ফাগুয়ারা ভিলা (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ
ছয়
পরদিন সন্ধেবেলা আমি যখন গিয়ে পৌঁছলাম তখনও আর কেউ আসেনি। আমি ছোট মামাবাড়িতে গেছিলাম যোধপুর পার্কেনইলে ভটকাই-এর সঙ্গেই আসতাম।
বল, কী খবর?
খবর আছে। শটগানের গুলি বছরে দু বাক্স তোলেন।
কী কী লটস?
দুনম্বর চার নম্বরই বেশি আর গোটা পাঁচেক এল.জি., এস.এস.জি।
আর রাইফেলের গুলি?
সেটাই একটু অবাক করল। পয়েন্ট টু-টুর গুলি এক হাজার তুলেছেন দেখলাম।
অত গুলি। একার লাইসেন্সে?
অন্য কারও লাইসেন্সেও তুলতে পারেন। জানি না, সেটা লিগালাইজ করে নিয়েছেন বিশ্বাসবাবুরা নিশ্চয়ই। কিন্তু অত গুলি কেন?
পয়েন্ট টু-টু দিয়েই হয়তো মুরগি তিতির বটের প্যাট্রিজ খরগোস ইত্যাদি মারা হয়। তিতির মুরগি মারতে তো অত গুলি লাগতেই পারে না।
আমি বললাম, টার্গেট প্র্যাকটিসের জন্যেও ব্যবহার করা যেতে পারে।
পারে। কিন্তু সেই মার্কসম্যানটি কে? কন্দর্পনারায়ণ নিশ্চয়ই নন।
ঋজুদা বলল।
তা কি বলা যায়? কন্দর্পনারায়ণ হয়তো রাইফেল শুটিং কম্পিটিশনে নাম দেন।
আর ফোর সেভেন্টির গুলি?
ও রাইফেলের গুলি তিন বছর আগে দশ রাউন্ড নেওয়া হয়েছিল।
ও রাইফেল ব্যবহারই হয় না। বাঘ বা হাতি তো রোজ এসে ফাগুয়ারা ভিলার গেটে মাথা ঠোকে না গুলি খাওয়ার জন্যে।
আর কিছু?
হ্যাঁ। সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং খবর হচ্ছে যে থ্রি ফিফটিন রাইফেলের গুলিও তোলা হয়েছে।
রাইফেল কার নামে?
জনাব মুনতাজার আলি সাহেবের।
এই সব গুলি কে তুলেছে দোকান থেকে? লাইসেন্স প্রডিউস করে?
অধিকাংশ সময়েই মুনতাজার। মিস্টার শর্মা একবার তুলেছিলেন, এবং কন্দর্পনারায়ণ নিজেও একবার। গত পাঁচ বছরের হিসেব দেখে বলছি।
হুম্ ম্।
বলল, পাইপটা ভরতে ভরতে।
শেষবারে গুলি কে তুলেছে?
মি, শর্মা।
কবে?
মাস দুয়েক আগে।
থ্রি ফিফটিন এর গুলিও?
না। থ্রি ফিফটিন-এর গুলি তুলেছে একমাত্র মুনতাজারই। তাও গত বছরে।
কত গুলি তুলেছিল?
কুড়িটা।
হ্যাঁ। থ্রি ফিফটিনটা মুনতাজারেরই নামে আছে?
হ্যাঁ। এ. বি. বাবু বলেছেন, দুবছর আগে কন্দর্পনারায়ণ রাইফেলটা ওদের দোকান থেকেই কিনে প্রেজেন্ট করেছেন মুনতাজারকে। লাইসেন্সও হোম ডিপার্টমেন্টে বলে পাইয়ে দিয়েছেন।
আমার আর কিছু বলার নেই।
আমি বললাম।
হ্যাঁ। আমারও নেই। এখন ভাববার সময়। ভাব। সকলে মিলে ভাব।
তুমি কি কোনও ক্ল পেলে? ক্লু পাইনি।
এখনও surmiseএর স্টেজেই আছে। Acid test-এ ট্যাঁকে কি না দেখতে পাইনি।
তারপরই বলল, এই ব্যাপারটা শেষ না করে ফেললে অন্য কোনও কাজে মন লাগাতে পারছি না। চল, রুদ্র, আমরা কালই Scorpion গাড়িটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। কন্দর্পনারায়ণও পরশু গিয়ে পৌঁছচ্ছেন। জিজ্ঞাসাবাদের সুবিধাও হবে।
কাল তিতির আর রুদ্র কি যেতে পারবে? ওদের দুজনেরই তো কি ঘনিষ্ঠ আত্মীয়র বিয়ে আছে বলছিল না।
না যেতে পারলে যাবে না। আমরা তো আর পিকনিক করতে যাচ্ছি না যে না গেলে কিছু মিস করব। ওখানে দু-তিনদিন থাকব তারপর তো ফিরেই আসব। এখানে না ফিরে তো রহস্যর জট পুরো খোলা যাবে না। অনেক loose ends tie up করতে হবে।
হু। আমি বললাম।
কাল কখন বেরোবে?
এখন পথ যা ভাল হয়ে গেছে। দু নম্বর হাওড়া ব্রিজ পেরিয়ে হাইওয়ে ধরে বেরিয়ে যাব।
ব্রেকফাস্ট করে বেরোব পথে কোথাও দুপুরের খাওয়া খেয়ে নেব। রাতে পিতিজ-এর বনবাংলোতে খিচুড়ি।
বলেই বলল, ভাল কথা, হাজারিবাগে কাজমি সাহেবকে ধর তো। বলে দি। এবারে একদিন ওঁর বাড়ি বিরিয়ানি খেতে যেতেই হবে হাজারিবাগ শহরে। তা ছাড়া নাজিম সাহেবের ছেলেরাও আছে। বানাদাগ-এর পথের কবরখানাতে নাজিম সাহেবের কবরে মোমবাতিও দিতে হবে।
তারপর বলল, দোস্তরা কেউই নেই। হাজারিবাগে যেতেই ইচ্ছে করে না আর।
কাজমি সাহেবের সঙ্গে ঋজুদার কথাও শেষ হল আর তিতির ও ভটকাইও প্রায় একই সঙ্গে হাজির হল।
বাবাঃ। কী টাইমিং।
আমি বললাম।
হাতঘড়িতে সাড়ে সাতটাতে তর্জনী দিয়ে দেখিয়ে ভটকাই বলল, ঘড়ি মিলিয়ে নিতে পারিস।
তাই তো দেখছি।
ঋজুদা বলল, উন্নতি হচ্ছে আস্তে আস্তে।
ওরা বসতে বসতে আমি বললাম, মুনতাজার-এর থ্রি ফিফটিন রাইফেল আছে।
আছে?
বলেই, ভটকাই লাফিয়ে উঠল। বলল, আমি বলেছিলাম না!
তিতির বলল, তাতে কিছুই প্রমাণিত হয় না। মুনতাজারই মাচাতে বসে ভীষ্মনারায়ণকে গুলি করেছিল কিনা সে সম্বন্ধে নিশ্চিত হতে হবে। আর যদি করেও থাকে, কী কারণে? হোয়াট ওজ দ্য মোটিভ বাহাইন্ড?
কারেক্ট!
ঋজুদা বলল।
রুদ্র, বন্দুকের দোকানে কী কী তথ্য পেলি ওদের জানা। তারপর ভাব। সকলে মিলে ভাব।
ভটকাই বলল, পণ্ডিচেরির অরোভিল এর কমুনিটি থিংকিং-এর মতো?
ঋজুদা ভটকাই-এর প্রগলভতার জবাব দিল না।
ইতিমধ্যে গদাধরদা এসে বলল, এই যে সোনারা সব এসে গেছ। ভুনি খিচুড়ি তো করিতিচিই কিন্তু তোমাদের খপর যেটি দেবার তা হতিচি বাংলাদেশ থিকি বদরুল মিঞা মস্ত এট্টা ইলিশ পাইট্যেচে প্লেনে কইরে। পাঁচশো টাকা নাকি কেজি। আমাদের টাকায়। ফোনে আমাকে বইলতেছিল। তোমরা সবাই না এসি পড়লে এ মাছ নে আমি কী বিপদেই না পইড়তাম বলো দিকি।
দূর! এক কেজি ইলিশ মাছে স্বাদই হয় না।
ভটকাই বলল, তাচ্ছিল্যের সঙ্গে।
এক কেজি!
গদাধরদা আহত হয়ে বলল, আরে, না, না। প্রায় আড়াই পৌনে-তিন কেজি মাছটা।
আমরা হই হই করে উঠলাম।
তিতির বলল, গত দু বছরে কলকাতার কোনও বাজারেই বড় ইলিশ পাইনি। বাবা তো ইলিশ গত প্রাণ। একটা ঘটনার মতো ঘটনা ঘটালে বটে গদাধরদা তুমি।
আমরা তো খিচুড়ির সঙ্গে ভাজাই খাব। গদাধরদা, বাকি মাছ তুমি তিন ভাগ করে গাদা-পেটি আলাদা করে যাবার সময়ে ওদের দিয়ে দিয়ে। বাড়িতে রান্না করে খাবে যার যেমন রুচি।
ঋজুদা বলল।
এ কী! এ কী! তুমি কী খাবে?
আমরা সমস্বরে বললাম।
ঋজুদা মিথ্যে কথা বলল, ইলিশ মাছ আমার ভাল লাগে না।
ভটকাই তিতিরের দিকে চেয়ে বলল, এইজন্যেই বলে খেয়ে যায়, নিয়ে যায় আরও যায় চেয়ে, কে যায়, কে যায়? বাঙালির মেয়ে।
ঋজুদা আমাদের নতুন প্ল্যানটার কথা বলল ওদের। কাল ব্রেকফাস্টের পরে মাহিন্দ্রর টার্বো ইঞ্জিন-এর Scorpion গাড়ি নিয়ে আমরা ইটখোরি পিতিজ যাচ্ছি। তবে থাকব পিতিজ বনবাংলোতে, ফাগুয়ারা ভিলাতে নয়।
ওরা দুজনে শুনেই প্রায় কেঁদে ফেলল।
তিতির বলল, ঋজুকাকা এ কী চককান্ত।
এবং যথারীতি ভটকাই আমাকে সন্দেহ করল।
বললাম, এই সিদ্ধান্ত ঋজুদা হঠাৎই নিয়েছে। বন্দুকের দোকান থেকে যা তথ্য পাওয়া গেছে তারই ভিত্তিতে যাওয়াটা দরকার।
দু-তিনদিন থেকেই হয়তো ফিরে আসব আমরা। খুব প্রয়োজনে দিন পাঁচ সাত থাকতেও হতে পারে।
ঋজুদা বলল।
তিতির আর ভটকাই আমাকে বলল, বন্দুকের দোকানে কী খবর পেলি বল।
ওই তো। মুনতাজারকে কন্দর্পনারায়ণ থ্রি ফিফটিন রাইফেল কিনে দিয়েছেন। ইন্ডিয়ান অর্ডন্যান্স ফ্যাকট্রির। ফাগুয়ারা ভিলা-তে কেউ রাইফেল প্র্যাকটিস করছে পয়েন্ট টু-টু রাইফেল দিয়ে। তার মানে, সেখানে কোনও মার্কসম্যান আছেন যিনি হয়তো আইপিং করতে পারেন।
বলেই, ঋজুদার মুখের দিকে চেয়ে বললাম, তাই তো?
ঋজুদা বলল, হুঁ।
ভটকাই বলল, তুই একটা মারাত্মক ভুল করছিস। ভীষ্মনারায়ণকে যে গুলি করেছিল সে থ্রি-ফিফটিন দিয়ে গুলি করেছিল, পয়েন্ট টু-টু দিয়ে নয়। গাছের কোটরে তুই-ই তো থ্রি ফিফটিন রাইফেলের এম্পটি সেল পেয়েছিলি কুড়িয়ে। ভুলে গেলি? তারপরেও অন্য রাইফেলের কথা আসে কী করে।
সেটা ঠিক।
আমি বললাম।
তিতির বলল, ওই অঞ্চলে টাট্ট ঘোড়া কার আছে খোঁজ লাগাও গিয়ে। ঘোড়াটাও একটা ফ্যাকটর।
ঋজুদা বলল, হুঁ।
এই যে। খাবার লাইগ্যে দিচি। খেতি খেতি কথা বলবে একন।
আমরা খাওয়ার ঘরে গিয়ে সবাই চেয়ার টেনে বসলাম একে একে।
ফাগুয়ারা ভিলাতে তো বেশি লোক থাকে না। দুজন নেপালি দারোয়ান তারাও অবশ্য রাইফেল বন্দুক চালাতে জানতে পারে। পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট বলতে প্রায় বৃদ্ধ মিশিরজি আর ভটকাই-এর নতুন বন্ধু মি. শর্মা। বাড়ির অন্য কাজের লোকেরা কেউ বন্দুক রাইফেল চালায় এটা ভাবাটা বাড়াবাড়ি।
সবই ভাবতে হবে। ঋজুদা বলল। তারপর বলল, যেখানে দেখিবে ছাই উড়াইয়া দেখো তাই, মিলিলে মিলিতে পারে অমূল্য রতন।
তিতির বলল, হ্যাঁ।
ভটকাইকে খুব উত্তেজিত দেখাচ্ছিল। ঋজুদা বলল, ইলিশের কাটা জিভে বা মাড়িতে ফুটে যাবে। হড়বড় করিস না, টেক ইয়োর ওন টাইম।
ভটকাই লজ্জা পেয়ে খাওয়ার স্পিড কমাল।
ঋজুদা বলল, তুই তৈরি হয়ে থাকিস রুদ্র। তোকে আমি পৌনে নটা নাগাদ তুলে নেব। পরেই বলল, তার চেয়ে তুই এখানেই চলে আয় বরং আটটার মধ্যে একটা ট্যাক্সি নিয়ে। গাড়ি তো তখন পাবি না। এখানেই ব্রেকফাস্ট সেরে এদিক দিয়ে বেরিয়ে যাব। কম ঘোরা হবে। বিশপ লেফ্রয় রোড থেকে আর বিদ্যাসাগর সেতু কতটুকু পথ।
ঠিক আছে।
তবে তোর রাইফেলটা সঙ্গে নিস।
কোনটা?
বিষেণদেওবাবু যেটা তোকে উপহার দিয়েছিলেন। আর দশ রাউন্ড গুলি। আমার এখানে এসে আমার থ্রি ফিফটিন রাইফেলটা, দশ রাউন্ড গুলি এবং : দূরবিনটা নিবি। তোরটাও নিয়ে আসিস। আমার আলমারি থেকে নাইট ভিশান-এর দূরবিনটাও নিয়ে নিস। এখন কৃষ্ণপক্ষ। রাতে ঘুটঘুটি অন্ধকার হবে। প্রয়োজন হতে পারে।
বললাম, ঠিক আছে।
ঋজুদা ওদের দুজনকে উদ্দেশ করেই বলল, তোরা তাহলে কোনও ক্রমেই যেতে পারছিস না।
না ঋজুদা। ইমপসিবল। এমন কাছের মানুষের বিয়ে যে না থাকলেই নয়।
ফুঃ। বিয়ে করার আর সময় পেল না সব।
ভটকাই-এর রাগে আমরা হেসে ফেললাম। বেচ্চারি বর বউ!
ওক্কে। কী আর করা যাবে।
যাওয়াটা পেছানো যেত না, না? কোনওমতেই?
ভটকাই আবার বলল।
না। টাইম ইজ দ্য এসেন্স। সময় অনেকই নষ্ট হয়েছে আর নষ্ট করার সময় নেই।
ঋজুদা বলল।
.
শীতের দিনে গাড়িতে করে দূরে কোথাও যেতে আলাদা আনন্দ। তবে এখন এয়ারকন্ডিশনাড গাড়ি হয়ে গিয়ে শীত-গ্রীষ্ম বোঝার উপায় তো নেই। শীতে গরম গাড়ি আর গরমে ঠান্ডা। এই কৃত্রিম ব্যাপারটা ভাল লাগে না আমার। কিন্তু এও ঠিক যে পথের ধুলো ধোঁয়া আওয়াজ সবেরই হাত থেকেই তো বাঁচা যায়। তবে একটা গাড়ি করেছে বটে মাহিন্দ্র অ্যান্ড মাহিন্দ্র। Scorpion! পৃথিবীর যে কোনও এই শ্রেণীর গাড়িকে টেক্কা দিতে পারে। গাড়ি তো নয়, যেন রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। বনে-জঙ্গলে-পাহাড়-পর্বতে এ গাড়ির জবাব নেই–সকলকে বাঁ পায়ে দশ গোল দিয়ে দেবে।
ঋজুদা বলল, আমরা হাজারিবাগ হয়ে যাব, কারণ, থানাতে আর ফরেস্ট অফিসে একবার করে হয়ে যেতে হবে। কিছু সময় বেশি লাগবে তাতে।
তারপর বলল, তুই-ই চালা, আমি বাঁদিকের কাঁচ নামিয়ে দিয়ে একটু পাইপ খাই। সারা পৃথিবীতে স্মোকিং-এর বিরুদ্ধে যে ধরনের প্রচার চলেছে তাতে বিদেশ তো বটেই এ দেশেই আর কদিন এই আনন্দ থাকবে বলা যায় না।
ক্যানসার তো সত্যিই হচ্ছে।
ছাড় তো! গড়িয়াহাটের বা চৌরঙ্গির মোড়ে দশ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকলে যা ক্ষতি হয় তা দশ বছর স্মোক করার ক্ষতির সমপরিমাণ। আগে পথ-ঘাট-মাঠ সব দূষণমুক্ত করো তারপরে মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতাতে হাত দাও। পটলামামার আশি বছর বয়স–এখনও দিনে পাঁচ প্যাকেট সিগারেট খাচ্ছেন আর দু চামচ চিনি দিয়ে পনেরো কাপ চা। কই তার তত কিছুই হয়নি। না ডায়াবেটিস, না ক্যানসার হার্ট-প্রবলেম। মনের আনন্দটাও তো একটা ব্যাপার না কি? যার হবার তার হবে। অমন পুতু পুতু করে বাঁচার কোনও মানে হয় না। দুস-স-স।
না খাওয়াই ভাল। তুমি অসুস্থ হলে আমাদের কী হবে? অনেকদিন খেলে তো।
আমি বললাম।
আমার কিছু হলে তোমাদের কিছুই হবে না। তোমরা সব আরও তালেবর হবে। আমাকে বিছানাতে ফেলে রেখে নিজেরা অ্যাডভেঞ্চার আর গোয়েন্দাগিরি করবে। যে যতদিন দৌড়াচ্ছে ঠিক আছে। থেমে গেলেই সব সঙ্গীরা তোমাকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাবে। তারাও নিরুপায়। মানুষের ধর্মই হচ্ছে সামনে চলা। পিছন দিকে তাকানো মানেই ফুরিয়ে যাওয়ার আগের স্টেজ। আইদার দ্যু রান ওর ড্রপ আউট। নিজে অন্যদের বোঝা হওয়াটা কখনওই উচিত নয়। আমি অসুস্থ হলে এই সুন্দর পৃথিবীতে বাইরে না বেরিয়ে তোরা আমার বিছানাতে বসে আমাকে প্রবোধ দিবি, আমার সেবা করবি, এত বড় দুর্দৈব ঈশ্বর যেন কখনওই না ঘটান। এই প্রার্থনা করি।
তুমি ঈশ্বর মানো? ঋজুদা?
খুব মানিরে! দুশো ভাগ মানি। ঈশ্বরের দয়া ছিল বলেই তো আজ জীবনে কিছু পেয়েছি। পরিচয়, নাম, যশ, তোদের মতো চেলা-চামুণ্ডা।
চামুণ্ডিও আছে।
তা ঠিক। তার দয়া না থাকলে কিছুই হয় না। পুরুষকার দরকার, খুবই দরকার। কিন্তু শুধুই পুরুষকারে কিছুই পাওয়া যায় না।
তারপর বলল, এসব কথা তোর বয়সে বুঝবি না। অতি-সপ্রতিভ নিরীশ্বরবাদীদের জীবনভর অনেকই শিখতে হয়। যদি শেখার মতো মন তাদের থাকে। এসব বোধ চট করে ভিতরে আসে না। যদি তোর আধার ভাল না হয় তবে ঈশ্বরবোধ যে কী জিনিস তা তুই সারাজীবনেও বুঝতেই পারবি না। সকলের সব কিছু হয় না। যাদের হল, তারা ভাগ্যবান, যাদের হল না তারা অভাগা। বিজ্ঞানের সঙ্গেও ঈশ্বরের কোনও বিরোধ নেই, যাদের দৃষ্টি স্বচ্ছ নয় তারাই ভাবেন যে বিরোধ আছে।
তারপর বলল, তোর সিনহা সাহেবকে মনে আছে?
কোন সিনহা সাহেব?
ছত্রিশগড়ের গর্ভনর। আমরা না তার অতিথি হয়েই ছত্রিশগড়ে গিয়েছিলাম গত বছর। ইন্দ্রাবতী প্রপাতে তিনি আমার সঙ্গে দেখা করতে এলেন মোটরকেড নিয়ে। মনে নেই?
মনে আবার নেই। আমাদের সঙ্গে নাগপুরের প্রদীপ গাঙ্গুলি কাকু, রায়পুরের প্রদীপ মৈত্ৰ কাকুরা সব ছিলেন।
হ্যাঁ। সিনহা সাহেব তো আগে বিহারের আই. জি. পুলিশ ছিলেন। এখনও তার খুব সম্মান বিহার এবং ঝাড়খণ্ডে। ওঁকেই কাল রাতে ফোন করেছিলাম ঝাড়খণ্ডের ডি. জি. পি-কে বলে দিতে। ডি. জি. পি. হাজারিবাগের এস. পি.-কে বলে রাখবেন যাতে আমাদের যা সাহায্য লাগে তা পাওয়া যায় নির্বিঘ্নে।
তুমি কি রহস্যর সমাধান করে ফেলেছ? ঋজুদা।
পাইপের পোড়া টোব্যাকো বাইরে খুঁচিয়ে ফেলতে ফেলতে ঋজুদা বলল, অলমোস্ট। তবে আমি তো আর খুনি বা খুনির মদতকারীদের অ্যারেস্ট করতে পারব না। পুলিশকে সব ব্লু দেব। ভীষ্মনারায়ণের সব ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজনদেরও দেব। তারপর পুলিশ সাক্ষ্যপ্রমাণ জোগাড় করে চার্জ ফ্রেম করবে। এ ব্যাপারে আত্মীয়রা যতটুকু পারেন সাহায্য করবেন পুলিশকে। সেই জন্যেই ইচ্ছা আছে হাজারিবাগ থেকে টুটিলাওয়া সীমারিয়া বাঘড়া মোড় হয়ে চান্দোয়া হয়ে রাঁচি চলে যাব। সেখানে ডি. জি. পি.-র সঙ্গে দেখা করে ও বীরুর সঙ্গে আড্ডা মেরে পরদিন ভোরে বেরিয়ে বিকেলে কলকাতাতে এসে পৌঁছব।
কোথায় উঠবে রাঁচিতে? বি. এন. আর.-এ?
এখন এস. ই. আর.। কিন্তু সে হোটেল আগের মতো আর নেই। আমরা উঠব অশোকাতে। আই. টি. ডি. সি-র হোটেল। হাইকোর্টের কাছেই। নিরিবিলি। এবং ভাল।
