চার
জিম ব্রাউনের গাড়িটি বেশ আরামদায়ক। জিম গাড়ি চালাচ্ছেন, পাশে মেজর। পিছনে বসে অর্জুন ভাবল, এত দামি গাড়ির মালিক হওয়া সত্ত্বেও জিম ড্রাইভার রাখেননি। গতবারই শুনেছিল অতিরিক্ত বিত্তবান না হলে এদেশে কেউ ড্রাইভারের খরচ মেটাতে পারে না। ভারতবর্ষ হলে জিম কখনও ড্রাইভারের সিটে বসতেন না।
এখন সন্ধে নামব নামব করছে। এই সময় ডিনারের কথা জলপাইগুড়িতে অতি নিয়মনিষ্ঠ মানুষও ভাবেন না। সাহেবদের ব্যাপারই আলাদা। মাঝরাতে খিদে নিশ্চয়ই ঘুম ভাঙাবে। আমেরিকায় গাড়ি চালানো কোনও কঠিন কর্ম নয়। ক্ল্যাচ নেই। ব্রেক আর অ্যাক্সিলেটারের উপর নিয়ন্ত্রণ থাকলেই হল। সেইসঙ্গে রাস্তার নিয়মটা জানতে হবে। জিম বোধহয় ম্যানহাটনের উলটো দিকে ওঁদের নিয়ে যাচ্ছেন। প্রচুর গাড়ি সামান্য ব্যবধান রেখে ছুটছে, লাল আলো দেখলেই দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। এর আগেরবার সে পাতালরেলে বেশি ঘুরেছিল। তাতে তাড়াতাড়ি গন্তব্যে পৌঁছোনো যায় বটে, কিন্তু মাটির উপরের শহরটাকে চেনা যায় না।
বড় রাস্তা থেকে গাড়ি চলে এল সরু পথ ধরে যেখানে একটা বিশাল লেক, স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে। গাড়ি থেকে নামতেই নিয়ন সাইন চোখে পড়ল, ওয়াটার ফ্রন্ট রেস্টুরেন্ট।
জিম বললেন, চলো, এটা আমার প্রিয় জায়গা।
ওয়েটাররা জিমকে চেনে। পরম সমাদরে কাঁচের দেওয়ালের পাশে সাজানো টেবিলে একজন নিয়ে গেল ওঁদের। কাঁচের ওপাশেই জল। বেশ চওড়া এই জলাশয়ের উপরে আলো জ্বলছে পরপর। তার আলো পড়েছে। জলে। দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যায়। অর্জুন বলল, বিউটিফুল!
খুব খুশি হলেন জিম। জানলার ধারের দুটো চেয়ার মেজর এবং অর্জুনকে ছেড়ে দিয়ে বসে বললেন, আমি এখানে প্রায়ই ডিনার খেতে আসি। ওই জলের বুকে ভাসতে থাকা আলোগুলো দেখতে-দেখতে দিব্যি সময় কেটে যায়।
ওয়েটার এগিয়ে এলে জিম বললেন, তুমি কী নেবে? স্কচ অর বিয়ার? মেজর তো এখন এসব খায় না, আমরাই একটু খাই। কী বলো?
অর্জুন চমকে গেল। সে মেজরের দিকে অবাক হয়ে তাকাল। যে মেজর পান না করে থাকতেন না, পকেটে চ্যাপটা ছোট বোতল সব সময় রাখতেন, তিনি অভ্যেসটা ছেড়ে দিয়েছেন? কী করে সম্ভব হল?
অর্জুনকে ওইভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে মেজর বললেন, বুদ্ধিমান মানুষরা অবাক হয় না, প্রয়োজনে অবাক হওয়ার ভান করেন। কী খাবে বলে দাও।
কৌতূহল দমন করে অর্জুন জিমকে বলল, আমাকে একটা লেমন স্কোয়াশ দিতে বলুন। খুব বেশি ঠান্ডা যেন না হয়।
মাথা নেড়ে জিম ওয়েটারকে পানীয় এবং ডিনারের মেনু জানিয়ে বিদায় করে মেজরকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি কি এখনই কাজের কথা শুরু করব?
মেজর বললেন, দেরি করার কি কোনও কারণ আছে?
জিম একটু ভাবলেন, তারপর বললেন, না। আগে ডিনারটাই আরাম করে খাওয়া যাক। আমি কাল সকালে ওর সঙ্গে কথা বলব। তুমি কি আমার অফিসে আসতে পারবে? পকেট থেকে পার্স বের করে কার্ড এগিয়ে দিলেন জিম।
নিশ্চয়ই। অর্জুন বলল।
বাঃ। তা হলে সকাল এগারোটায় চলে এসো।
কার্ডে চোখ বুলিয়ে পকেটে রেখে দিল অর্জুন। ব্রুকলিনের ঠিকানা। জায়গাটা মেজরের বাড়ি থেকে কীভাবে যেতে হয় জেনে নিতে হবে।
ডিনার যখন মাঝামাঝি অবস্থায় তখন সেলফোন শব্দ করতে লাগল। বেশ বিরক্ত হয়ে সেটটাকে অন করে ওদিকের কথা না শুনে জিম বললেন, আমি এখন ডিনার টেবিলে। খুব দরকার হলে ঘণ্টাখানেক পর কল করবেন। লাইনটা কেটে দিলেন জিম। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে আবার ওটা বেজে উঠল। জিম ফোনটা অন করলেন না। বেজেই চলেছে দেখে মেজর হাত বাড়িতে ওটা তুলে নিতে জিম বললেন, প্লিজ, আমাকে কথা বলতে বলবে না। লোকটি অভদ্র, এক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে পারল না?
মেজর লাইনটা অন করে বললেন, হ্যালো! কে বলছেন?
জবাবটা তিনি শোনামাত্র লাউডস্পিকার অন করে দিলেন, সরি, কে বলছেন বললেন?
এবার গলা শোনা গেল, আমি সার্জেন্ট গোল্ডস্মিথ বলছি। আপনি এখনই আপনার বাড়িতে চলে আসুন। আপনার বাড়িতে একটা দুর্ঘটনা ঘটে গিয়েছে।
শোনামাত্র মেজরের হাত থেকে সেলফোন ছিনিয়ে নিয়ে জিম ব্রাউন উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে? কী দুর্ঘটনা ঘটেছে?
আপনি মিস্টার ব্রাউন?
অফকোর্স, আমি জিম ব্রাউন।
আপনার স্ত্রীকে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভরতি করা হয়েছে।
আমি আসছি, এখনই আসছি। অফিসার, ও বেঁচে আছে তো?
এখন পর্যন্ত আমরা কোনও খারাপ খবর পাইনি।
সেলফোন অফ করে অর্জুনের দিকে তাকালেন জিম। খুব নার্ভাস দেখাচ্ছিল তাকে। ন্যাপকিনে ঠোঁট মুছতে গিয়ে হাত কাপল। বললেন, আমাকে এখনই যেতে হবে। তোমাদের ডিনারটা নষ্ট করার জন্যে দুঃখিত। তোমরা খাওয়া শেষ করো। ওয়েটার! গলা তুলে ওয়েটারকে ডাকতে সে কাছে। এলে ক্রেডিট কার্ড এগিয়ে দিয়ে বললেন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফর্মালিটিস শেষ করো। আমাকে যেতে হবে।
ওয়েটার কার্ড নিয়ে চলে গেলে মেজর বললেন, তোমার এই বিপদের সময় আমরা তোমার দেওয়া ডিনার খেতে পারি না জিম। কিন্তু তোমার স্ত্রীকে কে আহত করল? কেনই বা করল?
আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। আজ এখানে ডিনার খাওয়ার প্ল্যান তো আগে ছিল না, থাকলে ওকে সঙ্গে নিয়ে আসতাম। ওর যদি… উঃ, আমি পাগল হয়ে যাব। আমি কল্পনা করতে পারছি না মেজর! উঠে দাঁড়ালেন জিম ব্রাউন।
অর্জুন চুপচাপ শুনছিল। এবার সে মেজরকে জিজ্ঞেস করল, আপনি কি ওঁর বাড়িতে যাবেন? আমার মনে হচ্ছে যাওয়া দরকার।
মেজর আপত্তি করলেন না। জিমের একটু কুণ্ঠা ছিল। তার মনে হচ্ছিল, একে তো রাতের খাওয়া নষ্ট হল, তার উপর অত দূরে নিয়ে যাওয়া মানে কষ্ট দেওয়া। কিন্তু অর্জুনের কথা শুনে না বলতে পারলেন না।
মেজরের অনুরোধে স্পিড বাড়াতে গিয়েও বাড়ালেন না জিম। তার মনে হচ্ছিল, যত তাড়াতাড়ি বাড়িতে পৌঁছোতে পারবেন তত মঙ্গল। কিন্তু মেজর মনে করিয়ে দিলেন, এখন জিমের আস্তে গাড়ি চালানো উচিত। মনের উপর যে চাপ পড়েছে তা সামলে জোরে চালালে বিপদ ঘটতে পারে।
অর্জুন দেখল, নিউ ইয়র্কে এখন রাত নেমেছে। নানান ধরনের গাড়ি ছুটছে। কিন্তু রাস্তা শব্দহীন। কোনও গাড়ি থেকেই হর্নের আওয়াজ বের হচ্ছে না। দেশের ড্রাইভাররা যে কেন এটা শেখে না? হঠাৎ তার চোখ বড় হল। অন্ধকারেও সে বুঝতে পারল, তারা একটা সমুদ্রের ধার দিয়ে যাচ্ছে। এই শহরের বুকের কাছে সমুদ্র আছে তা জানা ছিল না তার। সে মেজরকে জিজ্ঞেস করল, এটা কী সমুদ্র?
অতলান্তিক। মেজর সামনের সিটে বসে জবাব দিলেন।
অর্জুনের মনে পড়ল। কোথায় যেন পড়েছিল, পৃথিবীর সব সমুদ্রের মধ্যে অতলান্তিক হল সবচেয়ে ভয়ংকর। একটু পরে সমুদ্র থেকে সরে এল গাড়ি। অর্জুন ভেবে রাখল, একদিন দিনের বেলায় ওই সমুদ্র দেখতে হবে।
কিছুটা যাওয়ার পর মেজর মুখ ঘুরিয়ে বললেন, নিউ ইয়র্কের এই অঞ্চলটার নাম লং আইল্যান্ড। বড়লোকদের পাড়া বলতে পার।
কথাগুলো বাংলায় বললেন বলে জিম মানে বুঝতে পারলেন না। অবশ্য তিনি এখন অভ্যেসে গাড়িটা চালাচ্ছেন, মন পড়ে আছে পুলিশের দেওয়া খবরে।
এগজিট দিয়ে বড় রাস্তা থেকে নেমে ভিলেজ রোডে চলে এল গাড়ি। কিছুদূর যেতেই গাড়ির গতি কমে এলে অর্জুন দেখল, একটা বিরাট একতলা বাড়ির লনের পাশে দুটো পুলিশের গাড়ির ছাদে আলো জ্বলছে নিভছে। হাট করে খোলা গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকে পুলিশের গাড়িগুলোর পাশে গাড়ি পার্ক করলেন জিম! তারপর গাড়ি থেকে নেমে দ্রুত বাড়ির দরজার দিকে হাঁটতে লাগলেন। মেজর এবং অর্জুন গাড়ি থেকে নেমে ওঁকে অনুসরণ করতে গিয়েও পিছিয়ে পড়লেন। অর্জুন দেখল, বিশাল লনে জোরালো আলো ছড়িয়ে আছে। লনের চারপাশে ফুলের গাছ, জিম সত্যি ধনী ব্যক্তি।
ওঁরা দরজায় গিয়ে দেখলেন, দু’জন পুলিশ অফিসারের সঙ্গে বেশ উত্তেজিত হয়ে জিম কথা বলছেন। মোটামুটি লম্বা চেহারার অফিসার বলছেন, আপনি শান্ত হন। এখন হাসপাতালে গেলে কোনও লাভ হবে না। আপনার স্ত্রীর সঙ্গে ওরা দেখা করতে দেবে না। আমি লাইনটা ধরে দিচ্ছি, আপনি কথা বলে দেখুন।
সেলফোনে লাইন ধরে জিমকে দিলেন অফিসার। জিম বললেন, আমি জিম ব্রাউন। একটু আগে আমার স্ত্রীকে আহত অবস্থায় পুলিশ আপনাদের হাসপাতালে ভরতি করেছে। আমি তাকে দেখতে এখনই আসতে পারি কি?
ওপাশের কথা শুনে মাথা নাড়লেন জিম, ও হো! ও কেমন আছে?
সেটা শোনার পর জিম ভেঙে পড়লেন, আই সি ইউ-তে আছে। ও বাঁচবে তো? প্লিজ, আমাকে মিথ্যে বলবেন না।
উত্তরটা শুনে মাথা নাড়লেন। ঠোঁট টিপে কান্না সামলে টেলিফোন রেখে দিয়ে একটা চেয়ারে ধপ করে বসে পড়লেন।
মোটাসোটা অফিসার এবার মেজরের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ওয়েল, জেন্টলম্যান, আপনাদের পরিচয় জানতে পারি?
মেজর আমেরিকান উচ্চারণে বললেন, আমি জিমের বন্ধু। এই ছেলেটি আমার গেস্ট। আমরা যখন ওয়াটার ফ্রন্টে ডিনার করছিলাম তখন ওর কাছে খবরটা পৌঁছেছিল। ওর এই বিপদে ওকে একলা ছেড়ে দিতে চাইনি।
ও কে। আমি সার্জেন্ট গোল্ড স্মিথ। চল্লিশ মিনিট আগে আমি এই রাস্তায় ডিউটিতে ছিলাম। হঠাৎ দেখলাম, এই বাড়ি থেকে একটা বাইক তীব্র গতিতে বেরিয়ে উলটো দিকে চলে গেল। আমি বাইকটাকে চেজ করতে পারতাম অত জোরে চালানোর জন্যে। কিন্তু আমার মনে হয়েছিল এই বাড়ির ভিতরে নিশ্চয়ই কিছু ঘটেছে। ভাগ্যিস সেটা মনে হয়েছিল, না হলে আমরা মিসেস ব্রাউনকে অত তাড়াতাড়ি হসপিটালাইজ করতে পারতাম না। ওঁর পিঠে, কোমরে, কাঁধে ছুরি মারা হয়েছে। প্রচণ্ড ব্লিডিং হচ্ছিল এবং ওঁর জ্ঞান ছিল না। যে ছুরি দিয়ে ওঁকে মারা হয়েছে, ছুরিটাকে আততায়ী এখানে ফেলে যায়নি। এই বাড়িতে আর-একজন বৃদ্ধা থাকেন। তার কত বয়স হয়েছে জানি না, কিন্তু ভাল করে কথা বলতে পারেন না। তাকে জিজ্ঞেস করে একমাত্র ওঁর সেলফোন নাম্বার ছাড়া কিছু পাওয়া যায়নি। নাম্বারটা বৃদ্ধার সেলফোনেই ছিল। তিনি কোনও চিৎকার, চেঁচামেচি শুনতে পাননি।
মাথা নাড়লেন জিম, আমার মা, এখন একদম শুনতে পান না।
মিস্টার ব্রাউন, আপনি আজ কখন বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন?
লাঞ্চের পরে। কয়েকটা কাজ শেষ করতে বিকেল হয়ে গেল। তখন মেজরের কাছে গিয়েছিলাম। স্ত্রীকে বলে গিয়েছিলাম, ফিরতে রাত হতে পারে। জিম বললেন।
আপনার বা আপনার স্ত্রীর সঙ্গে কারও শত্রুতা ছিল?
ওর মতো নিরীহ মানুষের কোনও শত্রু থাকতে পারে না।
আপনি এই কাজটা কার হতে পারে বলে সন্দেহ করছেন?
অফিসার, বিশ্বাস করুন, আমি ভাবতে পারছি না।
আপনার ছেলেমেয়ে?
মেয়ে ওয়াহিও ইউনিভার্সিটিতে পড়াচ্ছে। ওর স্বামীও ওখানকার প্রোফেসর। ছেলে কোথায় আছে তা আমি জানি না। জিম মাথা নাড়লেন।
ছেলের সঙ্গে আপনার এখন সম্পর্ক নেই?
হ্যাঁ। ও বাজে সংস্পর্শে পড়েছিল। স্কুলের পর পড়াশুনো ছেড়ে দিয়েছিল। আমি ওসব পছন্দ না করায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। ও আমাদের বেশি বয়সের সন্তান। দিদি এবং ভাই-এর বয়সের পার্থক্য অনেক।
ইদানীং কি ও আপনাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছে?
আমি জানি না। ওর মা আমাকে কিছু বলেনি।
ওর একটা ফোটো আমাদের চাই। না, না, এখনই দিতে হবে না। কাল সকালে দিলেই হবে। বুঝতেই পারছেন, ওকেও কিছু প্রশ্ন করা দরকার।
সার্জেন্টের কথা শুনে জিম মাথা নাড়লেন, কিন্তু ওর এখনকার ফোটো তো এই বাড়িতে নেই। স্কুল থেকে বেরোবার সময় ওর মায়ের সঙ্গে ফোটো তুলেছিল। সেই চেহারা নিশ্চয়ই বদলে গিয়েছে এতদিনে। সেটা যদি কাজে লাগে তা হলে দিতে পারি।
সেটাই নেবেন জানিয়ে সার্জেন্ট তার সঙ্গী অফিসারকে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। পুলিশের দুটো গাড়ি গেট দিয়ে বেরিয়ে গেল।
মেজর জিজ্ঞেস করলেন, মনে হল, তুমি ওদের সত্যি কথা বললে না জিম!
জিম চুপ করে থাকলেন।
মেজর জিজ্ঞেস করলেন, হাসপাতাল কী বলল?
একটু পরে ওর জ্ঞান ফিরবে বলে আশা করছে। জ্ঞান ফিরলে, কন্ডিশন স্টেবল হলে কাল সকালে অপারেশন করবে। আমাকে সকাল সাড়ে ছ’টার মধ্যে যেতে হবে। উঃ, আমি ভাবতেই পারছি না। জিম উঠে দাঁড়ালেন।
অর্জুন এতক্ষণে কথা বলল, আপনার স্ত্রীর সঙ্গে ছেলে কী কথা বলত তা সত্যি আপনি জানতেন না?
জিম অর্জুনের দিকে তাকালেন, হা, জানতাম। আমি ওকে নিষেধ করেছিলাম ছেলের ফোন এলে কথা বলতে।
কেন? মেজর জিজ্ঞেস করলেন।
টম চাইত আমার অনুপস্থিতিতে মায়ের সঙ্গে দেখা করতে। দীর্ঘকাল দেখা না হওয়ায় আমার স্ত্রী ওর প্রস্তাবে দুর্বল হয়ে পড়ত। আমার জন্যে কিছু বলতে পারত না।
কেন দেখা করতে চাইত? অর্জুন জিজ্ঞেস করল।
কেন আবার? মায়ের কাছ থেকে যদি পাঁচ-দশ হাজার ডলার পাওয়া যায় তা হলে কিছুদিন মজায় কাটাতে পারবে।
ও কি মায়ের কাছে টাকা চাইত?
আমি সন্দেহ করি, যদিও আমার স্ত্রী কখনও সেরকম কথা বলেনি?
তা হলে আপনি কী মনে করেন, ছেলেই তার মাকে ছুরি মেরেছে?
আমি কী করে বলব? তখন তো আমি সামনে ছিলাম না।
মেজর চেয়ারে বসলেন, কিন্তু জিম, এসব কথা তুমি পুলিশকে বললে না কেন? কাকে সন্দেহ হয় জিজ্ঞেস করেছিলেন অফিসার। তুমি ছেলের নাম বলোনি। যাকে নিয়ে দুশ্চিন্তার কথা তুমি আমাকে বললে, তা পুলিশকে জানানো তোমার কি কর্তব্য ছিল না?
মেজর আমার সন্দেহের কথা পুলিশকে জানালে ওরা আজ না হয় কাল ঠিক ওকে ধরে ফেলত। যদি এই কাজটা ও না করে থাকে তা হলে আমার স্ত্রী সুস্থ হয়ে ফিরে এসে যখন শুনত, আমার সন্দেহের কারণে ছেলে জেলে ঝুলছে, তা হলে খুব ধাক্কা খেত। আমাকে দায়ী করত। জিম বললেন।
ও যদি খুনের চেষ্টা করে থাকে তা হলে নিশ্চয়ই ধাক্কা খেতেন না। মেজর জিজ্ঞেস করলেন, সেক্ষেত্রে ছেলের শাস্তি চাইতেন তিনি।
আমি জানি না, আমাকে আগে স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে হবে। কাল সকালে যদি ওর সেন্স ফিরে আসে, ডাক্তার যদি কথা বলার অনুমতি দেয়! জিম ক্লান্ত গলায় বললেন।
মেজর চলে গেলেন ল্যান্ডলাইনের টেলিফোনের কাছে। রিসিভার তুলে নাম্বার ডায়াল করে জিমের বাড়ির ঠিকানা বলে ট্যাক্সি পাঠাতে বললেন।
জিম জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা চলে যাচ্ছ?
হ্যাঁ।
ও! আমি তোমাদের পৌঁছে দিতে পারছি না। আমি সত্যি দুঃখিত। আবার এই রাতে বাড়িতে একা থাকতেও স্বস্তি বোধ করছি না। আই ডোন্ট নো, যে খুন করতে চেয়েছিল সে যদি আবার ফিরে আসে? জিম নিচু গলায় বললেন।
মেজর এগিয়ে গিয়ে ওঁর কাঁধে হাত রাখলেন, তুমি পুলিশকে বলো…!
নাঃ। হয়তো আমি ভুল ভাবছি! ও কে!
মিস্টার ব্রাউন, অর্জুন এগিয়ে এল, আমি যদি আজকের রাতটা এই বাড়িতে থাকি তাতে কি আপনার আপত্তি আছে?
প্রস্তাবটা শোনামাত্র মুখে হঠাৎ আলো ফুটল জিমের, তুমি থাকবে? ওঃ, আই উইল বি হাইলি অবলাইজড।
এই সময় গাড়ির হেডলাইট এসে পড়ল বাড়ির উপর। মেজর বললেন, ঠিক আছে। অর্জুন, তুমি এখানেই থেকে যাও। কাল সকালে একটা ট্যাক্সি নিয়ে না-হয় কুইন্সে চলে এসো। মেজর এগিয়ে গেলেন দরজার দিকে। তার ট্যাক্সি এসে গিয়েছে।
আমেরিকার বাড়িগুলোর দেওয়াল ইটের নয়। পাতলা কাঠের। বাড়ির দরজাও পলকা। ঠেললে খুলবে না, কিন্তু একটু বেশি শক্তি প্রয়োগ করলে প্রতিরোধ করতে পারবে না। ধরেই নেওয়া হয় দরজা বন্ধ দেখেও যারা বেশি শক্তি প্রয়োগ করে তারা অপরাধী। এই কারণে দরজায়, জানলায় অ্যালার্ম লাগানো হয়। শক্তি প্রয়োগ করলেই যন্ত্র এমন জানান দেয় যে, প্রতিবেশীরা
তো বটেই, পুলিশও ছুটে আসে। এদেশে বাড়ি তৈরি হয় বড়জোর ষাট বছরের জন্যে। একজন তিরিশ বছর বয়সি মানুষ সেই বাড়ি কিনলে গোটা জীবন চমৎকার কাটিয়ে দিতে পারে। কখনও ছেলেমেয়ে, নাতির কথা ভেবে শক্তপোক্ত বাড়ি তৈরির কথা ভাবা হয় না।
দরজা বন্ধের পর অ্যালার্ম চালু করে দিয়ে জিম জিজ্ঞেস করলেন, ফ্রিজে কিছু খাবার আছে, তাই গরম করে দিই। তোমার তো ডিনার অর্ধেকও করা। হয়নি।
অর্জুন মাথা নাড়ল, এখনই দরকার নেই।
বেশ। এই বাড়িতে বেডরুম চারটে। নীচে গেস্টরুম, লিভিংরুম; হল, কিচেন। এসো আমার সঙ্গে। জিম একটা ছোট সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলেন, পিছনে অর্জুন।
মাঝখানে সুন্দর কার্পেট মোড়া ফাঁকা ঘর। দু’পাশে চারটে বেডরুম।
বাঁ দিকের শেষ দরজাটা খুললেন জিম। ভিতর থেকে অদ্ভুত আওয়াজ ভেসে এল। দরজায় দাঁড়িয়ে অর্জুন দেখল, জিম গিয়ে বসেছেন বিছানার একপাশে। আর তাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে এক বৃদ্ধা কেঁদে কেঁদে কিছু বলছেন! জিম বললেন, ঠিক আছে মা, আমি তো এসে গিয়েছি, তোমার কোনও ভয় নেই।
বৃদ্ধা ততক্ষণে অর্জুনকে দেখতে পেয়ে উত্তেজিত হয়ে আঙুল তুলে দেখিয়ে জড়ানো গলায় চেঁচিয়ে বললেন, হু-হুঁ-ইজ-দেয়ার?
জিম হাসলেন, হি ইজ গোয়িং টু হেলপ আস মম। হিজ নেম ইজ অ-র জুন।
অর্জুন ঘরের ভিতরে ঢুকে বৃদ্ধার সামনে দাঁড়িয়ে মাথা ঝোঁকাল। বৃদ্ধা তার দিকে ভাল করে দেখে ছেলের দিকে তাকালেন, হি-হি-গুড!
গুড। এখন তুমি একটু ঘুমোবার চেষ্টা করো। তুমি কি একটু দুধ খাবে?
বৃদ্ধা মাথা নেড়ে না বললেন।
চাদরটা বৃদ্ধার বুক পর্যন্ত টেনে দিয়ে একটা মৃদু আলো জ্বেলে দিয়ে, গুড নাইট মম! বলে বেরিয়ে এলেন জিম। অর্জুন তাকে অনুসরণ করল।
বাইরে বেরিয়ে জিম বললেন, এপাশের দুটো বেডরুম আমরা স্বামী-স্ত্রী ব্যবহার করি। নীচে গেস্টরুম আছে, আর উপরের চার নাম্বার বেডরুমটায় কেউ থাকে না। তুমি কোন ঘরে থাকতে পছন্দ করছ?
আমার বোধহয় নীচের ঘরে থাকা উচিত।
বেশ, তুমি নীচে যাও, আমি আসছি। জিম বললেন।
নীচে নেমে এল অর্জুন। গেস্টরুমে ঢুকে দেখল, দামি হোটেলের সঙ্গে কোনও তফাত নেই। দেওয়াল-আলমারির পাল্লা খুলে দেখল, এক কাপড়ের সুন্দর স্লিপিংসুট ভাঁজ করা রয়েছে। যাক, রাত্রে শার্ট-প্যান্ট পরে শুতে হবে না। এগুলো নিশ্চয়ই এই ঘরে যে অতিথি থাকবেন তার জন্যে রেখে দেওয়া। হয়েছে।
পোশাক পরিবর্তন করে অর্জুন খুশি হল। যেন তার শরীরের মাপ নিয়ে এগুলো বানানো হয়েছে। সে দরজা খুলে বাইরে আসতেই জিমকে দেখতে পেল। নিজের পরনে এখন শোওয়ার পোশাক। কিন্তু তার সামনের টেবিলে গ্লাসের ভিতর সোনালি রঙের পানীয়ে কয়েক টুকরো বরফ ভাসছে। জিম বললেন, বোসো। জিমকে খুব অন্যমনস্ক দেখাচ্ছিল।
অর্জুন বসল। কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করার পর অর্জুন জিজ্ঞেস করল, আপনার ছেলে কোথায় থাকে? ওর প্রফেশন কী?
আমি কিছুই জানি না। তবে ব্রঙ্কসে ওকে অনেকে দেখেছে।
ব্রঙ্কস?
ম্যানহাটন, কুইন্স, ব্রঙ্কস, স্যাটার্ন আইল্যান্ড আর লং আইল্যান্ড নিয়ে নিউ ইয়র্ক। ম্যানহাটনের পাশে হার্লেম আর ব্রঙ্কস হল কালোদের জায়গা। বেশিরভাগ ক্রিমিনাল ওখানেই আস্তানা গাড়ে। কারণ, ওখানকার কয়েকটা এলাকায় বড় দলে না গেলে পুলিশও ঢুকতে সাহস পায় না। আমার কোনও ইন্টারেস্ট নেই ও কোথায় থাকে তা জানার। আর ওর প্রফেশন সম্পর্কে আমার কোনও ধারণা নেই। ক্রাইমওয়ার্ল্ডে ঢুকে গিয়ে কোনও শক্তিশালী দলের সঙ্গে হাত মেলালে রোজগারের ভাবনা ভাবতে হয় না।
তা হলে আপনার ছেলে তার মায়ের কাছে টাকা চাইতে কেন এসেছিল? ওর তো অন্য পথে রোজগার থাকার কথা।
হয়তো সেখানে কোনও সমস্যা হয়েছে।
মিস্টার ব্রাউন, আপনার ছেলে এরকম হল কেন?
একটা বড় চুমুকে গ্লাস অর্ধেক করে জিম বললেন, আমাদের দুর্ভাগ্য। ওর দিদি অত ব্রিলিয়ান্ট ছাত্রী ছিল বলে আমরা ভেবেছিলাম ও সেরকম হবে। ওর মা চাইত, দিদির কথা বলে ওকে ইন্সপায়ার করতে। আমরা বুঝিনি, খুব। সাধারণ মানের ছাত্র বলে ও দিদিকে ঈর্ষা করত। স্কুলের বাজে ছেলেদের সঙ্গে মেলামেশা শুরু করে দিয়েছিল অল্প বয়সেই। তাদের কাছ থেকে ড্রাগ খাওয়া শিখেছিল সে। পনেরো বছর বয়সে প্রথম স্কুল থেকে ওর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ এল। ওকে স্কুল থেকে বের করে দিত কিন্তু ওর মা হাতে পায়ে ধরায় প্রিন্সিপাল সেবার ক্ষমা করেছিলেন। কিন্তু পরীক্ষায় ফেল করল ও। তারপর থেকেই আমাদের অবাধ্য হতে ওর খুব ভাল লাগত। রাত দুটো বা তিনটের সময় বাড়ি ফিরত। এইভাবে চলছিল। আঠারো বছরের পর ও বাড়িতে আসা বন্ধ করল। এখন মাঝে মাঝে মোটরবাইকে ওকে দেখা যায় ওই ব্রঙ্কস এলাকায়।
এখন ওর বয়স কত?
পঁচিশ পেরিয়েছে।
আপনার কি মনে হয় ও নিজের মাকে খুন করতে পারে?
কোনও কিছুই অসম্ভব বলে এখন মনে হচ্ছে না।
অর্জুন জিমের মনের অবস্থা বুঝতে পারছিল। তার মনে হচ্ছিল, জিমের এখন শুয়ে পড়া উচিত। তবু জিম গ্লাস শেষ করতে যাচ্ছেন দেখে সে জিজ্ঞেস করল, আপনি বোধহয় জেমস বন্ডের মতো একজনকে খুঁজছিলেন। মেজর আপনাকে আমার কথা বলেছিলেন? আমাকে দেখে আপনি খুব হতাশ হন। আপনি আমাদের ডিনার খাওয়াতে নিয়ে গিয়েছিলেন বটে, কিন্তু মনস্থির করতে পারেননি। আপনি কেন একজন সত্যসন্ধানীকে খুঁজছিলেন?
জিম হাসলেন, আমি ভয় পাচ্ছিলাম আমার কোনও ক্ষতি হবে। আমি একবারও ভাবিনি আঘাতটা আমার স্ত্রীর উপর আসবে। ভাবলে আরও বেশি তৎপর হতাম।
আপনি কেন ভয় পাচ্ছিলেন?
আমার ছেলে এই শহরে আছে কিন্তু কোথায় আছে তা জানি না। আমাকে এড়িয়ে সে মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। তার সঙ্গীরা হল ভয়ংকর ক্রিমিনাল। ভয় হচ্ছিল সেই কারণে। আমি ওর ঠিকানাটা জানতে চাইছিলাম। ঠিকানা জানলে ওর গতিবিধির উপর নজর রাখতে পারতাম। প্রাইভেট ডিটেক্টিভ এজেন্সিগুলোর উপর আমার একটুও ভরসা নেই। আবার পুলিশের কাছে যেতে চাইনি। আমি কোনও কারণ ছাড়াই ছেলেকে ভয় পাচ্ছি এটা শুনলে ওরা কোনও গুরুত্ব দিত না। জিম বললেন।
অর্জুন বলল, আপনি এবার শুয়ে পড়ুন।
জিম উঠলেন। ধীরে ধীরে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। কথাটা মনে আসতে অর্জুন জিজ্ঞেস করল, আপনার মেয়েকে খবরটা দিয়েছেন।
মাথা নাড়লেন জিম, না। কাল সকালে হাসপাতালে গিয়ে দেখব ও কেমন আছে, দেখে ফোন করব। গুড নাইট।
অর্জুন বলল, গুড নাইট।
এখন এই বাড়ি শান্ত। কোথাও কোনও শব্দ নেই। আলো নেভাতে গিয়ে টেবিলে পড়ে থাকা গ্লাসটার উপর চোখ পড়ল। সেটাকে তুলে নিয়ে কিচেনের বেসিনের পাশে রেখে এল অর্জুন। এত বৈভব, এত বিলাসিতা, কিন্তু বাড়িতে কোনও কাজের লোক নেই। অতিরিক্ত বিত্তশালী না হলে ড্রাইভার তো বটেই, কাজের লোকও রাখা সম্ভব নয়। ভারতীয় টাকায় মাসে যে আট লাখ টাকা রোজগার করে, তাকেও নিজের হাতে বাসন মাজতে হয়, রান্না থেকে ঘর পরিষ্কার না করে উপায় থাকে না। বাড়ির লনে ঘাস বড় হলে সেগুলো ছাঁটাও তার কর্তব্য।
আলো নিভিয়ে গেস্টরুমে চলে এল অর্জুন। জিম ব্রাউন না হয় এ দেশের মানুষ, অনেক ভারতীয়র হাজার সমস্যা থাকা সত্ত্বেও দেশে ফিরে যেতে চায় না। মানুষের টাকা রোজগার করতে গিয়ে দুঃখ কেন?
ঘরের আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ল অর্জুন। এখন চারধার চুপচাপ। দূরের রাস্তায় মাঝে মাঝে কোনও গাড়ি ছুটে গেলে তার আওয়াজ ভেসে এসেই মিলিয়ে যাচ্ছে। সারা দুপুর ঘুমোনোর জন্যে এখন অর্জুনের ঘুম আসছিল না।
ঘণ্টাখানেক পর সে উঠে বসল। ঘুম না আসার একটা কারণ, তার খিদে পেয়েছে। ওয়াটার ফ্রন্ট রেস্টুরেন্টে খাওয়া শুরু করামাত্র ফোনটা এসেছিল। সময়টা ছিল সন্ধেবেলা। এখন গভীর রাত। জিম নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে পড়েছেন।
কয়েক মিনিট চুপচাপ বসে থাকার পর অর্জুন উঠল। কিচেনের রেফ্রিজারেটরে কি কোনও খাবার নেই? মিসেস ব্রাউন কি আজ সকালে কিছু তৈরি করে রেখে দেননি ওখানে? যদিও ওখান থেকে জিমকে না জানিয়ে খাবার নেওয়া অনুচিত, কিন্তু নিশ্চয়ই চুরি বলে মনে করবেন না জিম?
দরজা খুলে নিঃশব্দে বড় ঘরে পা রাখল অর্জুন। ঘরে বাতি না জ্বললেও কাঁচের দেওয়ালের আড়াল ভেদ করে আকাশের আলো চুঁইয়ে ঢুকছে ভিতরে। তাতে অবশ্য কোনও কিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু ঘুরঘুট্টি অন্ধকারের চেয়ে একটু স্বস্তি এনে দিয়েছে। অর্জুন কিচেনের দিকে পা বাড়াল। মেঝের উপর কার্পেট থাকায় শব্দ হওয়ার কারণ নেই।
রেফ্রিজেটরের দরজা খুলতেই আলো জ্বলে উঠল ভিতরে। অনেক পাত্র রাখা আছে। প্রথমটি তুলতেই অর্জুন খুশি হল। পুডিং। এখনও ছুরির স্পর্শ পায়নি যখন, তখন আজ-কালের মধ্যেই বানিয়েছিলেন মিসেস ব্রাউন।
একটা প্লেটে খানিকটা পুডিং চামচ দিয়ে তুলে নিয়ে পাত্র যথাস্থানে রেখে দরজা বন্ধ করতেই আলো নিভে গেল। কিচেনে দাঁড়িয়েই এক চামচ পুডিং মুখে দিল অর্জুন। আঃ, দারুণ স্বাদ। খিদের কারণে দ্রুত পুডিং শেষ করে সে গ্লাস খুঁজে না পেয়ে জিমের ব্যবহার করা গ্লাস কলের জলে ধুয়ে আবার ভরে নিয়ে চুমুক দিল। ঠিক তখনই কোথাও কট করে একটা শব্দ হল। তারপর আবার সব চুপচাপ।
খালি বাড়িতে রাতের বেলায় শব্দ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। অর্জুন নিশ্চিত যে, সে ভুল শোনেনি। গ্লাস হাতে নিয়েই সে কিচেনের দরজায় গিয়ে দাঁড়াল। ঘর যেমন ছিল ঠিক তেমনই আছে। কাঁচের দেওয়ালের ওপাশে গোটানো পরদা, তাই বাইরের লন ঝাপসা দেখা যাচ্ছে। এই সময় দ্বিতীয়বার কট শব্দটা হল।
অর্জুন দরজার দিকে তাকাল। শব্দটা হচ্ছে দরজার ওপাশে। এটা হাওয়ার ধাক্কা নয়। সে পা টিপে টিপে দরজার এপাশে চলে আসামাত্র তৃতীয়বার শব্দটা হল। দরজার গায়ে তালায় চাবি বা ওই জাতীয় কিছু ঢুকিয়ে, কেউ খোলার চেষ্টা করছে। কিন্তু জিম এদিকের লকটা নামিয়ে দেওয়ায় চাবি কাজ করছে না।
কী করা যায়? লক তুলে দরজা চটপট খুললেই আগন্তুককে দেখা যাবে। লোকটি নিশ্চয়ই সেটা পছন্দ করবে না। সঙ্গে অস্ত্র থাকলে অর্জুনকে আঘাত করবেই। বোকামি করার কোনও মানে হয় না। অর্জুন ধীরে ধীরে কাঁচের দেওয়ালের পাশে ঝুলে থাকা পরদার আড়ালে গিয়ে দাঁড়াল। একটু ঝুঁকতেই বারান্দায় দাঁড়ানো লোকটির ঝাপসা মূর্তি দেখতে পেল সে। লোকটি তার দিকে পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছে। মুখ দেখা যাচ্ছে না কিন্তু লোকটি যে বেশ লম্বা তাতে কোনও সন্দেহ নেই। এবার দরজায় আলতো টোকা দিল লোকটি। কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করে আবার টোকা দিল। এবার একটু জোরে। তারপর অর্জুনকে অবাক করে চাপা গলায় ডাকল, মম, মম।
এতক্ষণ অর্জুন লোকটিকে জিম ব্রাউনের ছেলে বলে ধারণা করেছিল। মাকে খুন করার চেষ্টা করেও নিশ্চয়ই অন্য কোনও মতলবে ফিরে এসেছে। কিন্তু মম ডাক শুনে অর্জুনের মনে হল, এতক্ষণ তারা পুরোটাই ভুল ভেবে নিয়েছিল। লোকটি যখন এ বাড়ির দরজায় এসে মা বলে ডাকছে, তখন মিসেস ব্রাউনের হাসপাতালে যাওয়ার ঘটনাটা ওর জানা নেই। ও যদি ছুরি মেরে থাকে, তা হলে কখনওই এই সময়ে এসে ‘মা’ বলে ডাকবে না। ছেলের বদলে অন্য কেউ যদি হয় তা হলে সে ‘মা’ বলবে কেন? অর্জুনের মনে হল, লোকটির সঙ্গে কথা বলা দরকার। সে দেওয়ালের কাঁচে শব্দ করে লোকটির দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইল। কিন্তু শব্দ হওয়ামাত্র লোকটি হকচকিয়ে এদিকে তাকাল এবং এক লাফে নীচে নেমে দ্রুত গেটের দিকে চলে গেল। তারপরেই বাইকের শব্দ হল রাস্তায়। মুহূর্তেই শব্দ মিলিয়ে গেল।
