ম্যানহাটানের ম্যাডম্যান (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত

শেয়ার করুনঃ

 

(১৩)

 

মঙ্গলবার মে ২৪, ২০১১

 

ঘুম থেকে উঠে দেখি, একেনবাবু কোথাও বেরিয়েছেন। প্রমথকে জিজ্ঞেস করতেই খ্যাঁকখেঁকিয়ে উঠল, “আমি কি একেনবাবুর গার্জেন, কোথায় যাচ্ছেন, না-যাচ্ছেন তার খবর রাখব?”

 

“কী ব্যাপার, সাত সকালে মেজাজটা এত গরম কেন?”

 

“দেখবি আয়,” প্রমথ আমায় টেনে নিয়ে কিচেনে গেল। “দেখছিস?”

 

কী দেখাতে চায় মাথায় ঢুকল না। “কীসের কথা বলছিস?”

 

“চিনির কৌটোটা!”

 

চীনেমাটির কৌটোটা অক্ষত অবস্থাতেই আছে, চিনিও রয়েছে সেখানে।

 

“ঠিকই তো আছে,” আমি বললাম।

 

“চামচটা তোল।”

 

চামচটা তুলতেই প্রমথর অসন্তোষের কারণ স্পষ্ট হল। চামচের মুখে একগাদা চিনি লেপটে আছে। একেনবাবু চায়ে চিনি দিয়ে ঘেঁটে সেই চায়ে-ভেজা চামচটাই আবার চিনির কৌটোতে ঢুকিয়ে রেখেছেন! চা ঘাঁটার জন্যে অন্য চামচ ব্যবহার করেননি। প্রমথর কাছে এটা সিম্পল কেস অফ নেগলিজেন্স নয়, একটা ফেডারেল ক্রাইম।

 

“বার বার বললাম, একটু অপেক্ষা করুন, আমি কফি বানাচ্ছি’। না, আমার তাড়া আছে’ বলে নিজে ওস্তাদি করে কফি বানালেন আর দেখ তার পরিণাম।”

 

“ঠিক আছে, আমি চামচটা ধুয়ে দিচ্ছি।”

 

“থাক, আমিই ধুচ্ছি। কফি খাবি?” প্রমথ কফি মেকারে জল ভরতে ভরতে জিজ্ঞেস করল।

 

“খাওয়ালেই খাব। তা, একেনবাবুর ওঁর তাড়ার কারণ নিয়ে কিছু বললেন?”

 

“পরিষ্কার করে কি উনি কিছু বলেন? নিউ হেরিটেজ হোটেলে কী একটা কাজ আছে বলে ছুটলেন।”

 

“নিউ হেরিটেজ হোটেলে আবার কী কাজ?” আমি একটু অবাক হয়েই বললাম। “কোনও ফোন এসেছিল?”

 

“না।”

 

“কখন ফিরবেন কিছু বলেছেন?”

 

“না। এখনও মোবাইল ফোন কেনেননি, সুতরাং কন্ট্যাক্ট করারও উপায় নেই। যাই বলিস, জ্যোতিষ শাস্ত্রের উপর আমার একটু আস্থা ডেভলাপ করছে। শনির দশাই চলছে ওঁর, মাথাটা একেবারে গেছে! কালকে কি রকম সব উলটো-পালটা কনশান করছিলেন দেখেছিলি?”

 

আমি অবশ্য মনে করতে পারলাম না কোন কনকুশনের কথা প্রমথ বলছে, কিন্তু এ নিয়ে এখন তর্ক শুরু করার কোনও মানে হয় না। কফি খেয়ে আমি স্নান করতে চলে গেলাম।

 

স্নান করে বেরিয়ে দেখি প্রমথ কলেজ চলে গেছে। আরেক কাপ কফি নিয়ে একমাস ধরে যে পেপারটা লেখার চেষ্টা করছি সেটা নিয়ে বসলাম। এটা কেউ পড়বে কিনা, বা পড়ে উপকৃত হবে কিনা সেটা বলতে পারব না। তবে এটা জানি, না লিখলে আমার ক্ষতি হবে। ইউনিভার্সিটিতে চাকরি বজায় রাখতে গেলে সায়েন্টিফিক জার্নালে দুয়েকটা পেপার প্রতি বছর বার করতেই হবে, নো চয়েস। লেখাটা নিয়ে লড়াই করতে করতে প্রায় এগারোটা বাজল, কিন্তু কিছুই বিশেষ এগোলো না। “ধুত্তোর বলে যখন কলেজ যাবার জন্যে তৈরি হচ্ছি, একেনবাবু এসে হাজির।

 

“কোথায় গিয়েছিলেন সাত-সকালে?”

 

“দেবরাজবাবুর সঙ্গে দেখা করতে।”

 

“এত সকালে?”

 

“কী করব স্যার, উনি বললেন ন’টার সময় একটা মিটিং-এ যাবেন। সেখান থেকে সোজা বস্টন না কোথায়।”

 

“কী এমন জরুরি ব্যাপার ছিল আপনার?”

 

“কয়েকটা জিনিস ক্ল্যারিফাই করলাম স্যার।”

 

“যেমন?”

 

“অশোকবাবু ওঁর কাছে টাকা অ্যাডভান্স চেয়েছিলেন কিনা, অশোকবাবুর পার্সোনাল রেকর্ড দেখা যায় কিনা–এইসব আর কী।”

 

“উত্তর পেলেন?”

 

“হ্যাঁ স্যার। ইন্দ্রবাবু ঠিকই বলেছিলেন। তবে দশ হাজার নয়, আট হাজার ডলার অ্যাডভান্স চেয়েছিলেন দেবরাজবাবুর কাছ থেকে। ইন্দ্রবাবুও এ নিয়ে তদবির করেছিলেন অশোকবাবুর হয়ে। যেদিন অশোকবাবু মারা যান, সেদিন বিকেলে দেবরাজবাবু অশোককে জানিয়েছিলেন টাকাটা দেবেন। কিন্তু অফিস থেকে নয়, পার্সোনাল লোন হিসেবে। অফিস থেকে এই ভাবে অ্যাডভান্স দিলে, অনেকেই অ্যাডভান্স চেয়ে বসবে। একজনকে দিলে অন্যজনকে ‘না’ বলা যাবে না।”

 

‘ইন্টারেস্টিং,” আমি বললাম। “ইন্দ্র বলেছিলেন দশ হাজার, কিন্তু দেবরাজ বলছেন আট হাজার। তফাৎটা কেন?”

 

“হু নোজ স্যার। যাইহোক, অশোকবাবুর পার্সোনেল রেকর্ডের ফাইলটা দেখলাম। ওঁর বাবার ঠিকানা আর ফোন নম্বর টুকে এনেছি। অশোকবাবুর পিসতুতো দিদির ফোন নম্বরও রেফারেন্স হিসেবে রেকর্ডে ছিল। আরেকটা জিনিস রেকর্ডে ছিল সেটা হল, ওঁর কী কী হবি, তার লিস্ট। সেই লিস্টে রিডিং রিলিজিয়াস বুকস আর ফটোগ্রাফি ছিল।”

 

“ফটোগ্রাফি, দ্যাটস ইন্টারেস্টিং।”

 

একেনবাবু উত্তরে কিছু বললেন না। তবে দেখে মনে হল, খবরগুলো জোগাড় করে। বেশ সন্তুষ্ট হয়েছেন।

 

“কত বয়স হয়েছিল ওঁর?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

 

“মাত্র ৩৬ বছর। সো স্যাড স্যার–ডায়েড ইন দ্য প্রাইম অফ হিস লাইফ।”

 

“সত্যিই স্যাড।”

 

“কিন্তু এই তো জীবন, স্যার–আসে আর যায়!” দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে ফিলসফিক্যাল কমেন্ট করলেন একেনবাবু। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কি এখন কলেজ যাচ্ছেন স্যার?”

 

“হ্যাঁ, একটার সময় একটা মিটিং আছে।”

 

“যান স্যার, যান। আমি একবার তিনটে নাগাদ হয়তো আপনার অফিসে আসব।”

 

আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতে বললেন, “দেবরাজবাবু সস্তায় নীলা পাবার একটা সোর্স দিয়েছেন, কিন্তু আপনাদের সঙ্গে আলোচনা না করে কিছু কিনতে চাই না।”

 

“তার জন্যে অফিসে আসতে হবে কেন? বাড়িতে ফিরে আসার পরেও তো আলোচনা করতে পারেন!”

 

“না স্যার, সাড়ে তিনটের সময় অ্যাপয়েন্টমেন্ট, দেবব্রজবাবুই করে দিয়েছেন। একশো পঁচিশ ডলারে জেনুইন নীলা, সাইজ অবশ্য ছোটো।”

 

“কিনে ফেলুন, এতে এত ভাবার কি আছে?”

 

“ঠিক আছে স্যার, কিন্তু তাও একবার আসব। তারপর তো ম্যাডাম ক্যাথি ক্যাসেলের কাছে যেতে হবে। আপনি আসছেন তো?”

 

“দেখি।“

 

“দেখি, আবার কী স্যার! আপনি না এলে কী করে চলবে? প্রমথবাবুর কী একটা কাজ আছে, উনি আসবেন না।”

 

“ঠিকানাটা পেয়েছেন?”

 

“হ্যাঁ স্যার, সতীশবাবু দিয়েছেন। এই দেখুন,” বলে একটা কাগজ এগিয়ে দিলেন।

 

ওয়েবার অ্যাভেনিউয়ে ‘গোল্ডেন লজ’ অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং। ওয়েবার অ্যাভেনিউ নিউ ইয়র্ক সিটিতেই, কিন্তু ম্যানহাটানে নয়– ব্রঙ্কসে। জায়গাটা মোটামুটি কোথায় জানা ছিল। ট্রেন বা বাসে যেতে গেলে একাধিক বার চেঞ্জ করতে হবে।

 

“ওখানে তো গাড়ি নিয়েই যেতে হবে মনে হচ্ছে।”

 

একেনবাবু চুপ করে রইলেন। আমাকে সঙ্গে নেবার প্রয়োজনীয়তা এবার স্পষ্ট হল।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *