অ্যালবিনো (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ
সাত
ঋজুদা আমার ঘরের খাটে বালিশে হেলান দিয়ে আধশোয়া হয়ে পাইপ খাচ্ছিল।
বলল, একটু আরাম করে নে রুদ্র। ঘণ্টাখানেক পর বাথরুমে গিয়ে, গলায় আঙুল দিয়ে বমি করতে হবে। যত জোরে পারিস; শব্দ করে।
মুরগী-মুসল্লমটা বড় ভালো করেছিল, উগরে দিতে বলছ? আমি বললাম।
হ্যাঁ। সরি রুদ্র। উগরেই দিতে হবে। গোয়েন্দাগিরির সবে হাতেখড়ি হচ্ছে আমাদের। অনেক কিছুই করতে হবে। গোয়েন্দাগিরি কি চাট্টিখানি কথা?
আমি বললাম, ঋজুদা, কেসটার কি বুঝছ? কিছু কি ক্লু পেয়েছো? মার্ডার-টার্ডার হবে নাকি?
যে-কোনো মুহূর্তে। ঋজুদা গম্ভীর মুখে বলল।
তারপর বলল, আজ সকালে তোকে দিয়েই এ্যাকাউন্ট ওপেন করে ফেলেছিল প্রায়। একটুর জন্যে মিস্ করে গেল।
সকাল থেকে আমার চোখের সামনে কেবলি সাপটার চেহারা ভাসছিল। ভাবলেই, গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল আমার। কী একখানা সাপ!
ঋজুদাকে বললাম, ওটা কি সাপ ঋজুদা?
তখন থেকে আমিও বোঝবার চেষ্টা করছি। কাছাকাছি এসেছি, তবে ঠিক কী-না জানি না। কোলকাতা গিয়ে বাদুর স্নেকপার্কে গিয়ে দীপকবাবুকে জিজ্ঞেস করতে হবে আমার অনুমান ঠিক কী-না। ভদ্রলোক খুবই ওয়েল-ইনফমড এসব ব্যাপারে।
সাপেদের নাকি কান নেই। আমি বললাম।
না কান নেই। কিন্তু সাপেরা যে শুনতে পারে এ বিষয়েও কোনো সন্দেহ নেই। ম্যালকম্ স্মিথ-এর রেপটালিয়া এন্ড অ্যাম্ফিরিয়া বইয়ের খুব সম্ভব তৃতীয় চ্যাপ্টারে, যেখানে সার্পেন্টস্ সম্বন্ধে উনি আলোচনা করেছেন, সেখানে উনি বলেছেন : It is difficult to say much this lack of auditory apparatus has affected their hearing, or whether they have any compensatory machanism to make up for it, but that they can hear very well is indisputable.
তারপর বলল, আসলে, যে-কোনো শব্দ যে তরঙ্গ তোলে আবহতে, তাতেই সাপেরা শুনতে পারে। ওদের একটিমাত্র sensory area আছে–তাকে বলে Papilla basilaris. সেই জায়গাতেই শব্দ-তরঙ্গ লহরী তোলে। তাই শীষ দিয়ে যে লোকটি ঐ এতবড় বিষাক্ত সাপকে শত্রুনিধনের জন্যে ব্যবহার করছে, তাকে বাহাদুরী দিতে হয়। পাকা সাপুড়ে।
সাপটা কি সাপ তা ত’ বললে না?
যতদূর মনে হচ্ছে, সাপটা ওফিফাগাস্ ভ্যারাইটীর। আমাদের পুরাণ সাহিত্যে যাকে নাগ বলে। নাগের মধ্যে এ হচ্ছে যম-নাগ। খালি অন্য সাপ খেয়েই থাকে এরা। বড় গাছের কোটরে অথবা বড় বড় গাছের ডালে পেঁচিয়ে থাকে। অ্যালবার্ট গান্থার সাহেব, আঠারশ একষট্টি সালে তাঁর যে বিখ্যাত বই লিখেছিলেন, দ্যা রেপটাইলস অব ব্রিটিশ ইন্ডিয়া, সে-বইতেও তিনি এ-সাপের বিশদ বিবরণ দিয়েছেন। পাওয়া যায় অনেকই জায়গায়, কিন্তু খুবই দুষ্প্রাপ্য সাপ। এর কামড় একবার খেলে আর দেখতে হত না। অবশ্য যদি পেট-ভরা থাকে সাপেদের, তাহলে বিষের তেজ কম হয়। সব বিষাক্ত সাপই যত উপোস থাকবে, তার বিষ তত বেশি হবে।
আফ্রিকাতে আছে এই সাপ? আমি ঋজুদাকে শুধোলাম।
ঋজুদা উত্তর না দিয়ে কী যেন ভাবছিল পাইপ খেতে খেতে।
আসলে এই সাপ ব্যাপারটা আমার মোটেই পছন্দ নয়। ছোট কি বড়, বিষধর কি নির্বিষ; যে-কোনো সাপ দেখলেই আমার গা-ঘিনঘিন করে। মাবাবার সঙ্গে একবার স্কুলের ছুটিতে বিন্ধ্যাচলে বেড়াতে গিয়ে একটা শঙ্খচূড় সাপ মেরেছিলাম। ওখানে যে বাড়িতে ছিলাম আমরা, সেখানে একটি মেয়ে কাজ করত। সে একদিন সকালে দৌড়ে এসে কেঁদে পড়ল। তার ছেলেকে শঙ্খচূড় সাপে কামড়েছে। সঙ্গে সঙ্গে শেষ। আর তাদের গ্রামের পথের পাশেই একটা গর্তমত জায়গায় বাঁশঝাড়ের মধ্যে গিয়ে ঢুকেছে সাপটা। লোকেরা লাঠি নিয়ে গেছিল মারতে, তাদের এমন তাড়া করেছে যে, তারা পালিয়ে এসে বেঁচেছে কোনোক্রমে। বন্দুক নিয়ে গিয়ে মেরেছিলাম সাপটাকে–কিন্তু গুলি খাওয়ার পরও তার কী আস্ফালন। গর্তর মধ্যে বাঁশগাছগুলো সব লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছিলো। এখনও মনে হলে, ভয়ে গা শিউরে ওঠে। গ্রামের লোকেরা আমায় কাঁধে করে বাড়ি নিয়ে গেছিল, ছোট্ট ছেলে বলে–। মা খুব আদর করেছিলেন আর বকেওছিলেন।
ঋজুদা তখনও কি ভাবছিল।
আমি আবারও বললাম, আফ্রিকাতে আছে? ঋজুদা?
ঋজুদা বলল, না। এই সাপ নেই। এদের দেখা যায় সুমাত্রা, জাভা, বোর্নিও, ফিলিপিনস, আর আন্দামানে। ডুমেরিল সাহেব অবশ্য বলেছেন যে, নিউগিনিতেও এই সাপ দেখেছিলেন তিনি।
ঋজুদা বলল, আমি শুধু ভাবছি, এমন এক সাপ পোষ মানিয়ে এমন কাজে কে লাগাতে পারে?
তারপরই বলল, উত্তরপ্রদেশে বেহেড়িয়া বলে একটি সম্প্রদায় আছে, তারা বন্যপ্রাণী বশ করতে ওস্তাদ। তোদের ঐ বিন্ধ্যাচলের কাছেই মীর্জাপুর জেলায় শিউপুরা গ্রামে একটা লোক আসত বিন্ধ্যাচল পাহাড় থেকে নেমে; ওখানে জেঠুমণির সঙ্গে আমিও একবার গেছিলাম, সেই লোকটা ছিল ঐ সম্প্রদায়ের। সে আমাকে বলত যে, ও কুমীরের সঙ্গে কথা বলতে পারে। সেইই ত’ জেঠুমণিকে একবার শম্বর মারার জন্যে নিয়ে গিয়ে ভুল করে মীর্জাপুরের কুখ্যাত লেঠেলদের গ্রামের পেছনের দুপা বাঁধা একটা ঘোড়া মারিয়েছিল। রাত্তির বেলা।
আমি ঋজুদার কথা শুনে হেসে ফেললাম। বললাম, জেঠুমণির কাণ্ড।
ঋজুদা বলল, সব বেহেড়িয়াই যে ওরকম আনাড়ি তা নয়। বেহেড়িয়ারা সব পারে।
হঠাৎ ঘড়ি দেখে ঋজুদা বলল, রুরুদদরবাবু আপনার পেট-আপসেট হবার টাইম হয়েছে। প্রথমে জোর বমি। তারপর ঘড়ি ধরে পনেরো মিনিট বাদে বাদে তুই আর আমি দুজনেই বাথরুমে যাব। এত জোরে শব্দ করে ফ্লাশ টানতে হবে যে মনে হবে বাড়ি বুঝি ভেঙেই পড়ল। আওয়াজটা ত’ বিষেণদেওবাবু আর ভানুপ্রতাপের শোনা দরকার। কি বলিস?
গুরু-আজ্ঞা। অতএব আমার পেট গড়বড় হল। গুরুরও হল। তবে কম। কিন্তু তখন যদি জানতাম এর পরিণাম কি হতে পারে!
বিকেল চারটে নাগাদ বারান্দায় পায়ের শব্দ পাওয়া গেল। আমরা ভাবলাম, বেয়ারা চা নিয়ে আসছে। ঠিক করেছিলাম, বেয়ারাকে চা রেখে যেতে বলব, তারপর চলে গেলে মাঠরী এবং বোঁদে মেরে দেব। ফাস্টক্লাশ টেস্ট।
কিন্তু যে এল, সে বেয়ারা নয়। স্বয়ং বিষেণদেওবাবু।
বললেন, মনে হচ্ছে কারো শরীর খারাপ। যে বেচারী হ্যান্ডপাম্প দিয়ে কুঁয়ো থেকে জল তোলে ওভারহেড-ট্যাঙ্কে সে এসে বলছে ট্যাঙ্কের জল শেষ। খুবই কি বেশি অসুবিধে।
ঋজুদা কি বলবে ভেবে না পেয়ে বলল, আসুন আসুন। তারপর আমাকে দেখিয়ে বলল, ছেলেটা মারা যাবার উপক্রম। আপনি আসবেন ভেবে আগে খবর দিইনি, তাছাড়া এতটা যে বাড়াবাড়ি হবে তাও……হাতের জল শুকোতে পাচ্ছে না।
এত অসভ্য ঋজুদাটা! এই ভাষা বলতে পারে ঋজুদা, তা আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না। কিন্তু গোয়েন্দাগিরি করতে গেলে অনেক কিছুই করতে হয়।
সঙ্গে সঙ্গে বিষেণদেওবাবু বললেন, সারা দুপুর ফ্লাশ টানার ঘনঘন আওয়াজ শুনেই আমি বুঝেছিলাম। যাকগে, আমি ওষুধ নিয়েই এসেছি সঙ্গে করে। জংলী জায়গা। হাতের কাছে সব ওষুধই মজুত রাখতে হয়।
আমি মনে মনে বললাম, সাপের হাত থেকে বেঁচেছি, এবার ওষুধ বলে বিষ খাইয়ে দেবেন ইনি।
আমার চোখের ভাষা ঋজুদা বুঝল।
বলল, কি ওষুধ? দেখি! বলেই, ওষুধটা ইজিচেয়ারে বসা বিষেণদেওবাবুর হাত থেকে নিল। এন্টারোস্টেপ। পড়ল নামটা।
চারটে ক্যাপসুল নিয়ে এসেছিলেন উনি।
ঋজুদা বলল, খাইয়ে দেব ওকে।
বিষেণদেওবাবু বললেন, দেব নয় মশাই, এক্ষুনি খাওয়ান। এখানে অসুখ বেড়ে গেলে আর কিছু করার থাকবে না।
ঋজুদার মুখের ভাব করুণ হয়ে উঠল। হঠাৎই বিশ্বাসঘাতকতা করে বসল আমার সঙ্গে। বলল, আমারটা তেমন সীরিয়াস নয়–ঐ আপনার রুরুদদরবাবুরই কেস খুব সীরিয়াস।
বিষেণদেওবাবু হঠাৎ ইজীচেয়ার ছেড়ে উঠে লাল-ভেজা-কম্বলে ঢাকা মোরাদাবাদী কলসী থেকে রুপোর গ্লাসে নিজের হাতে জল ঢেলে আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। বললেন, আও বেটা, দাবা লে লেও। চার-গোলী একসাথ।
ওঁর সামনেই খেতে হল। সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় চার-চারটে এন্টারোস্টেপ। বলতে গেলে কলেরারই ওষুধ।
ওষুধ খাইয়ে বিষেণদেওবাবু ঋজুদাকে বললেন, বিকেলে হাঁটতে বেরোবেন না?
ঋজুদা বলল, দেখি, এখন ছেলেটা কেমন থাকে।
বিষেণদেওবাবু ঋজুদাকে বললেন, চা পাঠিয়ে দিই গিয়ে?
ঋজুদা বললেন, দিন। শুধু আমার জন্যে।
বিষেণদেওবাবু চলে যেতেই, আমি ঋজুদার দিকে তাকালাম।
ঋজুদা ডান হাতে পাইপ ধরে বাঁ হাতটা আমার নাকের সামনে তুলে বলল, তুই শার্লক-হোমস পড়েছিস?
আমি উত্তর না দিয়ে বললাম, এটা কি হল? তুমি এমন করে লেট-ডাউন করলে আমাকে। নিজে কেটে গেলে; আমাকে ডুবিয়ে।
ঋজুদা বলল, রুদ্র, ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড। ইটস ওল ইন দ্যা গেম।
আমি স্তোকবাক্যে না ভুলে প্রায় কেঁদে ফেলে বললাম, ঈসস-স। বললাম, কাল সকালে কি হবে আমার?
সেইটাই হচ্ছে কতা। বলেই, ঋজুদা একবার উঠে গিয়ে বারান্দায় কেউ আছে কি নেই দেখে নিয়েই হো হো করে হেসে উঠল।
তারপর আমার কাছে এসে বলল, সরী, ভেরী ভেরী সরী; রুদ্র।
আমি ভাবছিলাম, কালকে সারাদিন, অথবা কে জানে পরশুও হয়ত আমার কেবলই মনে হবে এর চেয়ে বিষেণদেওবাবু আমাকে বিষ খাওয়ালেই খুশী হতাম।
ঋজুদার জন্যে চা এল। মাঠরী এবং বোঁদেও এল।
ঋজুদা আমার দিকে চেয়ে বলল, লোভে পাপ; পাপে মৃত্যু।
তারপর বলল, যাক ওয়াটসনের খাতিরে শার্লক হোমস না-হয় আজ শুধু চা-ই-ই খেল। মাঠরী এবং বোঁদে স্যাক্রিফাইস করলাম আমি তোর জন্যে। বুঝলি কমরেড।
আমরা বিকেলে বারান্দার চেয়ারে এসে বসলাম। বাইরে বেলা পড়ে এসেছিল। নাচঘরের কাছে বুনো নিমের সবুজ অন্ধকারের মধ্যে অল্প কটা ইউক্যালিপটাসের সাদা নরম গা-মাথা দারুণ কনট্রাস্ট-এর সৃষ্টি করেছে। সাদা নরম গাছের গায়ে প্রথম ভোরে এবং শেষ দিনের আলো যেমন করে আলতো হাতে রঙ লাগায় এমন আর কোনো গাছেই লাগায় না। সুন্দরবনের সাদা বানীগাছ, পালামৌর চিলবিল আর আফ্রিকার ইয়ালোফিভার এ্যাকাসিয়াকে গোধূলির আলোতেই দেখতে হয়।
এক ঝাঁক টিয়া এক স্কোয়াড্রন সবুজ ক্ষুদে জেট-প্লেনের মত উড়ে যাচ্ছে। কোরা হরিণ ডাকছে পশ্চিমের জঙ্গল থেকে। নানারকম পাখির মিশ্র আওয়াজ। হঠাৎ নিঃশব্দ পায়ে দিন চলে গিয়ে যে রাত এলো, তা বোঝা গেল যখন একটা হুতুম প্যাঁচা তার কামানের গোলার মত ডাক ছুঁড়ে গার্ড-অফ-অনার দিল রাতকে। দুররগুন্ দুরগুম্ দুরগু-ম-ম্।
আমার অবস্থা কাহিল। মিথ্যা পেট আপসেট হওয়াতে এবং সত্যি এন্টারোস্টেপ খাওয়াতে। তাই বিষেণদেওবাবু এবং ভানুপ্রতাপ দুজনেই উপরে এলেন। কাল সকালে ছুলোয়ার বন্দোবস্ত করবেন কি করবেন না তা নিয়ে আলোচনা হল। ঋজুদা যেহেতু ওষুধ খায়নি, বলল, আমি ত যেতে পারি, কিন্তু আমি ত’ মারব না–যার সবচেয়ে উৎসাহ বেশি, সেই-ই যদি…।
বিষেণদেওবাবু বললেন, দাবা লেনেকা বাদ ভি টাট্টী……!
এত অসভ্য। ভাবলাম আমি। ঋজুদার উপর ভীষণই রাগ হল।
বিষেণদেওবাবু বললেন, তব ঔরভি চার-গোলি মাঙ্গাতা ম্যায়। খা লেও তুরন্ত।
শুনে, ভয়েই আধমরা হয়ে গেলাম আমি।
বললাম, না না, ওষুধ খাওয়ার পর আর……একেবারেই….
ঋজুদা আমাকে সহানুভূতি দেখানোর জন্যে বলল, ও ত’ রাতে কিছুই খাবে না, আমিও খাবো না। কালকে ছুলোয়া না করলেই ভাল। রুদ্র বেচারী। মারতে না পারুক, দেখতে ত’ পারবে অ্যালবিনো বাঘটাকে!
দেখতে মানে? মারতেও পারবে জরুর। বিষেণদেওবাবু বললেন। আসোয়া আর তার বেটা রত্ন নিজের চোখে দেখেছে।
বললাম, কেমন দেখতে?
ছাই-ছাই রঙ, কটা চোখ, আর দাড়ি-গোঁফওয়ালা হলুদ একটা ঘোড়ার মত দেখতে। দিখকে দিমাগ খারাপ হো যায়গা।
শুনেই দিমাগ খারাপ হচ্ছিল আমার। তারপর কিছুক্ষণ গল্প-গুজব করে ওঁরা নেমে গেলেন। বললেন, রাতে মিছরির শরবত খেয়ে যেন শুই।
ওরা চলে গেলেই আমরা ঘরের ভিতরে এলাম। ঋজুদা বলল, এর আগেও অ্যালবিনোর যা ডেসক্রিপশান ওরা দিয়েছেন তার সঙ্গে কিন্তু আসল অ্যালবিনোর চেহারা মিলছে না। আমি মধ্যপ্রদেশের ভীণ্ডার রাজার কাছে অ্যালবিনোর গল্প শুনেছি। উনি একটা মেরেছিলেন, যখন তোর মত বয়স ওঁর। অ্যালবিনোর গায়ের রঙ, লোম, সব সাদা হয়। আর চোখের রঙ হয় গোলাপি অথবা হাল্কা নীল। ভীণ্ডার রাজার বাঘটার চোখের রঙ ছিল গোলাপি। বুঝতে পারছিস? এই মালোয়াঁ-মহল ঘিরে অনেকই রহস্য আছে। এক নম্বর রহস্য অ্যালবিনো। দু নম্বর, নাচঘর। তিন নম্বর, ভূত। চার নম্বর, ভূতের ঘোড়া। পাঁচ নম্বর, পেত্নী। ছ’ নম্বর, পেত্নীর গান। সাত আর আট নম্বর ঘোড়া ও ঘোড়সওয়ার। ন’নম্বর, ওফিকাগাস সাপ। দশ নম্বর, ভানুপ্রতাপের বাবা ও মার হঠাৎ এবং এত অল্প দিনের ব্যবধানে মারা যাওয়ার রহস্য।
আমি বললাম, আরও একটা রহস্য আছে।
কি? ঋজুদা বলল।
ভানুপ্রতাপের বিদেশী ট্যুওয়ার গাড়িটা দেখেছিলে?
হ্যাঁ। ঋজুদা বলল।
আমাকে প্রথম দিন রাস্তায় দেখা হতেই তুলে নিয়ে গেছিলেন উনি গীমারীয়াতে। মনে আছে?
হ্যাঁ।
ঐ গাড়িতে খসস আতরের গন্ধ পেয়েছিলাম আর সেই গন্ধ ছাপিয়ে একটা বোঁটকা বাঘ বাঘ গন্ধ। আমি জিজ্ঞেসও করেছিলাম, কিসের গন্ধ বেরোচ্ছে?
ভানুপ্রতাপ বলেছিলেন ওঁর গাড়িতে উনি গরমের দিনে খসস আর শীতের দিনে অম্বর আত্বর স্প্রে করিয়ে রাখেন।
হুমম…..ম। ঋজুদা বলল।
তারপর বলল, গন্ধটা বাঘ-বাঘ, তোর ঠিক মনে আছে?
ঠিক বাঘেরই কি-না জানি না, তবে বাঘবাঘই মনে হয়েছিল।
তাহলে; এগারো নম্বর রহস্য বোঁটকা-গন্ধ। আমাদের এই এগারোটি রহস্য ভেদ করতে হবে।
তারপর একটু চুপ করে থেকে বলল, এটা অন্যায় নয়? প্রথমেই কি কাউকে গোয়েন্দাগিরিতে ডক্টরেটের থীসিস্ সাবমিট করতে বলা উচিত? বল্ রুদ্র! একটু সোজা কেস এবং একটা-দুটো রহস্য দিয়ে ব্যাপারটা শুরু হলেই ভালো হত না?
বললাম, ভালো ত’ হত! কিন্তু…
