ডেভিলস আইল্যান্ড (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ
ছয়
ঝকঝক করছে রোদ্দুর দিগন্তলীন নীলচে কালো সমুদ্রে আর সুনীল আকাশে। হু হু করে হাওয়া এসে আমাদের চুল এলোমেলো করে দিচ্ছে। আমরা মোটর বোট-এর ছাদে বসে আছি সাদা ডেকচেয়ারে। এখন এগারোটা বাজে প্রায়। আমরা মানে, ঋজুদা আমি আর তিতির। তিতির উড়াল চুলের পাগলামি থামাতে মাথায় একটা সিল্কের লাল-রঙা স্কার্ফ বেঁধেছে। ভটকাই বোটের একেবার সামনে ক্যাপ্টেন ভাদেরা যেখানে স্টিয়ারিং-এর সামনে বসে আছেন সেইখানে গিয়ে জমেছে। এরোপ্লেনের মতো না হলেও সেখানে আধুনিক গাড়ির ড্যাশবোর্ড-এর চেয়ে অনেক চওড়া ড্যাশবোর্ডে নানারঙা আলো জ্বলছে এবং নিভছেও। কমলা, লাল, নীল, সবুজ এবং লাল। কী করে মোটর বোট চলে এবং তাকে চালানো হয় সেই রহস্য জানবার জন্যই সেখানে গেছে ভটকাই। গেছে ভাল কথা কিন্তু আমার মতো ইঞ্জিনিয়ারিং না করলেই হয়। ভাবছিলাম আমি। বড় পিসেমশাই-এর একটি দারুণ ট্যাঁকঘড়ি ছিল। আমার ছেলেবেলাতে তিনি বম্বে থেকে একবার কলকাতাতে যখন এসেছিলেন পুজোর সময়ে তখন সেই দারুণ ঘড়ির মধ্যের যন্ত্রটা কী করে টিক টিক করে তা জানার উদগ্র উৎসাহে সেটাকে কয়লাভাঙা হাতুড়ি দিয়ে ভেঙেছিলাম। তারপরে অবশ্য আমার পিঠও ভেঙেছিল। ভটকাই এর যন্ত্র সম্বন্ধে উৎসাহের পরিণতি আমার মতো করুণ না হলেই হল।
ঋজুদার মাথায় হ্যাট। ঋজুদা সাহেবদের চেয়েও সুন্দর দেখতে আর তার স্মার্টনেসের কোনও তুলনা নেই। একটা ফেডেড জিনস আর হালকা মেরুন রঙা কলারওয়ালা গেঞ্জি পরেছে। দারুণ দেখাচ্ছে। তিতির ফোটো তুলল একটা ওর ক্যামেরা দিয়ে।
আমার ফোটো তুলে ফিল্ম নষ্ট করিস না। ডেভিলস আইল্যান্ডে অনেক কাজে লাগবে। সেখানে ফিল্ম ফুরিয়ে গেলে তো আর পাবি না। জানিস, আমার ভাবতেই ভাল লাগছে যে অনেক দিন পরে সমুদ্রে মাছ ধরতে পারব।
কী করে ধরবে? এই বোটে বসে? এত লম্বা লাইন কি তোমার হুইলে আছে?
আমি বললাম।
লাইন অনেকই লম্বা, মাছকে খেলাতে হবে না? তা ছাড়া এটা কি তোর পুনুদাদার সিঙ্গুরের পুকুর। এ যে সমুদুর রে! এখানের মাছেদের ব্যাপারই আলাদা। তবে ধরব তো ওই জলি-বোটেই বসে। বলেই, হাতের পাইপটা দিয়ে বোটের পেছন দিকে দেখাল। দেখি, সত্যিই তো! এতক্ষণ খেয়াল করিনি একটা ছোট নৌকো, সাদা রঙা, বসে আছে সাদা রাজহাঁসের মতো সেখানে। বোট সমুদ্রে কাপুত’ হলে এই ছোট নৌকোই লাইফ সেভিং বোটের কাজও করবে হয়তো। ভার্সেটাইল বোট।
অতটুকু নৌকোতে? ডুবে যাবে যে!
তিতির চিন্তিত হয়ে বলল।
ডুবব না রে, ডুবব না। তা ছাড়া বেশি গভীরে তো আর যাব না। দ্বীপের আশেপাশেই থাকব এবং বোটেরও কাছাকাছি। ডুবে গেলে তোরা উদ্ধার করবি।
কত বিপদে আর ফেলবে আমাদের তুমি আন্দামানে বেড়াতে এনে। চাং ওয়ান, উ থান্ট, ডেভিলস আইল্যান্ড তার উপরে আবার নৌকাডুবি?
তিতির বলল।
খুব জোরে হেসে উঠল ঋজুদা। এবং সেই হাসির শব্দ মিলিয়ে যাবার আগেই ভটকাই এসে হাজির হল রঙ্গমঞ্চে। নীচ থেকে। এসেই স্ট্রেট তিতিরকে বলল, নটিক্যাল মাইল কাকে বলে বলো তো? জলে বা আকাশে তো ডাঙার মাইল বা কিমি দিয়ে দূরত্ব মাপা হয় না, নটিক্যাল মাইলেই হয়। কিন্তু নটিক্যাল মাইল ব্যাপারটা কী?
তাই? সে তো আমরা জানিই।
তিতির বলল।
আমি বললাম, তুই কি কুইজ-মাস্টার নাকি? তাও যদি অমিতাভ বচ্চনের মতো ক্রোড়পতি করতে পারতিস তো বুঝতাম।
ভটকাই আমাকে পাত্তা না দিয়ে তিতিরকেই বলল, তা তো জানি। এক মাইলে কত মিটার বলো তো?
তিতির বলল, মিটার বলতে পারব না তবে সতেরোশো ষাট গজে এক মাইল যে সেটা জানি। মিটারে কনভার্ট করে নাও।
আর নটিক্যাল মাইলে?
আমরা সকলেই কবুল করলাম যে, জানি না।
ভটকাইকে খুব খুশি দেখাল।
তিতির বলল, তুমি কি ক্যাপ্টেন ভাদেরাকে এইসব জিজ্ঞেস করেছিলে না কি? ভালই!
‘দ্য ডেভিলস আইল্যান্ডে’ আর পৌঁছনো হবে না আমাদের, তার আগেই বোটের ক্যাপ্টেন নিজের প্রাণ বাঁচাতে সমুদ্রে ঝাঁপ দেবেন। প্রথম থেকেই অমন অত্যাচার শুরু করো না। সইয়ে সইয়ে করো। তোমাকে আমরা সইয়ে নিয়েছি নতুন’ মানুষে পারবেন কী করে!
তিতির বলল।
হায়। হায়। যার জন্যে চুরি করি সেই বলে চোর।
ভটকাই বলল।
তারপর বলল, আমি কি একার জন্যে জ্ঞানভাণ্ডার বাড়াচ্ছি নাকি আমার?
ঋজুদা হেসে ফেলল। বলল, ভালই বলেছিস। জ্ঞানভাণ্ডার! শুনেছিস রুদ্র?
শুনছি তো। আর ভাবছি, কী ছিল আর কী হল এ ছেলে?
ভটকাই একপাক নেচেই গেয়ে উঠল।
অস্তি গোদাবরী তীরে বিশাল শাল্মলী তরু, গোদা রে-এ-এ-এ
কোথায় ছিল? কে আনিল? অস্তি গোদা-আ-আ
তিতির বলল, থামো। থামো। ক্যাপ্টেন আর ক্রুরা ভাববেন বোটে ডাকাতই পড়েছে বুঝি।
পরক্ষণেই ভার্সেটাইল ভটকাই প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে বলল, দুপুরের খাওয়াটা জমে যাবে। কিচেন ইনসপেকশান করে এলাম। কুককেও ইন্টারভিউ করে এলাম। ব্রেকফাস্ট তৈরি করছে ইদ্রিস আলি। স্ক্র্যাম্বলড এগস, টোস্ট, কমলালেবু, হর্ষবর্ধনে করে এসেছে কলকাতা থেকে, আর সাউথ ইন্ডিয়ান কফি। আধপেটাই খেতে হবে।
আর দুপুরে?
তিতির বলল।
বলব না। খাটাখাটনি সব আমি করব আর খাবে তোমরা। নিজেরা যাও, খোঁজখবর করো। খাটো, খাটো, উ্য মাস্ট আর্ন ইওর লাঞ্চ।
আমাকে ধমকেই বলল ভটকাই।
ঋজুদা আবার হেসে ফেলল, বলল, আমাদের আসল বিপত্তি দেখছি চাং ওয়ানও নয়, উ থান্টও নয়, এই ভটকাইই।
তিতির হেসে বলল, ঠাকুর, রক্ষা করো।
আমি বললাম, সদ্য শেখা জ্ঞানটা এবারে আমাদের বিতরণ করে দে।
কী?
নটিক্যাল মাইলের রহস্য।
ও হ্যাঁ। Nautical মাইল অথবা কিমি দিয়েই আকাশ বা সমুদ্রর দূরত্ব মাপা হয়। ব্রিটিশরা নটিক্যাল মাইলকে ‘অ্যাডমিরালিটি মাইল’ও বলেন। ব্রিটিশ মতে, এক নটিক্যাল মাইলে ছ হাজার আশি ফিট বা এক হাজার আটশো তেপান্ন, পয়েন্ট দুই মিটার। ইউ এস এ তে উনিশশো ঊনষাটের পয়লা জুলাই থেকে যে নটিক্যাল মাইল মানা হচ্ছে তা হল ছ হাজার ছিয়াত্তর পয়েন্ট এক এক পাঁচ ফিট বা আঠারোশো বাহান্ন মিটার।
আমি জিজ্ঞেস করলাম সমুদ্র আর আকাশের জন্যে দূরত্বর অন্য মাপের প্রয়োজন হল কেন? ডাঙার মাপ কী দোষ করল?
ভটকাই চুপ করে রইল।
তিতির বলল, ঋজুকাকা তুমি কি জানো?
ঋজুদা বলল, ঠিক বলতে পারব না। তবে মনে হয় যে, পৃথিবী তো পুরোপুরি গোল নয়, মানে, যাকে perfect sphere বলা চলে আর কী। তাই বোধহয় সমুদ্র বা আকাশের দূরত্ব মাপতে অন্য পন্থা নিতে হয় এবং মাপের তারতম্যও ঘটে। আমি ঠিক জানি না। তবে আমি শুনেছিলাম যে এক নটিক্যাল মাইল বা নট’ আমাদের ডাঙার মাইলের চেয়ে আটশো মিটার বেশি। ভটকাই ভাল বলতে পারবে।
ঋজুদাও জানে না, এমনও যে অনেক কিছু আছে, তা জেনে অবাক হলাম আমরা সকলেই। আবার আশ্বস্তও হলাম, ঋজুদা সর্বজ্ঞ নয় বলেও। ঋজুদা নিজে অবশ্য সব সময়েই বলে, জ্ঞানের সীমা চিরদিনই ছিল, অজ্ঞতাই চিরদিন সীমাহীন।
ভটকাই বলল, তোমার নারী বালতিওয়ালা এক নম্বরের গুলবাজ।
নারীও নয় বালতিওয়ালাও নয়, নারি বালিয়ালা। কিন্তু গুলবাজ কেন?
কই? আমাদের তো ম্যাপ পাঠাল না।
পাঠায়নি বুঝি? তা পোর্ট ব্লেয়ারে থাকতে থাকতেই মনে করাবি তো! যাকগে, ভাল মনে করেছিস, নীচের কেবিন থেকে আমার ম্যাপটা নিয়ে আয় তো। টেবিলের উপরে রাখা আছে।
ভটকাই ম্যাপটা নিয়ে এলে ডেকচেয়ার থেকে নেমে ডেকের উপরে বাবু হয়ে বসে ম্যাপটা ছড়িয়ে দিয়ে বলল, দ্যাখ এবারে। ভটকাই ম্যাপের কথাটা মনে করিয়ে ভালই করেছে।
তারপর ম্যাপে আঙুল ছুঁইয়ে বলল, এই দ্যাখ, আমরা এখন সমুদ্রের এইখান দিয়ে যাচ্ছি।
এটা কি বঙ্গোপসাগর?
তিতির জিজ্ঞেস করল।
না। বে-আইল্যান্ড হোটেলের সামনে যে সমুদ্র দেখা যায় তা বঙ্গোপসাগর। আমরা কিছুক্ষণ আগে বঙ্গোপসাগর ছেড়ে আন্দামান উপসাগরে এসে পড়েছি। পড়ে, উত্তর পুবে যাচ্ছি। ডেভিলস আইল্যান্ডের দিকে। এবারে দ্যাখ, এই মায়নামার, মানে আগের বার্মা, আর এই হচ্ছে থাইল্যান্ড। আন্দামান উপসাগরের বেশ কাছেই থাইল্যান্ডের টেনাসেরিস অঞ্চল। আর ওই দ্বীপপুঞ্জ থেকে আসে থাই জাহাজ আর ট্রলারগুলো।
তারপর একটু চুপ করে থেকে পাইপে দু’টান মেরে বলল, তোরা মগ দস্যুদের নাম শুনেছিস? মগের মুল্লুক’ বলে কথাই আছে। মগ বাবুর্চিরাও বিখ্যাত পৃথিবীময়।
বর্মীদের, থুরি মায়নামারের মানুষেরই তো আরেক নাম মগ। বাংলাদেশের চাটগাঁওর আর মায়নামারের আরাকানের বাবুর্চিদের হাতের খানা যে না খেয়েছে। তার জীবনই বৃথা।
ভটকাই বলল, ইদ্রিস আলিকে জিজ্ঞেস করব তত তার বাড়ি চাটগাঁয়ে কী না!
ঋজুদা তারপরে বলল, ভাল করে ম্যাপে লক্ষ করে দ্যাখ, মায়নামারের প্রধান নদী ইরাবতীও আমাদের গঙ্গারই মতো অনেক ছোট বড় ব-দ্বীপ সৃষ্টি করে নানা নামে, নানা শাখা-উপশাখাতে বিভক্ত হয়ে সমুদ্রে এসে পড়েছে।
মায়নামার থেকে মাছ ধরা ট্রলার ও জাহাজ যে শুধু আন্দামান উপসাগরে চলে আসে তাই নয়, তারা বঙ্গোপসাগরেও চলে যায়। এই দ্যাখ, উত্তর আন্দামানের এই কোকো দ্বীপ থেকে মায়নামারের প্রেপারিস দ্বীপ খুবই কাছে। গাল্ফ অফ মার্তাবন হয়ে আসে চোরারা। শান্তির সময়ে শুধু মাছ চোরেরাই আসে আর যুদ্ধ লাগলে শত্রুপক্ষ এইসব দেশকে হাত করে তাদের যুদ্ধজাহাজ আর সাবমেরিনও ওই দিক দিয়েই পাঠাবে। এবারে দ্যাখ, আমার নিজের হাতে আঁকা এই ছোট্ট পুটকিটা, যা ছাপা ম্যাপে নেই। এই হচ্ছে ‘ডেভিলস আইল্যান্ড। ডেভিলস আইল্যান্ড থেকে মায়নামার এরং থাইল্যান্ড এই দু’ দেশের থেকে আসা সব জলযানের উপরেই নজর রাখা যায়। শুধু তাই নয়, ডেভিলস আইল্যান্ডে একটা গুহা আছে মস্ত বড়, সেটার এক মুখ সমুদ্রের দিকে, অন্য মুখ ডাঙাতে। আদিম জঙ্গলের গভীরে।
তুমি এমন করে বলছ ঋজুকাকা, যেন তুমি সেখানে গেছো অনেকবার আগে, নিজের চোখেই সব দেখেছ।
তিতির বলল।
নিজের চোখেই দেখেছি, তবে সশরীরে যাইনি। নারি আমাকে ভি ডি ও ফিল্ম দেখিয়েছিল, গতমাসে, যখন কলকাতাতে এসেছিল।
তাই?
আমরা সমস্বরে বললাম অবাক হয়ে।
হ্যাঁ।
ডেভিলস আইল্যান্ড-এর ওই গুহাটার কথা বললে কেন ঋজুদা? ওর বিশেষ কোনও তাৎপর্য আছে কি?
আছে।
তারপর বলল, তোরা কেউ ‘গানস অফ নাভারোন’ ছবিটা দেখেছিলি? গ্রেগরি পেক, অ্যান্থনি কুইন এরা সব ছিলেন যে ছবিতে।
আমি আর তিতির বললাম, একবার নয়, বহুবারই দেখেছি। জার্মানরা গ্রিসের নাভারোনের পাহাড়ের গুহাতে দুটো প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড কামান বসিয়েছিল, যে কামান দুটো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে মিত্রপক্ষের সব জাহাজ ডুবিয়ে দিত ক্রেট-এর সমুদ্রে। ওই জলপথটা যেহেতু প্রধান জলপথ ছিল, মিত্রপক্ষের জাহাজদের ওই পথ দিয়ে না গিয়েও উপায় ছিল না। ওই গুহার মধ্যে কামান দুটো থাকার জন্যে মিত্রপক্ষের উড়োজাহাজও কোনও ক্ষতি করতে পারত না কামান দুটোর।
কেন পারত না?
ভটকাই জিজ্ঞেস করল ঋজুদাকে।
এরোপ্লেনের পক্ষে অসুবিধের কী ছিল।
যদি কোনও পাইলট প্লেন নিয়ে গুহা মুখে ঢুকে পড়তে পারত–জাপানের কামেকাজে’ পাইলটদের, মানে আত্মঘাতী পাইলটদের মতে, তা হলে অবশ্য অন্য কথা ছিল কিন্তু মিত্রশক্তির পাইলটদের মধ্যে অমন দেশপ্রেম বড় একটা দেখা যেত না। তখনকার দিনে তো আর মিসাইলস ছিল না। আজকালকার দিনে গুহার মধ্যে লুকিয়ে রাখা কামানকে এরোপ্লেন থেকে মিসাইল ছুঁড়ে স্তব্ধ করে দেওয়াটা কোনও ব্যাপারই নয়।
তারপরই বলল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে জাপানি সাবমেরিনে করে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এসেছিলেন আন্দামানে, জানিস তোরা? মণিপুরেরই মতো এখানেও, মানে পোর্ট ব্লেয়ারের সেলুলার জেলেও আমাদের তেরঙ্গা পতাকা উড়িয়ে দিয়েছিলেন। এই আন্দামানই সবচেয়ে প্রথমে ভারতবর্ষের মধ্যে স্বাধীন হয়েছিল।
তারপর মণিপুর থেকে নেতাজিকে ফিরে যেতে হয়েছিল বার্মা হয়ে কিন্তু আন্দামানে জাপানি মদতে আই এন এর আধিপত্য বেশ কিছুদিন ছিল। ইন ফ্যাক্ট, ওই ডেভিলস আইল্যান্ডেই জাপানিরা নাভারোনের মতো কামান বসাবার মতলবও করেছিল।
নেতাজি কবে এসেছিলেন এখানে?
আমি জিজ্ঞেস করলাম।
উনিশশো তেতাল্লিশের নভেম্বরের ছ তারিখে জাপান গভর্নমেন্ট প্রভিশনাল গভর্নমেন্ট অফ আজাদ হিন্দকে আন্দামান হস্তান্তরিত করে দেন।
জাপানিরা নিজেরা কবে দখল করেছিলেন আন্দামান?
উনিশশো বেয়াল্লিশের তেইশে মার্চ। ওঁরা দখল নিয়ে রাস্তাঘাট এয়ারপোর্ট, জাহাজঘাটা, এই সব তৈরি করতে লেগে যান কিন্তু নানা কারণে পরে আজাদ হিন্দ ফৌজকেই আন্দামান হস্তান্তরিত করেন। ব্রিটিশরা অবশ্য আবার উনিশশো পঁয়তাল্লিশেই আন্দামান পুনর্দখল করে নেয়, আর সাতচল্লিশে পুরো ভারতই স্বাধীন হয়ে যায়।
ভটকাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল। ঘটনার মতো ঘটনা। সবই ঘটে গেল আমাদের জন্মের কত আগে! সত্যি! আমরা না দেখলাম রাজা-মহারাজা আর জমিদারদের বৈভব, না দেখলাম ব্রিটিশের মহিমা আর অত্যাচার। না জানলাম পরাধীনতার জ্বালা। লাইফটাই বৃথা হল।
ঋজুদা বলল, শুনছিস তোরা? ‘বৈভব’, মহিমা, কী সব শব্দ ব্যবহার করছে ভটকাই আজকাল?
তিতির বলল, তাই তো দেখছি। গোপনে ও খুব জোর সাধনা করছে।
ভটকাই বলল, তাতে দোষের কী?
বলেই বলল, বলল ঋজুদা, থামলে কেন?
ভারতীয় নৌবাহিনীতেও ভবিষ্যতের কথা ভেবে ওই গুহার মধ্যে খুব শক্তিশালী মিসাইল-লঞ্চার বসানো যায় কী না সেই কথা নিয়ে ভাবনাচিন্তা হচ্ছিল বেশ কিছুদিন হল।
তারপরে? আমরা সমস্বরে বললাম।
গত মাসেই আইডিয়াটা ড্রপড হয়েছে।
তবে? চাং ওয়ান আর উ থান্ট এর কী ইন্টারেস্ট রইল তা হলে আর ডেভিলস আইল্যান্ডে?
ইন্টারেস্ট তো নেই কোনও।
আমাদের স্তম্ভিত করে ঋজুদা বলল।
তার মানে?
তিতির বলল।
মানে, চাং ওয়ান আর উ থান্ট বলে কারওকেই আমি চিনি না।
কী বলছ, বুঝতে পারছি না।
ভটকাই একেবারে ভেঙে পড়ে হতাশ গলাতে বলল এবারে।
আমি বললাম, তা হলে চলো ফিরেই যাই। আমাদের জলিবয় দ্বীপ দেখা হল না।
ঋজুদা ধীর স্থির গলাতে বলল, যাবি রে যাবি। আগে ডেভিলস আইল্যান্ডে পৌঁছ, দ্যাখ, পছন্দ হয় কী না! পছন্দ হলে এখানেই হানিমুন করতে আসিস যখন বিয়ে-টিয়ে করবি।
ভটকাই কথা কেড়ে বলল, ওসবের মধ্যে আমি নেই। কিন্তু এলেও থাকব কোথায়? খাব কী?
কেন? তুই তো আগেই বলেছিস ‘ভজনং যত্রতত্র, শয়নং হট্টমন্দিরে’।
তারপর বলল, আমার তো বয়স হচ্ছে। কতদিন আর দেশের আর ভিন দেশের মানুষদের অর্ডার সাপ্লাই করব বল? কোথায় কার গুপ্তধন কে হাতিয়ে নিল, কোথায় কার বহুমূল্য হিরে কে চুরি করল, কোথায় কে কাকে খুন করল, কোথায় মানুষখেকো বাঘ বা গুণ্ডা হাতি মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তুলল তার সব জিম্মাদারি কেন শুধু ঋজু বোসকেই নিতে হবে বারবার? তোরাই বল? নাঃ এবার আমি রিটায়ার করব। আমি দুর্বল হয়ে পড়ছি।
তোমার যেটা দুর্বলতা সেটাই আমাদের বল ঋজুকাকা।
তিতির বলল।
ভটকাই বলল, তোমার বুড়ো হওয়ার সঙ্গে ডেভিলস আইল্যান্ডের কী সম্পর্ক?
এই দ্বীপটা আমি কিনে নেব ভাবছি। মানে, লিজে নেব পঞ্চাশ বছরের। আরও পঞ্চাশ বছর তো বাঁচব না আমি। যত দিন বাঁচি, এই নির্জনেই থাকব। সাধু সন্ন্যাসীরা পাহাড়ে পর্বতে নদীতীরে, মরুভূমিতে গিয়ে একা থাকেন, ঈশ্বর চিন্তা করেন। আমরা ঈশ্বর তো প্রকৃতিই। তাঁর সান্নিধ্যেই বাকি কটা দিন কাটিয়ে দেব। জানিস তো! নির্জনতা কখনও কাররওকে খালি হাতে ফেরায় না। নির্জনতা দু’ হাত ভরে দেয়। সারাজীবন যত কথা বলেছি, সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করব এই সমুদ্রের মধ্যের জনমানবহীন দ্বীপে বাক্যহীন বাস করে। কথা আর বলব না, শুনবই শুধু। গাছেদের কথা, পাহাড়ের কথা, পাখিদের কথা, সমুদ্রের কথা, মাছেদের কথা, তারাদের কথা, চাঁদ-সূর্যের কথা। নৈঃশব্দ্যর মতো শব্দময়তা যে আর কিছুই নেই সে কথা হৃদয়ের অন্তস্থলে অনুভব করব।
ভটকাই অত্যন্ত বিরক্ত গলাতে বলল, ওসব বললেই তো আর হল না। ওড়িশার কালাহান্ডি থেকে চারবার টেলিগ্রাম এসেছে। অরাটাকিরির মানুষখেকো বাঘটাকে মেরে দেবার জন্যে। তুমি অত মানুষকে ফেরাবে?
ফেরাব। আমার নিজেরও তো নিজের উপরে কিছু দাবি আছে। অনেক দৌড়াদৌড়ি ঘোরাঘুরি করেছি পনেরো বছর বয়স থেকে নানা পাহাড়ের জঙ্গলে নদীতে বাদাতে ঘাসবনে, দেশে বিদেশে। এবার আমার নিজস্ব পাহাড়ে জঙ্গলে এই সমুদ্র মার আকাশের মধ্যে থিতু হব।
তারপর একটু চুপ করে থেকে বলল, রবীন্দ্রনাথের সেই কবিতাটা পড়িসনি কি তোরা?
কোন কবিতা?
আমরা সমস্বরে বললাম। ‘বোঝাপড়া’। ‘ক্ষণিকা’তে আছে।
না তো।
তোদের জীবন বৃথা রে পোলাপানগুলান।
বলো না কবিতাটা?
নিজেরে আজ কহ যে,
ভালমন্দ যাহাই আসুক সত্যেরে লও সহজে।
বাঃ। কী সুন্দর।
তিতির বলল। ঋজুদা আবার আবৃত্তি করল:
সব কিছুরই একটা কোথাও করতে হয় রে শেষ
গান থামিলে তাই তো কানে থাকে গানের রেশ
জীবন অস্তে যায় চলি তার রংটি থাকে লেগে
প্রিয়জনের মনের কোণে শরৎসন্ধ্যা মেঘে।
নিজেরে আজ কহ যে,
ভাল মন্দ যাহাই আসুক, সত্যেরে লও সহজে।
