অর্জুন এবার নিউইয়র্কে – সমরেশ মজুমদার

শেয়ার করুনঃ

সাত

খুব উত্তেজিত হয়ে মেজরের বাড়িতে ফিরে এল অর্জুন। টিউব থেকে নেমে রাস্তা নিয়ে একটু ধন্দে পড়েছিল সে। জো তাকে সাহায্য করল। বাড়ির দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে গেল। বেল না বাজিয়ে মেজরের দেওয়া চাবি দিয়ে দরজা খুলে উপরে উঠতে উঠতে ঘড়ি দেখল সে। সাড়ে চারটে বেজে গিয়েছে।

 

দোতলার ঘরে কেউ নেই। টেবিলে একটা চিরকুট পেপারওয়েটের নীচে রয়েছে। তাতে মেজর লিখেছেন যে, তিনি মিসেস ব্রাউনকে দেখতে যাচ্ছেন। সাড়ে পাঁচটার মধ্যে ফিরে আসবেন। কিছু খাওয়ার ইচ্ছে হলে মাইক্রোওভেন চালু করে নিতে পারে।

 

অতএব এই ফাঁকা বাড়িতে স্নান সেরে মাইক্রোওভেন অন করে গরম খাবার নিয়ে টেবিলে বসল অর্জুন। বোনলেস মাংসের সঙ্গে নানান সবজি দিয়ে রান্না উপাদেয় ঝোল খেতে বেশ ভালই লাগল।

 

খেয়েদেয়ে ব্যালকনিতে গিয়ে বসল সে। এখনও বাইরেটা বেশ ঝকঝকে, রোদ্র সরতে অনেক দেরি। এখানে সন্ধে হয় রাত আটটার পরে। কাঠবিড়ালিগুলো একইভাবে লাফালাফি করে চলেছে।

 

জিম ব্রাউনের ছেলের সঙ্গে ওইভাবে দেখা হয়ে যাবে ভাবেনি অর্জুন। আচ্ছা, এটাকে কি কাকতালীয় বলে? তা কেন? ছেলেটি যে ব্রঙ্কসে থাকে তা তো সে আগেই শুনেছিল। হ্যাঁ, জো-এর সঙ্গে ডি সিলভার কাছে না গেলে নিশ্চয়ই ওর দেখা পাওয়া যেত না। ছেলেটির পোশাক, চালচলনে রুক্ষ ভাব থাকলেও কথা বলার সময় বোঝা যাচ্ছিল, ওর মধ্যে নরম ভাবও রয়েছে। মুখের গড়ন অবশ্য মিস্টার ব্রাউনের মতো নয়। পুলিশ ওকে আততায়ী বলে ভাবছে। মিস্টার ব্রাউন যদি স্টেটমেন্ট দেন, তা হলে সেটা ভাবাই স্বাভাবিক। কিন্তু মিসেস ব্রাউন কথা বলতে পারলে পুলিশের ধারণা অবশ্যই বদলাবে। একটা ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া গেল, ডি সিলভাকে ধরলে ওই ছেলেটির কাছে পৌঁছোনো যাবে।

 

একটা গাড়ি এসে দাঁড়াল রাস্তা ছেড়ে বাড়ির সামনে। ন্যাড়ামাথা গোলগাল এক ভদ্রলোক গাড়ি থেকে নেমে উপরের দিকে তাকিয়ে হাতের ইশারা করলেন।

 

অর্জুন জিজ্ঞেস করল, কার খোঁজ করছেন? এখন বাড়িতে আমি একা।

 

চাবি নিয়ে যেতে ভুলে গিয়েছি, দয়া করে দরজাটা খোলো। মেজরের গলা শুনে চমকে উঠল অর্জুন। ইনিই এতকালের চেনা মেজর? নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হচ্ছিল না। দৌড়ে নীচে নেমে সে চিৎকার করল, এ কী করেছেন?

 

কেন? শ্রাদ্ধ করলে মাথার চুল আর দাড়ি কামাতে হয়। হয় না?

 

আপনি সত্যি সত্যি নিজের শ্রাদ্ধ করে এলেন?

 

সেটা দুপুরে। এখন আমি ফ্রিম্যান, মুক্তপুরুষ। মেজর হাসলেন, এখন আমি নো-ম্যানস ল্যান্ডে রয়েছি বলে ভাবতে পারো।

 

নো-ম্যানস ল্যান্ড মানে?

 

দুটো দেশের সীমানা যেখানে শেষ হয় সেখানে কিছুটা খালি জায়গা রাখা হয়। সেই জায়গাটাকে নো-ম্যানস ল্যান্ড বলা হয়। আমি সংসার জীবন থেকে ছুটি নিয়েছি আবার পরলোকে যেতে দেরি হচ্ছে বলে এই নো-ম্যানস ল্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছি।

 

আপনার কি মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে?

 

অতিরিক্ত সুস্থ আছে। এখন এই বাড়ি, আসবাব, এমনকী এই শরীর দেখে মনে হচ্ছে এসব আমার নয়। কোনও পিছুটান নেই। আহা, কী যে আনন্দ হচ্ছে!

 

তা হলে শহরে আছেন কেন? পাহাড়ের নির্জনে চলে যাওয়াই তো ভাল ছিল।

 

পাহাড়ে নির্জনতা আছে একথা তোমাকে কে বলল? শহরে থেকেই আমি আমার চারপাশে নির্জনতা তৈরি করতে পারি। মেজর মাথা নাড়লেন।

 

তা হলে মিস্টার ব্রাউনের স্ত্রীকে দেখতে গেলেন কেন?

 

ও! তুমি এটা বুঝলে না? জিম আমাকে দেখে চমকে উঠল। প্রথমে চিনতেই পারেনি। এতে আমি আনন্দিত হলাম।

 

মিসেস ব্রাউনের সঙ্গে দেখা হয়েছে?

 

ইয়েস। হয়েছে। ওঁর জ্ঞান ফিরেছে। আমাকে চিনতে পারেননি, তাই কথাও হয়নি। জিমের কাছে শুনলাম উনি পুলিশকে বলেছেন, ছেলের ব্যাপারে কথা বলবে বলে একটি ছেলে তাঁর কাছে এসেছিল। সে এসে সরাসরি এক লক্ষ ডলার চায়। না দিলে ছেলেটিকে খুন করা হবে। তিনি চিৎকার করে উঠতে ছেলেটি তাঁকে ছুরি মারতে থাকে। এর পর তার কিছু মনে নেই।

 

তার মানে এই দাঁড়াল, আমার ধারণা সত্যি। অর্জুন হাসল।

 

জিমের ধারণা ভুল হওয়ায় তোমার উপর তার আস্থা বেড়ে গিয়েছে।

 

মেজর বললেন, ফ্রিজে কিছু খাবার ছিল। সেগুলোর সদ্ব্যবহার করেছ?

 

হ্যাঁ।

 

তোমার দিনটা নিশ্চয়ই ভাল কাটেনি?

 

উঁহু। দারুণ কেটেছে।

 

কীরকম?

 

আমি আজ ব্রঙ্কসে গিয়েছিলাম। অর্জুন বলল।

 

অ্যাঁ? চোখ বড় হয়ে গেল মেজরের, তুমি একা গিয়েছ?

 

না। অর্জুন মাথা নাড়ল। তারপর জো-এর সঙ্গে আলাপ হওয়া, তার সঙ্গে ব্রঙ্কসে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে জো-কে রাজি করানো ইত্যাদি ঘটনা মেজরকে জানাল।

 

মেজর খুবই উত্তেজিত। বললেন, এক্ষুনি জিমকে জানানো দরকার যে, তোমার সঙ্গে ওর ছেলের দেখা হয়েছে।

 

দেখা হয়েছে কিন্তু পরিচয় হয়নি। তা ছাড়া উনি চাইলেই ছেলের কাছে পৌঁছোতে পারবেন না। অর্জুন বলল।

 

না পারুক। খবরটা দেওয়া উচিত।

 

মিস্টার ব্রাউন এখনও হাসপাতালে?

 

না। ও বাড়িতে ফিরে গিয়েছে। ওর মা অসুস্থ। তাকে দেখাশোনা করতে হয়। বাড়িতে ফোন করলে পাওয়া যাবে ওকে।

 

মেজর চলে গেলেন ল্যান্ডলাইনে ফোন করতে। অর্জুন তাকিয়ে ছিল। মেজরের চেহারা একদম বদলে গিয়েছে। কিন্তু চেহারাই বদল হয়েছে, কথাবার্তা, উৎসাহ সব আগের মতো রয়েছে। নো-ম্যানস ল্যান্ডে থাকার কথা বলছেন। কিন্তু সেটা স্বভূমি থেকে কীসে আলাদা তা বোঝা যাচ্ছে না।

 

মেজর রিসিভার হাতে নিয়ে গলা তুললেন, অৰ্জুন, জিম তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাইছে। ও খুব এক্সাইটেড।

 

অর্জুন এগিয়ে গিয়ে রিসিভার নিয়ে বলল, গুড ইভনিং মিস্টার ব্রাউন!

 

গুড ইভনিং অ-র-জুন। আমি, আমি খুব দুঃখিত। আমি তোমাকে আন্ডারএস্টিমেট করেছিলাম। এখনও চব্বিশ ঘণ্টা কাটেনি, অথচ তুমি এর মধ্যে মিরাকেল করেছ।

 

আমি কিছুই করিনি। আচমকাই হয়ে গিয়েছে।

 

আমার ছেলেকে কেমন দেখলে?

 

ভাল।

 

তুমি কথা বলার সুযোগ পাওনি?

 

প্রথমে আমি বুঝতে পারিনি। যখন বুঝলাম, তখন সুযোগ ছিল না।

 

অ-র-জুন। ওকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা দরকার। আমার স্ত্রী ওকে ছেড়ে থাকতে পারছে না। আমার মা-ও ওকে দেখতে চাইছেন। এখন আমার মন বলছে তুমি পারবে ওকে ফিরিয়ে আনতে। তোমার পারিশ্রমিক বাবদ আমি পাঁচ হাজার ডলার কালই পাঠিয়ে দেব। এটা অগ্রিম। কাজে সফল হলে বাকি পাঁচ হাজার দেব। রাখছি। ফোন রেখে দিলেন জিম ব্রাউন।

 

পাঁচ হাজার ডলারে কত টাকা হয়? হিসেবটা মনে-মনে করতেই মুখ থেকে বেরিয়ে এল, পাগল! একদম পাগল!

 

মেজর তাঁর কামানো গালে হাত বোলাচ্ছিলেন, একদম পাগল বলছ? অর্ধেক নয়?

 

আপনি ভাবতে পারেন, ভদ্রলোক কাল দু’লক্ষ টাকা পাঠিয়ে দেবেন অ্যাডভান্স হিসেবে। যদি কাজ শেষ করতে পারি তা হলে আরও দু’লক্ষ দেবেন। এত টাকা পাওয়ার কথা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি। এবং এই কাজের জন্যে এত পাওয়ার কোনও কারণই নেই। অর্জুন বলল।

 

মাথা নাড়লেন মেজর, আফ্রিকার দুর্গম জঙ্গলে মুটুম্বু জাতের আদিবাসী শিশুরা যে পাথর ঘষে ঘষে মার্বেল বানিয়ে খেলত, তা একদল আমেরিকান অভিযাত্রী কৌতূহলবশে কুড়িয়ে নিয়ে এসে জানল, ওগুলো মহামূল্য হিরে। অতএব তোমার কাজের মূল্য তুমি যা নির্ধারণ করবে সেটা সঠিক না-ও হতে পারে। যাই, স্নান করে আসি। মেজর চলে গেলেন। হাঁ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল অর্জুন।

 

.

 

সকালে মেজরের ঘরে গিয়ে অর্জুন দেখল, তিনি গম্ভীর মুখে বসে আছেন। সে গুড মর্নিং বলতে মেজর মাথা নাড়লেন একবার।

 

কী হয়েছে?

 

বাংলায় যাকে অম্বল বলে, তাই।

 

অ্যান্টাসিড খেয়েছেন?

 

না। এই শরীর যেমন অম্বল তৈরি করেছে তেমনই তার দায়িত্ব সেটা দূর করা। বাইরে থেকে ওষুধ পাঠিয়ে তাকে সাহায্য করব না।

 

কেন?

 

শ্রাদ্ধের পর এই শরীর সম্পর্কে কোনও মোহ না থাকাই উচিত।

 

জল খান। তিন-চার গ্লাস। জল ওষুধ নয়।

 

মাথা নাড়লেন মেজর, সেটা খাওয়া যেতে পারে।

 

আমি ভাবছি, মিসেস ব্রাউনকে দেখতে যাব। কীভাবে যাব?

 

মার্টিনকে বলো। ও গাড়ি ড্রাইভ করবে।

 

টিউবের রুটটা কী?

 

আহা, গাড়িটা তো পড়েই আছে। ওটা নিয়ে যাও।

 

মার্টিন এককথায় রাজি। অতএব চা খেয়ে রওনা হল ওরা।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *