কমলালেবুর পাঁচটি বীজ (শার্লক হোমস) – আর্থার কোনান ডয়েল
এক
১৮৮২ সাল থেকে আজ পর্যন্ত শার্লক হোমস যে-সমস্ত বিচিত্র ধরনের রোমাঞ্চকর রহস্যের তদন্ত করেছে সেসব ঘটনার কথাই আমার সেই সময়ের ডায়েরির পাতায় সংক্ষেপে লেখা আছে। খুব মুশকিলে পড়ি যখন সে ব্যাপারগুলোকে সাজিয়ে-গুছিয়ে পাঠকদের মতো করে লিখতে যাই। সমস্যা হয় কোন ঘটনাটা বাদ দিয়ে কোন ঘটনাটা লিখি। যে-সব ঘটনা কোনও-না-কোনও কারণে সাধারণ লোকের মনে কৌতুহল জাগিয়েছিল, সেগুলোর বিস্তারিত বিবরণ তখনই একাধিক দৈনিক সংবাদপত্রে বের হয়েছিল। সেসব কথা এখনও অনেকেরই মনে আছে। তাই ওই ঘটনাগুলো আবার নতুন করে লেখবার কোনও প্রয়োজন আছে বলে আমার মনে হয় না। তবে সাধারণ লোকের জানা নেই এমন ঘটনার সংখ্যাই বেশি। কিন্তু এইসব ঘটনার মধ্যে কয়েকটা আবার এতই জোলো আর সাদামাটা যে সেসব অতি তুচ্ছ সমস্যার সমাধান সরকারি পুলিশই করতে পারত। এই ধরনের তুচ্ছ ব্যাপারগুলো লিখতে আমার প্রবৃত্তি হয় না। এর মধ্যে অবশ্য দু’-একটা ‘কেস’ আবার এমনই সাংঘাতিক রকমের জটিল যে, সেই নিশ্ছিদ্র রহস্যের জাল ভেদ করতে স্বয়ং শার্লক হোমসই ব্যর্থ হয়েছে। আরও কয়েকটা রহস্যের সমাধান হোমস করতে পারেনি কেন না তাঁর হাতে কোনও রকম সূত্রই ছিল না। এ ছাড়া কতকগুলো রহস্যের কিনারা আজও হয়নি। তদন্ত চলছে। এই ঘটনাগুলোর কথাও লিখে লাভ হবে না বলে আমার মনে হয়। সাধারণ পাঠক এগুলো পড়ে কোনও আনন্দই পাবেন না। কেন না এ ঘটনাগুলোর শুরু মানে রহস্যের ‘সূত্রপাত’ আছে কিন্তু শেষ অর্থাৎ রহস্যের কোনও ‘সমাধান’ নেই। এ ছাড়াও আর এক রকমের তদন্তের কথা আমার ডায়েরিতে লেখা আছে। সে ঘটনাগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা রহস্যের আংশিক সমাধান করা সম্ভব হয়েছিল হোমসের পক্ষে। আজকে আমি এই রকমই একটা ঘটনার কথা লিখব বলে মনে করেছি। এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত অনেক খুঁটিনাটি প্রশ্নের কোনও পরিষ্কার উত্তর পাওয়া যায়নি। আর ভবিষ্যতেও যে এই সব প্রশ্নের কোনও উত্তর পাওয়া যাবে তা মনে হয় না। তবুও যে এই ঘটনাটার কথা লিখছি তার কারণ হল এই যে এর শুরুটা যেমন অত্যন্ত অদ্ভুত শেষটাও তেমনই আশ্চর্য রকম অভিনব।
১৮৮৭ সালের ডায়েরির পাতা ওলটাতে ওলটাতে অনেকগুলো রহস্যজনক ঘটনার কথা লেখা দেখছি। যেগুলোর মধ্যে বিশেষ ভাবে উল্লেখ করতে হয় ‘প্যারাডল চেম্বার’-এর রহস্য, ব্রিটিশ জাহাজ সোফি অ্যান্ডারসনের অদ্ভুত ভাবে নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা, উফা দ্বীপে গ্রাইস প্যাটারসনের বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা আর সবশেষে ক্যাম্বারওয়েলে বিষপ্রয়োগে হত্যার ঘটনাটা। এই ক্যাম্বারওয়েল খুনের ব্যাপারটা তদন্ত করতে গিয়ে হোমস মৃত ব্যক্তির হাতঘড়ি পরীক্ষা করে দেখায় যে, ওই খুনের ঘটনা ঘটবার ঠিক দু’ঘণ্টা আগে ঘড়িটায় দম দেওয়া হয়েছিল। তার থেকে প্রমাণ হয় যে, ওই ব্যক্তি খুন হবার ঠিক দু’ঘণ্টা আগে শুতে যান। হোমসের এই আবিষ্কারের ফলে তদন্তের ধারাটা একটা নতুন মোড় নেয় আর তার ফলে যে নির্দোষ সে মুক্তি পায়, ও দোষীর সাজা হয়। এসব তদন্তের সব কথা ভবিষ্যতে সময় ও সুযোগ মতো আমার লেখবার ইচ্ছে আছে। তবে যে-তদন্তের কথা আজ এখানে লিখছি তার সঙ্গে ওই সব রহস্যের তুলনাই হয় না। এ ঘটনাটা আরও অনেক বেশি জটিল, অনেক বেশি রোমহর্ষক। বিজ্ঞাপনের ভাষায় রীতিমতো গায়ে কাঁটা-দিয়ে-ওঠা কাণ্ড।
সেপ্টেম্বর মাস শেষ হতে চলল, এ বছরে এখনও পর্যন্ত জল-ঝড়ের আর শেষ নেই। আজ সকাল থেকে শুরু হয়েছে যেমনই প্রচণ্ড ঝড় আর তেমনই তুমুল বৃষ্টি। ঝোড়ো বাতাসের গোঁ-গোঁ গর্জনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলেছে বৃষ্টি। জানলার শার্সিতে বৃষ্টির ছাটের চড়চড় শব্দের বিরাম নেই। ঘরের সব জানলা-দরজা বন্ধ করে আমরা দু’জনে বসেছিলাম। তবুও মাঝে মাঝে যখন হুংকার দিয়ে ঝড় আছড়ে পড়ে দরজার কপাট আর জানলার ছিটকিনি নাড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছিল তখন খাস লন্ডন শহরের বুকে বসেও আমার মনে হচ্ছিল যে, এ যেন সাধারণ ঝড় নয়, কোনও একটা অশুভ শক্তি আমাদের ধ্বংস করতে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। সন্ধের সঙ্গে সঙ্গে ঝড়-জলের তাণ্ডবনৃত্যও ক্রমশ বাড়তে লাগল। ঘরের ফায়ারপ্লেসে গনগন করে আগুন জ্বলছিল। ফায়ারপ্লেসের একধারে চুপচাপ আর হয়তো খানিকটা বিমর্ষ ভাবে বসে শার্লক হোমস তার নিজের তদন্তের একটা নির্দেশিকা তৈরি করছিল। ফায়ারপ্লেসের আর একধারে একটা চেয়ারে বসে আমি ক্লার্ক রাসেলের সমুদ্র নিয়ে লেখা গল্পের বই পড়ছিলাম। বাইরের প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে রাসেলের কাহিনীর পরিবেশ চমৎকার খাপ খেয়ে গেছে। উত্তাল সমুদ্রের বর্ণনা পড়তে পড়তে আমার মনে হচ্ছিল যে, আমি যেন আর বেকার স্ট্রিটে নেই, ভেসে চলেছি এক তুফানের মুখে-পড়া জাহাজে। হ্যাঁ, বলতে ভুলে গেছি যে, আমার স্ত্রী তাঁর এক দূর সম্পর্কের অসুস্থ আত্মীয়াকে দেখতে লন্ডনের বাইরে গেছেন বলে আমি আবার আমার পুরনো আস্তানায় ফিরে এসেছি।
“কে যেন দরজার কড়া নাড়ল বলে মনে হল না?” আমি হোমসের দিকে তাকালাম। “এই দুর্যোগ মাথায় করে এত রাত্তিরে কে আবার এল বলো তো? তোমার কোনও বন্ধুর আসবার কথা আছে নাকি?”
“তুমি তো খুব ভাল করেই জানো ওয়াটসন যে তুমি ছাড়া আমার আর দ্বিতীয় কোনও বন্ধু নেই। আর তা ছাড়া আমি অকারণে আমার কাছে কেউ আসুক তা চাই না।”
“তা হলে এ নিশ্চয়ই তোমার কোনও মক্কেল হবে।”
“তা যদি হয় তো বুঝতে হবে যে, তার সমস্যা খুবই গুরুতর। তা না হলে অন্তত আজকের মতো এই রকম দুর্যোগের রাত্তিরে কেউ চট করে ঘরের বাইরে বেরোতে রাজি হবে না। তবে আমার মনে হচ্ছে সে রকম কেউ নয়। এ আমাদের বাড়িওয়ালা গিন্নির কোনও বান্ধবীটান্ধবি হবেন।”
শার্লক হোমসের ধারণা যে ঠিক নয় তা বোঝা গেল একটু পরেই। আমাদের ঘরের বাইরে পায়ের শব্দ শোনা গেল আর তখনই দরজায় টোকা পড়ল। শার্লক হোমস তাড়াতাড়ি হাত বাড়িয়ে টেবিলল্যাম্পটা এমন ভাবে ঘুরিয়ে দিল যাতে সে নিজে থাকে আলোর পেছনে আর সমস্ত আলোটা পড়ে আগন্তুকের মুখের ওপর।
হোমস বলল, “ভেতরে আসুন।”
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকল একটি যুবক। তার বয়স খুব বেশি হলে বাইশ-তেইশ বছর হবে। তার জামাকাপড় বেশ শৌখিন আর পরিপাটি। আর প্রথম দর্শনেই যেটা দৃষ্টি আকর্ষণ করে সেটা হল তার ভদ্র সভ্য আচরণ। যুবকটির হাতের ছাতা থেকে যেরকম ঝরঝর করে জল গড়িয়ে পড়ছিল আর তার গায়ের বর্ষাতি জলে ভিজে যেরকম চকচক করছিল তার থেকে আমাদের বুঝতে কষ্ট হল না যে বাইরে কী তুমুল ঝড় জল হচ্ছে। ঘরে ঢুকতেই টেবিলল্যাম্পের জোরালো আলোয় যুবকটির চোখ ধাঁধিয়ে গিয়েছিল। সে খানিকটা হতভম্ব হয়ে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিল। তার চোখে-মুখে এমন একটা হতাশা আর চাপা দুঃখের ভাব ফুটে রয়েছে যে আমি বুঝতে পারলাম সে খুবই অশান্তিতে আছে।
“আগে থেকে না বলে-কয়ে হঠাৎ এই ভাবে এসে পড়ে আপনাদের অসুবিধে করার জন্যে আমি আপনাদের কাছে ক্ষমা চাইছি। আরও ক্ষমা চাইছি আপনাদের এই সুন্দর করে সাজানো ঘরটা জলে-কাদায় নোংরা করে ফেলার জন্যে,” যুবকটি রুমাল দিয়ে তার চশমার কাচ পরিষ্কার করতে করতে বলল।
তার কথার উত্তরে হোমস বলল, “আপনার ছাতা আর বর্ষাতিটা আমার হাতে দিন। আমি ওই কোণে রেখে দিচ্ছি। কোনও অসুবিধে হবে না, একটু পরেই শুকিয়ে যাবে।…আপনি দেখছি দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের বাসিন্দা।”
“হ্যাঁ, আমি হর্শ্যাম থেকে আসছি।”
“আপনার জুতোয় যে-ধরনের খড়িমাটি লেগে রয়েছে তা ওই দিকের মাটির বিশেষ গুণ,” হোমস মৃদু হেসে বলল।
“আমি আপনার সঙ্গে পরামর্শ করতে এসেছি।”
“পরামর্শ দিতে আমার বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই।”
“শুধু পরামর্শ নয়, আপনার সাহায্যও বিশেষ দরকার।”
“আমার পরামর্শ পাওয়াটা যত সহজ, সাহায্য পাওয়াটা কিন্তু তত সোজা নয়।”
“আপনার কথা আমি অনেকের কাছে শুনেছি। মেজর পেন্ডারগাস্ট আমাকে নিজে বলেছেন যে, কী রকম অদ্ভুত ভাবে আপনি তাঁকে ট্যাংকারভিল ক্লাবের নোংরা ব্যাপারটা থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন।”
“সে কথা ঠিক। তবে ব্যাপারটা কী জানেন, তাঁর বিরুদ্ধে তাস খেলায় জোচ্চুরির যে বদনাম দেওয়া হয়েছিল সেটা ডাহা মিথ্যে।”
“মেজর পেন্ডারগাস্ট যে আমাকে বললেন যে-কোনও রকম রহস্যের কিনারা আপনি করে দিতে পারেন।”
“এটা তিনি একটু বাড়িয়ে বলেছেন”, হোমস বলল।
“তিনি আমাকে এ কথাও বললেন আজ পর্যন্ত কোনও রহস্যের সমাধান করতে আপনি ব্যর্থ হননি।”
“না, এ কথাটা তিনি ঠিক বলেননি। এ পর্যন্ত আমাকে চার চারবার হার মানতে হয়েছে। তিনবার হেরেছি তিন ভদ্রলোকের কাছে, আর একবার এক ভদ্রমহিলার কাছে।”
“কিন্তু আপনার সাফল্যের বিরাট সংখ্যার সঙ্গে তুলনা করলে এই চারটে পরাজয় তো কিছুই নয়।”
“হ্যাঁ, এ কথা অবশ্য ঠিক যে মোটামুটি ভাবে আমি প্রায় সব ব্যাপারেই সফল হয়েছি।”
“তা হলে আমার এই ব্যাপারেও নিশ্চয়ই আপনি সফল হবেন।”
হোমস বলল, “তা হলে আগে আপনি ওই চেয়ারটা ফায়ারপ্লেসের কাছে টেনে নিয়ে এসে বসে শরীরটা একটু গরম করে নিন। তারপর আমাকে খুলে বলুন আপনার সমস্যাটা কী।”
“এটা কোনও সাধারণ ব্যাপার নয়।”
হোমস শান্ত ভাবে বলল, “সাধারণ ব্যাপার নিয়ে আমার পরামর্শ চাইতে কেউ আসে না। এটা অবশ্য আমার অহংকার বলে ভাববেন না।”
“না, আমি আপনার কথা অস্বীকার করছি না। কিন্তু তবুও গত কয়েকমাস ধরে আমাদের সংসারে যে রকম রহস্যময় ঘটনা সব ঘটেছে সে রকম ঘটনার দ্বিতীয় কোনও নজির আর আছে কিনা আমার সন্দেহ।”
“আপনার কথা শুনে আমার আগ্রহ বেড়ে যাচ্ছে,” হোমস বলল। “আপনি আগাগোড়া সব কথা আমাকে খুলে বলুন। কোনও কিছু গোপন করবেন না। তারপরে আমার যা জানবার তা আমি জেনে নেব।”
চেয়ারটাকে যতখানি সম্ভব ফায়ারপ্লেসের কাছে সরিয়ে এনে তার ভিজে জুতোপরা পা দুটো ফায়ারপ্লেসের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে যুবকটি তার কথা বলতে শুরু করল।
“আমার নাম জন ওপ্নশ। কিন্তু যে-সমস্যার সমাধানের জন্যেই এই প্রবল ঝড়-জল-দুর্যোগের মধ্যে অসময়ে আপনাকে বিব্রত করছি সেটা কিন্তু আমার নিজের কোনও ব্যাপার নয়। তাই যদি একটু পুরনো দিনের কথা দিয়ে আরম্ভ করি তা হলে আপনার পক্ষে ব্যাপারটা বোঝবার সুবিধে হবে।
“আমার ঠাকুরদার দুই ছেলে—আমার বাবা জোসেফ আর কাকা ইলিয়াস। কভেন্ট্রিতে আমার বাবার একটা ছোটখাটো কারখানা ছিল। তখন বাইসাইকেলের ফ্যাশান খুব হয়েছিল। বাবার কারখানায় সাইকেলের যন্ত্রপাতি তৈরি হত বলে কারখানাটারও খুব উন্নতি হতে লাগল। এই সময়ে বাবা ছ্যাঁদা বা ফুটো হবে না এমন ধরনের টায়ার আবিষ্কার করে তার পেটেন্ট মানে বিক্ৰিস্বত্ব নিয়ে নেন। আর তার ফলে তাঁর কারখানার লাভ হু-হু করে বাড়তে থাকে। বেশ কিছু টাকা জমাবার পর আমার বাবা মোটা টাকায় তাঁর চালু কারখানাটি বিক্রি করে দিলেন। তারপর বেশ আরাম করে অবসরজীবন কাটাতে লাগলেন।
“আমার কাকা ইলিয়াস অল্প বয়সে রোজগারের ধান্দায় আমেরিকা চলে যান। সেখানে ফ্লোরিডায় আস্তানা গেড়ে তিনি চাষবাসের কাজ করতে থাকেন। অল্পদিনের মধ্যেই কাকা বেশ ভাল টাকাপয়সা রোজগার করেন। তারপর যখন আমেরিকায় গৃহযুদ্ধ বাধল তখন কাকা প্রথমে জ্যাকসনের পক্ষে আর পরে হুডের দলে যোগ দিলেন। যুদ্ধে কাকা বেশ নাম করেছিলেন। সাধারণ সৈন্য থেকে তিনি ‘কর্নেল’ পর্যন্ত হয়েছিলেন। তারপর লি যখন যুদ্ধ বন্ধ করে সন্ধি করলেন তখন কাকা আবার তাঁর পুরনো পেশা মানে চাষবাসের কাজে ফিরে গেলেন। এর প্রায় বছর-চারেক পরে ১৮৬৯ কি ’৭০ সালে তিনি আবার হঠাৎ একদিন এ দেশে ফিরে এলেন। আর সাসেক্সের হর্শ্যামের কাছে একটা বাড়ি কিনে বাস করতে লাগলেন। আমরা শুনেছি যে কাকা আমেরিকাতে শুধু প্রচুর টাকা রোজগারই করেননি, তাঁর প্রভাব-প্রতিপত্তিও হয়েছিল খুব। তা সত্ত্বেও তিনি যে আমেরিকা ছেড়ে চলে এলেন তার একমাত্র কারণ হল নিগ্রোদের ওপর তাঁর অসম্ভব ঘৃণা। সেই জন্যে রিপাব্লিকান দল যখন নিগ্রোদের ভোট দেবার সুযোগ করে দিল তখন তিনি বিরক্ত হয়ে আমেরিকা ছেড়ে এ দেশে চলে এলেন। আমার কাকা একজন অদ্ভুত চরিত্রের মানুষ। যেমন রাগী আর তেমনই বদমেজাজি। রেগে গেলে তাঁর ভালমন্দ কাণ্ডাকাণ্ড জ্ঞান থাকে না। লোকজনের সঙ্গে মেলামেশা করা তো দূরের কথা মানুষজনের সঙ্গ এড়িয়ে একলা একলা থাকতেই পছন্দ করতেন তিনি। হর্শ্যামে থাকবার সময় তিনি কোনওদিন কোথাও বেড়াতে গিয়েছিলেন বলে আমার অন্তত মনে পড়ে না। কাকা একটা বিরাট বাড়িতে থাকতেন। তিনি বাড়ির বাগান আর মাঠের মধ্যেই নিয়মিত হাঁটাহাঁটি করতেন তাঁর স্বাস্থ্য ভাল রাখবার জন্যে। তবে আবার কখনও কখনও এমনও হত যে, সপ্তাহের পর সপ্তাহ তিনি নিজের ঘরের মধ্যে চুপচাপ একা একা বসে থাকতেন। তখন তিনি অনবরত কাপের পর কাপ কড়া চা খেতেন আর ধূমপান করতেন। যখন এই রকম অবস্থা চলত তখন বাইরের কোনও অপরিচিত লোক তো দূরের কথা তাঁর নিজের ভাই, মানে আমার বাবার সঙ্গেও দেখা করতেন না।
“তবে আমার কথা অবশ্য আলাদা। কাকা আমাকে ভীষণ স্নেহ করতেন। তার কারণ বোধহয় এই যে তিনি আমাকে প্রথম যখন দেখেন তখন আমি একদম ছেলেমানুষ। তখন আমার বয়স খুব বেশি হলে হবে এগারো কি বারো। সেটা ‘৭৮ সালের কথা। তারও প্রায় আট-ন’ বছর আগে থেকে তিনি এখানে স্থায়ী ভাবে বাস করতে শুরু করেন। একদিন তিনি আমাদের বাড়িতে এসে বাবাকে ভীষণ ধরে বসলেন আমাকে তাঁর কাছে থাকতে দেবার জন্যে। আমাকে তিনি বরাবরই খুব স্নেহ করতেন। যখন তাঁর মাথা ঠান্ডা থাকত তখন তিনি আমার সঙ্গে সমবয়সি বন্ধুর মতো লুডো ক্যারাম এই সব খেলতেন। আর সেই সময় থেকেই তিনি সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব—চাকরবাকরদের তদারকি থেকে শুরু করে দোকানের হিসেব দেখা, পাওনা মেটানো সবকিছু আমার উপর ছেড়ে দিয়েছিলেন। বলতে গেলে আমাকেই তিনি সংসারের কর্তা করে দিয়েছিলেন। অথচ তখন আমার বয়স ষোলো বছরও হয়নি। আমার কাছেই বাড়ির সব চাবি থাকত। আমি যেখানে খুশি যেতে পারতাম। তবে তাঁর নিজের ব্যাপারে তিনি কখনও আমাকে কোনও কথা বলেননি আর আমিও সে ধরনের কোনও কথা তাঁকে জিজ্ঞেস করতাম না। তবে বাড়ির ছাদের ওপর যে চিলেকোঠা ঘরটা আছে সেটা সব সময়েই বন্ধ থাকত। আর সেই ঘরে তিনি কাউকে এমনকী আমাকে পর্যন্ত কখনও ঢুকতে দিতেন না। বুঝতেই পারছেন, বয়সটা কম ছিল বলেই হোক আর নিষেধটা খুব কড়া ছিল বলেই হোক কৌতূহলটা ছিল বেশি মাত্রায়। সেইজন্যে আমি ফাঁক পেলেই দরজার চাবির ফুটোয় চোখ লাগিয়ে দেখতে চেষ্টা করতাম ওই ঘরের মধ্যে কী সব রহস্য লুকিয়ে আছে। কিন্তু খুবই মনখারাপ হয়ে যেত যখন দেখতাম যে, আর পাঁচটা বাড়ির চিলেকোঠায় যা-যা থাকে, যেমন পুরনো ভাঙা বাক্সপ্যাঁটরা আর পুঁটুলি ইত্যাদি, আমাদের ওই ঘরটাতেও এই সব আজেবাজে জিনিস ছাড়া আর কিছুই নেই।
“এ বছরের মার্চ মাসে হঠাৎ একদিন আমার কাকার নামে একটা চিঠি এল। চিঠিটায় বিদেশি ডাকটিকিট লাগানো ছিল। এমনিতে কাকার নামে বড় একটা চিঠিপত্র আসে না। দোকানদারদের পাওনা সব সময়ে আমরা নগদ টাকায় মিটিয়ে দিই। আর কাকার এমন কোনও বন্ধুবান্ধব আছে বলে শুনিনি যে কিনা কাকাকে চিঠি লিখতে পারে। চিঠিটা হাতে নিয়ে কাকা বললেন, ‘চিঠিটা দেখছি ভারতবর্ষ থেকে এসেছে। টিকিটের ওপর পণ্ডিচেরি ডাকঘরের ছাপ রয়েছে। এ আবার কী ব্যাপার।’
“কাকা খামটা ছিঁড়তেই খামের ভেতর থেকে টেবিলের ওপর পড়ল পাঁচটা কমলালেবুর শুকনো বীজ।”
দুই
“খাম থেকে কমলালেবুর শুকনো বীজ ঝরে পড়তে দেখে আমার বেদম হাসি পেল। কিন্তু কাকার মুখের দিকে তাকিয়েই শুকিয়ে গেল আমার হাসি। মুখটা হাঁ হয়ে রয়েছে। চোখ দুটো যেন এক্ষুনি ঠেলে বেরিয়ে আসবে। আমার মনে হল, হঠাৎ কোনও জাদুমন্ত্রে তাঁর শরীর থেকে মুহূর্তে সমস্ত রক্ত যেন কেউ শুষে নিয়েছে। কাকার মুখের রং কাগজের মতো সাদা। একদৃষ্টিতে খামটার দিকে তিনি তাকিয়ে আছেন। খামটা তাঁর হাতের মধ্যেই ধরা ছিল। অবাক হয়ে দেখলাম, তাঁর হাতটা থরথর করে কাঁপছে। আমার মনে হল, সবকিছু যেন ভুলে গেছেন তিনি, কোনও দিকে তাঁর খেয়াল নেই। সেই অবস্থায় হঠাৎ তিনি চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘K K K..ওহ ভগবান! এত দিন পরে আমার দেনা শোধের সময় হল।’
“‘এ সব তুমি কী বলছ কাকা?’ আমি না বলে থাকতে পারলাম না।
“আমার মৃত্যু ঘনিয়ে এসেছে’ বলতে বলতে কাকা খাবার ঘরের টেবিল থেকে উঠে পড়ে নিজের ঘরের দিকে গেলেন।…বিশ্বাস করুন মিঃ হোমস একটা অজানা ভয় আর আশঙ্কায় আমি যেন কেমন হয়ে গেলাম। কাকা ঘর থেকে চলে যাবার পরে আমি খামটা তুলে নিলাম। দেখলাম খামের যে-দিকটায় আঠা লাগানো থাকে সেই দিকে এক কোণে লাল অক্ষরে তিনটে বড় হাতের ‘K’ অক্ষর লেখা। খামটার মধ্যে ওই শুকনো বীজ পাঁচটা ছাড়া আর কোনও চিঠিপত্র নেই। আমি বুঝতে পারলাম না যে এই সামান্য ব্যাপারে কাকার এত বেশি ভয় পাবার কী কারণ থাকতে পারে।
“খাবার ঘর থেকে বেরিয়ে আমি যখন দোতলায় উঠছি তখন সিঁড়িতে কাকার সঙ্গে দেখা হল। কাকা ওপর থেকে নামছেন। কাকার এক হাতে একটা মরচে-ধরা চাবি আর এক হাতে একটা ছোট বাক্স, দেখতে অনেকটা ক্যাশবাক্সের মতো। চাবিটা দেখেই আমার মনে হল এটা নিশ্চয়ই চিলেকোঠার চাবি।
“উত্তেজিত ভাবে কাউকে শাপশাপান্ত করতে করতে কাকা বললেন, ‘ওরা যা পারে করুক গে। ঠিক আছে আমিও ওদের এইসা প্যাঁচে ফেলব যে বাছাধনরা টের পাবে।…জন, মেরিকে বলো সে যেন এক্ষুনি আমার ঘরের ফায়ারপ্লেসে বেশ গনগনে করে আঁচ দিয়ে দেয়। আর হর্শ্যামে গিয়ে ফোর্ডহ্যাম উকিলকে বলে এসো তার সঙ্গে আমার বিশেষ প্রয়োজন, সে যেন আজই আমার সঙ্গে দেখা করে।’
“আমি কাকার কথামতো কাজ করলাম। উকিল যখন এসে হাজির হল তখন কাকা আমাকে তাঁর ঘরে ডেকে পাঠালেন। ঘরে ঢুকতেই নজরে পড়ল ফায়ারপ্লেসে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। ফায়ারপ্লেসের লোহার শিকগুলোর ওপর স্তুপাকার ছাই আর টুকরো টুকরো পোড়া কালো কাগজ। আরও লক্ষ করলাম যে, ফায়ারপ্লেসের একধারে সেই তামার বাক্সটা খোলা। বাক্সটা একদম খালি। সেই বাক্সটার দিকে ভাল করে তাকাতে দেখতে পেলাম বাক্সটার ওপরে তিনটে K অক্ষর লেখা। ঠিক যেমন হরফের তিনটে K আমি খামের মধ্যে লেখা দেখেছিলাম।
“কাকা আমাকে বললেন, ‘জন, আমার ইচ্ছে যে তুমি আমার এই উইলের প্রধান সাক্ষী হও। আমার সমস্ত সম্পত্তি এর দায়দায়িত্ব ভাল-মন্দ সমেত সবকিছু আমি আমার দাদা তোমার বাবাকে দিয়ে গেলাম। আমি আশা করি যে, একদিন তোমার বাবা এই সম্পত্তি তোমাকেই দিয়ে যাবেন। তুমি যদি নিরুপদ্রবে, সুখে-স্বচ্ছন্দে এই সম্পত্তি ভোগ করতে পারো তো অতি উত্তম। তবে তা যদি না পারো তবে এই সম্পত্তি তোমার সবচেয়ে যে বড় শত্রু তাকে দান করে দিয়ো। আমার এই উপদেশটি মনে রেখো, ভুলো না। তোমাকে এই রকম একটা ঝঞ্ঝাটের মধ্যে ফেললাম বলে আমার নিজের খুবই খারাপ লাগছে। তবে শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটা কোন দিকে গড়াবে তা তো আমি জানি না। আশা করতে দোষ নেই যে, সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে যাবে। এখন লক্ষ্মীছেলের মতো এই কাগজের যেখানে ফোর্ডহ্যাম সই করতে বলছে সেখানে নাম সই করে দাও।’
“ফোর্ডহ্যাম যে-জায়গাটা দেখিয়ে দিলেন আমি সেইখানে সই করে দিলাম। তারপর সেই সব কাগজপত্র নিয়ে ফোর্ডহ্যাম তো চলে গেলেন। কিন্তু সেদিন সকাল থেকে যে-সব অসম্ভব কল্পনার অতীত ঘটনা ঘটে গেল সেগুলো আমার মনের ওপর মস্ত একটা ছাপ ফেলল। আমি সকাল থেকে যা যা ঘটেছে সব মনে মনে নাড়াচাড়া করতে লাগলাম। কিন্তু এই ব্যাপারের মাথামুন্ডু কিছুই বুঝতে পারলাম না। কেবল কেমন একটা অজানা ভয়, একটা বিপদের চিন্তা আমার মনকে আচ্ছন্ন করে রাখল।
“যাই হোক, একটা দুটো করে বেশ কয়েকটা সপ্তাহ কেটে গেল। ইতিমধ্যে অবশ্য কোনও গোলমাল হয়নি। আস্তে আস্তে সেই অজানা ভয়ের গা-ছমছমানি ভাবটা কমে এল বটে, কিন্তু সেই ভাবটা মন থেকে একদম মুছে গেল না। এই রকম একটা অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে আমাদের দিন কাটতে লাগল। বাইরে থেকে কোনও কিছুই বদলাল না। কিন্তু আমি বেশ বুঝতে পারছিলাম যে, আমার কাকা ভেতরে ভেতরে কেমন যেন বদলে যাচ্ছেন। তিনি আমাদের সঙ্গে মেলামেশা, কথাবার্তা বলা একদম বন্ধ করে দিয়ে প্রায় সব সময়েই নিজের ঘরে খিল লাগিয়ে একলা বসে থাকতেন। অবশ্য এক এক দিন খুব উত্তেজিত অবস্থায় তিনি একটা পিস্তল হাতে নিয়ে ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে আসতেন। সেই সময়ে তিনি পাগলের মতো চিৎকার করে যা বলতেন তার সারমর্ম হল যে, এ পৃথিবীতে তিনি কাউকে ভয় করেন না। কারও ভয়ে তিনি জন্তুর মতো চব্বিশ ঘণ্টা তাঁর ঘরের ভেতর বন্দি থাকতে পারবেন না। ‘মানুষ দানব ভূতপ্রেত কাউকেই আমি পরোয়া করি না’ বলে তিনি আমাদের বাড়ির বাগানে আর মাঠে খুব খানিকটা হাঁটাহাঁটি করতেন। কিছুক্ষণ পরেই সেই উত্তেজনার ভাবটা কেটে গেলে তিনি দৌড়োতে দৌড়োতে বাড়ির মধ্যে ঢুকে দুমদাম করে সব দরজার খিল লাগিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে পড়তেন। আমরা শুনতে পেতাম যে তিনি তাঁর ঘরের দরজায় চাবি দিয়ে দিচ্ছেন। সেই সময়ে তাঁকে দেখলে মনে হত যে তাঁর মনের মধ্যে ভয়ের ফাঁসটা তাঁকে এতই চেপে ধরছে যে তিনি আর সেটা সহ্য করতে পারছেন না। তাঁর দমবন্ধ হয়ে আসছে। প্রচণ্ড ঠান্ডার দিনেও দেখতাম যে তাঁর শরীর দরদর করে ঘামছে।
“যাক আমার কথা আর বেশি বাড়াব না। এইবার আসল কথায় আসি। একদিন রাত্রে কাকা তাঁর সেই উত্তেজিত অবস্থায় বাগানে পায়চারি করতে বেরিয়ে গেলেন। কিন্তু আর তিনি ফিরে এলেন না। মানে তাঁকে আমরা আর জীবিতাবস্থায় দেখিনি। অনেক রাত্রি পর্যন্ত কাকা ফিরছেন না দেখে আমরা মানে আমি আর চাকরবাকররা কাকার খোঁজ করতে গেলাম। আমাদের বাগানের এক কোণে একটা ডোবা আছে। খুঁজতে খুঁজতে আমরা দেখতে পেলাম যে সেই ডোবাটার মধ্যে কাকা উপুড় হয়ে পড়ে রয়েছেন। তাঁর দেহে প্রাণ নেই। তবে সেখানে কোনও রকম ধস্তাধস্তি, মারামারি কিংবা শারীরিক বল প্রয়োগের লেশমাত্র চিহ্ন নেই।
“যথারীতি পুলিশে খবর দেওয়া হল। পুলিশ এল। সব দেখেশুনে পুলিশ সিদ্ধান্ত করল যে, কাকা মনের অশান্তি সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন। পুলিশের এই সিদ্ধান্ত আমি মেনে নিতে পারলাম না। কেন না, কাকা যে শুধু মরতে ভয় পেতেন তাই নয়, তিনি বাঁচতে চাইতেন। যাই হোক, সব চুকেবুকে গেল। আমার বাবা কাকার সব সম্পত্তির মালিক হলেন। দেখা গেল, ঘরবাড়ি জায়গাজমি ছাড়াও ব্যাঙ্কে কাকার নগদ চোদ্দো হাজার পাউন্ড জমা আছে।”
ওপ্নশকে বাধা দিয়ে হোমস বলল, “এক মিনিট! আপনার কথা যতটুকু শুনলাম তাতেই আমার ভীষণ কৌতুহল হচ্ছে। এ রকম অদ্ভুত ঘটনার কথা আমি এর আগে সত্যি কখনও শুনিনি। তাই সব ব্যাপারটা আমি ভাল করে বুঝে নিতে চাই। আপনার কি মনে আছে যে, আপনার কাকা প্রথম চিঠিটা ঠিক কত তারিখে পান ? আর কত তারিখে তিনি পুলিশের কথামতো আত্মহত্যা করেন ?”
“চিঠিটা এসেছিল ১০ মার্চ ’৮৩। আর এই চিঠিটা পাবার ঠিক সাত সপ্তাহ পরে কাকার মৃত্যু হয়। দোসরা মে তারিখের রাত্রে।”
“ঠিক আছে। আপনি বলুন।”
“তারপর আমার বাবা তো হর্শ্যামে কাকার বাড়িতে চলে এলেন। একদিন আমি বাবাকে ওই চিলেকোঠাটা ভাল করে দেখতে বললাম। চাবি খুলে ঘরে ঢুকতেই আমাদের নজরে পড়ল সেই তামার বাক্সটা। বাক্সর ডালাটা তুলতেই দেখতে পেলাম ভেতরে রয়েছে একটা ছোট কাগজ। কাগজটার একপিঠে লেখা রয়েছে K K K আর তার নীচে লেখা রয়েছে চিঠিপত্র, রসিদ, তালিকা ইত্যাদি। আমরা বুঝতে পারলাম যে, ওই ফর্দে যা লেখা রয়েছে সেই সব জিনিস মানে চিঠিপত্র, রসিদ, তালিকা সব ওই বাক্সে ছিল। আর ওই কমলালেবুর বীজ পাওয়ার ফলেই কাকা ওই কাগজপত্র পুড়িয়ে ফেলেন। ওই বাক্সটা ছাড়া ওই ঘরে আর যা ছিল তা হল কিছু টুকরো কাগজ আর কয়েকটা ডায়েরিজাতীয় ‘নোটবুক’। ওই সব নোটবুকে কাকার আমেরিকার সব অভিজ্ঞতার কথা লেখা। কয়েকটা খাতায় শুধু যুদ্ধের কথাই লেখা ছিল। সেগুলো যে-কোনও লোক পড়লেই বুঝতে পারবে যে, কাকা অত্যন্ত কর্তব্যপরায়ণ অফিসার ছিলেন। বীর যোদ্ধা বলে তাঁর খুব নামও হয়েছিল। আর কয়েকটা খাতায় যুদ্ধের পরেরকার কথা লেখা ছিল। সেই খাতায় কেবলই রাজনীতির কথাবার্তা লেখা। বুঝতে পারলাম যে, কাকা রাজনীতির দলাদলিতে বেশ ভাল ভাবেই জড়িয়ে পড়েছিলেন। কাকার ডায়েরিতে উত্তরাঞ্চলের নেতাদের সম্বন্ধে বেশ কড়া কড়া সব মন্তব্য লেখা আছে। সে সময় আমেরিকার উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের নেতাদের ঝগড়াঝাটি চরমে উঠেছিল।
“৮৪ সালের গোড়ার দিক থেকে আমার বাবা পাকাপাকি ভাবে হর্শ্যামে বাস করতে শুরু করেন। একটা বছর বেশ ভাল ভাবেই কাটল। ‘৮৫ সালের জানুয়ারি মাসে হঠাৎ এক কাণ্ড ঘটল। নববর্ষের ঠিক চারদিন পরে আমরা আমাদের অভ্যেসমতো সকালবেলায় খাবার টেবিলে বসে কাগজ পড়তে পড়তে গল্প করছিলাম, এমন সময় বাবা চেঁচিয়ে উঠলেন। আমি দেখলাম তাঁর এক হাতে ধরা রয়েছে সদ্য-খোলা একটা খাম আর অন্য হাতে কমলালেবুর শুকনো পাঁচটা বীজ। এত দিন পর্যন্ত বাবা কাকার ওই কমলালেবুর বীজের ব্যাপারটা আস্ত গাঁজাখুরি বলে উড়িয়ে দিতেন। কিন্তু আমার মনে হল যে ঠিক এই মুহূর্তে তিনি নিজেই বেশ ঘাবড়ে গেছেন, ভয় পেয়েছেন।
‘“এ সবের মানে কী জানো?’ বাবা থেমে থেমে আমাকে বললেন।
“ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল। আমি কোনওমতে ঢোঁক গিলে উত্তর দিলাম, ‘এটা K K K।’
“বাবা খামটার ভেতরটা দেখে বললেন, ‘হ্যাঁ, তাই তো দেখছি।…এই তো লেখা রয়েছে K K K। কিন্তু এটা আবার কী লেখা রয়েছে।’ বাবার ঘাড়ের পাশ দিয়ে উঁকি মেরে দেখলাম খামটার ভেতরে লেখা রয়েছে, ‘সমস্ত কাগজপত্র সূর্যঘড়ির ওপরে রেখে দেবে।’
‘“কোন কাগজপত্র? আর সূর্যঘড়িই বা কী?’ অবাক হয়ে বাবা আমাকে প্রশ্ন করলেন।
‘“বাগানে যে সূর্যঘড়িটা আছে তার কথাই লিখেছে। আর তো কোনও সূর্যঘড়ি এ চত্বরে নেই। আর কাগজপত্র মানে যে-সব কাগজপত্র কাকা পুড়িয়ে দিয়েছেন।’
‘“ফুঃ ফুঃ, যত্ত সব ইয়ার্কি।’ বাবা গলায় বেশ খানিকটা জোর এনে বললেন, ‘আমরা একটা সভ্য দেশে বাস করি। এ দেশে আইনকানুন আছে। এখানে এ ধরনের বাঁদরামি চলবে না।…দ্যাখো তো চিঠিটা কোথা থেকে এসেছে।’
“পোস্ট অফিসের ছাপ পরীক্ষা করে আমি বললাম, ‘ডানডি থেকে।’
“বাবা বললেন, ‘এ আর কিছুই নয়, কেউ আমাদের সঙ্গে হয় তামাশা করছে না হয় তো বজ্জাতি করছে। আমি ওই কাগজপত্র বা সূর্যঘড়িফড়ির কোনও কিছুই জানি না। আর ওই সমস্ত গাঁজাখুরি ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামাবারও সময় আমার নেই।’
‘“আমার কিন্তু মনে হয় পুলিশে একটা খবর দিয়ে রাখা ভাল।’
‘“হ্যাঁ, আর পুলিশ আমাকে পাগল ভাবুক। উঁহু, ও সব আমি কোনও কিছুই করব না।’
‘“বেশ তো, আপনি নিজে যদি পুলিশকে জানাতে না চান তো আমি পুলিশকে খবর দিয়ে দিচ্ছি।’
‘“না, আমি তোমাকে বারণ করছি। এই ধরনের একটা অর্থহীন বাজে ব্যাপার নিয়ে কোনও রকম হইচই করা আমি একদম পছন্দ করি না।’
“আমি বুঝলাম যে, এ ব্যাপারে কথা বাড়িয়ে আর কোনও ফল হবে না। আমার বাবা ভীষণ একরোখা প্রকৃতির লোক। যেটা তিনি একবার ‘না’ বলবেন সেটা আর ‘হ্যাঁ’ হবে না। তাই ইচ্ছে থাকলেও এ ঘটনার কথা আমি পুলিশকে জানাতে পারলাম না। কিন্তু আমার মন ভয়ানক উদ্বিগ্ন হয়ে রইল।
“ওই চিঠি আসবার দিন তিনেক বাদে একদিন আমার বাবা তাঁর এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে পোর্টসডাউন হিলে গেলেন। বাবার বন্ধুর নাম মেজর ফ্রিবডি। তিনি ওই অঞ্চলের একটি দুর্গের অধিনায়ক। বাবা পোর্টসডাউন হিলে যাওয়াতে আমি মনে মনে বেশ স্বস্তি পেলাম। কী জানি কেন আমার মনে বিশ্বাস হয়েছিল যে, বিপদ আমাদের হর্শ্যামের বাড়ির আনাচেকানাচে লুকিয়ে আছে। তাই আমি ভাবলাম যে, বাবা যদি হর্শ্যামে না থেকে অন্য কোথাও গিয়ে কিছুদিন থাকেন তো বিপদের থাবা সেখান অবধি পৌঁছোতে পারবে না। তখন কি বুঝতে পেরেছিলাম যে আমার ধারণা কত ভুল। বাবা পোর্টসডাউন হিলে যাবার পরের পরের দিন আমি মেজরের কাছ থেকে একটা জরুরি টেলিগ্রাম পেলাম। তিনি আমাকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পোর্টসডাউন হিলে যেতে লিখেছেন। আমার বাবা একটা গভীর গর্তে পড়ে গিয়ে মাথার খুলিতে ভীষণ আঘাত পেয়ে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় রয়েছেন। খবর পেয়েই তো আমি রওনা হলাম। বাবার জ্ঞান আর ফিরল না। বাবা মারা গেলেন। খোঁজখবর করে যা জানতে পারলাম তা হল যে, সন্ধের অন্ধকারে ফেয়ারহ্যাম থেকে একা একা ফেরবার সময়ে তিনি খড়িমাটির গভীর গর্তে পড়ে যান। একে তো ওই অঞ্চলের পথঘাট তাঁর অচেনা, তার ওপর ওই গর্তটা বেড়া দিয়ে ঘেরা থাকায়, বিচারকদের সিদ্ধান্ত হল যে, দুর্ঘটনায় বাবার মৃত্যু হয়েছে।
“আমার বাবার মৃত্যু আমাকে ভীষণ ভাবে বিচলিত করল। আমার মনে হল যে, বাবার মৃত্যুটা ঠিক স্বাভাবিক নয়। কিন্তু মুশকিল হল এই যে, বাবাকে যে খুন করা হয়েছে তাঁর কোনও প্রমাণ যোগাড় করতে পারলাম না। বাবাকে কেউ বা কারা জোর করে গর্তের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে তার কোনও সাক্ষী বা প্রমাণ পেলাম না। বাবা যে গর্তটায় পড়ে গিয়েছিলেন সেই গর্তটার কাছে বাবার ছাড়া দ্বিতীয় কোনও ব্যক্তির পায়ের ছাপও নেই। বাবার পকেট থেকে কিছু চুরি যায়নি। এমনকী ওই অঞ্চলে কোনও অপরিচিত লোককেও সেই সময়ে দেখা যায়নি। এ সব সত্ত্বেও আমি মনে মনে শান্তি পাচ্ছিলাম না। যদিও কোনও প্রমাণ আমার হাতে ছিল না তবু আমার মনের মধ্যে যে সন্দেহটা দানা বাঁধতে শুরু করেছিল সেটা একটা স্পষ্ট আকার নিল। আমার বিশ্বাস হল যে, এ সবের পিছনে রয়েছে কোনও দুশমনের হাত।”
তিন
একটু থেমে থেকে ওপ্নশ ফের বলতে শুরু করল তার কথা। “এই রকম বলতে গেলে এক দুষ্টগ্রহের ফেরে আমি তো ওই সম্পত্তির মালিক হয়ে গেলাম। আপনি জিজ্ঞেস করতে পারেন যে, সম্পত্তিটা আমি বিক্রি করে দিলাম না কেন। এর উত্তরে আমি বলব, আমাদের জীবনে এই যে একটা উটকো অভিশাপ দেখা দিয়েছে, আমার বিশ্বাস, আমার কাকার জীবনের কোনও ঘটনার সঙ্গে এটা জড়িত। তাই, আমি যদি হর্শ্যাম ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাই, তা হলেও এই অভিশাপের হাত থেকে আমি রেহাই পাব না।
“৮৫ সালের জানুয়ারি মাসে আমার বাবার দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়। তারপর থেকে দু’বছর আট মাস কেটে গেছে। আমি হর্শ্যামেই আছি। কিন্তু আর গোলমাল হয়নি। ইদানীং আমার মনে হচ্ছিল যে, এত দিন যে-অভিশাপ আমাদের বংশকে তাড়া করে ফিরছিল তা বোধহয় আমার কাকা আর বাবার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে কেটে গেছে। বলতে কী আমি বেশ স্বস্তি পাচ্ছিলাম। আমার মনের ওপর যে ভয়ের ভাবটা চেপে বসেছিল সেটা আস্তে আস্তে সরে যাচ্ছিল। কিন্তু কালকেই টের পেয়েছি যে আমি এত দিন যা ভেবেছি তা কত ভুল! কাল সকালের ডাকে বাবার নামে যে রকম চিঠি এসেছিল, অবিকল সেই রকম একটা চিঠি আমার নামে এসেছে।” বলতে বলতে জন ওপ্নশ তার কোটের পকেট থেকে একটা দোমড়ানো খাম বের করল। তারপর সে খামটা উপুড় করতেই টেবিলের ওপর পড়ল পাঁচটা শুকনো কমলালেবুর বীজ।
“এই সেই খাম। খামটা লন্ডনের পূর্বাঞ্চলের কোনও ডাকঘরে ফেলা হয়েছিল। আমার বাবাকে লেখা খামে যে-কথা লেখা ছিল এই খামেও সেই একটা কথা লেখা আছে। এই যে প্রথমে লেখা K K K আর তার পরের লাইনে লেখা ‘সমস্ত কাগজপত্র সূর্যঘড়ির ওপরে রেখে দেবে।”
“চিঠিটা পেয়ে আপনি কী করলেন?”হোমস জিজ্ঞেস করল।
“কিছুই করিনি।”
“কিছুই করেননি!”
দু’হাতে নিজের মুখ ঢেকে জন ওপ্নশ অত্যন্ত হতাশ ভাবে বলতে লাগল, “সত্যি কথা বলতে কী আমি একদম ভেঙে পড়েছি। আমার মনের অবস্থা হয়েছে অজগরের সামনে পড়া খরগোশের মতো। অজগরটা তাকে গিলে ফেলবে বুঝেও খরগোশটা যেমন মন্ত্রমুগ্ধের মতো দাঁড়িয়ে থাকে আমিও ঠিক সেই রকম হয়ে পড়েছি। আমার মনে হচ্ছে যে, আমার চারপাশে দুষ্টশক্তির যে জাল ধীরে ধীরে গুটিয়ে আসছে সেই জাল থেকে রক্ষা পাবার কোনও উপায়ই নেই। কেউই বোধহয় এর হাত থেকে আমাকে বাঁচাতে পারবে না।”
“আরে ছিঃ ছিঃ,” হোমস বলল, “আপনার তো এ ভাবে ভেঙে পড়লে চলবে না। এখনই তো আপনাকে আপনার শক্তির শেষ বিন্দু দিয়ে লড়াই করতে হবে। আপনাকে সব রকম ভাবে চেষ্টা করতে হবে যাতে আপনি এই বিপদ থেকে উদ্ধার পান। এখন এ রকম চুপচাপ বসে হাহুতাশ করে লাভ নেই। বিপদের মুখোমুখি হতে ভয় পাবেন না। মনে সাহস এনে বিপদের মোকাবিলা করুন।”
“আমি থানায় গিয়ে পুলিশকে সব কথা খুলে বলেছি।”
“ও তাই নাকি? তা পুলিশ কী বলল ?”
“আমার সব কথা শুনতে শুনতে ওরা যে ভাবে মুখ ঘুরিয়ে মুচকে মুচকে হাসছিল তাতে আমার মনে হল যে, পুলিশের বিশ্বাস হয়েছে যে, আমার সঙ্গে কেউ ঠাট্টা তামাশা করছে। আর আমার কাকা ও বাবার মৃত্যু নিছক দুর্ঘটনা মাত্র। এই সব উড়োচিঠির সঙ্গে ওঁদের মৃত্যুর কোনও যোগাযোগই নেই।”
জনের কথা শুনে হোমস তাঁর বাঁ হাতের তেলোয় ডান হাতের মুঠো ঠুকতে ঠুকতে উত্তেজিত ভাবে বলল, “ওহ্, এ রকম নির্বোধও যে কেউ হতে পারে তা বিশ্বাস করা শক্ত।”
“যাই হোক, শেষ পর্যন্ত পুলিশ থেকে আমার কাছে কাছে থাকার জন্যে একজন কনস্টেবলকে দিয়েছে।”
“সে কি আপনার সঙ্গে এখানে এসেছে?”
“না। তার দায়িত্ব হচ্ছে আমার বাড়িতে পাহারা দেওয়া।” জন বলল।
আমি লক্ষ করলুম যে, শার্লক হোমসের চোখে-মুখে রাগ আর বিরক্তি দু-ই ফুটে উঠল।
তারপর সে জন ওপ্নশকে জিজ্ঞেস করল, “আপনি আমার কাছে কী করতে এসেছেন? আর এলেনই যদি তবে এত দেরি করে এলেন কেন?”
“বিশ্বাস করুন আমি জানতাম না। আজকেই যখন মেজর পেন্ডারগাস্টকে আমার এই বিপদের কথা বলছিলাম তখনই তিনি আমাকে আপনার কথা বলে আপনার সঙ্গে দেখা করতে বললেন।”
“এই চিঠিটা আপনার পাবার পর দু’-দুটো দিন কেটে গেছে। অনেক মূল্যবান সময় নষ্ট হয়ে গেছে। আমাদের আরও আগেই কাজ শুরু করে দেওয়া উচিত ছিল। আচ্ছা, আমাকে যা-যা বললেন এ ছাড়া এই ব্যাপারের সঙ্গে যোগ আছে এমন কোনও কিছু, তা সে যত সামান্য ঘটনা বা যত তুচ্ছ জিনিসই হোক,আপনি কি মনে করে বলতে পারেন? বেশ ভাল করে ভেবে দেখুন। এমন কোনও কিছু যার থেকে এই রহস্যের সমাধানের কোনও রকম হদিস পাওয়া যেতে পারে।”
“হাঁ, মনে পড়েছে, একটা জিনিসের কথা বলতে ভুলে গেছি,” বলে জন তার কোটের পকেট হাতড়াতে হাতড়াতে একটা রং-উঠে-যাওয়া কাগজ বের করে টেবিলের ওপর রাখল। বোঝা যায় যে, এক সময় কাগজটার রং ছিল ফিকে নীল।
“আমার কাকা যেদিন তাঁর সব কাগজপত্র পুড়িয়ে ফেলেছিলেন সেদিন সেই পোড়া কাগজের ছাইয়ের মধ্যে আমি দু’-একটা এই রঙের কাগজের টুকরো দেখতে পেয়েছিলাম। তারপর আমি আর বাবা যেদিন চিলেকোঠা খুলি সেদিন এই কাগজটা মেঝেয় পড়ে থাকতে দেখি। আমার তখনই মনে হয়েছিল যে, তাড়াতাড়ি বান্ডিল করে আনবার সময় এই কাগজটা কোনওক্রমে কাকার হাত ফসকে পড়ে যায় বলে এটা আর সব কাগজের মতো পুড়ে ছাই হয়ে যেতে পারেনি। এই কাগজটাতে কমলালেবুর বীজের কথা ছাড়া এমন কিছু লেখা নেই যার থেকে আমাদের কোনও সাহায্য হতে পারে। আমার মনে হয় এটা একটা ডায়েরির ছেঁড়া পাতা। তবে হাতের লেখা যে আমার কাকার সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।”
হোমস টেবিলল্যাম্পটাকে ঘুরিয়ে কাগজটার ওপর ফেলল। আমরা দু’জনে কাগজটার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়লাম। কাগজটার একটা ধার এবড়োখেবড়ো ভাবে ছেঁড়া। বোঝা যায় যে, এটা কোনও ডায়েরি বা খাতা থেকে ছিঁড়ে নেওয়া হয়েছে। কাগজটার ওপরে এক কোণে লেখা মার্চ ‘৬৯। তারপর এই রকম কতকগুলো হেঁয়ালির মতো লাইন ফর্দের মতো করে লেখা:
৪ তারিখ। হাডসন এসেছিল। সেই পুরনো প্ল্যাটফর্মে।
৭ তারিখ। ম্যাক্কলে, প্যারামোর আর সেন্ট অগাস্টাইনের সোয়েনের জন্যে কমলালেবুর বীজ ছাড়া হল।
৯ তারিখ। ম্যাক্কলে পরিষ্কার হয়ে গেল।
১০ তারিখ। জন সোয়েন পরিষ্কার হয়ে গেল।
১২ তারিখ। প্যারামোরের সঙ্গে মোলাকাত করা গেল। ফয়সালা হল।
কাগজটা ভাঁজ করে জনকে ফেরত দিয়ে শার্লক হোমস বলল, “ঠিক আছে। এখন আর কোনও কারণেই একটি সেকেন্ডও নষ্ট করা নয়। আপনি আমাকে যা বলেছেন সেটা নিয়ে খোলাখুলি ভাবে আলোচনা করবার সময়ও আর নেই। আপনি এখান থেকে বেরিয়ে সোজা বাড়ি চলে যান। আর আমি এখন যা বলে দেব তাই করুন।”
“বলুন আমাকে কী করতে হবে?”
“এখন আপনাকে একটা কাজই করতে হবে। আর সেটা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব করতে হবে। কাজটা হল এই: এই যে কাগজটা এখন আমাদের দেখালেন সেটা আপনার কাকার যে হাতবাক্সটার কথা বলছিলেন সেটার মধ্যে রেখে দেবেন আর অন্য একটা কাগজে লিখবেন যে একমাত্র ওই কাগজটি ছাড়া আপনার কাকা তাঁর অন্যান্য সব কাগজপত্র পুড়িয়ে নষ্ট করে ফেলেছেন। কথাটা এমন ভাবে লিখবেন যাতে তারা আপনার কথা সত্যি বলে মনে করে। তারপর আপনাকে লেখা চিঠিটায় যেমন নির্দেশ দেওয়া আছে সেইমতো বাক্সটা সূর্যঘড়ির ওপরে রেখে দেবেন।…আমার কথা বুঝেছেন তো?”
“হ্যাঁ।”
“আর একটা কথা। এখন আপনার বাবার কি কাকার খুনের প্রতিশোধ নেবার চেষ্টা তো দূরে থাক কল্পনাও করবেন না। অপরাধীকে আমরা আইনের ফাঁদে ধরে তার উপযুক্ত শাস্তি দেওয়ার চেষ্টা করব, কিন্তু তার জন্যে প্রস্তুতি চাই। ভেবেচিন্তে ঠান্ডা মাথায় ফন্দি করতে হবে। অথচ ওদের সুবিধে হচ্ছে যে ওদের সব মতলব অনেক আগে থেকেই ঠিক করাই আছে। আমাদের প্রথম কাজ হচ্ছে আপনাকে বিপদ থেকে রক্ষা করা। তার পরের কাজ হল এই সমস্যার সমাধান করে অপরাধীরা যাতে শাস্তি পায় তার ব্যবস্থা করা।”
জন ওপ্নশ তার ওভারকোট পরতে পরতে বলল, “আপনাকে যে কী বলে ধন্যবাদ দেব মিঃ হোমস তা জানি না। আপনি যেমনটি বললেন আমি ঠিক তেমনটিই করব। আপনার সঙ্গে কথা বলে আমি যে কতখানি ভরসা পেয়েছি তা বলতে পারি না।”
“বেশ। তবে এখন একদম সময় নষ্ট করবেন না। আপনার বিপদ যে সত্যি সত্যি কী মারাত্মক সে বিষয়ে আমার মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।…ভাল কথা, আপনি ফিরবেন কী ভাবে?”
“আমি ওয়াটারলু স্টেশন থেকে ট্রেন ধরব।”
“এখনও নটা বাজেনি। রাস্তায় এখনও লোকজন আছে। মনে হয় পথে আপনার কোনও আপদবিপদ হবে না। তবু সাবধানের মার নেই, খুব হুঁশিয়ার থাকবেন। চারদিকে নজর রাখবেন। বিপদকে কখনও অবহেলা করতে নেই।”
“আমার সঙ্গে অস্ত্র আছে।” ওপ্নশ মৃদু হেসে বলল।
“বাহ্, এটা ভাল করেছেন। আমি কাল থেকেই আপনার ব্যাপারে তদন্ত শুরু করব।”
“তা হলে তো কালই আপনার সঙ্গে হর্শ্যামে দেখা হবে।”
শার্লক হোমস বলল, “না। এই রহস্যের মূল আছে লন্ডন শহরেই। তাই লন্ডনেই আমার কাজ শুরু হবে।”
“ঠিক আছে। তা হলে দু’-এক দিনের মধ্যে আমিই আপনার সঙ্গে দেখা করে যাব। ইতিমধ্যে ওই কাগজটা আর বাক্সটা সূর্যঘড়ির ওপর রাখার ফলই বা কী হল আপনাকে জানাতে পারব। চিন্তা করবেন না, আপনার কথা আমি অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলব।”
জন ওপ্নশ চলে গেল। বাইরে তখনও ঝোড়ো বাতাসের গোঁ-গোঁ গর্জন আর বৃষ্টির একটানা ঝরঝর শব্দ শোনা যাচ্ছিল। আমার মনে হল আমাদের হঠাৎ-আসা এই মক্কেলের অদ্ভুত অবিশ্বাস্য কাহিনীর সঙ্গে বাইরে প্রকৃতির যে তাণ্ডবলীলা চলছে তার কোথায় যেন কিছুটা যোগ রয়েছে। দুটোর কোনওটাকেই আমাদের সাধারণ জীবনের সঙ্গে মেলানো যায় না। দুটোই কেমন যেন অসম্ভব, অবাস্তব বলে মনে হয়।
ওপ্নশ চলে যাবার পর থেকে শার্লক হোমস মাথা হেঁট করে চুপচাপ ফায়ারপ্লেসের গনগনে আগুনের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়েছিল। বেশ কিছুক্ষণ এই ভাবে কেটে যাবার পর হোমস পাইপ ধরিয়ে আরামকেদারায় মাথা হেলিয়ে দেখতে লাগল কী রকম ভাবে নীল ধোঁয়ার চাকাগুলো একটার পর একটা ওপরের দিকে উড়ে যাচ্ছে।
প্রায় আধঘণ্টা পরে শার্লক হোমস বলল, “বুঝলে ওয়াটসন, আজ পর্যন্ত যত রহস্যজনক ব্যাপারের তদন্তের ভার আমাদের ওপর এসেছে তার কোনওটাই জন ওপ্নশের ব্যাপারটার মতো জটিল বা অদ্ভুত নয়।”
“হ্যাঁ। কিন্তু আমি বলব যে ‘সাইন অব ফোর’কে বাদ দিতে হবে।”
“তুমি ঠিকই বলেছ। তবে এ কথাও ঠিক যে জন ওপ্নশের বিপদ কিন্তু শোলটোদের বিপদের চেয়ে ঢের বেশি সাংঘাতিক।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কী ধরনের বিপদের মধ্যে ওপ্নশ ছেলেটি জড়িয়ে পড়েছে তা কি তুমি আন্দাজ করতে পেরেছ?”
“সে বিষয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশই নেই।” হোমস শান্ত গলায় উত্তর দিল।
“বিপদটা কী ধরনের আর এই K K K-ই বা কী আর কেনই বা এই K K K, সে যেই বা যাই হোক, এই লোকগুলিকে শিকারির মতো তাড়া করে বেড়াচ্ছে সেটা একটু খুলে বলবে কি?” আমি খানিকটা অনুনয়ের স্বরে হোমসকে বললাম। সত্যি কথা বলতে কী এই কাহিনীর মাথামুন্ডু কিছুই আমি বুঝতে পারিনি।
আরামকেদারার হাতলে হাত রেখে দু’হাতের আঙুল ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে হোমস বলতে লাগল, “দ্যাখো ওয়াটসন, যে-লোক বুদ্ধি দিয়ে জীবনের সবকিছু বিচার-বিশ্লেষণ করে বুঝতে চায়, মানে যে যুক্তি দিয়ে সব জিনিস বুঝতে চায়, সে যখন কোনও একটি ঘটনা কেন ঘটল তাঁর কার্যকারণ বুঝতে পারে তখনই সে স্পষ্ট দেখতে পায় কী করে তার আগে একটার পর একটা ঘটনা ঘটে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে যার ফলে ওই বিশেষ ঘটনাটি ঘটেছে। শুধু তাই নয়, এর পরে কী ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে তাও সে মোটামুটি আন্দাজ করতে পারে। তুমি নিশ্চয়ই জানো যে কুভিয়েরকে যে-কোনও জন্তুর ছোট্ট এক টুকরো হাড় দেখালে তিনি পরীক্ষা করে সেই জন্তুর চেহারার একটা নিখুঁত বিবরণ দিতে পারতেন। সেই একই রকম ভাবে যাঁর দেখবার চোখ আর বিশ্লেষণ করবার ক্ষমতা আছে, তিনি যদি পর পর ঘটে-যাওয়া কয়েকটি ঘটনার মধ্যে খুব সামান্য কোনও কিছুর—তা সে একটা ঘটনাই হোক বা কথাই হোক বা একটা আওয়াজই হোক—আসল মানেটা ধরতে পারেন, তবে সেইটুকুর ওপর নির্ভর করে আগের ঘটনাগুলোর কার্যকারণ, সম্পর্ক তো বুঝতেই পারেন আর পরে কী ঘটতে চলেছে তাও অনুমান করতে পারেন। নির্ভুল বিচার-বিশ্লেষণ ও যুক্তির সাহায্যে আমরা জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে কী আশ্চর্য রকম ফল পেতে পারি তা এখনও আমরা ঠিকমতো বুঝতে পারিনি। এমন অনেক সমস্যা আছে যার সমাধান করা হয়তো অনেক লোকের পক্ষে বিস্তর খাটাখাটনি করা সত্ত্বেও সম্ভব হয়নি, সেই রকম সমস্যার সমাধান কোথাও না গিয়ে স্রেফ ঘরে বসে করে ফেলা যায়।
“যে-বিশ্লেষণী শক্তির কথা আমি বলছি সেই শক্তির চুড়ান্ত বিকাশ ঘটাতে গেলে প্রথমে যা দরকার তা হল হাতের কাছে যে-সব তথ্য রয়েছে সেগুলোকে ঠিকমতো কাজে লাগাবার দক্ষতা। আর সেই দক্ষতা অর্জন করতে গেলে যেটা সবচেয়ে দরকারি সেটা হল অনেক বিষয়ের ওপর অগাধ জ্ঞান, যত বেশি সম্ভব বিষয়ের সম্বন্ধে গভীর পড়াশোনা। আর এ কথাটা নিশ্চয়ই তোমাকে মনে করিয়ে দিতে হবে না যে, যদিও আমাদের দেশে এখন বিনা বেতনে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শেখাবার ব্যবস্থা হয়েছে আর এনসাইক্লোপিডিয়া ও সাধারণ জ্ঞানের বহু বই বাজারে বেরিয়েছে, তবুও নানা বিষয়ের ওপর রীতিমতো দখল আছে এ রকম পণ্ডিত কেউ নেই বললেই চলে। আমার কথা যদি বলো তবে বলতে পারি যে, যে-সব বিষয়ের জ্ঞান আমার নিজের কাজে লাগবে বা লাগতে পারে বলে মনে করি সেই সেই বিষয়ের ওপর যতদূর পড়াশোনা করা যায় ততটা আমি করেছি। আমার মনে আছে যে, আমার সঙ্গে প্রথম আলাপের অল্প কিছুদিন পরে তুমি আমার সম্বন্ধে বেশ একটা মজার হিসেব করেছিলে।”
আমি হেসে জবাব দিলাম, “হ্যাঁ। বলতে পারো সেটা তোমার সম্বন্ধে একটা রিপোর্ট-কার্ড। দর্শনশাস্ত্রে, জ্যোতির্বিজ্ঞানে আর রাজনীতিতে তোমার যা জ্ঞান তাতে আমি তোমাকে গোল্লা দিয়েছিলাম। উদ্ভিদবিজ্ঞানে তোমার জ্ঞান চলনসই, ভুতত্ত্বে, বিশেষ করে লন্ডন শহরের প্রায় পঞ্চাশ মাইল পরিধির মধ্যে যে-সব জায়গা আছে সেসব অঞ্চলের মাটির বিশেষত্ব সম্পর্কে তোমার জ্ঞান অসাধারণ। রসায়নশাস্ত্রে তোমার জ্ঞান যাকে বলা যেতে পারে খাপছাড়া। শারীরবিদ্যায়ও তোমার জ্ঞান কোনও কোনও বিষয়ে ভাল আবার কোনও কোনও বিষয়ে খুব খারাপ। তবে খুন-রাহাজানি-জালিয়াতি বা যে-সব অপরাধমূলক ঘটনা ঘটেছে তার খুঁটিনাটি যাবতীয় তথ্য তোমার নখদর্পণে। বেহালা বাজনায় তোমার হাত খুব ভাল। তুমি একজন ভাল মুষ্টিযোদ্ধা। দক্ষ অসিযোদ্ধা। আইনশাস্ত্রে বেশ ভাল দখল আছে। আর তুমি ভীষণ পাইপ খাও।…যতদূর মনে পড়ছে তোমার চরিত্র বিশ্লেষণ করে এই দিকগুলোই তখন আমার নজরে পড়েছিল।”
অল্প হেসে হোমস বলল, “আমি তোমাকে তখনও যে-কথা বলেছিলাম এখনও সেই কথা বলব। কথাটা হচ্ছে এই যে প্রত্যেক লোকেরই উচিত তার মস্তিষ্কের মধ্যে কেবলমাত্র সেই ধরনের তথ্যগুলি বেশ যত্ন করে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা দরকার যেগুলি তার কাজের পক্ষে বিশেষ প্রয়োজনীয়। আর যা কিছু তার নিজের কাজের পক্ষে অপ্রয়োজনীয় সেগুলি সে গুদামজাত করে রাখবে তার লাইব্রেরিতে, যাতে প্রয়োজন হলেই তার যা জানবার সে জেনে নিতে পারে। এখন এই যে কেসটা আমাদের হাতে এসেছে সেটার ফয়সালা করবার জন্যে আমাদের প্রথম কর্তব্য হল সমস্ত প্রয়োজনীয় খবরাখবর সংগ্রহ করা। তোমার চেয়ারের পাশের বইয়ের আলমারি থেকে আমেরিকান এনসাইক্লোপিডিয়ার যে খণ্ডে ‘K’ আছে সেটা করে দাও তো।
বইটা বের করে হোমসকে এগিয়ে দিলাম।
চার
বইটা হাতে নিয়ে শার্লক হোমস বলল, “ধন্যবাদ। কিন্তু এটা দেখবার আগে এসো চেষ্টা করা যাক আমরা যতটুকু জেনেছি তার থেকে কী সিদ্ধান্ত করতে পারি। প্রথমে এটা ধরে নেওয়া যেতে পারে যে, জন ওপ্নশয়ের কাকার আমেরিকা থেকে চলে আসবার পিছনে বিশেষ কোনও কারণ ছিল। কেন না, যে বয়সে তিনি আমেরিকা থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে চলে আসেন, সেই বয়সের লোকেরা সাধারণত নিজেদের চেনা পরিবেশ ছেড়ে চট করে অন্য কোথাও যেতে চায় না। বিশেষ করে ফ্লোরিডার চমৎকার আবহাওয়া ছেড়ে ইংল্যান্ডের ঠান্ডায় পাড়াগাঁয়ে কেউই বিনা কারণে আসতে চাইবে না। তিনি যে লোকজনের সম্পর্ক বাঁচিয়ে একলা একলা থাকতে চাইতেন তার থেকে এটাই মনে হয় যে, তিনি কোনও কিছুর বা কোনও লোকের ভয়ে অমন করে লুকিয়ে থাকতেন। তার থেকে এ অনুমান করাও ভুল হবে না যে, কোনও কিছুর বা কোনও লোকের ভয়েই আমেরিকা থেকে পালিয়ে আসতে তিনি বাধ্য হন। এখন কার বা কীসের ভয়ে তিনি আমেরিকা থেকে পালিয়ে আসেন তার কিছুটা হদিস আমরা পেতে পারি তাঁকে ও তাঁর উত্তরাধিকারীদের কাছে লেখা চিঠিগুলো পরীক্ষা করে। তুমি ওই চিঠিগুলোয় ডাকঘরের ছাপ লক্ষ করেছিলে কি?”
“হ্যাঁ। প্রথম চিঠিটা ফেলা হয়েছিল পণ্ডিচেরিতে, দ্বিতীয় চিঠিটা ফেলা হয়েছিল ডানডিতে আর তৃতীয়টা ফেলা হয়েছে লন্ডনের পুবদিকের কোনও ডাকঘরে।”
“লন্ডনের পুবদিকের কোনও ডাকঘরে।…হুঁ…আচ্ছা, এর থেকে তুমি কোনও সিদ্ধান্ত করতে পারো কি?”
“তিনটে জায়গাই সামুদ্রিক বন্দর। অর্থাৎ ওই পত্র যে লিখেছে, সে কোনও জাহাজযাত্রী।”
“এটা তুমি দারুণ বলেছ ওয়াটসন। এখন আমাদের হাতে একটা কাজের উপযুক্ত সূত্র পাওয়া গেল। এ বিষয়ে আমরা মোটামুটি নিঃসন্দেহ যে, পত্রলেখক খুব সম্ভবত…না, না, সম্ভবত নয়, প্রায় নিশ্চিত ভাবেই কোনও জাহাজের যাত্রী। আচ্ছা, এবার আর-একটা জিনিস লক্ষ করা যাক। প্রথম চিঠির বেলায়, যেটা পণ্ডিচেরিতে ফেলা হয়েছিল, হুমকি দেবার প্রায় সাত সপ্তাহ পরে চিঠির বক্তব্য অনুযায়ী কাজ হয়েছিল। কিন্তু দ্বিতীয় চিঠিটা যেটা ডানডিতে ফেলা হয়েছিল সেটার বেলায় চিঠি পৌঁছোবার তিন-চার দিনের মধ্যেই চিঠির কথা অনুযায়ী কাজ হয়েছিল। এর থেকে তুমি কিছু আন্দাজ করতে পারছ কি?”
“মনে হয় পত্রলেখককে বহু দূর থেকে আসতে হয়েছে।”
‘কিন্তু চিঠিটাও তো অনেক দূর থেকে এসেছে, তাই নয় কি?”
“নাহ্, তা হলে আমার বুদ্ধিতে কুলোল না।”
“এই রকম একটা আন্দাজ মোটামুটি ভাবে করা যায় যে, পত্ৰলেখক বা লেখকেরা যে জাহাজের যাত্রী সেটা হচ্ছে পালতোলা জাহাজ। মনে হয় যে, এরা এদের কাজে নামবার ঠিক আগেই তাদের চিঠি বা সংকেত যে-ব্যক্তি তাদের লক্ষ্য, তার ঠিকানায় পাঠিয়ে দেয়। তুমি নিশ্চয়ই লক্ষ করেছ যে, ডানডি থেকে চিঠি পাঠাবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই জনের বাবার আশ্চর্যভাবে মৃত্যু ঘটল। যদি তারা পণ্ডিচেরি থেকে স্টিমারে আসত, তা হলে তারা আর তাদের চিঠি একই সঙ্গে পৌঁছে যেত। কিন্তু তা হয়নি। চিঠি আসবার আর জনের কাকার অস্বাভাবিক মৃত্যুর মধ্যে সাত সপ্তাহ কেটে গেছে। আমার দৃঢ় ধারণা এই সাত সপ্তাহ দেরি হবার কারণ হল ডাকবাহী স্টিমার যাত্রীবাহী পালতোলা জাহাজের চেয়ে সাত সপ্তাহ আগে ইংল্যান্ডে পৌঁছে গিয়েছিল।”
“হ্যাঁ, সেটা হতে পারে।”
“না, এটা হতে পারে নয়, এটাই হওয়া সম্ভব। তা হলেই তুমি বুঝতে পারছ যে, কেন আমি ছেলেটিকে এত বার এত বেশি করে সাবধান হতে বলছি। এই রহস্যের ঠিকমতো সমাধান করতে হলে সব কাজই আমাদের খুব সাবধানে অথচ যতদূর সম্ভব তাড়াতাড়ি সেরে ফেলতে হবে। তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছ যে, চিঠি পাবার পরে পত্রলেখকের ঘটনাস্থলে হাজির হতে যতটুকু সময় লেগেছে ঠিক তার পরেই যাকে উদ্দেশ্য করে চিঠি লেখা হয়েছে তার ওপর চরম আঘাত নেমে এসেছে। জনকে লেখা চিঠিটা এসেছে লন্ডন থেকে। সুতরাং আর যাই হোক এ ক্ষেত্রে চিঠির হুমকি অনুযায়ী কাজ হতে যে দেরি হবে না সেটা আমরা ধরে নিতে পারি। তাই আমাদের যা-কিছু করবার তা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব করে ফেলতেই হবে।”
“ওপ্নশদের এই ধরনের কঠিন শাস্তি দেবার পেছনে কী কারণ থাকতে পারে বলে তোমার ধারণা?”
“জনের কাকার কাছে যে কাগজপত্র ছিল সেগুলো ওই জাহাজের কোনও যাত্রী বা যাত্রীদের কাছে ভীষণ দরকারি। আমি নিশ্চিত যে, এর পেছনে কোনও বিশেষ একটি লোক নেই। আছে গোটা একটি দল। কেন না করোনারকে ঠকিয়ে দু’-দুটো খুনকে দুর্ঘটনায় মৃত্যু বলে চালানো কোনও একজন লোকের পক্ষে অসম্ভব। এদের দলে অনেক লোক আছে। এরা অসম্ভব নাছোড়বান্দা আর এদের টাকাপয়সা ছাড়াও সব রকম সুযোগ-সুবিধেও আছে। সেইজন্যে যে-কোনও ভাবেই তারা এইসব কাগজপত্র ফিরে পেতে দৃঢ়সংকল্প। সে কাগজ যার কাছেই থাকুক তাকেই তারা তাড়া করবে শিকারি কুকুরের মতো। তা হলে এখন বুঝলে K K K কোনও ব্যক্তির নামের আদ্যক্ষর নয়, এটা একটা দলের প্রতীক বা চিহ্ন।”
“কিন্তু এটা কাদের দল ?”
শার্লক হোমস আমার দিকে ঝুঁকে পড়ে আশ্চর্য হয়ে বলল, “সে কী! তুমি কি Ku Klux Klan-এর নাম শোনোনি?”
“না তো?”
আমার কথার কোনও উত্তর না দিয়ে হোমস তার কোলের ওপর রাখা বইটি খুলে পাতা ওলটাতে লাগল। তারপর একটা পাতা খুলে চোখ বুলোতে বুলোতে বলল, “এই যে পেয়েছি। Ku Klux Klan। রাইফেলে গুলি পুরতে যে রকম শব্দ হয় সেই আওয়াজের সঙ্গে মিলিয়ে এই দলের নাম দেওয়া হয়। আমেরিকার গৃহযুদ্ধ শেষ হবার পরে দক্ষিণ রাজ্যগুলির ছাঁটাই হওয়া সৈন্যরা মিলে এই সাংঘাতিক গুপ্তসমিতির প্রতিষ্ঠা করে। আর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই গুপ্তসমিতির শাখা স্থাপিত হয়। টেনেসি, লুইসিয়ানা, ক্যারোলিনা, জর্জিয়া আর ফ্লোরিডায় এদের শাখাগুলো খুবই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। সাধারণ ভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতালোভের উদ্দেশ্যেই রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তিবিশেষ এদের কাজে লাগাত। এদের কাজ ছিল মোটামুটি দু’ রকমের। এক, নিগ্রো ভোটদাতাদের ওপর অত্যাচার করে তাদের ভয় দেখানো আর দ্বিতীয় কাজ হল তাদের সঙ্গে যাদের মতের মিল হত না তাদের একেবারে শেষ করে দেওয়া। এদের এই ধরনের জঘন্য কার্যকলাপ মোটামুটি একটা নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে হত। যে-লোককে এরা এদের শত্রু বলে মনে করত তাকে প্রথমে একটা হুমকি দিয়ে চিঠি পাঠাত। সেই চিঠির সঙ্গে থাকত হয় ওকগাছের পাতা না-হয় তরমুজ বা কমলালেবুর বীজ। এই হুমকি-দেওয়া-চিঠি যাকে দেওয়া হত হয় সে চিঠির শর্ত অনুযায়ী কাজ করত, না-হয় দেশ ছেড়ে পালাত। আর যারা ওদের হুমকি অগ্রাহ্য করেছে তাদের প্রত্যেকেরই আকস্মিক ও অদ্ভুত ভাবে মৃত্যু ঘটেছে। এদের এই সমিতির কাজকর্ম এমনই নিখুঁত আর গোছানো যে, আজ পর্যন্ত এরা যাদেরই চিঠি পাঠিয়েছে তাদের একজনও এদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি। এই ভাবে এরা এতদিন যে একটার পর একটা অন্যায় কাজ করে গেছে সে জন্যে এদের দলের কোনও লোককে ধরতে পারা তো দূরে থাক, এদের একজনেরও আসল পরিচয় পুলিশ পায়নি। বেশ কিছুকাল মার্কিন সরকারের সমস্ত রকম চেষ্টাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এই গুপ্তঘাতক সমিতি তাদের অত্যাচার বেশ জোরদার ভাবে চালিয়ে এসেছে। এদের দাপট খুব বেশি ছিল দক্ষিণ দিকের প্রদেশগুলিতে। তারপর হঠাৎ ‘৬৯ সালে প্রায় রাতারাতি এই সমিতির কাজকর্ম সব বন্ধ হয়ে গেল। এর পরে অবশ্য কখনও কখনও ছুটকোছাটকা ভাবে এদের কুকর্মের খবর পাওয়া গেছে।”
বইটা তুলে রাখতে রাখতে হোমস বলল, “তুমি যদি একটু খুঁটিয়ে দ্যাখো তো লক্ষ করবে যে, এই সমিতির উঠে যাওয়ার সঙ্গে ওপ্নশয়ের কাকার আমেরিকা থেকে কাগজপত্র নিয়ে পালিয়ে আসার একটা সময়ের দিক থেকে যোগাযোগ আছে। এমন হতে পারে যে, জনের কাকা আমেরিকা থেকে পালিয়ে এলেন বলেই ওই সমিতি উঠে গেল। সেই কারণেই ওই সমিতির লোকেরা বুনো কুকুরের মতো হন্যে হয়ে লেগে আছে ওপ্নশ বংশের পেছনে। এটা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ যে, জনের কাকা যে-ডায়েরি নিয়ে পালিয়ে আসেন তাতে এই সমিতির অনেক সদস্যের ব্যক্তিগত পরিচয় ছাড়াও বহু গোপন খবর লেখা ছিল। সুতরাং সেই ডায়েরিটা উদ্ধার করতে না পারা পর্যন্ত এদের ঘুম হবে না।”
“তা হলে ডায়েরির যে ছেঁড়া পাতাটা আমরা দেখেছি—”
“তুমি যা অনুমান করেছ ঠিক তাই। আমার যতদূর মনে পড়ছে তাতে এই রকম লেখা ছিল: ‘ক’ ‘খ’ ‘গ’-কে কমলালেবুর বীজ ছাড়া হল। এর মানে হল যে, এদের সাবধান করে দেওয়া হল। তারপর লেখা ছিল ‘ক’ আর ‘খ’ পরিষ্কার হয়ে গেছে। এর মানে এরা দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। আর ‘গ’ সম্বন্ধে লেখা ছিল গয়ের সঙ্গে মোলাকাত করা গেল। এই কথাটার মানে কিন্তু ভাল নয়। ‘মোলাকাত করা গেল’ কথাটার মানে হল ‘গ’-কে খুন করা হল। ডাক্তার, মনে হচ্ছে যে এত দিনে হয়তো Ku Klux Klan রহস্যের সমাধান হবে।
তবে জন ওপ্নশয়ের বাঁচবার একমাত্র রাস্তা হচ্ছে আমি তাকে যা করতে বলেছি সেইমতো কাজ করা। যাই হোক, আজ রাত্রে এ ব্যাপারে আর কোনও আলোচনা করে লাভ নেই। তার চেয়ে বরং আমার বেহালাটা দাও, সংগীতচর্চা করা যাক। তা হলে যদি এই বিশ্রী আবহাওয়া আর মানুষের কুৎসিত আচারব্যবহারের কথা অন্তত কিছুক্ষণ ভুলে থাকা যায়।”
পাঁচ
পরের দিন সকালে উঠে দেখি, আকাশ একদম পরিষ্কার। সূর্য উঠেছে। আগের দিন যে প্রচণ্ড ঝড় আর বৃষ্টি হয়ে গেছে, তার চিহ্নমাত্র নেই। হোমস দেখলাম আমার আগেই ঘুম থেকে উঠে পড়েছে। মুখ ধুয়ে আমি যখন চা খেতে গেলাম, তখন তার খাওয়া প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। আমাকে দেখে হোমস বলল, “আজ তোমার জন্যে অপেক্ষা না করেই চা খেতে আরম্ভ করেছি বলে আশা করি কিছু মনে করোনি। আসল কথা কী জানো, ওপ্নশয়ের কেসটা নিয়ে আজ সারাটা দিনই হয়তো বিস্তর ঘোরাঘুরি করতে হবে।”
ওপ্নশকে বাঁচাবার জন্যে কী ব্যবস্থা নেবে বলে ভাবছ?”
সেটা অনেকখানি নির্ভর করবে আমার তদন্তের ফলের ওপর। হয়তো আমাকে হর্শ্যামে যেতে হতে পারে।”
“সে কী! তুমি কি প্রথমেই হর্শ্যামে যাবে না?”
“না। আমার কাজ শুরু হবে এই লন্ডন শহরেই…হাঁক দাও, এখনই তোমার চা এসে পড়বে।”
চায়ের জন্যে অপেক্ষা করতে করতে আমি সকালের খবরের কাগজটা তুলে নিলাম। কাগজটা তখনও খোলা হয়নি। কাগজটা খুলে চোখ বোলাতেই খবরটা আমার নজরে পড়ল। খবরের শিরোনামটা পড়তেই একটা ঠান্ডা শিরশিরে ভাব আমার মেরুদণ্ড দিয়ে বয়ে গেল।
আমি চেঁচিয়ে বলে উঠলাম, “হোমস, তুমি অনেক দেরি ফেলেছ!”
“ওঃ!” হাতের চায়ের কাপটা টেবিলের ওপর নামিয়ে হোমস বলল, “এই আশঙ্কাটাই আমি করেছিলাম। কী করে ব্যাপারটা ঘটল?”
যদিও হোমস অত্যন্ত শান্ত ভাবে কথাগুলো বলল, আমার বুঝতে কষ্ট হল না যে, মনে মনে সে কতখানি উত্তেজিত হয়ে পড়েছে। তার এই বাইরের ধীরস্থির ভাবের আড়ালে কী চঞ্চলতা ঢাকা রয়েছে।
“ওয়াটারলুর কাছে ‘ট্র্যাজেডি’ বলে যে খবরটা বেরিয়েছে তাতে জন ওপ্নশয়ের নামটা আমার চোখে পড়ে। এই যে পড়ছি, শোনো:
‘গতকাল রাত্রি ন’টা থেকে দশটার মধ্যে ওয়াটারলু ব্রিজের কাছে পাহারা দেবার সময় এইচ ডিভিশনের পুলিশ কনস্টেবল কুক একটা আর্তনাদ আর তার সঙ্গে সঙ্গে জলে পড়ে যাবার ঝপাস শব্দ শুনতে পায়। গত রাত্রিতে ঝড়-জলের আর অন্ধকারের মধ্যে বেশ কয়েকজন লোকজনের সাহায্য পাওয়া গেলেও জলে পড়ে যাওয়া লোকটিকে সঙ্গে সঙ্গে জল থেকে তোলা যায়নি। যা হোক তৎক্ষণাৎ বিপদসংকেত দেওয়া হয় এবং জলপুলিশের সাহায্যে কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পরে লোকটির মৃতদেহ নদী থেকে তোলা হয়। লোকটির কোটপ্যান্ট পরীক্ষা করে একটি খাম পাওয়া যায়। তার থেকে লোকটির যেটুকু পরিচয় পাওয়া গেছে, তা হল, তার নাম জন ওপ্নশ, বাড়ি হর্শ্যাম। মনে হয় যে, ওয়াটারলু থেকে শেষ ট্রেন ধরবার জন্যে তাড়াতাড়ি যেতে গিয়ে অন্ধকারে সে পথ ভুল করে এবং স্টিমারঘাটের কিনারায় পা ফসকে নদীতে পড়ে যায়। যুবকটির দেহ ভাল ভাবে পরীক্ষা করে কোনও আঘাত বা ধস্তাধস্তির চিহ্ন পাওয়া যায়নি। সন্দেহ নেই যে দুর্যোগের রাত্রিতে একটি দুর্ভাগ্যজনক দুর্ঘটনার শিকার তাকে হতে হল। আমরা আশা করব যে, এই ঘটনার পর কর্তৃপক্ষ ওই শহরের ওই অঞ্চলের ঘাটগুলির অবস্থার কথা বিবেচনা করবেন এবং ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের দুর্ঘটনা না ঘটে তাঁর উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবেন।”
বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ কেটে গেল। আগে কখনও হোমসকে এ রকম ভাবে মুষড়ে পড়তে দেখেছি বলে মনে হয়নি। এক সময় নিস্তব্ধতা ভেঙে হোমস বলল,“ওয়াটসন, আমার আত্মসম্মানে দারুণ আঘাত লেগেছে। তুমি বলতে পারো এ ক্ষেত্রে আমার আত্মসম্মানের প্রশ্নটা খুবই তুচ্ছ। তা ঠিক। তবুও বলছি বিশ্বাস করো আমার আত্মসম্মানে ঘা লেগেছে। জন ওপ্নশের ব্যাপারটা এখন আমার কাছে নিছক একটা কেস নয়, এটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার হয়ে দাঁড়াল। ঈশ্বর সহায় হলে আমি এই দুষ্টচক্রের সবক’টাকে শায়েস্তা করব। ওহ্, আমি ভাবতে পারছি না যে, যে-লোকটা আমার কাছে সাহায্যের জন্যে এল তাকেই আমি মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিলাম।”
চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ে হোমস ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে লাগল। তার চোখমুখ, আর অস্থির ভাবে একবার হাত মুঠো করেই সঙ্গে সঙ্গে খুলে ফেলার ভঙ্গি দেখে আমার বুঝতে অসুবিধা হল না যে, তার মনের মধ্যে ক্ষোভ, ক্রোধ আর প্রতিশোধ নেওয়ার ইচ্ছে কী প্রচণ্ড ভাবে তোলপাড় করছে।
হোমস বলল, “বুঝলে ওয়াটসন, এই শয়তানগুলো যেমন চতুর তেমনই বেপরোয়া। আমি শুধু ভাবছি কী কায়দায় ওরা ছোকরাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে ওই রাস্তায় নিয়ে গেল। তাড়াতাড়ি স্টেশনে যেতে হলে নদীর বাঁধের রাস্তা দিয়ে কেউ যায় না। ওটা তো ঘুরপথ। যদিও কাল দুর্যোগ ছিল, তবুও ব্রিজের রাস্তায় লোকজনের যাতায়াত ছিল, তাই ওদের পক্ষে কাজ হাসিল করা শক্ত হত।…আচ্ছা এখন দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কে হারে আর কে জেতে। ওয়াটসন, আমাকে এখনই বেরোতে হবে।”
“কোথায়? পুলিশের কাছে?”
‘না। আমার পুলিশ তো আমি নিজেই। দাঁড়াও, আগে ওদের চারদিকে ভাল করে বেড়াজাল বিছিয়ে দিই, ওরা জালে পড়ুক, তখন পুলিশকে খবর দেওয়া যাবে। তার আগে পর্যন্ত যা করবার তা আমাকেই করতে হবে।”
হোমস চলে যাবার খানিক বাদে আমিও বেরিয়ে পড়লাম। রুগি দেখতেই সারাদিনটা কেটে গেল। যখন বেকার স্ট্রিটে ফিরে এলাম তখন সন্ধে হয়ে গেছে। হোমসের তখনও পাত্তা নেই। হোমস যখন ফিরে এল তখন ঘড়িতে প্রায় দশটা বাজে। তাকে ঠিক ঝোড়োকাকের মতো দেখাচ্ছিল। ঘরে ঢুকেই হোমস সিধে চলে গেল আলমারির কাছে। তারপর আলমারি থেকে একটা পাউরুটি বের করে সেটা এক গেলাস জল নিয়ে গোগ্রাসে খেতে লাগল।
আমি বললাম, “তোমার দেখছি খুব খিদে পেয়েছে।”
“হুঁ, বলতে পারো উপোসি ছারপোকা। সেই সকালবেলায় চায়ের সঙ্গে যা খেয়েছি। খাবার কথা আমার মনেই ছিল না।”
“সারাদিন কিছুই খাওনি?”
“না। একটি দানাও পেটে পড়েনি। আর তা ছাড়া আমার খাবার সময়ই ছিল না।”
“তা তোমার কাজ কেমন হল?”
“ভালই হয়েছে বলতে পারো।”
“তা হলে তুমি ব্যাপারটা হদিস করতে পেরেছ?”
“হ্যাঁ, ওরা এখন বলতে গেলে আমার হাতের মুঠোয়। বেচারা জন ওপ্নশকে অকারণে হত্যা করার জন্যে খুব শিগগির ওদের উপযুক্ত শাস্তি পেতেই হবে। দাঁড়াও, একটা বেশ ভাল বুদ্ধি মাথায় এসেছে। যে ধরনের হুমকি পাঠিয়ে ওরা এত দিন অন্য লোককে ভয় দেখিয়েছে, এইবার সেই চালই ওদের ওপর চালব। হ্যাঁ, এটাই খুব ভাল হবে।”
“তুমি কী বলছ বুঝতে পারছি না।”
আমার কথার কোনও উত্তর না দিয়ে হোমস আলমারির মাথা থেকে একটা কমলালেবু নিয়ে এল। তারপর সেটার খোসা ছাড়িয়ে কোয়াগুলো টিপে টিপে বীজগুলো বের করে নিল। সেই বীজগুলোর থেকে দেখেশুনে পাঁচটা বীজ বেছে নিয়ে সেগুলোকে একটা খামের মধ্যে পুরে খামের ভেতরে এককোণে লিখল ‘জে. সি. কে. এস. এইচ.’। খামটা আঠা দিয়ে বন্ধ করে নিজের শিলমোহর মেরে দিল। খামের ওপরে ঠিকানার জায়গায় লিখল: ক্যাপ্টেন জেমস ক্যালহন, লোনস্টার জাহাজ, সাভানা, জর্জিয়া।
আমার দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে হোমস বলল, “ব্যস, বন্দরে পৌঁছোনো মাত্রই জেমস ক্যালহন এই চিঠিটি পাবেন। আর এইটে পাবার পর, আর যাই হোক, তাঁর রাত্তিরের ঘুমটা সে রকম গাঢ় হবে না। জন ওপ্নশের বেলায় কমলালেবুর বীজ যেমন মৃত্যুর পরোয়ানা হয়ে দেখা দিয়েছিল, জেমস ক্যালহনের বেলায়ও ঠিক তাই হবে।”
“কিন্তু এই ক্যাপ্টেন ক্যালহনটি কে?”
“এই সমিতির পাণ্ডা। ওদের দলের প্রত্যেককেই ধরব। তবে নাটের গুরুকে দিয়েই শুরু করব।”
“আচ্ছা হোমস, এ সব তুমি জানলে কী করে?”
আমার কথার উত্তরে হোমস পকেট থেকে একটা বড় কাগজ বের করল। কাগজটার আগাগোড়া নাম আর তারিখে ভরতি।
“আজ সারা দিন আমি লয়েড কোম্পানির আপিসে বসে তাদের পুরনো রেজিস্টার আর নথিপত্র ঘেঁটেছি। আমার উদ্দেশ্য ছিল ‘৮৩ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে কোন কোন জাহাজ পণ্ডিচেরি বন্দরে থেমেছিল আর তারপর সেগুলো কোন কোন দিকে গেছে সেটা জানা। মোট ছত্রিশটা বড় আকারের জাহাজ ওই দু’মাসের মধ্যে পণ্ডিচেরি বন্দরে থেমেছিল। তখন আমি ওই জাহাজগুলোর পরিচয়, মানে কোন দেশের জাহাজ, কার জাহাজ, কোন কোন দেশে যায় এবং কোথায় জাহাজগুলো রেজিস্ট্রেশন করা—এই সব খবর সংগ্রহ করতে লাগলাম। এর মধ্যে লোনস্টার জাহাজটাকে আমার সবচেয়ে সন্দেহজনক বলে মনে হল। কেন না, যদিও কাগজে-কলমে লেখা রয়েছে যে, জাহাজটা লন্ডন থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে, কিন্তু সেখানে যে নাম দেওয়া আছে সেটা আমেরিকার একটি প্রদেশের।”
আমি বললাম, “কী, টেক্সাস নাকি?”
“না, তা মনে পড়ছে না। তবে আমি নিশ্চিত যে, জাহাজটা আমেরিকার।”
“তারপর কী হল?”
“তখন যে-সব জাহাজ ডানডিতে থেমেছিল সেগুলোর খোঁজ করতে লাগলাম। দেখলাম ‘লোনস্টার’ ‘৮৫ সালের জানুয়ারি মাসে ডানডিতে থেমেছিল। এই খবরটা জানবার পর আমার মনে যে সন্দেহটা দানা বাঁধতে শুরু করেছিল, সেটা সত্যি হয়ে উঠল।
“লয়েডের আপিস থেকে বেরিয়ে আমি গেলাম অ্যালবার্ট ডকে। ডকে পৌঁছে খবর পেলাম যে, আজ সকালের জোয়ারেই লোনস্টার তার নিজের দেশের দিকে পাড়ি দিয়েছে। তবে প্রথমে সে সাভানায় থামবে। আমি তৎক্ষণাৎ গ্রেভস এন্ডে টেলিগ্রাম করলাম। জানতে পারলাম যে লোনস্টার অল্প কিছুক্ষণ আগে সেখান দিয়ে চলে গেছে। সকাল থেকে যে রকম জোর হাওয়া দিচ্ছে তাতে আমার মনে হয় যে, লোনস্টার এতক্ষণে গুডউইনস ছাড়িয়ে আইল অব ওয়াইটের কাছাকাছি চলে গেছে।”
“তা হলে এখন তুমি কী করবে?”
“আরে আমি তো তোমাকে বললাম যে, ওরা আমার মুঠোর মধ্যে। আমি খবর নিয়ে জানতে পেরেছি যে, ওই জাহাজের ক্যাপ্টেন আর দু’জন নাবিক হচ্ছে আমেরিকার লোক। বাকিরা হয় জার্মান না হয় ফিন। আরও জানতে পেরেছি যে, ওই তিনজন লোক গত রাত্রে জাহাজে ছিল না। এ খবরটা আমি জাহাজে মালতোলা কুলিদের কাছে পেয়েছি। লোনস্টার সাভানায় পৌঁছোবার আগেই ডাকবাহী স্টিমার আমার ওই চিঠি সাভানায় পৌঁছে দেবে। আর ইতিমধ্যে সাভানার পুলিশের কাছে লন্ডন পুলিশ টেলিগ্রাম করে জানিয়ে দেবে যে, ওই তিনজনকে খুনের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে এবং তাদের যেন ফেরত পাঠানো হয়।
মানুষ যত হিসেবনিকেশ করেই কোনও পরিকল্পনা করুক না কেন, অনেক সময় সব হিসেব বানচাল হয়ে যায়। আর এই রকম এক অভাবনীয় কারণে জন ওপ্নশের হত্যাকারীদের হাতে তাদের নামে পাঠানো কমলালেবুর বীজসমেত খাম পোঁছোয়নি। তাতে তাদের ক্ষতি তো হয়নি, বরং লাভই হয়েছে বলা যায়। তাদের পেছনে যে তাদের চেয়ে ঢের বেশি নাছোড়বান্দা এবং ঢের বেশি বুদ্ধিমান এমন একজন লোক ধাওয়া করেছে, যে তাদের অপরাধের শাস্তি না দিয়ে ছাড়বে না, এই দুশ্চিন্তার হাত থেকে তারা বেঁচে গেছে।
বহুদিন অপেক্ষা করেও আমরা লোনস্টারের কোনও খবর পাইনি। সে বছর অবশ্য অন্যান্য বছরের তুলনায় সামুদ্রিক তুফান খুব বেশি হচ্ছিল। বেশ কিছু কাল পরে আটলান্টিক মহাসাগরে একটা কাঠ ভাসতে দেখা যায়। কাঠটার গায়ে ‘এল এস’ এই অক্ষর দুটো খোদাই করা ছিল। এর পরে লোনস্টারের কোনও খবর পাওয়া যায়নি।
