ব্রিফকেস রহস্য (কর্নেল সিরিজ) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

তিন

 

দোতলায় পুবের বারান্দায় হুইলচেয়ারে বসে চা খাচ্ছিলেন বারীন্দ্রনাথ। জনি তার বাঁ পাশে পেছনের দুই ঠ্যাং মুড়ে বসে ছিল। তার গলার চেন রেলিঙের থামে বাঁধা আছে। সামনে পোর্টিকোর চৌকো খোলা ছাদ। পাইনগাছটা খুব ঝাপালো হয়ে সেই ছাদকে প্রায় ঢেকে ফেলেছে। রাতে হাওয়া দিলে পাইন কাটাগুলো কার্নিশ আর রেলিঙে ঘষা খেয়ে অদ্ভুত শব্দ করে।

 

জনি ঘুরে তাকিয়ে গরগর করল। সৌম্য এসে বলল, মর্নিং মামাবাবু।

 

বারীন্দ্রনাথের ডানপাশে বেতের টেবিল আর একটা চেয়ার। সৌম্য চেয়ারে বসে আবার বলল, হাই জনি। মর্নিং। জনি তার কাছে আসার চেষ্টা করছিল। সৌম্য তার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করল।

 

বারীন্দ্রনাথ হাসলেন। হঠাৎ খুব স্মার্ট হয়ে উঠেছ। কোনও মতলব আছে। সম্ভবত। পটে গরম লিকার আছে। রুক্সিণীকে ডেকে একটা কাপ আনিয়ে নাও। রোয়িংয়ের পর মন্দ লাগবে না।

 

আপনি লক্ষ্য রেখেছিলেন?

 

হুঁউ। ও ছেলেটি কে?

 

অরিত্র সেন। আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু।

 

অ্যাকটিং করে বুঝি?

 

করে। তবে থিয়েটারেই বেশি ঝোঁক।

 

বারীন্দ্রনাথ একটু গলা চড়িয়ে ডাকলেন, রুক্মিণী! একটা কাপ দিয়ে যা তো তোর ছোটাসাবকে।

 

রুক্মিণী পিছনে তার ঘরের মেঝে মুছছিল। জি বড়াসাব! বলে দ্রুত ভেতরে উধাও হয়ে গেল।

 

সৌম্য টেবিলে রাখা বাংলা ফিল্মম্যাগাজিনটার পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে বলল, আপনি নাকি নীতা সোমের ছবি দেখে ভীষণ গম্ভীর হয়ে গেছেন?

 

তোমার মায়ের ধারণা সবসময় ঠিক হয় না তুমি জানো!

 

মা বলল নীতা সোমকে আপনার চেনা মনে হয়েছে?

 

বারীন্দ্রনাথ একটু কেসে নিয়ে বললেন, আমি অ্যানাটমি বিশারদ নই। নৃতাত্ত্বিকও নই। তবে আমার ধারণা, পৃথিবীর সব মানুষকে চেহারার দিক থেকে লক্ষ্য করলে কতকগুলো–আমি জানি না সংখ্যাটা কত দাঁড়াতে পারে, হ্যাঁ– এভাবে শ্রেণীবদ্ধ করা যায়। এজন্যই হঠাৎ অচেনা কাকেও দেখলে চেনা লাগে। সে তুমি মুখের চেহারা বলো, শারীরিক গড়ন বলো, কিংবা হাঁটাচলার ভঙ্গি বলো–হ্যাঁ, একটা ক্ল্যাসিফিকেশন করা যায়।

 

সৌম্য হাসল। অসাধারণ। আপনার এই থিওরির সঙ্গে আমি একমত।

 

রুক্মিণী একটা কাপ-প্লেট রেখে গেল। সৌম্য একটু লিকার ঢেলে চিনি মেশাল। বারীন্দ্রনাথ বললেন, কক্ষণো খালি পেটে চা খাবে না। ওই তো বিস্কুট আছে।

 

আপনার অনারে চা-বিস্কুট খাচ্ছি। আমি চা খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি।

 

বাহ। ভালো করেছ। আমিও আজকাল দুবেলা দুকাপ–আগে তো যত চা তত সিগারেট। বারীন্দ্রনাথ সিগারেটের প্যাকেট তুলে নিলেন। লাইটারে ধরিয়ে ধোঁয়ার রিং তৈরি করতে থাকলেন।

 

সিগারেট কিন্তু কমাতে পারেননি।

 

অনেক কমিয়েছি। তবে টেনসনের সময় একটু বেশি হয়ে যায়।

 

এখন কি কোনও টেনসন আছে? অবশ্য অ্যাশট্রে বলে দিচ্ছে আছে। অথচ আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে, নেই। অ্যাজ ইট ইজ জলি মুড।

 

বারীন্দ্রনাথ একটু হেসে বললেন–হা, মুড ফিরে এসেছে। কিন্তু তুমি ঠিকই ধরেছ। এরপর চারটে সিগারেট খেয়েছিলাম। তোমাদের হিরোইনের ছবিটা দেখার পর কিছুক্ষণের জন্য এক্সাইটেড হয়ে উঠেছিলাম। পরে মনে হল আমার ভুল হচ্ছে। যাই হোক, বলো। তুমি কি রোলে থাকছ? হিরো, না ভিলেন?

 

এ ছবিতে হিরো-ভিলেনের ব্যাপার নেই। অবিনাশদা রিয়্যাল লাইফ থেকে ক্যারেক্টার বেছে নেন। হয়তো দেখবেন আপনিও এ ছবিতে একটা ক্যারেক্টার।

 

আপত্তি নেই।

 

আমি কিন্তু খুব রিস্ক নিয়ে কথাটা বলেছি মামাবাবু। ভেবেছিলাম আপনি ভীষণ রিঅ্যাক্ট করবেন।

 

বারীন্দ্রনাথ সৌম্যের কথায় কান দিলেন না। বললেন, ডাইরেক্টর হিরোইনকে নিয়ে কখন এসে পৌঁছুবেন?

 

বলেছেন সকাল আটটায় স্টার্ট করবেন। ঘণ্টা তিনেক তো লাগবেই। সৌম্য একটু ইতস্তত করে ফের বলল, মামাবাবু। অরিত্র আপনার সঙ্গে আলাপ করতে চায়। এখন সময় হবে?

 

তোমার অনারে সময় দেব। তবে জনিকে দূরে কোথাও বেঁধে রাখতে হবে। বাইরের লোক দেখলে হৈচৈ করবে। নাহ্। তুমি ওকে সামলাতে পারবে না। রুক্মিণীকে বলছি।

 

সৌম্য চলে গেল। বারীন্দ্রনাথ রুক্মিণীকে ডেকে কুকুরটা সরিয়ে নিয়ে যেতে বললেন। তারপর পত্রিকাটা তুলে নীতা সোমের ছবির পাতাটা খুঁজে বের করলেন। ছবিটার দিকে নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে রইলেন বারীন্দ্রনাথ।

 

একটু পরে পাঞ্জাবির ঝুল পকেট থেকে একটা খাম বের করলেন। খাম থেকে একটা ফোটোগ্রাফ বের করে মিলিয়ে দেখলেন। আবার উত্তেজনাটা ফিরে এল।

 

নীচের সুরকি-বিছানো রাস্তায় একটু দূরে গাছপালার ফাঁক দিয়ে সৌম্য ও অরিত্রকে আসতে দেখে বারীন্দ্রনাথ খামটা পকেটে ঢোকালেন। পত্রিকাটা রেখে দিলেন টেবিলে। তারপর ডাকলেন, রুক্মিণী!

 

রুক্মিণী দক্ষিণের বারান্দা দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে এল।

 

চায়ের ট্রে নিয়ে যা। আর শোন। তোর বরকে বলবি, ওই ডালগুলো ছাঁটতে হবে। এখন নয়। পরে।

 

সৌম্য অরিত্রকে নিয়ে উত্তরের বারান্দা হয়ে এল। মামাবাবু। এই সেই অরিত্র।

 

অরিত্র পায়ে প্রণাম করতে এল। বারীন্দ্রনাথ হাসলেন। পা নেই। একজোড়া নকল পা। প্রণাম করবে কোথায়? বসো। সৌম্য! আমার ঘর থেকে চেয়ার এনে বস।

 

সৌম্য বলল, মা আমাকে বসতে বারণ করেছে। দ্বারিককে গাড়িতে বইতে হবে। হরিবল। আমার মারুতির শ্যাসি ভেঙে পড়লেই গেছি।

 

ওসব পলকা গাড়ি কিনেছ কেন?

 

দ্বারিকের জন্য নিশ্চয় কিনিনি।

 

বারীন্দ্রনাথ ঘড়ি দেখে বললেন, চণ্ডীতলা বাজারে যাচ্ছ–সাবধান। দ্বারিক যেন কাকেও শ্যুটিংয়ের খবর দেয় না। আমার বলা আছে। তবু–

 

মামাবাবু। কোনও কোনও ব্যাপারে মা আপনার চেয়ে ইনটেলিজেন্ট। আমাকে দ্বারিকের এসকর্ট সার্ভিসের দায়িত্ব কেন দিচ্ছে, অলরেডি বুঝিয়ে বলেছে।

 

সৌম্য চলে যাওয়ার পর অরিত্র বলল, খবর রটে যেতে দেরি হয় না। তবে আমার ধারণা, শ্যুটিং বলতে ঠিক যা বোঝায়, তেমন কিছু হবে না।

 

বারীন্দ্রনাথ তার দিকে তীক্ষ্ণদৃষ্টে তাকালেন। কী হবে?

 

অরিত্র হাসল। অবিনাশদার শো বিজনেস। আমাদের সঙ্গে রমেশ ভার্মা নামে এক ভদ্রলোক এসেছেন। ওয়েস্টার্ন ফিল্ম মার্কেটের ব্রোকার বলতে পারেন ওঁকে। অবিনাশদাকে ডিসটার্ব করবেন। আই মিন, একটা লিস্ট ধরিয়ে দেবেন হাতে। এটা করুন, ওটা করবেন না–আই নো হিম ওয়েল।

 

তাহলে আপনাদের ডাইরেক্টর ওঁকে সঙ্গে রাখছেন কেন?

 

ব্যাপারটা আমি ঠিক জানি না। মনে হচ্ছে, ভার্মাসায়েব নিজেই ইনসিস্ট করে থাকবেন। অরিত্র হঠাৎ পাইন গাছটার দিকে আঙুল তুলল। কী আশ্চর্য! এটা পাইনগাছ না?

 

হ্যাঁ, আমার ঠাকুরদার অদ্ভুত অদ্ভুত হবি ছিল। এবাড়িতে অনেক বিদেশি গাছ দেখতে পাবে। তিনি হাতুড়ে বটানিস্ট ছিলেন। তুমি চা খাবে?

 

আজ্ঞে না। চা আমি খাই না। ধন্যবাদ।

 

তুমি কি অন্য কিছু করো? নাকি শুধু অ্যাকটিং?

 

অরিত্র হাসল। আমি চ্যাটার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। একটা ফার্মে চাকরি করি।

 

বাহ্। খুব ভালো।

 

আপনার সঙ্গে আলাপের ভীষণ ইচ্ছে ছিল। কাল রাত্রে আমাদের টিমের ম্যানেজার বটুকদা বলছিলেন, সাংঘাতিক একটা প্লেন অ্যাকসিডেন্টের পর আপনি বেঁচে যান। খুব থ্রিলিং এক্সপিরিয়েন্স।

 

বারীন্দ্রনাথ তার কথার ওপর বললেন, বটুকদা বললে। ওঁর পুরো নাম কী?

 

বটুক দত্ত।

 

ওঁর সঙ্গে আমার পরিচয় নেই। উনি কী করে জানলেন?

 

সম্ভবত অবিনাশদা কিংবা সৌম্যের মুখে শুনে থাকবেন। অরিত্র একটু কুণ্ঠিতভাবে বলল, ডিটেলস আপনার মুখে জানতে ইচ্ছে করছে।

 

কাগজে তো বেরিয়েছিল। টিভি-তেও নাকি দেখিয়েছিল–পরে শুনেছি।

 

পড়ে থাকব। মনে নেই। কিংবা অত লক্ষ্য করিনি। অরিত্র একটু চুপ করে থেকে বলল, আমি ইনসিস্ট করছি না। আপত্তি থাকলে বলবেন না। আসলে আমি নিজে একবার সাংঘাতিক অ্যাকসিডেন্ট থেকে দৈবাৎ বেঁচে যাই। সৌম্য বলছিল আপনার ইনসটিংকট কাজ করেছিল। আই বিলিভ দ্যাট।

 

কী অ্যাকসিডেন্ট?

 

তখন আমি ছাত্র। আমহার্স্ট স্ট্রিটের ফুটপাতে একটা ঝুলবারান্দার তলায় দাঁড়িয়েছিলাম। প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছিল। হঠাৎ মাথার ওপর ছাদটার দিকে তাকিয়ে মনে হল, ধসে পড়বে না তো? জাস্ট টু অর থ্রি সেকেন্ডস। পাশেই একটা রেস্তোরাঁর দরজায় সরে গেছি, ছাদটা সত্যি ভেঙে পড়ল। যারা দাঁড়িয়েছিল, তারা কেউ বাঁচেনি। কয়েকজন পরে হসপিটালে গিয়ে মারা যায়। সেই থেকে একটা আতঙ্ক আমার পিছু ছাড়েনি। পুরনো কোনও বাড়ি দেখলেই একটা স্ট্রেঞ্জ ফিলিংস হয়।

 

বারীন্দ্রনাথ হাসলেন। এই বাড়িটা নাইনটিন টুয়েলভে তৈরি।

 

নাহ। আমি ঠিক তা বলছি না। ইনসটিংকটের কথা বলছি। সিক্সথ সেন্স বললে পয়েন্টটা হয়তো স্পষ্ট হয়। আমার ধারণা, একসময় প্যারাসাইকোলজি নিয়ে খুব পড়াশুনা করেছিলাম। এখনও তেমন বইটই পেলে পড়ি। ই এস পি বলে একটা টার্ম আছে শুনে থাকবেন। এক্সট্রাসেনসুয়ারি পার্ফেকশন। এ নিয়ে ওয়েস্টে প্রচুর রিসার্চ হয়েছে। হচ্ছে।

 

বারীন্দ্রনাথ একটা সিগারেট ধরিয়ে অভ্যাসমতো ধোঁয়ার রিং বানাতে থাকলেন। তারপর বললেন, সিক্সথ সেন্স কি না জানি না। পাইলট জানিয়ে দিয়েছিলেন, রাফ ওয়েদার। ক্র্যাশ ল্যান্ডিং ছাড়া উপায় নেই। আমার সিটের পাশেই এমার্জেন্সি ডোর ছিল। প্লেনটা তখন বরফে ঢাকা গ্রাউন্ড লেভেল থেকে বিশ পঁচিশ ফুট উঁচুতে। শোনামাত্র এমার্জেন্সি ডোর খুলে ঝাঁপ দিলাম। নরম বরফের স্তর। তেমন কিছু আঘাত লাগেনি।

 

তাহলে আপনার পা।

 

ফর্স্ট বাইট। প্রায় দুমাইল হেঁটে–ঠিক হাঁটা নয়, ওটা ছিল একটা অসমতল উপত্যকা। তবে ঝড়টার গতি যে দিকে, সেইদিকেই যাওয়ার চেষ্টা করছিলাম। তারপর একটা রাস্তা পেয়ে যাই। সেখানেই অজ্ঞান হয়ে পড়ি। জ্ঞান ফেরে হসপিটালে।

 

প্লেনটা?

 

একবার ঘুরে দেখেছিলাম। আগুন জ্বলছিল।

 

আর একজনও বাঁচেনি?

 

বারীন্দ্রনাথ একটু চুপ করে থাকার পর বললেন, আমার পাশের সিটে এক ভদ্রলোক ছিলেন। তিনিও আমার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

 

তার কী হল?

 

আমি সবে উঠে দাঁড়িয়েছি, কাছেই ওঁর চিৎকার শুনলাম। দেখলাম একটা উঁচু জায়গা থেকে গড়িয়ে পড়ছেন। সেখানে কয়েকটা পাইনগাছ ছিল। এজাতের পাইন নয়। ক্রিসমাস ট্রির মতো দেখতে। ওঁর কাছে যাওয়ার আগেই উনি গড়াতে গড়াতে আমার কাছে এসে হাজির। বারীন্দ্রনাথ হাসলেন। ব্লিজার্ড, তুষারঝড় হলে বাঁচার কোনও চান্স ছিল না। যাইহোক, একজন সঙ্গী থাকলে ওই অবস্থায় মনোবল বাড়ে। কিন্তু তার দুর্ভাগ্য! কিছুক্ষণ হাত ধরাধরি করে হাঁটার পর–হ্যাঁ, উনিই আমার হাত ছাড়তে চাইছিলেন না। ভীষণ আতঙ্কে যা হয়। তো আমার ডান হাত ব্যথা করছিল। আমি ওঁর কানের কাছে মুখ রেখে চিৎকার করে বললাম, আমার হাতে আঘাত লেগেছে। হাতটা ছাড়ুন। উনি ছাড়লেন না। অগত্যা জোর করে ছাড়িয়ে নিলাম। আর সেই মুহূর্তেই ভদ্রলোক তুষারখাদে তলিয়ে গেলেন। নাহ্। আমি ওঁকে ইচ্ছে করে ধাক্কা মারিনি, কিংবা জানতাম না পাশেই তুষারখাদ আছে। খাদগুলো নরম বরফে ঢাকা থাকে। দেখে বোঝা যায় না কিছু। আমি কেন কোনও খাদে যে তলিয়ে যাইনি, তার ব্যাখ্যা দিতে পারব না।

 

তখন সময় কত? আই মিন, ডে অর নাইট?

 

ভোরবেলা। নাইঙ্খ নভেম্বর।

 

ইতালির কোন এরিয়া ওটা?

 

তুসকানি এরিয়া। ইংরেজরা বলে টাসক্যানি। পাহাড়ি এলাকা। রাফ ওয়েদারের জন্য আমাদের প্লেনটা পথ বদলেছিল। যেখানে ক্র্যাশল্যান্ডিং করেছিল, সেই জায়গাটার নাম লা মারেম্মা। ওখানকার পাইনের জঙ্গল বিখ্যাত। পরে জেনেছিলাম।

 

তারপর?

 

তারপর আর কী? মাস তিনেক ফ্লোরেন্সে একটা হসপিট্যালে থাকার পর ভারত সরকার আমাকে বোম্বেতে এনেছিলেন। আমার ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু আমি একজন এক্স এম পি। বারীন্দ্রনাথের ঠোঁটের কোনায় বাঁকা হাসির রেখা ফুটে উঠল। আমাদের সরকারের একটা প্রেসটিজ বলে কথা। ফ্লোরেন্সে ডাক্তাররা আমাকে বলেছিলেন, পা ফিরে পাব। বোম্বের ডাক্তাররা বললেন, হাঁটুর নীচে থেকে বাদ না দিলে উরুও নষ্ট হয়ে যাবে। যাক গে। আপদ গেল। বারীন্দ্রনাথ হেসে উঠলেন।

 

সেই ভদ্রলোকের পরিচয় জানা যায়নি?

 

বাঙালি।

 

অরিত্র নড়ে বসল। বাঙালি? কী নাম ছিল ভদ্রলোকের?

 

এস কে রায়। ব্যবসা ট্যাবসা করতেন–যতদূর মনে পড়ছে। কলকাতার লোক। বারীন্দ্রনাথ দূরের দিকে তাকিয়ে ছোট্ট শ্বাস ছেড়ে ফের বললেন, তদন্ত হয়েছিল। আমি সত্যি যা ঘটেছিল, তাই বলেছিলাম।

 

ওঁর ফ্যামিলির মোটা টাকা কম্পেনসেশন পাওয়ার কথা। তাই না?

 

জানি না। আমার পা দুটো ঠিক থাকলে খোঁজ নিতাম। তবে কম্পেনসেশন– তুমি ঠিক বলেছ, পাওয়ারই কথা। ফ্যামিলি থাকলে নিশ্চয় পেয়েছিল। না থাকলে অন্য কথা।

 

সুদক্ষিণা এসে বললেন, তোমার ব্রেকফাস্টের সময় হয়ে গেছে।

 

অরিত্র উঠে দাঁড়াল। বলল, সরি মাসিমা।

 

সুদক্ষিণা বললেন, না, না–তুমি বসো। সৌম্য বলে গেছে। তোমাকে যেন না খাইয়ে ছাড়ি না।

 

না মাসিমা। বটুকদা রাগ করবেন। তা ছাড়া আমাদের টিমের একটা ডিসিপ্লিন আছে। মামাবাবু! চলি!

 

অরিত্র বারীন্দ্রনাথের সামনে প্রণামের ভঙ্গিতে নত হল। তারপর সুদক্ষিণার পা ছুঁয়ে প্রণাম করল। বারীন্দ্রনাথ বললেন, একে সিঁড়ি অব্দি পৌঁছে দাও। রুক্মিণী কোথায় জনিকে বেঁধে রেখেছে জানি না। আর শোনো। রুক্মিণীকে বল, এবার জনিকে নিয়ে আসুক। আমরা দুই বন্ধু এখানেই ব্রেকফাস্টে বসতে চাই।

 

সুদক্ষিণা অরিত্রকে পৌঁছে দিতে গেলেন। বারীন্দ্রনাথ হুইলচেয়ার গড়িয়ে ঘরে ঢুকলেন। টেবিলের ড্রয়ারের তালা খুলে পকেটে রাখা ছবির খামটা ড্রয়ারে ঢোকালেন। তালা এঁটে বেরিয়ে এলেন।

 

একটু পরে রুক্মিণী জনিকে নিয়ে এল। আগের জায়গায় বেঁধে রাখল। বারীন্দ্রনাথ নীচের রাস্তাটা দেখছিলেন। অরিত্র যেতে যেতে বার দুয়েক পিছু ফিরে তাঁকে দেখে গেল। হঠাৎ মনে হল, সৌম্যের বন্ধু প্লেনক্র্যাশের ঘটনা সম্পর্কে যেন একটু বেশি আগ্রহী। সিক্সথ সেন্স, প্যারাসাইকোলজি, ই এস পি এবং আমহার্স্ট স্ট্রিটে দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়া–

 

কিন্তু তার মুখের হাবভাব এবং চোখের দৃষ্টিতে যেন এসবের অতিরিক্ত কিছু ছিল।

 

নাকি বারীন্দ্রনাথের নিজেরই দেখার ভুল? আগে কেউ সেই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা শুনতে চাইলে খুব রঙ চড়িয়ে বলতেন। ক্রমশ একই কথা আর বলতে ভাল লাগে না। মোটামুটি একটা বর্ণনা দিয়ে থেমে যান। যে শুনছে, সে হয়তো তার প্রতি সমবেদনা দেখানোর জন্যই আগ্রহ দেখায়।

 

তবু একটা খটকা থেকে গেল।…

 

বেলা একটা নাগাদ বারীন্দ্রনাথ বিছানায় শুয়ে একটা বই পড়ছিলেন, সেই সময় সুদক্ষিণা এসে ঘোষণা করলেন, এতক্ষণে ওরা এল। সৌম্য দেরি দেখে অস্থির। পাগলামির একটা সীমা থাকা উচিত। স্নান খাওয়া নেই। গাড়ি নিয়ে হাইওয়েতে ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছিল।

 

বারীন্দ্রনাথ বই রেখে বললেন, সেই মেয়েটি–নীতা সোমকে দেখলে?

 

হ্যাঁ। মোটামুটি ভদ্র বলেই মনে হল। খুব উঁট দেখাবে ভেবেছিলাম। তেমন কিছু নয়। ওর সঙ্গে আরও একটি মেয়ে এসেছে। নীতার বন্ধু। ফিল্ম জার্নালিস্ট। বড় বেশি গায়ে পড়া। তোমার সঙ্গে আলাপ করতে আসবে বলল। আমি বললাম দাদাকে জিজ্ঞেস করব। সৌম্য বলে দিল, জিজ্ঞেস করার কী আছে? সৌম্যের আদিখ্যেতা দেখে আমার ভীষণ রাগ হচ্ছে।

 

বারীন্দ্রনাথ একটু হেসে বললেন, আমার রাগ হচ্ছে না। তবে আগে আমি নীতা সোমের সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই। সৌম্যকে পাঠিয়ে দিও।…

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *