কাঙ্গপোকপি (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

ঋজুদা নেই?

গদাধরদা দরজা খুলতেই আমি জিজ্ঞেস করলাম।

তা তিনি নেই তো কী, আমি তো আচি। ভিতরে এইস্যে বইস্যো দিকি। তা এতদিন কোতায় পাইলে গেচিলে তুমি, রুদ্দ বাবু?

পাইলে কেন যাব? ময়না মাসি তো এখন মাইসোরে থাকে। তিতিমিতির জঙ্গলে ঘুরে এলাম এবারের ছুটিতে। কেন? ঋজুদা তোমাকে বলেনি?

হ্যাঁ, আমি তো তেনার ইয়ার কিনা! দিনের মধ্যে কতো কন সাড়ে তিন খানা। মানে, বাক্যি। আমিও কি মনিষ্যি? এই তোমরা এলেই দেকি তেনার মুকে খই ফোটে! বিশেষ করে, ভটকাই বাবু। ইসস, কী সাহস! কী সাহস!

ওর কথা ছাড়ো।

ঋজুদাকে জন্মদিনে প্রণাম করতে এসেও সেই মীরজাফরের প্রশংসা শোনার একটুও ইচ্ছে আমার ছিল না।

কী খাবে বলো?

গদাধরদা বলল!

ঋজুদা গেছে কোথায়?

তা তো বলতে পারবনি। তবে একজন মাদ্রাজি ব্রাহ্মণ ফোন কইরেছিলেন, তাই তিনি গেছেন তার সইঙ্গে দেকা কইরতে।

মাদ্রাজি ব্রাহ্মণ তা তুমি জানলে কী করে?

আচ্ছা, আমি কি আর মাদ্রাজি জানি? দাদাবাবুই ফোন নামিয়ে রেখে বললেন যে, কাল রাতে একজন মাদ্রাজি ব্রাহ্মণ বাড়িতে খাবেন। পুজো-আচ্চা করে চান-টান সেরে যেন ভাল কইরে রান্না করি।

শোন, মাদ্রাজি বলে কোনও ভাষা নেই। ম্যাড্রাসের মানুষেরা যে ভাষাতে কথা বলে তার নাম, তামিল।

তা এখন বলো দেকি, তাকে খাওয়াবেটা কী?

তা, কীসের মাংস ভালবাসেন তা তো জানি না। কালই সকালে দাদাবাবুকে জিজ্ঞেস করে নে, তাপ্পরই ঠিক হবে।

মাদ্রাজি ব্রাহ্মণ মাংস খান না কোনওরকমই। তুমি বরং ধোঁকার ডালনা, ছানার ডালনা, পটল-পোস্ত, কাঁচা কলাইয়ের ডাল, বেগুন-বাসন্তী, কুমড়োর ফুলভাজা, কচি ঝিঙের টক এই সবই কোরো। খেয়ে তার মাথা ঘুরে যাবে। তুমিই তো ঋজুদার মা এবং বউ। দেখো, ঋজুদার ইজ্জৎ রেখো। আজকাল তোমার রান্না থার্ডক্লাস হয়ে যাচ্ছে।

গদাধরা চটে উঠে বলল, কী করে জাইনলে?

আবার কী করে। বহুদিন তো খাওয়াও না। আসলে কেমন যে রাঁধতে তাই তো ভুলে গেছি!

অ! তাইলে তুমিও কাল রেতে চইলে এসো।

ঋজুদা নেমন্তন্ন না করলেও আসাটা কি ঠিক হবে?

গদাধরদা হেসে ফেলল।

বলল, ঢং তো দেকি শিকেচো অনেকই। দাদাবাবুর অপেক্কাতেইতো রইয়েচো। যেদিন আস সেদিনই তো ফ্রিজে যা কিছু থাকে সবই সাবড়ে দিয়ে যাও। পাইরলে আমাকে সুদু খেইয়ে ফেল, তার…

আমি হেসে ফেললাম। বাণ লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়নি জেনে খুশি হলাম।

বললাম, তা হলে উঠি। ওহহ, দেখেছ, তোমাকেই প্রণাম করতে ভুলে গেছি। বলেই, গদাধরদাকে নিচু হয়ে প্রণাম করতে গেলাম।

আহা করো কী! কর কী! দাঁড়াও, ব্যাপারটা কী? দাঁড়াও, পাটা ধুয়ে আসি।

আহা। তুমি হলে গিয়ে গুরুর গুরু। তা ছাড়া তুমি পা-ই যদি ধোবে তবে আর পদধূলি পাব কী করে?

বলেই, প্রণাম করলাম।

দেকো তো! দেকো তো! ছেলেটা কতা শোনেনা মোট্টে। বলেই বলল, চুপটি কইরে বস। আমি ক্ষীরের তক্তি, চন্দ্রপুলি আর কুচো নিমকি নে আসতেচি।

কালোজিরে আর শুকনো লঙ্কার গুঁড়ো দিয়েছ তো নিমকিতে ভাল করে? ময়ান দিয়েছ?

হ্যাঁরে বাবা, হ্যাঁ। তিনকাল গে এককালে ঠেইকল আর উনি এইচেন আমাকে রান্না শেকাতে!

গদাধর ভিতরে যেতে না যেতেই ঋজুদার ড্রয়িংরুমের ডানদিকের জানালার দিকের কোণে যে গোলাকৃতি একটি ঝকঝকে বার্নিশ করা টেবিল আছে; সাদা ইটালিয়ান মাৰ্বল ট-এর; সেই টেবিলের উপরে উজ্জ্বল লালরঙের গোলাকৃতি একটি জিনিস চোখে পড়ল। অমন সুন্দর উজ্জ্বল লালরং আমি কখনওই দেখিনি। জিনিসটার উপরে সূক্ষ্ম রুপোর জালের ওড়িশি কাজ করা একটি ঢাকনি। সেটিও গোলাকৃতি। উঠে গিয়ে ভাল করে পর্যবেক্ষণ করব জিনিসটি, ঠিক এমনই সময়ে কলিংবেলটা বাজল। গদাধরদা ভেতরে থাকায় আমিই গিয়ে দরজাটা খুললাম। আর খুলেই দেখি, ভটকাই। এবং তার পিছনে ঋজুদা।

কী রে? কতক্ষণ? তা আদর আপ্যায়ন করেছে গদাধর ঠিকমতো?

হচ্ছে, হচ্ছে। আমি বললাম।

বিরক্তি গোপন করে।

ভটকাই তা হলে ঋজুদার এত কাছের মানুষ হয়ে গেছে যে, আমি জানি না আর ঋজুদা ভটকাইকে নিয়ে…। ওই মাদ্রাজি ব্রাহ্মণের সঙ্গে নতুন কোনও রহস্য বা অ্যাডভেঞ্চারের গন্ধ যে মাখামাখি হয়ে আছে সে বিষয়ে কোনও সন্দেহই রইল না আমার। এবং ওই রহস্যময় সুন্দর লাল গোলাকৃতি জিনিসটির সঙ্গে ওই মাদ্রাজি ব্রাহ্মণের নিশ্চয়ই কোনও যোগাযোগও আছে।

মুখ গম্ভীর দেখেই ঋজুদা মন পড়ে নিয়ে বলল, তুই তো কলকাতায় ছিলি না। এলি কবে?

আজই সকালে।

তাই বল। তুই নেই জানি, তাই ভটকাইকে আর তিতিরকে আসতে বলেছিলাম। আমি অন্য জায়গাতে গেছিলাম। ভটকাই-এর সঙ্গে আমার একসঙ্গে ঢোকাটা নেহাতই কাকতালীয়।

আমি আশ্বস্ত হয়ে বললাম, তাই বলো! ঘরে ঢুকেই বুঝেছি যে, ওই নবাগন্তুক মাদ্রাজি ব্রাহ্মণ আর ওই লাল বলের সঙ্গে নতুন কোনও রহস্য বা অ্যাডভেঞ্চার দানা বাঁধছে। আর তিতিরদের ফোন খারাপ।

লাল বল?

ঋজুদা অবাক হয়ে শুধোল।

হ্যাঁ।

আমি এমফ্যাটিক্যালি বললাম, লাল বল।

আমিতো জানি না। কোথায়?

ওই দ্যাখো।

ঋজুদা নিজের টিল্টিং-চেয়ারটাতে বসতে যাচ্ছিল কিন্তু বলটা দেখেই, না-বসে সেদিকে এগিয়ে গেল। ইতিমধ্যে গদাধরদাও আমার জন্যে ট্রেতে সাজিয়ে খাবার নিয়ে ঘরে ঢুকল।

তাকে দেখতে পেয়েই ঋজুদা জিজ্ঞেস করল, এটা কী জিনিস, গদাধর? কে দিল এটা? তোমাকে আর কতদিন বলব যে, কখনও অচেনা মানুষদের কাছ থেকে কোনও জিনিস নেবে না, রাখবেও না বাড়িতে। এটা যে একটা টাইম-বম্ব নয়, তাই বা এখুনি জানা যাবে কী করে?

আমি চণ্ডীগড়ে ছিলুম তো গতবছর পুজোর মধ্যে। ঠিক এমনি একটি টাইমবম্ব দিয়েই টেররিস্টরা একটি পুরো বাড়ি উড়িয়ে দিয়েছিল। আমারই চোখের সামনে। হাউ ডেঞ্জারাস! ব্যাপারটা ইনভেস্টিগেট করতে হচ্ছে।

ভটকাই অত্যন্ত উত্তেজিত গলাতে বলল।

গদাধরদা কথার মধ্যে কথা বলে উঠল, যা কখনওই করে না সে। বলল, এটা তো এই ভটকাই বাবুই কিছুক্ষণ আগে দে গেল। বইলে গেল, রেখে দাও গদাধরদা, আমি এই একুনি আসতিচি…

ঋজুদা চাপা বিরক্তির সঙ্গে বলল, ভটকাই? কী ওটা?

ভটকাই একটুও না-ঘাবড়ে বলল, পৃথিবীর চৌত্রিশতম বিস্ময়।

ব্যাপারটা কী?

ঋজুদা আবারও শুধোল। অসীম কৌতূহলের এবং বিরক্তির সঙ্গে।

এর পেছনে ভটকাই-এর কোনও ষড়যন্ত্র আছে এবং সেটা আমারই বিরুদ্ধে যে, এমন একটা সন্দেহও আমার মনে হঠাৎই উঁকি দিয়ে গেল। কিন্তু কোনও কথা না বলে আমি মাথা নিচু করে মনোযোগ দিয়ে ক্ষীরের পুলি খেতে লাগলাম।

ঋজুদা উঠে গেল জিনিসটার কাছে। রূপোর জালের ঢাকনাটা খুলল। খুলেই, হো হো করে হেসে উঠল। হাসতেই থাকল। এমন হাসি ঋজুদাকে বহুদিন হাসতে দেখিনি। ঋজুদার হাসি শুনে আমি খাওয়া থামিয়ে উঠে দৌড়ে গেলাম সেই জিনিসটার কাছে। দেখি, ওই বস্তুটির ওপরে ছোট্ট একটি লাল কাগজের টুকরো আঠা দিয়ে সাঁটা আছে। তার ওপর লাল কালিতে লেখা, মিস্টার রুদ্র রায়। লাল কাগজ এবং লাল কালি বলেই দূর থেকে ঠাহর হয়নি।

ঋজুদা তখনও হাসছিল। কিন্তু আমি কিছুই বুঝলাম না।

হাসি থামতে ঋজুদা বলল, ভটকাই, তুই বড় কৃতঘ্ন। এই রুদ্রই তোর জন্য অনেক ওকালতি করেছিল আমার কাছে। রুদ্রর জন্যই তুই ‘নিনিকুমারীর বাঘ’ মারার অ্যাডভেঞ্চারে আমাদের সঙ্গী হয়েছিলি, আর ‘সুফকর’-এও গেছিলি আমাদের সঙ্গে। সেই রুদ্রর সঙ্গে তোর এমন ব্যবহার করাটা মোটেই ভাল হচ্ছে না। তোর মতো কৃতঘ্ন বাঙালিদের জন্যেই বিদ্যাসাগর মশাইয়ের মতো মানুষকেও সাঁওতালদের সঙ্গে কাটাতে হয়েছিল, শেষ-জীবনটা।

ভটকাই তার উত্তরে হঠাৎ একটি গানের কলি আমারই দিকে চেয়ে, ডানহাতের তিন আঙুল নেড়ে নেড়ে গেয়ে উঠল, আদর যতন করিতে যেমন সে বাঁধনে যেন ছিড়োনা। আমি জগতের কাছে ঘৃণ্য হয়েছি, তুমি যেন ঘৃণা কোরো না।

এটা আবার কী গান?

ঋজুদা হেসে ফেলে বলল।

আঙুরবালা দাসীর গান। আমার ঠাকুমার মাথাতে যন্ত্রণা হলেই পুরনো ঘি মালিশ করতেন মাথায়, ব্যাব্যাগো! কী দুজ্ঞন্দ! আর তখন কলের গানে ওই গানটি শুনতেন।

আমি ওকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, ওই বস্তুটি কী?

ভটকাই বলল, ওটি হচ্ছেন গিয়ে তুমিই! বুয়েচ। ওটা একটি ফল। ওর নাম মাকাল ফল। অত সুন্দর কিছু দেখেছ কি আগে? আশ্চর্য সুন্দর, কিন্তু কোনও কাজেই লাগে না কারও। না খাওয়া যায়, না ফুটবল খেলা যায়, না তরকারি হয়, না টক হয়। কথায়ই বলে না, জামাই একটি মাকাল ফল! এই ফলেরই আরেক নাম, রুদ্র রায়।

ঋজুদা বলল, রাগ করছিস কেন, রুদ্র? আমরা সকলেই জানি, তুই নিজেও জানিস তুই কী? কিন্তু তুই ভটকাই-এর সেন্স অব হিউমারটা অ্যাপ্রিসিয়েট কর।

আমি বললাম, বাট হোয়াই অলওয়েজ অ্যাট মাই কস্ট?

ভটকাই বলল, বিকজ মাকাল ফল ইজ কস্টলি, অলমোস্ট অ্যাজ কস্টলি অ্যাজ য়ু আর।

পেলি কোথায় এটাকে?

এবারে ঋজুদা শুধোল।

কোথায় আবার? আমার রুটস যেখানে, সেখান থেকেই। সেই কেষ্টলগর সিটিতে। চুর্ণী নদীর পারের এক বড়লোকের ভেঙে পড়া বাগানবাড়ির লাগোয়া অবহেলিত নির্জনে একলাই বাগান আলো করে শোভা পাচ্ছিল। সংগ্রহ করেছি অনেকই দিন। মনিমাসিমার ডিপ ফ্রিজে রাখা ছিল। যাতে চেকনাই না নষ্ট হয়।

আশ্চর্য! মাকাল ফল, কিন্তু আমিও আগে দেখিনি কখনও। এত বনে-জঙ্গলে ঘুরেছি। ঋজুদা বলল।

তুমি চিনবে কী করে? মাকালেই মাকাল চেনে!

ভটকাই ফুট কাটল।

আমার খাওয়া শেষ হলে বললাম, এই মাদ্রাজি ব্রাহ্মণটি কে? একটি রহস্য-রহস্য গন্ধ পাচ্ছি যেন।

ঋজুদা বলল, অনুমান মিথ্যে নয়, তবে এবারে যদি যেতে রাজি হই তবে মিশনটি এতই বিপজ্জনক যে, তোমাদের কাউকেই নেব কি না আদৌ, তা ভেবে দেখতে হবে।

ভটকাই বলল, রামকৃষ্ণ মিশন না চ্যারিটি মিশন তা আমি জানি না, কিন্তু আমাদের না নিলে আমরা তোমার দরজার সামনে অনশন করব বলে দিচ্ছি। প্রথমে দাঁড়ানো-অনশন, তারপর বসা-অনশন। না হলে শোওয়া-অনশন। মিশনটা কী? আর ওই মাদ্রাজি ব্রাহ্মণটিই বা কে?

ঋজুদা বলল, আমার আজকে এক্ষুনি একবার বেরুতে হবে। তোরা কাল সন্ধে সাতটার মধ্যে চলে আয়। কেদাণ্ডারামাইয়া মশাই আসবেন সাড়ে সাতটাতে। আলিপুরে ওঁর এক আত্মীয়ের বাড়িতে উঠেছেন।

উনি কে?

উনি কর্ণাটকের ইনস্পেক্টর জেনারেল অফ পুলিশ।

তোমার সঙ্গে কী?

কিছু নয়, কিছু হতে পারে। ওরই বড় সম্বন্ধী হচ্ছেন ভেঙ্কটরামাইয়া মশায়। নাম শুনিসনি? ভারত বিখ্যাত ভীনাবাদক। উনি আমার বহু দিনের বন্ধু। গতমাসে রবীন্দ্র সরোবরের কাছের থিয়াগারাজা হলে রসিকারঞ্জনা সভার একটি অনুষ্ঠানে উনি বাজালেন। সেখানে গেছিলাম ওঁর বাজনা শুনতে। ওঁরই নিমন্ত্রণে। বাজনা শেষ হলে, যখন ব্যাকস্টেজে ওঁকে কনগ্রাচুলেট করতে গেছি, তখনই উনি বললেন ভীরাপ্পান-এর দৌরাত্ম্যের কথা এবং ওর ভগ্নীপতি কেদারামাইয়া মশায়কে উনি ওঁর সমস্যার কথা শুনে আমার কথা বলেছেন। এখন আমি যদি রাজি থাকি, তো আমার সঙ্গে কথা বলার জন্যে তিনি ব্যাঙ্গালোর থেকে কলকাতা আসবেন।

ভেঙ্কটরামাইয়া মশায় বড় গুণী মানুষ, তা ছাড়া কেসটা খুবই বিপজ্জনক হলেও খুবই ইনটারেস্টিংও। যাই হোক, এখন আমার তাড়া আছে। তোরা ইচ্ছে করলে বসতে পারিস। বাঘ সংক্রান্ত ভিডিও ফিল্মগুলো এতদিনে ফেরত পেলাম, সনৎদার কাছ থেকে। দেখবি তো, বসে দেখতে পারিস। গদাধরতো আছেই। আর বাড়িটা তো তোদেরই! বুড়ো বয়সে কবে যে তোরা আমাকেই বের করে দিবি বাড়ি থেকে, তোরাই জানিস।

আমি বললাম, কোথায় যাচ্ছ, দাঁড়াও! প্রণাম করতেই তো আসা, প্রণামটা অন্তত করতে দাও। আজ না তোমার জন্মদিন।

ভটকাইও বলল, ভুলেই মেরে দিয়েছিলুম। মাকাল ফল নিয়ে এতই ব্যস্ত ছিলুম।

বাস বাস। আর নয়। অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ।

ঋজুদা আমাদের মাথায় হাত রেখে বেরিয়ে পড়ল।

বলল, গদাধর, ওদের দেখো!

আমি বললাম, আশ্চর্য! ঋজুদার জন্মদিনে তিতির…

তিনি তো বাবা মায়ের সঙ্গে এবার গোয়াতে গেছেন। সেখান থেকে বম্বে ফিরে মনে হয়, মহাবালেশ্বর যাবেন। সেখান থেকে বেস ক্যাম্প করে ছত্রপতি শিবাজির দুর্গগুলো দেখবেন। এক এক করে। মায় সামুদ্রিক দুর্গ জিঞ্জিরা পর্যন্ত।

ঋজুদা বেরিয়ে যাবার পরে ভটকাই বলল, ঈশ্বর কিছু লোককে কপাল দিয়ে পাঠান। সত্যি! ভীষণ একচোখো ভদ্রলোক। যাই বলিস, আর তাই বলিস, রুদ্র। নইলে আমরা ঋজুদার ঘাড়ে চেপে ছাড়া কোথাওই যেতে পারি না আর তিতির কেমন…বলেই চোখ, ঠোঁট ও জিভ এই তিন প্রত্যঙ্গের সাহায্যে টাক করে একটা শব্দ করল, যা শুধু ভটকাইই করতে পারে। মেয়েরা তেঁতুল বা চালতা খেয়ে এমন শব্দ করে বটে; কিন্তু, কোনও ছেলেকে, ভটকাই ছাড়া এমন শব্দ করতে শুনিনি।

.

সকালে ঋজুদা প্রত্যেককেই ফোন করেছিল। বিকেল চারটেতে ঋজুদার বিশপ লেফ্রয় রোডের ফ্ল্যাটে ডেকেছে। কোল্লেগাল-এ যাবে, এমন মর্মে তামিলনাড়ু আর কর্ণাটক সরকারের যৌথ আবেদন মঞ্জুর করে ঋজুদা তার বন্ধু অনীকদার অফিস থেকে ফ্যাক্স পাঠিয়ে দিয়েছে। এই দুই সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের সেক্রেটারিরা নাকি ঋজুদার অ্যাকসেপটেন্স পেয়ে ফোন করেছিলেন ঋজুদাকে।

বিশপ লেফ্রয় রোডে যখন গিয়ে পৌঁছলাম চারটে বাজতে দুমিনিটে, দেখি তিতির ইতিমধ্যেই পৌঁছে গেছে এবং বসে আছে ঋজুদার সঙ্গে। বসবার ঘরে। গ্র্যান্ডফাদার ক্লকটাতে যখন গাং গাং করে চারটে বাজল, ঠিক তখনই ভটকাই ঢুকল। হাতে একটা প্রায় তিন কেজি ইলিশ মাছ নিয়ে। ঘড়ির দিকে বাঁহাতের বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বলল, দ্যাখ, দেখে শেখ। একেই বলে, অন টাইম।

ঋজুদা পাইপটা মুখ থেকে নামিয়ে বলল, ব্যাপারটা কী! মোহনবাগানের সাপোর্টারের হাতে ইলিশ। অবাক করলি তুই।

বড়মামা দিলেন। জুট মিলের ম্যানেজার তো! বাড়ির জন্যও এনেছেন। আর তোমার নাম করেও একটা। ঋজুদার সঙ্গে সুফকর-এ পড়ে খুব ভাল লেগেছে কি না। ঋজু বোসের ফ্যান হয়ে গেছে একেবারে। তাই তোমার জন্য এই নৈবেদ্য। কোথায় গেলে গদাধরদা? এই নাও গো। দেকো, কী এইনিচি তোমার জইন্যে।

বলেই, গলা তুলে চেঁচাল।

এই এনু বলে, ভটকে দাদা।

ভেতর থেকে গদাধরদা সাড়া দিল।

শুধু ঋজুদাকেই নয়, গদাধরদাকেও ভটকাই কাবু করেছে ভালমতো। কিছু আছে ছেলেটার মধ্যে। তুকতাকও জানতে পারে!

গদাধরদা আসতেই ভটকাই বলল, তোমার রুইদ্দবাবু বলার আগে আমিই বলতিচি, রাতে আমরা খেইয়ে যাব কিন্তুক। আকাশে মেঘ কইরেচে দেকেচো তো! ভাজা মুগডালের ভুনি খিচুরি, মধ্যে চিনাবাদাম, কিসমিস দিয়ে; আর ইলিশমাছ ভাজা। কড়কড়ে করে। শুকনো লঙ্কা আর পিয়াজি ভাইজতি ভুলে যেওনি যেন আবার।

তুমি যে এক্কেবারে রুইদ্দবাবু হইয়েচো গো ভটকেদাদা।

তা না হয়ে কি পারি, গদাধরদা? আমি যে তেনারই চ্যালা। আর ঋজুদা হলেন গে আমাদের সক্কলের মহাগুরু। বুইজলে কিনা!

ঋজুদা হেসে উঠল ভটকাই-এর কথার ভঙ্গিতে।

সত্যি! নর্থ ক্যালকাটার এই ছেলেটা ঋজুদার চরিত্রটাই পাল্টে দিচ্ছে আস্তে আস্তে। ভটকাই-এর প্রতি কথাতেই এত হাসির কী আছে ঋজুদার, তা কে জানে!

তোরা কে কোন কাগজ পড়িস রে? বাংলা?

বর্তমান। আমি বললাম।

তিতির বলল, আমি বাংলা কাগজ পড়িই না। শুধুই, দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া পড়ি।

অন্যায় করিস। ঋজুদা বলল।

একাধিক না রাখলেও অন্তত একটা বাংলা কাগজ রাখা উচিত প্রত্যেক শিক্ষিত বাঙালির বাড়িতেই। স্থানীয় একটা ইংরিজি কাগজও।

ভটকাই বলল, আমাদের বাড়িতে দ্য স্টেটসম্যান আর আনন্দবাজার রাখা হয়। আমার মেজদাদুর তো বাথরুমই হত না প্রথম থেকে শেষ অবধি আনন্দবাজার না পড়লে।

ভটকাই বলল।

তিতির হেসে উঠল, ওর কথা শুনে। বলল, মিল্ক অফ ম্যাগনেসিয়ার কমপিটিটর না কি? আনন্দবাজার?

দেশে-বিদেশেতে পড়েছি যে, সৈয়দ মুজতবা আলি সাহেবের বাবা ‘দ্য স্টেটসম্যান’ থেকে ‘প্রিন্টেড অ্যান্ড পাবলিশড বাই অবধি না পড়লে তাঁর দিনটাই নষ্ট হয়ে যেত। বিশেষ বিশেষ কাগজ সম্বন্ধে অনেকের এমন দুর্বলতা থাকেই। কথাটা ঠাট্টা নয়।

ঋজুদা বলল।

যে কারণে তুমি কাগজের খোঁজ করছিলে ঋজুদা, গতকাল, মানে বনধ’-এর দিনের আনন্দবাজারের কপি নিয়ে এসেছি। এই কারণেই তো জিজ্ঞেস করছিলে?

হ্যাঁ, ভেরি স্মার্ট অফ য়ু। কিন্তু কেটে আনতে গেলি কেন? আমিও তো আনন্দবাজারই রাখি।

তবুও নিয়ে এলুম। সাবধানের মার নেই। ভটকাই বলল।

তা এনেছিস যখন, তুই-ই ওদের পড়ে শুনিয়ে দে খবরটি। এটিই হচ্ছে লেটেস্ট খবর ভীরাপ্পানের ওপরে। গতকাল ‘বনধ’ না হলে পেয়ে যেতাম ডিটেইলড খবর, ফ্যাক্স-এ। মাইসোর ও কোয়েম্বাটোর থেকে।

বলেই বলল, ও ভাল কথা, মিস্টার এন. কৃষ্ণমূর্তি ফোন করেছিলেন আজ সকালেই। মানে পশ্চিমবঙ্গের চিফ-সেক্রেটারি। চমৎকার বাংলা বলেন ভদ্রলোক। খুব ভাল লাগল। বললেন, ওঁকেও নাকি কর্ণাটক আর তামিলনাড়ুর চিফ সেক্রেটারিরা ইনফর্ম করে রেখেছেন।

তারপর গম্ভীর মুখে ঋজুদা বলল, আমার কিন্তু বেশ চিন্তা হচ্ছে। ভাবছি এবার তোদের কারোকেই নিয়ে যাব না সঙ্গে। ইট উইল বি ভেরি ভেরি রিস্কি। এতখানি ঝুঁকি নেওয়া ঠিক হবে না। পুলিশ, বি. এস. এফ. কম্যান্ডোদের ব্যাটেলিয়ানের পর ব্যাটেলিয়ান, দুটি রাজ্যের সব শক্তিকেই যে বিফল করে দিচ্ছে, তার মুখে তোদের এগিয়ে দেওয়া যায় না। দুপক্ষেরই কত লোক মারা গেছে, তা জানিস?

একথা শুনেই ভটকাই সটান ঋজুদার পায়ের সামনে সাষ্টাঙ্গে শুয়ে পড়ল দুহাত জড়ো করে, ভজ গৌরাঙ্গ, কহ গৌরাঙ্গ স্টাইলে।

ঋজুদা বিরক্ত হল। হঠাৎই ভীষণ চটে উঠে বলল, সবসময় সবকিছু ভাল লাগে না ভটকাই। খুব সীরিয়াস একটা ব্যাপার নিয়ে আমরা আলোচনা করছি। তা ছাড়া এবারে যদি কারোকে নিতেও হয় সঙ্গে, তোকে নেওয়া আউট অফ দ্য কোয়েশ্চেন। তুই এ পর্যন্ত শুধু ‘নিনিকুমারীর বাঘ’ মারতেই গেছিস আমাদের সঙ্গে। ওইটিই তোর মেইডেন ভেঞ্চার। ভীরাপ্পানের সামনে যেতে হলে যেমন অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণের প্রয়োজন তা হয়তো রুদ্র আর তিতিরের কিছুটা আছে, কারণ ওরা আফ্রিকাতে আমার সঙ্গে গেছিল। রুদ্র তো দুবার গেছিল, এবং প্রথমবার তো বলতে গেলে ওই আমাকে মৃত্যুর হাত থেকে ফিরিয়ে এনেছিল। সঙ্ঘবদ্ধ ও শক্তিশালী চোরাশিকারিদের ওরা মোকাবিলা করেছে আফ্রিকাতে। আজকের এই মিটিংটা শিক্ষার মধ্যে পড়ে তাই আজকে ডেকেছি তোকে। তবে, তোকে তো নয়ই, তোদের কাউকেই এবার সঙ্গে নাও নিতে পারি। এ ভীষণই বিপজ্জনক ব্যাপার। এবার আমি নিজেই বেঁচে ফিরে আসব কিনা তারই কোনও স্থিরতা নেই। অথচ, স্বদেশের ব্যাপার। বিদেশের ডাকে তাদের সমস্যার সমাধান করে এসে নিজের দেশের আকুল আহ্বান পাবার পরও যদি না যাই, তাহলে সবাই আমাকে ভীতু ভাববে। বলবে, ঋজু বোস একটা হোক্স। স্পেন্টফায়ার। কিন্তু একা যে ঝুঁকি নেওয়া যায়, তোমাদের সঙ্গে করে সে ঝুঁকি নেওয়া যায় না। তোমরা তিনজনেই ছেলেমানুষ। কত সুন্দর জীবন পড়ে আছে তোমাদের সামনে। প্রত্যেকেরই সামনে। তা ছাড়া একটাই জীবন! যে জীবন নিয়ে তোমাদের প্রত্যেকেরই অনেক কিছু করার আছে। বাহাদুরি দেখাতে গিয়ে তোমরা ভীরাপ্পানের এ. কে. ফর্টিসেভেন রাইফেলের গুলিতে ছিন্নভিন্ন হবে, তা আমি হতে দিতে পারি না। তা ছাড়া, তোমাদের মা বাবার কাছেই বা আমি মুখ দেখাব কেমন করে? যদি নিজে বেঁচেও ফিরি? না, না। তা হয় না।

ঘরের মধ্যে কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধতা নেমে এল। ঋজুদার এই স্নাবিংটার খুবই দরকার ছিল ভটকাই-এর। কিছুদিন ও এখন ঠাণ্ডা থাকবে। বড্ডই বেড়ে গেছিল। তবে, আমারও মন খারাপ হয়ে গেল। সঙ্গেই যখন নিয়ে যাবে না, তখন এই মিটিংকনফারেন্সের কী দরকার ছিল? তিতিরের মুখও ব্যাজার হয়েছে দেখলাম।

ঋজুদাই নীরবতা ভেঙে একটু পরে বলল, কী রে! পড় ভটকাই। যে কাটিংটা এনেছিস, আনন্দবাজারের।

প্রচণ্ড ঝড়ে ডানা-ভাঙা পাখির মতো অবস্থাটা সামলে উঠতে সময় নিল একটু ভটকাই। কিন্তু, উঠল সামলে। উঠে, মানুষ যেমন করে শোকসভাতে শোকপ্রস্তাব পাঠ করে, তেমন করে, আনন্দবাজারের কাটিংটা সামনে ধরে গম্ভীর গলাতে আস্তে আস্তে পড়তে লাগল:

আনন্দবাজার পত্রিকা।
৭ই জুন, ১৯৯৩

ভীরাপ্পানের আরও ছয় সাগরেদ ধৃত
ব্যাঙ্গালোর, ৬ জুন–চন্দনকাঠের কুখ্যাত চোরাচালানকারী ভীরাপ্পানের আরও ৬ সাগরেদকে গতকাল গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এই ছ’জনের মধ্যে ভীরাপ্পানের এক ঘনিষ্ঠ সহযোগী রয়েছে। এই লোকটি ভীরাপ্পানের দলকে অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ করত। মালে মহাদেশ্বর পাহাড় অঞ্চলের একটি মন্দিরের এক পুরোহিতকেও আটক করেছে পুলিশ। পুলিশের সন্দেহ, এই পুরোহিতের সঙ্গে ভীরাপ্পানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এবং মাঝে মধ্যেই তাদের দেখা হত। কাল এই ছ’জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ বড় রকম সাফল্য পেয়েছে।

মহীশূর জেলার কোল্লেগাল তালুক থেকে ৬ জনকে গ্রেফতার করার ফলে এ পর্যন্ত ভীরাপ্পানের মোট ১৭ সাগরেদ ধরা পড়ল। গত সপ্তাহেই আটক করা হয়েছে ১১ জনকে। মূল্যবান চন্দনকাঠ চুরি কিংবা হাতির দাঁতের জন্য চোরাগোপ্তা হাতি শিকারের কাজে এরা নানাভাবে সাহায্য করত। যে পুরোহিতকে আজ পুলিশ গ্রেফতার করেছে সে মালে মহাদেশ্বর পাহাড়ের কাছে টালাবেট্টার নবগ্রহ মন্দিরের। ওই মন্দিরের কাছেই ২৪ মে ভীরাপ্পানের দল পুলিশের টহলদার দলকে আক্রমণ করে ৬ জন পুলিশকর্মীকে খুন করে। ভীরাপ্পানের আটক সাগরেদদের থানা হাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ চালাচ্ছে পুলিশ।

ইতিমধ্যে ৫০০ আধাফৌজ কালকেই মালে মহাদেশ্বর পাহাড়ে পৌঁছে গিয়েছেন। পথে তাঁদের বিপুল সংবর্ধনা জানান স্থানীয় মানুষ। সেখানে পৌঁছে সীমান্তরক্ষীবাহিনীর (বি. এস. এফ) কম্যান্ড টাস্ক ফোর্স অফিসারের সঙ্গে বসে ‘অপারেশনের কৌশল মোটামুটি ঠিক করে ফেলেছেন। তাঁদের লক্ষ্য, ভয়ঙ্কর চন্দন-দস্যু জঙ্গলের পোকা ভীরাপ্পানকে যেন তেন প্রকারেণ ধরা।

অপারেশনের সময় আধাফৌজ এবং টাস্কফোর্সের চলাচল অবাধ করতে সংলগ্ন গ্রামগুলোতে ২০ জুন পর্যন্ত ১৪৪ ধারা জারি করে গ্রামবাসীদের গতিবিধির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। মালে মহাদেশ্বর পাহাড় এবং তামিলনাড়ু সীমান্তের দিকে যাওয়ার সমস্ত বেসরকারি বাসও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

.

ভটকাই-এর পড়া শেষ হলে, তিতির বলল, এখন ভীরাপ্পান কোণঠাসা হয়ে পড়ছে আস্তে আস্তে। এর কিছুদিন আগেও তো ওর চ্যালা-চামুণ্ডা কিছু মারা পড়েছিল পুলিশের হাতে। হি ইজ লুজিং গ্রাউন্ড গ্র্যাজুয়ালি।

আমার সন্দেহ আছে।

ঋজুদা বলল।

যারা মারা গেছে, তারা যে ভীরাপ্পানেরই লোক, এর প্রমাণ কী? এমন এমন সিচ্যুয়েশনে দুপক্ষই ভুল করে, অনেক সময় ইচ্ছে করে প্রেসকে ভুল খবর দেয়। ভুল জেনেও, তা ঠিক বলে দাবি করে। হাওয়াটা কোনদিকে বইছে, তা এখানে বসে খবরের কাগজ পড়ে বোঝা সম্ভব নয়। স্পট-এ যাওয়া দরকার। আর্মচেয়ার কনসার্ভেসানের মতোই, আর্মচেয়ার–জার্নালিজমের মতোই, তা হবে থিওরিটিক্যালি এক্সারসাইজ। দুপক্ষরই প্রত্যেক দাবি ও পাল্টা দাবির সত্য খুব ভাল করে যাচাই করে দেখতে হবে, নিজেদের বুদ্ধি বিবেচনা দিয়ে।

তিতির বলল, মাঝে মাঝেই খবরের কাগজে পড়ি বটে, কিন্তু আসলে এই মানুষটা কে? কোথায় থাকে? কী করে? তামিলনাড়ু আর কর্ণাটক সরকারের যৌথ প্রচেষ্টাতেই তাকে ধরা বা মারা কেন যে সম্ভব হল না এতদিনেও, তা তো আমার বোধগম্য হয় না।

হয়তো তোর বুদ্ধির অকুলান বলেই।

ঋজুদা বলল।

আমাদের একটু বলো না ভীরাপ্পান সম্বন্ধে, ঋজুকাকা। তুমি যেমন আমাদের গার্জেন, আমরাও তোমার গার্জেন। সব শুনে-টুনেই ঠিক করব তোমাকে একা একা সেখানে যেতে দেওয়া আদৌ ঠিক হবে কি না!

ঋজুদা হেসে ফেলল। বলল, আচ্ছা কল করবার মতলবে আছিস তো তোরা। দ্য টেবিল ইজ টার্নড়, ইট অ্যাপিয়ার্স।

সে তুমি যাই বলো। আগে তো শুনি। তারপরই আমরা ডিসাইড করব। লোকটার পুরোনাম কী? বয়স কত?

বয়স? কত হবে? এখন হবে, এই চুয়াল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ মতো। পাঁচশো বুনো হাতি মেরেছে ওর দল, দাঁতের জন্য। রুআহা-র ভুষুণ্ডারাও লজ্জা পাবে ভীরাপ্পানের কাছে। আর কত কোটি টাকার চন্দনকাঠও যে পাচার করেছে তার সঠিক হিসেব কেউই জানে না। তবে মানুষটাকে ধরার ও মারার জন্য দুই রাজ্যের কম্যান্ডো ট্রেনিং-নেওয়া পুলিশ অফিসারেরা, বি. এস. এফ-এর জওয়ানরা, ন্যাশনাল সিকিউরিটি গার্ডস, এমনকী ইন্দো-টিবেটান বর্ডার ফোর্সের বাঘা বাঘা জওয়ানরা আর অফিসাররাও শুধু ঘোলই খাননি, অনেকেই প্রাণ দিয়েছেন তার হাতে। কিন্তু এত করেও ভীরাপ্পানকে ধরা যাচ্ছে না। কিছুদিন হল ভীরাপ্পানের যেখানে বিচরণভূমি, সেই অঞ্চলে, একশো চুয়াল্লিশ ধারা জারি করে, যাতায়াতের সব পথ রুদ্ধ করে, সমস্তরকম সরবরাহ বন্ধ করে, ওকে প্রাণে মারার উপক্রম করা হচ্ছে। তবুও ভীরাপ্পান ধরা পড়ছে তো নাই, মাঝে মধ্যেই নানাভাবে দুঃসাহসিক ফন্দি-ফিকির করে, হাজারের ওপর নানা ফৌজকে বুন্ধু বানাচ্ছে, তাদের অফিসারদের সুষ্ঠু মেরে দিচ্ছে।

এত সব ফৌজ মিলেও কেন ধরতে বা মারতে পারছে না ওকে, ঋজুদা?

কারণটা কী বা কী কী হতে পারে, তোরাই বল।

গদাধরকে ঢুকতে দেখেই থেমে গিয়ে তাকে বলল ঋজুদা, এতক্ষণে মনে পড়ল তোমার গদাধর? শুধু কি কথাতে পেট ভরে? এরা যে খিদেতে মরছে। ভটকাই-এর মুখের দিকেই একবারটি চেয়ে দেখো তুমি।

এট্টু দেরি হয়ে গেল দাদাবাবু। পেটিসগুলান ঠাণ্ডা মেরে গেচিল কি না! তাই এট্ট গরম কইরে নে এলাম।

পেটিস না, প্যাটিস গদাধরদা।

ওই হল। আর সঙ্গে পেটিটিরিও আচে। নাও। দাদা-দিদিরা সব ভাল কইরে খাও দিকিনি। আমি চা আইনতেচি বড় টি-পটে করি।

পেটিটিরিটা কী ব্যাপার?

তিতির অবাক হয়ে ঋজুদাকে শুধোল।

ঋজুদা হেসে বলল, পেস্ট্রি। ফ্লুরি’ থেকে প্যাটিস আর পেস্ট্রি আনছে গদাধর গত কুড়ি বছর হল, কিন্তু পেটিস আর পেটিটিরি’ যেই কে সেই রয়ে গেল। বদলাল না একটুও। গদাধর মানুষটা একেবারে ওরিজিনাল।

সামান্য একটু উন্নতি হয়েছে। আমি বললাম। আগে বলত, কেকুরি-পেটুরি–মানে, কেক ও প্যাস্ট্রি।

তিতির আর ভটকাই হেসে উঠল।

ঋজুদা পাইপটা ধরিয়ে বলল, নে নে। তোরা তুলে নে, কোয়ার্টার প্লেটে করে। ফর্ক নে, ন্যাপকিন নে। তারপর পাইপে একটা টান দিয়ে বলল, কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তর তো দিলি না।

ভটকাই একটা চকোলেট-কেকের পুরোটা একেবারেই মুখে পুরে দিয়েছিল। তাই সাঁতার না-জানা মানুষ যেমন জলে পড়ে খাবি খায়, তেমন করে খাবি খেতে খেতে কেকটাকে কজা করার চেষ্টা করতে করতেই বলল, আমি বলব?

বল।

আমার মনে হয়, এত পুলিশ-টুলিশের মধ্যে একজনও আসলে নিজে মরতে রাজি নয় বলেই মারতে বা ধরতে পারেনি ওরা ভীরাপ্পনকে, আজ অবধিও। আমায় নিয়ে চলো ঋজুদা, আমি ঠিক মেরে দেব। নিজে মরতে রাজি না থাকলে কি অমন দুর্ধর্ষ কাউকে মারা যায়? এত হাজার ফোর্স গেলে হবে কী? আমি বাজি ফেলতে পারি, এদের মধ্যে একজনও নিজে মরতে রাজি নয়। একজনও নয়। ডেডিকেশন চাই, জেদ চাই, করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে অ্যাটিচুড চাই।

আমি বা তুই মরতে রাজি থাকলে অথবা না-থাকলেও ভীরাপ্পান যে আমাদের ঠিকই মেরে দেবে, সে বিষয়ে ভীরাপ্পানের অথবা আমারও কোনওই সন্দেহ নেই। এমন কথা হচ্ছে, ভীরাপ্পন নিজে মরে কি না? তার মরার বিশেষ ইচ্ছে আছে বলে মনে হচ্ছে না। আর ওকে জীবিতাবস্থায় ধরার কোনও সম্ভাবনাই নেই। ধরা পড়বে পড়বে হলেও হয়তো সায়ানাইড খেয়ে আত্মহত্যা করবে।

তারপরই বলল, আরও কী কী কারণ হতে পারে, রুদ্র? তিতির? ভটকাই অ্যাটলিস্ট মেড আ পয়েন্ট। ভটকাই-এর উত্তরটা অন্তত একেবারে ফেলে দেবার মতো নয়। ‘ আমি বললাম, আমার মনে হয়, ভীরাপ্পান জঙ্গলের পোকা। তোমারই মতো ও বনজঙ্গলকে খুব ভাল করেই চেনে। বিশেষ করে, ওর নিজের এলাকার বনজঙ্গলকে। তাই গেরিলাযুদ্ধে ওকে কোনও ফোর্স, পুলিশের ব্যাটেলিয়ান, এমনকী কম্যান্ডোরাও কিছু করতে পারছে না। যে-মানুষ জঙ্গলকে জানে, ক্যামোফ্লেজিং জানে, যে তার নিজের এলাকার পাহাড়, নদী, নালা, পথ, সঁড়িপথ, উপত্যকা, অববাহিকা এবং মালভূমিকে নিজের হাতের রেখার মতোই, মায়ের মুখের মতোই চেনে; তার সঙ্গে টক্কর তারই মতো জবরদস্ত, দুঃসাহসী অন্য কোনও মানুষই একমাত্র দিতে পারে। এবং সহজেই অনুমেয় যে, তামিলনাড়ু ও কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রীরা সব ট্রাডিশন ভেঙে তোমাকে নিমন্ত্রণ করাতে পুলিশ, বি. এস. এফ এবং অন্যান্য নানা ক্র্যাক-ফোর্সের অফিসার ও জওয়ানরা বনবিভাগের হোমরা-চোমরারা অত্যন্তই অপমানিত হবেন। কিন্তু এসব ভাল করে জেনে ওঁরা তোমার শরণাপন্ন হয়েছেন। ব্যাপার অত্যন্তই গুরুতর। এই যুদ্ধটা, মনে হয়, কোনও আর্মির সঙ্গে আর্মির যুদ্ধ নয়, ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তিরই যুদ্ধ। আফ্রিকার চোরাশিকারি ভুষুণ্ডার কথা, অ্যালবিনোর রহস্যভেদের কথা, নিনিকুমারীর বাঘ এবং তোমার অন্যান্য সমস্ত অভিযানের কথা ভারতের এবং বিদেশের সমস্ত বড় কাগজে এবং টি. ভিতেও যেভাবে প্রচারিত হয়েছে তাতে আমাদের দেশের এবং হয়তো বিদেশেরও যে কোনও শিক্ষিত মানুষের কাছেই তুমি আর অপরিচিত নও। তাই বিপদে মধুসূদন তোমাকে ডেকে শেষ চেষ্টা করে দেখতে চান ওঁরা।

পরিচিতি-টিতির কথা জানি না। ওসব ফালতু ব্যাপার। নাম-যশ। আমি যে অতিমানবও নই তা আমার মতো ভাল আর কেউই জানে না। তবে তুই হয়তো ঠিকই বলেছিস। নীলগিরি হিল–এ মানে মাইসোর থেকে উটি, (যাকে এখন উধাগামঙ্গলম বলা হয়) আর উটি থেকে কোয়েম্বাটোরের মধ্যবর্তী জঙ্গলে ছেলেবেলাতে জ্যেঠুমণির সঙ্গে অনেকই শিকার করেছি। একটা বনপথ গভীর জঙ্গলের মধ্য দিয়ে কোয়েম্বাটোর থেকে মাইসোর চলে গেছে, ‘উটি’কে পাশ কাটিয়ে।

তারপর একটু চুপ করে থেকে বলল, বুঝলি, সেই জঙ্গলের সৌন্দর্য ও সুগন্ধ এখনও আমার চোখে আর নাকে লেগে আছে, সব জঙ্গলই সুগন্ধি, কিন্তু নীলগিরির নীলপাহাড়ের মাইলের পর মাইল চন্দনবনের যে কী স্নিগ্ধ সুগন্ধ; বিশেষ করে বৃষ্টি হলে, তার তুলনাই নেই।

বান্দিপুরটা ঠিক কোথায়? বান্দিপুর ন্যাশনাল পার্ক?

তিতির শুধোল।

মাইসোর থেকে উটিতে যাবার পথেই পড়ে। নীলগিরি পাহাড় শ্রেণী শুরু হবার আগে। বান্দিপুর; মুদুমালাই সব।

আর, পেরিয়ার ন্যাশনাল পার্ক?

ভটকাই শুধোল।

বান্দিপুর পড়ে কর্ণাটকে আর পেরিয়ার তামিলনাড়ুতে। অগণ্য হাতির আবাসস্থল এইসব অঞ্চল। আসলে ভীরাপ্পানের এলাকা হচ্ছে এইরকম। প্যাডটা দে তো তিতির, টেবিল থেকে। আর একটা কলম দে, তোদের একটা রাফ-স্কেচ করে দেখাচ্ছি।

তিতির প্যাডটা এগিয়ে দিল আর ড্রয়ার খুলে একটা ব্লা কলম এগিয়ে দিল। ঋজুদা নিঃশব্দে একটা ম্যাপ এঁকে দিল। নিঃশব্দে এজন্য বলছি, এইসব দুর্মূল্য জার্মান কলমে কোনওই শব্দ হয় না, লেখার সময়ে। আর কলমই হচ্ছে ঋজুদার সবচেয়ে প্রিয় জিনিস, একথা তার দেশ-বিদেশের অগণ্য বন্ধু-বান্ধব-অনুরাগীরা জানেন বলেই, সকলেই ঋজুদাকে কলমই উপহার দেন। আর ঋজুদার সবচেয়ে প্রিয় কলম হচ্ছে–ব্লা। উচ্চারণটা ওইরকম। লিখলে MONT BLANC, জার্মান ভাষায়।

-মঁ-ব্লা, না?

তিতির শুধোল।

হ্যাঁ।

মানে কী শব্দটার ঋজুদার? কোন দিশি কলম ওটা?

ভটকাই শুধোল।

সুইটজারল্যান্ডের আল্পস পর্বতমালার সর্বোচ্চ চূড়ার নাম MONT BLANC, তবে উচ্চারণটা ম-ব্লা।

একদিন ঋজুদাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, এত জাতীয়তাবাদী জাত জার্মানরা, অন্য দেশ সুইটজারল্যান্ডের চূড়োর নামে তাদের নিজেদের তৈরি ঝর্না কলমের নাম রাখতে গেল কেন?

ঋজুদা হেসে বলেছিল, ওরে বোকাইচন্দর। সুইজারল্যান্ড একটা আলাদা দেশ হতে পারে বটে, কিন্তু সুইস’দের আলাদা কোনও ভাষা নেই। ভাষা হিসেবে সুইজারল্যান্ডের আধখানিতে জার্মান চলে, অন্য আধখানিতে চলে ফরাসি। যদিও ওয়াটারটাইট কম্পার্টমেন্ট নেই কোনও। যে কোনও স্যুইসের সঙ্গে আলাপ হলে তুই জিজ্ঞেস করতে পারিস, আপনি কি স্যুইস-জার্মান? না সুইস-ফ্রেঞ্চ? সুইজারল্যান্ডে একটি গিরিবর্ত আছে, তার নাম পিও। শীতকালে সেখানে স্কিইং-এ উৎসাহীদের মেলা বসে যায়। সেই পিও পাস-এর একদিকে জার্মান ভাষাভাষীরা বাস করে আর অন্যদিকে ফরাসি। যদিও ধরাবাঁধা কোনও নিয়ম নেই।

আমার মন- মঁ-ব্লা কলমটা থেকে অনেক দূরে চলে গেছিল মুহূর্তের মধ্যে। ঋজুদার গলার স্বরে চমক ভাঙল। ঋজুদা বলল, এই দ্যাখ।

আমরা তিনজনে খেতে খেতেই হুমড়ি খেয়ে পড়লাম প্যাডটার ওপরে। ঋজুদা সেই ফাঁকে একটা চিকেন-প্যাটিস তুলে নিল। মিষ্টি তেমন পছন্দ করে না ঋজুদা, নোনতাই বেশি পছন্দ করে।

আমরা দেখলাম ম্যাপটাকে।

দেখছিস তো! এই হচ্ছে কর্ণাটক রাজ্য, আর এই হচ্ছে তার রাজধানী মাইসোর। এই দ্যাখ যেখানে কর্ণাটকের সীমানা এসে তামিলনাড়ুর সঙ্গে মিশেছে, তার কাছেই এই কোল্লেগাল। উটি বা উধাগামঙ্গলম, তামিলনাড়ুতে। কিন্তু ওখানে পৌঁছতে হলে তামিলনাড়ুর কোয়েম্বাটোর হয়েও যাওয়া যায়, সেখান থেকেই কাছে হয়, আবার মাইসোর হয়েও আসা যায়, বান্দিপুর ন্যাশনাল পার্ক হয়ে। বান্দিপুরের পরেই পাহাড় আরম্ভ হয়েছে। পাহাড়ের পর পাহাড়। নীল তাদের গায়ের রং, তাই তাদের নাম নীলগিরি। এই নীলগিরিতেই যত দৌরাত্ম ভীরাপ্পানের।

লোকটা এরকম হল কী করে? পাঁচশো হাতি মারা কি চাট্টিখানি কথা! আর মারলই বা কী করে? একা একা?

তিতির বলল।

একা মারেনিরে। আসলে ভীরাপ্পানের যখন ন’ বছর বয়স ছিল তখনই সে ওই অঞ্চলের কুখ্যাত চোরাশিকারির দল জেভিয়ার গুণ্ডাদের দলে নাম লেখায়।

মানুষটা তা হলে তো খুনি টাইপের বলতে হবে। ওই শিশুবয়স থেকেই ওইরকম ছিল।

নারে। যখন শিশু ছিল তখন ওও অন্য দশটা শিশুর মতোই ছিল। অতি গরিব মা-বাবার ঘরের বড় ছেলে। তার তিনটি বোন এবং দুটি ভাই। বাপে-খেদানো মায়ে-তাড়ানো ছেলে। ঘরে খাবার নেই যে খাবে, অবস্থা নেই যে পড়াশোনা করবে, কী করবে, আর? দলে জুটে গেছিল।

পাইপটা নিভে গেছিল ঋজুদার। দেশলাই জ্বেলে ধরিয়ে নিয়ে গম্ভীর মুখে পাইপটাতে একটা টান লাগিয়ে বলল, ভীরাপ্পানেরা যখন মস্ত বড় দানবীয় চেহারা নিয়ে আমাদের চোখের সামনে এসে দাঁড়ায় তখন তাকে মারবার জন্য পুলিশ, বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স, কম্যান্ডো সবকিছুকে নিয়োগ করি আমরা। অথচ, আমাদের একটু সহানুভূতি, একটু মায়া-মমতা, একটু ঔদার্য, সময়মতো খরচ করে ওই শিশু ভীরাপ্পানকেই সমাজের কতবড় উপকারী করে তুলতে পারতাম। দোষটা আসলে ভীরাপ্পানের একার নয়; দোষটা এই সমাজব্যবস্থার, এই অর্থনৈতিক বৈষম্যের, এই পঙ্গপালের মতো, গিনিপিগের মতো, তেলাপোকার মতো, প্রতিমুহূর্তে জিওমেট্রিক্যাল প্রগ্রেশনে বাড়তে-থাকা জনসংখ্যার। ভীরাপ্পান আমাদেরই তৈরি করা চরিত্র, ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন। সে আকাশ থেকে পড়েনি।

আমরা সকলেই চুপ করে রইলাম অনেকক্ষণ ঋজুদার কথা শুনে।

ঋজুদার মধ্যের এই গুণটা আমাকে প্রথম দিন থেকেই মুগ্ধ করে। সাধে কি ঋজুদার চামচাগিরি করি? কোনও মানুষকেই সহজে বাতিল করতে চায় না ঋজুদা। করে না। ফলটা দেখেই উত্তেজিত হয় নাবীজটা খুঁজতে চায়। সবসময়ই।

ভটকাই অগুনতি প্যাটিস ও পেস্ট্রি সাঁটিয়ে, ভুড়ি যব ঠাণ্ডা, মুড়ি তব ঠাণ্ডা নীতির জাজ্বল্যমান উদাহরণ হয়ে, খুশি খুশি গলায় বলল, আমাদের আরও বলো ঋজুদা ভীরাপ্পান সম্বন্ধে। দারুণ একটা ক্যারেকটার। যাই বলো, আর তাই বলো!

জন্মেছিল ও উনিশশো সাতচল্লিশে। কর্ণাটকের মহীশূর জেলার গোপীনাথম নামের একটি গ্রামে। তামিলনাড়ুর সীমান্ত থেকে দেড়শো মাইল মতো দূরে। ওর এক ভাইয়ের নাম অর্জুনান। সে এখন তামিলনাড়ুর জেলে রয়েছে। চিদাম্বরম নামক একজন ফরেস্ট রেঞ্জারকে খুন করার অভিযোগে সে অভিযুক্ত। কিন্তু, অনেকেই আবার বলেন যে, চিদাম্বরমকে খুন করেছে আসলে ভীরাপ্পানই। তার কেশাগ্রও স্পর্শ করতে না পেরেই তার ভাইকে ভরে দেওয়া হয়েছে জেলে। অবশ্য এমনতো আকছারই ঘটছে দেশের সব আনাচে-কানাচেই!

তুমি যে বললে, ভীরাপ্পান চন্দনকাঠের চোরাকারবারি। আমরাও তো বিভিন্ন কাগজে তেমনই পড়েছি।

তিতির শুধোল।

হ্যাঁ, এখন তাই। আগে ও জেভিয়ার গুণ্ডাদের হাতি মারা দলে ছিল। শ পাঁচেক হাতি জেভিয়ার গুণ্ডাদের দল নাকি সাবাড় করে দিয়েছে, গত তিনযুগে। ভেবে দেখ একবার।

এ তো গুগুনোম্বারের দেশ-এর আর রুআহা-এর টুর্নাডো-ভুষুণ্ডাদেরও হার মানালো দেখছি।

তিতির বলল।

তবে দেখতে দেখতে হাতি মারার ব্যবসা বন্ধই হতে বসল এখানে, যখন থেকে ভারতবর্ষ থেকে হাতির দাঁত রপ্তানির উপরে নিষেধাজ্ঞা জারি হল। আসলে মেরেছিল ওই দল শ পাঁচেকেরও বেশি হাতি। প্রকৃত সংখ্যা জানার কোনও উপায় ছিল না। কেন ছিল না, তারও একটা লজ্জাকর কারণ ছিল। নিয়ম ছিল, যদি কোনও রেঞ্জে একটিও হাতি, চোরাশিকারিদের হাতে মারা যায় তবে সেই রেঞ্জ-এর রেঞ্জারের সঙ্গে সঙ্গে চাকরি যাবে। ফলে, বুঝতেই পারছিস, রেঞ্জারেরা নিজের নিজের ঘাড় বাঁচাবার জন্যই হাতি শিকারের খবর যাতে উপরওয়ালাদের কাছে না পৌঁছয়, তা দেখত। তাই পাঁচশো সংখ্যাটা যদি অফিসিয়াল সংখ্যা হয়, তবে প্রকৃত সংখ্যাটা স্বভাবতই তার চেয়ে অনেকই বেশি ছিল।

আসলে ঠিক কোন অঞ্চলে ভীরাপ্পানের দৌরাত্ম চলছে, এখন?

আমি জিজ্ঞেস করলুম, ঋজুদাকে।

এখন তো সে কাল্লাটির গভীর জঙ্গলে ডেরা করেছে। সেখানে কারও পক্ষেই আর পৌঁছবার কোনও উপায় নেই। চারদিকেই জমি-মাইন পেতে রেখেছে সে। যদি সেখানেও তাকে ধরবার জন্য মাইনের ও সম্ভবত সমস্ত প্রতিরোধের বাধা পেরিয়ে কেউ পৌঁছতেও পারে তবে সে জঙ্গলের আরও গভীরে পালিয়ে যাবে সত্যমঙ্গলম-এর দিকে। ভীরাপ্পান যাকে বলে, জঙ্গলের পোকা। একমাত্র অন্য কোনও জঙ্গলের পোকাই তার সঙ্গে টক্কর দিতে পারে। সাধারণ পুলিশ বা বি.এস.এফ দিয়ে হবে না।

কেউই কি যেতে পারেনি আজ পর্যন্ত, সত্যমঙ্গলম-এ?

পুলিশের এস. গোপালকৃষ্ণনই একমাত্র মানুষ, যিনি ভীরাপ্পানের খোঁজে ওই জঙ্গলে একবার গেছিলেন, এবং মাইনে ‘আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। এপ্রিল মাসের ন তারিখে এক বাসভর্তি তামিলনাড়ুর রাজ্যের টাস্ক ফোর্স-এর পুলিশকে নেতৃত্ব দিয়ে যখন উনি নিয়ে যাচ্ছিলেন তাদের ভীরাপ্পানের সত্যমঙ্গলম-এর ডেরার দিকে, তখনই ভীরাপ্পানের মাইনে, তাঁদের পুরো বাসটিই উড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই বাইশজন দক্ষ ও সাহসী পুলিশের মৃত্যু ঘটে। গোপালকৃষ্ণন নিজে যদিও কোনওক্রমে প্রাণে বাঁচেন কিন্তু সাংঘাতিক রকম আহত হন। নইলে, এপ্রিল মাসের ন তারিখে আহত হবার পর জুন মাসের আজ অবধিও তাঁকে হাসপাতালে পড়ে থাকতে হত না।

এ পর্যন্ত কত জন পুলিশ ভীরাপ্পানের হাতে মারা গেছে?

ভটকাই শুধোল।

তামিলনাড়ু এবং কর্ণাটক রাজ্য পুলিশের এবং অন্যান্য ফোর্সেরও কত মানুষ যে ভীরাপ্পানের হাতে প্রাণ দিয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই। অথচ ভীরাপ্পান কিন্তু আজও বন-জঙ্গলের মানুষদের কাছে দারুণ জনপ্রিয়। গরিবদের সবরকম সাহায্য করে ভীরাপ্পান। তার বয়স্কা মা-বাবাকে দেখে সবদিক দিয়ে তার তিন বোন আর দুভাইকেও দেখে। তার দুঃসাহস প্রায় কিংবদন্তির রূপ নিয়েছে ওই অঞ্চলে ইংল্যান্ডের রবিন হুডেরই মতো।

ভীরাপ্পানের ফ্যামিলি নেই?

তিতির জিজ্ঞেস করল।

হ্যাঁ, মাত্রই বছর দুয়েক আগে বিয়ে করেছে ভীরাপ্পান। তাঁর স্ত্রী সন্তানসম্ভবা হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হল। শিশুও ভূমিষ্ঠ হল। যে ভীরাপ্পানকে ধরবার জন্য হাজার সশস্ত্র পুলিশের দিনে রাতের চব্বিশ ঘণ্টা চোখে ঘুম নেই, সে-ই শহরের হাসপাতালে গিয়ে সকলকে বুদু বানিয়ে তার স্ত্রী ও শিশুকে দেখে এল। এতেই প্রমাণিত হয় যে, ভীরাপ্পান নিজে যে শুধু দুঃসাহসী তাই নয়, সমাজের সব স্তরেই তার হিতার্থী বন্ধু এবং সহযোগী আছে। নইলে, এমন অঘটন সম্ভব হত না। আসলে আমার মনে হয়, ভীরাপ্পানও হয়তো আফ্রিকার ভুষুণ্ডারই মতো কোনও নেপথ্যচারী টর্নাডোর ক্রীড়নক। সেই লোকটা হয়তো সমাজের ওপরতলার অত্যন্ত সচ্ছল তোক। দিব্যি আরামে আছে। খাচ্ছে দাচ্ছে, মৌজ ওড়াচ্ছে, ব্যাঙ্গালোর, কি মাইসোর কি কোয়েম্বাটোর কি মাদ্রাজে বসে।

সত্যি! ফ্যান্টাসটিক।

ভটকাই উত্তেজিত গলায় বলে উঠল।

বলেই, তাৎক্ষণিক স্বরচিত একটা ছড়া আওড়ে দিল:

শোনো, শোনো, মিস্টার ভীরাপ্পান।
আমিও যে মিস্টার ভটকাই,
ভেবোনা আমাকে তুমি পোলাপান
দুই হাতে, হাতে-নাতে পিপিণ্ডি চটকাই।
দেখা হলে কী করে যে ঘাড়খানি মটকাই।
আমি ভটকাই। চটকাই। হাই-ফাই।

ঋজুদা হেসে ফেলল। তিতিরও। আমি একটুও হাসলাম না। হাসা যেত, যদি ছড়াটা, ছড়া পদবাচ্য হত। এমন কাতুকুতু দিয়ে হাসানোর চেষ্টা যারা করে, তারা অন্যদের তো আনন্দ দিতেই পারে না, উলটে নিজেদেরই ছোট করে। হচ্ছিল কী রকম সিরিয়াস কথা, তার মধ্যে বাগবাজারি চ্যাংড়ামি! কোনও মানে হয়!

ঋজুদা বলল, রুদ্রর আদৌ পছন্দ হয়নি তোর ছড়া, ভটকাই। আমারও যে খুব একটা পছন্দ হয়েছে তা নয়। তবে, আমি বোধহয় তোদের বোর করতে শুরু করেছিলাম–সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে এই বিরতিটা, খুবই টাইমলি এনেছে ভটকাই।

এমন সময়ে ফোনটা বাজল। রিসিভারটা তুলে নিয়েই ঋজুদা বলল, ইয়েস।

ইয়েস। গুড ইভনিং। নমস্কার।

ও আই সি! দ্যাট আর্লি। অন সানডে? গুড হেভেনস্! হুইচ ডে ইজ টুডে? টুইসডে!..ইয়া!..ইয়া? আই কোয়াইট সি ইওর পয়েন্ট…নো নো, প্লিজ ডোন্ট ওয়্যারি বাউট দ্যাট। বাট ইট মাস্ট বি কেপ্ট আ সিক্রেট। দ্য হোল থিং। নো গভর্নমেন্ট ভেহিকে। নো রিসেপশান। নো বডি শুড নো। নোবডি। প্লিজ, মেক ইট ডাবলি শিওর।…নো। নো। নান অফ ইওর অ্যারেঞ্জমেন্ট প্লিজ। এভরিথিং শুড বি ডিসক্রিট–আটারলি ডিসক্রিট। আই রিপিট। ডু য়ু আন্ডারস্ট্যান্ড? ইয়েস, প্লিজ থ্যাঙ্ক বোথ দ্য চিফ মিনিসটারস অন মাই বিহাফ।..ইয়া। আই উইল গিভ ইউ দ্য ফ্লাইট নাম্বার-ইয়েস। অন দ্য ডায়রেকট লাইন। ইয়েস। অন দি আনলিস্টেড ওয়ান।–অ্যাট ইওর রেসিডেন্স।…ইয়া।

গুড নাইট। নমস্কার।

ফোনটা নামিয়েই ঋজুদা বলল, রুদ্র, গিয়ে দেখতো গদাধর খিচুড়িটা চাপিয়ে দিল কি না। না, আজকে খিচুড়ি-ইলিশমাছ ভাজাটা বাদ দিতে হবে।

বাদ? খিচুড়ি?

গভীর আশাভঙ্গের সঙ্গে ভটকাই বলল।

হ্যাঁ। তবে ক্যানসেল হচ্ছে না। আগামী কাল তোমরা সকলে পৌনে-সাতটায় আসবে। তারপর খিচুড়ি ইলিশমাছ খেয়ে, রাত দশটার মধ্যে বাড়ি যাবে।

আমি উঠতে যাব, এমন সময়ে গদাধরদা নিজেই কাশ্মীরি কাঠের ট্রেতে, সুন্দর হালকা মেহেন্দি-রঙা ম্যাটের ওপরে চাপিয়ে, প্রবাল-রঙা টি-কোজিতে মোড়া বড় চায়ের পটটি আর বোন-চায়নার কাপ ডিস সাজিয়ে নিয়ে ঘরে ঢুকল। তিতিরের জন্য আলাদা একটি ফিকে হলুদ-রঙা গ্লাসে দুধ, ড্রিঙ্কিং-চকোলেট মেশানো।

ঋজুদা বলল, গদাধর, সৈন্যদলকে এখন বিদায় করো দুধ আর চা খাইয়ে। কাল রাতে খাওয়া-দাওয়া হবে। ভাজাভুজির পদ দু একটি বেশি কোরো। ভাজা ছাড়া খিচুড়ি জমে না।

কাঁটালের বিচি ভাজা খাব, ঋজুকাকা।

আদুরে গলাতে, তিতির আবদার করল।

দাঁড়াও মা। কাঁটাল তো এখন গোরুর খাইদ্য। দেকি, পাই কি না।

গদাধরদা বলল।

ভটকাই বলল, তোমার বয়সই হল চার কুড়ি, কিন্তু বুদ্ধি বলে কিছুই হলোনি গো গদাধরদা। এতদিনে এও জানলিনে গো! কাঁটালের বিচি আলাদা কিনতে পাওয়া যায়। আমিই নে আসবখন।

এই দাদাটা বড্ডই ভ্যাজ-ভ্যাজর করে। কই? রুদ্র বাবুকে তো এতদিন ধরে। দেইকতিচি, তিনি তো আমার সঙ্গে কইনো…।

আমি বললাম, গদাধরদা, তুমিও তেমনই। তোমার রুদ্রবাবু এই একটাই হয়েছিল। তুমি তার জোড়া পাবে কোত্থেকে!

একটা লাখ কথার এক কথা বলে ফেলেছিস রুদ্র। তুই যে এই পৃথিবীতে একটা মাত্রই–এই জ্ঞানটা তোর হয়েছে জেনে ভাল লাগল। একটা মাত্র যে কী? কোন চিজ, সেটা আর বললাম না।

তিতির বলল, তুমি রবিবারে যাচ্ছ, ঋজুকাকা?

ঋজুদা অন্যমনস্ক হয়ে গেছিল। তিতিরের হাত থেকে চায়ের কাপটা নিতে নিতে বলল, উ? হু! তাই তো যেতে হবে দেখতে পাচ্ছি।

একাই যাবে? ভটকাই শুধোল।

চায়ে একবার চুমুক দিয়ে বলল ঋজুদা, এখনও তো সেইরকমই ঠিক আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *