ডেভিলস আইল্যান্ড (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ
তিন
আন্দামানের পোর্ট ব্লেয়ারের বে-আইল্যান্ড রিসর্টে ঋজুদার ঘরে আমরা সবাই ঋজুদার খাটের উপর শুধুই আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের ম্যাপটাকে ছড়িয়ে দিয়ে খাটের তিন পাশে মেঝের কার্পেটে বসে ম্যাপটাকে দেখছিলাম ঋজুদার নির্দেশে। ঋজুদা বসেছিল সমুদ্রমুখী বারান্দা আর ঘরের মধ্যের কাঁচের স্লাইডিং-ডোরের পাশের ইজিচেয়ারে। কাঁচের দরজাটা বন্ধই ছিল। কারণ, ভিতরে এয়ার কন্ডিশনার চলছে। আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে যে কোনও সমুদ্রপারের জায়গারই মতো শীত তেমন একটা পড়ে না। মাসটা ডিসেম্বর হলে কী হয়, বেশ গরম এখনও।
ঋজুদা বলল, আজ আর কাল আরাম করে নাও। পরশু থেকে তো সমুদ্রের মধ্যে মোটর বোটে। থাকা ও খাওয়ার এমন ইলাহি বন্দোবস্ত তো আর থাকবে না বোটে।
ভটকাই বলল, ভজনং যত্র তত্র শয়নং হট্টমন্দিরে।
তিতির হেসে বলল, শব্দটা ভজনং নয় মিস্টার ভটকাই, ভোজনং।
আমি বললাম, বোকার মতো কথা বলিস না ভটকাই। শুনছিস যে মোটর বোটে থাকতে হবে, তার আবার যত্রতত্র কী?
ঋজুদা বলল, এই আরম্ভ হল তোদের চিটপিটানি আর ভাঁড়ামো। ম্যাপটাকে ভাল করে দ্যাখ, বুঝে নে।
তিতির বলল, বুঝব কী ঋজুকাকা। এ যে সবই একইরকম লাগে। আদিগন্ত জলের মধ্যে এই গুঁড়িগুড়িগুলো কী?
ওগুলো সবই দ্বীপ। বড়, মেজো, সেজো, ছোট। সবসুদ্ধ শপাঁচেক দ্বীপ আছে। হয়তো আরও বেশি আছে। ম্যাপে কিন্তু অনেক দ্বীপই নেই। মানে আনচার্টেড দ্বীপও আছে অনেক। এই পাঁচশো চার্টেড দ্বীপের মধ্যে আবার মাত্র ঊনচল্লিশটি দ্বীপে মানুষের বাস আছে।
মাত্র?
অবাক হয়ে বললাম আমি।
ইয়েস। মাত্র।
ঋজুদা বলল।
‘দ্য ডেভিলস আইল্যান্ড’ এই গুঁড়িগুড়িগুলোর মধ্যে কোনটা?
তিতির জিজ্ঞেস করল।
হাঃ।
ঋজুদা পাইপটা মুখ থেকে নামিয়ে হাসি এবং ঠাট্টা মেশানো একটা আওয়াজ করল।
বলল, কোনটা? তা জানলে আর ভাবনা ছিল কী? তা ছাড়া ‘ডেভিলস আইল্যান্ড’ নাম হয়েছে একসময়ে এক বা একাধিক সাংঘাতিক মানুষ সেখানে থাকত বলেই। এখন সম্ভবত সেখানে কেউই থাকে না। আবার থাকতেও বা পারে। তবে এক বা একাধিক, সংখ্যায় সংখ্যাতে তারা যতই হোক, পার্মানেন্টলি কেউ থাকত না কোনওদিনই সেখানে। ওটা ছিল নানা শয়তান জলদস্যুদের ডেরা। তা ছাড়া, একই মানুষ বা একই দল কখনওই নিয়মিত সেখানে থাকত বলেও মনে হয় না। কোনও জায়গার শয়তানেরাই কোথাও থিতু হয় না। মানুষখেকো বাঘ থেকে ডাকাত, সবই। পার্মানেন্টলি থাকলে এখানের হ্যাঁবিটেবল দ্বীপের সংখ্যা ঊনচল্লিশ নয়, চল্লিশটি হত।
তা ঠিক।
তিতির বলল।
এইসব দ্বীপে কারা থাকে ঋজুদা? মানে, ঊনচল্লিশটি দ্বীপে?
মানুষের বাস যেসব দ্বীপে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের সেই সব দ্বীপে ওঙ্গে, আন্দামানি, এবং জারোয়াদের দেখা যাবে। নিকোবরে নিকোবরি শোম্পেনদের দেখা যাবে। দেশ ভাগের পরে পূর্ববঙ্গ থেকে ছিন্নমূল বেশ কিছু বাঙালি উদ্বাস্তুরাও এসে কিছু কিছু দ্বীপে বসবাস শুরু করেছেন।
আবারও বলল, জানিস তো, আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে ভারতীয় লোকসভার একটি মাত্র আসন এবং সেটিতে অনেকই দিন হল এক বাঙালি উদ্বাস্তু ভদ্রলোকই নির্বাচিত হয়ে আসছেন।
কী নাম তাঁর?
তাঁর নাম শ্ৰীমনোরঞ্জন ভক্ত।
তারপরই বলল, জানিস তো? এখানের মানুষেরা তো বটেই, অনেক পাখ-পাখালির মতোই গাছ-গাছালিরাও সব endemic। বলেছি?
বলেছ আগে কিন্তু endemic শব্দের মানে?
ইংরেজিতে পণ্ডিত ভটকাই বলল।
সত্যি কথা বলতে কি আমিও শব্দটির মানে জানতাম না। আমি রুদ্র রায় মনে মনে কবুল করলাম কিন্তু আমার অজ্ঞতা ‘পেকাশ’ করলাম না।
তিতির বলল, endemic মানে, native বুঝলি না?
ঋজুদা বলল, তা ছাড়া, যাদের অন্য কোথাওই আর দ্যাখা যায় না। দ্যাখা তো যায়ই না, জোর করে সেই মানুষদের অন্যত্র নিয়ে গিয়ে তাদের পুনর্বাসন করালে, কী গাছেদের, অন্যত্র নিয়ে গিয়ে লাগালে তারা হাসে না, হয়তো বাঁচেও না।
তাই? আশ্চর্য তো!
চিন্তিতমুখে বলল, ভটকাই।
ঋজুদা বলল, মনে আছে তোদের? আমরা যখন ভারত মহাসাগরে স্যেশেলস দ্বীপপুঞ্জে সেই ফরাসি জলদস্যুদের গুপ্তধনের রহস্যভেদ করতে গেছিলাম তখন আমাদের দেশের কৃষ্ণচূড়ার চেয়েও অনেক বেশি ঝলমলে একরকমের গাছ। দেখেছিলাম, রঙিন ফুলে-ফুলে ছাওয়া…। মনে নেই? কী রে তিতির?
বললাম, ফ্ল্যামবয়ান্ট। তাই না ঋজুদা, তাদের নাম? মনে আছে নিশ্চয়।
ভটকাই বলল, তিতির জানবে কোত্থেকে? সে কি সঙ্গে গেছিল আমাদের। তুমি ওই হাইলি-ডেঞ্জারাস মিশানে খুকিকে তো আর নিয়ে যাওনি।
তিতির হেসে বলল, ‘দু’দিনের সন্ন্যাসী, ভাতকে বলে অন্ন। রুআহাতে যেতে পারলাম আর…তোমাকে দলে এনে রুদ্র সত্যিই খাল কেটে কুমির এনেছে।
ঋজুদা কথা কেটে বলল, ইয়েস! এই ফ্ল্যামবয়ান্ট গাছই এখানের একটি দ্বীপে একজন এনে লাগিয়েছেন ভারত মহাসাগরের স্যেশেলস দ্বীপপুঞ্জ থেকে। শুধু লাগিয়েছেন যে তাই নয়, সে গাছ তরতর করে বড়ও হয়েছে। ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে। গতবারে আমি দেখে গেছি। অথচ আশ্চর্য! ফ্ল্যামবয়ান্ট গাছ স্যেশেলস-এর endemic। আন্দামানে বাঁচবার কথা নয়।
কোন দ্বীপে? ঋজুকাকা?
তিতির জিজ্ঞেস করল।
সেই দ্বীপও ওই ঊনচল্লিশটি দ্বীপের মধ্যে পড়ে না। সেটিও আনচার্টেড। তার নাম দ্য হর্নেটস নেস্ট।
নামটা তো দারুণ।
আমি বললাম।
‘To stir a hornet’s nest!’
ভটকাই বলল।
খাইছে!
তিতির বলল।
আমরা সকলেই হেসে উঠলাম জোরে।
ভটকাই বলল, ইংরেজিটা শেখার চেষ্টা করছি, তাতেও ঠাট্টা! আমি তো আর তোমাদের মতো ইংলিশ-মিডিয়াম স্কুলে পড়িনি।
বেশ করেছিস। ইংরেজি-মিডিয়াম স্কুলে পড়লেই কি লেজ গজায় নাকি?
বরং ফালতু গুমোর বাড়ে।
তিতির বলল।
সেই দ্বীপে যিনি থাকেন তিনি এক দারুণ মানুষ। বুঝলি? মাত্র দু’জন মানুষ থাকেন ‘দ্য হর্নেটস নেস্ট-এ। মাঝে মাঝে একজন আবার চলে আসেন রসস আইল্যান্ডে। কখনও অন্যজন আসেন পোর্ট ব্লেয়ারে।
ঋজুদা বলল।
ভটকাই বলল, আচ্ছা, ঋজুদা সেই ভদ্রলোকের নাম কি মিঃ আহুক বোস? আর তাঁর সঙ্গীর নাম কি গুচ্ছাপ্পা ভীরাপ্পান?
ঋজুদা অবাক হয়ে বলল, তুই কী করে জানলি? আশ্চর্য তো!
আমি আন্দামানের পটভূমিতে লেখা একটি উপন্যাসে পড়েছিলাম ‘দ্য হর্নেটস নেস্ট’-এর কথা। সেখানে পাখির-বাসার ব্যবসা করেন তো ভদ্রলোক? তাইওয়ানে রপ্তানি করার জন্যে, তাই না?
পাখির বাসা? তা দিয়ে কী হয়?
আমি অবাক হয়ে বললাম।
আরে, চিনেরা ভালবেসে খায়।
তিতির বলল, কলকাতার তাজ বেঙ্গলে’ বা ‘মেইনল্যান্ড চায়না’তে বার্ডস-নেস্ট সুপ কি পাওয়া যায়?
ঋজুদা বলল, খেয়াল করিনি। তবে বম্বের তাজমহল হোটেলে পাওয়া যায়, খেয়েছি।
কী পাখির বাসা ওগুলো ঋজুদা?
আমি জিজ্ঞেস করলাম।
সুইফট-লেট পাখি।
ফটিকজল পাখি দেখেছিস?
হ্যাঁ।
তাদেরই ক্ষুদে সংস্করণ। পাখিরা তাদের মুখের লালা দিয়ে বানায় সেই বাসা।
যে বইয়ের কথা তুই বললি ভটকাই, সে বই তো বড়দের বই। আমি জানি। মা আমাকে পড়তে দেননি।
তিতির বলল।
কী বই রে?
ঋজুদা জিজ্ঞেস করল।
সমুদ্র মেখলা।
ভটকাই, টক খেলে মুখ যেমন ভ্যাটকায় তেমন করে বলল।
একটা কথা তিতির। তোর মাকে বলিস যে আমি বলেছি, বই পড়ে কেউই কোনও দিন খারাপ হয়নি।
ঋজুদা বলল।
না, মা তো নিজেই খুব রেলিশ করে পড়লেন বইটি তারপর মাসিকেও পড়তে দিলেন। অবশ্য খারাপ হওয়ার কথা বলেননি, বলেছিলেন, মনের গভীরতা বাড়ার পরে ও-বই পড়তে।
বয়স বাড়লেই কি সব সময়েই মনের গভীরতা বাড়ে? বইটির প্রকাশক কে?
দে’জ পাবলিশিং।
পড়ে দেখতে হবে তো! আহুক বোস আর হর্নেটস নেস্ট নিয়ে কে লিখলেন বই? আর কেমনই বা লিখলেন?
‘দ্য ডেভিলস আইল্যান্ড’ কোনটা?
ম্যাপটা দেখিয়ে, ভটকাই প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে প্রশ্ন করল ঋজুদাকে।
ঋজুদা ইজিচেয়ার ছেড়ে নিজেও মেঝের কার্পেটের উপরে নেমে এল। তারপরে হাঁটু মুড়ে বসে পাঞ্জাবির পকেট থেকে ম-ব্লা কলমটা বের করে সমুদ্রের মধ্যে একটি জায়গার ছোট বড় কয়েকটি বিন্দুকে মাঝখানে রেখে একটি গোল্লা এঁকে দিল। বলল, এই যে ছোট-বড় মিলিয়ে পাঁচ-ছটি দ্বীপ দেখছিস, তারই মধ্যে একটি হল দ্য ডেভিলস আইল্যান্ড। ঠিক কোনটি যে তা আমি নিজেও জানি না।
আমাদের করণীয়টা কী? এই আরামের হোটেল ছেড়ে, এখানে দেখার মতো কত কিছু আছে সে সব কিছু ভাল করে না দেখে, সমুদ্রের মধ্যে মোটর বোটে করে মোচার খোলার মত ভাসতে ভাসতে অজানা দ্বীপের দিকে কী করতে যাব আমরা?
যাব, দেশের কাজে। কিছু তথ্য জোগাড় করে ইন্ডিয়ান নেভিকে দেব আমরা। তাতে তাদের কাজের সুবিধে হবে। তা ছাড়া সকলেই যা করে তা না করাটাই তো ব্যতিক্রমী মানুষদের কাজ। কুণ্ডু স্পেশাল বা অন্য অনেক টুর কোম্পানিই তো পর্যটকদের নিয়ে আসেন আন্দামানে, সেই সব পর্যটক কি ‘দ্য হর্নেটস নেস্ট’ বা ‘দ্য ডেভিলস আইল্যান্ড’ দ্বীপের নাম শুনেছেন, না যাবেন কখনও সেখানে? ইচ্ছে থাকলেও কি যেতে পারবেন?
তা বুঝলাম, কিন্তু দেশের কাজের ব্যাপারটা ঠিক বুঝলাম না।
ভটকাই বলল।
সত্যি! তুমি মাঝে মাঝে কী যে হেঁয়ালি করো না ঋজুকাকা!
এই কাজটি কি খুব বিপজ্জনক? মানে, ‘ডেভিলস আইল্যান্ড’-এ যাওয়াটা?
আমি বললাম এবারে।
ঋজুদা একটু চুপ করে থেকে বলল, এমনিতে বিপদ হওয়ার তো কথা নেই কোনও। তবে চাং ওয়ান যদি বিপদ ঘটাতে চায়, তবে আমরাও তার বিপদ ঘটাব। গায়ে পড়ে আমরা কিছুই করব না। তা ছাড়া আমরা তো কিছু তথ্যই সংগ্রহ করতে যাচ্ছি মাত্র।
চাং ওয়ান মানুষটি কে?
তিতির বলল।
জানবি জানবি, সবই জানতে পারবি সময়ে।
গুপ্তচরবৃত্তি বিপজ্জনক নয় কি?
ভটকাই বলল।
গুপ্তচরবৃত্তি হবে কেন? এই সমুদ্র, এই সব দ্বীপপুঞ্জ আন্দামান উপসাগর, বঙ্গোপসাগর সবই তো আমাদের। মানে ভারতেরই। এখানে বার্মা, থুরি মায়ানমার আর থাইল্যান্ড-এর বেশ কিছু মাছ-চোর আর কাঠ-চোরেরা এসে হামলা তো করেই চলেছে। তা ছাড়া আরও সাংঘাতিক কিছু করতে চলেছে তারা। মানে, চাং ওয়ান অ্যান্ড কোম্পানি। তাদের মদত জোগাতে পারে মেইনল্যান্ড চায়না, বা মায়ানমারের জঙ্গি সরকার। এমনকী পাকিস্তানও। সেই জন্যেই আমাকে এবারে এখানে আসতে বলা।
কে বলল আসতে?
তিতির জিজ্ঞেস করল।
ইন্ডিয়ান নেভির ইন্টেলিজেন্স উয়িং।
ভারতীয় নৌবহর নিজে করতে পারল না কাজটা?
করতে পারত সহজেই। কিন্তু তাঁরা কারওকে বুঝতে দিতে চান না যে তাঁরা নিজেরা এই ষড়যন্ত্রর কথা বুঝতে পেরেছেন। মানে, ওঁরা যে ন্যাকা সেজে রয়েছেন একথা আমাদের শত্রুদের বুঝতে দিতে চান না।
বাংলাদেশিরা আসে না এখানে মাছ চুরি বা কাঠ চুরি করতে?
আসত অবশ্যই। যদি এইসব উপসাগর ও সাগর বাংলাদেশের কাছে হত। তাদের দৌরাত্ম সুন্দরবন অঞ্চলে, বঙ্গোপসাগরের মুখে। তারা অবশ্য ডাকাতিতে পুরোপুরিই সিদ্ধহস্ত। চুরি করে পশ্চিমবঙ্গীয় সুন্দরবনে মাছ মারা, গাছ কাটা, ডাকাতি করা, বাঘ ও হরিণ মারা ইত্যাদি তো তারা নিয়মিতই চালিয়ে যাচ্ছে।
তা আমরা কী করছি?
ভটকাই বলল।
কী আর করব!
আমরা ভারতীয়রা বড় ম্যাদামারা। যারা যে ভাষা বোঝে, তাদের সঙ্গে যে শুধু সে ভাষাতেই কথা বলতে হয়, অন্য ভাষাতে যে তাদের সঙ্গে ভাব বিনিময় করা যায় না, এই সহজ কথাটা আজ অবধিও আমরা বুঝে উঠতে পারলাম না। জানি না, কবে আমাদের চোখ ফুটবে।
ভটকাই বলল, যা বলেছ। আমাদের wave-length হচ্ছে, ‘মেরেছ কলসির কানা তাই বলে কি প্রেম দেব না? আর সেই জন্যেই সকলেই আমাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করছে।
তোমার ওই সাংঘাতিক কিছুটা কী ঋজুদা?
একটু যেন ভয় পাওয়া গলাতেই বলল, তিতির।
ঋজুদা একটুক্ষণ চুপ করে থেকে, হঠাৎ গলা নামিয়ে, প্রায় ফিসফিস করে বলল, দেখে আয় তো ভটকাই, আর ঘরের দরজার বাইরে কেউ আছে কি না?
বলেই বলল, দরজাটা এক ঝটকাতে খুলবি।
ভটকাই উঠে গিয়ে ঋজুদার ঘরের দরজাটা এক ঝটকাতে খুলেই মুখ বাড়িয়ে তাকিয়ে পাঁচ-সাত সেকেন্ড পরেই আবার বন্ধ করে দিল।
ও ভিতরে এলে, ঋজুদা বলল, দেখলি কী?
কেউ একজন দরজার সামনেই ছিল। সম্ভবত আমাদের কথা শুনছিল। হঠাৎ করে দরজা খোলাতে চমকে উঠে তাড়াতাড়ি রিসেপশানের দিকে চলে গেল।
লোকটাকে দেখতে পেলি কি?
হ্যাঁ। পেছন থেকে। এক ঝলক।
কী পোশাকে ছিল?
ফেডেড জিনস আর হলুদ গেঞ্জি।
কোনও বিশেষত্ব নজর করলি?
এক সেকেন্ড ভেবে নিয়ে ভটকাই বলল, হ্যাঁ।
কী?
লোকটা একটু খুঁড়িয়ে হাঁটে।
কোন পায়ে খুঁত?
দাঁড়াও, ভাবি একটু।
তারপরই বলল, ডান পাটা বোধ হয় একটু ছোট, বাঁ পায়ের চেয়ে।
মাথার চুলের ছাঁট কীরকম?
বেন্টিঙ্ক স্ট্রিটের চিনে-জুতোর দোকানের চিনেদের মতো।
হুম।
বলল ঋজুদা। তারপর বলল, গায়ের রং কেমন?
ভটকাই বলল, ইট-চাপা ঘাসের মতো।
তার উপমা শুনে টান টান উত্তেজনার মধ্যেও ঋজুদা সমেত আমরা তিনজনেই হেসে উঠলাম।
চিনে হতে পারে?
ঋজুদা ভটকাইকে শুধোল।
হ্যাঁ। হতে পারে।
ঋজুদা আরেকবার বলল, হুম।
একটু পরে ঋজুদা বলল, কাল সকালে আরও তিনটি ম্যাপ আমাদের জন্যে পাঠিয়ে দেবে পোর্ট-ব্লেয়ারের ন্যাভাল কম্যান্ড থেকে। তবে দেখে মনে হবে, তিনটি বইই বুঝি। সেগুলো তোরা নিজের নিজের কাছে রাখবি, নিজের নিজের সুবিধে মতো দাগ বা চিহ্নও দিয়ে রাখবি। একজনের ম্যাপ অন্যকে দিবি না।
আমি বললাম, ঋজুদা, তোমার সঙ্গে সঙ্গে এ পর্যন্ত দেশে বিদেশে এত জায়গাতে এতরকম বিপজ্জনক অ্যাডভেঞ্চারে গেলাম, কত জায়গার মানুষখেকো বাঘ, গুণ্ডা হাতি শিকার করলাম, গোয়েন্দা শিরোমণি হয়ে কত রহস্য ভেদ করলাম কিন্তু ঠিক এইরকম বিপজ্জনক কোনও মিশান-এ আমরা আগে এসেছি বলে আমার তো মনে পড়ছে না। পুব আফ্রিকার রুআহাতে, কিলালা এবং আন্তর্জাতিক চোরা শিকারিদের সঙ্গে আমাদের রীতিমতো যুদ্ধই লড়তে হয়েছিল কিন্তু এই আন্দামানের ব্যাপারটা একেবারেই অন্যরকম বলে মনে হচ্ছে।
ঋজুদা গম্ভীর হয়েই ছিল। গম্ভীরতর মুখে আমাদের দিকে চেয়ে বলল, তা ঠিক। এখন ভাবছি, একাই যাব পরশু। তোরা এই হোটেলেই থাক, মজা কর, যা যা দ্যাখার জায়গা আছে সব দ্যাখ-ট্যাখ, আমি ফিরে আসব দিন সাতেক পরে।
বললেই হল? আমরা কি….
ভটকাই তিতিরের মুখ থেকে কথা কেড়ে বলল, পোলাপান?
তিতির বলল, নো-ওয়ে। তোমাকে আমরা ছাড়ছি না, তুমিও আমাদের ছাড়ছ না। তবে একটাই অনুযোগ আমাদের। তুমি এবারে আমাদের একেবারে অন্ধকারে রেখে দিয়েছ।
ঋজুদা হাসল অনেকক্ষণ পরে। বলল, তোরা সকলে মিলে প্রার্থনা কর ‘Let there be light.’
তারপরে বলল, যাও, নিজের নিজের ঘরে বিশ্রাম করো গিয়ে। তোমাদের নিয়ে বিকেলে বেরোব সাড়ে চারটেতে। অ্যাকোয়া স্পোর্টস কমপ্লেক্সে’ যাব। সেখানে গিয়ে যার যা খুশি কোরো, সমুদ্রের জলে স্কুটার চালিও, ওয়াটার-স্কি কোরো, স্পিডবোট চালিও, কিন্তু দেখো, দয়া করে সমুদ্রে ডুবে মরো না। লাইফ-জ্যাকেট পরে নেবে সকলেই, সমুদ্রের মধ্যে চিতপটাং হলে যাতে তোমাদের উদ্ধার করা যায়। ওরাই অবশ্য জোর করে পরিয়ে দেবে।
ভটকাই বলল, আমরা কি পাগল? সবে চাং ওয়ান-এর আভাস পেলাম আর এখুনি জলে ডুবে মরব?’ ‘দ্য ডেভিলস আইল্যান্ড’ না দেখেই।
ঋজুদা ভটকাই-এর কথার কোনও জবাব না দিয়ে বলল, ঠিক সাড়ে চারটেতে লবিতে দেখা হবে। যে টাটা সুমোটা আমাদের এয়ারপোর্ট থেকে নিয়ে এসেছিল হোটেলে পরশু দিন সকালে, সেইটাই আসবে। লালরঙা।
ঠিক আছে।
বলে, আমরা তিনজন ঋজুদার ঘর থেকে চলে এলাম।
করিডর-এ বেরিয়ে তিতির বলল, দুপুরবেলাতে আবার বিশ্রাম কি? আমরা কি বুড়ো নাকি? ঋজুদা নিজেই থোরি বিশ্রাম নেবে। চলো সবাই আমার ঘরে।
ভটকাই বলল, চলো।
