ম্যানহাটানের ম্যাডম্যান (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত

শেয়ার করুনঃ

 

(১০)

 

শনিবার / রবিবার মে ২১/২২, ২০১১

 

আমি দেখেছি, মাথায় যদি কোনও প্রশ্ন জাগে, যতক্ষণ সেটার উত্তর না মেলে, মনটা ছটফট করতে থাকে। খুবই অকিঞ্চিৎকর প্রশ্ন, বেভের আন্টিই অশোক দুবের সেই মিশেল কিনা সেটা নিয়ে ভাবতে ভাবতে রাতে ভালো ঘুম হল না। সকালে উঠে দেখি প্রমথ বা একেনবাবু কেউই বাড়িতে নেই। আজকাল শনি-রবিবার প্রমথর দেখা পাওয়া ভার। সাত সকালে ফ্রান্সিস্কার অ্যাপার্টমেন্টে চলে যায়। মাঝে মাঝে উইক-এন্ডটা সেখানেই কাটিয়ে আসে। আমার ধারণা দে আর স্লিপিং টুগেদার। নট দ্যাট আই কেয়ার। আজ বাদে কাল তো বিয়েও করবে। একেনবাবু সাধারণত বাড়িতেই থাকেন। তিনি কোথায় অদৃশ্য হয়েছেন কে জানে? একটু বাদে একেনবাবুর ফোন পেলাম। উইক-এন্ডে আমার প্ল্যান জানতে চান।

 

“কোনো প্ল্যান নেই।”

 

“তাহলে, চলুন না, কুইন্সে উইক-এন্ডটা কাটাই।”

 

“কুইন্স? অফ অল দ্য প্লেসেস?”

 

“আসলে স্যার, আমার খুড়তুতো শ্যালক কলকাতা থেকে কাল রাতে এসেছে। কুইন্সে ওর এক বন্ধুর কাছে আছে। আমি ওঁদের সঙ্গেই এখন গল্প করছি। আমাদের সবাইকে নেমন্তন্ন করেছেন সেই বন্ধু– উইক-এন্ডটা এক সঙ্গে কাটাবার জন্যে।”

 

“আপনি যান। প্রমথ তো নেই, আর আমারও কলেজের কিছু কাজ বাকি পড়ে আছে, সেগুলো এই ফাঁকে সেরে নেব।”

 

“আপনি একা একা থাকবেন স্যার?”

 

“তাতে কী হয়েছে? আপনার কি রাইড লাগবে? আমি আপনাকে কুইন্সে পৌঁছে দিয়ে আসতে পারি।”

 

“ছি, ছি, স্যার, কী যে বলেন! ওঁরাই আমাদের নিয়ে যেতেন।”

 

“ব্যাস, তাহলে তো চুকেই গেল।”

 

একেনবাবু কিছু একটা বলতে গিয়ে চুপ করে গেলেন। বুঝলাম আমাকে একা ফেলে রেখে যেতে একেনবাবুর খারাপ লাগছে। প্রমথ যখন উইক-এন্ডগুলো বাইরে কাটায়, তখন এক আধ সময় একেনবাবুকে আমি বলেছি, এটা হল ট্রায়াল, ধীরে ধীরে প্রমথকে ছাড়াই আমাদের থাকতে হবে। উই উইল মিস হিম। এক বছর বাদে একেনবাবুরও দেশে ফিরে যাবার কথা। ওঁর ফুলব্রাইট ফেলোশিপ শেষ হচ্ছে। ওঁরা চলে গেলে এই তিন বেডরুমের অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে দিয়ে ছোটোখাটো কিছু খুঁজতে হবে। এই নিয়ে একেনবাবুর সঙ্গে আগে কয়েকবার কথাও হয়েছে। প্রতিবারই একেনবাবু বলেছেন, “আপনি স্যার, কলকাতায় চলে আসুন। প্রমথবাবুর ম্যাডাম আছেন, ওঁর পক্ষে দেশে ফিরে আসা হবে না। আপনি তো স্যার মুক্ত পুরুষ। আমি একেনবাবুকে বলেছি, কেন, আমি কি এখানে কোনও ম্যাডাম জোগাড় করতে পারি না?” একেনবাবু লজ্জা পেয়ে বলেছেন, কী যে বলেন স্যার, তাহলে তো খুবই ভালো হয়।

 

সত্যি কথা বলতে কী, কেউ না থাকায় দিব্বি কাটল। নিজের কাজগুলো হল, সুচিত্রা উত্তমের ডিভিডি ‘চাওয়া-পাওয়া’ দেখলাম। আমার এখনও মায়েদের সময়কার রোম্যান্টিক ছবিগুলো ভালো লাগে। প্রমথর জ্বালায় ওগুলো আনা যায় না। ওর মতে পুরোনো ছবিগুলো সব সিলি সেন্টিমেন্টাল ট্র্যাশ। একজনকে মুখ ফুটে ভালোবাসি বলতে যদি দু’ঘণ্টা কেটে যায়, সেটা আবার একটা সিনেমা হল নাকি? বাংলা বইও ও পড়ে না। একবার শরৎচন্দ্রের ‘দত্তা’ অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে ওকে পড়িয়েছিলাম। পড়ে ক্ষেপে আগুন! ওর কনকুশন– বিজয়াকে যদি বা ক্ষমা করা যায়, নরেন একটা ইডিয়ট। আর আমার মস্তিষ্ক পরীক্ষা করানো উচিত এইসব পুরানো বস্তাপচা রাবিশ এখনো পড়ি বলে!

 

.

 

শনিবার সন্ধ্যায় একটা ফোন পেলাম। এক ভদ্রলোক একেনবাবুর খোঁজ করছিলেন। নামটা বলেছিলেন, কিন্তু প্রথমে ঠিক শুনতে পাইনি। দুয়েকটা কথার পরে চিনতে পারলাম। বিপাশা মিত্রের ফ্যামিলি মিউজিয়ামের কিউরেটর সতীশ কুমার। বব ক্যাসেলের মৃত্যুতে খুব আপসেট দেখলাম সতীশ কুমারকে। দু’জনে বোধহয় ভালো বন্ধু ছিলেন।

 

একেনবাবুকে কিছু বলতে হবে কিনা জিজ্ঞেস করাতে সতীশ বললেন, বব ক্যাসেলের মা ক্যাথি ক্যাসেল একেনবাবুর সঙ্গে বিশেষ প্রয়োজনে একটু কথা বলতে চান, কবে এলে দেখা হবে। কারণটা অবশ্য সতীশ আমার কাছে ভাঙলেন না। তবে বললেন, বিপাশা মিত্রের কাছে সতীশ শুনেছেন যে, একেনবাবু একজন ভালো ডিটেকটিভ। সতীশই ক্যাথিকে একেনবাবুর নামটা দিয়েছেন। ক্যাথি ক্যাসেলের বয়স পঁচাত্তর– পার্কিনসন্স, আরথ্রাইটিস ও অন্যান্য দুরারোগ্য ব্যাধিতে ভুগছেন। একেনবাবু একটা সময় দিলে সতীশ কুমার নিজেই ওঁকে নিয়ে আসবেন। একেনবাবুকে আমি চিনি। উনি কখনোই চাইবেন না যে, একজন বৃদ্ধা এত কষ্ট করে আসবেন ওঁর কাছে। আমি ক্যাথি ক্যাসেলের নম্বরটা নিয়ে নিলাম। বললাম একেনবাবু যোগাযোগ করবেন।

 

রবিবার রাত্রে প্রমথ ফিরল। হাতে একটা প্যাকেট। ফ্রান্সিস্কা একটা ফুটকেক বানিয়েছে। তার থেকে পেল্লায় সাইজের একটা অংশ প্যাক করে দিয়েছে আমার আর একেনবাবুর জন্যে। ভেরি সুইট। একেনবাবু ফিরলেন প্রমথর একটু পরেই। তিনিও মিষ্টির একটা প্যাকেট এনেছেন। আমি কফির সঙ্গে সেগুলোর সদ্ব্যবহার করতে করতে একেনবাবুকে। বললাম, “বব ক্যাসেলের মা ক্যাথি ক্যাসেল আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান।”

 

“কেন স্যার?”

 

“ঠিক জানি না, তবে একজন ডিটেকটিভের খোঁজ করছিলেন। সতীশ কুমার আপনার নাম সাজেস্ট করেছেন। বৃদ্ধা অসুস্থ, সতীশ কুমার নিজেই ওঁকে নিয়ে আসতেন এখানে। বললাম, আপনি ফোন করবেন।”

 

“নম্বরটা দিন স্যার। এখন রাত্রি হয়ে গেছে, কাল ফোন করব।”

 

ফুটকেকটা ফ্র্যান্সিস্কা দুর্দান্ত বানিয়েছে। প্রমথকে বললাম, “তুই মাঝে মাঝে প্লিজ ফ্রান্সিস্কার কাছে গিয়ে থাকিস। হোয়াট এ ট্রিট!”

 

“রাস্কেল!” বলে প্রমথ শুতে চলে গেল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *