ব্রুক স্ট্রিট রহস্য (শার্লক হোমস) – আর্থার কোনান ডয়েল
খাপছাড়া ভাবে আমি যে-স্মৃতিকথা লিখে যাচ্ছি তার কারণ কিন্তু একটাই। সেটা হল আমার বন্ধু শার্লক হোমসের কাজের ধারা আর তার আশ্চর্য বিশ্লেষণ-ক্ষমতার কথা সাধারণ লোককে জানিয়ে দেওয়া। কিন্তু লিখতে বসে বেশ মুশকিলে পড়ে গিয়েছি। যে-ধরনের লেখা লিখতে চাই সে রকমের ঘটনা একটাও পাচ্ছি না। ডায়েরির পাতা ওলটাতে ওলটাতে দু’ ধরনের ‘কেস’ নজরে পড়েছে। এক ধরনের রহস্যের তদন্তে হোমস এমন অসম্ভব বাহাদুরি দেখিয়েছে যা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা শক্ত। এগুলোকে প্রায় অলৌকিক কাণ্ড বলা যায়। তবে এই ঘটনাগুলোর কোনওটাই দম-বন্ধ-করা রহস্যকাহিনী নয়। এমনকী, বেশ চমকদারও কিছু নয়। তাই এই কাহিনীগুলো লিখতে বিশেষ উৎসাহ পাই না। বুঝতে পারি না, এগুলো পড়তে পাঠকদের ভাল লাগবে কিনা। কতকগুলো ঘটনা আবার রোমহর্ষক। এই সব রহস্যের তদন্তের জন্যে হোমসের ডাক পড়েছে। হোমস ফয়সালাও করে দিয়েছে। তবে সমাধান এত সহজেই হয়ে গেছে যে, হোমস তার কেরামতি দেখাবার বিশেষ কোনও সুযোগই পায়নি। আর সেই কারণেই এই জাতীয় রহস্যের সমাধানে হোমসের ‘পার্ট’ খুব একটা বড় কিছু নয়।
‘বোহেমিয়ায় কেলেঙ্কারি’ বলে যে-ঘটনাটার কথা আগে লিখেছি, সেটা এই ধরনেরই ব্যাপার। গ্লোরিয়া স্কট জাহাজের তদন্তটাও এই ধরনের। এ ধরনের রহস্য সমাধানের ঘটনাগুলো আমার মোটেই ভাল লাগে না। আমার ইচ্ছে হোমসের জীবনী লেখা। তাই যে-সব রহস্যের সমাধানে হোমস তার প্রতিভার পুরোদস্তুর পরিচয় দিতে পেরেছে, সেগুলোর দিকেই আমার ঝোঁক বেশি। আমি হোমসের এই অদ্ভুত ক্ষমতার কথা লিখে যেতে চাই। এসব কথা বলবার পরে আজকে যে-ঘটনার কথা লিখব বলে বসেছি সেটা অবশ্য দ্বিতীয় দফার মধ্যেই পড়ে। এই রহস্যের সমাধান করতে হোমসকে বেশি খাটাখাটনি করতে হয়নি বটে, তবে ঘটনাটা খুবই অদ্ভুত। তাই এই ঘটনার কথা না লিখে পারলাম না।
অক্টোবর মাস। আজ সারা দিন ধরে বৃষ্টি হয়েছে আর গুমোট করে রয়েছে। হোমস বলল, “বিচ্ছিরি আবহাওয়া। এখন একটু হাওয়া দিচ্ছে আর বৃষ্টিও ধরেছে দেখছি। ওয়াটসন, লন্ডনের পথেঘাটে খানিক ঘুরে এলে কেমন হয়?”
ঘরে হাত-পা গুটিয়ে বসে থেকে আমারও বিরক্তি ধরে গিয়েছিল। হোমসের কথায় সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলাম। ঘণ্টা তিনেক আমরা ব্রুক স্ট্রিট আর স্ট্র্যান্ড বরাবর ঘুরে বেড়ালাম। অজস্র লোকের মিছিল। প্রত্যেকটি লোকই আলাদা। তাদের বেশবাসের ধরন, হাঁটাচলার কায়দা সবই আলাদা। সব দিক দিয়ে এক অপূর্ব বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। হোমস মাঝে মাঝেই এক এক জনকে ভাল করে দেখে নিয়ে তাদের সম্বন্ধে তার মতামত দিচ্ছিল। সে সব শুনতে আমার বেশ মজা লাগছিল। আর অবাক হচ্ছিলাম হোমসের দেখবার আর অনুমান করবার ক্ষমতা দেখে।
আমরা যখন বেকার স্ট্রিটে ফিরে এলাম তখন রাত দশটা বেজে গেছে। দরজার কাছে এসে দেখি একটা ব্রুহাম দাঁড়িয়ে আছে।
“হুম…ডাক্তারের গাড়ি দেখছি! ভদ্রলোক জি. পি.। পারিবারিক চিকিৎসক বলেই বোধ হচ্ছে। খুব বেশি দিন ডাক্তারি শুরু করেননি। তবে পসার বেশ ভালই জমেছে,” হোমস বলল। “মনে হচ্ছে আমাদের কাছেই এসেছেন। খুব ভাল সময়েই আমরা ফিরে এসেছি।”
হোমসের কায়দাকানুন আমি এখন মোটামুটি রপ্ত করেছি। তাই কী ভাবে হোমস এ কথাগুলো বলল তা আন্দাজ করতে পারলাম। গাড়ির ভেতরের বাতিদান থেকে ঝোলানো একটা বেতের বাক্সে ডাক্তারি জিনিসপত্র। বাতির আলোয় বাক্সের ভেতরটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। একনজরে গাড়ির ভেতরটা দেখে নিয়ে হোমস সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, ওটা ডাক্তারের গাড়ি। আমাদের বসবার ঘরে আলো জ্বলছিল। আলো দেখেই হোমস বুঝে নিয়েছিল যে, গাড়ির মালিক বোধহয় আমাদের কাছেই এসেছেন। হঠাৎ একজন ডাক্তার আমাদের কাছে এলেন কেন? নিজে ডাক্তার বলেই বোধহয় আমার আগ্রহ বেশি হল। কৌতূহলে টগবগ করতে করতে আমি হোমসের পিছু পিছু উঠে এলাম।
আমরা ঘরে পা দিতেই ফায়ারপ্লেসের সামনে থেকে এক ভদ্রলোক চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। খোঁচা খোঁচা দাড়ি গোঁফওলা মুখ শুকিয়ে একেবারে আমসি। ভদ্রলোকের বয়স তেত্রিশ-চৌত্রিশের বেশি হবে না। কিন্তু তাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছিল যে, যে-কোনও কারণেই হোক তাঁর শরীর ভাল নয়। এই বয়সের লোকের যতটা চনমনে থাকা উচিত, ভদ্রলোক মোটেই সে রকম নন। তাঁর চেহারায় একটা ক্লান্তির ছাপ, ভদ্রলোকের হাবভাবও বেশ লাজুক লাজুক। ভদ্রলোকের হাতের আঙুলগুলো এত সুন্দর যে, দেখলেই মনে হয় কোনও চিত্রকরের আঙুল, সার্জেনের আঙুল বলে বোঝা যায় না। ভদ্রলোকের পোশাকও বেশ রুচিসম্পন্ন। কালো ফ্ৰককোট আর গাঢ় রঙের ট্রাউজার্স। টাই রঙিন।
হোমস হেসে হেসে বলল, “গুড ইভনিং ডক্টর। আপনাকে আমাদের জন্যে খুব বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি।”
“ও, আপনি বুঝি আমার কোচোয়ানের সঙ্গে কথা বলছিলেন।”
“না। ওই যে পাশের টেবিলে মোমবাতিটা জ্বলছে, ওটা দেখেই বুঝলাম। আপনি বসুন। আর আমি আপনার কী উপকারে লাগতে পারি, যদি বলেন…”
“আমার নাম ডাঃ পার্সি ট্রেভেলিয়ন,” আগন্তুক বললেন, “আমার ঠিকানা ৪০৩ ব্রুক স্ট্রিট।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “আচ্ছা আপনিই কি সেই নার্ভের অসুখের ওপর বইটা লিখেছেন?”
আমি যে তাঁর বইয়ের কথা জানি এ কথা জেনে ভদ্রলোকের মুখ খুশিতে চকচকে হয়ে উঠল।
“বইটার কথা আজকাল কারও মুখেই শুনি না। তাই আমার ধারণা হয়েছিল, বইটার কথা সকলেই ভুলে গেছে। প্রকাশক বিক্রির যা হিসেব দিয়েছে তা দেখেও আমার ধারণাটা আরও জোরদার হয়েছে,” ভদ্রলোক বললেন, “আপনি কি ডাক্তারি লাইনের লোক?”
“হ্যাঁ। আমি মিলিটারিতে সার্জেন ছিলাম। এখন রিটায়ার করেছি।”
“আমার বরাবরের ঝোঁক নার্ভাস ডিজিজের ওপর। আমার ইচ্ছে ছিল যে পড়াশোনা করে আমি এই ধরনের অসুখের ওপর বিশেষজ্ঞ হব। কিন্তু অনেক সময় মানুষ হাতের কাছে যা পায় সেটাকেই আঁকড়ে ধরে। এখন সেসব কথা থাক। আমি জানি আপনাদের সময়ের দাম আছে। তাই কাজের কথায় আসি। মিঃ হোমস, কিছু দিন ধরে আমার ব্রুক স্ট্রিটের বাসায় অদ্ভুত সব কাণ্ড ঘটছে। আজ রাতে ব্যাপার এমন সাঙ্ঘাতিক হয়েছিল যে, আমার মনে হল আর কালবিলম্ব না করে আপনাকে সব কথা জানানো উচিত। আপনার সাহায্য আর পরামর্শ ছাড়া আমার কোনও গতি নেই।”
শার্লক হোমস একটা চেয়ারে আরাম করে বসে পাইপ ধরাল। “আমার সাহায্য আর পরামর্শ দুই-ই আপনি পাবেন। কোন ঘটনার জন্যে আপনি এত ঘাবড়ে গেছেন সেটা তা হলে খুলে বলুন।”
ডাঃ ট্রেভেলিয়ন বললেন, “দু’-একটা ঘটনা এতই তুচ্ছ যে, সেসব কথা আপনাকে বলতেই আমার লজ্জা হচ্ছে। কিন্তু ব্যাপারটা এতই গোলমেলে আর শেষটায় এমন সাঙ্ঘাতিক আকার নিয়েছে যে, আমার মনে হয় সব কথা আপনাকে খুলে বলাই ভাল। কোন কথাটা দরকারি আর কোনটা অদরকারি সেটা আপনি ঠিক বুঝে নেবেন।
“আমার ছাত্র জীবনের কথা দিয়েই শুরু করি, না হলে সব জিনিসটা হয়তো আপনার কাছে খোলসা হবে না। আমি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম। অহংকার করছি মনে করবেন না, আমার মাস্টারমশাইরা বলতেন যে, আমার যে রকম মেধা তাতে আমার ভবিষ্যৎ খুবই উজ্জ্বল। পাশ করবার পরই আমি কিংস কলেজের হাসপাতালে একটা চাকরি পাই। চাকরির সঙ্গে সঙ্গে গবেষণা আরম্ভ করি। আমার বরাত ভাল বলতে হবে, আমি ক্যাটালেপসির ওপর যে-কাজ করছিলাম তা অনেকেরই নজরে পড়ে। শেষ পর্যন্ত যে-বইটার কথা আপনার বন্ধু একটু আগে বলছিলেন, সেই বইটার জন্যে ব্রুস পিংকারটন প্রাইজ আর মেডেল পাই। সবাই তখন স্বীকার করলেন যে, আমি অল্প সময়ের মধ্যে খুব নাম করব।
“কিন্তু আমার নিজের দিক থেকে একটা মস্ত বাধা ছিল। সেটা হল টাকা। আপনি তো জানেন কোনও চিকিৎসক যদি কোনও বিশেষ রোগের বিশেষজ্ঞ বলে নিজেকে দাঁড় করাতে চান, তাঁকে ক্যাভেন্ডিস স্কোয়ারের কাছাকাছি যে-সব রাস্তা আছে তারই কোনওটাতে চেম্বার খুলতে হয়। এটাও নিশ্চয়ই জানেন যে, ওই এলাকায় জায়গার ভাড়াও অসম্ভব বেশি। শুধু ঘর হলেই হবে না। উপযুক্ত আসবাবপত্র চাই। সাজসরঞ্জাম চাই। একখানা ভাল গাড়ি চাই। এ তো গেল সব বাইরের জোগাড়। এই সব নিয়ে চেম্বার খুললেই যে পসার হুহু করে জমবে তারও কোনও কথা নেই। বেশ কিছু দিন লেগে থাকতে হবে। আর এ সব করতে হলে চাই অনেক টাকা, যা আমার নেই। সুতরাং আমি ঠিক করলাম যে, বছর-দশেক চাকরি করে কিছু টাকা জমিয়ে নিয়ে নিজের চেম্বার খুলব। হঠাৎ একদিন একটা ঘটনা ঘটল। এমন ঘটনা যা আমি কখনও কল্পনাও করতে পারিনি। আর তাতে আমার জীবনের মোড়ই ঘুরে গেল।
“ব্লেসিংটন বলে সম্পূর্ণ অচেনা, অজানা এক ভদ্রলোক একদিন আমার সঙ্গে দেখা করতে এলেন। সেই হল ঘটনার সূত্রপাত। না বলে-কয়ে ব্লেসিংটন একদিন সকালে সোজা আমার ঘরে এসে হাজির।
“‘আপনি কি পার্সি ট্রেভেলিয়ন? ছাত্র হিসেবে আপনার তো খুব নাম ছিল? আচ্ছা কিছু দিন আগে আপনিই তো একটা প্রাইজ পেলেন, তাই না?’ ভদ্রলোক আমাকে জিজ্ঞেস করলেন। আমি কোনও কথা না বলে শুধু মাথা নাড়লাম।
“ভদ্রলোক বললেন, ‘আমার কথার সোজাসুজি উত্তর দেবেন। তাতে আখেরে আপনারই ভাল হবে। আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে যে জীবনে উন্নতি করতে গেলে যে বুদ্ধির দরকার তা আপনার আছে। কিন্তু আপনি কি যথেষ্ট রকম বিবেচক?’
“ভদ্রলোকের চাঁচাছোলা কথা শুনে আমি হেসে ফেললাম।
“বললাম, ‘আমার ধারণা যে আমার বিবেচনা শক্তি আছে।’
“‘আপনার কোনও বদ-অভ্যেস আছে? মানে কোনও রকমের নেশাটেশা করেন কি?’
“আমি একটু রাগ করেই বললাম, ‘এ সব আপনি কী বলছেন?’
“‘নানা, রাগ করবেন না। ঠিক আছে। এ কথাটা তো আমাকে জানতেই হত। এখন কথা হচ্ছে যে, আপনার এত গুণ থাকা সত্ত্বেও আপনি প্র্যাকটিস শুরু করেননি কেন?’
“আমি কোনও উত্তর দিলাম না।
“‘বুঝেছি, বুঝেছি। আর বলতে হবে না। পেটে বিদ্যে যত আছে, পকেটে পয়সা তত নেই,’ ভদ্রলোক বলে ফেললেন। ‘আচ্ছা আমি যদি বুক স্ট্রিটে আপনাকে একটা চেম্বার করিয়ে দিই তো কেমন হয়।’
“আমি অবাক হয়ে ভদ্রলোকের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
“ভদ্রলোক বললেন, ‘চেম্বারটা আপনার নয়, আমার নিজের স্বার্থেই খুলব। সব কথা আপনাকে খুলে বলি। বন্দোবস্তটা যদি আপনার পছন্দ হয় তো বলুন, আমি রাজি আছি। আমি কিছু টাকা ব্যবসায় খাটাতে চাই। টাকাটা আমি আপনার ওপরেই লগ্নি করব।’
“‘কিন্তু আমার ওপরে কেন,’ আমি বললাম।
“‘আমার কাছে এটা একটা ফাটকা খেলা। তবে অন্য ফাটকার চাইতে লোকসানের ঝুঁকিটা কম।’
“‘আমাকে কী করতে হবে?’
“‘সব কথাই আমি আপনাকে বলছি। আমি একটা বাড়ি ভাড়া করব। যা যা আসবাবপত্র বা সাজসরঞ্জাম লাগবে সব জোগাড় করব। লোকজনের মাইনে দেব। অন্যান্য খরচ খরচা সব আমার। আপনাকে যা করতে হবে, সেটা হল চেম্বারে বসে পসার জমানোর চেষ্টা। আপনার হাতখরচা ও অন্যান্য খরচাও আমি দেব। এ সবের বদলে আপনার যা আয় হবে তার তিন ভাগ আমার আর এক ভাগ আপনার।’
“মিঃ হোমস, ব্লেসিংটন এই অদ্ভুত প্রস্তাব নিয়ে আমার কাছে হাজির হল। এরপর সে আমাকে কী বলল, আমি তাকে কী বললাম, বা কী রকম দর কষাকষি চলতে লাগল সে সব কথা বলে আপনার অমূল্য সময় নষ্ট করব না। যাই হোক, অল্প কয়েকদিন পরে আমি ব্রুক স্ট্রিটের বাড়িতে উঠে গেলাম। ব্লেসিংটন যে-প্রস্তাব দিয়েছিলেন তাতেই শেষ পর্যন্ত আমি রাজি হয়ে গেলাম। ব্লেসিংটন আমার এক জন আবাসিক রুগি হিসেবে ওই বাড়িতেই থেকে গেলেন। ভদ্রলোকের ‘হার্ট’ খুব ভাল নয়, তাই সব সময়ে ডাক্তারের চোখে চোখে থাকতে হয়। বাড়ির দোতলায় সবচাইতে ভাল ঘরদুটো ব্লেসিংটন দখল করলেন। একটা তার বসার ঘর। অন্যটা শোবার ঘর। ভদ্রলোকের হালচালও তেমন স্বাভাবিক নয়। কারও সঙ্গে মেলামেশা করেন না। বাড়ির বাইরেও বড় একটা যান না। ভদ্রলোকের আচারব্যবহার হাবভাব সবই কেমন যেন সৃষ্টিছাড়া। তবে একটা বিষয়ে ভদ্রলোক খুব হুঁশিয়ার। প্রতি দিন সন্ধের পর তিনি আমার চেম্বারে আসতেন আর আমার সারা দিনের রোজগারের হিসেব নিতেন। তারপর পাইপয়সা হিসেব করে ওঁর নিজের অংশটা বুঝে নিয়ে সোজা ওপরে চলে যেতেন। ওঁর ঘরে একটা লোহার সিন্দুক আছে। টাকাটা সিন্দুকে পুরে ফেলতেন।
“একটা কথা না বলে থাকতে পারছি না। ব্লেসিংটন আমাকে নিয়ে যে-ফাটকা খেলছিলেন তার জন্যে ওঁকে হাহুতাশ করতে হয়নি কোনও দিন। গোড়া থেকেই আমার পসার জমে গিয়েছিল। কয়েক জন রুগিকে চটপট সারিয়ে তোলার ফলে আর হাসপাতালের কাজে আমার সুনামের খাতিরে খুব অল্প দিনের মধ্যেই আমি প্রথম শ্রেণির ডাক্তারদের একজন হয়ে উঠলাম। আর শেষের দু’ বছর ব্লেসিংটন তো আমার দৌলতে রীতিমতো বড়লোক হয়ে গেলেন।
“মিঃ হোমস, এই হচ্ছে আমার ইতিহাস আর ব্লেসিংটনের সঙ্গে আমার যোগাযোগের কাহিনী। এইবার আপনার কাছে আজ এত রাতে কেন ছুটে এসেছি সেই কথাটাই বলি।
“কয়েক সপ্তাহ আগে একদিন সন্ধেবেলায় মিঃ ব্লেসিংটন খুব উত্তেজিত অবস্থায় এসে হাজির হলেন। তিনি ঘরে পা দিয়েই বললেন যে, ওয়েস্ট এন্ডে কাদের বাড়িতে চুরি হয়ে গেছে। আমার স্পষ্ট মনে আছে যে, চুরির কথা বলতে বলতে তিনি রীতিমতো অস্থির হয়ে উঠেছিলেন। আমার মনে হল যে, তিনি সামান্য একটা ব্যাপারকে নিয়ে বড় বাড়াবাড়ি করছেন। ব্লেসিংটন বললেন যে, যত শিগগির সম্ভব আমাদের বাড়ির জানলা-দরজায় মজবুত খিল আর হুড়কো লাগাতে হবে। এ ঘটনার পর দিন সাতেক ব্লেসিংটন খুব ছটফট করতে লাগলেন। লক্ষ করলাম, থেকে থেকেই তিনি জানলা দিয়ে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছেন। প্রতি দিন সন্ধের পর তিনি খিদে বাড়াবার জন্যে একচক্কর বেড়াতে যেতেন। এই ঘটনার পর উনি বাইরে বার হওয়া বন্ধ করে দিলেন। মিঃ ব্লেসিংটনের হাবভাব দেখে আমার মনে হল যে, যে-কোনও কারণেই হোক তিনি ভীষণ ভয় পেয়ে গেছেন। কীসের জন্যে বা কার জন্যে তিনি এত ভয়ে ভয়ে আছেন সে কথা জিজ্ঞেস করলাম। তাতে তিনি এত রাগারাগি আর অভব্যতা করতে শুরু করে দিলেন যে, আমি আর ওই প্রসঙ্গে কোনও কথা বললাম না। কয়েক দিন কেটে যাবার পরে অবস্থা আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল। ব্লেসিংটন আবার বাড়ির বাইরে যেতে লাগলেন। তারপর হঠাৎ একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে গোলমাল বেধে গেল। ব্লেসিংটন একেবারে ভেঙে পড়েছেন। ওঁকে দেখলে খারাপ লাগে।
“যা ঘটেছে তা বলছি। দু’দিন আগে আমি একটা চিঠি পাই। চিঠিটায় কোনও তারিখ দেওয়া নেই। কোথা থেকে আসছে সে ঠিকানাও দেওয়া নেই। চিঠিটা এখন আপনাদের পড়ে শোনাচ্ছি। চিঠির বয়ান এই রকম: ইংল্যান্ডে বসবাসকারী অভিজাত বংশের এক রুশ ভদ্রলোক ডঃ পার্সি ট্রেভেলিয়নের সঙ্গে ব্যক্তিগত কারণে যোগাযোগ করতে চান। কিছুকাল ধরে ইনি ক্যাটালেপসি রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। আমরা জানতে পেরেছি যে, ডাঃ ট্রেভেলিয়ন এই রোগের একজন বিশেষজ্ঞ। আগামী কাল সন্ধে সওয়া ছ’টা নাগাদ ইনি ডাঃ ট্রেভেলিয়নের চেম্বারে যাবেন। ডাঃ ট্রেভেলিয়ন যদি অনুগ্রহ করে সেই সময় চেম্বারে থাকেন তো বড় ভাল হয়।
“চিঠিটা পেয়ে আমার ভারী আনন্দ হল। আনন্দের কারণ আর কিছু নয়, ক্যাটালেপসি খুব কম লোকের হয়। এটাকে বলা হয় ‘রেয়ার ডিজিজ’। সুতরাং আপনারা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন যে, ওই সময় আমি অবশ্যই আমার চেম্বারে বসে ছিলাম। ঠিক সওয়া ছ’টার সময় আমার লোক রুগিকে চেম্বারে এনে হাজির করল।
ডাঃ ট্রেভেলিয়ন একটু থেমে শুরু করলেন, “রুগিকে দেখে অভিজাত রুশ বংশের লোক বলে বিশ্বাস করা কঠিন। ভদ্রলোকের সঙ্গে যে সহচরটি এসেছিল তার চেহারাটি দেখবার মতো। লোকটির বয়স কম। খুব লম্বা। সুন্দর দেখতে। হাত-পা-বুক-পিঠের গড়ন দেখলে হারকিউলিসের কথা মনে পড়ে। ছোকরাটি বৃদ্ধ লোকটিকে হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে নিয়ে এল। তারপর সযত্নে অসুস্থ লোকটিকে একটা চেয়ারে বসাল।
“আমাকে লক্ষ্য করে সেই ছোকরা বলল, আপনার চেম্বারে ঢুকে পড়েছি বলে মাফ চাইছি।’ ওর কথাটা একটু জড়ানো। বলল, “ইনি আমার বাবা। বাবার শরীর যাতে ভাল থাকে সেটা দেখাই আমার একমাত্র কাজ।’
“ছোকরার কথা শুনে আমার বড় ভাল লাগল। এ রকম পিতৃভক্ত পুত্র আজকাল চট করে দেখা যায় না। তাই বললাম, ‘ঠিক আছে। তা আমি যখন আপনার বাবাকে পরীক্ষা করব তখন আপনি এ ঘরে থাকবেন তো?’
“‘না না,’ প্রায় আর্তনাদ করে ছোকরা বলে উঠল। ঘরে আমি কিছুতেই থাকব না। আমার ভীষণ কষ্ট হয়। আমার সামনে বাবার যদি ক্যাটালেপসির লক্ষণ দেখা যায়, তা হলে আমি নির্ঘাত মারা পড়ব। আমার নার্ভ খুব দুর্বল। আপনি বাবার সঙ্গে কথা বলে ওঁকে পরীক্ষা করুন, আমি ততক্ষণ পাশের ঘরে বসি।’
“ছোকরার কথায় আমি রাজি হয়ে গেলাম। সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তখন আমি আমার রুগিকে নিয়ে পড়লাম। তাঁকে প্রশ্ন করে তাঁর অসুখের সূত্রপাত থেকে যা যা চিকিৎসা হয়েছে সব একে একে জেনে নিয়ে লিখে নিতে লাগলাম। ভদ্রলোককে খুব একটা চালাক-চতুর বলে মনে হল না। আমার প্রশ্নের উত্তরে তিনি যা বললেন, তা-ও কেমন ভাসা ভাসা। ওঁর কথা ভাল বুঝতে পারছিলাম না। এর কারণ হয়তো এই যে, ভদ্রলোক ইংরেজিটা তত ভাল জানেন না। আমি লিখতে লিখতে ওঁর সঙ্গে কথা বলছিলাম। হঠাৎ খেয়াল হল ভদ্রলোক আমার কথার কোনও উত্তর দিচ্ছেন না। আমি মাথা তুলে তাকাতেই দেখি ভদ্রলোক খাড়া হয়ে বসে আমার দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে আছেন। ভদ্রলোকের চোখের পাতা পড়ছে না। তার চোখের চাউনি কেমন বিহ্বল। ভদ্রলোকের মুখের চামড়া টানটান হয়ে মুখোশের মতো দেখাচ্ছিল। বুঝলাম ভদ্রলোকের মধ্যে ক্যাটালেপসির লক্ষণ দেখা দিয়েছে।
“ভদ্রলোককে দেখে প্রথমে আমার কষ্ট আর আশঙ্কা হচ্ছিল। কিন্তু তার পরেই আমি আমার রুগির শরীরের তাপ নাড়ির গতি পরীক্ষা করে লিখে নিলাম। তারপর তার মাংসপেশি কতটা শক্ত হয়ে উঠেছে সেটাও পরীক্ষা করলাম। সঙ্গে সঙ্গে তার অবচেতন প্রক্রিয়া কতটা স্বাভাবিক তাও লক্ষ করলাম। ভদ্রলোককে পরীক্ষা করে আমি এমন কিছু পেলাম না, যা অস্বাভাবিক বলা যায়। এ ধরনের বহু রুগি আমি আগে দেখেছি। আগে এই ধরনের রুগিকে অ্যামিল নাইট্রেট দিয়ে খুব ভাল ফল পেয়েছি। আমার মনে হল যে ভদ্রলোককে ওই ওষুধটা দিয়ে দেখি না কেন। ওষুধটা আমার চেম্বারে ছিল না। ছিল ল্যাবরেটরিতে। ওষুধটা আনতে গেলাম। ওষুধ খুঁজে পেতে একটু দেরি হল। খুব জোর মিনিট-পাঁচেক পরে আমি ফিরে এলাম। ঘরে ফিরে এসে আমার যা অবস্থা হল তা আপনারা কল্পনাও করতে পারবেন না। ঘর খালি। রুগি নেই।
“আমি প্রথমেই পাশের ঘরে ছুটে গেলাম। ভদ্রলোকের ছেলে নেই। হলঘরের দরজাটা ভেজানো, বন্ধ করা নয়। যে-ছেলেটি রুগিদের আমার কাছে ডেকে দেয় সে খুব একটা চালাক-চতুর না। তার ওপর ও এই নতুন কাজ করতে এসেছে। কাজের ধারাটাও বুঝে উঠতে পারেনি। ছেলেটা নীচে থাকে। আমি ঘণ্টা বাজালে ওপরে এসে রুগিকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে যায়। ওকে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম। না, ও কিছু জানে না। ব্যাপারটা কেমন রহস্য বলে মনে হল। খানিক পরে মিঃ ব্লেসিংটন বেড়িয়ে ফিরে এলেন। এই ব্যাপারটার সম্বন্ধে কোনও কথাই আমি ওঁকে বললাম না। সত্যি কথা বলতে কী, আমি ওঁকে ইদানীং এড়িয়ে চলি। খুব দরকার না হলে ওঁর সঙ্গে কথাটথা বলি না।
“আমার ধারণা হয়েছিল যে, রুশ ভদ্রলোকের ব্যাপারটা বোধহয় শেষ হয়ে গেল। ও নিয়ে আমি তাই আর মাথা ঘামাইনি। কিন্তু হঠাৎ বলা-কওয়া নেই ওরা বাপ-ছেলে যখন আমার চেম্বারে আবার এসে হাজির হলেন তখন আমি সত্যি সত্যি অবাক হয়ে গেলাম। এতই অবাক হলাম যে, আপনাদের বলে বোঝাতে পারব না।
“‘গতকাল আপনার চেম্বার থেকে হঠাৎ না বলে কয়ে চলে যাওয়ার জন্যে আপনার কাছে মাফ চাইতে এসেছি,’ আমায় বললেন।
“আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, আপনাদের কাণ্ড দেখে আমি তো অবাক।’
“ভদ্রলোক বললেন, ‘আসল কথাটা কী জানেন, ওই রকম অবস্থার পর আমি যখন সুস্থ হয়ে উঠি আমার মাথাটা তখন কী রকম খালি হয়ে যায়। কিছুই মনে থাকে না। সুস্থ হয়ে দেখলাম যে, আমি অচেনা একটা ঘরে বসে আছি। কোথায় এসেছি, কেন এসেছি কিছুই ভেবে পেলাম না। তাই আস্তে আস্তে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলাম।’
“ভদ্রলোকের ছেলে বললেন, ‘বাবা ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন দেখে আমি ভাবলাম যে, কথাবার্তা সব হয়ে গেছে নিশ্চয়ই। তাই আমিও কাউকে কিছু না বলে চলে গেলাম। আসল কথাটা জানতে পারলাম বাড়ি পৌঁছে।’
“আমি হেসে বললাম, “তাতে খুব একটা ক্ষতি হয়নি। শুধু মাঝখান থেকে আমাকে বেশ চিন্তার মধ্যে পড়তে হয়েছিল। তা হলে চলুন, চেম্বারে যাই। কালকের বাকি কাজটুকু আজ সেরে ফেলি।’
“প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে আমি বৃদ্ধ ভদ্রলোকের সঙ্গে কথাবার্তা বলে ওঁর কী হয়, কী কষ্ট, সব জেনে নিলাম। তারপর প্রেসক্রিপশন লিখে ওঁকে কী কী করতে হবে বুঝিয়ে দিলাম। তারপর ছেলের হাত ধরে ভদ্রলোক চলে গেলেন।
‘আপনাদের আগেই বলেছি যে, সারা দিনের মধ্যে এই সময়েই মিঃ ব্লেসিংটন শরীর চাঙ্গা রাখবার জন্যে একবার বেড়াতে যান। একটু পরেই উনি ফিরে এলেন আর সোজা ওপরে চলে গেলেন। ওপরে যাওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই উনি ছুটতে ছুটতে নেমে এলেন। কাঁপতে কাঁপতে উনি আমার চেম্বারে ঢুকে পড়লেন। মিঃ ব্লেসিংটন এমন সাঙ্ঘাতিক ভয় পেয়েছিলেন যে, আমার মনে হল, উনি হয়তো ভয়ের চোটে পাগলই হয়ে যাবেন।
“‘আমার ঘরে কে ঢুকেছিল?’ উনি জানতে চাইলেন।
“কেউ তো যায়নি,’ আমি বললাম।
“‘মিছে কথা,’ চিৎকার করে উনি বললেন, ‘এসে দেখে যান।’
“উনি প্রচণ্ড ভয় পেয়েছিলেন বলে ওঁর এই ধরনের কথা আমি চুপ করে সয়ে গেলাম। ওঁর সঙ্গে ওপর তলায় ওঁর ঘরে গেলাম। উনি ঘরের মেঝের দিকে দেখালেন। মেঝের পাতলা কার্পেটের ওপর কতকগুলো পায়ের ছাপ।
“আমার দিকে তাকিয়ে উনি চিৎকার করে বললেন, ‘তুমি কি বলতে চাও যে এগুলো সব আমার পায়ের ছাপ?’
“পায়ের ছাপগুলো মিঃ ব্লেসিংটনের পায়ের ছাপের চাইতে বেশ বড়। আর দেখেই বোঝা যায় যে, ছাপগুলো পুরনো নয়, নতুন। আপনাদের খেয়াল আছে নিশ্চয়ই যে, বিকেলের দিকে প্রচণ্ড বৃষ্টি হয়েছিল। রুশ ভদ্রলোক আর ছেলে ছাড়া আর কেউ আসেওনি। বুঝলাম যে, আমি যখন ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বলছিলাম তখন ওঁর ছেলে নিশ্চয়ই মিঃ ব্লেসিংটনের ঘরে ঢুকেছিল। তবে কেন যে সে এ কাজ করেছে তা বুঝতে পারলাম না। ঘরের কোনও জিনিস নড়ানো বা সরানো হয়নি। কোনও জিনিস খোয়াও যায়নি। তবে সে যে ঘরের মধ্যে ঘোরাঘুরি করেছে সে কথা পরিষ্কার।
“যদিও ব্যাপারটা যে-কোনও লোককেই ভাবিয়ে তোলবার পক্ষে যথেষ্ট, তবুও আমার মনে হল যে, মিঃ ব্লেসিংটন ব্যাপারটা নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করছেন। বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না, উনি একটা আরামচেয়ারে বসে কাঁদতে শুরু করলেন। উনি এমন আবোলতাবোল বকতে লাগলেন যে, তা বলবার নয়। শেষকালে ওঁর কথা থেকে বুঝতে পারলাম যে, উনি আপনাকে এই সমস্যা সমাধানের ভার দিতে চান। যদিও ব্যাপারটা খুবই তুচ্ছ এবং এটা নিয়ে আপনার কাছে আসা মানে মশা মারতে কামান দাগা হয়ে যাচ্ছে, তবুও সব দিক ভেবেচিন্তে আমি আপনার কাছে আসাটাই ঠিক বলে মনে করলাম। এখন আপনি যদি আমার সঙ্গে এসে ওঁকে একটু শান্ত করতে পারেন তো ভাল হয়। আমি গাড়ি নিয়েই এসেছি।”
হোমস খুব মন দিয়ে ডাঃ ট্রেভেলিয়নের প্রতিটি কথাই শুনছিল। বুঝতে পারলাম, এই দীর্ঘ কাহিনীর মধ্যে সে নিশ্চয়ই কোনও জটিল রহস্যের সন্ধান পেয়েছে। তাই সে মনে মনে এত উত্তেজিত হয়ে উঠেছে। অবশ্য হোমসকে দেখে তার মনের কথা বোঝবার উপায় নেই। ভাবলেশহীন মুখ। চোখের পাতাগুলো প্রায় বুজে এসেছে। কেবলমাত্র ওর পাইপ থেকে যে রকম ঘন ঘন ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠছিল তাতেই বোঝা যাচ্ছিল যে ডাক্তারের কথা শুনতে শুনতে হোমস ভেতরে ভেতরে কী রকম অস্থির হয়ে উঠেছে। ডাঃ ট্রেভেলিয়ন থামতেই হোমস লাফিয়ে উঠে পড়ল। একটিও কথা না বলে সে আমার টুপিটা আমাকে দিয়ে নিজের টুপিটা টেনে নিয়ে ডাঃ ট্রেভেলিয়নকে সঙ্গে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। মিনিট-পনেরোর মধ্যেই আমরা ডাঃ ট্রেভেলিয়নের ব্রুক স্ট্রিটের বাসায় পৌঁছে গেলাম। ওয়েস্ট এন্ডের বাড়িগুলো যেমন হয় ঠিক তেমনই গোমড়ামুখো ন্যাড়াবোঁচা বাড়ি। অল্পবয়সি একটা চাকর দরজা খুলে দিল। চওড়া কার্পেট-মোড়া সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে লাগলাম।
হঠাৎ সিঁড়ির আলোটা নিবে গেল। হকচকিয়ে গিয়ে আমরা দাঁড়িয়ে পড়লাম। অন্ধকার থেকে কাঁপা কাঁপা গলায় কে যেন বলল, “আমার হাতে পিস্তল আছে। আর এক পা এগোলেই গুলি করব।”
ডাঃ ট্রেভেলিয়ন বিরক্ত হয়ে বললেন, “মিঃ ব্লেসিংটন, আপনি কিন্তু মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছেন।”
“ও ডাক্তার, আপনি। ভদ্রলোকের বলার ধরন দেখে বুঝলাম যে, তিনি স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়লেন। “কিন্তু এ ভদ্রলোকেরা? এঁরা সাচ্চা লোক তো?”
আমরা বুঝতে পারলাম যে, ব্লেসিংটন আমাদের আড়াল থেকে ভাল ভাবে দেখছেন।
খানিকক্ষণ পরে ভদ্রলোক বললেন, “ঠিক আছে। আপনারা ওপরে আসুন। কথায় বলে সাবধানের মার নেই। আশা করি আমার ব্যবহারে আপনারা রাগ করেননি।”
ভদ্রলোক সিঁড়ির গ্যাসের আলোটা জ্বেলে দিলেন। গ্যাসের আলোয় যে-মানুষটিকে দেখলাম তার সবটাই অদ্ভুত। ভদ্রলোকের চোখে-মুখে ভীষণ একটা ভয়ের ছাপ। উনি বেশ মোটা। তবে মনে হল যে, আগে আরও মোটা ছিলেন। শরীরে চামড়া ঝুলে গেছে। মুখের চামড়া বেশি ঝুলে গেছে বলে মুখটা ব্লাড-হাউন্ডের মতো দেখাচ্ছে। মাথার চুল পাতলা হতে শুরু করেছে। ভয়ে চুলগুলো খাড়া খাড়া। ভদ্রলোকের হাতে একটা পিস্তল ছিল। আমরা এগোতেই পিস্তলটা উনি পকেটে পুরে ফেললেন।
“গুড ইভনিং, মিঃ হোমস,” ভদ্রলোক বললেন, “আপনি এসেছেন বলে আমি যে কী আরাম পেয়েছি তা বলে বোঝাতে পারব না। আপনার সাহায্য ছাড়া আমার চলবে না। আমার ঘরে যে বাইরের লোক ঢুকেছিল, সে কথা ডাঃ ট্রেভেলিয়ন নিশ্চয়ই আপনাকে বলেছেন।”
“হ্যাঁ, তা শুনেছি,” হোমস বলল। “ওই লোকদুটি কে মিঃ ব্লেসিংটন? আর কেনই বা ওরা আপনাকে এ ভাবে উৎপীড়ন করছে?”
মিঃ ব্লেসিংটন ঘাবড়ে গিয়ে আমতা আমতা করে বললেন, “সেটা বলা শক্ত। আর তা ছাড়া আপনার এ কথার আমি কী উত্তর দেব বলুন তো, মিঃ হোমস।”
“আপনি বলছেন যে ওদের আপনি চেনেন না।”
“অনুগ্রহ করে আপনারা এ দিকে আসুন। এই যে, এই ঘরে।”
ভদ্রলোক আমাদের তার শোবার ঘরে নিয়ে গেলেন। ঘরটা বেশ বড় আর সুন্দর ভাবে সাজানো গোছানো।
“ওটা দেখছেন?” খাটের একধারে রাখা একটা বড় কালো বাক্স ভদ্রলোক আঙুল তুলে আমাদের দেখালেন। “আমি খুব বড়লোক নই, মিঃ হোমস। জীবনে আমি ডাঃ ট্রেভেলিয়নকে সাহায্য করা ছাড়া কোনও ফাটকাও খেলিনি। আমার কথা সত্যি কিনা তা ডাঃ ট্রেভেলিয়নকে জিজ্ঞেস করলেই জানতে পারবেন। কিন্তু আমি ব্যাঙ্কওলাদের বিশ্বাস করি না। আমি ব্যাঙ্কওলাদের ছায়া পর্যন্ত মাড়াই না। আপনাকে বিশ্বাস করে কথাটা বলছি, আমার যা সামান্য টাকাকড়ি আছে তা সবই ওই বাক্সের মধ্যে রাখা। তা হলে বুঝতেই পারছেন যে, আমার অনুপস্থিতিতে অচেনা কোনও লোক ঘরে ঢুকেছে জানতে পারলে আমার মনের অবস্থা কী হয়!”
হোমস মিঃ ব্লেসিংটনের দিকে তাকিয়ে থেকে মাথা নাড়ল। তারপর বলল, “মিঃ ব্লেসিংটন, আপনি যদি সত্যি কথা না বলেন তো আমার পক্ষে আপনাকে সাহায্য করা সম্ভব নয়।”
“কিন্তু আমি তো আপনাকে সব কথাই বলেছি।”
মুখটা অত্যন্ত ব্যাজার করে হোমস ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম করল। “গুড নাইট, ডাঃ ট্রেভেলিয়ন,” হোমস বলল।
কাতর ভাবে ব্লেসিংটন বললেন, “আপনি আমাকে কী করতে বলছেন?”
“আপনাকে একটি উপদেশ দিই। সত্যি কথা বলতে শিখুন।”
আর কোনও কথা না বলে হোমস বেরিয়ে এল। পেছনে পেছনে আমিও। রাস্তায় বেরিয়েও হোমস কোনও কথা বলল না। চুপচাপ হাঁটতে হাঁটতে আমরা বাড়ির দিকে এগোলাম। অক্সফোর্ড স্ট্রিট পার হয়ে যখন হার্লে স্ট্রিটের অর্ধেক রাস্তা পেরিয়ে এসেছি তখন হোমস মুখ খুলল।
“অযথা তোমার খানিকটা হয়রানি হল, ওয়াটসন। তবে ব্যাপারটা বেশ ঘোরালো।”
আমি বললাম, “আমি কিন্তু মাথামুন্ডু কিছুই বুঝতে পারিনি।”
“দেখো, বোঝাই যাচ্ছে যে এ সবের মূলে আছে দুটি লোক। আরও বেশি লোকও থাকতে পারে। তবে দু’টি লোকই প্রধান, যে-কোনও কারণেই হোক এরা মিঃ ব্লেসিংটনের পেছনে লেগেছে। আমি হলপ করে বলতে পারি যে, দু’ দিনই ওই ছোকরাটি মিঃ ব্লেসিংটনের ঘরে ঢুকেছিল। আর ওর সঙ্গী কৌশলে ডাক্তারকে চেম্বারে আটকে রেখেছিল।”
“তা হলে ক্যাটালেপসির ব্যাপারটা?”
“অভিনয়, ওয়াটসন, অভিনয়। অবশ্য ডাঃ ট্রেভেলিয়নের সামনে কথাটা বলতে আমার খারাপ লাগত। এই অসুখের লক্ষণগুলো এমন যে নকল করা মোটেই শক্ত নয়। আমি নিজেই বহু বার ক্যাটালেপটিকের অভিনয় করেছি।”
“তারপর কী হল?”
“ঘটনাচক্রে দু’দিনই মিঃ ব্লেসিংটন বাড়িতে ছিলেন না। ওরা ট্রেভেলিয়নের কাছে আসবার এমন একটা সময় বেছে নিয়েছিল যে-সময় চেম্বারে রুগি বিশেষ থাকে না। আর ওই সময় ব্লেসিংটনও বেড়াতে যান। এর থেকে বোঝা যাচ্ছে যে ওরা ব্লেসিংটনের সম্বন্ধে খুব বেশি খবরাখবর রাখে। ওরা যদি ডাকাতির মতলবে আসত তা হলে ওরা ঘরের জিনিসগুলো উলটেপালটে দেখত। তা ছাড়া মানুষ যখন প্রাণভয়ে ভীত হয় তখন তার চোখের দৃষ্টি পালটে যায়। সে দৃষ্টি আমি চিনি ওয়াটসন। দু’জন লোক ব্লেসিংটনকে খুন করবার জন্যে হন্যে হয়ে ঘুরছে, ব্লেসিংটন বলছেন তিনি কিছুই জানেন না। এটা কি একটা বিশ্বাস করার মতো কথা হল? আমার দৃঢ় বিশ্বাস এই লোকদু’টিকে ব্লেসিংটন চেনেন। আর সে কথা যে তিনি গোপন করছেন তার পেছনেও ওঁর উদ্দেশ্য আছে। দেখা যাক কাল সকালে ব্লেসিংটন হয়তো মত বদলাতে পারেন। তখন সব কথা তার কাছ থেকে জানা যাবে।
আমি বললাম, “অবশ্য ওপর ওপর দেখলে ব্যাপারটা যে অসম্ভব এবং অবাস্তব মনে হতে পারে সে কথা মানছি। তবুও ধরো এমন কী হওয়া একেবারেই অসম্ভব যে, ওই রুগি আর ছেলের ব্যাপারটা ডঃ ট্রেভেলিয়নের নিজের কল্পনা। ডাঃ ট্রেভেলিয়নই মিঃ ব্লেসিংটনের ঘরে গিয়েছিলেন।
“বন্ধু হে, এ কথা আমার প্রথমেই মনে হয়েছিল। কিন্তু গোড়াতেই আমি এমন প্রমাণ পেলাম যার থেকে বুঝলাম যে, ডাক্তার সত্যি কথাই বলছে। সেই অল্পবয়সি ছোকরার জুতোর দাগ আমি সিড়ির কার্পেটে দেখতে পাই। তাই ঘরের ভেতরে ঢুকে ওর পায়ের ছাপ আর দেখতে পাইনি। আমি তোমায় বলছি শোনো, ব্লেসিংটন পরেন সুঁচলো জুতো। কিন্তু ওই জুতোর মুখটা থ্যাবড়া। তা ছাড়া ডাঃ ট্রেভেলিয়নের চাইতে ওই ছোকরার পায়ের মাপ প্রায় দেড় ইঞ্চি মতো বড়। এ দুটো কথা থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, ওই লোকটি একটি রক্তমাংসের লোক। ডাঃ ট্রেভেলিয়নের কল্পনার চরিত্র নয়। যাক, এ নিয়ে ভেবে এখন আর মাথা গরম করে লাভ নেই। আমার মন বলছে যে, কাল সকালেই ব্রুক স্ট্রিট থেকে আমাদের ডাক আসবে। ডাক না এলে বিস্মিত হব।”
শার্লক হোমসের কথা খেটে গেল। যা ব্যাপার ঘটল তা একেবারে পুরোদস্তুর নাটক। পরদিন যখন ঘুম ভাঙল তখন সবেমাত্র সাড়ে সাতটা বাজে। ভাল করে আলো ফোটেনি। চোখ মেলতে দেখলাম যে, ড্রেসিং গাউন পরে হোমস আমার বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে।
হোমস বলল, “ওয়াটসন, আমাদের জন্যে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।”
“কেন? কী হয়েছে?”
“ব্রুক স্ট্রিটের কাণ্ড।”
“নতুন কোনও খবর আছে নাকি?”
“ঘটনা নিশ্চয়ই গুরুতর। তবে কিছুটা ধোঁয়াটে। ঘরের পরদা সরাতে সরাতে হোমস বলল, “এই দেখো। নোট বইয়ের পাতা ছিঁড়ে পেনসিলে কী লেখা আছে: “ভগবানের দোহাই এখনই চলে আসুন—পি. টি।’ ডাক্তার ট্রেভেলিয়ন খুব বিপদে পড়ে এই চিঠি লিখেছেন। উঠে পড়ো, ওয়াটসন। এক মুহূর্ত দেরি করা ঠিক হবে না।”
মিনিট-পনেরোর মধ্যেই আমরা ডাঃ ট্রেভেলিয়নের বাসায় পৌঁছে গেলাম। আমাদের দেখতে পেয়ে ডাক্তার ছুটে এলেন। ভয়ে তাঁর মুখ একদম সাদা।
দু’ হাত দিয়ে বুকটা চেপে ধরে ডাঃ ট্রেভেলিয়ন বললেন, “ওহ, কী মারাত্মক কাণ্ড!”
“কী হয়েছে?”
“ব্লেসিংটন আত্মহত্যা করেছে।”
হোমস মুখ দিয়ে চুকচুক শব্দ করল।
“হ্যাঁ, রাত্তিরবেলায় উনি গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন।”
ডাঃ ট্রেভেলিয়ন আমাদের একটা ঘরে নিয়ে গিয়ে বসালেন। আমার মনে হল ওই ঘরটা ডাঃ ট্রেভেলিয়নের রুগিদের বসবার ঘর।
ডাঃ ট্রেভেলিয়ন বললেন, “আমি যে কী করছি তা নিজেই জানি না। পুলিশ এসেছে। ওরা এখন ওপরে রয়েছে। কাণ্ড যা হচ্ছে তাতে তো আমার মাথা খারাপ হবার জোগাড়।”
“কখন জানতে পারলেন যে, উনি এই কাণ্ড করেছেন?”
“রোজ সকালে ঘরে বসে উনি এক কাপ চা খান। সাতটা-নাগাদ আমাদের কাজের মেয়েটি চা তৈরি করে ওঁর ঘরে নিয়ে যায়। ঘরে পা দিয়ে সে দেখে এই কাণ্ড। ঘরের মাঝখানে গলায় দড়ি দিয়ে উনি ঝুলছেন। ওই ঘরের ঠিক মাঝখানে ঝাড় টাঙাবার একটা আংটা আছে। সেই আংটা থেকে দড়ি গলায় বেঁধে যে-বাক্সটা কাল আমাদের দেখিয়ে ছিলেন, সেই বাক্সটার ওপরে দাঁড়িয়ে উনি ঝুলে পড়েন।”
হোমস কোনও কথা বলল না। বুঝলাম সে গভীর ভাবে কিছু চিন্তা করছে।
বেশ কিছুক্ষণ পরে হোমস বলল, “আপনার যদি আপত্তি না থাকে তো আমরা একবার ওপরে যাব।” আমরা দোতলায় গেলাম। আমাদের পেছনে পেছনে এলেন ডাঃ ট্রেভেলিয়ন।
শোবার ঘরে পা দিতেই যা দেখলাম তা এক কথায় বীভৎস। চোখে দেখা যায় না। ঘরের মাঝখানে ব্লেসিংটনের দেহটা ঝুলছে। আগেই বলেছি যে, ব্লেসিংটন খুব মোটাসোটা লোক ছিলেন। অনেকক্ষণ ওই রকম ভাবে ঝুলে থাকার দরুণ তাঁর শরীরটা আজ অস্বাভাবিক রকমের মোটা দেখাচ্ছিল। তার ওপর ঘাড়টা দেখাচ্ছিল ছাড়-ছাড়ানো মুরগির মতো। ব্লেসিংটনের গায়ে রাতের পোশাক। ব্লেসিংটনের লাশের কাছে একজন চালাক চালাক দেখতে পুলিশ ইন্সপেক্টর দাঁড়িয়ে ছিলেন।
হোমস ঘরে ঢুকতেই ইন্সপেক্টর বললেন, “আপনাকে দেখে বড় আনন্দ হল মিঃ হোমস।”
“গুড মর্নিং লেনার,” হোমস বলল। “আমি এখানে এসে পড়ায় তুমি নিশ্চয়ই ভেতরে ভেতরে বিরক্ত হচ্ছ না। তুমি কি সব কথা শুনেছ?”
“হ্যাঁ, কিছু কিছু কথা শুনেছি।”
“ব্যাপারটার সম্বন্ধে তোমার মত কী?”
“আমার যা মনে হচ্ছে তা হল যে ভদ্রলোক স্রেফ ভয় পেয়েই এই কাণ্ডটা করেছেন। বিছানার অবস্থা দেখে বোঝাই যাচ্ছে যে উনি ঘুমিয়েছিলেন। আপনি তো জানেন মিঃ হোমস যে, ভোরের দিকে—পাঁচটা নাগাদই—আত্মহত্যার ঘটনা বেশি ঘটে। এ ব্যাপারটাও মনে হয় ওই সময়েই হয়েছে। এটা একটা সাধাসিধে আত্মহত্যার কেস।”
ব্লেসিংটনকে দেখে আমি বলছিলাম, “এঁর মাংসপেশিগুলো যে রকম শক্ত হয়ে উঠেছে তার থেকে মনে হয় অন্তত ঘণ্টা-তিনেক আগেই উনি মারা গেছেন।”
“এই ঘরের মধ্যে নজরে পড়ার মতো কিছু দেখেছ কি?”
“মুখ ধোওয়ার বেসিনে একটা স্ক্রু-ড্রাইভার আর ক’টা স্ক্রু পড়ে ছিল। ফায়ার প্লেসের কাছে গোটা চারেক চুরুটের টুকরো পেয়েছি। মনে হয় ভদ্রলোক খুব চুরুট খেয়েছেন।”
হোমস বলল, “হুঁ,…ওঁর সিগার হোলডারটা পেয়েছ?”
“না। সিগার হোলডার তো নজরে পড়েনি।”
“ওঁর সিগার কেসটা কোথায়?”
“ব্লেসিংটনের কোটের পকেটেই ছিল।”
হোমস সিগার কেসটা খুলে ফেলল। ভেতরে একটা সিগার ছিল। সেটা শুঁকে হোমস বলল, “এটা হাভানা সিগার। কিন্তু ওই চারটে সিগারের টুকরো হল অন্য তামাক দিয়ে তৈরি। ডাচরা পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ থেকে এই তামাকপাতা আনিয়ে এই সিগার তৈরি করে। এগুলো সাধারণত খড়জাতীয় জিনিস দিয়ে মোড়া থাকে আর সাধারণ সিগারের চাইতে সরু হয়।”
হোমস পকেট থেকে ম্যাগনিফাইং লেন্সটা বের করে সিগারের টুকরো চারটে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে লাগল।
“দুটো টুকরো দেখে বোঝা যাচ্ছে যে, সিগারদুটো হোলডারে ঢুকিয়ে খাওয়া হয়েছিল। আরও দুটো এমনিই খাওয়া হয়েছে। তা ছাড়া দুটো সিগারের তলার দিকটা ভোঁতা ছুরি দিয়ে কাটা হয়েছে। আর দুটো সিগার দাঁত দিয়ে ছেঁড়া হয়েছে। যে ছিঁড়েছে তার দাঁত খুব ভাল।…মিস্টার লেনার, এটা আত্মহত্যার ব্যাপার নয়। ঠান্ডা মাথায় ভেবেচিন্তে খুন করা হয়েছে ওই ভদ্রলোকটিকে।”
“অসম্ভব!” লেনার চেঁচিয়ে বললেন।
“কেন অসম্ভব?”
“গলায় দড়ি বেঁধে ঝুলিয়ে কেউ কি কাউকে খুন করে?”
“সেইটেই তো আমাদের খুঁজে বের করতে হবে।”
“খুনিরা বাড়ির ভেতরে ঢুকল কেমন করে?”
“সামনের দরজা দিয়ে।”
“কিন্তু সকালবেলা তো দরজায় খিল দেওয়াই ছিল।”
“তা হলে খুনিরা চলে যাবার পরে খিল লাগানো হয়েছিল।”
“আপনি কী ভাবে জানলেন?”
“আমি যে তাদের যাতায়াতের কিছু হদিশ পেয়েছি। একটু ধৈর্য ধরো; আমি তোমাকে আরও কিছু খবর দিতে পারব, ইন্সপেক্টর।”
হোমস দরজার দিকে এগিয়ে গেল। তারপর দরজার ল্যাচের চাবিটা বারকয়েক ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখল। তারপর চাবিটা বের করে নিল। চাবিটাকেও বেশ খুঁটিয়ে দেখে নিয়ে হোমস ঘরের মেঝে, কার্পেট, টেবিল, চেয়ার, বিছানা সব এক এক করে পরীক্ষা করল। তারপর যখন তার দেখাশোনা শেষ হল তখন আমাকে আর ইন্সপেক্টরকে ডেকে নিয়ে ব্লেসিংটনকে নামিয়ে ফেলল। তারপর একটা চাদর দিয়ে তার দেহটা ঢেকে দিল। হোমস বলল, “এই দড়িটা এল কোথা থেকে?”
ব্লেসিংটনের খাটের তলা থেকে একটা দড়ির বান্ডিল বের করে ডাঃ ট্রেভেলিয়ন বললেন, “এইটা থেকে কেটে নেওয়া হয়েছে। আগুন সম্বন্ধে ব্লেসিংটনের দারুণ ভয় ছিল। যদি বাড়িতে আগুন লেগে যায়, যদি উনি ঘর থেকে বার হতে না পারেন, সেই ভয়ে এই দড়িটা রেখে দিয়েছিলেন। সে রকম অবস্থা হলে উনি দড়ি বেঁধে জানলা দিয়ে ঝুলে পড়বেন—এই ছিল ওঁর মতলব।”
হোমস গম্ভীর ভাবে বলল, “এতে করে খুনিদের পরিশ্রমই বেঁচে গেছে।…এমনিতে ব্যাপারটা খুব সোজা। মনে হয় সন্ধের মধ্যে সবকিছুর ফয়সালা করে ফেলতে পারব। ম্যানটেলপিসের ওপরে ব্লেসিংটনের যে-ছবিটা রয়েছে ওটা আমি নিয়ে যাব। আমার তদন্তের সুবিধে হবে।”
হোমসের কথায় ডাঃ ট্রেভেলিয়ন বলে উঠলেন, “কিন্তু আপনি তো আমাদের কোনও কথাই বলছেন না।”
হোমস বলল, “ঘটনা যা ঘটেছে তা তো সহজেই বোঝা যাচ্ছে। তিন জন লোক ছিল। ছোকরামতো একজন, বয়স্ক একজন, আর একজন যার পরিচয় আমি পাইনি। প্রথম দু’জন যে কে তা আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন। সেই রুশ ভদ্রলোক আর তার ছেলে যারা আপনাকে দেখাতে এসেছিল। সেই জন্যেই ওদের সম্বন্ধে আমরা অনেক কিছুই জানি। বাড়ির মধ্যে ওদের দলের একজন কেউ ছিল সে-ই খিল খুলে ওদের ঢুকতে ও বার হতে সাহায্য করেছে। ইন্সপেক্টর, আমার উপদেশ যদি শোনো তো এ বাড়ির ফাইফরমাশ খাটার লোকটিকে এখনই গ্রেফতার করো। লোকটি অল্প ক’দিন আগে চাকরিতে বহাল হয়েছে। তাই না ডাঃ ট্রেভেলিয়ন?”
ডাঃ ট্রেভেলিয়ন বললেন, “সে ছোঁড়ার সকাল থেকে পাত্তাই পাওয়া যাচ্ছে না। কাজের মেয়েটি আর রাঁধুনি তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে।”
হোমস কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, “এই নাটকে ওই চাকরটির ভূমিকা কিন্তু মোটে তুচ্ছই নয়। বাড়ির ভেতরে ঢুকে ওই লোকগুলো পায়ের পাতার ওপর আলতো করে ভর দিয়ে সিঁড়িতে উঠেছিল। প্রথমে বৃদ্ধ, তারপরে সেই ছোকরা আর তার পিছনে তৃতীয় লোকটি—
“হোমস!” আমি না বলে পারলাম না।
“না না, পায়ের ছাপের ওপরে ছাপ যে পড়েছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। কারটা কার পায়ের ছাপ তা দেখবার সুযোগ কাল রাতে আমার হয়েছিল। যাই হোক দোতলায় উঠে ওরা দেখে যে ব্লেসিংটনের শোবার ঘরের দরজা ভেতর থেকে চাবি বন্ধ। সরু তার দিয়ে ওরা তালা খুলে ফেলে। খালি চোখে দেখলেও তালার গায়ে অনেক আঁচড়-কাটা দাগ দেখতে পাবেন আপনারা।
“ঘরে ঢুকেই ওরা ব্লেসিংটনের মুখ বেঁধে দেয়। ব্লেসিংটন তখন ঘুমোচ্ছিলেন। আর যদি উনি জেগেও থাকেন তো ওদের দেখে ভয়েই আধমরা হয়ে গিয়েছিলেন। এই ঘরের দেওয়াল খুব পুরু। সুতরাং উনি যদি চেঁচিয়েও থাকেন তো সে চিৎকার ঘরের বাইরে থেকে শোনা যায়নি।
“ব্লেসিংটনকে কবজা করে ওরা বেশ খানিকক্ষণ নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলেছিল। আমার ধারণা, ওরা একটা ছোটখাটো বিচারসভা বসিয়েছিল। এই বিচারপৰ্ব চলেছিল বেশ খানিকক্ষণ। সেই সময় ওরা চুরুট খেয়েছিল। বৃদ্ধ লোকটি বসেছিল এই বেতের চেয়ারে। ছোকরাটি বসেছিল ওখানে। ছোকরা ওই দেরাজের গায়ে ছাই ঝেড়েছে। তৃতীয় লোকটি ঘরের মধ্যে পায়চারি করেছে, বসেনি। যতদূর মনে হচ্ছে, ব্লেসিংটন বিছানার ওপর সিধে হয়ে বসেছিলেন। তবে এ কথাটা আমি খুব জোর দিয়ে বলতে পারছি না।
“শেষকালে ওরা ব্লেসিংটনকে ফাঁসি দেওয়াই সাব্যস্ত করে, এবং তার গলায় দড়ি বেঁধে ঝুলিয়ে দেয়। গোটা ব্যাপারটা এত ঠান্ডা মাথায় বিচার বিবেচনা করে করা হয়েছে যে, আমার স্থির বিশ্বাস ওরা কপিকল জাতীয় কোনও কিছু সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল। ওই স্ক্রু-ড্রাইভার আর স্ক্রু সেই জিনিসটাকে খাটাবার জন্যে আনা হয়েছিল বলে মনে হয়। ওই আংটা নজরে পড়ায় ওদের পরিশ্রম বেঁচে যায়। কাজ সেরে ওরা চলে যায়। ওরা চলে যাবার পরে ওদের সঙ্গী সদর দরজায় খিল দিয়ে দেয়।”
আমরা—যাকে বলে মন্ত্রমুগ্ধের মতো হোমসের কথা শুনছিলাম। এ সবই হোমস বের করেছে তুচ্ছ সব সূত্র থেকে। সূত্রগুলো এতই তুচ্ছ যে, হোমস যখন সেগুলোকে আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরছিল তখনও আমরা সেগুলো ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। সত্যিই বিশ্লেষণ করবার ক্ষমতা হোমসের অসাধারণ। লেনার গেল সেই চাকরটার খোঁজ করতে। আমি আর হোমস বেকার স্ট্রিটে ফিরে এলাম।
ব্রেকফাস্ট শেষ করেই হোমস বলল, “আমি এখন বার হচ্ছি। ফিরতে তিনটে হবে। ইন্সপেক্টর আর ডাঃ ট্রেভেলিয়নের আমার কাছে আসবার কথা আছে। এই কেসটার যেটুকু জটিলতা রয়েছে ততক্ষণে পরিষ্কার হয়ে যাবে বলে মনে হয়।”
যাঁদের আসবার কথা ছিল তারা ঠিক সময়ে এসে হাজির হলেন। কিন্তু হোমস কই? হোমস এল সওয়া চারটের সময়। হোমসের মুখ-চোখ দেখে বুঝলাম খবর ভাল।
“ইন্সপেক্টর, কোনও খবর আছে কি?”
“সেই ছেলেটাকে ধরেছি।”
“চমৎকার। আমিও সেই লোকগুলোকে ধরেছি।”
“লোকগুলোকে ধরে ফেলেছ? ধরে ফেলেছেন?” আমরা তিনজনে বলে উঠলাম।
“না আমি তাদের সত্যিকারের পরিচয় পেয়েছি। ব্লেসিংটনকে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের অনেকেই চেনে। এমনটা যে হবে তা আমি আঁচ করেছিলাম। ওঁকে যারা খুন করেছে তাদেরও পুলিশ ভাল করেই চেনে। ওদের তিনজনের নাম হল—বিড্ল, হেওয়ার্ড আর মেফেট।
“অর্থিংডন ব্যাঙ্ক-ডাকাতের দল!” ইন্সপেক্টর বলে উঠলেন।
“হুঁ।”
“তা হলে ব্লেসিংটনই হচ্ছে সাটন?”
হোমস বলল, “ঠিক বলেছ, ইন্সপেক্টর।”
“এখন সব ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়ে গেল।”
“ইন্সপেক্টরের কাছে রহস্যের সমাধান হয়ে গেলেও আমাদের কাছে হয়নি। আমি আর ডাঃ ট্রেভেলিয়ন মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলাম।
হোমস বলল, “অর্থিংডন ব্যাঙ্কের সেই দারুণ ডাকাতিটার কথা নিশ্চয়ই তোমার মনে আছে। পাঁচ জন লোকে মিলে কাজটা করেছিল। এই চার জন আর কার্টরাইট বলে একটি লোক। ব্যাঙ্কের কেয়ারটেকার টবিনকে খুন করে ডাকাতরা সাত হাজার পাউন্ড নিয়ে পালায়। ঘটনাটা ঘটে ১৮৭৫ সালে। ওরা পাঁচ জনই ধরা পড়ে। কিন্তু ওদের বিরুদ্ধে জোরদার কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ওদের মধ্যে সব চাইতে দুষ্ট প্রকৃতির লোক ছিল ব্লেসিংটন ওরফে সাটন। ও রাতারাতি রাজসাক্ষী হয়ে যায়। ওর কথার ওপর ভিত্তি করে টবিনকে খুন করার দায়ে কার্টরাইটের ফাঁসি হয়ে যায়। বাকি তিন জনের প্রত্যেকের পনেরো বছরের জন্য জেল হয়ে যায়। কিছুদিন আগে মেয়াদ শেষ হবার আগেই ওরা খালাস পায়। জেল থেকে বেরিয়ে ওরা ঠিক করে যে, বিশ্বাসঘাতককে তার উপযুক্ত শাস্তি ওরা দেবেই। আর ওদের বন্ধুর ফঁসির প্রতিশোধ নেবে। দু’দিন চেষ্টা করে ওরা ব্লেসিংটনকে ধরতে পারেনি। তৃতীয় বার ওরা ব্লেসিংটনকে ধরে ফেলে।…আর কিছু ব্যাখ্যা করতে হবে? ডাঃ ট্রেভেলিয়ন কী বলেন?”
ডাঃ ট্রেভেলিয়ন বললেন, “আপনি তো সবই বুঝিয়ে দিলেন। এখন বুঝতে পারছি যে, যে-দিন ওদের খালাস পাওয়ার খবর কাগজে বার হয় সেই দিন উনি খুব ঘাবড়ে যান।”
“ঠিকই ধরেছেন। চোরের গল্প বলে উনি আসল কথাটা চাপা দিতে চেয়েছিলেন।”
“কিন্তু সব কথা উনি আপনাকে খুলে বললেন না কেন?”
“দেখুন ওর শাগরেদরা যে কী সাংঘাতিক ধরনের অপরাধী ব্লেসিংটন তা জানত। সেই জন্যে ও প্রাণপণ চেষ্টা করেছিল নিজের আসল পরিচয় গোপন রাখতে। ওর নিজের অতীত তো খুব ভাল নয়। তাই নিজের কথা বলতে ওর স্বাভাবিক ভাবেই সংকোচ ছিল।…যাই হোক ও যত বদলোকই হোক ও আইনের আওতায় ছিল। ইন্সপেক্টর, আইন অবশ্য ওকে বাঁচাতে পারেনি, কিন্তু ওর হত্যাকারীরা যেন আইনের হাত এড়াতে না পারে তা তুমি দেখো।”
এই হল ডাঃ ট্রেভেলিয়নের আবাসিক রুগির রহস্য এবং সেই রহস্যের সমাধান। তবে সেই রাত্রের পর থেকে ব্লেসিংটনের হত্যাকারীদের কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি। পুলিশের ধারণা, পর্তুগালের কাছে ‘নোরা ক্রিনা’ বলে যে-জাহাজটা ডুবে যায়, সেই জাহাজে ওরা ছিল। চাকরটা ধরা পড়েছিল বটে, তবে তার বিরুদ্ধে কোনও প্রমাণ না থাকায় সে ছাড়া পেয়ে যায়।…এই হল ব্রুক স্ট্রিট রহস্যের আসল কথা।
