ল্যাংড়া পাহান (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ
এক
গরমের ছুটিতে বহু বছর পরে একসঙ্গে কোথাও এলাম আমরা। তাই না?
তিতির বলল।
যা বলেছ।
আমি বললাম।
পাশের কটেজ থেকে ঋজুদাও এসে যে কটেজে আমি আর ভটকাই রাতে ছিলাম তার বারান্দাতে উঠল, পাজামা-পাঞ্জাবি পরে। লংক্লথের পাজামা আর আদ্দির পাঞ্জাবি। ঋজুদা কখনও স্লিপিং-স্যুট পরে না। পুরোপুরি বাঙালিয়ানাতে বিশ্বাসী সে, শুধুমাত্র পাজামা-পাঞ্জাবিটা ছাড়া। আজকাল অবশ্য খুব কম বাঙালিই ধুতি পরেন। কিন্তু ঋজুদা বলে, প্রত্যেক বাঙালির ধুতিই পরা উচিত। তামিলনাড়ু, কর্ণাটক এবং কেরালার মানুষেরা তো ধুতিই পরেন, পাঞ্জাবী, কাশ্মিরী সকলেই নিজেদের পোশাক। তখন আমাদের এই সাহেবি অথবা জগাখিচুড়ি পোশাক পরার কোনও মানে হয় না।
তিতির, তার কটেজ থেকে আগেই এসে হাজির হয়েছিল।
ঋজুদা এসে আমাকে বলল, কী রে রুদ্র? চা আনতে বলেছিস?
তিতির বলল, কাল রাতেই তো বলে দিয়েছি সব কটেজেই ভোর ছটাতে বেড-টি দিতে। কিন্তু এখনও তো ছ’টা বাজেনি।
বাবাঃ। হল কী রে তোর রুদ্র? আজ কি সে সানরাইজ দেখবি নাকি? নাও। বাঙালি এবারে সত্যি সত্যিই জাগবে বলে মনে হচ্ছে।
কলকাতার সব পাড়ার চারদিকের দেওয়ালে কারা যেন লিখত না একসময়ে, বাঙালি গর্জে ওঠো।
তিতির বলল।
হ্যাঁ।
আমি বললাম, তার নীচে অন্য কারা আবার লিখে রাখত, আঃ। কাঁচা ঘুম ভাঙিও না।
ঋজুদা হেসে উঠল আমার কথাতে।
বলল, যাই বলিস, আমরা, মানে বাঙালিরা অনেক দোষেই দোষী, ভাগ্য আমাদের সহায় হয়নি, আর আমাদের নেতারাও আমাদের জন্যে করার মতন কিছুই করেননি এত বছরেও কিন্তু তবু এত দুর্দশার মধ্যেও এই সেন্স অফ হিউমার এখনও বেঁচে আছে বলেই বাঙালি বেঁচে আছে।
বলেই বলল, আরে! মিস্টার ভটকাই-কে তো দেখছি না! সে কোথায় গেল? একা একা অ্যাডভেঞ্চার করতে বেরিয়ে গেল না তো এই সাতসকালে! শেষে এই বান্দিপুরের অভয়ারণ্যে ভীরাপ্পানের হাতে পড়বে না তো?
পড়লেই হল। তা হলে তোমাকে বাধ্য হয়েই ভীরাপ্পানের কেসটা হাতে নিতে হবে। কিন্তু বেচারা ভটকাইকে বাগে পেলেও ভীরাপ্পান কিছু করবে না।
আমি বললাম।
ঋজুদা বলল, কেন?
কারণ সে মাথা ন্যাড়া করেছিল তামিল ব্রাহ্মণ সাজবার জন্যে, মনে আছে? আমরা মণিপুর আর নাগাল্যান্ডে সেই হত্যা-রহস্য সমাধান করতে যাওয়ার আগে?
হ্যাঁ। তা ঠিক।
তিতির বলল।
তুই তো সেই কাহিনী তোর কাঙ্গপোকপি বইয়েতে ইতিমধ্যে লিখেই ফেলেছিস।
বাঃ। রুদ্র তো কাঙ্গপোকপি অভিযানের পরেও আমাদের বক্সার জঙ্গলের ট্রিপ নিয়েও লিখেছে ঋজুদার সঙ্গে বক্সার জঙ্গলে।
তিতির বলল।
এ কথা সত্যি যে ঋজু বোসকে বাংলা সাহিত্যে এই মিস্টার রুদ্র রায়ই বিখ্যাত করে দিয়েছে। নইলে, দেশে তো আমার মতো বনে-জঙ্গলে ঘোরা আর। রহস্যভেদী কত মানুষই আছেন যাঁরা আমার চেয়ে কোনও অংশে কম যোগ্য ও নলেজেবল নন কিন্তু ঋজুদা কাহিনীগুলির মাধ্যমে রুদ্র শুধু আমাকে একাই নয়, তোকে, ভটকাইকে এবং নিজেকেও বাংলার ঘরে ঘরের কিশোর-যুবা বৃদ্ধদের কাছে এত জনপ্রিয় করে তুলেছে। এই কারণেই আমাদের সকলেরই ওর কাছে কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।
আমি আমার এত প্রশংসাতে একটু লজ্জা লজ্জা ভাব করলাম মুখে, যদিও খারাপ লাগছিল না। আমি যদি অতগুলি ঋজুদা কাহিনী না লিখতাম তবে ঋজুদা যেমন সাধারণের কাছে এত বিখ্যাত হত না, বাংলার পাঠক-পাঠিকারাও খুবই বঞ্চিত হতেন যে, সে বিষয়ে কোনওই সন্দেহ নেই। ঘনাদা, টেনিদা, ফেলুদার পরে ঋজুদার মতো এমন চরিত্র তো বাংলা কিশোর-সাহিত্যে হয়নি। তা ছাড়া, অনেকেই যা জানেন না, তা হচ্ছে এই যে ফেলুদা আর ঋজুদা সমসাময়িক। দু’জনের আবির্ভাব বাংলা সাহিত্যে প্রায় একই সময়ে। ভবিষ্যৎই বলবে এই দুই দাদার মধ্যে কোন দাদা বেশিদিন বেঁচে থাকবেন বাঙালির মনে। সময়ের চেয়ে। বড় পরীক্ষক আর নেই।
ওই যে চা আনছে।
তিতির স্বগতোক্তি করল।
ভটকাই খালি গায়ে শুয়েছিল। গায়ে, পাঞ্জাবিটা গলাতে গলাতে বাইরে বেরিয়ে বলল, দে দে, চা দে রুদ্র।
বাঃ। আমি কি তোর valet নাকি? কী ভেবেছিস নিজেকে?
ভাবিনি কিছুই। তোদের এত করে বললাম যে বান্দিপুরে হল্ট না করে চল উটিতেই চলে যাই, তা না…
সাহেবদের উটি নয় বা আমাদের উটাকামণ্ডও নয়, বল উধাগামণ্ডলম।
যা বলেছ!
তিতির বলল।
তারপর স্বগতোক্তির মতন বলল, সারা দেশটাই ক্যালকাটা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন হয়ে গেল।
মানে?
ঋজুদা বলল।
মানে, কলকাতার রাস্তার নাম বদল করা ছাড়া যেমন তাঁদের আর কোনও কাজ আছে বলে মনে হয় না, তেমন সারা দেশেই এই নাম বদলের ধুম-ধাড়াক্কা পড়ে গেছে যেন।
ভটকাই ফুট কেটে বলল, যা বলেছ তিতির। কোনওদিন দেখব আমার বাবার নামও বদলে দিল ওরা।
ঠিকই বলেছ। আমি বললাম, বম্বে হল মুম্বাই, মাড্রাস হল চেন্নাই, উটি হল উধাগামণ্ডলম!
যাকগে, থামা এবার তোদের কচকচানি, বেশ কড়া করে এক কাপ চা ঢালত দেখি। রাতে তো ঘুমই হয়নি।
ভটকাই বলল।
ঋজুদা পাতলা চা খায়। ঋজুদারটা আগে ঢালি, তারপর আমাদেরটাও ঢেলে তোকে সবচেয়ে শেষে কড়া চা দেব। প্রথমেই চা কড়া হবেটা কী করে?
ঠিক আছে। কাজ কর। বাতেল্লা করিস না।
ভটকাই বলল, মুখ ভেটকে।
রাতে ঘুম হয়নি কেন রে?
ঋজুদা জিগ্যেস করল।
হবে কী করে? সারা রাত যদি বাংলোর চারপাশে খচরমচর করে পালে পালে হরিণ চরে আর খায়, তবে কি ঘুম আসে! এই সব কারণেই আমার এই সব অভয়ারণ্য-টন্য ভাল লাগে না। অরণ্যে যদি ভয়ই না থাকল, না বন্যপ্রাণীদের, না দু পেয়ে মানুষের বা অন্য চারপেয়ে বন্যপ্রাণীদের কাছ থেকে, তবে পুরো ব্যাপারটাই আর্টিফিসিয়াল বলে মনে হয় আমার। তুমিই বলো ঋজুদা, কাজিরাঙ্গার গণ্ডার, বা বান্ধবগড়ের বাঘ, বা হলং-জলদাপাড়ার বা পালামৌর বাইসন, মানে গাউর, অথবা কানহার বাঘ বা বারাশিঙাদের কি বন্যপ্রাণী বলা চলে? তারা তো প্রায় গৃহপালিতরই মতন ব্যবহার করে। বন্যপ্রাণীর মধ্যে যে স্বাভাবিক বন্যতা, মানুষের প্রতি ভয়, বা বনে মানুষের বন্যপ্রাণী থেকে যে ভয়, তার কিছুমাত্রই তো থাকে না।
তা ঠিক। পূর্ব আফ্রিকার সেরেঙ্গেটির সিংহ বা লেক-মানিয়ারার চিতাবাঘেরই মতো তাদের দেখতে কোনওই চমক নেই।
চায়ে চুমুক দিতে দিতে তিতির বলল, ঋজুকাকা তুমি চুপ করে যে!
ঋজুদার পাইপটা ভরা হয়ে গেছিল। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল, যাই বলিস, এই নীলগিরির চা খেয়ে আনন্দ নেই। আমাদের দার্জিলিঙের চায়ের মতো চা ভূ-ভারতে পেলাম না। মকাইবাড়ি, লপচু, আরও কত বাগানের চা। গন্ধ আর স্বাদই আলাদা।
চা খেয়েই কিন্তু আমাদের সেই মার্ফিগঞ্জের মানুষখেকো বাঘ ‘ল্যাংড়া পাহানে’র গল্পটা বলতে হবে। শোবার আগে আরম্ভ করেছিলে, এবারে শেষ করতে হবে ব্রেকফাস্টের আগে।
তোরা এই বান্দিপুরের জঙ্গলে গেলি না অন্ধকার থাকতে, হাতির পিঠে অথবা জিপে করে?
না।
কেন না?
বান্দিপুর আর মুদুমালাই-এর জঙ্গল আমার ভাল লাগে না।
আমি বললাম।
কেন?
কেন, তা এক কথাতে বলতে পারব না। লাগে না, এইটুকুই বলতে পারি।
আমি বললাম।
তবে এলি কী করতে? না কি ভীরাপ্পানের ভয়ে জঙ্গলে যেতে চাস না?
ঋজুদা বলল।
না, তা নয়। এলাম তো উটি দেখতে। সেই ছেলেবেলা থেকে মায়ের কাছে গল্প শুনে আসছি উটির। দাদু তো মধ্যজীবনে বেশ কিছুদিন ছিলেনও এখানে।
ভটকাই বলল, মধ্যে পড়ে, তুই বাগড়া দিস না, ঋজুদাকে শুরু করতে দে। মার্কিগঞ্জের ল্যাংড়া পাহানের গল্প।
ভারী মজার নামটা, না? ল্যাংড়া পাহান। একবার শুনলে আর ভোলার নয়।
তিতির বলল।
তা ঠিক।
আমি বললাম।
ল্যাংড়া পাহান কি জিম করবেট-এর Temple Tiger-এরই মতন?
ভটকাই অধৈর্য গলাতে বলল।
আহা শোনই না। অত অধৈর্য কেন তুই?
আমি বললাম।
তোর নাম রুদ্র না হয়ে ধৈর্যশীল হলে ভাল হত।
ওরে ওরে ভটকাই আয় তোরে চটকাই।
হঠাৎ বলে উঠল ঋজুদা, ভটকাই-এর পাড়ার ছেলেরা যেমন করে বলে তেমন করে।
আমরা হেসে উঠলাম।
তিতির বলল, নাও ঋজুকাকা চা-টা শেষ করো, আর এক কাপ আমি বানিয়ে দিচ্ছি। এবার কিন্তু পাইপটা ধরিয়ে নিয়ে শুরু করতে হবে।
ওক্কে। যা তোমরা করতে আজ্ঞা করবে, তাই করব।
চা-টা ঢাল কাপে। এবারে শুধুই লিকার কিন্তু। চা-টা কড়া হয়ে গেছে। ওটা ভটকাইকে দিয়ে দে। আর এক পট চা আনতে বল রুদ্র।
বলছি।
আমি বললাম।
কিন্তু ল্যাংড়া পাহানের গল্পটা শুরু করে দাও।
তিতির বলল।
ঋজুদা তার সুললিত, ব্যক্তিত্বমণ্ডিত কণ্ঠস্বরে শুরু করল:
মার্ফিগঞ্জে ঢুকতে হলে তখন সিজুয়াবাগ হয়ে ঢামনা অবধি আসতে হত ফিলফিলার পিচ-রাস্তা দিয়ে। তারপরই অনেকটা টাঁড়মতো জায়গা, লাল মাটির মস্ত তেমাথা। সেই তেমাথা থেকে অসমান কাঁচা রাস্তা চলে গেছে গভীর জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে।
এক ফার্লং মতো গিয়েই পথের পাশে একটা মস্ত বড় গাছ। বনস্পতি। বট না অশ্বত্থ, এতদিনে আর মনে নেই। অনেকইদিন আগের কথা।
জঙ্গলে-জঙ্গলে অনেকখানি গিয়ে পথের ডানদিকের ফরেস্ট বাংলো পেরিয়ে গিয়ে বাঁ দিকে এক গভীর উপত্যকা। ঘন জঙ্গলে ভরা। সেই জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চলে গেছে ঝরনা পেরিয়ে ছোটবড় পাহাড়ের দোলায়-দোলায় দুলতে-দুলতে বড় বড় গাছের ছায়ায় অন্ধকার হয়ে থাকা পাকদণ্ডী। এই পাকদণ্ডীর মোড়ে দাঁড়িয়ে পড়ে সেই উপত্যকার দিকে মুখ করে পেছনে তাকালে দেখা যেত উঁচু পাহাড়টার চুড়োর কাছে মাফিজ নোজ। অর্থাৎ, মার্ফি সাহেবের নাক। মস্ত, কালো কোনও মানুষের মুখের আকৃতির পাথরটার সামনে-বেরিয়ে-থাকা ন্যাড়া পাথরটাকে একটি অতিকায় নাকের মতোই দেখতে লাগত।
যে-সমস্ত লোকের খুব গর্ব থাকে, অথবা যাঁরা বরেন্দ্রভূমির ব্রাহ্মণ, তাঁদের নাক যেমন দেখতে হয়, মার্কিজ নোজও তেমনই দেখতে ছিল।
মাঝে-মাঝেই টপিং-হাউস থেকে বেরিয়ে, মাইল-চারেক হেঁটে মাফিজ নোজ-এর কাছে এসে পথের পাশের বড় পাথরটাতে বসে থাকতাম। ভারী শান্তি ওখানে। দিনমানে বা রাতে গাড়ি বা জিপ যায় একটি বা দুটি। বাস যায় একটিই। সকালে রাঁচী গিয়ে সন্ধেতে ফিরে আসে। মানুষজনেরও যাতায়াত নেই বিশেষ। কখনও-সখনও একলা বার্কিং-ডিয়ার জঙ্গলের এদিক থেকে ওদিকে সাবধানে ইতিউতি চেয়ে সেই লালমাটির পথটি পেরোত। নইলে পাখির ডাক, হাওয়ার শব্দ, পাতার সঙ্গে পাতার কানে কানে কানাকানি। ব্যাস। নিস্তব্ধ, সুনসান।
কখনও গরমের দিনের বিকেলের পড়ন্ত রোদ্দুরে চিত্রল হরিণদেরও সেই পথ পেরোতে দেখা যেত, লাফাঝাঁপি করে আমলকী বনে, আমলকী খাওয়ার পর।
এক দারুণ শীতের সকালে ওই গভীর জঙ্গলাবৃত উপত্যকাতেই দেখেছিলাম প্রথমবার ল্যাংড়া পাহানকে।
পাহান শব্দটির মানে কী ঋজুদা?
তিতির শুধোল।
‘পাহান’শব্দটার মানে হচ্ছে পুরোহিত, ওঁরাও ভাষাতে। প্রতি গ্রামেই একজন করে পুরোহিত থাকে। তাকে মান্যও করে সকলে। বাঘের মতো বাঘ ছিল সে। মান্য করারই মতো। তাই সাতগাঁয়ের মানুষে ভালবেসে তার নাম রেখেছিল ল্যাংড়া পাহান।
জঙ্গলের মধ্যে সেই জায়গাটিতে গত শীতে ক্লিয়ার-ফেলিং হওয়াতে কয়েকশো বর্গগজ মতন এলাকাতে একটিও গাছ ছিল না। সেই পুরো এলাকাটিই ঘনঘোর বর্ষার জল পেয়ে ঝকঝকে-জেল্লা-দেওয়া কচি-কলাপাতা-রঙা সবুজ ঘাসে ভরা ছিল। ল্যাংড়া পাহান ধীরে-সুস্থে সেই ঘাসে-ভরা সবুজ প্রান্তরটি পেরোচ্ছিল। মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে পড়ে, এদিক-ওদিক দেখছিল মাথা ঘুরিয়ে। তখনও তার গায়ে রাতের শিশির লেগে ছিল। প্রথম সকালের সোনারঙা রোদ তার গায়ে পড়ে, তাকে সত্যিই দেখাচ্ছিল রাজারই মতো। রাজা তো নয়! পুরোহিত-রাজা।
কে ওর নাম দিয়েছিল জানি না। তবে পাহাড়-জঙ্গল ঘেরা মার্কিগঞ্জে তো বটেই তার চারদিকের পুরো এলাকার সব বস্তির মানুষেরাই ল্যাংড়া পাহান বললেই এক ডাকেই তাকে চিনত। ছেলে বুড়ো-মেয়ে সকলেই। চেনবার কারণও ছিল।
যদিও সেই সময়ে আমাদের বনে-জঙ্গলে বড় বাঘের অভাব ছিল না কিন্তু অত বড় বাঘ সে সময়ে এ-অঞ্চলে আর দ্বিতীয় ছিল না। অনেক দূর থেকে এবং অনেক উঁচু থেকে তাকে দেখেছিলাম, তাই বহুদিন ধরে তার পুত্থানুপুঙ্খ বর্ণনা শুনে আসা সত্ত্বেও সে যে ল্যাংড়া পাহানই সে সম্বন্ধে আমি নিশ্চিত হতে পারিনি। কিন্তু বাংলোতে ফিরে মালীর কাছে তার নিখুঁত বর্ণনা দিতে সে সঙ্গে-সঙ্গেই বলেছিল যে, ও বাঘ ল্যাংড়া পাহান না হয়েই যায় না।
ওর জন্ম হয়েছিল নাকি সেই জঙ্গলের গহনের বনদেওতার ভাঙা দেউলে। ও যখন ছোট ছিল, তখন সামনের বাঁ পায়ে কোনও চোট পেয়ে থাকবে। কী করে পেয়েছিল তা জানা নেই। কিন্তু ও খুঁড়িয়ে হাঁটত। তাই ওঁরাও শিকারিরা আদর করে ওর নাম দিয়েছিল ল্যাংড়া পাহান। ল্যাংড়া পাহান কখনও কারও ক্ষতি করেনি! সিজুয়াবাগ থেকে মার্কিগঞ্জ এবং ঢামনা থেকে ফিলফিলা অবধি ছড়ানো গভীর জঙ্গলের মধ্যে-মধ্যে যেসব গ্রাম ছিল, সেসব গ্রামের একটি থেকেও কখনও সে বর্ষাকালেও গোরু-মোষ নেয়নি। এমন কী, বাঘেদের ঘুঘনি বা চাট যে দিশি ঘোড়া, যা ওরা বড় ভালবেসে খায়, সেই ঘোড়াও ধরেনি একটাও। যদিও গগর, ফুলাটোলি এবং বতরু গ্রামের মুসলমান চাষিদের অনেকেরই টাটু ঘোড়া ছিল। কোনও মানুষেরও ক্ষতি করেনি কখনও সে। তাই পথ চলতে বা কাঠ কাটতে গিয়ে বা হাটবারে হাট সেরে রাত করে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে নিজের নিজের দূর গ্রামে ফিরে যাবার সময়ে তার সঙ্গে হঠাৎ কখনও কারও নির্জনে দেখা হয়ে গেলে, এ তল্লাটের সব মানুষই সহর্ষে ‘ল্যাংড়া পাহান’! ল্যাংড়া পাহান’!বলে। চেঁচিয়ে উঠত অনেকটা, আদর করেই। যেমন করে পোষা অ্যালসেশিয়ান বা গ্রেট ডেন কুকুরকে মানুষে ডাকে।
ল্যাংড়া পাহানের চোখে এবং নখেও কোনও পাপ ছিল না।
