেলকে?”
“প্রায় আট বছর।”
.
মিসেস ক্যাসেল আস্তে আস্তে ফিরে এসে সোফায় এসে বসলেন। একেনবাবু উঠে দাঁড়ালেন।
“ম্যাডাম, আপনার ছেলের মৃত্যুর ব্যাপারে খোঁজখবর করব এই কথাটা দিচ্ছি। তার বেশি কিছু বলতে পারব না।”
মিসেস ক্যাসেল ঘোলাটে চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন একেনবাবুর দিকে। তারপর বললেন, “থ্যাঙ্ক ইউ, আপনাকে কত দিতে হবে?”
“এই খোঁজখবরের জন্যে কিছু দিতে হবে না ম্যাডাম। আপনার ছেলের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়েছিল। খুব ভালো লোক ছিলেন। উই আর ট্রলি স্যাড ম্যাডাম।”
“আওয়ার কন্ডোলেন্সেস,” আমি বললাম।
সতীশ কুমারও উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, “চলুন আপনাদের এগিয়ে দিয়ে আসি।”
যখন আমরা নীচে নামছি, একেনবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “আমি ম্যাডামের ওখানে এগুলো আলোচনা করতে চাইনি, কিন্তু যেটুকু জানি মিস্টার ক্যাসেল একটা হাইরাইজ বিল্ডিং থেকে নীচে পড়ে গিয়েছিলেন।”
“হ্যাঁ, আমাদের কোম্পানিরই একটা বিল্ডিং। উপরের তলাগুলোতে রিনোভেশন চলছে। বব মাঝে মাঝে ওখানে দেখভাল করার জন্যে যেত।”
“রবিবারও ওখানে কাজ হত স্যার?”
“না, তবে রবিবার গিয়ে কাজকর্ম কী রকম এগিয়েছে দেখার সুবিধা হত। বিপাশা অনেক সময় যেত, আমিও এক আধবার ববের সঙ্গে গিয়েছি।”
“রবিবার ওখানে কারা থাকত?”
“কেউই না। যে কেউ ওখানে ঢুকতে পারে না। সিঁড়ি তালা-বন্ধ থাকে। স্পেশাল চাবি ব্যবহার করে লিফটে ওই তলাগুলোতে পৌঁছনো যায়।”
“চাবিগুলো কার জিম্মায় থাকত স্যার?”
“বব আর বিপাশার কাছে।”
“কনস্ট্রাকশন কোম্পানির লোকরা ওখানে যেত কী করে?”
“সার্ভিস এলিভেটর ব্যবহার করত। এলিভেটরগুলো রবিবার লন্ড থাকত।”
“বুঝলাম। আচ্ছা স্যার, অশোকবাবু আর মিস্টার ক্যাসেল বেশ বন্ধু ছিলেন তাই না?”
“হ্যাঁ, ওর মৃত্যুও ববকে বেশ অ্যাফেক্ট করেছিল। ইন ফ্যাক্ট, অশোক মারা যাবার পরের দিন সকালে পুলিশ এসে যখন ওকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ও প্রায় হতবাক হয়ে গিয়েছিল।”
“আপনাকে পুলিশ কোনও প্রশ্ন করেছিল?”
“প্রথমে করেনি। শুধু বব আর বিপাশাকে করেছিল। অশোকের সঙ্গেই ওদের যোগাযোগ ছিল বেশি।”
“তাহলে আপনাকে কেন করল স্যার?”
“পুলিশ জানতে চাইছিল অশোক যেদিন মারা যায় সেদিন রাতে বব আমার সঙ্গে কতক্ষণ ছিল।”
“কতক্ষণ ছিলেন স্যার?”
“প্রায় সাড়ে নটা পর্যন্ত।”
“আপনার বাড়িতে স্যার?”
“না, আমরা অফিসের কাছেই একটা রেস্টুরেন্টে বসে ডিনার খাচ্ছিলাম।” তারপর হঠাৎ সতীশ কুমারের কী মনে হল, বললেন, “একটা কথা পুলিশকে তখন আমি বলিনি– মনে হয়নি রেলেভেন্ট বলে।”
“কী কথা স্যার?”
“সাড়ে আটটা নাগাদ ডিনার খেয়ে যখন বেরোচ্ছি, তখন ববের খেয়াল হল ওর গাড়ির চাবি অফিসে ফেলে এসেছে। আমি আর উপরে উঠিনি। শুধু ওইটুকু সময়ই আমি ববের সঙ্গে ছিলাম না।”
“কতক্ষণ ছিলেন উনি উপরে?”
“তা প্রায় মিনিট দশেক।”
“আপনাদের লিফট তো খুব তাড়াতাড়ি ওঠে স্যার, অত সময় লেগে গেল শুধু চাবি আনতে?”
“ঠিকই বলেছেন, অত সময় লাগার কথা নয়। কিন্তু ববকে তো আমি চিনি, উপরে গিয়ে শুধু চাবি নিয়ে আসার পাত্র সে নয়, নিশ্চয় আরও দুয়েকটা টুকিটাকি কাজ সারছিল। ফ্র্যাঙ্কলি, আমি একটু অধৈর্যই হয়ে পড়েছিলাম, উপরে যাচ্ছিলাম ওর খোঁজ করতে। তখন দেখি মেরি, মানে আমাদের যে অফিস পরিষ্কার করে– সে উপরে যাচ্ছে। তাকে বললাম ববকে তাড়া দিতে।”
“তার তাড়া খেয়েই নেমে এলেন?”
“এক্সাক্টলি। তবে বিপাশা অফিসে ছিল বলে বোধহয় সময়টা একটু বেশি লেগেছিল। নেমে এসেই বলল, ‘বেঁচে গেছি, বিপাশা কারোর জন্য অপেক্ষা করছে, মনে হল মেজাজটা ভালো নেই। নইলে হয়েছিল, আটকা পড়ে যেতাম। যাই হোক তারপর আমরা হাঁটতে হাঁটতে ওর গাড়ির গ্যারাজ পর্যন্ত গেলাম। সেখানে হঠাৎ দেখা হয়ে গেল আকাহাশির সঙ্গে। গল্প করতে প্রায় সাড়ে ন’টা বেজে গেল। আমার টায়ার্ড লাগছিল। কয়েকটা ব্লক পরেই আমার অ্যাপার্টমেন্ট। আমি ওদের রেখে বাড়ি রওনা দিলাম। যখন একটু এগিয়েছি তখন মনে হল বব আর আকাহাশি তর্কাতর্কি করছে। দুজনেই বেশ উত্তেজিত। হয়তো ওদের কোনও পার্সোনাল ব্যাপার। আমিও ক্লান্ত ছিলাম, তাই দাঁড়ায়নি। বব এখন মারা গেছে বলেই কথাটা এখন মনে হচ্ছে।”
“মিস্টার ক্যাসেলের সঙ্গে মিস্টার আকাহাশির সম্পর্ক কী রকম ছিল স্যার?”
“একটু রাইভ্যালরি ছিল। সেটা ছিল বিপাশার জন্য। মাঝে মাঝে আমাদের মনে হত বিপাশা নিজের লোকেদের থেকে আকাহাশিকে বেশি ট্রাস্ট করে। বব বিপাশার অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অ্যাসিস্টেন্ট বলে সেটা ওর বুকে বাজত বেশি করে।”
“ভেরি ইন্টারেস্টিং। আচ্ছা স্যার, সেদিন অশোকের কোনও প্রসঙ্গ ওঠেনি?”
“ও হ্যাঁ, আমরা যখন ডিনার খাচ্ছি, তখন বব বলল অশোক একটা ভয়েস-মেসেজ রেখেছে, কিন্তু ও মেসেজটা রিট্রিভ করতে পারছে না। এরকম এক আধ সময় হয় না, তা নয়। আমি বললাম অশোককে একটা ফোন করতে। বব বলল ‘কয়েকবার ধরার চেষ্টা করেছে, কিন্তু পাচ্ছে না। আমার সামনেও ফোন করল, কিন্তু ফোন বেজেই গেল। আমি ববকে বললাম, যদি কোনো ইম্পর্টেন্ট মেসেজ অশোক দিয়ে থাকে, তাহলে একবার দেবরাজকে ধরার চেষ্টা করো না?”
দেবরাজকে যদিও আমরা খুবই ভালো করে চিনি, কিন্তু এই ছোটোখাটো ব্যাপারে তাকে ফোন করতে বব দেখলাম ইতস্তত করছে। শেষমেশ করল। কিন্তু দেবরাজের ফোন সুইচড অফ। এছাড়া আর তো কিছু মনে পড়ছে না।”
“অশোকের মেসেজটা কী ছিল জানেন?”
“না, এ নিয়ে ববের সঙ্গে পরের দিন কোনো কথা হয়নি। তারপর তো পুলিশ এল। দুপুরে ববের বাইরে কাজ ছিল বেরিয়ে গেল। শনিবার ছুটি, আর রোববার তো দুঃসংবাদটা পেলাম।”
“থ্যাঙ্ক ইউ স্যার, আপনাকে আর আটকে রাখব না, আমরা চলি।”
যেতে যেতে হঠাৎ একেনবাবু ঘুরে দাঁড়ালেন। সতীশ কুমার তখনো লবিতে দাঁড়িয়ে আছেন।
“আরেকটা প্রশ্ন স্যার, বিপাশা ম্যাডাম কি বিল-পেমেন্ট নিয়ে ঝামেলা করেন?”
“বিল পেমেন্ট নিয়ে?” সতীশ কুমার প্রশ্নটাতে দেখলাম বিস্মিত। “সে রকম তো কিছু শুনিনি!”
“থ্যাঙ্ক ইউ স্যার, প্রশ্নটা করা আমার উচিত হয়নি।”
গাড়িতে উঠতে না উঠতেই মোবাইলটা বাজলো। প্রমথর ফোন। এখানে কী হল তার রিপোর্ট শেষ করার আগেই দেখি একেনবাবু ঘুম লাগিয়েছেন।
