(১১)
সোমবার মে ২৩, ২০১১
সোমবার একটু দেরি করে ব্রেকফাস্ট খেয়ে দশটা নাগাদ আমি আর একেনবাবু বেরোলাম। ফিলাটেলিস্ট কর্নার আমাদের বাড়ি থেকে হেঁটে মিনিট দশেকের পথ। একেনবাবুকে বললাম, “আমি বুঝতে পারছি কেন স্ট্যাম্পের দোকানে যেতে চাচ্ছেন, কিন্তু যেটা বুঝছি না, আমাকে কেন দরকার?”
“আপনাকে স্যার একটু অভিনয় করতে হতে পারে।”
“কী অভিনয়?” আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
“না না, তেমন কিছু নয় স্যার।”
“দাঁড়ান দাঁড়ান, এদিকে বলছেন অভিনয় করতে হবে, অথচ পার্ট বলছেন না ব্যাপারটা কী?”
“আঃ, ঘাবড়াচ্ছেন কেন স্যার, চলুন না?”
আমরা যখন গিয়ে পৌঁছলাম, দোকান তখন সবে খুলেছে। যে বৃদ্ধ ভদ্রলোক দোকানে বসেছিলেন তিনি উঠে এগিয়ে এলেন। আমি একেনবাবুকে চট করে সতর্ক করে দিলাম, “ইনি কিন্তু অন্য লোক।”
“থ্যাঙ্ক ইউ স্যার।”
“মে আই হেল্প ইউ উইথ এনিথিং?” ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন।
“আমরা দোকানটা একটু দেখতে এসেছি স্যার।”
“নিশ্চয়, দেখুন। আমাদের দোকান ছোটো, কিন্তু স্টক ভালো। কিসে আপনাদের ইন্টারেস্ট?”
“জেনারেল ইন্টারেস্ট স্যার, খুব জেনারেল। আসলে স্যার, আমাদের বাজেট খুব লিমিটেড।
“পাঁচ ডলারের মধ্যে আমাদের অনেক স্ট্যাম্প আছে। কুড়ি, পঁচিশ– এমন কি একশো ডলারের স্ট্যাম্পও বেশ কয়েকটা আছে। বেশি দামের স্ট্যাম্পও জোগাড় করে দিতে পারি। তবে একটু সময় লাগতে পারে।”
.
দোকানটা বাইরে থেকে যতটা ছোটো মনে হয়েছিল ততোটা নয়। ভেতরটা বেশ লম্বা হলের মতো, দু’ধারে ডিসপ্লে-তে অজস্র স্ট্যাম্প। পেছনে কাঁচের আলমারিতে ফাইলের পর ফাইল সাজানো। ইন্ডিয়ার প্রচুর স্ট্যাম্প রয়েছে দেখলাম, দামও বেশি নয়। বেশি দামের মধ্যে একটাই শুধু চোখে পড়ল, পঞ্চান্ন ডলার।
“সত্যি স্যার, এক্সেলেন্ট কালেকশন আপনাদের। আমি তো ভাবিইনি এত স্ট্যাম্প আছে এখানে। আজ তাড়া আছে, আরেকদিন এসে ভালো করে দেখব।”
“বেশ তো, আমরা শুধু রবিবার বন্ধ থাকি।”
বেরোবার পথে একেনবাবু হঠাৎ থেমে জিজ্ঞেস করলেন, “ভালো কথা স্যার, আপনারা তো স্ট্যাম্প কেনেন না– তাই না?”
“কেন কিনব না? নিশ্চয় কিনি।”
একেনবাবু এবার আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “শুনলেন স্যার? আপনি যে বলেছিলেন কাস্টমার না থাকলে এঁরা কেনেন না? সেটা ঠিক কথা নয়।”
আমি উত্তরে কী বলব বুঝে উঠতে পারার আগেই দোকানের ভদ্রলোক বললেন, “সেটা বেশি দামের স্ট্যাম্পের বেলায়। পাঁচ দশ ডলারের স্ট্যাম্প আমরা নগদ দিয়ে কিনি। একশো বা তার বেশি দামের স্ট্যাম্প সাধারণত নিলামে বিক্রি হয়। আমাদের চেনাজানা কিছু বড় কালেক্টর আছেন, তাঁরা পছন্দসই স্ট্যাম্পের খবর পেলে অনেক সময়ে আমাদের কাছ থেকে সোজাসুজি কিনে নেন।”
“এবার বুঝেছি স্যার, আসলে এঁর এক বন্ধু কিছুদিন আগে আপনাদের দোকানে একটা দামি স্ট্যাম্প বিক্রি করতে এসেছিলেন, তখন সেটাই বোধহয় আপনারা বলেছিলেন।”
“কবে এসেছিলেন?”
“টাইমটা তো ঠিক বলতে পারব না।”
“কী নাম বলুন তো?”
“মিস্টার অশোক দুবে।”
“ও ইয়েস, লজেন্স ক্যানসেলের ছাপ মারা হাফ-অ্যানা সিন্ডে ডক স্ট্যাম্প। ইট ওয়াজ ইন এক্সেলেন্ট কনডিশন।” তারপর আমায় জিজ্ঞেস করলেন, “উনি আপনার বন্ধু?”
আমি কিছু বলার আগেই একেনবাবু বললেন, “হ্যাঁ, স্যার।”
“বাঁচালেন! কয়েকজন ইন্টারেস্টেড, কিন্তু আপনার বন্ধু যে ফোন নম্বর দিয়ে গিয়েছিলেন সেটা নট-ইন-সার্ভিস, তাই যোগাযোগ করতে পারছি না। ওঁর অন্য কোনও ফোন নম্বর আছে আপনার কাছে?”
“থাকলেও লাভ হত না স্যার, হি ইজ ডেড।” একেনবাবু গম্ভীরমুখে বললেন। “ও মাই গড! সো সরি টু হিয়ার দিস!”
“কবে উনি এসেছিলেন স্যার, মনে আছে?”
“না, ঠিক কবে মনে নেই। শুধু ফোন নম্বরটা লিখে রেখেছিলাম।”
“চলি স্যার।” বলে দোকানদার ভদ্রলোককে প্রায় হতভম্ব অবস্থায় রেখে আমরা বেরিয়ে এলাম।
.
আমার কাছে ব্যাপারটা এখন বেশ স্পষ্ট হয়ে আসছে। বাইরে বেরিয়েই আমি একেনবাবুকে জিজ্ঞেস করলাম, “তাহলে কি অশোকই বিপাশা মিত্রের ছবির খামটা চুরি করেছিলেন?”
“সেটাই তো আমার সন্দেহ হচ্ছে স্যার। কাল যখন আপনি বললেন, এই দোকানের কেউ আপনাকে ভুল লোক ভেবে বলেছে, আপনার স্ট্যাম্পের খরিদ্দার পাওয়া গেছে–তখনই সন্দেহটা হল।”
“তা বুঝলাম, কিন্তু সেটা অশোকবাবু হতে যাবেন কেন?”
“কারণ, দেবরাজ সিং প্রথম দিন এসে বলেছিলেন, আপনার চেহারার সঙ্গে অশোকবাবুর মিল আছে।”
“কে জানে, আমার কিন্তু সেরকম মনে হয়নি, অবশ্য আমি অশোককে দেখেছি খুব অল্প সময়ের জন্যেই।”
“আমি কিন্তু একটু কনফিউসড স্যার।”
“কেন?”
“আপনি তো স্ট্যাম্পের অনেক খবর রাখেন, সিন্ডে ডক-এর কথা আপনি জানতেন?”
“আমি স্ট্যাম্পের খবর কিছুই জানি না।”
“সে কি স্যার, আপনি যে সেদিন ট্রেসকিলিং ইয়েলো স্ট্যাম্পের কথা বললেন!”
“ওই একটা নামই জানতাম।”
“ইন্টারেস্টিং,”একটু মাথা চুলকোলেন একেনবাবু। “আসলে স্যার, যাঁরা স্ট্যাম্প জমান তাঁরা এসব জানেন। কিন্তু অশোকবাবু জানলেন কী করে? মনে আছে, অশোকবাবু স্ট্যাম্প জমান কিনা জানতে চেয়েছিলাম ইন্দ্রবাবুর কাছে? তিনি তো বললেন, ‘না’।”
“হয়তো ছেলেবেলায় জমাতেন।”
“তা হতে পারে স্যার।” একেনবাবু মাথা নাড়লেন।
“এছাড়া অশোক নিশ্চয় যখন খামটা দেখেছিলেন, ভিতরের চিঠিটাও পড়েছিলেন। সেখানে লেখা ছিল না–তোমাকে অমূল্য ধন পাঠালাম?”
“ইউ হ্যাভ এ ভেরি গুড পয়েন্ট স্যার।”
“আমার কী মনে হয় জানেন, অশোক যখন বিপাশা মিত্রের পার্টিটা অ্যারেঞ্জ করছিলেন, তখন নিশ্চয় বার কয়েক ওঁর অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকেছিলেন। বিপাশা মিত্র হয়তো এক সময়ে ভিতরে ছিলেন না বা কিছু, তখনই অশোক খামটা পায়। ও ক্রিমিন্যাল নয়,
তবে বড়লোকদের টাকা নিয়ে গরিবদের কাজে লাগানোর মধ্যে বোধহয় কোনও অপরাধ দেখেনি।”
“খুবই সম্ভব স্যার। কিন্তু অশোকবাবুকে খুন করল কে?”
“সেটাই বার করতে হবে। ইন ফ্যাক্ট, সেটা বার করলে, আপনার দুটো কেসই সভজ্ঞ হয়ে যাবে।”
“আপনার কী মনে হয় স্যার, খুনি ওই স্ট্যাম্পের লোভেই অশোকবাবুকে খুন করেছে?”
“তাই তো মনে হয়। অশোকের মানিব্যাগ, ক্রেডিট কার্ড কিছু চুরি যায়নি। চুরি গেছে একটা খাম, যার খবর কারোরই জানার কথা নয় খুনি ছাড়া।”
“ভেরি ইন্টারেস্টিং স্যার, তার মানে খুনিকে অশোকবাবু স্ট্যাম্পের কথা বলেছিলেন।”
“নিশ্চয়, একজনকে তো বলেইছিলেন।”
“কাকে স্যার?”
“কাকে আবার, ফিলাটেলিস্ট কর্নারের ওই দোকানদারকে!”
“ও হ্যাঁ, ঠিক কথা। বন্ধু ইন্দ্রবাবুকে কি বলেছিলেন?”
“ইন্দ্র তো অস্বীকার করলেন, কোনও চিঠি বা স্ট্যাম্প দেখেছেন বলে। তাছাড়া ওঁর অ্যালিবাই আছে, বন্ধুদের সঙ্গে তাস খেলছিলেন।”
“ট্রু স্যার। তবে কিনা, এই অ্যালিবাই আর থাকে না, যদি ওঁরা সবাই এই মার্ডারের সঙ্গে যুক্ত থাকেন।”
“সেটা কি সম্ভব?”
“নাথিং ইজ ইমপসিবল স্যার। কাউকেই সাসপেক্ট লিস্ট থেকে বাদ দেওয়া যায় না। এই দোকানদারকে দেখে আপনার কী মনে হল?”
“মনে হয় ভদ্রলোক ইনোসেন্ট, নইলে আমাদের এই স্ট্যাম্পের কথা বলতেন না, চেপে যেতেন।”
“একটা প্রশ্ন করা হল না স্যার। অশোকবাবু যখন স্ট্যাম্পটা এনেছিলেন, তখন দোকানে আর কেউ ছিলেন কিনা। খুনি হয়তো একজন স্ট্যাম্প কালেক্টর স্যার। অশোকবাবু যখন স্ট্যাম্পটা দেখাচ্ছেন, তখন নিশ্চয় খুনি সেটা দেখেছিলেন। সে ক্ষেত্রে
খুনিকে ধরা সহজ ব্যাপার হবে না।” বলতে বলতে একেনবাবু হঠাৎ একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেলেন।
ইতিমধ্যে আমরা ইউনিভার্সিটির দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছি।
“আপনি যান স্যার, আমি একটা কাজ সেরে আসি।”
কী কাজ, কোথায় চললেন, কিছু না জানিয়েই অদৃশ্য হলেন। টিপিক্যাল একেনবাবু!
