গুগুনোগুম্বারের দেশে (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ
পাঁচ
গাড়ির মধ্যে বসে-বসে ঘুম পেয়ে গেল। এত বেশি উত্তেজিত ও ক্লান্ত ছিলাম যে, খিদের কথা মনেও এল না। ওয়াটার বটল থেকে একটু জল খেলাম, তারপর নিজের জীবনের, ঋজুদার জীবনের সব দায়িত্ব খনভাম-এর উপর চাপিয়ে দিয়ে পা-ছড়িয়ে, বন্দুকটার নল বাইরে করে বসে রইলাম, টুপিটা চেপে মাথায় বসিয়ে। গাড়ির ভিতরটাই এত ঠাণ্ডা হয়ে গেছে যে মনে হচ্ছে, ফ্রিজ-এর মধ্যে বসে আছি। বাইরে না জানি আজ কী ঠাণ্ডা! ঋজুদা এখন কী করছে, বেঁচে আছে কি না কে জানে? ঋজুদা যদি কাল সকালবেলাতে ফিরে না আসে, তাহলে আমি কী করব, কী কী করা উচিত–ভাবতে পারছিলাম না। কিন্তু ভাবতে হচ্ছিল।
এবারে পর-পর যেসব ঘটনা ঘটল, চোখের সামনে যত মৃত্যু ঘটতে দেখলাম, এবং আশ্চর্য–নিজেও ঘটালাম, এর পর ঋজুদা অথবা আমি মরে গেলেও অবাক হবার কিছু নেই।
দেখতে-দেখতে চোখের সামনে ভোর হয়ে এল। বনে-জঙ্গলে, নদীতে-পাহাড়ে সূর্য-আসা আর সূর্য-যাওয়া প্রতিদিনের যে কত বড় দুটি ঘটনা যাঁদের চোখ-কান আছে তাঁরাই জানেন। কত আশ্চর্য রঙের হেরি-খেলা, কত রাগ-রাগিনীর আলাপ, কত শিল্পীর তুলির আঁচড়, কত শান্ত নরম, আলতো গন্ধ সব মিলিয়ে-মিশিয়ে যিনি সব গায়কের গায়ক, সব শিল্পীর শিল্পী, সব সুগন্ধের গন্ধরাজ, তিনিই এই পৃথিবী-ঘরের বাতি নেভান, বাতি জ্বালান। ঘরের বাইরে এলেই, দেশে এবং এই বিদেশেও তাঁকেই দেখি, দেখতে পাই। ঋজুদা যেমন আমাকে শিখিয়েছে, তেমনই আমি আকাশ বাতাস জল স্থল পাখি হরিণ মানুষ ফড়িং–এই সবের মধ্যেই তাঁকে দেখি।
ভোর হয়েছে কিন্তু সূর্য এখনও মেঘে ঢাকা। অন্ধকার কেটেছে প্রায় পনেরো মিনিট। ঋজুদা তবু এল না। এবার যা করার নিজেকেই বুদ্ধি করে করতে হবে। কম্যাণ্ডারের এতক্ষণে ফিরে আসা উচিত ছিল।
গাড়ির দরজা খুলে চাবিটা পকেটে নিলাম। এই চাবি হাতছাড়া করাতেই ভুষুণ্ডা এমন একটা লং-রোপ পেয়ে গেছিল। লোডেড বন্দুক কাঁধে আবার জঙ্গলের দিকে চলতে লাগলাম। কাল যেখান দিয়ে বেরিয়েছিলাম সেই দিকে। সাবধানে জঙ্গলের কিনারা, কিনারার আশেপাশের গাছ ইত্যাদি দেখতে দেখতে এগোচ্ছি। হঠাৎ চোখে পড়ল কতগুলো শকুন উড়ছে বসছে, কামড়া-কামড়ি করছে রেড-ওট ঘাসের বন যেখানে ঢালু হয়ে জঙ্গলে নেমেছে সেইখানে।
আমার বুকটা ধক্ করে উঠল। কী দেখব কে জানে?
আর একটু এগোতেই দেখি, কালকে হাতিরা সেই মৃতদেহগুলিকে এখানে এনে ফেলেছে আর শকুনরা ভোজে লেগেছে, হায়নাদের পর।
তাড়াতাড়ি সরে এলাম। সরে আসার সময় লক্ষ করলাম যে, কালকে যে কোপিটা দেখেছিলাম তার উপরেও দুটো শকুন উড়ছে চক্রাকারে। ঐদিকে চেয়ে আমার মন যেন কেমন করে উঠল। এমনই করে। যাঁরা জঙ্গলে জঙ্গলে ঘোরেন, তাঁরা জানেন একেই বলে সিক্সথ সেন্স। এর কোনো ব্যাখ্যা নেই; ব্যাখ্যা হয় না।
আমি আস্তে-আস্তে কোপির দিকেই চলতে লাগলাম। সামনের বনে মৃত্যুর নিস্তব্ধতা। মনে হচ্ছে, মৃত হাত বুলিয়ে গেছে এর উপর। কতগুলো বেবুন চিৎকার করছে আর একদল ব্যাবলার ও থ্র্যাশার সরগরম করে রেখেছে জঙ্গল, বৃষ্টি ধরে যাওয়ার আনন্দে।
কোপির নীচে পৌঁছেই আমি চমকে উঠলাম। চাপ-চাপ রক্ত পড়ে জমে রয়েছে পাথরের উপর। তারপর রক্তের ছড়া চলে গেছে ভিতরে। বৃষ্টিতে যা ধুয়ে গেছে তা গেছে খোলা জায়গায়। যা ধোয়নি তা জমে আছে।
রক্তের দাগ দেখে উপরে উঠতে লাগলাম। একটু গিয়েই, যে সার্ডিনের টিন খুলে আমরা কাল দুপুরে গাছের উপর বসে খেয়েছিলাম, সেই খালি টিনটা উল্টে পড়ে আছে দেখলাম। শকুনগুলো ঘুরে-ঘুরে উড়ছিল উপরে।
আমি বন্দুকটা সামনে ধরে, একটা বড় পাথরের আড়ালে শরীরটা লুকিয়ে ডাকলাম, ঋজুদা! ঋজুদা।
কোনো উত্তর পেলাম না। কিন্তু ভয়ে আমার বুক শুকিয়ে গেল ঋজুদা কি…? নাকি ভুষুণ্ডাদের ডেরায় এসে পড়েছি আমি?
এমন সময় কারা যেন আসছে উপর থেকে শুনলাম। জুতো পায়েও নয়, খালি পায়েও নয়; যেন নুপুর পায়ে কারা নেমে আসছে। আরও ভয় পেয়ে গেলাম আমি। এ কী ব্যাপার। বন্দুকটা ওদের আসার পথে ধরে আমি তৈরি হয়ে রইলাম। ঠিক সেই সময় পাঁচটা আফ্রিকান স্ট্রাইপড জ্যাকেল একসঙ্গে হুড়োহুড়ি করে নেমে এল উপর থেকে। ওদের পায়ের নখের শব্দ পাথরের উপর ঐরকম শোনাচ্ছিল।
আমাকে দেখতে পেয়েই দুটো শেয়াল দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে তেড়ে এল। পাছে গুলি করলে শব্দ হয়, তাই ট্রিগার গার্ডে হাত রেখে ব্যারেল দিয়ে গুঁতো দিলাম ওদের। তাতেও কাজ না হলে গুলি করতে বাধ্য হতাম।
গ-র-র–গরররর করতে করতে ওরা নেমে গিয়ে পাথরের আড়ালে যেখানে রক্ত জমে ছিল, সেইখানে হুড়োমুড়ি করে চাটতে লাগল।
আমি আরও এক ধাপ উঠে গিয়ে ডাকলাম, ঋজুদা! তুমি সাড়া দাও। ঋজুদা!
এমন সময় মনে হল কেউ বলল, আমি। আয়।
এত ক্ষীণ যে, ভাল করে শুনতে পেলাম না। মনে হল ভুল শুনলাম না তো!
আবারও যেন শুনলাম, আয়
একপাশে ঘেঁষে, বন্দুক রেডি করেই, পাথরটা টপকে বাঁক নিলাম। নিয়েই…
ঋজুদার বাঁ পায়ে ঊরুর কাছে গুলি লেগেছে। গাদা বন্দুকের গুলি। বড় সীসার একটা তাল। পায়ের হাড় ভেঙে গেছে কি না কে জানে! রক্তে সারা জায়গাটা থকথক করছে। ঋজুদার ঠোঁট ফ্যাকাসে নীলচে। আমাকে দেখে আমার দিকে হাত তুলল। আমি হাতটা হাতে নিয়ে খুব করে ঘষে দিলাম। তারপর বললাম, ভুষুণ্ডা?
ঋজুদা ডান হাতটা তুলে হাতের পাতাটা নাড়ল।
ফাস্ট-এইড বাক্সটা হ্যাভারস্যাক থেকে বের করে ডেটল আর মারকিওক্রোমের শিশি আর তুলো বের করতে করতে বললাম, ডেড?
ঋজুদা ফিসফিস করে বলল, পালিয়ে গেছে। আমি মিস করেছিলাম। এত অন্ধকার হয়ে গেল! মিস করলাম।
ভুষুণ্ডা কোথায়? আমি শুধোলাম।
ঋজুদা বলল, বোধহয় চলে গেছে। চলে না গেলে ও আমাকে শেষ করে যেত। ওর গুলিতে আমি যে পড়ে গেছি, তা ও দেখেছে।
আমি যখন ঋজুদার ট্রাউজারটা কাঁচি দিয়ে কেটে ফেলে ঋজুদাকে ড্রেস করছিলাম, তখন ঋজুদা আমার এল-জি ভরা বন্দুকটা দুহাতে ধরে পাথরের পথের দিকে চোখ রাখছিল।
আমি বললাম, শেয়ালরা তোমাকে কিছু করেনি তো?
নাঃ। তুই না এলে করত হয়তো। শকুনরাও করত। ওরা ঠিক টের পায়।
পা-টা একেবারে থেঁতলে গেছে গুলিতে। কত যে টিসু আর লিগামেন্ট ছিঁড়ে গেছে তা ভগবানই জানেন। আধঘন্টা লাগল ঋজুদাকে ড্রেস করতে। তারপর দুটো কোডোপাইরিন খাইয়ে বললাম, ঋজুদা, তুমি এখানে থাকো। আমি গাড়িতে জেরিক্যান থেকে তেল ভরে, গাড়িটা কোপির যত কাছে আনতে পারি তত কাছে এনে তোমাকে তুলে নেব।
ঋজুদা বলল, ভুষুণ্ডা যদি চলে না গিয়ে থাকে তবে তো গাড়ির আওয়াজ শুনেই এসে তোকে মারবে।
আমি বললাম, এখন তো আর রাত নয়, দিন। আমি তোমার থার্টি-ও-সিক্স রাইফেলটা নিয়ে যাচ্ছি। এখানে শর্ট রেঞ্জে বন্দুক অনেক বেশি এফেকটিভ। দুব্যারেল এল-জি পোরা থাকল। তুমি এটা বুকের উপর নিয়ে শুয়ে থাকো।
ঋজুদার হ্যাভারস্যাকটাকে ঠিকঠাক করে বালিশের মতো করে দিলাম। তাতে একটু আরাম হল। তারপর রাইফেলের ম্যাগাজিন ভর্তি করে চেম্বারেও একটা গুলি ঠেলে দিয়ে সেফটি ক্যাচে হাত রেখে আমি নেমে গেলাম।
নিজের অজান্তে আমার চোয়াল দুটো শক্ত হয়ে এল। চোখ দুটো জ্বালা করতে লাগল। না-ঘুমোবার জন্যে নয়, প্রতিহিংসায়। তারপরই চোখ দুটি ভিজে এল আমার। ঋজুদার সামনে পারিনি। ঋজুদা কষ্ট পেত।
এখন পরিষ্কার দিনের আলো। আজ সকালে ভুষুণ্ডা যদি পাঁচশো গজের মধ্যেও তার চেহারা একবার আমাকে দেখায় তাহলে অস্ট্রিয়ায় তৈরি এই ম্যানকিলার শুনার রাইফেলের সফট-নোজড গুলি তার বুকের পাঁজর চুরমার করে দেবে। ঋজুদার কাছে রাইফেল চালানো কতটুকু শিখেছি তার পরীক্ষা হবে আজ।
কোপি থেকে নামতে নামতে দাঁতে দাঁত চেপে আমি বললাম, ভুষুণ্ডা! তোমার আজ শেষ দিন।
ফাঁকায় বেরিয়ে আমি হরিণের মতো দৌড়ে যেতে লাগলাম গাড়ির দিকে। হরিণ যেমন কিছুটা দৌড়ে যায়, তারপর থেমে পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখে, আমিও সেরকম করছিলাম। অবশ্য শিকারী ঠিক ঐ থমকে দাঁড়ানোর মুহূর্তেই হরিণকে গুলি করে। ভাবছিলাম, ভুষুণ্ডা যদি এখনও থেকে থাকে তাহলে গুলি করে আমাকে আবার হরিণ না বানিয়ে দেয়।
কিছুক্ষণের মধ্যেই যখন বন্দুকের ও তীরের পাল্লার বাইরে চলে গেলাম, তখন হেঁটে যেতে লাগলাম পিছনে তাকাতে তাকাতে।
রাইফেলটাকে গাড়ির বনেটের উপর শুইয়ে রেখে পিছনে গিয়ে দুটি জেরিক্যান থেকে তেল ঢাললাম ট্যাঙ্কে। মাঝে-মাঝেই ঐদিকে দেখছিলাম। নাঃ। কোনো লোকজনই নেই।
রাইফেলটা ভিতরে তুলে নিয়ে, সুইচ টিপতেই গাড়ি কথা বলল। বড় মিষ্টি লাগল সেই কথা! তারপর গীয়ারে ফেলে এগিয়ে চললাম কোপিটার দিকে। কাছে গিয়ে গাড়িটা ঘুরিয়ে রাখলাম। ট্রেলার থাকলে গাড়ি ব্যাক করতে ভারী অসুবিধা হয়।
ভাল করে চারপাশ দেখে নিয়ে রাইফেল হাতে দৌড়ে উঠে গেলাম। গিয়ে দেখি, ঋজুদা নিজেই ওঠবার চেষ্টা করছে, কিন্তু চেষ্টা করতে গিয়ে পড়ে গেল। যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গেল মুখ।
আমি বললাম, কী করছ? চলো, আমার কাঁধের নীচে তোমার পিঠটা লাগাও। বলে, ঋজুদাকে কাঁধের ওপর নিয়ে খুব সাবধানে নামতে লাগলাম। ঐ অবস্থাতেও ঋজুদা শটগানটা দুহাতে ধরে ব্যারেলটা সামনে করে রাখল।
কোপির নীচে এসে দেখলাম, নাঃ, কেউ কোথাও নেই। ঋজুদাকে গাড়ি অবধি নিয়ে বাঁ দিকের দরজা খুললাম। কিন্তু ঋজুদা বলল, আমি তো বসতে পারব না ঐভাবে!
তবে? কোথায় বসলে সুবিধে হবে তোমার?
ঋজুদা বলল, আমি তো এখন একটা বোঝা। যার নিজের হাত-পায়ে জোর নেই, সে বোঝা ছাড়া কী? আমাকে ট্রেলারের উপর উঠিয়ে দে। টেলারে শুয়ে গেলেই যেতে পারব।
আমি বললাম, সে কী? ধুলো লাগবে, ঝাঁকুনি লাগবে। ঝাঁকুনিতে আরও রক্ত বেরোবে।
ঋজুদা হাসবার চেষ্টা করল। বলল, উপায় কী বল? নইলে তো আমাকে এখানে রেখে তোর একাই চলে যেতে হয়। এই ভাল, রোদ পোয়াতে-পোয়াতে, ঘুমোতে-ঘুমোতে দিব্যি যাব।
আমি পিছনের সীট খুলে তার গদি দুটো এনে ট্রেলারের মালপত্রের উপরে পেতে দিলাম। তারপর ঋজুদাকে যতখানি আরাম দেওয়া যায় দিয়ে গুলিভরা শটগান, জলের বোতল, ব্রাণ্ডির বোতল, হ্যাভারস্যাক সব হাতের কাছে রেখে, রাইফেলটা নিয়ে আমি ড্রাইভিং সীটে উঠে বসলাম।
গাড়ি স্টার্ট করে, একটু পরই টপ-গীয়ারে ফেলে দিলাম, যাতে তেল কম পোড়ে। কিন্তু ঋজুদার যাতে কম ঝাঁকুনি লাগে সেই জন্যে খুব সাবধানে আস্তেই চালাতে লাগলাম।
সামনে যতদূর চোখ যায় ঘাসবন। এখন মেঘ কেটে গেছে। পনেরো ডিগ্রী ইস্ট এবং ডিউ সাউথ-এর বেয়ারিং নিয়ে গাড়ি চালাচ্ছি। মাঝে-মাঝে কম্পাস ও ম্যাপ দেখছি।
জঙ্গলে এসে ল্যাণ্ড-রোভার বা জীপে বা গাড়িতে সামনের সীটে আমি একা এই প্রথম। হয় ঋজুদা চালায়, আমি পাশে বসি, নয় আমি চালাই, ঋজুদা পাশে বসে। আজ ঋজুদা ট্রেলারে শুয়ে আছে। খুব তাড়াতাড়ি কোনো ভাল হাসপাতালে ঋজুদাকে দেখাতে না পারলে গ্যাংগ্রিন সেট করে যাবে। পা-টা হয়তো কেটে বাদই দিতে হবে। কে জানে? ঋজুদা, লাঠি হাতে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে, ভাবাই যায় না। ঋজুদাকে বাঁচানো যাবে না আর?
আমি আর ভাবতে পারছিলাম না।
মাঝে একবার গাড়ি থামিয়ে ঋজুদার পা আবার ড্রেসিং করে দিলাম। ট্রেলারের ঝাঁকুনিতে বেশ রক্ত বের হচ্ছে। মুখে কিছু বলছে না ঋজুদা, কিন্তু মুখের চেহারা দেখেই বুঝছি যে, ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। গায়ে হু-হু করছে জ্বর। চোখ দুটো জবাফুলের মতো লাল। ট্রেলারের উপর সবুজ কম্বল গায়ে দিয়ে শুয়ে তবুও আমার সঙ্গে দু-একটা রসিকতা করতে ছাড়ছে না।
ম্যাপটা একবার দেখিয়ে নিলাম ভাল করে। যদি অজ্ঞান হয়ে পড়ে তবে কে আমাকে গাইড করবে!
ঋজুদা বলল, ঠিকই যাচ্ছিস। আমরা তো আর তাঁবুগুলো কালেক্ট করতে আগের জায়গায় যাব না–সোজাই চলে যাব। যাতে গোরোংগোরা-সেরোনারার মেইন রাস্তাতে পড়তে পারি।
তারপর বলল, তাঁবুগুলো তুলতে মোট দশ মাইল মতো ঘোরা হত, কিন্তু ওখানে আমার অবস্থার কারণ ছাড়াও অন্য কারণেও যাওয়া ঠিক নয়। ওয়াণ্ডারাবোরা যে আবার ওখানে ফিরে এসে ম্যাসাকার শুরু করেনি তা আমরা জানছি কী করে?
দুপুরবেলা খাওয়া-দাওয়া, বিশ্রাম ও ঋজুদার পরিচর্যার জন্য থামলাম আর-একবার। ঋজুদার গায়ে জ্বর, তবু আমি চীজ দিয়ে চায়ের বিস্কুট, মালটি-ভিটামিন ট্যাবলেট আর ঘুমের ওষুধ খাইয়ে দিলাম ওকে।
ট্রেলারের তলায় হেলান দিয়ে উদাস চোখে দূরে চেয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম।
হঠাৎ ঋজুদা গায়ে অত দিয়ে বলল, কী ভাবছিস? আমি মরে যাব? দূর বোকা! আমি যখন মরব, তখন আমার সুন্দর দেশেই মরব। বিদেশে মরতে যাব কোন দুঃখে। তাছাড়া, এখন মরলে তো চলবে না আমার রুদ্র। ভুষুণ্ডার অ্যাকাউন্ট সেটল করতে আমাকে আবার আফ্রিকাতে আসতেই হবে। হয়তো এখানে নয়, অন্য কোনোখানে। সেবার একেবারে একা-একা শুধু ভুষুণ্ডার সঙ্গে বোঝাপড়া করতেই আসতে হবে। আফ্রিকার যে-প্রান্তেই সে থাক না কেন, খুঁজে বের করতেই হবে। তা যদি না পারি, তাহলে হেরে গিয়ে হেরে থেকে বেঁচে লাভ কী? সে বাঁচা কি বাঁচা?
আমি বললাম, সেবার আমাকে সঙ্গে আনবে তো?
ঋজুদা হাসল। বলল, পরের কথা পরে। এখন ভাল করে খেয়ে নিয়ে গাড়িটা স্টার্ট কর। পা-টা যদি কেটে বাদই দিয়ে দেয়, তাহলে তো তোর উপর নির্ভর করতেই হবে। আর সেইজন্যেই কি মতলব করছিস যে, সাধের পা-টা আমার বাদই যাক?
আমি ঋজুদার পাইপটা ভাল করে পরিষ্কার করে ভরে লাইটারটা হাতের কাছে দিয়ে সামনে যেতে-যেতে বললাম, আচ্ছা ঋজুদা, আমরা যখন কাল দুপুরে ঐ দোলামতো জায়গাটাতে বসেছিলাম তখন হিসসসস করে খুব জোরে কী একটা জানোয়ার ডেকেছিল? তুমি আমাকে গুলি বদলাতে বলেছিলে, মনে আছে?
ঋজুদা পাইপে আগুন জ্বালাতে-জ্বালাতে বলল, আছে। ঐ আওয়াজের মতো ভয়ের জিনিস আফ্রিকার বনে-জঙ্গলে খুব কমই আছে। এক ধরনের সাপ। প্রকাণ্ড বড়, আর বিষধর। নাম গাব্বুন ভাইপার। আমাদের দেশের শঙ্খচূড়ের চেয়েও মারাত্মক। যদি কাউকে কামড়াবে বলে ঠিক করে, তাহলে দুমাইল যেতেও পিছপা হয় না। অনেকখানি উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে ছোবল মারে।
আমার গা শিরশির করছিল, তখন মনে পড়েছিল যে, ঐ সাপকেই গাড়ির নীচে নিয়ে আমি কাল রাতে অতক্ষণ ছিলাম। ঋজুদাকে বললাম, কী করে সাপটা আমাকে বাঁচিয়েছিল আক্রমণকারীদের হাত থেকে।
ঋজুদা সব শুনে খুবই অবাক হল।
আমি স্টীয়ারিং-এ গিয়ে বসলাম।
এখন দুপাশে আবার অনেক জানোয়ার দেখা যাচ্ছে। শ’য়ে শ’য়ে থমসনস ও গ্রান্টস গ্যাজেল, টোপি, ওয়াইন্ডবীস্ট, ওয়ার্টহগস, জেব্রা। জিরাফ আর উটপাখি কম।
খুব বড় একদল মোষের সঙ্গেও দেখা হল। আফ্রিকাতে বলে, ওয়াটার বাফেলো। জলে-কাদায় ওয়ালোয়িং করে ওরা। সব দেশের মোষই করে। বিরাট দেখতে মোষগুলো গায়ের রঙ বাদামি কালো। মোটা মোটা ঘন লোম। তবে শিংগুলো আমাদের দেশের জংলি মোষের মতো অত ছড়ানো নয়।
মাঝে-মাঝে পিছন দিকে তাকিয়ে দেখছি। ঋজুদা ঠিক আছে কি না। কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। বাঁ হাতটা চোখের উপরে রেখে চোখ আড়াল করে ডান হাতে বন্দুকটার স্মল অব দ্যা বাট ধরে শুয়ে আছে ঋজুদা। খাওয়ার সময় জ্বরটা বেশ বেশি দেখেছিলাম। যে-চরিত্রের লোক ঋজুদা, যতক্ষণ না অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে ততক্ষণ নিজে মুখে একবারও বলবে না যে কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু চোখ দুটো লাল হয়ে গেছে। জ্বর আরো বেড়েছে।
বড় অসহায় লাগছে আমার। আজ সন্ধে অবধি গাড়ি চালানোর পর কাল কতখানি তেল অবশিষ্ট থাকবে জানি না। আর জেরিক্যান নেই। কী হল তা ভুষুণ্ডাই বলতে পারে। যে বেয়ারিং-এ যাচ্ছি তাতে গোরোংগোরো আগ্নেয়গিরি আর সেরোনারার মধ্যের পথটার কাছাকাছি আমাদের পৌঁছে যাওয়ার কথা। এখন কী হবে, কে জানে? ঋজুদাকে তাড়াতাড়ি কোনো হাসপাতালে না নিয়ে যেতে পারলে বাঁচানোই যাবে না। আর কিছুক্ষণ পর থেকেই গ্যাংগ্রিন সেট করবে।
স্টীয়ারিং ধরে সোজা বসে আছি। চোখ বন্ধ হয়ে আসছে ঘুমে। কাল রাতে ঘুম হয়নি সামান্য তন্দ্রা এসেছিল শুধু শেষ রাতে। মারাত্মক ভুল। সেই তাকেই চিরঘুম করে দিতে পারত ভুষুণ্ডা। কী পাজি লোকটা। কে ভেবেছিল ও অমন চরিত্রের মানুষ? কেবলই ভুষুণ্ডার মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠছিল আমার। আর টেডি? হ্যাঁ, টেডির মুখটাও। ওর মুখের উপর এখন অনেক মাটি!
ঘন্টাদুয়েক চলার পর একবার দাঁড়িয়ে পড়ে ঋজুদাকে দেখে নিলাম। চুপ করে শুয়ে আছে। চোখ বন্ধ। কাছে গিয়ে বললাম, কেমন আছ ঋজুদা?
ঋজুদা চোখ খুলে হাসল একটু। বলল, ফাইন।
তারপরই বলল, চল রুদ্র। জোরে চল। থামলি কেন?
আমি দুটো ঘুমের বড়ি খাইয়ে দিলাম ঋজুদাকে। তারপর আবার স্টীয়ারিং-এ বসলাম। ভয়ে আমার তলপেট গুড়গুড় করতে লাগল। ঋজুদা একেবারেই ভাল নেই। নইলে আমাকে জোরে চলার কথা বলত না। পা-টার দিকে আর তাকানো যাচ্ছে না।
কিছুক্ষণ চলার পর ঠক করে একটা আওয়াজ শুনলাম উইন্ডস্ক্রীনের বাইরে। তারপরই ভিতরে। দুটো সেৎসী মাছি ঢুকে পড়েছে। গাড়িটা দাঁড় করিয়ে আমার টুপি দিয়ে ও দুটোকে মারতে যাব ঠিক এমন সময় পিছন থেকে ঋজুদার গলা শুনলাম যেন। যেন আমাকে ডাকছে!
তাড়াতাড়ি গাড়ি থামিয়ে দরজা খুলে দৌড়ে যেতেই ঋজুদা বলল, রুদ্র, রুদ্র, তাড়াতাড়ি আয় বলেই উঠে বসার চেষ্টা করে পড়ে গেল।
আমি পাগলের মতো হয়ে গেলাম। জানোয়ারের সঙ্গে বন্দুক-রাইফেল নিয়ে মোকাবিলা করা যায়। কিন্তু এদের সঙ্গে আমি কী করে লড়ব? রক্তপিশাচ মাছিগুলো। থিকথিক করছে ঋজুদার পায়ে। আর শুঁড় ঢুকিয়ে রক্ত টানছে।
আমাকে একটাই কামড়েছিল ঐ মাছি। যখন হুলটা ঢোকায়, তখন সাংঘাতিক লাগে, তারপর মনে হয়, কেউ সিরিঞ্জ ঢুকিয়ে রক্ত টানছে। কামড়াবার অনেকক্ষণ পর অবধি জায়গাটা জ্বালা করতে থাকে অসম্ভব। একটা মাছি! আর এখানে অগুনতি।
আমি পাগলের মতো করতে লাগলাম। হাত দিয়ে, টুপি দিয়ে যা পারি, তাই দিয়ে। কিন্তু ওরা ঠিকই বলেছিল, সেৎসীদের দশটা জীবন। আমাকেও কামড়াতে শুরু করেছে। মনে হচ্ছে আমিও অজ্ঞান হয়ে যাব। আর ঋজুদার যে কী হচ্ছে তা সে নিজেও হয়তো জানে না।
হঠাৎ আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এল। গাড়ির পিছনের সীটে টেডির বিরাট মাপের ডিসপোজালের ওভারকোটটা পড়েছিল। দৌড়ে গিয়ে ওটা নিয়ে এলাম। তারপর কোমরের বেল্ট থেকে ছুরি দিয়ে চেঁছে ফেলে, টুপি দিয়ে হাওয়া করতে করতে ঋজুদাকে ওভারকোটটা দিয়ে ঢেকে দিলাম পুরো। ঢাকবার সময় লক্ষ করলাম, ঋজুদার চোখ বেয়ে জল গড়াচ্ছে।
বললাম, ঋজুদা, কেমন আছ?
ঋজুদা প্রথমে উত্তর দিল না। তারপর অনেকক্ষণ পর, যেন অনেকদূর থেকে বলল, ফাইন।
তাড়াতাড়ি দুহাত এলোপাতাড়ি ছুঁড়তে ছুঁড়তে আমি স্টীয়ারিংয়ে বসে যত জোরে গাড়ি যেতে পারে তত জোরে অ্যাকসিলারেটরে চাপ দিলাম। ভয় ছিল, ঝাঁকুনিতে ঋজুদা ট্রেলার থেকে পড়ে না যায়। কী ভাবে যে গাড়ি চালাচ্ছি তা আমিই জানি। এত মাছি ঢুকে গেছে। কিন্তু ঐ মাছির এলাকা না পেরোলে আমরা এদের হাতেই মারা পড়ব।
আধ ঘন্টা জোরে গাড়ি চালিয়ে গিয়ে থামলাম। প্রথমে গাড়ির মধ্যে যে কটা মাছি ঢুকে আমাকে আক্রমণ করেছিল তাদের মারলাম। শুধু মারলামই না। এদের কামড়ে এতই যন্ত্রণা হয় যে, সত্যিই এদের মেরে ধড় থেকে মুণ্ডুটা টেনে আলাদা না করলে, মনে হয় প্রতিহিংসা ঠিকমতো নেওয়া হল না। এখন বুঝতে পারছি, কেন এই হাজার-হাজার মাইল ঘাসবন এমন জনমানবশূন্য। এখানকার জংলি জানোয়ারেরা আদিমকাল থেকে এখানে থাকতে থাকতে এই মাছিদের কামড়ে ইমিউন্ হয়ে গেছে। প্রকৃতিই ওদের এমন করে দিয়েছে, নইলে এখানে ওরা থাকত কী করে?
দরজা খুলে নেমে আবার ঋজুদার কাছে গেলাম। বোধহয় জ্ঞান নেই। গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। বারবার ডাকলাম। অনেকক্ষণ পর যেন আমার নাম ধরে সাড়া দিল একবার।
আমি কী করব? এদিকে সন্ধে হয়ে আসছে। এত জ্বরে ঋজুদা বাইরের ঠাণ্ডায় কী করে শোবে?
সেদিনকার মতো ঐখানেই থাকব ঠিক করলাম। এখন যা-কিছু করার, সিদ্ধান্ত নেবার, সব আমাকেই করতে হবে।
ঋজুদার গা থেকে টেডির ওভারকোট সরিয়ে দিলাম। চারটে মাছি তখনও তার নীচে ছিল। রক্ত খেয়ে ফুলে বোলতার মতো হয়ে গেছে প্রায়। সেই চারটেকে মারা কঠিন হল না। নড়বার ক্ষমতা ছিল না ওদের। আমি জ্যান্ত অবস্থাতেই ওদের ধড় থেকে মুণ্ডু আলাদা করলাম।
তারপর হাত ধুয়ে এসে ঋজুদার জন্যে খাবার বানাতে বসলাম। শক্ত কিছু খাওয়ার মতো অবস্থা ছিল না। এদিকে গরম কিছু দেব তারও উপায় নেই। না আছে সঙ্গে স্টোভ, না কোনো জ্বালানি। ট্রেলারের কোণ থেকে একটা প্যাকিং বাক্স বের করে সেটাকে ভেঙে ঘাস পরিষ্কার করে একটু আগুন করলাম। কফির জল চাপিয়ে, তার মধ্যে ক্রীমক্র্যাকার বিস্কুট দিয়ে দিলাম গোটা ছয়েক। সেগুলো গলে গেলে তার মধ্যে এক চামচ কফি দিলাম। দুধ ছিল না। আমার হাভারস্যাকে যে ওষুধ-ব্র্যাণ্ডি ছিল তার চার চামক ঢেলে দিলাম সেই মগে। তারপর ভাল নেড়ে ঋজুদার কাছে গিয়ে তার মাথাটা কোলে নিলাম। ঋজুদা অনেক কষ্টে চোখ খুলল। বললাম, মাছিরা আর নেই। এবারে খেয়ে নাও।
ঋজুদা হাত নেড়ে অনিচ্ছা জানাল।
আমি ছাড়ালাম না। বললাম, খেতেই হবে। জোর করে মগটাকে ঠোঁটের কাছে ধরলাম।
একটু-একটু করে চুমুক দিতে দিতে ঋজুটা পুরোটা চোখ খুলল। খাওয়া শেষ হলে আমি তুলে বসালাম ঋজুদাকে। বললাম, পাইপ খাবে না? তুমি কতক্ষণ পাইপ খাওনি, ঐজন্যেই তো এত খারাপ লাগছে তোমার। যার যা অভ্যেস। আমি ভরে দেব?
ঋজুদা একটু হাসল। তারপর মাথা নাড়ল।
হাভারস্যাকের পকেট থেকে পাইপটা বের করে নতুন তামাকে ভরে দিলাম।
কয়েক টান দিয়েই ঋজুদাকে অনেক স্বাভাবিক দেখাল। হ্যাভারস্যাকে হেলান দিয়ে বসে বলল, পা-টা একটু তুলে দে তো রুদ্র।
তুলে দিলাম। ঋজুদা আমার কাঁধে হাত দিয়ে বলল, জানিস, আমার বন্ধুরা বিয়ে করিনি বলে কত ভয় দেখিয়েছে। বলেছে-
কথা বলতে কষ্ট হচ্ছিল ঋজুদার। তবু টেনে টেনে বলল, বলেছে যে, আমাকে দেখার কেউ নেই। থাকবে না।
তারপর একটু পর বলল, ওরা ভুল। একেবারে ভুল।
দম নিয়ে পাইপের ধোঁয়া ছেড়ে ঋজুদা বলল, রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন যে, আত্মীয়তা দু’রকমের হয়। রক্তসূত্রের আর ব্যবহারিক সূত্রের। প্রথম আত্মীয়তার বাঁধনে কোনো বাহাদুরি নেই, চমক নেই। কেউ রাজার ছেলে, কেউ ভিখিরির মেয়ে। কিন্তু তোর-আমার আত্মীয়তার গর্ব আছে। তুই আমার জঙ্গলের বন্ধু। তুই আমার সেভিয়ার।
একটু দম নিয়ে বলল, বড় ভাল ছেলে রে তুই। বলে, আমার চুল এলোমেলো করে দিল বাঁ হাত দিয়ে।
আমার চোখ জলে ভরে এল। মুখ ঘুরিয়ে নিলাম আমি।
তারপর আমিও খেয়ে নিলাম ঐ কফি আর বিস্কুট। ঋজুদা কথা বলছিল দেখে আমার খুব ভাল লাগছিল। খাওয়ার পর টেডির বড় ওভারকোটটার কোনায় ট্রেলারের ত্রিপলের দড়ি বেঁধে তাঁবুর মতো ঋজুদার মাথার উপরে টাঙিয়ে দিলাম, যাতে ঠাণ্ডা না লাগে রাতে।
পশ্চিমাকাশে শেষ-সূর্যের গোলাপি মাখামাখি হয়ে ছিল। দুটি ম্যারাবুও সারস উড়ে যাচ্ছিল ডানা মেলে। হলুদ-মাথা বড় বড় কতগুলো ফেজেন্ট দৌড়ে যাচ্ছিল সিঙ্গল ফর্মেশানে দূর দিয়ে। আমাদের ডান দিক থেকে সিংহের ডাক ভেসে এল কয়েকবার।
আজও রাত জাগতে হবে। ঋজুদার পাশে ট্রেলারের উপর মাঝে-মাঝে শুয়ে নেব। অন্য সময় গাড়ির চারপাশে পায়চারি করব। ঋজুদার পায়ের এই রক্তের গন্ধ হয়তো অনেক জানোয়ারকে ডেকে আনবে। সকালবেলার শেয়ালগুলোর মতন। বোধহয় শুক্লা অষ্টমী কি নবমী, চাঁদটা ভালই উঠবে সন্ধের পরে।
সূর্য ডুবে যেতেই রাইফেল ও বন্দুকে গুলি ভরে হাতের কাছে ঠিক করে রেখে ঋজুদাকে কম্বল মুড়ে ভাল করে শুইয়ে দিলাম আরো দুটো ঘুমের বড়ি খাইয়ে। আর কিছু দেবার মতো নেই। তার আগে পা-টা আবার ডেটল দিয়ে ধুইয়ে, ওষুধ লাগিয়ে দিলাম।
ঋজুদার এখন যা অবস্থা তাতে প্রয়োজন হলেও বন্দুক রাইফেল কিছুই ছুঁড়তে পারবে না। তাছাড়া একটু আগেই বন্দুক লোড করার সময় প্রথম জানতে পারলাম যে, গুলিও ফুরিয়ে এসেছে। অনেক গুলি তাঁবু থেকে ভুষুণ্ডা এবং তার ওয়াণ্ডারাবো বন্ধুরা নিয়ে গেছিল। তাছাড়া আমরা তো আর শিকারে আসিনি। তাই খুব বেশি গুলি এবারে আনেওনি ঋজুদা।
বন্দুকের গুলি দু’ব্যারেলে দুটো পোরার পর আর চারটে আছে। আমার উইণ্ডচিটারের পকেটে রেখেছি সে কটাকে। আর থার্টি ও সিক্স রাইফেলের ম্যাগাজিনে ও ব্যারেলের দুটো গুলি বাদ দিয়ে আর আছে তিনটি গুলি। ফোর ফিফটি হান্ড্রেড রাইফেলটাকে ভুষুণ্ডা তাঁবু থেকে নিয়ে গেছিল কিন্তু ঋজুদা ওটা তাঁবুতে রেখে যাবার আগে তার লকটা খুলে নিয়ে নিজের হ্যাভারস্যাকে রেখেছিল। খালি স্টক আর ব্যারেল নিয়ে গেলে তো গুলি ছুঁড়তে পারবে না। আর সে কারণেই ঋজুদা এখনও বেঁচে আছে। ভুষুণ্ডার হাতে গাদা-বন্দুক না থেকে যদি ঐ রাইফেল থাকত তবে গুলি লাগার সঙ্গে-সঙ্গে শকেই মরে যেত ঋজুদা।
অন্ধকার হয়ে আসতে আসতে-না-আসতেই চাঁদ উঠল। তারা ফুটল। সিংহগুলোর ডাক ক্রমশ এগিয়ে আসতে লাগল। এখন আর ওরা ডাকছে না, আস্তে-আস্তে এগিয়ে আসছে এদিকে। সবসুদ্ধ গোটা সাতেক আছে। আরও কাছে আসতে দেখলাম দুটো সিংহ, দুটো সিংহী আর তিনটে বাচ্চা। একেবারে ছোট বাচ্চা নয়, মাস চারেকের হবে।
গুলি করলে আক্রমণ করতে পারে। তাছাড়া ওরা বিপদ না ঘটালে গুলি করবই বা কেন? আমি একা। গুলি নেই বেশি। তারপর রাত। তাই রাইফেল না তুলে আমি বড় টর্চ দুটো ওদের দিকে ফেললাম। বণ্ড-এর টর্চ। পাঁচ ব্যাটারির। খুব সুন্দর আলো হয়।
সামনের সিংহী দুটো আলোতে থমকে দাঁড়াল। তারপর টর্চ দুটো নিয়ে আমি নাইরোবি সর্দার যেমন করেছিল গাড়ির বনেটের উপর দাঁড়িয়ে, তেমনি ট্রেলারের উপর দাঁড়িয়ে আলো নিয়ে মশালের মত কাটাকুটি করতে লাগলাম উপরে-নীচে।
সিংহগুলো কিছুক্ষণ গরগরর করে ফিরে গেল। আসলে ওরা ব্যাপারটা কী তাইই বোধহয় দেখতে এসেছিল। কেউ যদি ঘুম ভেঙে উঠে তার বাড়ির উঠোনে একটা মস্ত গাছ হয়েছে দেখতে পায়, তো অবাক হবে না? ওদেরও সেই অবস্থা। নিজেদের আদিগন্ত ঘাসবনে অদ্ভুত এই নতুন চাকা লাগানো জন্তুটা কী তাই বোধ করি ভাল করে দেখতে এসেছিল।
পেঁচা ডাকতে-ডাকতে উড়ে গেল ঘাস-ইঁদুরের খোঁজে। ঘাসের মধ্যে এদিক ওদিক সরসর, শিরশির আওয়াজ শুনতে লাগলাম। রাতের প্রাণীরা সব জেগেছে। সাপ, ইঁদুর, নানারকম পোকা, পেঁচা, খরগোশ। দূর দিয়ে একদল ওয়ার্ট-হগ মাটিতে ধপধপ আওয়াজ করে দৌড়ে চলে গেল। চাঁদের আলো পরিষ্কার হলে দেখা গেল আমাদের সামনে অনেক দূরে মস্ত একটা ওয়াইল্ডবীস্টের দল চরে বেড়াচ্ছে।
বসে থাকতে-থাকতে বোধহয় ঘুমিয়ে পড়ে থাকব। আচমকা ঘুম ভাঙতে, ঘড়িতে দেখি বারোটা বাজে। তার মানে বেশ ভালই ঘুমিয়েছিলাম, রাইফেল-বন্দুক পাশে থেকে। ভুষুণ্ডার লোকেরা এতদূরে পায়ে হেঁটে আমাদের কাছে আসতে পারবে না, কিন্তু জন্তু-জানোয়ার আসতে পারত। ঘুমোনো খুব অন্যায় হয়েছে। শিশির পড়েছে খুব। হলুদ ঘাসের সাভানা-সমুদ্রকে কুয়াশায় চাঁদের আলোয় শিশিরে মিলেমিশে মাঝরাতে কেমন নীলচে-নীলচে দেখাচ্ছে।
আমি ঋজুদার কপালে হাত দিলাম। জ্বর ঝাঁঝাঁ করছে। কাল যদি আমরা রাস্তায় পৌঁছতে না পারি বা কোনো উপায় না হয় তাহলে ঋজুদাকে এখানেই রেখে যেতে হবে। ঋজুদাকে রেখে গেলেও আমি যে যেতে পারব, তারও কোনো স্থিরতা নেই। এই প্রসন্ন অথচ নিষ্ঠুর, তেরো হাজার বর্গমাইল ঘাসের মরুভূমিতে জলের অভাবে খাবারের অভাবে তিল-তিল করে শুকিয়ে মরে যাব। ভুষুণ্ডা। ভুষুণ্ডাই এর জন্যে দায়ী। ওক্কে, ভুষুণ্ডা! দেখা হবে।
আমি ট্রেলার থেকে নেমে আবার একটু আগুন করলাম। ঠাণ্ডায় আমার নাক দিয়ে জল গড়াচ্ছে। কান দুটো আর নাকটা ঠাণ্ডায় এমন হয়ে গেছে যে, মনে হচ্ছে কেউ বুঝি কেটেই নিয়ে গেছে।
আবার কফি বানিয়ে দুটো বিস্কুট গুড়া করে, তাতে ব্র্যাণ্ডি ঢেলে ঋজুদাকে জাগিয়ে তুললাম।
ঋজুদা বলল, কে? গদাধর? ভাল আছিস? চিঠি যা এসেছে, আমাকে দে।
আমি চমকে উঠলাম। ঋজুদা ভুল বকছে নাকি? কলকাতায় তার বিশপ লেফ্রয় রোডের ফ্ল্যাট যে দেখাশোনা করে, সেই বহুদিনের বিশ্বস্ত পুরনো লোক গদাধর। যার জন্যে আমরা বনবিবির বনে গেছিলাম, সে।
আমি বললাম, ঋজুদা! আমি! আমি রুদ্র!
ও। রুদ্র। সেই গানটা শোনাবি একটু।
কোন্ গান ঋজুদা?
সেই গানটা রে। ধন-ধান্যে পুষ্পে ভরা, আমাদের এই বসুন্ধরা, তুই বড় ভাল গাস গানটা।
আমি বললাম, এইটা খেয়ে নাও ঋজুদা। অনেক ঘন্টা হয়ে গেছে আগের বার খাওয়ার পরে।
ঋজুদা প্রতিবাদ না করে খেল। তারপর আমার পিঠে হাত দিয়ে বলল, রুদ্র, তুই আমাকে এখানে ফেলে রেখে যাস না রে। মরেও যদি যাই, তাহলেও দেশে কিন্তু নিয়ে যাস আমাকে। আমাকে কবর দিতে বলিস আমাদের দেশের কোনো সুন্দর জঙ্গলে, আমারই প্রিয় কোনো জায়গায়। তুই তা সবই জানিস।
আমি বললাম, আঃ ঋজুদা! পাইপ খাও। খাবে?
ঋজুদা মাথা নাড়ল। বলল, না, ঘুমোব।
আমি আর-একটা ঘুমের বড়ি দিলাম ঋজুদাকে। কম্বল ভাল করে গুঁজে দিলাম গলায়, ঘাড়ে। নাড়াতে গিয়ে দেখি, ফুলে শক্ত হয়ে গেছে পা-টা। আমার ঘুমটুম সব উবে গেল। জল চড়ানোই ছিল, তাই কফি খেলাম একটু। গা-টা গরম হল।
তারপর অনেকক্ষণ পায়চারি করলাম রাইফেল কাঁধে গাড়ির চারদিকে। কিন্তু হঠাৎ মনে হল, এখন এনার্জি নষ্ট করা ঠিক নয়। কী যে লেখা আছে কপালে ভগবানই জানেন। হয়তো এনার্জির শেষ বিন্দুটুকুও প্রয়োজন হবে ভীষণভাবে।
ঋজুদার পাশে গিয়ে ট্রেলারে বসলাম। চারধারে নীলচে চাঁদের স্বপ্ন-স্বপ্ন আলো হলুদ ঘাসবনে ছড়িয়ে আছে। বসার আগে চারধার ভাল করে দেখে নিলাম। নাঃ, কিছুই নেই কোথাও।
নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। দুঃস্বপ্নের মধ্যে জেগে উঠলাম। আঁ-আ-আ-আ করে এক সাংঘাতিক চিৎকারে। ধড়মড় করে উঠে বসে দেখি আমার প্রায় গায়ের উপরে কটা বিদঘুঁটে জানোয়ার বসে আছে আর ঋজুদার পা কামড়ে ধরেছে আর একটা। আর ট্রেলারের তিন পাশে কম করে আরও আট-দশটা জানোয়ার দাঁত বের করে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
আমার সংবিৎ ফিরতেই বন্দুকটা তুলে নিয়ে, ব্যারেল দিয়ে, যে জানোয়ারটা ঋজুদার পা কামড়ে ধরেছে তাকে ঠেলা মারলাম–পাছে গুলি করলে গুলি ঋজুদারই গায়ে লাগে। ঠেলা মারতেই সে মাথা তুলল–সঙ্গে-সঙ্গে তার মাথার সঙ্গে প্রায় ব্যারেল ঠেকিয়ে গুলি করে দিলাম। হায়নাটা টাল সামলাতে না পেরে পিছন দিকে উলটে ট্রেলারের বাইরে পড়ে গেল। গুলির শব্দে আমার কাছেই যে হায়নাটা ছিল সে চমকে গিয়ে লাফ মারল নীচে। তাকেও গুলি করলাম অন্য ব্যারেলের গুলি দিয়ে। সে-ও পড়ে গেল। কিন্তু কী সাংঘাতিক এই আফ্রিকান হায়নাগুলো, প্রায় বুনো কুকুরেরই মতো, চারধার থেকে লাফিয়ে ট্রেলারে ওঠার চেষ্টা করতে লাগল একের পর এক।
বন্দুকের দু’ব্যারেলেই গুলি শেষ। এবার আমি থার্টি ও সিক্স রাইফেলটা তুলে নিয়ে ট্রেলারের উপর উঠে দাঁড়ালাম, যাতে তিন দিকেই ভাল করে দেখা যায়। ওরা না গেলে ঋজুদার পায়ের দিকে যেতে পারছি না। হায়নার চোয়ালের মতো শক্ত চোয়াল কম জানোয়ারের আছে। হাঙরের মতো তারা হাড় কেটে নিতে পারে কামড়ে। ঋজুদার গোড়ালির একটু উপরে কামড়েছিল হায়নাটা।
হায়নাগুলো লাফাচ্ছে আর ট্রেলারে ওঠবার চেষ্টা করতে গিয়ে ধাক্কা মারছে ট্রেলারে। ট্রেলারটা কেঁপে উঠছে বারবার।
প্রথমে কয়েকবার গুলি বাঁচাবার জন্যে আমি ব্যারেল দিয়েই বাড়ি মারলাম ওদের মুখে, মাথায়। কিন্তু সামলানো যাচ্ছে না। ওরা ক্রমাগত লাফাচ্ছে। ঋজুদার পায়ের রক্তের গন্ধ পেয়ে এসেছে ওরা। একটাকে ঠেকাই তো আর একটা উঠে পড়ে। যখন কিছুতেই ঠেকাতে পারছি না, তখন বাধ্য হয়ে গুলি করতে লাগলাম। থার্টি ও সিক্স-এর বোল্ট খুলি, আর গুলি করি। দেখতে দেখতে ম্যাগাজিন খালি হয়ে গেল। আমার মাথায় খুন চেপে গেছিল। মানুষের সহ্যশক্তির একটা সীমা থাকে। সেই সীমা এরা পার করিয়ে দিয়েছিল। তখনও আরো দুটো হয়না আস্ত ছিল, তাদের বিক্রম তখনও কমেনি। মৃত সঙ্গীদের শরীরের উপর দিয়ে লাফিয়ে উঠতে কী মনে করে, তারা থেমে গিয়ে টাটকা রক্তের গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে নিজেদের সঙ্গীদেরই খেতে শুরু করল। ট্রেলারের চারধারে অনেকগুলো মরা হায়না, হাঁ করে পড়ে আছে। সে-দৃশ্য দেখা যায় না, ওদের গায়ের দুর্গন্ধে ওখানে টেকাও অসম্ভব। আমি এক লাফে ট্রেলার থেকে নেমে দৌড়ে গিয়ে এঞ্জিন স্টার্ট করে গাড়িটাকে আধ মাইলটাক দূরে নিয়ে গেলাম। তারপর দৌড়ে নেমে গেলাম ঋজুদার কাছে।
ঋজুদা, আশ্চর্য, পাইপ খাচ্ছিল।
আমি যেতেই বলল, কানের কাছে যা কালীপুজোর আওয়াজ করলি, তাতে তো ওয়েস্টার্ন ছবির হীরোরাও শুনলে লজ্জা পেত।
ঋজুদা কথা বলছে দেখে খুব খুশি হয়ে আমি বললাম, ধ্যুত। তারপরই বললাম, কতখানি কামড়েছে?
ঋজুদা বলল, মার্করিওক্রোম আর ডেটল লাগা। ব্যাটা মাংসই খুবলাতে গেছিল। ভাগ্যিস চেঁচিয়েছিলাম। বিশেষ সুবিধা করতে পারেনি। তুই না উঠলে আমাকে জ্যান্তই খেত।
আমি বললাম, দেখি পা-টা দাও।
ঋজুদা বলল, একে কম্বল, তার পরে ফ্লানেলের ট্রাউজার, তার নীচে মোজা; ব্যাটা সুবিধা করতে পেরেছে বলে মনে হয় না। টর্চ দিয়ে দ্যাখ তো রুদ্র।
আমি টর্চ দিয়ে দেখে ওষুধ আর ডেটল লাগিয়ে বললাম, কলকাতায় ফিরে তোমার ডান পায়ের জন্যে একটা পুজো দিও।
ঋজুদা হাসল। তারপর আমাকে শুধোল, গুলি কতগুলো আছে?
বললাম, রাইফেলের গুলি তিনটে, বন্দুকের দুটো।
হুঁ। আমার ডান পকেট থেকে পিস্তলটা বের কর তো। এ-যাত্রায় আমার দ্বারা তোর আর কোনো সাহায্যই হবে না। পারলে আমি তো নিজেই গুলি করতে পারতাম হায়নাটাকে। আমি পারলাম না। পারি না…
বলেই থেমে গেল।
আমার ভীষণ কষ্ট হল।
পিস্তলটা লোডেড ছিল। আটটা গুলি আছে এতে। কোমরের বেল্টের সঙ্গে বেঁধে নিলাম আমি। যে-কটা গুলি ছিল, বন্দুক এবং রাইফেলে লোড করে সেফটি ঠিক করে রাখলাম।
বললাম, দেখো, আমি কিন্তু আর একটুও ঘুমোব না। তুমি নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমোও এবারে সকাল অবধি।
ঋজুদা ফিস ফিস করে বলল, তুই তো কম ক্লান্ত নোস। ছেলেমানুষ।
বলেই বলল, সরি, উ আর নট। আই অ্যাপলোজাইজ।
আমি হাসলাম। কাঁধে হাত রেখে বললাম, ঘুমোও ঋজুদা।
