(৪)
ভাদুড়িমশাইয়ের সঙ্গে যিনি দেখা করতে এসেছেন, তাঁকে ভিতরে নিয়ে আসবে, না কি পরে আসতে বলবে, কাজের মেয়েটিকে সে-কথা জানাবার আগেই মালতী এসে ঘরে ঢুকে বলল, “আমার রান্না হয়ে গেছে, দাদা, চটপট তোমরা খাবার টেবিলে গিয়ে বোসো, নয়তো সব ঠান্ডা হয়ে যাবে।”
“এখুনি কী করে খেতে বসব?” ভাদুড়িমশাই বললেন, “একজন যে দেখা করতে এসেছে!”
“ভাগিয়ে দাও, নয়তো বিকেলের দিকে আসতে বলো।”
“তা-ই কি বলা যায় নাকি? মনে হচ্ছে কলকাতার বাইরে থেকে এসেছে। পুজোগন্ডার দিন, আমার সঙ্গে কাজ সেরেই হয়তো ফিরে যাবে, এখন যদি বিকেলে আসতে বলি তো লোকটা ততক্ষণ কী করবে? কলকাতার রাস্তায়-রাস্তায় এই ভরদুপুরে ফ্যাফ্যা করে ঘুরে বেড়াবে নাকি?”
অরুণ স্যান্যাল বললেন, “না না, তা হয় না। লোকটা দেখা করতে এসেছে, আর বাড়িতে থাকা সত্ত্বেও আমরা তাকে ফিরিয়ে দেব? কী যে বলো। খেতে না হয় দু’-পাঁচ মিনিট দেরিই হবে, তাতে কিছু মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না। তা ছাড়া আজ ছুটির দিন, দেরি তো একটু হতেই পারে।”
“ঠিক আছে,” মালতী বলল, “তা হলে ভিতরে নিয়ে এসো। আমি ওঁর জন্যে চা-বিস্কুট পাঠিয়ে দিচ্ছি। কিন্তু মনে রেখো যে, একটা বেজে গেছে, বেশিক্ষণ কথা বলা চলবে না, যত তাড়াতাড়ি পারো ভাগিয়ে দেবে।”
অনুমতি পেয়ে কাজের মেয়েটি যাঁকে ড্রয়িং রুমে নিয়ে এল, সেই ভদ্রলোকটির বয়স মনে হল তিরিশ-পঁয়তিরিশের বেশি হবে না। পরনে মামুলি শার্টপ্যান্ট, মাথার চুল ছোট করে ছাঁটা, পায়ে জুতো নেই। তবে খালিপায়ে নিশ্চয় অসেননি, জুতোজোড়া সম্ভবত ঘরের বাইরে খুলে রেখে এসেছেন। রোগা-পাতলা ছোটখাটো মানুষ, দৈর্ঘ্য বোধহয় পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চির বেশি হবে না, তার উপরে দাঁড়াবার ভঙ্গিটি এতই সংকুচিত যে, শরীরের দৈর্ঘ্যকে যেন সেই কারণেই আরও কম বলে মনে হয়। এ-সব লোক ভিড়ের মধ্যে খুব সহজেই হারিয়ে যায়, আলাদা করে এদের চেনা যায় না।
কোত্থেকে এসেছেন, জিজ্ঞেস করতে ভদ্রলোক যা বললেন, তাতে বোঝা গেল যে, কাজের মেয়েটি ভুল বলেছিল। জায়গাটার নাম পরেশডাঙাও নয়, ফরাসডাঙাও নয়, পলাশডাঙা। ভদ্রলোকের নাম সুরেশচন্দ্র দাস। এসেছেন পলাশডাঙার কালীচরণ সেনের কাছ থেকে।
ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়েই কথা বলছিলেন। আর ক্রমাগত হাত কচলাচ্ছিলেন। এটা বোধহয় এঁর একটা ব্যাধি। অরুণ স্যান্যাল বসতে বলায় একটু ইতস্তত করতে লাগলেন। তারপর ভাদুড়িমশাই যখন বললেন, “আরে বসুন না মশাই, দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে কি কথা হয় নাকি,” তখন একটা চেয়ারের একেবারে কিনার ঘেঁষে যে-রকম কুণ্ঠিত ভঙ্গিতে বসলেন, তাতে আমার মনে হল, দাঁড়িয়ে থাকাটাই এঁর পক্ষে আরও স্বস্তিজনক হচ্ছিল।
‘কালীচরণ সেন’ নামটাকে খুবই আত্মগতভাবে দু’চার বার উচ্চারণ করে ভাদুড়িমশাই বললেন, “ঠিক মনে করতে পারছি না। আমার কাছে আপনাকে কেন পাঠিয়েছেন, সেইটে বরং বলুন।”
“আজ্ঞে একটা চিঠিও তিনি লিখে দিয়েছেন।” শার্টের বুকপকেট থেকে একটা খাম বার করে খুবই বিনীত ভঙ্গিতে ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে সুরেশচন্দ্র বললেন, “এই চিঠিখানা পড়লেই সব জানতে পারবেন।”
চিঠি পড়ে ভাদুড়িমশাই মৃদু হেসে বললেন, “ওহো, আমি ভুলেই গিয়েছিলুম। মাদ্রাজের রোটারি ক্লাবে এঁর সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছিল বটে। তা সে তো বছর পাঁচেক আগের কথা।”
“আজ্ঞে তখন বোধহয় তিনি মাদ্রাজের রামনাদ কটন মিলের ম্যানেজার ছিলেন।”
“রাইট। ভদ্রলোককে এখন আরও স্পষ্ট করে মনে করতে পারছি। দোহারা চেহারা, চওড়া কপালের ডান দিকে একটা কাটা দাগ, বাঁ গালে আঁচিল, টকটকে ফর্সা রং…কী, ঠিক বলছি?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ, স্যার।”
“রামনাদে গিয়ে একটা উইক এন্ড কাটাবার জন্য আমাকে রিকোয়েস্টও করেছিলেন। কিন্তু আমার যাওয়া হয়নি। তা এখানে উনি কবে এলেন?”
“আজ্ঞে গত বছরের জুন মাসে। উনিই তো ওখানে…মানে আমাদের পলাশডাঙায় এখন সর্বেসর্বা।”
যেমন ‘কালীচরণ সেন’-এর বেলায় করেছিলেন, তেমনি ‘পলাশডাঙা’ নামটাকেও বার দুয়েক আপন মনে উচ্চারণ করলেন ভাদুড়িমশাই। তারপর বললেন, “নামটা যেন চেনা-চেনা মনে হচ্ছে।
আমি বললুম, “হতেই পারে। কাগজে তো মাঝে-মাঝেই খবর বেরোয়। বুকানন ব্রাদার্সের নাম শুনেছেন তো?”
“তা শুনেছি বই কী। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি, ইউরোপ আমেরিকা আর আফ্রিকা জুড়ে বিশাল কারবার, তার উপরে আবার আমাদের ইকনমিক পলিসির লিবরেলাইজেশনের পরে শুনছি এখানেও ঢুকেছে।”
“ঠিকই শুনেছেন। তবে এখানে ওদের নাম বুকানন ব্রাদার্স নয়, বুকানন ইন্ডিয়া। বাজারে অন্তত ওই নামে ওরা শেয়ার ছেড়েছে।”
“রাইট। মনে পড়েছে। পলাশডাঙায় ওরা কীসের যেন একটা কারখানা বসিয়েছে, তাই না?”
“আজ্ঞে সিমেন্টের কারখানা।” হাত কচলে সুরেশচন্দ্র বললেন, “মিঃ সেন আমাদের চিফ একজিকিউটিভ অফিসার
“প্রোডাকশন শুরু হয়ে গেছে?”
“আজ্ঞে না, কন্সট্রাকশনের কাজ এখনও শেষ হয়নি, তবে শিগগিরিই…এই ধরুন আর মাস দুই-তিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে।…আসলে গোড়ার দিকেই একটা গন্ডগোল ঘটে গিয়েছিল তো, নইলে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যেই ফার্স্ট ইউনিটের কাজ শেষ হয়ে যেত।”
“কীসের গন্ডগোল?”
“আজ্ঞে, জায়গাটার দখল নিতে গিয়ে গোড়াতেই একটা ঝঞ্ঝাট বাধে। কমপেনসেশন দেওয়া হয়েছিল, তবু কিছু ট্রাইবাল পিপ্ল ওখান থেকে সরে যেতে চায় না। তাই নিয়ে খুব ঝামেলা লেগে যায়। সেটা মিটে যাবার পরে কাজ বেশ এগোচ্ছিল, কিন্তু মাস তিনেক আগে আবার নতুন করে একটা ট্রাব্ল দেখা দেয়। কাজ যে শেষ হয়ে আসছে, এটা বুঝতে পেরে ঠিকে-মজুররা দাবি করে বসে যে, তাদের পার্মানেন্ট করে নিতে হবে। তাদের অনেক করে বলা হয় যে, তারা লেবার কন্ট্রাকটরের লোক, যদি কিছু বোঝাপড়া করতে হয় তো ঠিকেদার কোম্পানির সঙ্গে সেটা তাদের করতে হবে। কিন্তু সে-সব যুক্তির কথা তারা শুনতে চায় না, বলে যে, এই কারখানাতেই তাদের চাকরি চাই।”
“এটা তো নতুন-কিছু নয়। বলতে গেলে প্রায় সর্বত্রই এটা হচ্ছে। বিশেষ করে হচ্ছে কাজ যখন শেষ হয়ে আসে, তখন। এটা যেমন ওয়েস্ট বেঙ্গলে হচ্ছে, তেমন কর্নাটক, মহারাষ্ট্র কি অন্ধ্রেও কিছু কম হচ্ছে না; আর হবে না-ই বা কেন, পার্মানেন্ট চাকরি কে না চায়।”
“ঠিকই বলেছেন, স্যার। চাকরি তো ওরা চাইতেই পারে।”
“সেটা দেওয়া যাবে?”
“আজ্ঞে দিতেই হবে। সবাইকে না হোক, কিছু লোককে দিতেই হবে। ইউনিয়নের লিডারদের সঙ্গে অন্তত সেইরকমই কথা হয়েছে।” সুরেশচন্দ্র ফের হাত কচলাতে শুরু করলেন। তারপর বললেন, “আর কিছু না হোক, লিডারদের কারও শালা, কারও ভগ্নিপতি, কারও ভাগ্নেকে তো দিতেই হবে। তা নইলে কি আর নতুন করে কাজ শুরু করা যেত? যেত না।”
“তা এখন আর কোনও গন্ডগোল নেই তো?”
“আজ্ঞে না, স্যার।”
ভাদুড়িমশাই মৃদু হাসলেন। তারপর কালীচরণ সেনের চিঠিখানার উপরে আর-একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে সেটাকে আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “পড়ে দেখুন।”
চিঠিখানা এখানে তুলে দিচ্ছি:
প্রিয় মিঃ ভাদুড়ি,
যে-কারখানার কাজ নিয়ে এখানে এসেছি, তার কর্মীরা বিজয়া উপলক্ষে লক্ষ্মীপুজোর দিন অর্থাৎ ৮ অক্টোবর সন্ধ্যায় একটি প্রীতি-সম্মেলনের আয়োজন করেছেন। তাতে গান ও আবৃত্তি ছাড়াও একটি নাটক থাকবে। ডি. এল. রায়ের ‘চন্দ্রগুপ্ত। কর্মীরা ও তাঁদের পরিবারের লোকজনেরাই তাতে অংশ নেবেন। আমার উপর ভার পড়েছে সভাপতি ঠিক করে দেবার। তা বিখ্যাত কোনও লোক ছাড়া তো এঁদের মন উঠবে না, আর বিখ্যাত লোক বলতে একমাত্র আপনাকেই আমি চিনি। আমাকে হয়তো আপনার মনে পড়বে না, তবু বলি, বছর কয়েক আগে মাদ্রাজে রোটারি ক্লাবের একটা সভায় আপনার সঙ্গে আমার পরিচয় ও কিছু কথাবার্তা হয়েছিল।
যদি আসেন তো খুব খুশি হই। এখানে পাহাড় আছে, জঙ্গল আছে, একটা নদীও আছে। সুতরাং দিন তিনেকের জন্যে যদি আসেন, খারাপ লাগবে না। যদি সত্যি আসেন, তা হলে কীভাবে আসতে চান, সেটা সুরেশচন্দ্রকে জানাবেন। ও-ই সব ব্যবস্থা করে দেবে।
নমস্কার ও শুভেচ্ছা জানাই। ইতি। কালীচরণ সেন।
পুনশ্চ: ব্যাঙ্গালোরে আপনার অফিসের নাম্বারে ফোন করেছিলাম। আপনার কলকাতার ঠিকানা তাঁদের কাছে পাওয়া গেল।
চিঠি পড়া শেষ হয়ে গিয়েছিল। চোখ তুলে ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকাতে তিনি বললেন, “জায়গাটা ঠিক কোথায় বলুন তো?”
“বেঙ্গল-বিহার বর্ডারের কাছে। যাবেন নাকি?”
কথাটার উত্তর না দিয়ে সুরেশচন্দ্রের দিকে তাকিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “কারখানার কাজ তো শুনলুম শেষ হয়নি, লাইট-টাইট আছে তো?”
সুরেশচন্দ্র বললেন, “আজ্ঞে তা আছে বই কী। সব বাড়িতে এখনও অবিশ্যি কানেকশন দেওয়া যায়নি, তবে অফিসারদের কোয়ার্টারগুলোতে ইলেকট্রিক আছে, অ্যাডমিনিস্টেশন আপিসে আছে, অফিসার্স ক্লাবে আছে, আর আপনাকে তো যদ্দুর জানি গেস্ট হাউসে রাখা হবে, সেখানেও আছে।…যাবেন তো?”
“যদি যাই তো কীভাবে যাব?”
“আজ্ঞে গাড়িতেও যেতে পারেন, ট্রেনেও যেতে পারেন। গাড়িতে যদি যান তো আমাদের কলকাতা-আপিসকে আমরা ফোন করে দেব, লক্ষ্মীপুজোর দিন সকালে তারা এখানে গাড়ি পাঠিয়ে দেবে। আটটায় যদি রওনা হন, তো দুটো-আড়াইটের মধ্যেই পলাশডাঙায় পৌঁছে যাচ্ছেন। তবে আমার মনে হয় ট্রেনে যাওয়াই ভাল।”
“কেন?”
“আজ্ঞে ন্যাশনাল হাইওয়ের হাল বিশেষ সুবিধের নয়। যা বর্ষা গেল, রাস্তা অনেক জায়গায় ভেঙে গেছে, অথচ মেরামতির কাজ এদিকে খানিকটা এগিয়েছে বটে, কিন্তু ওদিকে এখনও শুরুই হয়নি। ঝাঁকুনি লাগবে, কষ্ট হবে। কোথাও কোথাও হয়তো আটকে যেতে পারেন। তাই বলছিলুম যে, রেলগাড়িতে যাওয়া ভাল।…তা হলে যাচ্ছেন তো?”
ভাদুড়িমশাই একটা সিগারেট ধরালেন। ধীরেসুস্থে ধোঁয়া ছাড়লেন। তারপর মৃদু হেসে বললেন, “এক্ষুনি কথা দিতে পারছি না। আপনি কি সরাসরি এখান থেকে হাওড়া গিয়ে ফিরবার ট্রেন ধরবেন?”
“না স্যার,” সুরেশচন্দ্র বললেন, “কলকাতায় আরও দু-একটা কাজ আছে। সেগুলি না-মিটিয়ে তো যাবার জো নেই, সব মিটিয়ে রাত্তিরের ট্রেন ধরব ভাবছি।”
“তা হলে বরং বিকেলে…এই ধরুন পাঁচটা নাগাদ একটা ফোন করুন। যাব কি না, তখনই সেটা বলে দেবখন।”
সুরেশচন্দ্র উঠে পড়লেন। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার আগে শেষবারের মতো হাত কচলে বললেন, “আজ্ঞে পাঁচটাতেই ফোন করব। তবে চেষ্টা করবেন, স্যার। সবাই বড় আশা করে রয়েছে।”
কৌশিক ওঁকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে এল।
সদানন্দবাবু বললেন, “খুব গুড-নেচারড লোক। কীরকম রেসপেক্টফুলি কতা কইছিল দেকলেন তো?”
অরুণ সান্যাল বললেন, “তা দেখলুম বই কী। আসলে একটা ভিতুর ডিম। ‘আজ্ঞে’ ছাড়া কথাই বলছিল না।”
কৌশিক বলল, “আর সারাক্ষণ সমানে হাত কচলাচ্ছিলেন।”
“হাত ঘেমে গেলে ওরকম হয়।” সদানন্দবাবু বললেন, “ওর খুব ভাল হোমোপ্যাথি ওষুধ আচে। আমার এক মামাতো ভাইয়েরও এরকম হত, দু’ডোজ পড়তেই সেরে গেল।”
অরুণ সান্যাল বললেন, “আশ্চর্য কাণ্ড, দাদা। প্রথমে তো ভদ্রলোকের নাম শুনে আপনি কিছুই ধরতে পারছিলেন না। তারপর চিঠি পড়েই সব আপনার মনে পড়ে গেল। এমন কী, কপালের কাটা দাগ আর গালের আঁচিল পর্যন্ত। এটা কী করে হয়?”
“হবে না কেন?” ভাদুড়িমশাই বললেন, “অ্যাসোসিয়েশন অব থট্স বলে একটা কথা আছে না? একটার সূত্রে আর-একটা চলে আসে। এতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই।
পলাশডাঙার কালীচরণের প্রসঙ্গ এসে পড়ায় মোম্বাসার কালীচরণ ইতিমধ্যে আড়ালে চলে গিয়েছিল। খাবার টেবিলে তার কথাটা আবার উঠে পড়ল।
অমিতাভ বলল, “আমি কিন্তু একটা কথা বুঝতে পারছি না, মামাবাবু।”
ভাদুড়িমশাই ডাল দিয়ে ভাত মাখছিলেন। কাজটা বন্ধ রেখে মুখ তুলে বললেন, “কোন কথাটা?”
“মোম্বাসার কালীচরণের কথাটা। মামাবাবু, ট্রায়াঙ্গুলার পার্কের সামনে যে-লোকটা আমার জন্যে ট্যাক্সি ধরে দিয়েছিল, হতে পারে সে আমাদের পাড়ারই মস্তান, ওদিককার ট্যাক্সিওয়ালারা তাকে ভয় খায়, আর এটাও হতে পারে যে, আমার রাঁচি ফেরার কথাটা সে জানত…আর হ্যাঁ, হাওড়া ইস্টিশানের কুলিরা যে ইয়ার্ড থেকেই কম্পার্টমেন্ট দখল করে রাখে, সেটাও না হয় বুঝলুম, যদিও সেই কম্পার্টমেন্টে অতগুলো বেঞ্চি খালি পড়ে থাকবে কেন, আর প্ল্যাটফর্মের উপরে শয়ে শয়ে লোক স্রেফ একটু জায়গার জন্যে হাপিত্যেস করে দাঁড়িয়ে থাকা সত্ত্বেও সেদিন বেছে-বেছে আমাকেই বা সেই কম্পার্টমেন্টে নিয়ে ঢোকানো হবে কেন, সেটা আমার ঠিক বোধগম্য হচ্ছে না। তবু নাহয় মেনে নিচ্ছি যে, আপনার কথাটাই ঠিক। কিন্তু মামাবাবু, মোম্বাসায় যা হল, তার তো কোনও ব্যাখ্যা নেই।
কৌশিক বলল, “ঠিক কথা, মোম্বাসার কালীচরণ তো পাড়ার লোকও নয়, হাওড়া ইস্টিশানের কুলিও নয়, তা হলে সে ও-সব কথা বলে কী করে?”
মালতী একপাশে দাঁড়িয়ে আমাদের খাওয়া দেখছিল রাঁধুনি মেয়েটিকে পরিবেশনের ব্যাপারে এটা-ওটা নির্দেশ দিচ্ছিল। সে এবারে ছেলেকে একটা কড়া ধমক দিয়ে বলল, “বলি এ-সব হচ্ছেটা কী, তোরা কি চটপট খেয়ে নিবি, না বসে-বসে শুধু গল্প করবি? এদিকে যে আড়াইটে বাজতে চলল। কাজের লোক দুটোকে ছুটি দিতে হবে না?”
ছোট বোনের দিকে তাকিয়ে একটু-বা অন্যমনস্কভাবে ভাদুড়িমশাই বললেন, “ও হ্যাঁ, বড্ড দেরি হয়ে গেল।” তারপর অমিতাভর দিকে মুখ ফিরিয়ে: “তুমি কী যেন বলছিলে?”
“বলছিলুম যে, মোম্বাসার ব্যাপারটা নিয়ে আমি অনেক ভেবেছি,” অমিতাভ বলল, “কিন্তু কোনও ব্যাখ্যা খুঁজে পাইনি।”
“তার মানে খুব ভাল করে ভাবোনি।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “এবারে বরং আমাকে একটু ভাবতে দাও।…কিন্তু আমিই বা এখন ভাবনা-চিন্তার সময় পাচ্ছি কোথায়? নতুন একটা ফ্যাকড়া জুটে গেল যে!”
হেসে বললুম, “পলাশডাঙা?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা ছাড়া আর কী। চিঠিটা তো পড়লেন। কী মনে হল?”
“মনে হল, চিঠিটা যিনি লিখেছেন তিনি একজন সত্যিকারের ভদ্র শিক্ষিত বিবেচক মানুষ।”
“এটা মনে হল কেন?”
“প্রথমত, আপিসের লেটারহেডে চিঠি না লিখে স্রেফ সাদা কাগজে লিখেছেন। তার মানে উনি যে একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির একজন বড়কর্তা, সেটা জাহির করতে চাননি। চিঠির কোথাও ওঁর পদমর্যাদার কোনও উল্লেখ নেই। দ্বিতীয়ত, আমাদের প্রোফেশনাল ম্যানেজাররা তো মাতৃভাষায় এক লাইন লিখতে গেলে দুটো কলম ভাঙেন, ইনি কিন্তু ঝরঝরে পরিচ্ছন্ন বাংলায় এই চিঠিখানা লিখেছেন। তৃতীয়ত, একগাদা আগড়ম-বাগড়ম না লিখে যেটুকু আমাদের জানানো দরকার, শুধু সেইটুকুই জানিয়েছেন ইনি।”
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “শার্লক হোমসের মতো না হলেও আপনার ডিডাকশনটা নেহাত খারাপ নয়।”
অরুণ সান্যাল বললেন, “যান দাদা, ঘুরেই আসুন। খারাপ লাগবে না।”
“তা না-হয় গেলুম, কিন্তু একা যেতে কি ভাল লাগবে?…কী রে কৌশিক, যাবি?”
“অসম্ভব।” কৌশিক বলল, “একটু ভালমন্দ খাব বলে পুজোর সময় কলকাতা এলুম, আর এরই মধ্যে আমাকে বাইরে যেতে বলছ?”
“কিরণবাবু, আপনি?”
বললুম, “আমার কোনও আপত্তি নেই। যখন পাহাড় আছে, জঙ্গল আছে, আর সেইসঙ্গে একটা নদীও আছে, তখন পলাশডাঙা জায়গাটা মনে হচ্ছে খারাপ হবে না।”
সদানন্দবাবু এতক্ষণ চুপচাপ সব শুনে যাচ্ছিলেন। এবারে ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমাকে অবিশ্যি আপনি রিকোয়েস্ট করেননি। তবে রিকোয়েস্ট যদি করেন তো আমিও যেতে পারি।”
ফোন এল ঠিক বিকেল পাঁচটাতেই। সুরেশচন্দ্র দাশের ফোন। ভাদুড়িমশাই তাঁকে জানিয়ে দিলেন যে, তিনি যাচ্ছেন। “সঙ্গে অবশ্য আমার দুই বন্ধুও যাবেন।…না, গাড়িতে নয়, আমরা ট্রেনেই যাচ্ছি।…হ্যাঁ, টাইমটেবিল দেখেছি। লক্ষ্মীপুজোর দিন বিকেল পাঁচটা পঁয়তিরিশে আমরা পলাশডাঙায় পৌঁছব।…ও হ্যাঁ, হাওড়ায় আমাদের পৌঁছে দিতে হবে না, একটা ট্যাক্সি ধরে আমরা চলে যেতে পারব, তবে পলাশডাঙা স্টেশনে যদি আপনারা কেউ থাকেন তো ভাল হয়।”
.
মেল কিংবা এক্সপ্রেস যেহেতু পলাশডাঙায় থামে না, লক্ষ্মীপুজোর দিন হাওড়ায় এসে তাই একটা প্যাসেঞ্জার গাড়িতে আমাদের উঠতে হয়। তবে এটা ফাস্ট প্যাসেঞ্জার, কিছু-কিছু ইস্টিশানকে তাই টপকে চলেছে। তা সত্ত্বেও এক ঘন্টা লেট, পলাশডাঙায় পৌঁছতে পৌঁছতে সাড়ে ছ’টা বেজে গেল। প্ল্যাটফর্মে নামতেই যিনি এগিয়ে এসে আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন, ভাদুড়িমশাইয়ের সঙ্গে তাঁর কথা থেকে বুঝে নিলুম যে, ইনিই মিঃ কালীচরণ সেন, বুকানন ইন্ডিয়ার এই সিমেন্ট ফ্যাক্টরির বড়কর্তা।
ভদ্রলোকের কপালের ডানদিকে যে সত্যিই একটা কাটা দাগ আর বাঁ গালে একটা আঁচিল রয়েছে তাও চোখে পড়ল।
দিন ছোট হয়ে এসেছে, চারদিক তাই এরই মধ্যে অন্ধকার। কারখানাটা এখান থেকে মাইল দুয়েক দূরে। রাস্তাটাও উঁচুনিচু। ভদ্রলোক তাই একটা জিপ নিয়ে এসেছেন। স্টেশন থেকে বেরিয়ে আমরা সেই জিপগাড়িতে উঠে পড়লুম।
গাড়ি চলতে শুরু করার পর ভাদুড়িমশাই বললেন, “ট্রেনটা লেট করবে ভাবিনি, তবে আপনাদের অনুষ্ঠান নিশ্চয় শুরু হয়ে গেছে।
কালীচরণ সেন নিজেই গাড়ি চালাচ্ছিলেন। তাঁর চোখ সামনের দিকে। চোখ না ফিরিয়েই তিনি বললেন, “অনুষ্ঠান তো হচ্ছে না।”
