ল্যাংড়া পাহান (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

দুই

সেই প্রথম দেখার প্রায় বছর পনেরো পরের ঘটনা।

এখন আর আগের সেই জঙ্গল নেই, আবহাওয়া নেই, পুরনো লোকজনও নেই। পুরো জায়গাটাই দ্রুত বদলে গেছে, বদলে যাচ্ছে। শুনতে পাচ্ছি, কাঁচা রাস্তাটাও নাকি পাকা হয়ে যাবে। তবে একথা শুনে আসছি প্রায় গত দশ বছর হল। আসলে কবে হবে, তা ঈশ্বরই জানেন। জঙ্গলের জাদু সম্বন্ধে সম্পূর্ণ উদাসীন কিছু নতুন বড়লোক আর আপস্টার্টদের ভিড়ও ক্রমশই বাড়ছে। এত জায়গা থাকতে তারা মরতে এমন জঙ্গলের জায়গায় বাড়ি করে কেন, ভেবে পেতাম না। করে হয়তো, রাঁচী শহরের থেকে বেশি দূরে নয় বলেই। জমি-বাড়ির মতো ইনভেস্টমেন্ট তো হয় না। অনেকে থাকেও না। অনেকেই জায়গা নিয়ে নতুন বাড়ি করেও সে বাড়ি ফেলে রাখছে। তাতে অবশ্য আমি অসুখী হইনি। মানুষ যতদিন কম আসবে, থাকবে, পরিবেশ অমলিনই থাকবে। ট্রানজিস্টর, টিভি বাজবে না।

মাঝে, বহুবছর বাইরে বাইরেই ছিলাম।

এটুকু বলে ঋজুদা থামল। পাইপটা নিভে গেছিল। ধরিয়ে নিল। তারপর বলল, স্টেটস-এ, কানাডাতে, স্পেইন-এ। ভারতে পৌঁছেই সময় করে এসেছি মার্কিগঞ্জে অনেক নেমন্তন্ন ও মিটিং-টিটিং ক্যানসেল করে।

এক শেষ বিকেলে, বাংলোর বাইরে বসে আছি, পেয়ারাগাছগুলোর তলায়। মালী বউকে দিয়ে খুব ভাল করে গোবর-নিকিয়ে জায়গাটা পরিষ্কার করানো হয়েছে, যাতে সাপ-খোপ না আসে। একটু পরেই সন্ধে হয়ে যাবে। বাংলোর কম্পাউন্ডের পাশের নালা থেকে তিতির ডাকছে ঘন ঘন। চিহা-চিহা-চিহা করে।

এমন সময়ে ডগলাস এসে হাজির।

গুড ইভনিং মিস্টার বোস। বলে, সে আমাকে উইশ করে নিজেই বেতের চেয়ার টেনে বসল।

গুড ইভনিং।

বিরক্ত গলায় বললাম, আমি।

এই ডগলাস লোকটাকে আমি পছন্দ করতাম না। ভীষণ পরনিন্দা-পরচর্চা করে। আর সব বাড়ি-বাড়ি ঘুরে সকলের হাঁড়ির খবর নিয়ে বেড়ানোই ওর কাজ ছিল। বউ মরে গেছে অনেকদিন আগে। কিছু করারও ছিল না। যখন বউ ছিল, তার সঙ্গে ঝগড়া করে অনেকটা সময়ই কেটে যেত ওর। ডগলাস প্রায়ই বলত, বউ মরে যাওয়াতে বুঝি, ঝগড়া করার আর দ্বিতীয় কোনও লোক নেই। পরের সঙ্গে ঝগড়া করে সুখ নেই একেবারেই।

ডগলাস বলল, এক কাপ কফি হবে?

কফি আনতে বললাম মালীর বউকে।

ও না চাইলে খাওয়াতাম না। কফি খাওয়া মানেই আরও কিছুক্ষণ বসে থাকা।

ডগলাস বলল, মিঃ বোস, তোমার বন্দুক কোথায়?

কেন? বন্দুক-রাইফেল সবই গান-স্ট্যান্ডেই আছে। যেখানে থাকার। সবসময়েই কি বন্দুক-রাইফেল কাঁধে করে বসে থাকব নাকি? আমি তো ব্যাঙ্কের দ্বারী নই!

তারপর বললাম, কী ব্যাপার বলো তো? হঠাৎ এই প্রশ্ন?

সে কী! তোমাকে কেউই বলেনি এখনও? মালীও না?

আমি একটু অবাক হয়ে বললাম। নাঃ। কী বলবে? তা ছাড়া আমি তো মাত্র কয়েকদিন হল এসেছি।

মালীর বউও বলেনি?

না। বলেনি। কী? তা বলবে তো?

আমাদের গুড ওল্ড ল্যাংড়া পাহান ম্যান ইটার হয়ে গেছে। গত ছ’ মাসে দশজন মানুষ ধরেছে। তোমার এমন করে খালি হাতে বাইরে বসে থাকা ঠিক নয়। অন্ধকারও তো হয়ে এল।

আমি অবাক হলাম। বললাম, বলো কী? পেট্রোম্যাক্স-আলো জ্বলছে বাড়ি বাড়ি। প্রত্যেকের বাবুর্চিখানাতে রান্না হচ্ছে। এর মধ্যে বাড়িতে আসবে বাঘ? টাইগার? মার্কিগঞ্জের সব বাড়ি কি সুন্দরবনের জেলে-মউলে-বাউলেদের নৌকো হয়ে গেল নাকি?

ডগলাস আমার কথার উত্তর না দিয়ে ওর খাঁকি ট্রাউজার্সের পকেট থেকে টর্চটা বের করে জ্বেলে বারকয়েক চারপাশে ঘুরিয়ে দিল। অন্ধকার হয়ে গেছে ততক্ষণে।

তারপর একটু চুপ করে থেকে ওর বুক পকেট থেকে আধখানা-খাওয়া সিগারেটটি বার করে, ইঙ্গিতে আমার সামনের গোল বেতের টেবলের উপরে রাখা লাইটারটি চাইল।

লাইটারটি এগিয়ে দিতেই আগুন জ্বেলে সিগারেটটি ধরিয়ে এক রাশ ধুয়ো ছেড়ে বলল, তুমি যা ভাবছ, তা নয়। ল্যাংড়া পাহান মার্কিগঞ্জের বাংলো থেকেও মানুষ নিয়েছে।

কাকে?

হতবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম আমি।

মিসেস ভাওয়ালের মালীর ছেলেকে। এবং মিস্টার জনসনকেও।

কোন জনসন? রোনাল্ড জনসন?

ইয়েস স্যার! তবে আর বলছি কী! চলো, আমরা ভেতরে গিয়ে বসি।

এতই যদি ভয়, তা হলে খালি হাতে অন্ধকারে তুমি এতটা হেঁটে এলে কী করে তোমার বাংলো থেকে?

বিরক্ত হয়ে বললাম, আমি।

ডগলাস হাসল। অন্ধকারেও সোনা দিয়ে বাঁধানো দাঁতদুটো ঝিলিক মেরে উঠল।

বলল, লুক! মিস্টার ঋজু বোস। আমার কথা আলাদা। আমি তো মরতেই চাই। জেনিফারই চলে গেল আমাকে ফেলে, আমার জীবনে বাকি আর কী আছে। আমি মরতে চাই বলেই অন্ধকারে একা-একা ঘুরে বেড়াই। আত্মহত্যা করলে মানুষে কাপুরুষ বলবে। কিন্তু বাঘে খেলে তো আর বলবে না। জঙ্গলে যাই। রাতের বেলাও। কিন্তু পাহান তো আমাকে নেবে না। যে যা চায়! বুঝলে মিস্টার বোস, সে, তা ছাড়া, আর সবই পায়। গড ইজ ভেরি মীন। ইয়েস! দ্যাট জেন্টলম্যান ইজ ভেরি মীন ইনডিড!

তুমি এক সেকেন্ড বোসো, আমি রাইফেলটা নিয়েই আসি।

আমি বললাম, ডগলাসকে। বসব বাইরেই। হাতের কাছে রাইফেল থাকতেও আমাদের তুলে নিয়ে যাবে এমন মানুষখেকো বাঘ এখনও ভারতে জন্মায়নি।

ভিতরে গিয়ে প্রথমেই বাবুর্চিখানার দিকে এগোলাম। বাবুর্চিখানাটা খাওয়ার ঘরের সঙ্গে একটি ঢাকা প্যাসেজ দিয়ে জোড়া। বাবুর্চিখানাতে গিয়ে দেখি, ভিতর থেকে দরজাটা বন্ধ। মালী আর তার বউ ঘরের মধ্যে ফিসফিস করে কথা বলছে। প্রেসার কুকারে মুরগি সেদ্ধ হচ্ছে। তার সি-সিঁ আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। দরজায় টোকা মারতেও ওরা দরজা খুলল না। তারপর ডাকতেই ধড়ফড়িয়ে উঠে দরজা খুলল।

শুধোলাম, বাঘোয়া হিয়েপর? আদমি…?

হাঁ মালিক। বড়া তংক করলথু। বড়কা বাঘোয়া।

মালী বলল।

মালীর বউ যোগ করল, ল্যাংড়া পাহান।

আমাকে বলোনি কেন?

না মালিক। ভয়ে বলিনি। যদি আপনি ল্যাংড়া পাহানকে মারতে যান।

তার মানে? তাতে ভয়ের কী? আমি কি বাঘ কখনও দেখিনি? না মারিনি?

না সাহাব। বনদেওতা কা দোয়া হ্যায় উসকো পর, গোলিসে কুছ ভি নেহি কিয়া যায়গা। এ পর্যন্ত তিনজন শিকারি মারতে গিয়েছিল। তিনজনকেই ল্যাংড়া পাহান মেরেছে। একজনকে খেয়েও নিয়েছে। সেই শিকারি রাতে একা বসে ছিল মাচাতে, পাহানকে মারবে বলে। আর মারল পাহানই তাকে। ও, সেই লাশ যদি দেখতেন মালিক!

বললাম, ডগলাস সাহেবের জন্যে কফির জল চড়াও। আমিও খাব এক কাপ। তবে, ব্ল্যাক।

সে বলল, নিয়ে যাচ্ছি কফি হয়ে গেলেই। তারপর বলল, যেমন উনি ভালবাসেন, কফির সঙ্গে ওমলেটও করব কি?

করো।

আমি বললাম।

তারপর বললাম, তোমরা আমাকে ল্যাংড়া পাহানের কথা বলেনি কেন?

ভয়ে।

ভয়ে! কীসের ভয়ে?

আপনার ভয়ে।

মানে?

ওই বাঘ কেউই মারতে পারবে না। ও বন-দেওতার বাঘ। মধ্যে দিয়ে আপনারই প্রাণ যাবে। আপনার প্রাণ গেলে আমাদের কী হবে সাহেব?

যত্তসব বাজে কথা।

ধমকে বললাম আমি।

ওমলেটও ভেজে নিয়ে যাচ্ছি।

মালী বউ বলল।

তা হলে দরজাতে খিল লাগিয়েই থাকবে। আর আরও একটা পেট্রোম্যাক্স ধরিয়ে পেছনের বারান্দাতে রাখো।

বলে, থ্রি-সেভেন্টি-ফাইভ ম্যাগনাম রাইফেলটা এবং দু-রাউন্ড গুলি নিয়ে বাইরে গেলাম। পাঁচ ব্যাটারির টর্চটাও নিয়ে গেলাম। যদিও আমার বাংলোর চারপাশে বড় গাছ নেই, বড়গাছ সব কম্পাউন্ড-এর সীমানার কাছাকাছি। তবু একটা পাহাড়ি নালা আছে বাংলোর কম্পাউন্ডের চারধার দিয়ে। যে-কোনও জানোয়ারের পক্ষেই নালার ভিতরে এবং কম্পাউন্ডের সীমানার বড় বড় হরজাই গাছেদের ছায়াতে লুকিয়ে থাকা খুবই সহজ। গত বছরই মালীর কুকুরটাকে নিয়ে গিয়েছিল একটা চিতা, সন্ধে লাগার সঙ্গে-সঙ্গেই। ওই নালাতেই লুকিয়ে ছিল সেটা।

বাইরে এসেই, চমকে উঠলাম। ডগলাস নেই চেয়ারে। টর্চটা চারধারে ঘুরিয়ে ডাকলাম, ডগলাস, ডগলাস, হোয়ার আর উ্য?

সাড়া নেই। টর্চটা এবার উলটো দিকে ফেললাম।

দেখলাম প্যান্টের বোতাম আটকাতে-আটকাতে ডগলাস অন্ধকার কুঁড়ে আমার দিকে আসতে-আসতে বলল, সুইচ ইট অফফ মিস্টার বোস। মাই মেডালস আর শোয়িং।

এর উত্তরে আর কী বলা যায়। জঙ্গলের জায়গাতে ছোট বাইরে করতে পুরুষেরা বাথরুমে যানই না। রাতে তো নয়ই।

রাইফেলটাকে কোলের উপর আড়াআড়ি করে রেখে, গুলি দুটি টেবলের উপরেই রাখলাম। মার্কিগঞ্জে নিজের বন-বাংলোতে সন্ধেবেলা গুলি-ভরা রাইফেল হাতে বসে থাকতে হবে এমন ভাবনাও নিজেকে বে-ইজ্জৎ করল।

ডগলাস কাছে এসে চেয়ারে বসলে, বললাম, তোমার কথা সব দেখছি সত্যিই! মালী তো তাই বলল। তুমি কিন্তু এমন কোরো না। প্রিকশান নিয়ো।

ডগলাস ইংরিজিতে যা বলল, তার সারাংশ করলে দাঁড়ায়: ও যমেরও অরুচি। তাই যমের নৈবেদ্য হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই দারিদ্র্য, আর একাকিত্বর জীবন ও আর বইতে পারছে না। তবু যম তাকে দয়া করছে কোথায়?

রাতে তুমি যেয়ো না। আমার এখানেই থেকে যাও। আমি বললাম।

মাথা খারাপ! জেনিফার বুঝি রাগ করবে না? আমি সময়ে না ফিরলে! ও খুব চিন্তা করে আমি সময়মতো না ফিরলে। ওর খাটটা, ওর চেয়ারটা সব আমাদের বেডরুমে যেমন থাকার তেমনই আছে। ওই চেয়ারে বসেই ও উল বুনত, লেস বুনত, বাইবেল পড়ত। আর ওই খাটেই ও শুত। ও চলে গেছে বটে, কিন্তু ও আমার কাছে কাছেই থাকে সবসময়।

তারপর একটু চুপ করে থেকে বলল, আচ্ছা, মিস্টার বোস, মানুষ মরে কোথায় যায় বলতে পারো?

জানি না। ভাবিনি, তেমন করে কখনও। নিজে মরলে বলতে পারব।

আমি কিন্তু সবসময়ই ভাবি। তুমিও একটু ভেবো। জেনির সঙ্গে আমার কি দেখা হবে? আমি যদি তাড়াতাড়ি যাই?

মালীর বউ, কফি, আর ওমলেট নিয়ে এল।

বললাম, ডগলাস, আজ আমার সঙ্গে ডিনার খেয়ে এখানে থেকেই যাও রাতটা।

ডগলাস কথা বলার সময়ে বাঁ হাতটাকে হাতপাখার মতো নাড়িয়ে নাড়িয়ে কথা বলত সবসময়। হাত নাড়িয়ে বলল, আউট অফ দ্যা কোয়েশ্চেন।

তা হলে, তুমি আমার একটা বন্দুক নিয়ে যাও সঙ্গে। গুলি ভরে দিচ্ছি।

আই ডোন্ট নিড ওয়ান। আমি তো মরতেই চাই। ল্যাংড়া পাহানের হাতে মরলে, ডেথ উইল বি অ্যাজ শিওর অ্যাজ ডেথ অ্যালোন কুড বি। পাহান আমাদের ওল্ড চ্যাপ। নোন চ্যাপ। নাইস-গাঈ।

তারপর বলল, আ গান টু অ্যাভয়েড ডেথ?

তারপরই বলল, ওর কি দয়া হবে? আমার উপরে?

এই কথা বলে ও অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। আমিও চুপ করে রইলাম। অনেকক্ষণই।

অনেক বছর পরেই এসেছি আমার এই বড় প্রিয় জায়গায়। মাঝে চার বছর। বাইরে বাইরেই ছিলাম। দেশে ফিরেছি মাত্র দেড় মাস হল। সপ্তাহখানেক হল এসেছি মার্কিগঞ্জে। স্বদেশের সঙ্গে কোন দেশের তুলনা?

ভাবছিলাম, ডগলাসের বোধহয় একটু মাথার গোলমাল হয়েছে। পরে মিঃ হল্যান্ডকে জিজ্ঞেস করতে হবে। মিঃ সেটনই ডগলাসের বাড়ির সবচেয়ে কাছে থাকেন যদিও।

ওর ওমলেট আর কফি খাওয়া হয়ে গেলে বললাম, তোমাকে আমি এভাবে ছেড়ে দিতে পারি না। চলো, তোমার বাংলো অবধি পৌঁছে দিয়ে আসি।

ডগলাস হেসে উঠল।

বলল, ইটস ভেরি সুইট অব ইউ ইনডিড টু হ্যাভ সেইড দ্যাট। জোকস এপার্ট, আই রিয়্যালি ওয়ান্ট টু ডাই! আমি সত্যিই মরতে চাই। মিস্টার বোস।

মরতে চাও, সে খুউব ভাল কথা। কিন্তু আমি তোমার খুনের দায়ে পড়তে রাজি নই। তোমার বাড়ির পথ গভীর জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে গেছে প্রায় দু-ফার্লং। যেখানে ম্যানইটার বাঘ অপারেট করছে, সেখানে অমন পথে কেউ রাতে যায়?

ডগলাস বেগতিক দেখে একটু ভেবে বলল, চলো, তা হলে। তুমি যখন মরতে দেবেই না।

উঠলাম আমরা। মালীকে ডেকে সাবধানে থাকতে বললাম বাবুর্চিখানার দরজা বন্ধ করে। আমি না-ফেরা অবধি।

আমার বাংলোর কম্পাউন্ড প্রায় কুড়ি বিঘার। নানা জংলি গাছও আছে। তবে এখন এপ্রিলের শেষ, গাছগুলোর পাতা প্রায় সবই ঝরে গেছে। তবে আমাদের বনে প্রায় সব গাছই পর্ণমোচী যদিও, সব গাছেরই পাতা যে একই সময়ে ঝরে, তা কিন্তু নয়। কিছুর পাতা ঝরে শীতে, কিছুর বসন্ত-শেষে, কিছুর আবার শরতে। প্রকৃতির এমন নিতুই-নব-লীলা পৃথিবীর আর কোথায় আছে?

নীচেও আর আগাছা নেই এখন। অনেক দূর অবধি পরিষ্কার দেখা যায়। কোনও জানোয়ার, বিশেষ করে বাঘের মতো বড় জানোয়ার এমন ফাঁকা জায়গাতে এলে, যার কিছুমাত্র শিকারের অভিজ্ঞতা আছে, তার চোখ বা কান এড়িয়ে আসতে পারবে না। পারবে না বলব না। বাঘের মতন এমন ক্যামোফ্ল্যাজ করার ক্ষমতা পৃথিবীর খুব কম প্রাণীরই আছে। এমন নিঃশব্দে চলাফেরাও আর কোনও জানেনায়ারই করতে পারে না। তবু যদি পারে, তবে তারও মুশকিল হবে। বাঘও শিকারি কিন্তু শিকারিও তো শিকারি। বাঘের কিছু গুণ তো তাদেরও আছে!

সেদিন বোধহয় শুক্লপক্ষের অষ্টমী কি নবমী হবে। ক্রমশই চাঁদটা জোর হচ্ছে। মার্চের শেষে দোল গেছে। এপ্রিলের পূর্ণিমাও বনে-জঙ্গলে এবং আমার এই মার্ফিগঞ্জে বড় চমৎকার। নেশা লাগে দমক-দমক হাওয়ায় মহুয়া আর করৌঞ্জের। আর বাংলোগুলির হাতার মধ্যে মধ্যে লাগানো আম কাঁঠালের মঞ্জরী আর মুচির গন্ধে।

চলতে চলতে ডগলাস বলল, আমি তো চাকরির কারণে মধ্যপ্রদেশে ছিলাম এত বছর। গভীর জঙ্গলে। যত ম্যানইটারের কথা শুনেছি সেখানে, লেপার্ডের কথা বলছি না, টাইগার, তারা তো দিনের বেলাই মানুষ ধরত। রাতে ধরতে তো বিশেষ শুনিনি।

ল্যাংড়া পাহান তো তার ছেলেবেলা থেকেই এই বস্তিগুলোর আর মার্কিগঞ্জের চারপাশের জঙ্গলেই বড় হয়ে উঠেছে। এই অঞ্চলের লোকজনকে এবং তাদের অভ্যাস-অনভ্যাস ল্যাংড়া পাহানের লেপার্ডদের মতোই ভাল করে জানা হয়ে গেছে। মানুষের ভয়-ডরও আর ওর নেই। সে কারণেই বোধহয়…।

আমি একটু চুপ করে থেকে বললাম, ইটস আ গেসস ডগলাস। তুমি যা বলেছ, তাই ঠিক। বড় বাঘ মানুষখেকো হলে দিনেই মানুষ ধরে সাধারণত। রাতে যে একেবারেই ধরে না, তা যদিও নয়।

ছোট, জরাজীর্ণ ওর দু’কামরার বাংলোতে পৌঁছে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমাকে গুডনাইট করল ডগলাস। আমিও গুডনাইট করে ফিরলাম।

কিছুটা আসার পরই সেই জঙ্গলে এসে পড়লাম। জঙ্গলটার মধ্যে দিয়ে সাবধানে ফিরছিলাম। হঠাৎ হিস্ শব্দ শুনে চমকে উঠে টর্চ ফেললাম। মস্ত একটা অশ্বত্থ গাছ এখানটাতে। কখনওই এর পুরো টাক পড়ে না মাথায়। পিছনে একটা নালা থাকায় অনেক পাতাই সবুজ থাকে। আশ্চর্য। তার ঠিক গুঁড়ির কাছেই একজোড়া বিরাট শঙ্খচূড় সাপ প্রায় এক মানুষ উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মাটি থেকে। ফণায়ফণায় জড়াজড়ি করে। শঙ্খ লেগেছে।

কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলাম। ওরা নিজে থেকেই সরে গেল। আমি আবার আমার পথে এগোলাম। জংলি লোকেরা বলে, এমন ভাবে সাপকে দেখলে নাকি মানুষ রাজা হয়।

আমিও হব হয়তো কোনওদিন, কে বলতে পারে?

চলতে-চলতে ভাবছিলাম, ডগলাস এরকম নির্জন জায়গাতে একেবারেই একা থাকে। ওর নিয়ারেস্ট নেবার সেটন। কিন্তু মার্কিগঞ্জের প্রত্যেক বাংলোর সঙ্গেই দশ পনেরো কুড়ি তিরিশ বিঘা করে জঙ্গল থাকে। তা পরিষ্কার করে চাষাবাদও করেন খুবই স্বল্প মানুষে। তা ছাড়া জঙ্গল আছে বলেই না এত জায়গা থাকতে আমি এখানের এই বাংলো কিনেছিলাম। যে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান ভদ্রলোকের ছিল বাংলোটি, তিনি অস্ট্রেলিয়াতে চলে যাচ্ছিলেন এটি বিক্রি করে দিয়ে। এ অঞ্চলের অধিকাংশ বাংলোই এক সময়ে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদেরই ছিল।

প্রত্যেক বাংলোর সঙ্গেই বিরাট জঙ্গল থাকে বলেই পাশের বাংলোতে যেতে হলেও অনেকখানি পথ হেঁটে যেতে হয়।

তা ছাড়া, পথ তো জঙ্গলের আর পাহাড়ের মধ্যে দিয়েই।

ডগলাসের বাড়িতে এখন আর কোনও চাকর-বাকর, মালীও নেই। ওদের একটিই মাত্র মেয়ে। সে একটি বিহারী আই. পি. এস. ছেলেকে বিয়ে করে, জব্বলপুরে। তার স্বামী পুলিশের ডিআইজি, বিহার ক্যাডারের। মেয়েও টাকা পয়সা পাঠায় না কিছু। বছরে একটি চিঠি লিখেও খোঁজ নেয় না। জেনিফারের মৃত্যুর সঙ্গে-সঙ্গে তার পেনশানও বন্ধ হয়ে গেছে। ডগলাস যা পেনশান পায়, তাতে কুকুরেরই চলে না, তায় মানুষের! একা থাকে বলেই ওর জন্যে আমার চিন্তা হতে লাগল। এমন নির্জনে যখন-তখন যা-তা ঘটতে পারে, যদি ল্যাংড়া পাহান সত্যি সত্যিই মানুষখেকো হয়ে গিয়ে থাকে। কে জানে! কেন ও ম্যানইটার হল?

চারদিকের জঙ্গল কাটা হচ্ছে। শুয়োরের মতন, গিনিপিগের মতন বাড়ছে। মানুষ। পৃথিবীর সব গাছ, সব মাঠ, সব ফুল, সব পাখি ধ্বংস না করা অবধি এই খাই-খাই করা দুপেয়ে জন্তুরা থামবে না!

.

পরদিন সকালেই ব্রেকফাস্টের পরে রেঞ্জারের অফিসে গিয়ে পাহান কোথায় কোথায়, কবে কবে মানুষ নিয়েছে, তার সঠিক একটা বিবরণ বিস্তারিত লিখে নিলাম। একটা ম্যাপও এঁকে ফেললাম।

আমি আসার একদিন আগেই, তেরো বছরের একটি মেয়েকে নিয়েছে ফুলফুলিয়া গ্রাম থেকে। মেয়েটির মা অজ্ঞান হয়ে রয়েছে এখনও মেয়ের শোকে।

রেঞ্জার সাহেব বললেন, আমাকে নাকি কলকাতায় চিঠিও পাঠিয়ে ছিলেন। কনজারভেটর সাহেবকেও উনি গতকালই খবর পাঠিয়েছেন। জানিয়েছেন আমার আসার কথা। আমি এসে পড়ায়, অন্য কোনও শিকারিকে ওই বাঘ মারার পারমিট ওঁরা আপাতত দেবেন না।

বললেন যে, চিপাদুরার ঠিকাদার সর্দারজি গুরনাম সিংকে দিনদশেক আগে পারমিট দিয়েছিলেন। কিন্তু সর্দারজির এ বাঘ মারাতে বিশেষ উৎসাহ নেই। সে হরিণ-শম্বরের চোরাশিকারি।

যে-তিনজন শিকারিকে ল্যাংড়া পাহান এ-পর্যন্ত মেরেছে, তাদের মধ্যে একজন চিপাদুরার, একজন সদরের আর অন্যজন এখানেরই।

রেঞ্জারসাহেবকে আমি শুধোলাম, কেউ কি এ পর্যন্ত বিট করিয়েছিল বাঘকে বের করার জন্যে?

রেঞ্জারসাহেব হাসলেন।

বললেন, ম্যানইটার বাঘ বা লেপার্ডকে বিট করতে তো রাজি হয় না গ্রামের লোক। তা ছাড়া, এ বাঘ, এদের সকলেরই ধারণা, এক বিশেষ বাঘ। যারাই তাকে ইদানীং দেখেছে, তাকে শিকার করতে গেছে সকলেই এ কথা বলে। আপনিও বিশেষ সাবধান হবেন বোসোহেব। বহতই খতরনাগ হ্যায় ঈ বাঘোয়া। মামুলি বাঘোয়া মত শোচিয়ে ইসকো!

পরদিন সকালে পেয়ারাতলিতে বসে চা খেয়ে সবে জমিয়ে পাইপটা ধরিয়েছি, ঠিক এমন সময় প্রচণ্ড গতিতে সাইকেল চালিয়ে খাকি পোশাকের একজন ফরেস্ট-গার্ড গেট দিয়ে ঢুকল, চাকায় লাল ধুলো উড়িয়ে, লাল কাঁকুড়ে-মাটিতে কিরকির আওয়াজ তুলে।

এতই আচম্বিতে খোলা-গেট দিয়ে ঢুকে পড়েছিল সে কারও অনুমতি না নিয়ে এবং এত জোরে সাইকেল চালাচ্ছিল লোকটা যে, তার বদতমিজীতে চটে গিয়ে মালীর কালো কুকুর কালু তাকে ধাওয়া করে সাইকেলের পেছন পেছন আসতে লাগল তারস্বরে চেঁচাতে-চেঁচাতে।

গার্ড সাইকেল থেকে নেমেই সেলাম করল। একটা চিঠি দিল। রেঞ্জারের চিঠি।

তাড়াতাড়ি খুলে দেখি, লিখেছেন, কাল ভোরে একটা নতুন কিল হয়েছে। মার্কিজ নোজ-এর কাছে। কাল খুব দেরিতে জানতে পারায় গার্ড রেঞ্জ অফিসে এসে জানাতে পারেনি, রাতে জানিয়ে লাভও ছিল না। তার আসার সাহসও ছিল না। এই গার্ড কিল কোথায় আছে, তার আন্দাজ জানে। যা ভাল মনে করার করবেন। চিঠি পাওয়া মাত্র রওনা হতে পারেন। কিন্তু আবারও বলছি, খুব সাবধান। এ বনদেওতার বাঘ।

তক্ষুনি চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ে, মালী আর তার বউকে আমাদের দু’জনের জন্যে খুব তাড়াতাড়ি নাস্তা তৈরি করতে বলে, চান করতে চলে গেলাম। হাতে অনেকই সময় আছে।

গার্ডের নাম যুগলপ্রদ। জাতে সে কাহার। নাস্তা করতে করতে ও ল্যাংড়া পাহানের কীর্তিকলাপ সম্বন্ধে আমাকে অনেক কিছুই বলল। বলল, কীভাবে মানুষ নিচ্ছে, কী করে আমাদের নির্বিরোধী ভালমানুষ প্রতিবেশী ল্যাংড়া পাহান মানুষখেকো হল মানুষেরই দোষে, সেই সব গল্প।

যুগলপ্রসাদ এবং রেঞ্জারসাহেবেরও দৃঢ় ধারণা যে, বছরখানেক আগে রাঁচী থেকে যে একদল শিকারি জিপে করে রাতে ফরেস্ট-গেট ভেঙে এসেছিল স্পট লাইট নিয়ে, চুরি করে শিকার করতে, তাদেরই এলোপাথাড়ি চালানো গুলিতে পাহান আহত হয়ে থাকবে।

এরা আসলে সব হরিণ-মারা, খরগোশ-মারা শিকারি। বাঘের মোকাবিলা করার সাহস বা ইচ্ছা এদের কোনওকালেই ছিল না। ল্যাংড়া পাহান’ তাদের সামনে পড়ে যাওয়াতে  বাঘ-শিকারি হওয়ার লোভ সামলাতে না পেরে, জিপ এর উপরেই দাঁড়িয়ে শটগান-এর এল-জি দিয়ে দু-তিনজন একসঙ্গে গুলি করে। ল্যাংড়া পাহানের নাকি দাঁত ভেঙে যায় তাতে। এবং সামনের ডানদিকের পাটাও চোট পায়। বেচারার আর দোষ কী? স্বাভাবিক জীবন যদি যাপন করতে পারত তবে সে কেন মানুষ মারতে যাবে?

যুগলপ্রসাদ উষ্মার সঙ্গে বলল, প্রথমে ওইসব শিকারিদেরই গুলি করে মারা উচিত সাহেব আপনার। তার পরেই না হয় আমাদের বচপনকা সাথী ল্যাংড়া পাহানকে মারার তোড়জোর করবেন।

আমি বললাম, বলেছ তুমি ঠিকই।

রওনা হওয়া গেল। আমি যুগলপ্রসাদের সাইকেলের কেরিয়ারে বসলাম। রাইফেল কাঁধে ঝুলিয়ে। বন্দুকটার ব্যারেল আর স্টক ‘Lamb’s Leg’-এ পুরে ওকে দিলাম। আলাদা করে ঝুলিয়ে নিল যুগলপ্রসাদ, সাইকেলের হ্যান্ডলে। অন্য জিনিসপত্রও ওইভাবেই নিল।

মাইল-দুয়েক ঢামনার দিকে গিয়ে বড় কাঁচা রাস্তা ছেড়ে, একটা সরু পায়ে-চলা ফরেস্ট রোডে ঢুকে পড়ল যুগলপ্রসাদ। বলল, মাফিজ নোজ-এ যাবার এটাই সবচেয়ে শর্টকাট রাস্তা।

যাকে মেরেছে, সে ছেলে না মেয়ে?

আমি জিজ্ঞেস করলাম।

হুজৌর! সকাল বেলা দূর থেকে দেখেছে হুডকু। দেখেছে, ল্যাংড়া পাহান তার বাবা লক্ষ্মণকে কিছুটা খেয়ে, তার লাশ টেনে নিয়ে যাচ্ছে।

হুডকু? হুকুটা আবার কে?

আমি জিজ্ঞেস করলাম।

লক্ষ্মণই বা কে?

হুডকু হচ্ছে আমাদের লক্ষ্মণ সিং শিকারির ছেলে। ল্যাংড়া পাহানকে মারবার পারমিট লক্ষ্মণ সিংকে দেওয়া হয়নি। ওর গাদা-বন্দুক আছে একটা। লক্ষ্মণের জিগরী দোস্ত ঝাড়কে ল্যাংড়া পাহান মেরে খেয়ে ফেলার পরই ওই গাদা বন্দুক নিয়েই বাহাদুরি এবং বদলাও নেবার জন্যে তক্কে তক্কে ছিল লক্ষ্মণ। লক্ষ্মণের ওরকম মর্মান্তিক মৃত্যুর পর থেকেই হুকু ছেলেটা সারা দিন বাবার বন্দুকটা হাতে করে জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে বেরিয়েছে।

হুকুর বয়স কত?

কত আর হবে! তেরো-চোদ্দো।

অতটুকু ছেলে! ও কী করছে জঙ্গলে? এই বাঘ মারবে ও?

বন্দুকটার নল ওর প্রায় কাঁধ-সমান লম্বা। তাতে কী হয়? ছেলের উৎসাহ এবং সাহসের কমতি নেই। বাপকা বেটা সিপাহিকো ঘোড়া, কুছ নেহি তো থোড়া-হোড়া!

তোমরা সব আশ্চর্য মানুষ তো! সদ্য বাবা-হারানো ছেলেটাকে একা ছেড়ে দিলে যমের মুখে!

যমের মুখে কে আর শখ করে যেতে চায় হুজৌর।

তারপর আমি জিজ্ঞেস করলাম, শিকার করতে জানে হুডকু?

তা জানে। তবে, বড়জোর খরগোশ বা কোটরা মেরে থাকবে দু একটা। বাপই শিখিয়েছিল। একটা মাত্র ছেলে। মা কেঁদে-কেঁদে মরছে। কারও কোনও কথাই শোনেনি। ও-ও মরবে। ওয়াক্ত হয়েছে। ও একেবারে ভোরভোর দেখেছে ল্যাংড়া পাহান কী যেন হেঁচড়ে হেঁচড়ে টেনে নিয়ে চলে যাচ্ছে, মার্কিকা নাককা তল্লেমে। কিন্তু কারোকে জানায়নি৷ রেঞ্জারসাহেবকে, মোষের গাড়ি আসছিল চারটে সিজুয়া বাগ থেকে, সেই গাড়োয়ানেরাই সন্ধের মুখে মার্কিগঞ্জে খবর দিয়েছে। মৃত্যুভয় বড় ভয় হুজোর।

আরও মাইল-তিনেক গিয়ে যুগলপ্রসাদ বলল, এবার সাইকেল ছেড়ে আমাদের হেঁটে যেতে হবে হুজৌর।

সাইকেলটা একটা বড় শিমুল গাছের গোড়ায় রেখে, আমার হ্যাঁভারস্যাক, জলের বোতল আর ল্যাম্বস-লেগটাকে কাঁধে নিয়ে এগোল যুগলপ্রসাদ, পিছন-পিছন আমি, রাইফেল-হাতে।

অনেক অচেনা পথ, শুকিয়ে-যাওয়া পাহাড়ি ঝরনা দুটি ছোট পাহাড় টপকে আমরা একটি চওড়া নদীর শুকনো বুকে এসে পৌঁছলাম।

নদীটিকে দেখেই চিনলাম। ঘুংঘটিয়া নদী। এ নদীটি এখন প্রায় শুকনো। মার্ফিগঞ্জের চারপাশ দিয়ে, মালার মতো গোল হয়ে ঘুরে গেছে। এবং মিশেছে গিয়ে সব-সময় জল-থাকা সিতাওন নদীতে।

মনে পড়ল, এই ঘুংঘটিয়া নদীরই পুবদিকে নদীর পাশের গুহার কাছে। ভালুকের ছবি তুলতে গিয়েছিল একবার ডগলাস। তখন তার ফ্লানেলের প্যান্ট এবং পেছনের এক কেজি দু’শো গ্রাম মতো মাংস একটি পয়সাও না দিয়ে খুবলে নিয়েছিল অভদ্র কিন্তু রোগা-দুর্বল একটা ভালুক। সে অনেক বছর আগের কথা।

সেই মাংস দিয়ে সেই ভালুক ভিডালু বানিয়েছিল, না কাবাব, তা অবশ্য জানা নেই।

এই এলাকাতেই হুডকু নাকি ল্যাংড়া পাহানকে দেখেছে।

বালিতে ভাল করে খুঁজতে লাগলাম আমরা বাঘের পায়ের দাগ।

কাল মাঝরাতে এক চোট ঝড়-বৃষ্টি হয়ে গেছে। থাবার দাগ-টগ সব মুছে গেছে। ঝড়ে-ওড়া লাল-হলুদ-খয়েরি শুকনো পাতা আর কুটো ছড়িয়ে আছে বালির উপর। এখনও বেশ ঠাণ্ডাই আছে।

একটা বনমোরগ ডেকে উঠল হঠাৎই আমাদের সামনে থেকে কক কক করে। ভয়-পাওয়া ডাক। এখানে বাঁদর বেশি নেই। ময়ুরও নেই। টিটি পাখির একটি ছোট্ট দল হঠাৎ ওদের ল্যাগব্যাগে পা-দুলিয়ে উড়ে গেল আমাদের থেকে একশো গজ দূরের একটি ঝোপ থেকে।

বন্দুকে গুলি ভরে আমি জায়গাটার দিকে সোজাসুজি না গিয়ে একটু ঘোরা পথে এগোলাম।

যুগলপ্রসাদকে ফিসফিস করে বললাম, নদীর পাড়ের একটা বড় পাথরের উপর বসে থাকতে। রাইফেলটা গুলি ভরে ওর হাতে দিলাম।

ও বলল, একবার চালিয়েছিল ও, ওর বড় সম্বন্ধীর টোপিওয়ালাবন্দুক। জেঠ-শিকারের সময়।

টোপিওয়ালা বন্দুক মানে, গাদা বন্দুক।

বললাম, বড় সম্বন্ধীর টোপিওয়ালা বন্ধুক ছুঁড়েছ, বেশ করেছ। বাঘ একেবারে তোমার ঘাড়ে এসে না চড়লে, এই যন্ত্র গুলি করবে না। আর পেছন দিকে নজর রাখবে।

যুগলপ্রসাদ বলল, কার পেছন দিকে?

আঃ তোমার পেছন দিকে।

ও বলল, জী হাঁ! অব সমঝা।

তারপরই আমার কী মন হওয়াতে রাইফেলটা ‘সেফ’ করে ওকে দিয়ে বন্দুকটাই আমি নিলাম। কারণ শর্ট-রেঞ্জে বন্দুক রাইফেলের চেয়ে অনেকই বেশি কার্যকরী। তা ছাড়া, ধাক্কাটাও বেশি লাগে। যার গায়ে গুলি লাগে তার।

ওকে সেই পাথরের উপরে চড়িয়ে দিয়ে খুব সাবধানে কিছুটা এগিয়েছি। কিল অথবা ড্রাগ-মার্ক কিছুরই হদিশ নেই। বাঘের পায়ের থাবার দাগেরও নয়।

হঠাৎই একটা শিস শুনে চমকে উপরে তাকালাম। একটা শিশু গাছের উপরের ডাল থেকেই শিসটা এল। কিন্তু ঠিক কোথা থেকে এল তা অনুমান করার চেষ্টা করছি, এমন সময় হঠাৎ চোখে পড়ল ছেলেটাকে। ভেঁড়া, আধ-নোংরা ধুতি-পরা, খালি-গায়ের ছেলেটা আঙুল দিয়ে ওর সামনের, কিন্তু দুরের কোনও কিছুর প্রতি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। ও বারে বারে আঙুল তুলছিল। কিন্তু নিঃশব্দে। বেশ অনেকখানি সাবধানে, নিঃশব্দে এগিয়ে যাবার পর দেখলাম সামনে একটা বেশ বড় কালো পাথর। বেশ উঁচুও। তার উপরে খুব সাবধানে নিঃশব্দে উঠেই দেখি, বাঘটা! বাঘটার দিকেই ছেলেটা আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছিল। বাঘটা যে ল্যাংড়া পাহান, তা দেখেই বুঝলাম। অদ্ভুতভাবে একটু সামনে ঝুঁকে ও এগিয়ে চলেছিল। তবে অনেকই দূরে ছিল বাঘ। হাত কামড়াতে ইচ্ছে করছিল আমার রাইফেলটা যুগলপ্রসাদকে দিয়ে বন্দুকটা আনলাম বলে। ল্যাংড়া পাহান বন্দুকের রেঞ্জের বাইরে ছিল, যখন প্রথম দেখলাম তাকে, তখনও।

ঝোপ-ঝাড়ের মধ্যে-মধ্যে ঢাল বেয়ে চলে-যাওয়া ল্যাংড়া পাহানের দিকে তাকিয়ে কী করব ভাবছি, এমন সময়েই ব্যাপারটা ঘটল। গদ্দাম করে, গাছে বসা হুকু তার হাতের একনলা গাদা বন্দুক দিয়ে আমার পেছন থেকে বাঘের দিকে গুলি করে দিল।

গুলির শব্দে চমকে উঠে আমি ওর দিকে তাকালাম। ওকে দেখা গেল না কিন্তু পরক্ষণেই প্রচণ্ড গর্জনের সঙ্গে ঝোপ-ঝাড় ভাঙার আওয়াজ হল। এবং সঙ্গে সঙ্গেই আড়াল নিল বাঘ। আড়াল নিয়ে অতি দ্রুত ল্যাংড়া পাহান কানাডিয়ান স্টিম ইঞ্জিনের মতো জঙ্গল-পাহাড় গাছ-পাথর ভেঙে তছনছ করে অদৃশ্য হয়ে গেল। হুকুর বন্দুকের আওয়াজ গাছের ওপর থেকে হয়েছিল। তবু শিকারি কোথায় ছিল তার একটা আন্দাজ পাহান করেছিল সঙ্গে সঙ্গেই।

বেশ কিছু দূরে চলে গিয়ে আবারও গর্জন করল একটা। সারা বন পাহাড় থরথর করে কেঁপে উঠল তাতে। এবং সেই দ্বিতীয় গর্জনের দাপটেই বোধহয়, পাকা ফলেরই মতো হুডকু গাছ থেকে সোজা নীচে পড়ল ধুপ করে। তখুনি দৌড়ে তার কাছে গেলাম। নীচে বালি ছিল বলে, সে-রকম চোট লাগেনি। তা ছাড়া, সে তো আর শহুরে মাখনবাবু নয়। কিন্তু লাফিয়ে পড়াতে বন্দুকটার নল পাথরে ঠুকে গেছিল। বন্দুকটার নলের মুখের উপর নিশানা নেবার জন্যে যে মাছি থাকে, সেটা দুমড়ে মুচড়ে বেঁকে গেছে দেখলাম। ততক্ষণে যুগলপ্রসাদও দৌড়ে এসেছে।

ল্যাংড়া পাহানের গর্জন আরও একবার শোনা গেল। সিতাওন উপত্যকার দিক থেকে। মনে হল, আরও দূরে চলে গেল সে।

বুঝলাম যে, কপালে অশেষ দুর্ভোগ আছে আমার!

যুগলপ্রসাদ হুডকুকে অনেক করে জিজ্ঞেস করল। কোনও উত্তরই দিল না হুডকু। চোখ বড় বড় করে আমার দিকে ফিরে যুগলপ্রসাদ বলল, বোবা হয়ে গেছে ছেলেটা। সেদিনও আমার সঙ্গে কত্ত কথা বলল!

হুকুর চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছিল, আর ও আঙুল দিয়ে ল্যাংড়া পাহান যে দিকে গেছে, সেদিকেই দেখাচ্ছিল বারবার। ওর মনের মধ্যে ওর মৃত বাবার প্রতি ওই ভালবাসা আর বাঘের প্রতি প্রতিহিংসা মিলে এক আশ্চর্য ভাব ফুটে উঠেছিল।

ভারী কষ্ট হল ছেলেটাকে দেখে। বেপরোয়া, সাহসী এবং পিতৃভক্ত ছেলে যে-বাবার থাকে, সে বাবা ভাগ্যবান নিশ্চয়ই!

যুগলপ্রসাদ বলল, মড়ি কোথায়?

হুডকু আঙুল দিয়ে, পাহান যেদিকে গেছে, সেদিকেই দেখিয়ে দিল।

যুগলপ্রসাদ যখন ওর সঙ্গে ফিসফিস করে কথা বলছিল, আমি উঠে রাইফেলটা যুগলপ্রসাদের হাত থেকে নিয়ে এগিয়ে গেলাম। বেশি দূর যেতে হল না। হঠাৎই সকালের সুগন্ধি হাওয়াটা ফিরল। এবং ফিরতেই দুর্গন্ধে নাক ভরে উঠল। বমি পেতে লাগল। একটু গিয়েই একটা দোলামতো ছায়াতে দেখা গেল দেহটা। জুতো-মোজা সুদ্ধ অক্ষত মানুষের একটি পা বেরিয়েছিল অদ্ভুত ভঙ্গিমায়।

অবাক কাণ্ড। ভাবলাম অবশ্যি, এখানের গাঁয়ের মানুষেরা তো জুতো পরে না। কাছে গিয়ে দেখি, শরীরের প্রায় পুরোটাই খেয়ে গেছে। কিন্তু মুখটা অবিকৃত। বাঁ গাল থেকে এক খাবলা মাংস খেয়েছে শুধু। আর বাঁ কানটা। আরও কাছে যেতেই চমকে উঠলাম আমি। এ কী! এ যে ডগলাস!

চেঁচিয়ে ডাকলাম যুগলপ্রসাদকে। ও দৌড়ে এল। কিন্তু হুকু যেমন বসেছিল, তেমনিই বসে রইল।

বললাম, দ্যাখো কে?

হা রাম! ইয়ে তো ডগলস সাব! হা রাম!

চেঁচিয়ে উঠল যুগলপ্রসাদ।

ডগলাসকে ওরা ডগলস সাব বলত। যেমন ম্যাকফার্সনকে বলত ম্যাকফু। ওই অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের কলোনিতে সাহেবদের ছড়াছড়ি। যদিও এখন বেচারাদের মধ্যে অনেকেই উপোসি।

এতক্ষণ ল্যাংড়া পাহানের সঙ্গে আমার ঝগড়াটা ছিল ন্যায়-অন্যায় নিয়ে। এখন ঝগড়াটা হয়ে দাঁড়াল ব্যক্তিগত আক্রোশের। ডগলাস-এর মুখটা মনে পড়ল।

মরতেই তো চাই। আমি তো তাই চাই।

কানে ভেসে উঠল ওর গলার স্বর।

ভেবে পেলাম না ডগলাস কী করতে রাতের বেলা জঙ্গলে ঢুকেছিল? এবং এতদূর এসেছিল। পাহান তাকে মার্কিগঞ্জে ধরলে, এত কষ্ট করে তাকে টেনে আনবে কেন? একজনকে যখন ধরে কাছাকাছিই খেয়েছে।

ডগলাস যেখানে পড়ে আছে, সেখানে ল্যাংড়া পাহান খুব সম্ভব আর ফিরবে না গুলির শব্দের পর। মাথার মধ্যে চক্কর উঠল। ডগলাসকেই যদি মারল পাহান তবে লক্ষ্মণ শিকারি কোথায় গেল? তার লাশ?

ফুলদাওয়াই আর জিরহুল সবে ফুটতে আরম্ভ করেছে এ দিকের জঙ্গলে। আমরা সকলে অনেক ফুল মুঠো করে এনে মৃতদেহের উপর ছড়িয়ে দিলাম।

ওদের দুজনকে তক্ষুনি চলে যেতে বললাম আমি। যাতে সন্ধের আগে আগেই মার্ফিগঞ্জে পৌঁছতে পারে। এখন প্রায় একটা বাজে। সকালে আমরা কম পথ আসিনি। সবটাই প্রায় চড়াইয়ে। হ্যাঁভারস্যাক আর রাইফেলটা যুগলপ্রসাদের কাছ থেকে নিয়ে দোনলা বন্দুকটাতে একটা বল আর একটা এল-জি পুরে হুকুর হাতে দিলাম।

সে, কথা না বলে ফিরিয়ে দিল বন্দুকটি আমারই হাতে।

যুগলপ্রসাদকে বললাম, কাল সকালে মালীর কাছ থেকে কিছু খাবার আর ফ্লাস্কে গরম চা নিয়ে রিহানতোড়ির বড় মহুয়াগাছটার নীচে অপেক্ষা করতে। আর বললাম, বন্দুকটাও যেন সঙ্গে আনে আসার সময়। খালি হাতে আমার অপেক্ষায় না-বসে থাকে। আর কাল বেলা বারোটার মধ্যে যদি আমি না ফিরি, তা হলে যেন রেঞ্জারসাহেবকে খবর দেয় আমার লাশের খোঁজ করার জন্যে।

হুডকু ঘোলা দৃষ্টিতে একবার আমার দিকে তাকাল। আশ্চর্য! একটাও কথা বলল না আমাদের কারও সঙ্গেই।

যুগলপ্রসাদ বলল, লওট চালিয়ে হুজৌর! ইয়ে শের তো নেহি হ্যায়, ইয়ে বন-দেওতাকা…।

আমি উত্তর না দিয়ে, ওদের চলে যেতে বললাম, হাত দিয়ে।

.

ওরা চলে গেল। আমিও হ্যাঁভারস্যাকটা কাঁধে তুলে জলের বোতলটা নিয়ে এগোলাম। মনটা বড়ই খারাপ লাগছিল ডগলাসের জন্যে।

ডগলাস একসময় মার্ফিগঞ্জে আমার বাংলোর কেয়ারটেকারও ছিল। অনেকদিনেরই পরিচয়। অনেক স্মৃতি, সুখ-দুঃখের।

যে কোনও মানুষই, মরে গেলে বোধহয় তার দোষগুলো আর মনে পড়ে না, শুধু গুণগুলোর কথাই স্মৃতিতে ভাসে।

মন খারাপ লাগছিল হুকুর জন্যেও। আর অবাক লাগছিল ওর সাহসের কথা ভেবে। অতটুকু ছেলে! ভাল করে বন্দুক ওঠাতে পর্যন্ত পারে না হাতে, সে কিনা বাবার মৃত্যুর বদলা নেবার জন্যে এমন সাংঘাতিক মানুষখেকোর পেছনে একনলা গাদাবন্দুক সম্বল করে একা-একা ঘুরে বেড়াচ্ছে! যার হাতে তিন-তিনজন ঝানু শিকারি ঘায়েল হয়েছে, সেই বাঘের কাছে ও তো নিতান্ত শিশুই। তার জীবন, তার পরিবেশ, তার চারদিকের প্রতিকূল অবস্থা এবং শত্রুতাই তাকে জেদি আর সাহসী করেছে। নইলে, এমন দুর্জয় সাহসের কথা ভাবা যায় না। এ তো সাহস নয়, এ তো জেনেশুনে আত্মহত্যা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের এয়ারফোর্সের কামিকাজে’ পাইলটরা যেমন করত, তেমনই।

হাওয়াটা বন্ধ হয়ে গেছে এখন। প্রথম গ্রীষ্মের বিকেলের জঙ্গলে যে একটা গরম ভাপ ওঠে, সেই ভাপ উঠছে এখন। যদিও কাল বৃষ্টি হওয়াতে গরম ততটা নেই।

একদল চিতল হরিণ দৌড়ে চলে গেল পাহাড় থেকে নেমে উপত্যকার দিকে। বন্দুক হাতে, খুব সাবধানে চারধার দেখতে দেখতে আমি খুব আস্তে আস্তে এগোতে লাগলাম। কিছুদূর যাবার পর একটা প্রকাণ্ড বেজি দৌড়ে পায়েচলা পথটা পেরুল। বাঁ দিক থেকে ডান দিকে গেল। তিতির আর কালি তিতিরের ডাকে চারপাশ সরগরম হয়ে আছে। সিতাওন উপত্যকা থেকে সম্বরের গম্ভীর ঢাংক-ঢাংক আওয়াজ এল। আশ্চর্য। দিনের বেলা!

পাহান অবশ্য ওই দিকেই গেছে।

শেষ বসন্তের বনের সকালের মিশ্র গন্ধে আমার নাক ভরে গেল। কী শান্তি, কী সুখ এখানে। আমাদের ওই সুন্দর দেশের বন-পাহাড়ের নানা জায়গাতে যে কী গভীর আনন্দময়, শান্তি আছে তা আমরা নিজেরাই জানলাম না। সারা পৃথিবী ঘুরেছি বলেই আমি জানি যে, আমার দেশ কী সুন্দর!

হুডকু যেখানে গুলিটা করেছিল, সেখানে পৌঁছে কিন্তু রক্ত পেলাম না। কিন্তু তার একটু পরেই রক্ত পেলাম। পিটিসের ঝোপে, সাবাই ঘাসে, লেগেও আছে। নীচেও দাগ আছে মাঝে-মধ্যে। গাদা বন্দুকের গুলি। ঢুকেছে, কিন্তু বেরোয়নি। রাইফেলের গুলি হলে এ-ফোঁড় ওফোঁড়ই করে দিত। অতদুর থেকে ছোঁড়া বন্দুকের গুলি শরীরে ঢুকলেও গভীরে যে ঢোকেনি তা জানাই ছিল। কতখানি বারুদ গেদেছিল এবং সীসের কতবড় বল দিয়েছিল কিছুই জানা নেই। তবে কাঁধে নয়। গুলিটা সম্ভবত লেগেছে শরীরের নীচের দিকে। ওপরে যদি লাগত, তবে রক্তের দাগ গাছগাছালির লতাপাতার আরও উপরে থাকত। পেছনের পায়ে লাগলে, পেছনের পায়ের থাবার চিহ্নে তা একটু অন্তত বোঝা যেত। তা হলে, পা টেনে, বা উপরে তুলে চলত। লাগল তো লাগল সামনেরই পায়ে?

গুলি করার সময় নিশ্চয়ই পাহান হুকুর দিকে ঘুরে ছিল, নইলে, পেছন থেকে গুলি করলে সাধারণত পেছনের পায়েই লাগার কথা।

কাল রাতের বৃষ্টির পরে ছায়াচ্ছন্ন জায়গায়, যেখানে-যেখানে মাটি বা বালি ভিজে আছে, যেখানে-সেখানেই দাগ পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে অনেকখানি পথ দাপাদাপি লণ্ডভণ্ড করে গেছে পাহান।

কী আর করবে বেচারা! ডগলাসও যেমন আমার বহুদিনের বন্ধু ছিল, পাহানও তাই। ছোটবেলাতেই কোনও নিষ্ঠুর আনাড়ি শিকারি তার সামনের পায়ে চোট করে দেয়। তবু সে এতদিন মানুষের ক্ষতি করেনি। তারপরও যখন তাকে একেবারে অক্ষম করে দিল মানুষ, কী ও করবে? বেঁচে তো থাকতে হবে!

আগে আমাদের এই সব বন-জঙ্গল অনেকই গভীর ছিল। অনেক বেশি এবং অনেকরকমের জানোয়ার ও পাখি ছিল। পথে বেরোলে মনে হত ওপেন-এয়ার চিড়িয়াখানায় বেড়াতে এসেছি। এখন জঙ্গল পাতলা হয়ে গেছে, হয়ে যাচ্ছে প্রতি বছরই। পশু-পাখি কমে আসছে। সব কেমন ন্যাড়া, ফাঁকা-ফাঁকা লাগে। এ জঙ্গলে শুক্লপক্ষের রাতের বনে ছমছম করবে ছায়া-ভরা জ্যোৎস্না।

এবার সিতাওন উপত্যকার মুখে এসে পৌঁছলাম। এখানে নদীটা গভীর এবং জলও থাকে সবসময়ই। এক জায়গায়, নদী থেকে বেরুনো নদীর একটি প্রশাখাতে, পাথরের মধ্যে, দেখলাম, জমা-জল রক্তে লাল হয়ে আছে। বুঝলাম, পাহান এখানে বসেছিল, নিশ্চয়ই। জলও-খেয়েছিল।

নদীটা পেরোতেই অনেকগুলো সম্বরের খুরের দাগ দেখলাম। এইখানেই সম্বরগুলো পাহানকে আসতে দেখে চিৎকার করেছিল যে, তা বোঝা গেল।

সেখানটায় দাঁড়ালাম কিছুক্ষণ। এবারে আবার রক্তের অথবা পায়ের দাগ পাওয়া যাবে। যতক্ষণ আলো থাকে ততক্ষণ ওকে পিছা করা যাবে। তবে রাত হলেও চিন্তা নেই। কারণ, পুর্ণিমা সামনেই। এপ্রিলের শুক্লপক্ষের রাতের বনে আঁচল ওড়াবে ডাইনি জ্যোৎস্না।

হ্যাভারস্যাকটাকে নদীর পারে একটা আমলকী গাছের শুকনো ডালে ঝুলিয়ে দিলাম। জল খেয়ে, ওয়াটার বটলটাকেও। ডগলাস-এর ওই মূর্তি দেখে কিছু খাওয়া-দাওয়ার স্পৃহা আমার মনে জাগেনি!

বন্দুকটা হাতে নিয়ে আর ছুরিটা বেল্টে ঝুলিয়ে এগোলাম। এদিকের জঙ্গলটা সারান্ডা ডিভিশনের শাল-জঙ্গলের মতো। গরমের দাপটও এখনও পুরো হয়নি, তাই এদিকে আন্ডারগ্রোথ এখনও যথেষ্টই আছে। মে মাসে হয়তো জ্বলে-পুড়ে মরে যাবে এসব। ঘাস-পাতা ঝোপঝাড়। সিতাওনের এই ছায়াচ্ছন্ন উপত্যকাতে গরমও তেমন নেই। চোট-খাওয়া পাহানের পক্ষে লুকিয়ে থাকার আইডিয়াল, জায়গা।

ভাবলাম, ছায়াচ্ছন্ন আন্ডারগ্রোথ বেশি বলেই পায়ের দাগ এখানে এসেই হারিয়ে গেল। রক্তের দাগও দেখা গেল না। অবাক হলাম আমি। ঘন আন্ডারগ্রোথের জন্যে ভাল করে দেখাই যায় না। গুলি খাওয়া পাহান যে-কোনও মুহূর্তেই লাফিয়ে উঠতে পারে। খুবই সাবধানে বন্দুকটা আড়াআড়ি ধরে ট্রিগার-গার্ডে আঙুল রেখে এগোতে লাগলাম উত্তেজনাতে টানটান হয়ে। উত্তেজনায় এবং ভয়েও হাতের পাতা ঘেমে উঠতে লাগল।

আধ মাইলটাক যাওয়ার পরই মনটা যেন কেমন করে উঠল। শিরদাঁড়া শিরশির করে উঠল। দাঁড়িয়ে পড়লাম আমি। আমার তিরিশ গজ দূরে একটি ছাতারে পাখির পরিবার শব্দ করে উড়ে গেল। এবং সঙ্গে সঙ্গেই একটা ময়ূর ডেকে উঠল প্রচণ্ড ভয় পাওয়া কর্কশ স্বরে। ডেকেই, লম্বা লেজ নিয়ে আধো-অন্ধকার বনের চাঁদোয়ার নীচে শপ-শপ আওয়াজ করে উড়ে গেল।

সামনেই ঘন শালবনের মধ্যে কতগুলো পাথরের স্তূপের মতো ছিল। যেন কেউ এনে, একটার পর একটা সাজিয়ে দিয়েছে। পুব-আফ্রিকার সেরেঙ্গেটির KOPJE র মতো। খুব মোটা একটা শালগাছের আড়াল নিয়ে আমি নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম। আমার পায়ে পাতলা রাবার-সোলের কাপড়ের জুতো জঙ্গলে নিঃশব্দে চলা-ফেরা করার অভ্যাসও আছে ছেলেবেলা থেকেই। আমি নিশ্চিত ছিলাম যে, একেবারে নিঃশব্দেই এবং পরিবেশে কোনওরকম আলোড়ন না-ঘটিয়েই সেখানে পৌঁছেছিলাম। আমাকে দেখে ছাতারে এবং ময়ুর অবশ্যই ভয় পায়নি।

তবে?

কী দেখে ভয় পেল?

ভাবলাম, এখন বনের কী বলার আছে আমাকে, তা মনোযোগ দিয়ে শোনা দরকার। নইলে, আমার অবস্থাও ডগলাস এবং হুডকুর বাবা লক্ষ্মণের মতোই হবে। প্রায় মিনিট-পাঁচেক সেখানে নিঃশব্দে অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। কোনও আওয়াজ নেই, পিছনের নদীর একটানা কুলকুলানি আওয়াজ ছাড়া। ঝিরঝির করে একটা হাওয়া বইছে। চৈত্রশেষের বিকেলের হাওয়া। বনের মধ্যে এই সুগন্ধি হাওয়া যে কী সুখ বয়ে আনে আগন্তুকের মনে, তা কী বলব। বছরের এই সময়ে জঙ্গল দাবদাহতে আধ-পোড়া কিন্তু তবুও একটা সোঁদা-সোঁদা গন্ধ পাচ্ছি নাকে।

আরও অপেক্ষা করতাম। কিন্তু অধৈর্য লাগল। কোনও আওয়াজ শুনলাম না, কোনও নড়াচড়াও চোখে পড়ল না। তাই আবারও এগোলাম। এবং এগোতেই বিস্ময়ে এবং ভয়ে স্তব্ধ হয়ে দেখলাম ওই পাথরগুলোর মধ্যে একটি বাঘ আরামে দু-থাবার মধ্যে মুখ রেখে নাক লম্বা করে শুয়ে আছে। তার পেটটা একবার উঠছে, একবার নামছে। পাশের একটা বড় সাদা পাথরের চাঙ্গড় থেকে একটা লতা নেমে এসেছে। তাতে নীলরঙা জংলি ফুল। হলুদকালো ডোরাকাটা বাঘ, জঙ্গলের চাঁদোয়া ছেদ করে আসা নরম আলোর টুকরো-টাকরা, এইসব মিলিয়ে এক দারুণ ছবি হয়েছে। মুগ্ধ হয়ে চেয়েছিলাম। কিন্তু সেই মুগ্ধতা রইল সামান্যক্ষণ। পরক্ষণেই আমার চোয়ালের পেশি শক্ত হয়ে এল। বন্দুকটা তুলে নিলাম কাঁধে।

গুলি করতে যেতেই হঠাৎ মনে হল, ও তো পাহান নয়। পাহানের তো এখন ঘুমোবার কথা নয়। তা ছাড়া, বাঘটার শরীরের কাছাকাছিও কোথাও রক্ত নেই। বাঘটা গভীর ঘুম ঘুমুচ্ছে।

পাহান নয়, তা বুঝতে পেরেই আবার সাবধানে পিছু হটে এলাম পায়ে-পায়ে। হাতে একটি আহত নরখাদক আছে, তাই-ই যথেষ্ট। অক্ষত কোনও বাঘকে গুলি করার সময় এটা আদৌ নয়, তা ছাড়া তাকে মারবার পারমিটও আমার নেই।

তা ছাড়া যখন দেশে বাঘ প্রচুর ছিল যথেষ্টই মেরেছি বাঘ। কোনও খেদ নেই। আমার অন্তত নেই। আমার মতো শিকারিকে শিকার করতে পারেনি বলে বাঘেদের খেদ ছিল কিনা তা অবশ্যই জানা হয়নি। থাকতে পারে।

তা হলে, পাহান কি নদী না-পেরিয়ে নদী বরাবর গেছে? সে কারণেই সিতাওন উপত্যকাতে ঢুকে রক্ত অথবা পায়ের দাগ কিছুই দেখিনি! আর যদি তাই-ই গিয়ে থাকে, তবে সে তো মার্কিগঞ্জের দিকেই গেছে! তার শক্তির শেষ বিন্দুটিও কি মার্কিগঞ্জের প্রতি ঘেন্না দেখিয়ে তার ওপর প্রতিশোধ নিয়ে সে খরচ করবে?

নদীর কাছে ফিরে এলাম। ফিরে এসেই নিজের ভুল বুঝলাম। পাহান নদী পেরিয়েছে ঠিকই সিতাওন উপত্যকার কাছে, কিন্তু নদী ধরেই চলে গেছে। এবং মার্কিগঞ্জেরই দিকে। হুডকুর গাদা বন্দুকের চোট যে গুরুতর কিছু হয়নি, তা এখন বোঝা যাচ্ছে। হবার কথাও ছিল না। পাহান যদি বন্দুকের রেঞ্জের মধ্যেই থাকত, তবে তো আমার গ্রিনার বন্দুক দিয়েই গুলি করতে পারতাম। ঘৃণাতে কাণ্ডজ্ঞানহীন হয়ে হুডকু তাকে গাদা বন্দুকে গুলি করেছিল, আর পাহানও বোধহয় মানুষের প্রতি ঘৃণাবশে যতটা রাগ দেখিয়েছিল, ততটা যন্ত্রণার কারণে দেখায়নি।

এদিকে বেলা পড়ে আসছে দ্রুত। এবং এ জঙ্গলে দেখছি মানুষখেকো এবং সদ্য-আহত পাহানই নয়, তার একজন জাতভাইও আছে। নাকি সঙ্গিনী? পায়ের দাগ না দেখতে পেলেও, চেহারা দেখে বাঘিনী বলেই মনে হয়েছিল। পাহান কি এ-জঙ্গলে থাকে না? হয়তো থাকে না। থাকলে জেনেশুনেই অন্য বাঘের এলাকাতে ঢুকে পড়ত না। অথবা ওই-ই থাকে। ওই বাঘিনীই বে-এক্তিয়ারে ঢুকে পড়েছে হয়তো। যাই-ই ঘটে থাকুক, এখান থেকে বেলা থাকতে-থাকতে মার্ফিগঞ্জে ফেরা সম্ভব নয়। রাতে পাহানকে খুঁজে বেড়ানোও সম্ভব নয়। খুঁজলে পাহানই আমাকে অনেকই সহজে খুঁজে পাবে হয়তো। তার এই চোট যখন মারাত্মক হয়নি, তখন তার সম্বন্ধে খুবই সাবধানে থাকতে হবে।

এই সব ভেবে রওনা হলাম নদী বরাবরই। কী করব, চলতে-চলতে ঠিক করা যাবে। এখনও সন্ধে হতে ঘণ্টাখানেক বাকি আছে।

নদীটা সামনেই বাঁক নিয়েছে একটা। সেই বাঁকের মুখে দেখি কয়েকটা নীল-গাই জল খাচ্ছে চকচক শব্দ করে। আর সে জায়গার উজানে, একশো গজ দূরে একদল শুয়োর জমিয়ে চান করছে জলে ঝাঁপাঝাঁপি করে। আমাকে নীলগাইদের প্রহরীটি দেখতে পেতেই ওরা সকলেই খুরে-খুরে খটাখট আওয়াজ তুলে পালিয়ে গেল। কিন্তু শুয়োরের বাচ্চারা তখনও নির্বিকার। আরও এগোতে তারাও সিংগল-ফাইলে পড়ি কি মরি করে লেজগুলো উপরে তুলে দৌড়ল। ওদের দেখে আফ্রিকার ওয়ার্টহগসদের কথা মনে পড়ে গেল আমার। সেই সঙ্গেই আফ্রিকার এবং তোদেরও অনেকই কথা মনে পড়ে গেল। শিগগিরি যাব আরেকবার।

এবারে ভটকাইকে নেব না। তুমি রাম অথচ হনুমানকেই চিনলে না।

ভটকাই বলল, শুয়োরগুলো যখন দৌড়ে চলে গেল, তখন আমার মনে পড়ল যে, পাহান যদি মাগিঞ্জের দিকেই গিয়ে থাকে, অথবা এখানেই কোথাও জল খেয়ে বিশ্রাম নিয়ে, জখমের জায়গা জিভ দিয়ে চেটে চেটে পরিষ্কার করার পরই যদি রাতে আবার নতুন শিকার ধরার জন্যে ওই দিকেই যায়, তবে ও মার্কিগঞ্জের থেকে আধমাইল দূরে নদীটা যখন সরু হয়ে এসে ফরেস্ট রোডের উপর দিয়েই বয়ে গেছে, হয়তো ঠিক সেখানে গিয়েই ফরেস্ট রোড ধরে মার্কিগঞ্জে ঢুকবে। ঢোকাটা স্বাভাবিক অন্তত। সেইখানে কোনও গাছে যদি বসে থাকতে পারতাম, তবে নির্ঘাত তার সঙ্গে দেখা হতে পারত।

এসবই অবশ্য ইন্টেলিজেন্টগেস-ওয়ার্ক। বাস্তবের সঙ্গে মিলতেও পারে, নাও মিলতে পারে।

হয়তো মার্কিগঞ্জের দিকেই যাবে। কারণ ডগলাস-এর শরীরে তার একদিনের খাবার জন্য বিশেষ কিছু নেই। দৈনিকও যদি খায়, তবে বাঘের দশ থেকে পনেরো কেজি মাংস হলেই চলে যায় কিন্তু দৈনিক খেতে না পেলে বেশি লাগে। পেট ভরে গেলে, সে দু একদিন না-খেয়েও থাকতে পারে এবং থাকেও। এ দিকের বাঘ।

আমি কিন্তু নদীর পারের ঘাসের উপর দিয়েই চলেছি। ল্যাংড়া পাহানের পায়ের দাগ যেন ভোজবাজির মতো মিলিয়ে গেছে নদী পেরিয়েই। সামনেই নদীটা আরেকটা বাঁক নিয়েছে। সেই বাঁকে পৌঁছে ভাবলাম যে, এখানে নদী পেরিয়ে সিতাওন উপত্যকাকে পেছনে ফেলে একটা পাহাড় টপকে গেলেই নদী আর ফরেস্ট-রোডের জাংশানে গিয়ে পৌঁছব। এ কথা ভেবেই নদী পেরোলাম জলে ছপ ছপ শব্দ করে এবং পেরিয়েই দেখলাম, নদীর বালিতে বাঘের থাবার দাগ। বাঘটা একটু আগে জল পেরিয়ে আমি যেদিকে যাব ভাবছি, সেদিকেই গেছে। বালি তখনও ভিজে। থাবার দাগ অন্য কোনও বাঘের নয়, ল্যাংড়া পাহানেরই। সামনের ডানদিকের থাবাটাতে যে জখম আছে, তা বালির উপরের স্পষ্ট দাগ থেকে বোঝা যাচ্ছে।

ডগলাসের ছিন্নভিন্ন লাশ দেখার পর থেকে আমার মাথার ঠিক ছিল না। তার উপর আবার চোখের সামনে একটা বারো-তেরো বছরের সবে বাবা-মরা বোবা ছেলেকে দেখলাম। হাতে বড় কাজ থাকলে অনেক ব্যাপার নিয়েই তখন মাথা ঘামালে চলে না। কিন্তু পরে ভাবলে মাথার মধ্যে মাদল বাজে, শিঙা ফোঁকে যেন কারা। কান ঝাঁঝাঁ করে।

আমার মনে হল, আমি একেবারেই প্রকৃতিস্থ নই। মাথার গোলমালই হয়ে গেছে যেন। সকালের পর কিছু খাইওনি। এদিকে হ্যাঁভারস্যাক ও জলের বোতল, দূরে গাছে টাঙিয়ে রেখে এসেছি। এক্ষুনি পাহান জল পেরিয়ে গেছে, জলে বা বালিতে এখানে কিন্তু কোথাও একটুও রক্তের দাগ নেই। নানা রকমের ম্যাজিক হচ্ছে যেন সকাল থেকে। ডগলাস, যাকে সেদিন সন্ধেবেলা বাড়ি পৌঁছে দিয়ে এলাম, তাকে এইভাবে আবিষ্কার করার পর থেকে হুকুর অবিবেচকের মতো গুলি করা, হুডকুর বোবা হয়ে যাওয়া, পাহানের বন-পাহাড় গুঁড়ো করা গর্জন-ত জন, তারপরও এই হঠাৎ-আসা বাঘিনী। এত সব ঘটনা এত দ্রুত ঘটে যাওয়াতে সত্যিই মাথার মধ্যে সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে।

প্রচণ্ড জলপিপাসা পেল আমার। ওয়াটার বটল ফেলে এসেছি সত্যি, কিন্তু এই বহতা নদী সিতাওনের পাশে-পাশেই হেঁটেও আসছি এতক্ষণ! পিপাসাতে বুক ফাটলেও, জলের কথা একবারও মনে হয়নি। আশ্চর্য!

.

আমার মাথার মধ্যে কে যেন বলে উঠল; আমি তো মরতেই চাই।

কে? ডগলাস?

গালের মাংস খুবলে-নেওয়া গলাকাটা ডগলাস বিস্ফারিত চোখে আমার দিকে চেয়েছিল। ওই দৃশ্য যে কত বীভৎস, তখন বুঝিনি। অথচ কত চেনা ডগলাস। আমার মধ্যের পিপাসাটা হঠাৎ ভীষণ তীব্র হয়ে উঠল।

কে যেন আমার মাথার মধ্যে আবার বলল: আমি তো মরতেই চাই। মরতেই চাই!

কেন? কে?

চ্যাঁ-চ্যাঁ-চ্যাঁ করতে করতে একদল সবুজ টিয়া অস্তগামী সূর্যের অয়ন পথের হদিস নিতে আমার মাথার মধ্যের ‘কেন’র উত্তরটাকে ওদের লাল ঠোঁটে তুলে নিয়ে চলে গেল।

বন্দুকটাকে আমি নদীর পারের একটা বড় বেঁটে মহুয়া গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে রেখে, নদীর দিকে ফিরে গেলাম খুব নিশ্চিন্ত হয়ে। যেন এখানে কোনও বিপদ নেই, যেন বাঘে কোনও মানুষ ধরে না এখানে, যেন ডগলাস বা হুডকু, বা হুকুর বাবা এবং আরও দু’জন শিকারির পরিণতির ঘটনা সত্যি নয়। আমি জলের কাছে এসে হাঁটু গেড়ে বসে জল খেতে লাগলাম আঁজলা ভরে। ঠিক সেই সময় কে যেন আবার আমার মাথার মধ্যে বলে উঠল, হরিণরা কি এমন ভাবে জল খায়?

হরিণদের কি হাত থাকে? জিভ দিয়ে চকচক করে খায়।

অমনি আমি যন্ত্রচালিতের মতো দু-হাত পিছনে মুঠো করে ধরে, জিভ বের করা কুকুর বা হরিণদের মতোই চকচক শব্দ করে জল খেতে লাগলাম। মুখ নীচে নামিয়ে জলের সঙ্গে মুখ ছুঁইয়ে।

ঠিক সেই সময়ে আবার কে যেন বলল মাথার মধ্যে, তুমি হরিণ, তোমার ঘাড়ে এক্ষুনি বাঘ লাফাবে।

অমনি আমি ভীষণ ভয় পেয়ে গেলাম। তাড়াতাড়িতে হরিণের মতো চারপায়ে পিছন ফিরতেই বালির মধ্যে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলাম। এবং পড়ে গিয়েই দেখলাম, বড় মহুয়া গাছটার গুঁড়িতে হেলান দিয়ে যেখানে বন্দুকটা রেখেছিলাম, ঠিক সেইখানেই বন্দুকটাতে প্রায় লেজ ঠেকিয়ে দিয়ে একটি সুন্দরী বাঘিনী কায়দা করে বসে আছে। তার মুখে মৃদু-মুদু হাসি৷ একটু আগেই যাকে দেখে এলাম সেই বাঘিনীটাই! যাকে আমি ঘণ্টাখানেক আগে পাথরগুলোর মধ্যে নীল জংলি ফুলের আর রোদের টুকরো-টাকরার মধ্যে দেখেছিলাম।

বাঘিনী কথা বলল না। তেড়েও এল না। শুধু হাসতে লাগল মিটি মিটি, আমার গুলি-ভরা বন্দুকটাতে লেজ ঠেকিয়ে।

আমার মাথার মধ্যে অনেক লোক একসঙ্গে কথা বলে উঠল। তিরিশ বছর আগে যে মা আমার চলে গেছেন, সেই মা ডাকলেন, বললেন, খোকন আয়। আজ জন্মদিন, তোর জন্যে পায়েস করেছি। খাবি আয়। সাদা পাথরবাটিতে খেজুরের পাটালি আর লাল-চালের ঘন পায়েস। আয়, খাবি আয়।

আমার ঘুম পেতে লাগল। আজ যে আমার জন্মদিন। আমার গুলিভরা ডাবল-ব্যারেল বন্দুকের কাছে বসে থাকা বাঘিনীর হাসি-হাসি মুখের দিকে মুখ করে আমি মায়ের হাতে পায়েস খাওয়ার আনন্দে, জন্মদিনের আনন্দে, ঘুমিয়ে পড়লাম।

আমি জানি, তোরা ভাবছিস এ কী গাঁজাখুরি গল্প শোনাচ্ছি কিন্তু শেষ অবধিই শোন।

আজ আমারও তা-ই মনে হয়।

কিন্তু যা ঘটেছিল, তাই-ই বলছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *