(১৭)
সরু গলি, গাড়ি ঘোরাবার উপায় নেই, ব্যাক গিয়ার দিয়ে আস্তে-আস্তে এলিয়ট রোডের মোড়ে এসে গাড়ির মুখটা ঘুরিয়ে দিতে হল। মোড়ের পানের দোকানের সামনে থেকে যে-লোকটি প্রায় সঙ্গে-সঙ্গে আমাদের গাড়ির পাশে এসে দাঁড়াল, ইউনিফর্ম পরা না থাকলেও বুঝতে কিছুমাত্র অসুবিধা হল না যে, সে পুলিশের লোক। জানলার কাচ নামিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “কোন্ বাড়িতে আমরা গিয়েছিলুম, সেটা খেয়াল করে দেখেছ?”
বিনীত গলায় লোকটি বলল, “হাঁ, সাব।”
“ভিতরে যাবার দরকার নেই, বাইরে থেকে ওই বাড়িটার দোতলার ফ্ল্যাটের উপরে আজ সারা রাত নজর রাখতে হবে।”
“ঠিক আছে, আমি থানায় গিয়ে পনেরো মিনিটের মধ্যে দু’জন লোক পাঠিয়ে দেব।”
“লক্ষ রাখতে হবে, বাইরে থেকে কেউ যেন ওই দোতলার ফ্ল্যাটে না ঢোকে।”
“কেউ ঢুকবে না।”
“আর একটা কথা।” ভাদুড়িমশাই ইঞ্জিনে স্টার্ট দিয়ে বললেন, “ওই ফ্ল্যাটে যে মেমসাব থাকেন, কাল সকাল এই ধরো সাড়ে আটটা নাগাদ একজন এসকর্ট দিয়ে তাঁকে তোমাদের গাড়িতে করে আমাদের কাঁকুড়গাছির ফ্ল্যাটে রওনা করিয়ে দিতে হবে। মোটামুটি ন’টা নাগাদ যেন ওখানে পৌঁছে যান।”
“ওটা ভি হয়ে যাবে।”
গাড়ির পাশ থেকে লোকটি সরে গেল। ভাদুড়িমশাই গিয়ার পালটে অ্যাকসিলেটরে চাপ দিলেন। ওয়েলেসলি স্ট্রিটে পড়ে আমরা ডাইনে মোড় ফিরলুম।
বাড়ি ফিরতে-ফিরতে প্রায় সাড়ে এগারোটা। পথে কোনও কথা হল না। পীতাম্বর চৌধুরি লেনে আমাদের বাড়ির সামনে গাড়ি রেখে ভাদুড়িমশাই বললেন, “চলুন, উপরে গিয়ে একটু বসা যাক।”
বললুম, “অনেক রাত হয়েছে কিন্তু। মালতীরা চিন্তায় থাকবে।”
“একটা ফোন করে দিন, তা হলে আর চিন্তা করবে না। বলবেন যে, সাড়ে বারোটার মধ্যেই ফিরছি। …আসলে ব্যাপারটা কী জানেন, অনেকক্ষণ চা কিংবা কফি খাইনি।”
উপরে উঠে দেখলুম, বাসন্তী জেগেই আছে। তাকে কফির কথা বলে দিয়ে ভাদুড়িমশাইকে নিয়ে আমার বৈঠকখানা ঘরে এসে বসলুম। ভাদুড়িমশাই বললেন, “বিমল বরাটকে ফোন করেছিলেন?”
“বিকেলে আপনাদের ওখান থেকে ফিরে এসেই করেছি। বিমলকে সব কথা খুলে বলিনি। তবে এটা বলেছি যে, বাড়ি থেকে না-বেরুনোর ব্যাপারটাকে সে যেন মোটেই হালকাভাবে না নেয়। মনে হল, কেন যে এত কড়াক্কড় করছি, সেটা সে বুঝতে পেরেছে।”
“বুঝতে পারলেই ভাল।” ভাদুড়িমশাই একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “মিস রবিনসনকে দেখে কী মনে হল?”
“আমার আর কী মনে হবে।” হেসে বললুম, “আপনার কী মনে হল, সেইটে বলুন।”
বাসন্তী কফি দিয়ে গেল। ভাদুড়িমশাই অন্যমনস্কভাবে কফির পেয়ালায় চুমুক দিয়ে বললেন, “আমার মনে হল, প্রসাদ গুপ্তের মৃত্যুতে ওঁরও যে একটা ভূমিকা রয়েছে, অলদো অ্যান ইনডিরেক্ট রোল, ভদ্রমহিলা এখনও সেটা বুঝতে পারেননি। বুঝতে পারলে নিজেকে ক্ষমা করা ওঁর পক্ষে শক্ত হবে।”
“বুঝতে তো আমিও পারছি না। একটু বুঝিয়ে বলবেন?”
“বললুম তো, অ্যান ইনডিরেক্ট রোল। মানে মিস রবিনসনকে এমনভাবে কাজে লাগানো হয়েছে, যে-ভাবে না-লাগালে প্রসাদ গুপ্ত আজও বহাল তবিয়তে বেঁচে থাকতেন। উনি অবশ্য সেটা জানেন না। কিন্তু এখন না-জানলেও পরে যে জানবেন, বিশেষ করে আমার সঙ্গে যখন ওঁর যোগাযোগ হয়েছে, তখন আমিই যে সেটা ওঁকে জানিয়ে দেব, সেটা তারা আঁচ করতে পারবে নিশ্চয়। হয়তো ইতিমধ্যেই আঁচ করেছে।”
“আঁচ করতে পারলে তারা কী করবে?”
“মারুতি গাড়ির ড্রাইভারটিকে যা করেছে, ওঁকেও তা-ই করবে। অর্থাৎ সরিয়ে দেবে। … কিন্তু না, আর নয়। আমাকে উঠতে হবে।”
“বাসন্তীর সঙ্গে দেখা করে যাবেন না?”
“থাক, ওকে আর বিরক্ত করব না। জাস্ট টেল হার দ্যাট দ্য কফি ওয়াজ রিয়েলি গুড। …আর হ্যাঁ…” বেরিয়ে যেতে-যেতে দরজা থেকে ফিরে দাঁড়ালেন ভাদুড়িমশাই। বললেন, “পারলে কাল সকাল দশটা নাগাদ আমাদের ওখানে চলে আসুন। প্রসাদ গুপ্ত যে কেন অন্যের পাসপোর্ট নিয়ে ইউরোপ যাচ্ছিল, তা হলে সেটা জানতে পারবেন।”
